ঢাকা, ২০১৯-০৬-১৭ ১৬:৫৭:৪৫, সোমবার

Ekushey Television Ltd.

হাওরবাসীর দিনলিপি

জামশেদ উদ্দীন

প্রকাশিত : ১০:৫৮ পিএম, ১৬ মে ২০১৯ বৃহস্পতিবার

‘আত্মপীড়নের অন্তরালে’ গল্প গ্রন্থটিতে হাওরবাসীর সুখ-দুঃখ ফুটে উঠেছে। এটি মূলত রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত-এর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সঙ্কলিত গল্পগ্রন্থ। হারিয়ে যাওয়া যতসব গল্প ও তার প্রকাশিত ৫টি গল্পগ্রন্থ থেকে বাছাই করা ৩৪টি গল্প নিয়ে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত আপাদমস্তক একজন ছোট গল্পকার। প্রকাশিত কয়েকটি বড় গল্পও রয়েছে তার। ওই সব গল্প আকারে বড় হলেও ছেদ পড়েনি পাঠে। গ্রন্থের ভূমিকায় কবি অরুণ দাস গুপ্ত এমনি অভিমত প্রকাশ করেন।

তিনি লিখেন,‘অজ্ঞাতবাসের দিনরাত্রি’ গল্পগ্রন্থটিতে দুটি বড় গল্প রয়েছে, ওইসব গল্পও সঙ্কলিত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রত্যেকটি গল্প দৈর্ঘ্যে বেশ বড়। তবে ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য হারায়নি। তৃষ্ণার বিলাপ গ্রন্থে ‘তরঙ্গ ভঙ্গ’ ‘সন্দেহ’ ও সুন্দর দাঁড়াও ফিরে গ্রন্থে এবং নামংকিত গল্পটিও আছে ওই গ্রন্থটিতে।

এছাড়া ‘আত্মপীড়নের অন্তরালে’ ‘চাক্ষুষ’ ‘আশ্রয়’, কিংশুকের স্বপ্নবিলাস, ‘নিত্যানন্দেন অসুখ-বিসুখ, ‘স্খলন’ এবং আকাক্সক্ষারা উড়ে যায় গ্রন্থে ‘শেষ নেই’ ‘প্রেম পালিয়েছে’ ‘সাগর থেকে ফেরা’ প্রভৃতি গল্পে রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত মনঃকোকনদে মধুবিন্দুর সন্ধান করেছেন। ‘সাগর থেকে ফেরা’ গল্পটি চমৎকার একটি গল্প। এই গল্পের প্রধান চরিত্র মূলত আত্মজৈবনিক, গল্পে তা বর্ণিত হয়েছে। পরস্পর ভালোবেসে বিয়ে করা, তারপর কয়েক বছর ঘর-সংসার করা, দুই কন্যার জন্ম দেওয়া সন্তানদের ফেলে স্বামীকে ছেড়ে অন্য এক পুরুষের হাতধরে চলে যাওয়া, বেশ কয়েক বছর পর আবার স্বামীর ঘরে ফিরে আসার ঘটনা নিয়ে রথীন্দ্র প্রসাদ গল্পটি লিখেছেন। অন্তিম আকুতি-দহনে গল্পটি শেষ হয়।

গল্পটি নামকরণেও গল্পকার ভাবসত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এভাবে সংসার-সমুদ্রে নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে ফিরে আসা। গল্পকার নেহাত সাদামাটা নারীর শরীরি-স্থুলতা বা একধরণে আসক্তি হয়ে ছুটেননি। তবে প্রকৃতির কাছে আশ্রিত হয়েছেন। ‘প্রার্থনা’ গল্পে তা ফুটে উঠেছে। ‘পুকুর পাড়ে প্রাচীন একটা বৃক্ষ দণ্ডায়মান। এর শাখা প্রশাখা ছাতার মতো বিস্তৃত হয়ে একটু পশ্চিম দিকে হেলে মন্দিরটাকে যেন স্নেহ-শিতল ছায়া দিচ্ছে। শাখা-প্রশাখায় আশ্রিত আজ পাখ-পাখালি সকাল-সন্ধ্যায় ঈশ্বরের বন্দনায়ও মুখরিত হয়।’

‘জীবন কাঁদে মোহনার বাঁকে’ গল্পের বর্ণনা মনোমুগ্ধকর। ‘কুমারী বসন্তের সকালে হাল্কা কুয়াশা পড়েছে, কুয়াশা ভেঙে এখনো ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি। রাস্তার দু’পাশে কর্ষিত মাঠভরে আছে রোদের পোড়া মাটির ডেলায়। ধূরস প্রকৃতিতে বাতাসে শীতের আমেজ। আকাশে মেঘের অবস্থানটা জলরঙ চিত্রের পটভূমি হয়ে আছে। দু’জন শিশির ধোয়া ঘাস মাড়িয়ে কথা বলতে-বলতে পাশাপাশি যাচ্ছে। নাহার পড়েছে কচুপাতা রঙের একটি শাড়ি। সত্যের মনে হলো যেন সূর্যালোকের অভার তাড়াতে পারছে কচুপাতার রঙের শাড়িটা।’

গল্পের এই চিত্রকল্প ও আঙ্গিক পরিপূর্ণতা পায়। যা সমাজ ও বাস্তবতার নিরিখে ফুটে উঠে। অন্যদিকে গল্পের ভাষাও ঝরঝরে এবং শক্তিমত্তা ও রোমান্টিকতার আবহে পাঠকে প্রতিক্ষণ উজ্জীবিত করে। গল্পের এ যাদুবাস্তবতায় লেখকের সফলতার স্বাক্ষর মিলে।

ব্যক্তিগতভাবে গল্পকার রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত’র সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, যখন তিনি পেটের পীড়ায় ও দুরাগ্য ক্যান্সারে নিদারুণভাবে আক্রান্ত। বলা যায় এক ধরনের বন্দি অবস্থায় দিন অতিবাহিত হচ্ছিল তার ; এই নিত্য সুখ-দুঃখের খুঁনসুটি কাছ থেকে দেখা। গ্রন্থটি প্রকাশ নিয়ে অন্যরকম দহন ছিল তার। হারিয়ে যাওয়া গল্প নিয়ে সে কি উৎকণ্ঠা, প্রতিটি লেখকেরই এমনি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়। গ্রন্থে লেখকের অনু ভূমিকায় সেই আত্মজ বেদনার কথা প্রকাশ পায়।

গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলো আমাদের স্বাধীনতার সমসাময়িক। অর্থাৎ ঊনিশ’শ বাহাত্তর থেকে দুই হাজার দুই সাল পর্যন্ত। তবে ওই সময়ের সঙ্গে গল্পগুলো গ্রন্থে ধারাবাহিক সাজানো সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে দীর্ঘ বিরতি হয়েছে। যেটুকু লেখালেখি ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, তার সবটুকু সংগ্রহেও থাকেনি। যেটুকু পাওয়া গেছে সেটুকু দিয়েই গ্রন্থিত করা হয়েছে।

তিনি অনুভব করেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে তার প্রকাশিত বইগুলো এখন আর বাজারে নেই। আগোছালো মানুষ হিসেবে পাণ্ডুলিপিসহ সবকটি গ্রন্থেরও একই অবস্থা। এক এক করে সংগ্রহ করতে হয়েছে, এমতাবস্থায় মনে হলো পাঁচটি গ্রন্থকে এক মলাটে নিয়ে এলে গল্পগুলো সংরক্ষিত থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের সামনেও উপস্থাপিত হবে। এ রকম ভাবনা থেকেই বইটি প্রকাশ পেল। তবে গল্পগুলো আগের মতোই থেকেছে। প্রথম-বয়সের আবেগ-অনুভূতি আর এসময়ের আবেগ-অনুভূতি এক নয়; একদিন যেমন ছিলেন, গল্পগুলোও তেমনি সেখানে রেখে দিয়েছেন।

রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত হাওয়র অঞ্চল নেত্রকোণার গোপালশ্রম কেন্দুয়ায় ১৯৪৭ সালে ২০ অক্টোবর জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা- ভূপেন্দ্র প্রসাদ দত্ত। মাতা- ইন্দু প্রভা দত্ত। স্ত্রী, তাপসী মজুমদার। মেয়ে, রূপা দত্ত পপি, ছেলে-অভীক প্রসাদ দত্ত।

সত্তর দশকে ঢাকা ও কলকাতা বেশ কয়েকটি নামকরা ও খ্যাতিমান পত্রিকায় সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত হন মেজোভাই রমেন দত্ত। তিনি একজন কবিও। অথাৎ পারিবারিক বৃত্তে রথীন্দ্র দত্তের বেড়ে ওঠা। তবে লেখালেখিতে তিনি নিজস্ব সকিয়তা বজায় রেখে সৃষ্টিশীল পরিমণ্ডল গড়ে তোলতে সক্ষম হন।

গল্পকার রথীন্দ্র প্রসাদ দত্তের শৈশবের দূরন্তপনা কাটে নেত্রকোণার হাওয়র এলাকায়। গল্পে হাওরবাসীর সুখ-দুঃখের কথা উঠে আসে। প্রত্যয়, সন্ধি, নিত্য আসা-যাওয়া, অজ্ঞাতবাসের দিনরাত্রি, জীবন কাঁদে মোহনার বাঁকে এবং শেষ নেই গ্রল্পে চিত্রায়িত হয়। ‘শেষ নেই’ গল্পের শুরুতেই উল্লেখ করেন, ‘ চৈত্রের দাহে প্রকৃতি জ্বলছিল। বেঙ্গুরা, রাজগাতি, ভাটেরশী, এসব হাওয়রে ধূলোর কুণ্ডলী উড়িয়ে দাপাদাপি করে বাতাসেও খেলছে।’ গল্পে রুস্তম আলী স্বপ্ন দেখে, বাড়ির পেছনে পশ্চিম দিকে ধু-ধু করা বেঙ্গুরা হাওরে কর্ষিত জমির ইটাগুলো যেনো চুলার জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলছে। পূর্বদিকে জালির হাওয়রে মা বসুমতি মুঠো মুঠো রাশি-রাশি সোনা প্রসব করছে, পক্ষকালের মধ্যেই দু’হাত ভরে ঘরে তুলে আনবে তার চার পাড়ের মানুষ। হরালী এসব দুর্গত মানুষের কথা বিবেচনা করে আত্মহুতি দিতে রাজি হয়ে যান; তখন কৃষককে উপদেশ দিয়ে হরালী বললেন, ‘এখন আমি যে নিয়মের কথা বলছি তা যদি তোমরা মেনে চলো তবে এ হাওরে আর কখনোই শিলাবৃষ্টি হবে না; কৃষকরা এই নিয়মের কথা জানতে চাইলে হরালী বলেন, এ হাওরে ফসল কাটার আগে হিন্দুরা পাঁঠা বলী দিয়ে কালী পূজা করবে আর মুসলমানরা বিলাবে শিরনী। এই হাওরের বুকের ওপর দিয়ে কেউ পাদুকা পরে আর ছাতা মেলে চলাচল করতে পারবে না।’ এভাবেই হাওরবাসীর নিত্যদিনের দিনলিপি বয়ে চলছে।

২০১৯ সালে অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় গ্রন্থটি প্রকাশ করে ‘খড়িমাটি’ প্রকাশন। প্রচ্ছেদ করেছেন খালিদ হাসান। ৩৬৮ পৃষ্টা এই গল্পগ্রন্থের শুভেচ্ছা মূল্য ৪০০ টাকা।

লেখক: কবি ও মুক্তিযুদ্ধো বিষক গবেষক

 



© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি