ঢাকা, শনিবার   ০৫ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

পাড়ার মোড়ে চা বেঁচে বদলে গেল বিধবা অণিমার জীবন

প্রকাশিত : ১৫:৫২, ৯ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ১১:৫৮, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Ekushey Television Ltd.

অণিমা রাণী। বয়স ৬৫ ছুঁয়েছে। যশোর চৌগাছার বালিদা পাড়া গ্রামে বসবাস। ১৪ বছর আগে হারিয়েছেন স্বামী। একমাত্র ছেলে সে-ও ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে দুনিয়া ছেড়েছেন অনেক আগেই। একদিকে স্বামী ও ২২ বছরের ছেলে হারানোর বেদনা। অন্যদিকে সংসারে ৮ মেয়ে সন্তানের ভরণ-পোষণের ভার।

সবমিলিয়ে হতাশার এক অথৈ পাথারে পড়ে যান অণিমা। ছেলের ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে সহায়-সম্বল হারিয়ে অর্থের টানাপোড়েনে চোখে যেন শর্ষে ফুল দেখতে থাকেন তিনি। আর সেই মুহুর্তে তার পাশে দাঁড়ায় উন্নয়ন সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এ কর্মসূচি। এর আওতায় মাসে ৫০০ টাকা বয়স্ক ভাতা পাওয়া শুরু করেন অণিমা, এখনও পাচ্ছেন। তবে এখন আর ওই ভাতার ওপর তার খুব বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে না। ভাতার ক্ষুদ্র পুঁজি বিনিয়োগ করে পাড়ার মোড়ে চা বেঁচা শুরু করেন অণিমা। প্রিয়জন হারানো ও বয়সের বাঁধা তাকে দমাতে পারেনি। চা বিক্রি করে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার চালিয়ে অল্প অল্প সঞ্চয়ও করেন। দোকানও করে ফেলেছেন। আজ তিনি অনেকটাই স্বাবলম্বী।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ থেকে ১৪ বছর আগে স্বামী গৌর দত্ত ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বেশ ভালোই চলছিল ৮ মেয়ের মা অণিমা রাণীর সংসার। স্বপ্ন দেখছিলেন ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সংসারের হাল তার হাতে ছেড়ে দিবেন। সংসারের ভার ছেড়ে দিয়ে স্বামী ও সে নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করবেন। কিন্তু বিধি বাম। হঠাৎ রোগাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন স্বামী। বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধে স্বামীর শরীরে। স্বামীর চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হলো না। স্বামীর মৃত্যুতে মুষঢ়ে পড়েন অণিমা রাণী। ২০০৩ সালে স্বামীকে হারানোর বেদনা ভুলতে না ভুলতেই তার মাথায় আরও একটা বজ্রপাত।

একমাত্র ভরসার স্থল ছেলেটিও আক্রান্ত হলো দূরারোগ্য ব্যাধিতে। ছেলের ক্যান্সার নিরাময়ে তিনি ছুটতে থাকেন হাকিম, কবিরাজ, ফকীর ও ডাক্তারের দরজায়। যেখানে ভালো হওয়ার ভরসা পান সেখানেই ছুটে যান। এভাবে সহায়-সম্বল যা ছিল এক ছেলের পেছনে সবই খুঁইয়ে বসেন। তারপরেও বিধি বিমুখ। শেষ রক্ষা হলো না। ছেলেও বাবার পথে হাটলো, না ফেরার দেশে। স্বামী আর ছেলে হারানোর বেদনায় অস্বাভাবিক হয়ে পড়লেন বৃদ্ধা অণিমা রাণী। কাঁদতেও যেন ভুলে গেছেন তিনি। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে চোখে মুখে ঘোর অমানিশা দেখতে পান। কোনো চিকিৎসকও তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারছিল না। এভাবে চলতে থাকে কিছুদিন।

মরার ওপর আবার খাড়ার ঘাঁ। ৯ মেয়ের মধ্যে ১ মেয়ে আক্রান্ত হলেন টিটিনাসে। মেয়েকে বাঁচাতে দরকার টাকা। কিন্তু সে টাকা তো আগেই ছেলের পেছনে খরচ হয়ে গেছে। এখন অণিমা নি:স্ব। তাই ইচ্ছা থাকলেও মেয়েকে আর ডাক্তারের কাছে নেওয়া সম্ভব হয় না। শেষ পর্যন্ত মেয়েকেও কেড়ে নিল বিধাতা। একে একে স্বামী, ছেলে ও মেয়েকে হারিয়ে শোকাহত অণিমা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন।

কারো সঙ্গে কথা বলেন না। মুখে কোনো হাসি নেই। কোনো কিছুতেই যেন তার আর খেয়াল নাই। দিন দিন তিনিও অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। নানা অসুখ বাসা বাঁধতে থাকে তার শরীরে। এ অবস্থায় অণিমার জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)। যেখানে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় অসহায় গরীব প্রবীণদেরকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হয়।

এই কর্মসূচির সদস্য হিসেবে অণিমা রাণী ২০১৬ সালের জুলাই থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পেতে শুরু করেন। সেই টাকা জমিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে সিংহঝুলি বাজারে চা-বিস্কুট, রুটি-কলা বিক্রি শুরু করেন অণিমা। প্রথম দিকে খোলা জায়গায় চা বিক্রি করতেন। পরে স্থানীয় এক বিত্তবান আব্দুল করিম মল্লিক তার একটি ঘর অণিমা রানীর চা বিক্রির জন্য দেন। রোজ চা-বিস্কুট বিক্রি করে যা লাভ হয় তা দিয়ে সংসার ভালো মতোই চলে যায় তার।

অণিমা রাণীর একদিকে ব্যবসায়ের এ লাভ, অন্যদিকে জাগরণীর মাধ্যমে পিকেএসএফের প্রতিমাসের ভাতা। যা গত জুলাই থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে অণিমা রাণী এখন সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। স্বামী ও ছেলে সন্তান হারিয়েও তার ভরণ-পোষণের জন্য আর চিন্তা করতে হয় না। স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে তিনি এখন অনেকটা স্বাভাবিক ও সুস্থ্য। এখন তার ইচ্ছা জীবনের শেষ দিনগুলো যেন এভাবে হাঁসি-খুশিতে কাটাতে পারেন।

তার এ ইচছাকে বাস্তবে নিতে পিকেএসএফের অর্থ সহযোগিতার পাশাপাশি বাসস্থানের সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় দানবীর আব্দুল করিম মল্লিক। আব্দুল করিম মল্লিক অণিমাকে মানষিকভাবে সুস্থ্য করে তুলতে এক মেয়ে ও তার জামাইকে ইটের বাড়ি করে দিয়েছেন। যেখানে জামাই-মেয়ে ও অণিমা রাণী থাকেন। সবার সঙ্গে হেসে-খেলে জীবন যাচ্ছে তার।

অণিমা রাণী বলেন, আমার ৯ মেয়ের মধ্যে একজন মারা গেছে অনেক আগেই। বাকী ৮ মেয়ের ৪ জনকে ভারতে বিয়ে দিয়েছি। আর ৪জনকে বাংলাদেশেই বিয়ে দিয়েছি। যাদের একজনকে আবার আমার কাছে এনে রেখেছি। তাদের নিয়েই আমার সংসার ভালই চলছে।সুখেই আছি।

অণিমার ভাষ্য, বয়স্ক ভাতা আর এ চায়ের দোকান নাড়াচাড়া করে আমার খোরাক এখন আমি নিজেই যোগার করতে পারি। কারো ওপর ধর্না দিয়ে থাকতে হয় না। এটাই আমার বড় পাওয়া। প্রথমে এ কাজ শুরু করতে আমার ভয় হচ্ছিল। হিসেবও ভাল বুঝতাম না। কারণ আমি মাত্র ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছি। এখন কিন্তু আর তেমন অসুবিধা হয় না। এজন্য পিকেএসএফ ও জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ। তারা আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাগরণীর ‘প্রবীণ জন গোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়ন’ প্রকল্প চৌগাছা ইউনিয়নের সমন্বয়ক মিজানুর রহমান বলেন, আমরা যখন অণীমা রাণীর পাশে এসে দাঁড়াই তখন তার মানসিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। মানসিক দুরাবস্থার সঙ্গে শারীরিক ও অর্থনৈতিক দূরবস্থাও ছিল। এরপর আমাদের বয়স্ক ভাতা পেয়ে অণিমা রাণী একটা চায়ের দোকান দিলেন। প্রথমে তার মুখে যেন কোনো হাঁসি ছিল না। দশটা কথা বলার পর একটার উত্তর দিতেন। এখন তিনি হাঁসি মুখে কথা বলেন। জীবন সংগ্রামে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

/ এআর /


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি