ঢাকা, ২০১৯-০৬-১৯ ১৬:৫০:৪৩, বুধবার

Ekushey Television Ltd.

রামকৃষ্ণ মিশনে হচ্ছে ১০ তলা ভবন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৮:১৩ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শনিবার

সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কেন্দ্র ঢাকার মঠ। রাজধানীর টিকাটুলি ইত্তেফাক মোড়ের নিকবর্তী এ মঠে নির্মাণ করা হচ্ছে ১০ তলা অত্যাধুনিক ভবন। ভবনের নাম দেওয়া হচ্ছে ‘বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী ভবন’। যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠাগার, সংস্কৃতিশালা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র খোলা হবে।

মিশন সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১৮ সালের মধ্যে এ ভবন নির্মাণ কার্যক্রম শেষ করা হবে। ভবনের ৫ম তলা পর্যন্ত সম্পন্ন করে সেখানেই মিশনের সব সেবা দেওয়া হবে। নতুন এ ভবনে সেবার পরিধি আরো বাড়ানো হবে বলে জানায় মিশন কর্তৃপক্ষ।

মিশনের আইটি বিভাগের প্রধান অরুণ মহারাজ বলেন, মানব সেবাই আমাদের মিশন নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সে সেবা কার্যক্রমগুলো সবার মাঝে আরো সহজভাবে পৌঁছে দিতে চলতি বছরেই ভবন নির্মাণ শেষ করা হবে।

জানা গেছে, মানব সেবায় ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের অনেক তাত্পর্যপূর্ণ কার্যক্রম রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে চিকিত্সা সেবা, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষা দান উল্লেখযোগ্য। সংক্ষেপে এর বিশেষ কিছু কার্যক্রম তুলে ধরা হলো।

বিদ্যালয় : ১৯১৪ সালের ৮ নভেম্বর শ্রী রামকৃষ্ণ অবৈতনিক বিদ্যালয় নামে দরিদ্র ছেলেদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়। ১৯১৬ সালে ওয়ারী ও মৌশুন্ডির ভাড়া বাড়ি থেকে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টি হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়।

বিদ্যার্থী ভবন : পঞ্চাশের দশকে লম্বা টালির চালার একটি ঘরে কিছু ছাত্র থাকতে শুরু করে। ষাটের দশকে দোতলা ‘বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী’ ভবনটি নির্মাণ হয়। ২০০৪ সালের দিকে ছাত্রদের থাকার অভাব পূরণে হাসপাতাল সংলগ্ন দোতলায় আরেকটি নতুন ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকার বাইরের থেকে যেসব শিক্ষার্থী নটরডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয় তারাই এখানে থাকার সুযোগ পায়। প্রতিবছর দরিদ্র ও মেধাবী কয়েকজন ছাত্রকে বিনা খরচে বা আংশিক খরচে এখানে থেকে পড়াশুনার সুযোগ দেওয়া হয়।

সংস্কৃতি ভবন : ১৯৭৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মো. সায়েম। ১৯৭৭ সালে এই সংস্কৃতি দ্বিতল ভবনের দ্বারোত্ঘাটন করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড় মঠের জেনারেল সেক্রেটারি স্বামী গম্ভীরানন্দ। সংস্কৃতি ভবনের নিচতলায় গ্রন্থাগার, দোতলায় বিবেকানন্দ হল।

পাঠাগার : ১৯১১ সালে স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য স্বামী পরমানন্দ মিশনে পাঠাগার স্থাপন করেন। পাঠাগারে ধর্মীয় গ্রন্থ, রামকৃষ্ণের বাণী, স্বামী বিবেকানন্দের উপদেশাবলিসহ বহু প্রাচীন গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে। সাধারণ পাঠকসহ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় গ্রন্থ, পত্রিকা ও সাময়িকী রয়েছে এই পাঠাগারে।

বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ : ১৯৮৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত কিছু যুবক ঢাকা মঠের তত্কালীন অধ্যক্ষ স্বামী অক্ষরানন্দের সান্নিধ্যে এসে বিবেকানন্দের মানবসেবা শিক্ষা এবং সংস্কৃতি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ’ গঠন করে। বর্তমানে দেশজুড়ে এই পরিষদের ৩৮টি সেন্টার রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ত্রাণকার্য এবং অন্ধ দরিদ্র ও শিশুদের প্রয়োজনে সেবাকাজ করে যাচ্ছে এ পরিষদ।

 

প্রশিক্ষণ কর্মসূচি : চিকিত্সালয় সংলগ্ন ভবনের নিচতলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মোটরগাড়ি  মেরামত, ওয়েল্ডিং এবং অন্যান্য শক্তিচালিত যন্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যুগের চাহিদার সাথে যুগোপযোগী শিক্ষার জন্য চালু করা হয় ‘কম্পিউটার ট্রেনিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’।

চিকিত্সা সেবা : মিশনের সেবা বিভাগ চালু হয় ১৯০৮ সালে। শুরুতে মিশনের সেবকরা বাড়ি বাড়ি দিয়ে রোগীদের সেবা দিতো। পরে নবাব সলিমুল্লার আর্থিক সহায়তায় মিশনে ১৯১৩ সালে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১৬ সালে ৮ অক্টোবর ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের উদ্বোধন করেন লর্ড কার্জন। নাক, কান ও গলা, দন্ত, চোখসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিত্সার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আছে প্যাথলজি বিভাগ। উন্নতমানের এক্সরে মেশিনে রোগীরা স্বল্পমূল্যে এক্সরে করার এবং আলট্রাসনোগ্রাফি করার সুযোগ রয়েছে এখানে। দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম-মহাসভায় বক্তৃতার পর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বিভিন্ন দেশ ও জায়গায় পরিভ্রমণে বের হন। পরিভ্রমণ শেষে ১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় ফিরে আসেন স্বামীজী। ওই বছরই পহেলা মে কলকাতায় ধর্ম প্রচারের জন্য এবং সামাজিক কাজের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। এটি ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিত্সা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনের প্রারম্ভ। রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শের ভিত্তিই হচ্ছে কর্মযোগ।

১৮৯৯ সালে ১৮ জানুয়ারি, স্বামীজী অসুস্থ, কিন্তু কাজ করে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। ভগবান বুদ্ধের বাণী প্রচারের জন্য যেমন তার অনুগামীরা দূর-দূরান্তে গিয়েছিলেন তেমনি শ্রী রামকৃষ্ণের বাণী প্রচারের জন্য তার অনুগামীদের সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষ্যে কাজ করেন স্বামীজী। এই সিদ্ধান্তনুসারে স্বামীজী  স্বামী বিরজানন্দ ও স্বামী প্রকাশানন্দকে বাংলাদেশে যাবার আদেশ দেন। স্বামী বিরজানন্দ তখন স্বামীজীকে বিনীতভাবে বলেন, ‘স্বামীজী, আমি কী প্রচার করব? আমি তো কিছুই জানি না।’ স্বামীজী তখন বলেন, ‘তবে যা, তাই বলগে। ওটাও তো একটা মস্ত বড় কাজ।’ তারপর স্বামীজী নরম স্বরে বলেন, ‘বাবারা, কাজে লেগে যা, মনপ্রাণ দিয়ে কাজে লেগে যা। ওই হচ্ছে কাজের কথা; ফলের দিকে দৃষ্টি দিবি না। যদি অপরের কল্যাণ সাধন করতে গিয়ে নরকগামী হতে হয়, তাতেই বা ক্ষতি কি? স্বার্থপরতা নিয়ে নিজের স্বর্গলাভ করার চেয়ে এ ঢের ভালো।’ এরপর ১৮৯৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি স্বামী বিরজানন্দ ও স্বামী প্রকাশানন্দ ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তারা ঢাকায় পৌঁছে কায়েতটুলিতে কাশিমপুরের জমিদার সারদা রায় চৌধুরীর বাড়িতে ওঠেন। ওখানে থেকেই তারা প্রচার কাজ শুরু করেন। এর আগেই ১৮৯৮ সাল থেকে মোহিনীমোহন দাসের বাড়িতে শ্রী রামকৃষ্ণের মতবাদ প্রচারের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৯৯ সালকেই ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাকাল ধরা হয়। ১৯১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পূজা ও হোমের পর আশ্রমের বর্তমান স্থানে স্বামী ব্রহ্মানন্দ ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও স্বামী প্রেমানন্দ রামকৃষ্ণ মিশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঢাকার জমিদার, ধর্ম ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক যোগেশ চন্দ্র দাসের দান করা সাত বিঘা জমিতে এ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানেই মঠ এবং মিশনের মূল মন্দির, সাধু নিবাস, চিকিত্সার জন্য হাসপাতাল, স্কুল, সংস্কৃতি ভবন নির্মিত হয়। মন্দিরটি পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০০০ সালে। শেষ হয় ২০০৫ সালে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেলুড় মঠের সহাধ্যক্ষ স্বামী গহনানন্দজী মহারাজ।

আরকে// এআর



© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি