ঢাকা, ২০১৯-০৪-২৬ ৭:৪৮:৩৮, শুক্রবার

বাংলাদেশের আইসিইউতে ৮০ ভাগ মৃত্যুর কারণ সুপারবাগ: টেলিগ্রাফ

বাংলাদেশের আইসিইউতে ৮০ ভাগ মৃত্যুর কারণ সুপারবাগ: টেলিগ্রাফ

বাংলাদেশের আইসিইউতে ৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ‘সুপারবাগ’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-তে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ আইসিইউতে কর্মরত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক সায়েদুর রহমানের বরাতে এ খবর দিয়েছে বৃটেনের দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এই অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। এসব দেশে চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, গবাদী পশু মোটাতাজা করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া এবং দোকান থেকে অবৈধভাবে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার সুযোগকে এক্ষেত্রে দায়ী করা হয়েছে। ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে হাসপাতালটির আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন ৯০০ জন রোগী। এদের ৪০০ জনই মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ৮০ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকজনিত ইনফেকশনকে দায়ী করা হয়েছে। এসব ইনফেকশন ছিল অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক দোকানে কেনাবেচা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এসব ওষুধ শুধুমাত্র হাসপাতাল থেকে বিতরণ করা যাবে, এমন ব্যবস্থা করা উচিত। এক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি প্রয়োজন। অধ্যাপক আবু সালেহ আরও বলেন, ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য কোনো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক নেই। পাশাপাশি, বর্তমানে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এ কারণে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই সুপারবাগের বিস্তারের পেছনে মূল দায়ী করা হচ্ছে, অর্থের লোভে অযোগ্য ডাক্তারদের দেওয়া আ্যান্টিবায়োটিকে ভুল প্রেসক্রিপশন। অনেক দেশে আবার গবাদী পশুর রোগের জন্য প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধ অনুসরণ করা হয় না। মানুষের জন্য ব্যবহার্য অনেক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় গবাদী পশুকে, যাতে দ্রুত ওজন বাড়ানো সম্ভব হয়। এদিকে, দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার এই প্রতিবেদনের পর প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রিটে বিবাদী করা হয়েছে, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জনপ্রশাসন সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রিটের শুনানি হবে বলে জানান এই আইনজীবী। এ ব্যাপারে সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক শুধু যে আমরা নিজেরা নিচ্ছি তা নয়, কৃষিজাত পণ্য, গরু, ছাগল ও মুরগিতেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহার হচ্ছে। ফলে পরোক্ষভাবে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে। যার কারণে একটা বয়সে আর অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। অ্যান্টিবায়োটিক একটা সময়ে আমাদের জন্য ছিলো বড় আবিষ্কার, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সময়ে এটা আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। এর একমাত্র কারণ হলো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কোন নিয়ম-কানুন মানা হয় না। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি যে অ্যান্টিবায়োটিকটা যেন অন্তত স্পেশালাইজড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান ছাড়া এটা বিক্রি না হয়। কারণ, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যপারটা বুঝছেন না। আমি মনে করি এ ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের এখনি সচেতন হওয়া প্রয়োজন, নয়তো আমাদের পরবর্তী ১/২টা জেনারেশনে আর কোন ওষুধে কাজ করবেনা। উল্লেখ্য, জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর ধারা ৩ (১৫)- তে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে বলা হয়েছে— ‘উন্নত দেশগুলোর আদলে সাধারণভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে’ এই তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ধারা ৪ (১৮) -এ ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধ সম্পর্কে বলা হয়েছে— নিবন্ধিত অ্যালোপেথিক, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতির ওষুধের মধ্য থেকে সাধারণভাবে ব্যবহৃত এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওষুধ তালিকাভুক্ত করা হলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সময় সময় এ তালিকা হালনাগাদ করবে বলে ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে। এসি  
নকল সিগারেট বাজারে, বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

অবৈধভাবে উৎপাদিত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সিগারেটের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। অন্যদিকে এ অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রনের বাইরে থাকায় বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ তামাক মুক্ত করার লক্ষ্য প্রতি বছর সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনসহ সরকারের নেওয়া উদ্যোগ গুলোও মারাত্বকভাবে ব্যহত হচ্ছে। এজন্য প্রশাসনের কম নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে খোঁজ নিয়ে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় আমাদের প্রতিনিধিদের সরেজমিন বাজার পরিদর্শ থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রনের বাইরে থাকায় বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এজন্য প্রশাসনের কম নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছে, সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের ১০ ভাগ সিগারেট থেকে আসে। আর এ খাতের আয় প্রতি বছরই বাড়ছে। এ খাত থেকে গত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে সরকার। চলতি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের আশা করা হচ্ছে। এর আগে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ও ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করেছে সরকার। এসব তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় দ্বিগুনেরও বেশি বেড়েছে। তবে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেটের বাজারের কারণে সরকার আরও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের গত বছরের তথানুযায়ী, রাজস্ব ফঁকি দিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সিগারেটের ব্র্যান্ডের সংখ্যা ৪০টিরও বেশি। সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় ৩০টি কোম্পানি ৫০টির বেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট উৎপাদন করছে। রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন বাজারে সেনর গোল্ড, ডার্লি, ব্ল্যাক, ভরসা, পার্টনার, দেশ ব্ল্যাক, টপি টেন, ফ্রেশ গোল্ড, সুপার গোল্ড সেনর গোল্ড পিউর ইত্যাদি নামে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ১০ শলাকার এক প্যাকেট সিগারেটের সর্বনিম্ন দাম ৩৫ টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১০-১৫ টাকায় সিগারেটের প্যাকেট বিক্রি করছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অবৈধ ও নকল সিগারেটের এই বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে এ খাত থেকে বছরে আরও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে জানা যায়, দামের ভিত্তিতে সিগারেটকে তিনটি স্তরে ভাগ করে রাজস্ব আদায় করা হয়। এরমধ্যে শুধু নিম্ন স্তরের অর্থাৎ কম দামের সিগারেটের ভোক্তাই প্রায় ৭০ ভাগ। এ খাতের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭১ ভাগ কম দামের সিগারেট থেকে আসে। এরমধ্যে সম্পূরক শুল্ক ৫৫ ভাগ, মূল্য সংযোজন কর ১৫ ভাগ ও হেলথ সারচার্জ এক ভাগ। এ হিসেবে ৩৫ টাকা মূল্যের প্রতি প্যাকেটের সিগারেট থেকে প্রায় ২৫ টাকা রাজস্ব আয় হয়। এই আয় নিশ্চিত করতে সিগারেট প্রস্তুতকারী সব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে ট্যাক্সস্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ট্যাক্সস্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ছাড়া কোন সিগারেট বাজারে ছাড়া হলে সেটা আইনত অবৈধ। এছাড়া ট্যাক্স স্ট্যাম্প পুনঃব্যবহার ও নকলভাবে সিগারেট উৎপাদন আইনত দণ্ডীয় অপরাধ। দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বাংলাদেশ লি. এই ট্যাক্স স্ট্যাম্প উৎপাদনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান। কেউ যদি অন্য কোথাও ট্যাক্সস্ট্যাম্প/ ব্যান্ডরোল উৎপাদন করে থাকে সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নকল টাকা তৈরির মতোই বড় অপরাধ। অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে বাংলাদেশ প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাক মুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেটের বাজার। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে প্রশাসনকে মাঠ পর্যায়ে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এবিষয় জানতে চাইলে, ঢাকা পশ্চিম কমিশনারেটের কমিশনার ড. মইনুল খান একুশে টিভি অনলাইনকে বলেন, নকল সিগারেট করখানা বন্ধ করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলায় এমন একটি কারখানা সন্ধান পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কারখানার জন্য কোনো ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া হয়নি। ভ্যাটের নিবন্ধন ব্যতিত এর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, যা অবৈধ। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ ভ্যাট রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে ক্রেতারা নকল সিগারেট কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে ক্রেতার স্বাস্থ্যঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘কারখানায় স্থাপিত উন্নতমানের মেশিন দিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ শলাকা সিগারেট প্রস্তুত করা সম্ভব। সে হিসেবে এ ধরনের একটি গোপন প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ স্তরের সিগারেট উৎপাদনের ভিত্তিতে মাসে গড়ে প্রায় ৫১ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি হতে পারে। এবিষয় জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ড. মো. শহিদুল ইসলাম একুশে টিভি অনলাইনকে বলেন, সম্প্রতি সময়ে আমরা লক্ষ করছি নকল সিগারেট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। যার মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এছাড়া এসব সিগারেট পান করার কারণে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছি। আমরা এবিষয় আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। অতিরিক্ত কমিশনার জাকির হোসেন একুশে টিভি অনলাইনকে বলেন, অফিসারদের তদারকির মাধ্যমে গতকাল একটি নকল সিগারেট কারখানার সন্ধান পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। টাঙ্গাইল শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ‘মেসার্স শাকিল অটো রাইস মিল’ নামের এ কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ তামাক ভর্তি সিগারেটের ফিল্টার ও মেশিন জব্দ করা হয়ে টিআর

বৈশাখে কেন পান্তা ইলিশ?

ইলিশ মাছ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ ইতিমধ্যে ভৌগলিক নিবন্ধনও পেয়েছে। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০-৭৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। দিনে দিনে এই ইলিশ উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে। তবে কিছু ব্যবসায়ী এবং ভ্রান্ত ধারণার কারণে মা-ইলিশ ও জাটকা ইলিশ ধরাও বাড়ছে। জানা যায়, দেশে সারা বছর যতো জাটকা ধরা হয় তার ৬৫-৭০ শতাংশ ধরা হয় এপ্রিল মাসে বৈশাখ উপলক্ষ্যে। মৎস্যসম্পদ গবেষক অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, ‘মার্চ-এপ্রিলে ইলিশ থাকে জাটকা অবস্থায়। তাই তা ধরার ওপরে নিষেধাজ্ঞা থাকে। কারণ, জাটকা ইলিশ ধরা হলে এর উৎপাদনও কমবে। এখন যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তা মূলত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত ছাড়া কেউ কিনতে পারছেন না। ইলিশকে সারাবছর সব শ্রেণির মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে চাইলে বৈশাখে ইলিশ খাওয়া বন্ধ করতে হবে।’ বাংলা নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে একবারেই ছিল না। এর সঙ্গে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কোনো সংযোগ নেই। বাংলা নববর্ষ সৌর পঞ্জিকা অনুসারে প্রবর্তিত হয়। এই এলাকায় পান্তা ভাত সব সময়ই কৃষকের কাছে পরিচিত খাবার। এর সঙ্গে বিভিন্ন শাকসবজি ও শুটকি ভর্তা ছিল খাবারের তালিকায়। কিছু এলাকায় কচু শাকের ডাঁটা মিশিয়ে চাঁদা মাছের শুটকির প্রচলন বেশি ছিল বলে জানা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে। প্রথমটি আবহমান বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে চলে আসা সামজিক রীতি। অন্যটি ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রমনা পার্কক ঘিরে শুরু হলেও বর্তমানে যার বিকশিত রূপ সারা বাংলাদেশ এবং বিশ্বে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়া প্রসঙ্গে ছায়ানটের সভাপতি ও রবীন্দ্র-গবেষক সন্জীদা খাতুন মন্তব্য করেন, ‘একসময় আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের (ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন) আশপাশে অনেক দোকান বসত।  সেখানে পান্তা-ইলিশ খাওয়ানো হতো। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসব দোকান দিত। দোষটা এসে চাপে আমাদের ঘাড়ে। অথচ গ্রামের হালখাতার নববর্ষ আর রমনার নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা হচ্ছে বাঙালির নবজাগরণ। যারা বোঝেন না, তারা এ নিয়ে বিদ্রুপ করেন। পত্র-পত্রিকায় উপসম্পাদকীয়ও লেখেন। এসব কথায় কখনও কান দিই নি। নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেতে হবে- এমনটা কখনও  দেখি নি, শুনি নি। কারণ গ্রামের মানুষ এ সময় কাঁচা লঙ্কার সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে অথবা শুকনো মরিচ পুড়িয়ে পান্তা ভাত খায়। সেখানে ইলিশ থাকে না। ইলিশ তো খুব দামি মাছ। এটা গ্রামের মানুষ কোথায় পাবে?’ মানিক বন্দ্যোপাধায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস ইলিশ ধরা জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের চরিত্র কুবের ও অন্যান্য জেলেদের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনার বিষয়টি এসেছে সেখানে। ঋতুভিত্তিক সামাজিক অবস্থাও ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। কিন্তু পুরো উপন্যাসের কোথাও বৈশাখ মাসে নববর্ষ পালনের জন্য ইলিশের যোগান দেয়ার কথা লেখা হয় নি। লোক গবেষক শামসুজ্জামান খান মনে করেন, ‘বৈশাখে খরার মাসে যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা  মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে  খেত।’ যতটুকু জানা যায়- আশির দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন এবং তা সব বিক্রি হয়ে গেল। কয়েকজন বেকার তরুণ এই কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদেরকে উৎসাহিত করতে এবং ‘নতুন একটা কিছু প্রবর্তন’ করার মানসিকতা নিয়ে একটি গ্রুপ এর প্রচারণা চালাতে লাগলেন। যাদের মধ্যে দুই একজন গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন।  বিষয়টা আর কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। মুনাফালোভী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বৈশাখের অনেক কিছুই কর্পোরেটদের দখলে চলে যায়। কর্পোরেট সংস্কৃতি সব কিছুকেই পণ্য বানাতে চায়। সেজন্য তারা উপকরণ খোঁজে। পান্তা ইলিশ হয়ে যায় সেই উপকরণ। বৈশাখী খাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পান্তা ইলিশ। মিডিয়ায় ইলিশের নানাপদের রেসিপি, বিজ্ঞাপন, নাটক, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সবখানে এমন ভাবেই বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের সংযোগ ঘটানো হয় যে, মনে হয় পান্তা ইলিশ ছাড়া বৈশাখের কোনো মানে নেই। যার প্রভাব পড়ে আর্থ-সামজিক পরিমণ্ডলে। ইলিশের চাহিদা কেবল বাড়তেই থাকে। এক হালি ইলিশের দাম এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ইলিশ বলতে নির্বিচারে জাটকা নিধন শুরু হয়। দেশে সারা বছর যতো জাটকা ধরা হয় তার অন্তত শতকরা ৬৫ ভাগ মার্চ এপ্রিল মাসে নিধন হয়। তা কেবল এই বৈশাখকে কেন্দ্র করে। এ সময় মা ইলিশের ডিমসহ নিধন কেবল একটি মাছ নয়, লাখ লাখ ভবিষ্যতের ইলিশকেও ধ্বংস করা হয়। সামাজিক এই অনাচারের প্রতি প্রথম নীরব প্রতিবাদ জানায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। ২০১৩ সালে এই সংগঠনের সদস্যরা বৈশাখে ইলিশ বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা ইলিশের বিকল্প হিসেবে বাজারে সুলভ তেলাপিয়া মাছকে বেছে নেন এবং পান্তার সঙ্গে তেলাপিয়া মিলিয়ে ‘পান্তপিয়া’ নাম দিয়ে সদস্যদের হাজার হাজার পরিবার নববর্ষকে বরণ করেন। প্রতি বছর তারা নববর্ষে ইলিশ বর্জন করে পান্তাপিয়া দিয়েই উৎসব পালন করছেন। যা অনেকের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পরবর্তীতে সুধী সমাজ, মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। এ বিষয়ে কবি আসাদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। এ সময়টা ইলিশ সংরক্ষণের সময়। বৈশাখ উপলক্ষে কিছু লোক পয়সার গরম দেখানোর জন্য চড়া দামে ইলিশ কিনছে, কিছু লোক সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করছে; এরা আত্মসম্মানবোধহীন বাঙালি।’  বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অনেক গণমাধ্যমও এগিয়ে এসেছে। তারা নিয়মিত প্রতিবেদন, টক শো, টিজার, মানববন্ধনসহ নানা উদ্যোগ নেয়। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে নববর্ষ পালনে ইলিশ বর্জনের ঘোষণা দেন এবং ধারাবাহিক ভাবে তিনি এই সিদ্ধান্ত বজায় রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সরকারি বৈশাখী আয়োজনগুলো থেকে ইলিশ বাদ পড়ে। নববর্ষের আগে চাঁদপুরসহ ইলিশের জেলাগুলোতে যে বিরূপ চাপ পড়তো তা অনেকটাই কমে আসে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায়। দেশের একটি বড় অংশ ইলিশ খাওয়া থেকে বিরত হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। তার প্রমাণ পাওয়া যচ্ছে ইলিশ প্রধান এলাকাগুলোতে। সম্প্রতি আড়াই কেজি ওজনের একটি ইলিশ মাছ ধরা পড়েছে নাফ নদীতে। ‘ইলিশের উৎপাদন ৯ বছরে ৬৬ শতাংশ’ বেড়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে গত ৯ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টন, যা গত ৯ বছরে বেড়ে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ বেশি উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। পাশাপাশি এ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪২ দশমিক ৭৭ লাখ মেট্রিক টন হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল দুই লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে এর পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা চার লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭ সালের শেষদিকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এ সফলতা এসেছে। এ অর্জন ধরে রাখতে হবে। মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ভাবে মৎস্যখাতে জড়িত এবং ১১ শতাংশের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে শুধু ইলিশ থেকে। দেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক দশমিক ১৫ শতাংশের অধিক। মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ দিতে বছরে দুই বার ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ২০১১ সালে সংশোধিত আইন অনুযায়ী ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদ উদয় হওয়ার আগে তিন দিন ও চাঁদ উদয় হওয়ার পরের সাত দিন মোট ১১দিন উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ দিন। এ ছাড়া, জাটকা সংরক্ষণে এবং প্রজননের সুযোগ দিয়ে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই মাসও নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। দেশের ১৬টি জেলার প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবার এ খাদ্য সহায়তা পায় বলে জানায় মৎস্যসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র।” তবে শুধু মা ইলিশ বা জাটকা নয়, ইলিশ বাঁচাতে এর ডিম সংরক্ষণও বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “চাঁদপুর থেকে ইলিশের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে রপ্তানি করা হচ্ছে ইলিশের ডিম। প্রতিদিন অন্তত ৫০০ কেজি করে ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত করার পর ছোট ছোট বাক্সে করে পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রামে। সেখান থেকে এসব ইলিশের ডিম ভারত হয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। ডিম প্রক্রিয়াজাতকারক ও বিক্রেতা আজাদ হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরে স্থানীয় ও চট্টগ্রামের কিছু ব্যবসায়ী ইলিশের ডিম চাঁদপুর থেকে প্রক্রিয়াজাত করে ট্রেনে করে প্রথমে চট্টগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে দিচ্ছেন। সেখান থেকে এসব ডিম বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। আড়াই কেজি করে ইলিশের ডিম প্রতিটি বাক্সে ভর্তি করার পর বরফজাত করা হয়। পরে ককশিটের ভেতর ঢুকিয়ে চট্টগ্রাম পাঠানো হয়। আর এসব ইলিশ ও ডিম ছাড়ানোর জন্য ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চুক্তিতে শত শত শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। লোনা ইলিশ মণ হিসেবে ১২ হাজার টাকায় এবং ইলিশের ডিম কেজি ১ হাজার ২০০ টাকায় পাইকারি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এক মণ ইলিশে প্রায় পাঁচ কেজি ডিম পাওয়া যায়। ডিমওয়ালা নরম ইলিশ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পাইকারি দামে বিক্রি হয়। চাঁদপুর মাছঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী আবদুল মালেক খন্দকার বলেন, ইলিশ ও ইলিশের ডিমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু এ বছর ইলিশ কম থাকায় ইলিশের ডিমও কম। তবে স্থানীয়ভাবে ইলিশের ডিমের চাহিদা কম থাকলেও বিদেশে এর চাহিদা অনেক বেশি। তবে সরকার সরাসরি বিদেশে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রাখায় চট্টগ্রামে এই ইলিশের ডিম পাঠানো হচ্ছে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশলে এসব ডিম বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।’ এভাবে ইলিশের ডিম যদি বিদেশে চলে যেতে থাকে তবে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হবে চরমভাবে। অবিলম্বে ডিম বিদেশে পাঠানো নিষেধ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি মাওয়া ঘাটেসরেজমিনে গিয়ে দেখা গিয়েছে সেখানে ইলিশের ডিম জোরা দুইশ টাকা ভেজে বিক্রি করা হচ্ছে। মা ইলিশ ধরা এবং ডিম বিক্রি করা থেকে সবাইকে বিরত রাখতে হবে। এসএ/  

নারী ও শিশু নির্যাতন: প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন মানবাধিকারের সর্বাধিক লঙ্ঘন। গত বছর সারা দেশে এক হাজারের বেশি ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ঘটেছে নারীর প্রতি সাড়ে চার হাজারেরও বেশি সহিংসতার ঘটনা। সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির দেহে কেরোসিন ঢেলে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)- এর একটি বিশেষ টিম ইতোমধ্যেই তৎপর হয়েছে। নুসরাত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, পরিকল্পিতভাবে নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়া হয়েছে। কারণ একটা পরীক্ষা কেন্দ্র সাধারণত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে থাকে। তাই অধ্যক্ষ এবং কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের যোগসাজশ ছাড়া সেখানে কেরোসিন বা পেট্রল নিয়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘরের বাইরে সাধারণত প্রভাবশালীরাই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো জন্ম দিচ্ছে। এ কারণে প্রায় প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জন্য ওই অপরাধীর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একজন অপরাধী যে শ্রেণি বা পেশারই হোক, অপরাধকাণ্ডের ক্ষেত্রে তার পরিচয় ‘অপরাধী’। অন্যসব প্রভাব-পরিচয়কে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অপরাধী হিসেবেই তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা গেলে নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের পথ সুগম হবে। নারীরা যেন ঘরে-বাইরে সর্বত্র পুরুষের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সমাজের বিবেকবান প্রতিটি মানুষেরই প্রত্যাশা। নুসরাতের মৃত্যুর পর অনেকেই বলেছেন, এভাবে আর একটি মৃত্যুও চাই না। আর কোনও নুসরাতকে যেন যৌন নিগ্রহের শিকার হতে না হয়, মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এভাবে চিরতরে চলে যেতে না হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীচক্র, রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের সহযোগিতা বরাবরই লক্ষ করা গেছে। আর রাফির ঘটনাটিও এ চক্রের বাইরে নয়। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিকচক্র, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আয়শা খানম মনে করেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেই চলবে না, রাজনৈতিকভাবে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। তাই রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অতি দ্রুত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের কঠোরতম আইনানুগ শাস্তি প্রদান করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারও জোর দাবি জানান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, রাফি দুটি জিনিস চেয়েছিল। এক. বাঁচতে চেয়েছিল, দুই. বিচার। আমরা তাকে বাঁচাতে পারিনি। এখন বিচারটা যেন হয়। যদি রাফির পরিবার ন্যায়বিচার না পায়, তাহলে এভাবে কেউ আর প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসবে না। সে ক্ষেত্রে সমাজটা অন্যায়কারীতে ভরে যাবে। আমাদের ভেবে দেখতে হবে যে, আমরা সে রকম সমাজ চাই কি না। সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইনে আসলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বলতে কিছু নেই। তদন্ত কাজ হচ্ছে পুলিশ বিভাগের। পুলিশ ইচ্ছে করলে আসল ঘটনা উদ্ঘাটন করতে পারে। আর এ ঘটনার মূল বিষয় তো এরই মধ্যে বেরিয়ে গেছে। মোটামুটি স্পষ্ট। অতএব, রাজনৈতিক বাধা না থাকলে সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক মনে করেন, নুসরাত ছিল একজন প্রতিবাদী মানুষ। অন্যায়ের কাছে, কারও যৌন লালসার কাছে নত হয়নি সে। রাফি জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে গেছে। অনেকেই নত শিকার করে, সায় দেয়। কিন্তু রাফি সেটা করেনি। তার প্রতিবাদ আমাদের সবার কাছে শিক্ষণীয় বলে মনে করেন কাজী রিয়াজুল হক। নুসরাত হত্যা বিষয়ে মামলা বিষয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এই মামলাটি যেন তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়। সে জন্য মামলাটি দ্রুত তদন্ত শেষে চার্জশিট দিতে হবে। চার্জশিট যাতে দ্রুত হয়, সে জন্য সরকার পক্ষের আইনজীবীদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, এ সব মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষী হাজির করা এবং পুলিশ অফিসার, যারা তদন্তে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের হাজির করা প্রয়োজন আছে। কোনও ধরনের মুলতবি না দিয়ে মামলার বিচার কাজ শেষ করতে হবে। তবে জরুরি কোনও কারণ থাকলে আদালত দু-একটি মুলতবি দেওয়া যেতে পরে। নুসরাত রাফি জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে গেছে। আর এ প্রতিবাদ যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। অন্যায় আর নিপীড়নের বিপরীতে ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক ও মৌলিক মানবাধিকার দাবি করতে গিয়ে আর কাউকেই যেন এমন বর্বরতার শিকার না হতে হয়। তাই দায়মুক্তির অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বসবাসযোগ্য নিরাপদ, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব স্তরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অঙ্গীকার ও তার বাস্তব প্রতিফলন এখন সময়ের দাবি।

রাজধানীর বেশিরভাগ ভবনই রাজউকের নকশা মেনে হয়নি

রাজধানীর বেশিরভাগ ভবনই রাজউকের নকশা মেনে হয়নি। ভবনগুলোতে নেই যথাযথ অগ্নি নিরাপত্তা। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকা- চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে অনিয়মের চিত্র। তবে এসব দেখার দায়িত্বে থাকা রাজউকের ভূমিকা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আছে রাজউক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। ড্যাপের আওতায় থাকা এলাকাগুলোতে আছে ২২ লাখ স্থাপনার মধ্যে ৭ তলা থেকে শুরু করে ২৪-২৫ তলা পর্যন্ত ভবন আছে আরো ৮৮ হাজার। ১০ তলা বা এর বেশী উচ্চতাসম্পন্ন বহুতল ভবন রয়েছে ২ হাজার ৯শর বেশি। রাজউকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি অভিযোগ ভুরি ভুরি। এসব কারণেই বেশিরভাগ ভবনই অনুমোদিত নকশা মেনে হয়নি। বনানীর পুড়ে যাওয়া ফারুক-রুপায়ন টাওয়ারের অনুমোদন ১৮ তলার, করা হয়েছে ২৩ তলা। শুধু এফ আর টাওয়ারই নয়, রাজধানীর বেশিরভাগ ভবনের অবস্থা একই রকম। ২০১৭ সালে ফায়ার সার্ভিসের জরিপে ১২৭৫টি শপিংমলের মধ্যে মাত্র ৪৭টির অবস্থা সন্তোষজনক। ১০৩৫টি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৭টির অবস্থা সন্তোষজনক। দ্বিতীয় ধাপের জরিপে প্রায় চার হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সন্তোষজন অবস্থায় আছে মাত্র ৮৫টি। এফআর টাওয়ারের বিপরীতপাশে ৩৫ ও ৩৭ নম্বর প্লটের ভবনটির নকশা জাল। আর এসব অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত রাজউকের কর্মকর্তারা। উত্তরা অফিসের কর্মকর্তা আশরাফ। প্রাঁয় পাচ বছর ধরে একই চেয়ারে আছে। নকশার জন্য যারা গেছেন তারাই পড়েছেন বিপাকে। তবে, অতি চালাক এক কর্মকর্তা ক্যামেরা দেখেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অর্গ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা নেই খোদ রাজউক অফিসেও। উত্তরার পুরো অফিসেই পাওয়া গেলো ১টি মাত্র ফায়ার ডিস্টিংগুয়িশ তবে সেটির মেয়াদও শেষ হয়েছে সাত বছর আগে। রাজধানীর মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ ভবনের অগ্নি নির্বাপনের সক্ষমতা রয়ছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা। এত বছরেও রাজউক কোন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারেনি রাজউক। বিভিন্ন অনিময়সহ নানা অংসগতির বিষয়ে জানতে কয়েকদিন ঘুরেও রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে কথা বলেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তমন্ত্রী। জানিয়েছেন, সব কিছু বিবেচনা করে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। নগরবাসীও চায় দ্রত কার্যকর পদক্ষেপ। বিস্তারিত দেখুন ভিডিওতে : এসএ/  

সড়কে বিশৃংখলা-মুত্যু-চাঁদাবাজি

কোনোভাবেই থামছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই যানবাহনের চাকায় পিষ্ঠ হচ্ছে মানুষ। কিছুতেই যেনো সড়কে ফিরছে না শৃঙ্খলা। যানবাহনগুলোর গতির প্রতিযোগিতা, লাইসেন্সবিহীন যানবাহন ও চালক, ট্রাফিক পুলিশের দায়সারা দায়িত্বই মূলত দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। বিশেজ্ঞরা বলছেন- লাগামহীন চাদাবাজি আর পরিবহন খাতের বিভিন্ন দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সড়কে শৃংখলা আসবেনা। খোদ রাজধানীতেই এভাবেই প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে যানবাহনগুলো। আর মহাসড়কেতো কথাই নেই। মূলত বেপরোয়া গতির কারণেই ঘটছে দুর্ঘটনা। অনিরাপদ সড়কে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, এই সংখ্যা ১০গুণ বেশি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ হাজার ৯৫৪ জন মারা যায়। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭ হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা যায় প্রায় নব্বই শতাংশ দুর্ঘটনা ঘরে গতি ও চালকদের কারণে। আর যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ক্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন, রেলক্রসিং এবং মহাসড়কের ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, ফুটপাথ না থাকা বা বেদখল হওয়ায় ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব রোধে মাড়ে মোড়ে আছে চেক পোস্ট, কিন্তু তারা ব্যস্ত অন্যকাজে। গাড়ী আটক করে টাকা তোলাই যেন পুলিশের প্রধান কাজ। রাজধানীর কোন পুলিশ চেক পোস্টে টাকা তোলা হয়না এমনটা খুজে পাওয়া দুষ্কর।কিছক্ষণ দাড়ালে এমন দৃশ্য দেখা যায় হরহামেশাই। দীর্ঘদিন সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ বিশেজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ছাড়া দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক সব পক্ষকেই আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দিলেন বিশেষজ্ঞরা দেখুন ভিডিও : এসএ/    

জর্ডানের পোষাকশিল্পে বাড়ছে বাঙালি কর্মী

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানের পোষাকশিল্প এখন বাঙালি নারীদের দখলে। দিন দিন সেখানে যাবার আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশিদের। আশাতীত বেতন, উন্নতমানের বাসস্থান, মানসম্পন্ন খাবার আর স্বাস্থ্যসেবার কারণে জর্ডানে বসবাসরত নারীকর্মীরাও বেজায় খুশি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানকার পোষাকশিল্পে প্রচুর কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই সুযোগটি অত্যন্ত যুতসইভাবে কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশিরা। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরের মাঝামাঝিতে জর্ডানে নারীশ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩০ হাজারের অধিক। যা মোট প্রবাসী শ্রমিকের ৪৯ শতাংশ। আর এভাবে চলতে থাকলে আসন্ন দশকে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬০ থেকে ৬২ শতাংশে। আমাদের জন্য রীতিমতো গর্বেরও বিষয় ব্যাপারটি। বেশ ক’বছর ধরেই দক্ষ শ্রমিক যাচাই-বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া দেখভাল করছে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মরণ কুমার চক্রবর্তী একুশে টেলিভিশনকে বলেন, বোয়েসেল সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে কর্মী পাঠাতে সাহায়তা করে। এখানে নারী কর্মীদের শুধু পাসপোর্ট করে এলেই হয়। এরপর আর কোনো খরচ নেই। মেয়েরা বিনা খরচে জর্ডানে চাকরি পাচ্ছে। প্রতি শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কর্মী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি চলমান। এই মুহূর্তে সেখানকার বড় বাজার হলো রাজধানী আম্মান থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে আল হাসান ইপিজেড এলাকার প্রসিদ্ধ পোষাক শিল্প ক্লাসিক ফ্যাশনস এন্ড এ্যাপারেলস। সেখানে প্রতিমাসেই হাজারের কাছাকাছি কর্মী পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। আর ক্লাসিক গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যানাল কুমার বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বোয়েসেলকে জানিয়েছেন, ভারতীয়, নেপালি, পাকিস্তানি, সিরিয়ান, শ্রীলংকান কিংবা জর্ডানিদের চেয়েও বাঙালি মেয়েদের কাজ অত্যন্ত সুক্ষ এবং নিপূণ। ইন্টারন্যাশনাল বাইয়াররাও বাঙালিদের কাজের মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ। তাই ক্লাসিক হচ্ছে বাঙালি নারীকর্মীদের স্বাচ্ছন্দের প্ল্যাটফরম। এমনকি কাজ না পারলেও স্যানাল এবং তাঁর টিমের কর্তারা বাঙালিদের ক’মাসের প্রশিক্ষণে কাজের উপযুক্ত করে নিচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে বেতন-ভাতা কিংবা অন্যান্য সুযোগের কোন ঘাটতিও থাকে না। প্রতি শুক্রবার ঢাকার মিরপুরের বাংলাদেশ-জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে পরীক্ষা দিচ্ছেন পোশাককর্মীরা। জর্ডান থেকে আসা ক্লাসিকের প্রতিনিধি শ্রীজিত কুমার ও বাংলাদেশে ক্লাসিকের অন্যতম কর্মকর্তা স্বপন জালাল মাতব্বর (ফোন: ০১৭৪২ ৬৭৪ ০৩১) একুশে টেলিভিশনকে বলেন, সপ্তাহের একদিনে যে সংখ্যক কর্মীর সাক্ষাতকার ক্লাসিক নিতে পারছে তাতে কোম্পানি পুষিয়ে উঠতে পারছে না। কারণ এই মুহূর্তে ক্লাসিক ফ্যাশনস এন্ড এ্যাপারেলসে প্রয়োজন ১০ হাজার বাঙালি কর্মী। কথাবার্তায় বেশ জোর দিয়েই শ্রীজিত আমাদেরকে বলেন, বাঙালি নারীর জয়জয়কার জর্ডানের পোষাকশিল্পে। কিন্তু সেই সংখ্যক দক্ষ কর্মী আমরা পাঠাতে পারছি না। যে কারণে বাংলাদেশ যেমন রেমিটেন্সের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে তেমনি আমাদের প্রতিষ্ঠানেরও কমবেশি ক্ষতি হচ্ছে। আর এসব শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে জর্ডান যেতে যতো ধরণের খরচা আছে তার সবই বহন করে ক্লাসিক গ্রুপ। এমনকি, একজন কর্মী জর্ডানে যাবার পর থেকে মাসিক বেতন না পাওয়া অব্দি তার হাত খরচও বহন করে থাকে ক্লাসিক গ্রুপ। একইসঙ্গে থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবই ফ্রি। (চলমান)  

যেভাবে যোগ হয় ভাষার অভিধানে নতুন নতুন শব্দ

বাংলা একাডেমিতে বাংলা ভাষা নিয়ে যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, তেমনি কোন শব্দ বা বানান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত এখান থেকেই আসে।      মূলত বাংলা ভাষার গবেষণা বা নতুন কিছুর অনুমোদন এখান থেকেই হয়ে থাকে। আর অন্য যে কাজটি করে বাংলা একাডেমি, তাহলো অভিধানে নতুন শব্দ যোগ করা। বাংলা একাডেমি যখন নতুন কোন শব্দ অভিধানে অন্তর্ভূক্ত করে, তখন কোন কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে কাজটি করেন তারা? এমন এক প্রশ্নে একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, বাংলা একাডেমির একটা সম্পাদক পর্ষদ আছে যাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি নতুন শব্দকে অভিধানে স্থান দেয়া হয়। তিনি বলেন, "যারা শব্দ সম্পর্কে, ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে, ব্যবহার সম্পর্কে এবং প্রয়োজন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকেন, তাদের নিয়ে আমাদের একটা পর্ষদ আছে। তাঁরা যখন বিবেচনা করে যে এই শব্দটি বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে থাকা দরকার, তখন সেই শব্দটি আনা হয়"। বাংলা একেডেমি বলছে, এভাবে গত এক দশকে প্রায় ২,০০০ শব্দ অভিধানে যোগ করা হয়েছে। তবে এসব শব্দের তালিকা দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একাডেমির কর্মকর্তারা বলছেন প্রযুক্তিগত বেশ কিছু শব্দ নতুন করে অভিধানে যোগ হয়েছে। নতুন শব্দ যখন অভিধানে যোগ হয়, তখন অনেকেই তা জানতে পারেন না। একাডেমির মহাপরিচালক সিরাজী বলছিলেন, বিদেশে এই জানানোর চর্চা থাকলেও রেওয়াজটা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। তবে জনসাধারণকে জানানোর বিষয়টা তারা বিবেচনা করছেন। "সম্পাদকমণ্ডলী যদি মনে করে তাহলে এই সংস্করণে এই শব্দগুলো নতুন ভুক্তি হয়েছে তাহলে তারা প্রেসের মাধ্যমে, প্রেস রিলিজ দিয়ে, বা নোটিফিকেশন দিয়ে জানাতে পারে। এই রেওয়াজটি আমাদের এখানে নেই। তবে আমরা মনে করি এটা ভবিষ্যতে অবশ্যই কর্তব্য"। বাংলা ভাষার নতুন শব্দ প্রয়োগের বিষয়টা সাধারণ মানুষকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি প্রভাবিত করে লেখক, অনুবাদক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক সহ নানা মহলকে। লেখক এবং অনুবাদক অদিতি ফাল্গুনী বলছিলেন, নতুন শব্দগুলোর ব্যাপারে মানুষকে জানালে ভালো। তবে তিনি মনে করেন শব্দগুলো সম্পর্কে মানুষ আগেই একটা ধারণা পেয়ে যায়। "বাংলা ভাষা বা সাহিত্যের মানুষ না তিনি কিন্তু সহজে এই পরিবর্তনগুলো জানেন না। এবং আমাদের পণ্ডিতেরা কিন্তু জানান না। এই যে বড় বড় কমিটি হয়, বানান পরিবর্তন হয় তারা বলেন যে ভাষাকে সহজ করার জন্য সংক্ষিপ্ত করার জন্য এটা করা হয়েছে"। তিনি আরো বলছিলেন, ইন্টারনেটের বাংলা অনেকে বলছেন অন্তর্জাল, ফেসবুক বলছে বদনবহি। এরকম শব্দগুলো অভিধানের মাধ্যমে জানানো দরকার। নতুন শব্দ যোগ করার ক্ষেত্রে প্রচারণার যে দরকার সে বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষক মেহের নিগার। এই প্রচারণার জন্য তিনি একাধিক উপায়ের কথাও উল্লেখ করেন। "নতুন যে শব্দগুলো সংযোজিত হচ্ছে, সেগুলো বইমেলাকে কেন্দ্র করে একটা পুস্তিকা বের হতে পারে যে এই বছর এই শব্দ যোগ হয়েছে। এখানে সচেতন পাঠকদের মাধ্যমে হাতে হাতে চলে যেতে পারে। আরেকটা হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে"। তিনি বলেন, যখন বিদেশী ভাষায় একটা নতুন শব্দ যোগ হয়, তখন তারা ব্যাপক প্রচার চালায়। সেখানে ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণগুলো থাকে, বানানটা কেমন হবে, উচ্চারণটা কেমন হবে। বাংলা শব্দের ক্ষেত্রে অনলাইনের মাধ্যমে সেটা করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা একাডেমি যেহেতু বাংলা ভাষার তত্ত্বাবধানে আছে, সেহেতু বাংলা ভাষায় প্রমিত রীতির মধ্যে কোন কোন নতুন শব্দ সংযোজিত হবে, সেগুলোর ব্যাপক প্রচার এবং প্রসারটা তাদেরই করা প্রয়োজন। সূত্র: বিবিসি বাংলা এসি   

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি