ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:৫৪:৩১, বৃহস্পতিবার

অযথা আবেগ দেখিয়ে টাইগারদের আক্রমণ করবেন না

অযথা আবেগ দেখিয়ে টাইগারদের আক্রমণ করবেন না

ক্রিকেট আমাদের আবেগের জায়গা। ১৬ কোটি মানুষের ঐক্যমত্যের একমাত্র ক্ষেত্র। এই জায়গাটা নষ্ট হোক তা নিশ্চয়ই আমরা চাইব না। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ সামনে রেখে অহেতুক আবেগ দিয়ে মাশরাফি-সাকিবদের ওপর প্রত্যাশার চাপ তৈরি করা ঠিক হচ্ছে না। সংবাদ কর্মীদের অনুরোধ করবো এমন আবহ তৈরি করবেন না যাতে টাইগাররা চাপে পিষ্ট হয়ে যায়। তাদেরকে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দিন।
‘ভারত ও বাংলা ভাগ’ ভিতর-বাহির

ভারতীয় উপমহাদেশে ধন-সম্পদ লুণ্ঠন আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নানা সময়ে দস্যুপ্রবৃত্তিমনা বিভিন্ন বণিকদল এসেছিল। অস্ট্রিক-দ্রাবিড়দের সময়কাল থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসকদের সময়কাল পর্যন্ত এ-চিত্র ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। এদের মধ্যে হিংস্রতা থেকে শুরু করে কূটকৌশল সব ধরণেরই আচরণ ছিল। এ দেশের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন আর ভোগ করাই তাদের কাছে প্রধান ছিল। দেশটাকে নিজের মনে করে গ্রহণ করেনি কেউই। ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু তুর্কি ও মুঘোলদের সময়কালে। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলা ভূখ- ছিল ধন-সম্পদ ও কৃষি পণ্যসামগ্রীতে পূণ্যবতী। আর এসবই হয়েছিল ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। ‘অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরি’ চর্যাপদের বহুল পরিচিত এই পংক্তি যেন রীতিমতো ফলেছিল ভারতবর্ষের ললাটে। হরিণ যেমন তার নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্যই নিজেই নিজের বিপদের কারণ, নিজের জীবন বিপন্ন হয়, ভারতবর্ষের অবস্থাও তাই ছিল। ভারত তার নিজের রূপ-ঐশ্বর্য্য-অর্থ-সম্পদ-প্রাচুর্য্যরে জন্য বারবার বহিরাগতদের লোভ আর হিংস্রতার শিকার হয়েছে। দীর্ঘকাল ভারতকে পরাধীনতার নির্মম ও করুণ পরিণতি বহন করতে হয়েছিল। ভারতবর্ষের পরাধীনতা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। ভারতবর্ষ প্রকৃত অর্থে কোন সময়কাল থেকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরেছিল, কিভাবে সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কারা চেষ্টা করেছিল, কোন নেতাদের প্রধান ভূমিকা ছিল, সে সব নেতারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কিভাবে নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তন করেছিল, লেবাসধারী ভূমিকা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের তৈরি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নেতৃত্ব হরণ করেছিল, ভারতকে অখন্ডভাবে স্বাধীন করার প্রত্যয়ে কারা অন্দোলন সংগ্রাম বিপ্লব করেছিল, আবার তারাই কিভাবে নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তন করে নিয়েছিল, কারা বাংলা ভাগের বিপক্ষে জোরালো প্রতিবাদ করেছিল, আবার সেই তারাই কত সহজেই বাংলা ভাগ মেনে নিলেন বা আর এক অর্থে বাংলাকে ভাগ করলেন। এর মূলে ধর্ম বা দ্বিজাতিতত্ত্ব, ব্যক্তি ক্ষমতা ও স্বার্থ কতোটা প্রবল ও হিংস্রতার থাবা ছিল। সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো মহান নেতা যিনি দৃঢ়পত্যয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, তাকে কতোভাবে গান্ধী-নেহেরু-জিন্নাহর কূট ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছিল। এমনকি দেশ ত্যাগের মতো দুর্ভাগ্যের নির্মম পরিণতি বহন করতে হয়েছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বকাঁপানো মহান নেতাজিকে। দেশের স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবী বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম বসু, রাশবিহারী বসু, শহীদ তিতুমীর, মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতি লতাসহ অসংখ্য বিপ্লবী যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন, রক্ত সোপানে লিখে দিয়েছিলেন নিজের জীবন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অগ্নিস্পর্ধিত কবিতা লিখে জেল খেটেছেন একমাত্র বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সব মিলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার প্রয়াস, একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাকে ভাগ করে ফেলা। এসবের অসামান্য এক দালিলিক সুবৃহৎ গ্রন্থ ‘ভারত ও বাংলা ভাগ: এক বিয়োগান্তক অধ্যায়’। গ্রন্থটি রচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ। তাঁর অক্লান্ত শ্রমসাধ্য এই গ্রন্থটি গতানুগতিক ও প্রচলিত বহু ধারণাকে সরিয়ে আলোর মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে ভারতবর্ষ কিভাবে স্বাধীন হয়েছিল। ভারতবর্ষকে কিভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল, কিভাবে বাংলার বুকে স্বার্থের নীতি ও বিবেকহীন ছুরি চালিয়ে তা ভাগ করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে অযৌক্তিকভাবে যুক্ত করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিও তেইশ বছরের মাথায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত হয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই গ্রন্থটি পাঠকের কাছে ভারতবর্ষের ইতিহাস, পরাধীনতার যন্ত্রণা এবং বাংলা ভাগের বিয়োগান্তক বেদনার চির বহমান রক্তক্ষরণের ছবি হয়ে উঠেছে। গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ ঐতিহাসিক বহুমুখী ঘটনা ও ধারাবাহিক গতিধারা, বহুমাত্রিক তথ্য-উপাত্ত ও ভারতবর্ষের দালিলিক পর্যায়ের অসংখ্য দেশি-বিদেশি গ্রন্থ পত্র-পত্রিকা নিবিড় অধ্যয়ন ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ বিচারে প্রকৃত সত্য উদ্ধারে ধ্যানী সাধকের মতো ব্রত নিয়ে কঠিন-কর্মটি সফলভাবে সাধন করতে পেরেছেন। এই গ্রন্থে দ্রাবিড় অস্ট্রিক আর্য থেকে শুরু করে হিন্দুরা কিভাবে এ দেশে এসেছিল, কিভাবে এ দেশকে শাসন করেছিল, তাদের কাছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কতোটা হীনতর ছিল, একই সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের কী ভীষণ রকমের বৈষম্য সৃষ্টি, দ্বন্দ্ব সংঘাত হানাহানি-রক্তপাতের বীজ সেখান থেকেই প্রথম সৃষ্টি। এ সবের কঠিন সত্যটি আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রন্থে। হিন্দু যুগ, মুসলমান যুগ ও ইংরেজ যুগ। এক এক গবেষকের কাছে এক একভাবে মূল্যায়িত বা অবমূল্যায়িত হয়েছে। এ গ্রন্থে এ সবের পরিষ্কার বিশ্লেষণ রয়েছে। হিন্দু শাসকেরা কিভাবে শোষণ-শাসন করেছিল, দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাদের কোন দায়বোধ বা আগ্রহ ছিল না। এমনকি বাংলা ভাষা তারা নিষিদ্ধ করে সংস্কৃতি ভাষাকেই গ্রহণ করতে অধিক আগ্রহী ছিল। তুর্কি ও মুঘলরা এ দেশে আসার পর এ অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটেছিল, অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতার অভূতপূর্ব যে বিকাশ ঘটেছিল এবং শ্রেণিবৈষম্য দূর কওে অসাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ববোধের যে জাগরণ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল, তখন নিম্নবর্গের বহু হিন্দু স্বতঃস্ফূতভাবে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। প্রকৃত অর্থে এক আলোর যুগ হিসেবে তা প্রতিষ্ঠা পায়। তুর্কি ও মুঘলরা এ দেশে ভিনদেশ থেকে এলেও এই দেশটাকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে এখানেই স্থায়ী বসতি নির্মাণ করেছিল, এদের সন্তানেরাই পরবর্তীতে এ দেশটাকে পরিচালনা করেছিল। সে সময়ে হিন্দু মুসলমানের যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। মুসলমানেরা তাদের ক্ষমতায় হিন্দুদেরও অংশীদারিত্ব করে উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা এটা মানতো দেশটা শুধু মুসলমানের নয়। হিন্দু-মুসলমান সকলের। পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল। এর মূলেও ছিল এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকরা। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে রক্তবীজ বুনে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর ছিল। আর এর মূলে ছিল চতুর ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী। এ দেশটাকে তারা শোষণ আর লুণ্ঠনের জন্য বেছে নিয়েছিল, এ দেশটাকে ভাগ করো আর শাসন করো, এটা ছিল তাদের নীতি। আর এদের তাঁবেদারি করেছিল উচ্চবিত্ত হিন্দু শ্রেণি। এ সব জটিল সময়কাল ও কূটিল রাজনীতি এবং এর গহিন সত্য লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় স্বচ্ছতার সাথে এ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস গ্রন্থ বলতে যে গুরুগম্ভীর ভাষা ও তথ্য-উপাত্তে ভরা রসহীন উপস্থাপনা। এ গ্রন্থটি তা থেকে মুক্ত। লেখক গ্রন্থটিতে তথ্য-উপাত্ত যেমন তুলে ধরেছেন, ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মন্তব্য যেমন গ্রহণ করেছেন, তেমনি নিজস্ব বিচারিক ও নির্মোহ যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সে সব বক্তব্যের সঙ্গে এক মত বা দ্বিমত পোষণ করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। এবং এই প্রয়াসকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, পাঠকের মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। লেখকের ভাষার শক্তিতে এটি সুপাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করবে এ আশাবাদ থাকছে। যে কোন দেশের, যে কোন কালের ইতিহাসকে সাবলীল ও প্রাণবন্ত ভাষায় গ্রন্থে রূপদান করা সহজসাধ্য নয়। ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে লেখকের মুন্সিয়ানা বা শিল্পদক্ষতার উপর নির্ভর করে। এই গ্রন্থের লেখক প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহর কাছে সে-কাজটি অনায়াসসাধ্য বলেই বিবেচিত হতে পারে। লেখক হিসেবে এটি তার বড় শক্তি। ইতিহাসকে উপন্যাস বা গল্পে রূপদান করা সহজ। সেখানে লেখকের অনেক স্বাধীনতা থাকে। ইতিহাসের মূল বিষয় সামনে রেখে মনগড়া অনেক ছবি সেখানে যুক্ত করে দুর্দান্ত এক শিল্পকর্ম রচনা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সেটা সৃজনশীল কোন সাহিত্যকর্ম ইতিহাসগ্রন্থ নয়। ইতিহাসগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব স্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না। লেখককে পুরো ইতিহাসের উপরই নির্ভর করতে হয়। সেটাকে ভাষার জোরে পাঠককে কতোটা আকৃষ্ট করা যায়, অতটুকুই লেখকের শক্তি। ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভ্যান হ’, মহাকবি ফেরদৌসের ‘শাহনামা’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’, নজরুলের ‘কুহেলিকা’, ‘অগ্নি-বীণা’, ‘প্রলয়-শিখা’, এমনকি মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সহ অনেক গ্রন্থ আছে যা ইতিহাসকে উপজীব্য করে রচিত। কিন্তু এসব গ্রন্থ কালোত্তীর্ণ মর্যাদা লাভ করলেও এগুলো ইতিহাস গ্রন্থ নয়, সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম। এসব গ্রন্থের ভাষা যত সহজে কাব্যিক, আবেগময় ও অলঙ্কারের ব্যবহারে পাঠকের মস্তিষ্কের কোষে কোষে প্রবল উর্মিমালা তৈরি করা যায়, ইতিহাস গ্রন্থে তা কল্পনা করাও কঠিন। এই কঠিনকে জয় করেছেন গবেষক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ। লেখক এমনভাবে ভাষাকে স্রোতমীয় করে তুলেছেন পাঠক কখন কিভাবে ইতিহাসের গভীর থেকে গভীরে একটা পর একটা দরোজা খুলে ঢুকে পড়েন, তা তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারেন না। অথচ এটি পুরোপুরি ইতিহাসগ্রন্থ। লেখকের ভাষাশৈলীতে গ্রন্থটি ইতিহাস গ্রন্থ হয়েও পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে।গ্রন্থটিতে মোট নয়টি অধ্যায় রয়েছে। শুরুতে পটভূমি। নয়টি অধ্যায়ের পরে আছে উপসংহার, পরিশিষ্ট ও গ্রন্থপঞ্জি। ‘সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক প্রভাব’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের পূবে ভারতকে অখণ্ড ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু যে প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন, তা বিশেষ করে গান্ধী ও নেহেরুর অসহযোগিতার কারণে যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি তার বিস্তারিত আছে। ‘ভারতে বৈষম্য সৃষ্টি’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ এবং দেশ ভাগের ক্ষেত্রে নেহেরু বদ্ধ পরিকর অবস্থান এবং এ প্রেক্ষিতে মুসলমানেদের জন্য জিন্নাহর আলাদা রাষ্ট্র গঠনের মতো হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়। ইংরেজ সরকার প্রথম থেকেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘাত-হানাহানি-বিরোধ সৃষ্টি করার নানা কূটকৌশল গ্রহণ করেছিল, তা অনেকখানি সফলতা পায় এদের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে। আর এর ফলেই সংঘটিত হয়েছিল কলকাতায় ১৯৪৬ এর ভয়াবহ দাঙ্গা। ‘বঙ্গভঙ্গে ভারতে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান’ অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে ভারতভাগের কারণে বাংলা ভাগ হয়েছে অনস্বীকার্য এই সত্য। কিন্তু এই ভাগের পেছনে ক্রীড়ানক হিসেবে কারা ছিলেন এবং কাদের স্বার্থে তারা এটা করেছিলেন । ‘বঙ্গভঙ্গ ও দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক ব্যবধান’ অধ্যায়ে তথ্য-উপাত্তসহ গবেষক তুলে ধরেছেন দেশভাগের আগে প্রায় দেড় শত বছর অবিভক্ত বাংলার উন্নয়ন তা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম বাংলাকেন্দ্রিক। পূর্ব বাংলা অবহেলিত থেকেছে। দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক ব্যবধান যে কত ভয়াবহ ছিল তা এই অধ্যায়ের মূল উপজীব্য। ‘বাংলা ভাগে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও হিন্দুসভার প্রভাব’ এ অধ্যায়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দ্বিজাতিতত্ত্বেও ভিত্তিতে ভারত ও বাংলা ভাগের মাধ্যমে অখণ্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্ন কিভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং এতে কংগ্রেস ও হিন্দুসভার ভূমিকা ও প্রভাব বর্ণিত হয়েছে। ‘বাংলা ভাগ ও দ্বিজাতি তত্ত’ অধ্যায়ে সুভাষচন্দ্র বসুর অখণ্ড ভারতের স্বপ্নপ্রয়াস কিভাবে গান্ধী-নেহেরুদের কূটচালের কাছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পর্যবসিত হয়েছিল তা বিশ্লেষিত হয়েছে। এওছাড়াও ‘সুভাষচন্দ্র বসু এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা’, ‘অবিভক্ত বাংলা আন্দোলন এবং ভারত ও বাংলা ভাগ: প্রকাশিত গ্রন্থ ও পণ্ডিতবৃন্দের মতামত পর্যালোচনা’র মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে এ গ্রন্থে। গ্রন্থের শুরুতে লেখক যে পটভূমি উপস্থাপন করেছেন তা সমৃদ্ধতর। পুরো গ্রন্থের বক্তব্যকে এতো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, সেকারণে মূল গ্রন্থটি পাঠের পূর্বে ‘পটভূমি’ পাঠ করা অতীব জরুরি মনে করি। তাহলে গ্রন্থটি পাঠের আগেই পটভূমি থেকেই পাঠক একটি মূল ধারণা পেয়ে যাবে। যা মূলগ্রন্থ পাঠে পাঠকের দারুণ সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পটভূমিতে ভারতে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক মাঙ্গোলীয় অবস্থান এবং এদের পরে আর্যদের আগমন ও বসবাস ও হিন্দু ধর্মচর্চা এবং ক্ষমতা প্রয়োগ। আর্যদের পরে আরব এবং পরবর্তীতে তুর্কি ও মোঘলরা ক্ষমতায় আসে। এরপর ইংরেজ শাসন ও আধিপত্য এবং সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য তখন নানামাত্রিক যে সব আন্দোলন ও বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ সব বিষয় ধারাবাহিকভাবে সাবলীলভঙ্গিতে পটভূমিতে রূপ পেয়েছে। এসব বিষয়ই মূল গ্রন্থে অধ্যায় বিভাজনের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এই গ্রন্থে দুর্লভ অনেক ছবি স্থান পেয়েছে। এ ক্ষেত্রেও লেখক সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ছবিগুলোও প্রকৃত ইতিহাস আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গ্রন্থ রচনায় লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যা সাধারণত কোন গ্রন্থে লক্ষ করা যায় না। কারণ নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপন করতে হলে লেখকের সাহস ও শক্তি, সঠিক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার এবং অবশ্যই নির্মোহ নিরপেক্ষ বিচারিক ক্ষমতার অধিকারী হতে হয়, না হলে এটি সম্ভব নয়। গ্রন্থের শেষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, গ্রন্থের সময়কাল ক্রমানুসারে সাল হিসেবে সাজানো, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও গ্রন্থপঞ্জির সংযোজন গ্রন্থটিকে যেমন সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ রূপ দিতে সহায়ক হয়েছে, তেমনি গবেষণার গতানুগতিক আঙ্গিক-ধারা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবেও যে গবেষণাকর্ম করা যেতে পারে, এই গ্রন্থটি তার প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা রাখে। ভারতবর্ষের ইতিহাস ও বাংলা ভাগের ভিতর-বাহির নান ঘটনা সম্বলিত এটি একটি আদর্শ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লেখক: ড. রকিবুল হাসান। অধ্যাপক ও কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক।

দুরু দুরু বক্ষ ...

জুন মাসের ১৩ তারিখ এই বছরের বাজেট ঘোষণা করার দিন। সেই হিসেবে যখন আমার এই লেখাটি প্রকাশিত হবার কথা তার আগেই আমাদের বাজেটটি সবার জানা হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে দেশের বাইরে বসে যখন আমি এই লেখাটি লিখছি তখন অবশ্য আমি বাজেট সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। প্রতিবছরই আমাদের বাজেট বেড়ে যাচ্ছে, দেখে বড় ভালো লাগে। প্রতিবছরই আমি বাজেট নিয়ে এক ধরনের স্বপ্ন দেখি, আমার স্বপ্নটা অবশ্য শিক্ষাখাতের বরাদ্দ নিয়ে। প্রতিবছরই ভাবি এই বছর নিশ্চয়ই শিক্ষার জন্য একটা সম্মানজনক বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু আমার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। এই বছর শিক্ষাখাতে কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে জানি না কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি আমাদের বাজেট কমতে কমতে জিডিপির ২.২ শতাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটি কিন্তু শুধু দুঃখের ব্যাপার ছিল না, এটি আমাদের জন্য একটি লজ্জার ব্যাপারও ছিল। যারা আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না তাদেরকে বলবো উইকিপিডিয়াতে গিয়ে কোন দেশ শিক্ষা খাতের জন্য কত টাকা খরচ করে সেটা একবার নিজের চোখে দেখতে। আমি নিশ্চিত তারা অবাক হয়ে দেখবে সারা পৃথিবীতে যে দেশগুলো শিক্ষার পেছনে সবচেয়ে কম খরচ করে বাংলাদেশ তার মাঝে একটি। আমাদের থেকে কম খরচ করে যে দেশগুলো তাদের মাঝে রয়েছে সুদান (২.০ শতাংশ) কিংবা সাউথ সুদানের (১.৮ শতাংশ) মত দেশ। সারা পৃথিবীর উন্নয়নের মডেল হয়ে আমাদের যদি সুদান কিংবা সাউথ সুদানের মত অকার্যকর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সঙ্গে তুলনা করে শান্তি পেতে হয় তাহলে তার থেকে বড় লজ্জার কথা আর কী হতে পারে? আমাদের পাশাপাশি সবগুলো দেশ শিক্ষাখাতে আমাদের চেয়ে বেশি খরচ করে। ভারতবর্ষ খরচ করে জিডিপির ৩.৮ শতাংশ, শ্রীলংকা ৩.৫ শতাংশ। পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্রটিকে আমি আজকাল হিসেবের মাঝেই আনতে রাজী না, সেটি পর্যন্ত জিডিপির ২.৮ শতাংশ খরচ করে। এমন কি যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান তাদের জিডিপির ৩.১ শতাংশ লেখাপড়ার পেছনে খরচ করে। প্যালেস্টাইন এখন পর্যন্ত একটা স্বাধীন দেশই হতে পারেনি তারা পর্যন্ত খরচ করে জিডিপির ৫.৭ শতাংশ। একেবারে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় ফিদেল কাস্ত্রোর দেশ কিউবার কথা শুনলে, তারা খরচ করে জিডিপির ১২.৯ শতাংশ! আর সারা পৃথিবীর উন্নয়নের মডেল হয়ে আমরা এতদিন খরচ করে এসেছি জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ। সারা পৃথিবীর সামনে যদি লজ্জায় মাথা কাটা যাবার অবস্থা হয় তাহলে কী দোষ দেওয়া যায়? শিক্ষার জন্যে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ না করে আমরা ছেলেমেয়েদের ঠিক করে লেখাপড়া করাতে পারছি না বলে লজ্জা নয়, জাতি হিসেবে লেখাপড়াকে আমরা কোনো গুরুত্ব দেই না বলে লজ্জা। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশের মানুষের অভিযোগের কোন শেষ নেই। আমিও মাঝে মাঝে দুঃখ করি, লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলি কিন্তু কখনো অভিযোগ করি না। কোন মুখে অভিযোগ করবো? এতো কম টাকা খরচ করে পৃথিবীর আর কোন দেশ এতো বিশাল জনগোষ্ঠী এতো বেশি লেখাপড়া করাতে পেরেছে? লেখাপড়ার মান যদি বাড়াতে চাই তাহলে তার জন্য টাকা খরচ করতে হবে। যদি এর পেছনে টাকা খরচ না করে শুধু অভিযোগ করে যাই এবং সেই অভিযোগ থেকে রক্ষা পাবার জন্য জোড়াতালি দিয়ে একটা সমাধান খুঁজে পাই তাহলে কোনদিন শিক্ষার মানের উন্নতি হবে না। বিষয়টা যে কেউ জানে না তা নয়। আমি নিজের কানে আমাদের আগের অর্থমন্ত্রীকে দুঃখ করে বলতে শুনেছি দেশের শিক্ষার জন্য যত টাকার দরকার এখন বাজেটে তার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ রাখা হচ্ছে। (কথাটি একশ’ ভাগ সত্যি, বাংলাদেশ ডাকার সম্মেলনে সারা পৃথিবীর সামনে অঙ্গীকার করে এসেছিল যে তারা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষার পেছনে খরচ করবে।) যদি দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা এটা জানেন তাহলে কেন আমরা শিক্ষা খাতে টাকা পাই না? সারা পৃথিবীর সব গুণীজন, সব শিক্ষাবিদ সব অর্থনীতিবিদ জোর গলায় বলে থাকেন শিক্ষাখাতে টাকা খরচ আসলে ‘খরচ’ নয় এটি হচ্ছে ‘বিনিয়োগ’। শিক্ষার জন্য যদি এক টাকাও খরচ করা হয় সেই একটি টাকাও কিন্তু কোথাও না কোথাও কাজে লাগে, কখনোই সেই টাকাটি অপচয় হয় না। তাহলে শিক্ষার জন্য টাকা খরচ করতে আমাদের ভয়টি কোথায়? ২. এই বছর শিক্ষা খাতে কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে আমরা এখনো জানি না। যদি সত্যি সত্যি এই বছর আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়ে থাকে, শিক্ষাখাতে আমরা একটা সম্মানজনক বরাদ্দ পেয়ে থাকি তাহলে আমরা কী কী করতে পারি? সেই স্বপ্নের কথা বলে শেষ করা যাবে না, আপাতত শুধু শিক্ষকদের কথা বলি। সংবাদপত্রে আমরা যেসব খবর দেখি তার মাঝে সবচেয়ে হৃদয় বিদারক খবর কী হতে পারে? আমার কাছে মনে হয় সেটি হচ্ছে একটুখানি বেতনভাতা, একটুখানি নিরাপত্তা এবং একটুখানি সম্মানের জন্য শিক্ষকদের আন্দোলন। (না, আমি মোটেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা বলছি না, আমলাদের মত এতখানি না হলেও তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনী প্যানেল নিয়ে কথা বলার জন্য তারা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আমি স্কুল শিক্ষকদের কথা বলছি।) আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে অনশন, আমরা সবসময়েই দেখি শিক্ষকেরা আমরণ অনশন শুরু করেছেন। সেই অনশনের কী ফল হয় আমরা জানি না, একদিন দেখি কয়েকদিন অভুক্ত থেকে নানা বয়সী পুরুষ এবং মহিলা শিক্ষকেরা নিজের জায়গায় ফিরে যান। এভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে নিজেদের পরিবার-পরিজন কিংবা ছাত্রছাত্রীদের সামনে তাদের মুখ দেখাতে কেমন লাগে কে জানে! যদি শিক্ষা খাতে এবারেই আমরা যথেষ্ট টাকা পেয়ে যাই তাহলে কী আমরা দেশের সব স্কুলের অবকাঠামো ঠিক করে যোগ্য শিক্ষকদের বেতনভাতা দেওয়া শুরু করা যেতো না? আমরা আসলে এটাকে খুব জরুরি মনে করি না, ধরেই নিয়েছি স্কুল শিক্ষকের মান-মর্যাদা জীবন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেভাবে চলছে সেভাবেই চলুক। দেশের বড় বড় জায়গায় ভালো কিছু স্কুল থাকবে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ছেলেমেয়েরা সেই খ্যাতনামা স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করবে। আর দেশের আনাচে-কানাচের স্কুলগুলো ধুঁকে ধুঁকে কোনভাবে টিকে থাকবে এবং সেই স্কুলগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে কীভাবে রসাতলে গিয়েছে সেটি বর্ণনা করে হতাশায় মাথা নাড়বে। খুব ভালো স্কুল বিল্ডিং, সুন্দর ক্লাস রুম, চমৎকার লাইব্রেরী, আধুনিক ল্যাবরেটরি আর বিশাল খেলার মাঠ থাকলেই যে সেখানে খুব ভালো লেখাপড়া হবে সেটি কিন্তু ঠিক নয়। ভালো অবকাঠামো অবশ্যই দরকার কিন্তু সেটা সবকিছু নয়। ভালো লেখাপড়ার জন্য আরো তিনটি বিষয় দরকার, সেগুলো হচ্ছে ভালো পাঠ্যবই, ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি এবং ভালো শিক্ষক। ভালো পাঠ্যবই হলে ছেলেমেয়েরা নিজেরাই অনেক কিছু শিখে নিতে পারে, তাদের প্রাইভেট টিউটর আর কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে হয় না। সবাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে চায়, তাই পরীক্ষা পদ্ধতি ভালো হলে যারা ভালো জানে শুধু তারাই ভালো নম্বর পাবে এবং ছেলেমেয়েরা নিজেরাই মুখস্ত করে শর্টকাট পদ্ধতির জন্য না গিয়ে সত্যিকারের লেখাপড়া করবে। ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতির জন্য যে খুব বেশি বাজেট দরকার তা নয়, তার জন্য দরকার সদিচ্ছা আর সুন্দর একটা পরিকল্পনার। এই দেশে এর যে বড় ঘাটতি আছে সেটা মনে হয় না কিন্তু তার পরেও কেন এই দেশের ছেলেমেয়েরা ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি পাচ্ছে না সেটা বুঝতে পারি না। (যেমন আমি সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির নানা রকম সমালোচনা শুনি, শিক্ষকেরা যেহেতু মান সম্পন্ন প্রশ্ন করতে পারেন না, বিশাল প্রশ্নের একটা ডাটাবেস তৈরি করে রাতারাতি এই সমস্যা মিটিয়ে দেওয়া যায়। সেটা নিয়ে আলোচনাও হয়েছে কিন্তু কার্যকর হতে দেখছি না।) ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি হয়তো সহজেই পাওয়া যাবে কিন্তু ভালো শিক্ষক পাওয়া কিন্তু এতো সহজ নয়। এর জন্য আমাদের টাকা খরচ করতে হবে। আমি সব সময়েই কল্পনা করি শিক্ষকদের জন্য একটা আলাদা বেতন স্কেল হবে এবং সেই স্কেলটি হবে খুব আকর্ষণীয় একটা স্কেল। সেটি এমন আকর্ষণীয় হবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল শিক্ষকদের এতো রকম সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক সম্মান দেওয়া হবে যে একজন তরুণ শিক্ষার্থী পাস করে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতই শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখবে। জীবনটাকে উপভোগ করা যদি বেঁচে থাকার স্বার্থকতা হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষক হওয়ার মত আনন্দ আর কিসে আছে? এসবই কী খুব অবাস্তব কল্পনা? আমার তো মনে হয় না। এখন দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি, এবারের বাজেটে কী শিক্ষাখাতে একটা সম্মানজনক বরাদ্দ রাখা হয়েছে? আরকে//

মোদি সরকার ২.০ এবং আগামী দিনের ভারত

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থের শেষ দিকে আপসোস করে বলেছেন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেল বটে, কিন্তু ভারত মাতার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। দ্বিখণ্ডিত এই দেহ থেকে যে রক্তক্ষরণ শুরু হলো তার শেষ কোনোদিন হবে কিনা তা নিয়ে মাওলানা নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মুসলমানদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের স্লোগান তুলে যেভাবে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো তাতে গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ হাসিল হলেও সমগ্র ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ আগামীতে কিভাবে রক্ষিত হবে তার কোনো কিনারা তিনি দেখতে পাননি। আয়েশা জালালের গ্রন্থ, দ্যা পিটি অব পার্টিশনের বর্ণনা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের কয়েক মাসের মধ্যে উভয় সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ লাখ নিরীহ মানুষ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বলি হয়েছেন এবং চৌদ্দপুরুষের ভিটে মাটি ছাড়া হলেন প্রায় দেড় কোটি। হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি, তারা আলাদা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের বাসিন্দা হলে উপমহাদেশে শান্তি আসবে, এই ধারণার কোনো বাস্তব চিত্র বিগত ৭২ বছরে দেখা যায়নি। তারপর ১৯৭১ সালে তো পাকিস্তানের এক মুসলমান পক্ষ অন্য মুসলমান পক্ষের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করল, ধর্ষণ করল দুই লক্ষ নারীকে। সঙ্গত কারণেই সাধের পাকিস্তান থাকল না, দ্বিখণ্ডিত হলো। এখন বর্তমান যে পাকিস্তান সেখানে তো প্রায় শতভাগ মুসলমান। তারা আগামীতে এক পাকিস্তান হয়ে থাকবে এমন কথা কোনো যুক্তিবাদি মানুষ বিশ্বাস করে না। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। প্রায় একশ কোটির অধিক হিন্দুদের মধ্যে ভারতে এখন প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের আবাস। ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে তীব্র জাতীয়তাবাদি ও সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুলে যেরকম মহাপ্লাবনসম বিজয় অর্জন করেছে তা এক কথায় বিস্ময়কর এবং অভাবনীয়। শুধুমাত্র দক্ষিণের কেরালা ও তামিলনাড়ু বাদে এতদিন রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারি আঞ্চলিক দলগুলো প্রায় ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে। উত্তর প্রদেশে দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বি আখিলেশ যাদবের সমাজবাদি পার্টি (এসপি) এবং মায়াবতির বহুজন সমাজবাদি পার্টি (বিএসপি) এবার জোটবদ্ধ হওয়ায় সকল জায়গা থেকেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসন ২০১৪ সালে প্রাপ্ত আসন থেকে অর্ধেক বা তারও নীচে নেমে আসবে। কিন্তু ২৩ মে ফল প্রকাশের পর দেখা গেল উল্টো চিত্র। ২০১৪ সালে প্রাপ্ত ৭১ আসনের জায়গায় এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৬০টি আসন। একমাত্র রায়ব্রেলির আসনটি ছাড়া উত্তর প্রদেশ থেকে কংগ্রেস একেবারে ছাপ হয়ে গেল। সবচাইতে বিপর্যয় ঘটেছে আমেথি আসনে। গান্ধী পরিবারের মর্যাদার প্রতীক সেই আমেথি আসনে বিজেপির প্রার্থী স্মৃতি ইরানীর কাছে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী হেরে গেছেন। কেউ ভাবতেও পারেনি। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হলেও সৌজন্যতার খাতিরে উত্তরের দুই মহারথী যাদব আর মায়াবতি আমেথি আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। তারপরও রাহুল গান্ধীর হেরে যাওয়াটা আগামীতে ভারতের রাজনীতির জন্য সুদূরপ্রসারি বার্তা বহন করে। বিজেপির উত্থানের পথে উত্তর প্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গকে আরেকটি বড় চেক পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এখানে কোনো অংক এবং হিসাব-কিতাব কাজ করেনি। এখানেও অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। এপ্রিল মাসে নির্বাচন শুরু হওয়ার পরপরই ঢাকায় এসেছিলেন সর্ব ভারতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহুয়া চৌধুরী। কোলকাতার মানুষ এখন দিল্লিতেই থাকেন। ঢাকায় তাঁর সাথে কথা প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এবার হয়তো সাত-আটটি আসন পেতে পারে। তিনি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়েই বললেন, ‘না দাদা দুটি আর টেনে টুনে হলে তিন-চারটির বেশি আসন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে পাবে না।’ সেই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গে আসন পেয়েছে তারা ১৮টি। ২০১৪ সালে যেখানে ভোট পেয়েছিল শতকরা ১৭ ভাগ, সেখানে এবার পেয়েছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ ভোট। পশ্চিমবঙ্গে এমনটার জন্য সবাই মমতা ব্যানার্জিকেই দুষছেন। বেপরোয়া আচরণ এবং ভোট ব্যাংক রাজনীতির অতি তোষণে মুসলিম উগ্রবাদিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ার জন্য মমতার অনড় ভূমিকার পিছনে কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গের উগ্রবাদি মুসলিম রাজনৈতিক গোষ্ঠির বিরোধীতা, যারা বাংলাদেশের জামায়াতিদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় মমতা ব্যানার্জীর বিরোধীতার কারণে যখন তিস্তা চুক্তি হলো না, তার অব্যবহিত পর কোলকাতার গড়ের মাঠে এক বিশাল জনসভায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছিলেন, তিস্তা চুক্তির বিরোধীতা করে মমতা ব্যানার্জী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের মতো জামায়াতপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলে পুনরায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে, এই কঠিন সত্য মমতা ব্যানার্জী বুঝছেন না। তখনই বোঝা গিয়েছিল বিজেপির পরবর্তী টার্গেট হবে পশ্চিমবঙ্গ। এই নির্বাচনের সময়ে বিজেপির প্রচারণার কৌশল ও গুরুত্ব দেখেও সেটা বোঝা গেছে। অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি আলাদা আলাদাভাবে পশ্চিমবঙ্গে সাত-আটবার করে নির্বাচনি জনসভা করেছেন। আগামী ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে তা এখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। তৃণমূল থেকে ইতোমধ্যেই দুইজন বিধায়ক এবং পঞ্চায়েত সভার ৫০ জন কাউন্সিলর বিজেপিতে যোগদানের খবর বেরিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন ডুবন্ত উন্মুখ জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়া শুরু হয়েছে। তৃণমূলের হাতে গত পাঁচ বছর বিজেপির যে ৫০ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে, সেই ৫০ জনের পরিবারকে দিল্লীতে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাম ও কংগ্রেসের এককালের নিবেদিত ভোট সব গিয়ে পড়েছে বিজেপির বাক্সে। খবর বেরিয়েছে তৃণমূলের অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে শক্তিহীন বাম এবং কংগ্রেসের ভোটাররা বিজেপির ঘরে ঢুকেছে। অনেকে বলছেন, বামের ভোট এবার রামে গেছে। এই যে, প্যারডিস শিফট বা ভূমিধস পরিবর্তন তা কি আগামীতে ভারতের জন্য ভাল হবে, নাকি মন্দ হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে উদার প্রগতিবাদি ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর আস্থাবান মানুষ কিছুটা হলেও যে শঙ্কিত সে কথা বলতেই হবে। দক্ষিণে তামিলনাড়ু ও কেরালায় বিজেপি বিরোধী শক্তি অটুট থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অন্ধ প্রদেশ এবং ওডিশায় বিজেপির মিত্র পক্ষই লোকসভার আসনে বিপুল জয় পেয়েছে এবং একই সময়ে অনুষ্ঠিত বিধান সভার নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় উঠেছেন। মোদি বিরোধী ব্লকে থাকা অন্ধ প্রদেশের ক্যারিশম্যাটিক নেতা চন্দ্রবাবু নাইড়ু রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন এবং তার স্থলে মূখ্যমন্ত্রী হলেন মোদি ঘনিষ্ঠ তরুণ নেতা জগমহল রেড্ডি। ওডিশায় বিজেপি মিত্র নবীন পাটনায়েক বিপুল বিজয় নিয়ে পঞ্চমবারের মতো মূখ্যমন্ত্রী হলেন। এক সময়ে বিহারের প্রতাপশালী নেতা লালু প্রসাদ যাদব, তার পরিবার ও দলের কোনো নিশানা নেই। সেখানেও নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডি-ইউ) ও বিজেপি জোট বেশীরভাগ আসন দখল করেছে। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেখানে কোথাও কংগ্রেস নেই। প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলো সব বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। সর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক মেরুকরণে নরেন্দ্র মোদির বিজেপির অবস্থান এখন অনেকটাই ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত পর স্বাধীনতা উত্তর সময়ে জওহরলাল নেহেরুর কংগ্রেসের মতো হতে যাচ্ছে বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। সুতরাং প্রশ্ন ওঠেছে, তাহলে কি নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক পক্ষ আপাতত ভারতে থাকছে না। ভারতের মতো এত বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার দেশে প্রবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে এত বেশী জাত-পাত, ভাষা, সংস্কৃতির বহুত্ববাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিহীন শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠান কি আগামী দিনে ভারতের জন্য মঙ্গলজনক হবে? এই প্রশ্ন ওঠার পিছনে অনেক প্রেক্ষাপট ও সঙ্গত কারণ রয়েছে। বিজেপির সর্ব ভারতীয় বিশাল উত্থানের পিছনে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদি সংগঠন আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) এবং শিব সেনার মত দল। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরপেক্ষ খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া হাউসের ভাষ্যকারদের মতে বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের পিছনে গত পাঁচ বছর তাদের শাসনের সফলতা যতটুকু না কাজ করেছে, তার চাইতে অনেক বেশি কাজ করেছে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত নেতৃত্বের কারিশমা এবং তার সঙ্গে কট্টর জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদের স্লোগান। নির্বাচনের প্রচার অভিযানে যে তিনটি প্রধান ইস্যু বিজেপি সামনে রেখেছে তার বাস্তবায়ন শুধু ভারত নয় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রথমত অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ। ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা এবং সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের প্রচেষ্টার জের ও সূত্র ধরে এ পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে যা ঘটেছে সেদিকে তাকালে এই লেখার একেবারে শুরুতে উল্লেখ করা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কথাই স্মরণে আসে। হিন্দু-মুসলমান, একই বৃন্তে দুটি ফুল, কেউ আর রক্তক্ষরণ চায় না, কারো তা কাম্য হওয়া উচিত নয়। প্রথমত, ভারতে এখন প্রায় ২০ কোটি মুসলমান সম্প্রদায়ের আবাসভূমি। দ্বিতীয়ত, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (এনআরসি) বা নাগরিগত্ব ইস্যু। নির্বাচনের প্রচার অভিযানের সময় বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মুখ থেকে এই ইস্যুতে যেসব কথা বের হয়েছে তা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। তৃতীয়ত, ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তারা বাতিল করবেন বলে বলেছেন। কাশ্মীরের বর্তমান যে অবস্থা তাতে এই ঘোষণা কার্যকর হলে সেটি পরিস্থিতিকে আরো বিপদজনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। ২০১৪ সালে কাশ্মীরের ছয়টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি তিনটি পেলেও এবার এই মহাবিজয়ের সময়ে একটি আসনও পায়নি। তবে একথাও বলতে হবে বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকের শঙ্কা থাকলেও একই সঙ্গে আশাবাদের জায়গাও কম নয়। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে ভোটের রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ২৩ মে ফল প্রকাশের পরপরই দিল্লির পার্লামেন্ট ভবনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সকল দলের ৩৫৩ জন লোকসভার সদস্যদের উদ্দেশ্যে নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘক্ষণ দিক নির্দেশনামূলক গুরত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। সে সময়ে মঞ্চে লাল কৃষ্ণ আদভানি, মরলি মনোহর যোশীসহ জোটের সব শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মোদির পূর্বের স্লোগান সবকা সাথ, সবকা বিকাস, এবার নতুন করে তার সঙ্গে যোগ করেছেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা- সবকা বিশ্বাস। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে সকলের উন্নতি এবং সবার বিশ্বাস তিনি অর্জন করতে চান। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও তাদের জন্যে কাজ করার কথা কয়েকবার ওই ভাষণে উল্লেখ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয়ত জোর দিয়ে বলেছেন তিনি ভারতের সংবিধানকে অক্ষুন্ন রাখবেন এবং তার পবিত্রতা রক্ষা করবেন। উপরোক্ত দুটি অঙ্গীকারের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী তা প্রশংসিত হয়েছে। আগামী দিনে দেশের ভেতরে ও বিশ্ব অঙ্গনে ভারতের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে তার বাস্তবায়ন চাইলে, উপরোক্ত অঙ্গীকার থেকে মোদি এবং তাঁর সরকারের সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভারতের অভ্যন্তরে যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদের বাড়াবাড়ির ঘটনা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অঙ্গনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের একটা বড় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নরেন্দ্র মোদি নিজে এবং বিজেপি নিশ্চয়ই এ সব ইস্যুতে সতর্ক থাকবেন। ভারত নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে মর্যাদাপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চাইবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে ভারতকে অবশ্যই তার বহুত্ববাদের মূল্যবোধকে সর্বত্রই সমুন্নত রাখতে হবে। এটা নরেন্দ্র মোদি নিজে যেমন উপলদ্ধি করেন, তেমনি ভারতের সব পক্ষের পরিপক্ক রাজনীতিক ও সুশীল সমাজও সেটি বোঝেন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনীতির সমীকরণে চীন-আমেরিকার টানাপোড়নে ভারত থাকবে ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকায়। বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি টেনেই লেখাটি শেষ করছি। এতদিনে উভয় দেশের সব পক্ষের রাজনীতিক, মিডিয়া, সুশীল সমাজ সকলেই উপলদ্ধি করেছেন ভারত-বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি একই সূত্রে গাঁথা। সুতরাং প্রত্যাশা করা যায় মোদির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সরকারের মেয়াদেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলোতে ঈদ ও কিছু কথা 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরের একটি শহর। শহরটির নাম বাফেলো। এটিকে আমেরিকার বুকে ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আপনি শুনে অবাক হবেন এই বাফেলোতে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রবাসী বাংলাদেশিরাই নিয়ন্ত্রণ করছে সেই শহরের ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুই! তবে আমেরিকা-কানাডা সীমান্তে অবস্থিত বাফেলো নামের শহরটা ছবির মতো এত সাজানো গোছানো ছিল না। এই শহরে বিশ বছর আগেও বাঙালিদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। কিন্ত এখন এই শহরে গেলে শ্বেতাঙ্গ খুঁজে পাওয়াটাই হবে কষ্টের। নব্বইয়ের দশক থেকে এই শহরে বাংলাদেশিদের আগমন শুরু হয়। ওই সময় বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকেই নিউইয়র্ক ছাড়তে শুরু করেন। কেউ কেউ চলে যান মিশিগানে, আবার কেউ কেউ পাড়ি জমান নিউইয়র্ক থেকে কয়েক ঘন্টা দূরত্বের শহর বাফেলোতে। বাফেলো শহরটা তখন ছিল সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। চোর, ডাকাত, ড্রাগ ডিলার থেকে শুরু করে খুনি, সব ধরণের অপরাধীরাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতো এই শহরে। শহরের বাসিন্দা ছিল খুবই কম, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই দোকানপাট বন্ধ করে সবাই ঘরে ঢুকে যেতো। শহরের অধিবাসীদের অনেকেই চলে গিয়েছিলেন শহর ছেড়ে, তাদের বাড়িঘরগুলো পড়ে ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। আগের তুলনায় বাফেলোর চিত্রটা অনেক পাল্টে গেছে। বর্তমানে বাফেলো শহরে প্রায় ৩০ হাজারের উপরে বাঙালি তথা বাংলা ভাষাভাষী লোকজন বসবাস করে। যেখানে রয়েছে, মুদি দোকান , বাংলা ভাষার ডাক্তার ছাড়াও বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অধ্যাপক ও প্রভাষক। প্রসঙ্গ ছিলো বাফেলোতে ঈদ। গত তিন বছর ধরে এ শহরে ঈদ করছি। অনেকটা দেশের মতোই। এটাই আনন্দ, এটাই খুশি। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য থেকে এখানে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে এখান থেকে চলে যাওয়া সংখ্যাটা খুবই কম। আমার মত অনেকেই বিগত সময়ে যারা নিউইয়র্ক বসবাস করতেন তাদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে। তাদের মধ্যে মানসিক, শারীরিক টেনশন দেখা গেছে। তাদের মধ্যে বাসা ভাড়ার চাপ, গাড়ি পার্কিং করার চাপ, বাচ্চাকে স্কুলে আনা নেওয়ার চাপ। এসব চাপের মধ্যে অনেকেই বাফেলো শহরে এসে পাড়ি জমিয়েছে।   ভিডিও লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম।

এ কে খন্দকারকে দেখে অনেকে শিক্ষা নিতে পারে

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেটাকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে হবে সবাইকে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দল-মত নির্বিশেষে অভিন্ন অবস্থান থাকতে হবে। পাশের দেশ ভারতে আমরা যেটা দেখি, কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। কিন্তু বিজেপি সরকার দেশটির জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করছে না। মহাত্মা গান্ধী একটি দলের নেতা ছিলেন, সত্য। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পর তিনি জাতির পিতা, জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুও একটি দলের নেতা ছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে তিনি জাতির পিতায় পরিণত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এখন জাতীয় সম্পদ। সব দলের উচিত তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেহুদা তর্ক-বিতর্ক করে আমরা অনেক সময় নষ্ট করেছি। এখন আর নয়। এ কে খন্দকারকে দেখে অনেকে শিক্ষা নিতে পারেন।  আর কিছুদিন পর বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হবে একই সময়ে। এটা ঠিক, এই সময়ে এসে আমরা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না। তবে এ কে খন্দকারকে বই সংশোধেনের ক্ষেত্রে যারা বাধা দিয়েছেন,তার অবশ্যই সবার নাম প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করছি। কারণ জাতি তাদের সম্পর্কে জানা উচিত।    নিজের লেখা বইয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ বছর পর জাতির কাছে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। `১৯৭১ :ভেতরে বাইরে` বইয়ে তিনি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন `জয় পাকিস্তান` বলে। দেশের স্বনামধন্য একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইটি বাজারে আসার পর হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্তির নানা চেষ্টা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই একটি মহলের মধ্যে এই প্রবণতা আমরা দেখে এসেছি। কিন্তু এ কে খন্দকারের বইয়ে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য অগ্রহণযোগ্য কেবল নয়, অপ্রত্যাশিতও ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কেবল নন; ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিমান বাহিনীপ্রধান। পরবর্তীকালে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন; মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ছিলেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতা। তিনি যখন খোদ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন, তখন বিক্ষুব্ধ হওয়া তো বটেই, বিস্মিত হওয়াও স্বাভাবিক। এ কে খন্দকারের বইটি প্রকাশের পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দৈনিকে লিখেছিলাম `১৯৭১ :ভেতরে বাইরে নিয়ে তিন প্রশ্ন` শীর্ষক নিবন্ধ। সেখানে যে তিনটি প্রশ্ন তুলেছিলাম, তার প্রথমটি অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এ কে খন্দকারের `জয় পাকিস্তান` শোনা নিয়ে। ঐতিহাসিক ওই সভায় আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। এ প্রসঙ্গে লিখেছিলাম- আমি তো বটেই; আমার ধারণা উপস্থিত গোটা জনসমুদ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনিনাদের প্রতিটি শব্দ শুনছিল। আমরা হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম ওই দিনের পরিস্থিতি। ভাষণের সময় উপস্থিত সব মানুষের মনে এখনও সেই ভাষণ গেঁথে আছে। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ শেষ করেছিলেন `জয় বাংলা` বলে। তিনি যেখানে বলছেন `এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম; সেখানে জয় পাকিস্তান কেন বলতে যাবেন- এটা তো কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়। (সমকাল, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। আমার ওই নিবন্ধে আরও দুটি প্রশ্ন তুলেছিলাম। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনকে `মোটামুটি সফল` বলা নিয়ে। বইটির ৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে এই মূল্যায়ন করেছেন। আমার প্রশ্ন ছিল- একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন যদি `মোটামুটি সফল` হয়, তাহলে পুরোপুরি সফল আন্দোলন তিনি বিশ্বের কোথায় দেখেছেন? আপামর জনসাধারণ ওই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। কৃষক, ছাত্র, জনতা, পেশাজীবী- সবাই সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী `যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে`। এমন অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- বাঙালির একটি মহৎ আন্দোলনকে কি এ কে খন্দকার জেনেশুনেই খাটো করতে চেয়েছেন? তৃতীয় প্রশ্ন তুলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এ কে খন্দকারের সীমান্ত পাড়ি দেওয়া নিয়ে। তার বইয়ের ৭৪, ৭৫ ও ৭৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, ২৮ বা ২৯ মার্চ পুরো পরিবারসহ সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ গিয়ে আবার ফিরে আসেন। এপ্রিলের শেষ দিকে আবার চেষ্টা করে আরিচা থেকে ফিরে আসেন। তৃতীয় ও শেষ চেষ্টায় মে মাসে আগরতলা চলে যান। আমার প্রশ্ন ছিল- তিনি বারবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করলেন এবং প্রত্যেকবারই বিমানবাহিনীর কর্মস্থলে ফিরে এসে দায়িত্ব পালন করে গেলেন; অথচ হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাকে কিছুই বলল না? আমি একাত্তরে তরুণ অর্থনীতিবিদ মাত্র। বেসামরিক প্রতিষ্ঠান পিআইডিতে (বর্তমানে বিআইডিএস) কর্মরত। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর কারফিউ শিথিল হওয়ার প্রথম সুযোগেই ২৭ মার্চ এলিফ্যান্ট রোডের বাসা ত্যাগ করি এবং পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি নিয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ হয়ে ভারতে চলে যাই। আমি ঢাকা ত্যাগ করার পরদিনই আমার বাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হানা দিয়েছিল। অথচ এ কে খন্দকারের মতো একজন বাঙালি সামরিক অফিসার নজরদারিতে ছিলেন না এবং দেশ ত্যাগ করার বারংবার চেষ্টা করেও বিমানবাহিনীর মতো সুরক্ষিত জায়গায় চাকরি করে গেছেন কীভাবে- এটা সত্যিই একটি বড় প্রশ্ন।  যা হোক, এ কে খন্দকার নিজেই শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে সাংবাদিকদের ডেকে এই ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। বইটির বিতর্কিত অনুচ্ছেদটি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিলম্বে হলেও তার যে বোধোদয় ঘটেছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু বইটি কেবল `জয় পাকিস্তান` নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি করেনি। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকে `মোটামুটি` সফল বলেও কি তিনি বিভ্রান্তি তৈরি করেননি? আমার মতে, বইয়ের বাকি বিষয়গুলো নিয়েও তার উচিত বিভ্রান্তি নিরসন করা বা প্রত্যাহার করা। বস্তুত এ কে খন্দকারের বিলম্বিত বোধোদয় এবং সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গ আরও তিনটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে- এত বড় `ভুল` তিনি করেছিলেন কেন? হতে পারে, তিনি বইটি নিজে লেখেননি। কাউকে ডিকটেশন দিয়েছেন। তারপরও পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের পর কি তিনি একবার পড়ে দেখেননি? বইয়ের ভূমিকায় তিনি যেভাবে `প্রচলিত অনেক ধারণা` ভেঙে দিতে চেয়েছেন, তাতে মনে হয় ৭ মার্চের ভাষণের তথ্য নিছক স্লিপ অব পেন নয়। বইটির ভাষ্য কি অন্য কোনো প্রকল্পের অংশ ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন- লেখার সময় বুঝতে না পারলেও এখন ভুল বুঝতে পারছেন কীভাবে? নাকি যে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বইটি লেখা, শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে? যদি তার এই ভুল স্বীকার সত্য হয়েও থাকে, তাহলে আরও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। নিশ্চিত না হয়েই যিনি ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত বিষয়ে এভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারেন; অন্যান্য বিষয়ে তাহলে তিনি কী করেন? এই ব্যক্তি আমাদের দেশের দুই মেয়াদে পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন! তৃতীয় প্রশ্ন- একটি ভুল স্বীকার করতে প্রায় পাঁচ বছর লেগে গেল? তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভুল স্বীকার আগেই করতে চেয়েছেন; কিন্তু নানা কারণে পারেননি। তিনি যদি ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারে আন্তরিক হয়ে থাকেন, তাহলে উচিত হবে এর পেছনের ঘটনা আদ্যোপান্ত খুলে বলা। বইটি কীভাবে লেখা হয়েছিল; মিথ্যা তথ্য দিতে কারা তাকে প্রভাবিত করেছে, কারা তাকে ভুল স্বীকার করতে দেয়নি; কারা বইটি সংশোধন করতে দেয়নি; স্বচ্ছতার স্বার্থে সব খুলে বলা উচিত। পৃথিবীর যত দেশ আছে কোথাও কোনো জায়গায় জাতির জনককে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য না করলেও বাংলাদেশে এমন ঘটনা শোনা যায়। তাই সবার উচিত জাতির জনককে নিয়ে মন্তব্যের বিষয়ে আরো যত্নবান হওয়া।    লেখক: ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

বিশ্বকাপে যেসব দলের জয় চান তসলিমা নাসরিন

শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ, চারিদিকে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। জয় নিয়ে হিসেব কষছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। কে হতে যাচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এরইমধ্যে অনেক ক্রীড়ামোদিরা তাদের প্রিয় দলকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। তেমনি বসে নেই ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের আলোচিত লেখিকা তসিলিমা নাসরিন। তিনিও প্রকাশ করেছেন নিজের অভিব্যাক্তি। বিশ্বকাপে কোন কোন দলের জয় চান তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন তিনি। মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ তালিকা প্রকাশ করেন। তসলিমা নাসরিন স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘যে দল ভালো খেলে সে দল জিতুক, সব সময়ই চাই। কিন্তু কোন দল জিতলে ভালো লাগবে -- তারও তো একটা লিস্ট চাই। রোববার বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জিতুক চেয়েছি। সোমবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তান জিতুক চেয়েছি। আজ শ্রীলংকার বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক চাইবো, পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতে জিতুক চাইবো। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক চাইবো। ৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতুক চাইবো। সাত তারিখে পাকিস্তান আর শ্রীলংকার মধ্যে যে ভালো খেলে সে জিতুক, আট তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, নয় তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারত জিতুক। বাকিগুলো এরকম, চাইঃ ১১ তারিখে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ১২ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাকিস্তান জিতুক, ১৩ তারিখে নিউজিল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১৪ তারিখে ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ওয়েস্ট ইণ্ডিজ জিতুক, ১৫ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শ্রীলংকা জিতুক, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক, ১৬ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১৭ তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ১৮ তারিখে জিতুক ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান, ১৯ তারিখে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতুক দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ২১ তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতুক শ্রীলংকা, ২২ তারিখে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে জিতুক ভারত, ২৩ তারিখে জিতুক দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পাকিস্তান, ২৫ তারিখে জিতুক অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, ২৬ তারিখে জিতুক নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তান। ২৭ তারিখে জিতুক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ভারত, ২৮ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শ্রীলংকা জিতুক, ২৯ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক, ৩০ তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১ জুলাই তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জিতুক শ্রীলংকা, ২ তারিখে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে যে ভালো খেলবে সে জিতুক। ৩ তারিখে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড জিতুক, ৪ তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক। ৫ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক। ৬ তারিখে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে ভারত জিতুক আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা জিতুক। কিন্তু আমি চাইলেই যে সে দল জিতবে তা তো নয়। বরং আমার লিস্টের ফেভারিটগুলো বেশির ভাগই গোহারা হারবে। কিন্তু কী চাই তা বলতে দোষ কী।’

ওআইসির সমালোচনায় তসলিমা

অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশানের (ওআইসি) সমালোচনা করেছেন ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। গতকাল রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে ওআইসি নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি। স্ট্যাটাসে তসলিমা লেখেন, ‘ও আই সি। অরগানাইজেশান অফ ইসলামিক কোঅপারেশান। এইটা আবার কী জাতের অরগানাইজেশান? আমি তো কোনও অরগানাইজেশান অফ ক্রিশ্চান কোঅপারেশান বা অরগানাইজেশান অফ জুইশ কোঅপারেশান বা এই ধরণের কোনও সংস্থার নাম শুনিনি। যদি থাকেও এই ধরনের সংস্থা তবে সেগুলো নিতান্তই ক্ষুদ্র, নিতান্তই রক্ষণশীল, নিতান্তই অনাধুনিক,অবহেলাযোগ্য। আমরা সবাই অবিজ্ঞান মানি,আজগুবি রূপকথা মানি, আমরা অসভ্য, আমরা বর্বর, আমরা নারীবিরোধী, আমরা মানবতাবিরোধী আমরা গণতন্ত্রবিরোধী আমরা বাকস্বাধীনতাবিরোধী সুতরাং চলো আমরা মিলিত হই এবং পরস্পরকে সাহায্য করি, ব্যাপারটা একজাক্টলি তাই। সভ্য হতে হলে এইসব ধর্মীয় লেবাস, ধর্মীয় ভাইবেরাদরি ত্যাগ করতে হবে। সভ্য হতে হলে ধর্মকে সবার আগে দূরে সরাতে হয়, তারপর ব্যাক্তির সমাজের রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নতির জন্য কাজ করতে হয়। সভ্য হতে হলে গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারীর সমান অধিকার, শিশুর অধিকার, পশুপাখির অধিকারকে রক্ষা করতে হয় ,পৃথিবীকে সবার জন্য বাসযোগ্য করতে হয়, সবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতাকে সবার ওপরে স্থান দিতে হয়। ধর্মের সঙ্গে সভ্যতার বিরোধ চিরকালের। নানা ছুতোছাতায় পেছনে দৌড়োলে সত্যিকার লাভ কিছু হয় না। কিছু একটা পাওয়ার আশায় সভ্যতাবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করেও সত্যিকার লাভ কিছু হয় না ‘

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা রয়েছে আর তা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পাগল, মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, মানসিকভাবে অসুস্থ বা ভূতের দ্বারা আক্রান্ত। কিন্তু এটি একটি স্নায়বিক সমস্যা। এর ফলে রোগী কথা বলতে বা বুঝতে, নতুন জিনিস শিখতে এবং সমাজে চলতে অসীম সমস্যার সম্মুখীন হন। প্রতিবন্ধী রোগীদের এই স্নায়ুবিক পার্থক্য তাদের অক্ষমতা নয়। এই পার্থক্যের জন্য প্রতিনিয়ত তাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। এর জন্য যারা এই ভিন্ন চিন্তার মানুষ, তাদের জন্য সরকারীভাবে, পরিবার বিভিন্ন জায়গায় সহযোগীতার মানসিকতা তৈরি করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা ভিন্ন মস্তিস্কের তারা আত্মঘাতী পথেরও অনুসরণ করতে পারে। যার কারণে তাদের পারিবার তাদের স্কুলের শিক্ষকসহ তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের আচরণ ক্ষমতা ও তাদের চিন্তা ভাবনা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তাদের জন্য আলাদা পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিবন্ধী কি? প্রতিবন্ধী নিউরোলজিকাল বা স্নায়ুবিক সমস্যা যাতে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বায়োকেমিক্যাল কাঠামোর কারণে এই নিউরণগুলি অত্যাধিক সংবেদনশীল। আর অটিজমযুক্ত শিশুরা উচ্চ আওয়াজ, উজ্জ্বল আলো বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে সহ্য করতে পারেনা। এমন বাচ্চাদের কথা বলাতে সমস্যা, বন্ধু তৈরি বা শারীরিক ফিটনেসেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এছাড়া প্রতিবন্ধী হচ্ছে মস্তিষ্কের বিন্যাসগত সমস্যা। প্রতিবন্ধী শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার ফলে শিশু শুধুমাত্র নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শিশু যখন শুধু নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে তখন তার অন্যদের সাথে যোগাযোগ, সামাজিকতা, কথা বলা, আচরণ ও শেখা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইদানিং প্রতিবন্ধী নিয়ে মানুষ কিছুটা জানলেও এ রোগটি আগে থেকেই ছিল। শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি বলেই রোগটিকে নতুন মনে হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রথম ধারণা দেন হেনরি মোস্‌লে নামে একজন ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট ১৮৬৭ সালে। তিনিই প্রথম লক্ষ্য করেন যে কিছু কিছু শিশুর সামাজিক ও শারীরিক আচার-আচরণ এবং বুদ্ধিমত্তা অন্যান্য বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের থেকে আলাদা । যেসব কারণে প্রতিবন্ধী হয়? প্রতিবন্ধীর জন্য শিশুরা কখনো দায়ী নয়। এটি জন্মগত একটি সমস্যা। প্রতিবন্ধী হওয়ার সঠিক কারণ এখনো অজানা রয়ে গেছে। তবে গবেষণার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীর জন্য অনেকগুলো কারণকে দায়ী করা হয়েছে। ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে, গবেষকরা আবিষ্কার করেছিলেন যে,`এক্স` ক্রোমোসোমের পরিবর্তনগুলি প্রতিবন্ধীর জন্য ঝুঁকি বাড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। যখন ছেলেদের মধ্যে এই পরিবর্তন হয় এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এক বিশেষ জিন যেখানে মিউটেশনগুলি নির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধীর সঙ্গে যুক্ত হয়। যা মানুষের মধ্যে প্রোটিনের একটি প্রকার। কারণ এই জিনের মিউটেশনগুলি মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে হাইপার-কানেক্টিভিটি সৃষ্টি করে। ভ্রুণ বৃদ্ধির প্রারম্ভিক অবস্থায় স্বাভাবিক মস্তিস্কের বৃদ্ধিতে গোলমাল দেখা যায়, জিনের অস্বাভাবিকতার জন্য যা  মস্তিস্কের বৃদ্ধি এবং মস্তিস্কের কোষগুলির নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। সম্ভবত জিন ও  পরিবেশগত উপাদানের প্রভাবে এ এস ডি রোগের সৃষ্টি হয়। পরিবেশগত ও প্রারম্ভিক কারণ অনেক তাত্ত্বিক ও গবেষকগণ জানিয়েছেন যে, কিছু পরিবেশগত এজেন্ট যেমন অ্যালকোহল প্যারাসিটামল এবং থ্যালিডোমাইড মত এক্সপোজার গর্ভবতী মহিলারা ব্যাবহার করে, যা সম্ভাব্য অটিজম ঝুঁকি সম্পর্কিত কারণগুলির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যার কারণে জন্মের ত্রুটি হতে পারে। এছাড়া এমএমআর  টিকা ও প্রতিবন্ধীর মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে। এসব কারণ ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে প্রতিবন্ধী হওয়ার জন্য। মাতৃস্বাস্থ্য গর্ভবতী মহিলাদের যাদের ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা এবং প্রদাহজনক রোগের মতো রোগ রয়েছে তাদের অটিস্টিক শিশু জন্মের বেশি ঝুঁকি রয়েছে। এই রোগগুলি ভ্রূণ এবং ভ্রূণীয় টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যা উন্নয়নশীল ভ্রূণের স্নায়ুতন্ত্রের উপর বিধ্বংসী। জন্মগত ভাইরাল সংক্রমণ প্রতিবন্ধীর জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। গবেষণায় দেখা যায় যে, চাকরি না থাকা, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট বা দুঃখ দুর্দশা জীবনযাত্রার ঘটনাগুলি কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী বা আধ্যাত্মিক বিষণ্ণতার কারণ হয়। যার কারণে গর্ভবতী নারীরা হতাশার মধ্যে থাকে। যা তার অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে। আচরণগুলি ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে প্রতিবন্ধীর সঙ্গে। এ কারণেই পরিবেশগত চাপগুলি জিন-পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে। যা মায়ের অ্যামনিওটিক টেসটোসটের মাত্রা বাড়ায়। মস্তিষ্কের প্যাটার্ন সনাক্তকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জটিল সিস্টেমগুলি বিশ্লেষণ করে যখন শিশুর জন্ম হয় তখন সহানুভূতি ও যোগাযোগ হ্রাস করার ফলে এটি ক্রমবর্ধমান ভ্রূণে মস্তিষ্কের বিকাশকে পরিবর্তন করতে পারে না। প্রতিবন্ধীর ধরন অটিজম সঙ্গে কোন শিশুর সম্পর্ক নেই। এটা যে কোনো ব্যাক্তির হতে পারে। অটিজম নিয়ে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে না। অটিজম সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে। ক্লাসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের ভাষা এবং শব্দ ভাণ্ডারের উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটে ক্লাসিক অটিজমে।  এই প্রতিবন্ধী শিশুরা সামাজিক ও যোগাযোগের চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়। এছাড়া অস্বাভাবিক আচারণের পাশাপাশি পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণও দেখা দিতে পারে।   উচ্চ কার্যকরী প্রতিবন্ধী এই ধরনের অটিজম রোগিরা Asperger সিন্ড্রোম হিসাবে পরিচিত। তাদের মধ্যে অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে অঙ্ক এবং সঙ্গীতে পারদর্শী হতে দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিভা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। সেভেন্ট প্রতিবন্ধী এই ধরনের প্রতিবন্ধী রোগীদের কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। বহির্বিশ্বের জনসাধারণ ও সামাজিক অনুমোদনের মান পূরণের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধীর সঙ্গে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। তবে তারা অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভা প্রদর্শন করে থাকে, যা তাদের ফটোগ্রাফিক মেমরি ব্যবহার করতে সক্ষম করে। এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা শিশুদের প্রতিভাধর হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়। অপটিক্যাল প্রতিবন্ধী এই ধরনের প্রতিবন্ধী রোগীরা সম্পূর্ণ অ অটিস্টিক। এই প্রতিবন্ধী শিশুরাও সাধারণত অনেক জ্ঞানী এবং বুদ্ধিজীবী ধরনের হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধীরা তাদের সামাজিক যোগাযোগমূলক আচরণ ও তাদের অধিকার ভুলে যায়, তবে উচ্চ কার্যকরী অটিজমসহ শিশুদের ক্ষেত্রে আচরণ ও যোগাযোগের সামাজিকভাবে উপযুক্ত উপায়গুলো শেখানো যেতে পারে। প্রতিবন্ধী প্রতিরোধে করণীয় প্রতিবন্ধীর যেহেতু কোনও নিরাময় নেই, তাই সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এটি প্রতিরোধ করতে হবে। পরিবারে কারো প্রতিবন্ধী অথবা কোন মানসিক এবং আচরণগত সমস্যা থাকলে, পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত গর্ভধারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা না করা, পর্যাপ্ত ঘুম, শিশুর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের পিতামাতারা অনেক ধৈর্যশীল হতে হবে। তাদের প্রতি সুন্দর সহজ, সরল ব্যবহার করতে হবে। তাদের প্রতি সর্বদা হাসি, খুশি এবং চলাফেরা খেলাধুলার যেন বিঘ্ন না ঘটে তা সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে। লেখক: রুকমিলা জামানচেয়ারম্যান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (লেখাটি লেখকের ইংরেজি কলাম থেকে ভাষান্তরিত)

বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণ

চতুর্দশ শতকে ইউরোপের রেনেসাঁর শুরু থেকে ষষ্ঠদশ শতকের সায়েন্টিফিক রেভ্যুলেশনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার যে শুরু তা অব্যাহত থাকে একেবারে আধুনিক যুগের বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। এক সময়ে পুরো আমেরিকাসহ আফ্রিকা, এশিয়া জুড়ে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিশ্ব ক্ষমতা বলয়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকে ইউরোপের হাতে। আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পরেও আরো প্রায় দুইশ’ বছর এশিয়া ও আফ্রিকাতে ইউরোপের শাসন বহাল থাকে। সে সময়ের বিশ্বকে এককেন্দ্রিক, অর্থাৎ ইউরোপ কেন্দ্রিক বলা গেলেও ক্ষমতাবলয়ের বিস্তার নিয়ে ইউরোপের দেশসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ অনবরত লেগেই থাকত। ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ছিল প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ। স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের দেশগুলো ক্ষমতাবলয়ের ভাগাভাগিতে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিযোগী হিসেবে লিপ্ত ছিল। তার জের ধরেই দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ হয় এবং দুটো যুদ্ধেরই কেন্দ্রভূমি ছিল ইউরোপের ভূখণ্ড। প্রথম মহাযুদ্ধের পরে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মানচিত্রের সুচনা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ব্লক এবং ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদি ব্লকের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতায় বিশ্ব দুই ভাগ হয়ে যায়। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং তখন থেকে পুঁজিবাদি ব্লক বা পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বের ফ্রন্টভাগে চলে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থেকে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপি ক্ষমতাবলয় বিস্তারের অনেক সুবিধা পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সময়ে বিভাজনটি মূলত ছিল ইউরোপ এবং আটলান্টিক মহাসাগরীয় কেন্দ্রিক। পূর্ব-পশ্চিম দুই অংশে ইউরোপ ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিমের নেতৃত্বে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর পূর্বের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুরু হয় বিশ্বব্যাপি ক্ষমতাবলয় বিস্তারের প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ন্যাটো (NATO) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাকট। দুই পক্ষের অসংখ্য প্রক্সি যুদ্ধের শিকার হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে। আমেরিকার ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে যেতে অস্বীকার করায় সিআইয়ের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হয়েছেন তৃতীয় বিশ্বের অনেক স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রনায়ক। এই তালিকায় আছেন চিলির আলেন্দো, ইরানের মোসাদ্দেক, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণসহ বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব। নিজেদের দোরগোড়ায় আমেরিকার প্রক্সি শাসক বসানোর ভয়ে ভীত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সত্তর দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তান কেন্দ্রিক অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনের সূত্রে বিশ্বে উত্থান ঘটেছে ভয়াবহ ধর্মান্ধ জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর। সেটি এখন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনরূপে আমেরিকাসহ পুরো মানব সভ্যতাকে ধাওয়া করছে বিশ্বের সর্বত্র। ক্ষমতাবলয় বিস্তারের এই অশুভ প্রতিযোগিতার পরিণতির কথা তখনই দুই পক্ষের বাইরে থাকা কয়েকজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ঠিকই বুঝেছিলেন। তৎকালীন সদ্য স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রনায়কগণ, বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং মিসরের বিপ্লবী নেতা জামাল আবদুল নাসের উপলব্ধি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের নেতৃত্বে দুটি ব্লক, তাদের নিজ নিজ ব্লকের স্বার্থে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব ব্লকের দিকে টানার যে চাপ সৃষ্টি করবে তা থেকে বাঁচার জন্য উন্নয়নশীল ও নতুন স্বাধীনতা লাভকারী দেশসমূহের একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম থাকা অপরিহার্য। তা না হলে সম্পূর্ণ পৃথিবী দুটি সামরিক জোটে ভাগ হয়ে পড়বে এবং তা হবে বিশ্ব শান্তির জন্য অশনি সংকেত। আর নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে বৃহৎ শক্তির করতলে পড়ে নামেমাত্র স্বাধীন হয়েও দুই পরাশক্তির আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে। তারা নিজ রাষ্ট্রের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। উপনিবেশ যুগের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। প্রথমে উদ্যোগটি শুরু হয়েছিল মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পক্ষ থেকে। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই জওহরলাল নেহেরুর পাণ্ডিত্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটা বিশ্বব্যাপি পরিচিতি ছিল। দুই ব্লকের বাইরে বড় একটা তৃতীয় ব্লক সৃষ্টি হলে বিশাল আয়তন, বড় জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে ও জওহরলাল নেহেরুর ক্যারিশমায় অতি সহজেই বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে ভারত একটা অন্যতম ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। সেই সুযোগে ভারত প্রথমপক্ষ, দ্বিতীয়পক্ষ, অর্থাৎ উভয় ব্লক থেকে সমাদর পাবে এবং নবগঠিত সংস্থা বা তৃতীয় পক্ষের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন করা সহজ হবে। আজ বিশ্ব অঙ্গনে ভারতের যে অবস্থান তার শুরুটা হয়েছিল এখানেই, এবং তা জওহরলাল নেহেরুর দূরদর্শিতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। নেহেরুর মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণসহ উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বিশ্বে একটা তৃতীয় বলয় সৃষ্টিতে একমত হন। বান্দুং সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। সেদিন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল জোসেফ ব্রজ টিটো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ, মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, ঘানার প্রেসিডেন্ট নক্রুমা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যৌথভাবে দুই ব্লকের বাইরে থেকে একটা মধ্যম পথে চলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। আন্দোলনের আদর্শ হিসেবে জাতিসংঘের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঁচটি নীতিকে গ্রহণ করা হয়। যার অন্যতম ছিল, সকলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং কেউ কারো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের পতনের পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকটাই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে ওয়ারশ সামরিক জোটও ভেঙ্গে যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল ওয়ারশ জোটের বিলুপ্তির সঙ্গে ন্যাটো, সামরিক জোটেরও বিলুপ্তি ঘটবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের ঘুঁটি কোনো একটি অথবা দুটি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না। দুই পক্ষের প্রক্সি ও আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে এশিয়া-আফ্রিকার দেশসমূহ মুক্ত থাকবে। আর বৈশ্বিক সংকট সমাধানে শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হবে জাতিসংঘ। কিন্তু বিশ্বের শান্তিকামি মানুষের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। কেন হয়নি, সে তো বিশাল ইতিহাস। কমিউনিষ্ট বিশ্বের পতন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া, ওয়ারশ সামরিক জোটের বিলুপ্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বিজয় হিসেবে ধরে নেয় এবং ভীষণভাবে প্রলুব্ধিত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ও সামরিক পন্থায় ও কৌশলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক ক্ষমতা বলয় প্রতিষ্ঠার অভিযানে নেমে পড়ে। একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ন্যাটো বাহিনীকে শক্তিশালী এবং পূর্ব ইউরোপের সবগুলো দেশকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত, এই আড়াই দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় যে রকম ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে এবং ভূ-রাজনীতির কূটকৌশলের পরিণতিতে যেভাবে ইসলামিস্ট উগ্রবাদি জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তার পাল্টা হিসেবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে তার কোনো কিছুই বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয়ের সমীকরণের বাইরে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক ক্ষমতাবলয়ের বিপরীতে চীনের মহাউত্থান, ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা (বিআরআই) এবং ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই যাত্রায় এখন সর্বদাই নতুন নতুন অনুষঙ্গ যোগ হচ্ছে। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নুতন সামরিক নীতিতে আটলান্টিক ও ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ায় এতদাঞ্চলের দেশগুলোর ভূমিকা পূর্বের চাইতে এখন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন-রাশিয়ার একই বলয়ে অবস্থানের বিষয়টি এখন স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়া, ন্যাটো বাহিনীর ব্যয়ভার নিয়ে ইউরোপের দেশসমূহের সঙ্গে ট্রাম্পের মতপার্থক্য এবং সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়ার কারণে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের মতো আর দহরম-মহরম সম্পর্ক নেই। আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো অন্য কোনো ইস্যুতে এখন আর ইউরোপ অন্ধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করবে না। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে এতদাঞ্চলের বড় দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের মধ্যে থাকলেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে এসব দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রশান্ত মহাসাগরের উদীয়মান শক্তি ভারত যদিও পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিসহ ক্রমশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেও চীনের সঙ্গে একটা সহযোগিতার করিডোর ভারত খোলা রাখতে চায়, যার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের চীনের পর্যটন নগরী উহানের হৃদ্যতাপূর্ণ বৈঠকের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ভূমিধস বিজয় নিয়ে নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলেন। গত মেয়াদের ধারাবাহিকতায় আগামী পাঁচ বছরে মোদির লক্ষ্য হবে ভারতকে মর্যাদাপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ারস গ্রুপের সদস্য করা এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আপাতত চীনের সঙ্গে ভারত কোনো সংঘাতে জড়াবে না। ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সামরিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার ঘোষণা ও তার কৌশল আগামী দিনে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।। লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক sikder52@gmail.com

বি‌শেষ ধন্যবাদ জাপানকে

দশ বছর আগের ঘটনা। টো‌কিও শহরের এক স্টেশনের কাছে হাতে ম্যাপ নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে একটা ঠিকানা খুঁজছি। কাছাকাছি এসেও খুঁজে না পেয়ে একে ওকে প্রশ্ন করছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। এর মধ্যেই হঠাৎ কোথা থেকে যেনো উদয় হলেন মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা। কাছে এসে জানতে চাইলেন, কী খুঁজ‌ছো? গন্তব্য বলার পর তিনি অনেকটা হেঁটে পথ দেখিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, তার খুব জরুরি কাজ আছে। যেতে হবে। এরপর তিনি প্রায় দৌড়া‌তে লাগলেন। প্রচণ্ড কাজের মধ্যেও বিদেশি বুঝতে পেরে তিনি যেভাবে সাহায্য করলেন তাতে ভালো লাগতে বাধ্য। নাম না জানা সেই জাপানিকে‌ আজীবন ধন্যবাদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সেবার ১৫ দিনের জাপান সফর পৃথিবী সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছিলো। মনে আছে, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনে করে হি‌রো‌শিমা যাওয়ার পথে দলে থাকা এক সাংবাদিক তার পাস‌পোর্ট ভুল ক‌রে ট্রেনে ফেলে গিয়েছিলেন। এরপর তার কী দুশ্চিন্তা। কিন্তু সাথে থাকা জাপানি গাইড বললেন, চিন্তা করো না। আসলেই তার চিন্তা দূর হ‌য়ে গিয়েছিলো। ট্রেন থেকে নামার আধঘণ্টার মধ্যে তার পাস‌পো‌র্টের হদিস পাওয়া যায়। জাপানের ফরেন প্রেস সেন্টা‌রের যে ভবনটায় প্রতিদিন যেতে হতো, সেখানকার দা‌রোয়ানকে দেখা যেতো রোজ সকালে সবাইকে‌ মাথা নুই‌য়ে হা‌সিমু‌খে স্বাগত জানাচ্ছেন। একইরকম হাসিমুখ থাকতো প্র‌তিটি রেস্তোরাঁর ও‌য়েটারা। প্রথম ধাক্কায় যে কারও মনে হবে, জাপানিরা এতো ভা‌লো কেনো! জাপান নি‌য়ে এতো কথা বলার কারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা সড়কপথ আর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর। ঢাকা-চট্টগ্রাম প‌থে বহু বছর ধ‌রে যারা যাতায়াত করেন, তাদের কাছে কুমিল্লার দাউদকান্দির যানজট ছিলো এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। মেঘনা ও গোমতীর দুই সেতুতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব‌সে থাকার দুঃসহ স্মৃতি যে কারো ভোলা কঠিন। তবে সেই ভয়ঙ্কর সময় বু‌ঝি কাটলো। কারণ মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু গত ২৫ মে থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে। আর কিছুদিন আগে চালু হয়েছে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নতুন এই তিনটি সেতু নির্মাণের ফ‌লে মানু‌ষের দু‌র্ভোগ কমে গেছে। ইতিম‌ধ্যেই এর সুফল পেতে শুরু করেছেন কুমিল্লার মানুষ। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যেতে আগে যেখানে কখনও কখনও সাত থেকে আট ঘণ্টাও লাগতো গত তিনদিন ধরে সেখানে মাত্র দেড় ঘণ্টা লাগছে। এবারের ঈদের আগে কু‌মিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভা‌গের মানু‌ষের জন্য সেতুগু‌লো যেনো বিরাট উপহার। এজন্য বি‌শেষ ধন্যবাদ জাপানকে। কেনো শুনবেন? চলুন তিন বছর আগে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে এই তিন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলো। কিন্তু জুলাই মা‌সে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় কয়েকজন জাপানি নাগ‌রিকের মৃত্যুর ঘটনায় সংকটে পড়লো সব। প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ রাখলো জাপানের তিন নির্মাতা কোম্পানি। পরে প্রকল্প মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোরও আবেদন করে তারা। সে অনুযায়ী আরও সাতমাস পরে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ছয় মাস তো লাগলোই না, আগের নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই নির্মাণ শেষ করেছে জাপা‌নিরা। এর নামই জাপান! দেশি কিংবা বি‌দে‌শি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর ধান্দায় থাকে, সেখা‌নে জাপানিরা নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করে অনন্য নজির স্থাপন ক‌রে‌ছে। সময়ের আগে কাজ শেষ হওয়ায় হাজার কোটি টাকাও সাশ্রয় হয়েছে। জাপান কিন্তু বাংলাদেশের নতুন বন্ধু নয়। বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পাশে আছে দেশটি। বলা যায় জাপান বাংলাদেশের দুর্দিনের বন্ধু। এই তো কয়েক বছর আগে পদ্মাসেতুর কাজে ঋণ দিতে বিশ্বব্যাংক যখন অস্বীকৃ‌তি জানালো, জাপান কিন্তু ঠিকই ২২ হাজার কো‌টি টাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শুরু করলো। ২০২০ সা‌লের মধ্যে মেট্রো চালু হ‌লে এই শহ‌রের গণপ‌রিবহ‌নের চিত্র অন্যরকম হবে। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের সহায়তা নজিরবিহীন। অবকাঠামো ছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য খাতেও জাপা‌নি‌দের সহায়তা অনেক। বাংলাদেশকে যতো দেশ উন্নয়ন সাহায্য দেয় জাপান সেই তালিকায় সবার ওপরে। দুই দেশের এই সম্পর্ক‌কে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ মে সরকারি সফরে জাপান যা‌বেন। তিনদিনের এই সফরে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেবেন। তবে এই সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ভ্রমণে জাপান যে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে সেটি নিয়েও অলোচনা হওয়া উচিৎ। জাপান প্রবাসী সাংবাদিক মনজুরুল হক লিখেছেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা জাপানের আরোপিত ভ্রমণ সতর্কতা বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর। আসলেও তাই। এই সংকটের শুরু ২০১৫ সালে। ওই বছ‌রের ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপ‌রেই জাপা‌নি‌দের ভ্রমণে সতর্কতা জা‌রি করা হয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান ঘটনার পর এই নিষেধাজ্ঞা অনেকটা স্থায়ী হ‌য়ে যায়। অনেকেই জেনে থাকতে পারেন, বাংলাদেশে প্র‌তিবছর যে দেশগু‌লো থে‌কে সবচেয়ে বেশি বি‌দে‌শি পর্যটক আসেন, সেই শীর্ষ দেশগু‌লোর একটি ছিলো জাপান। প্র‌তি বছর গ‌ড়ে হাজার বিশেক জাপানি আসতেন যার ম‌ধ্যে অসংখ্য তরুণ-তরুণী ছিলেন। কিন্তু, ২০১৬ সা‌লের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পর থে‌কে সেটি বন্ধ রয়েছে। জাপানি নাগরিকদের এখন ঢাকায় যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর থেকে উত্তরণ জরুরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনা ২৯ মে টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেদিন জাপানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন যে থোক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা আসার কথা, এককালীন হিসেবে সেটা এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশ-জাপানের মধ্যে আড়াই বিলিয়ন ডলারের অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্টেন্স (ওডিএ) চুক্তি সই হবে। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেব, এই সময়টায় আমাদের একটা চাওয়া আছে। প্রধানমন্ত্রীকে অনু‌রোধ, শিনজো আবের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে যেনো সতর্কতা উঠিয়ে ফের জাপা‌নিদের বাংলাদেশ সফরের সফ‌রের অনু‌রোধ করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থে‌কে জাপানিদের এই বার্তা দিতে হবে, তোমরা আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। আমরা চাই তোমরা বাংলাদেশে বেড়া‌তে আসো। তোমাদেরকে আমরা স্বাগত জানাবো। কারণ পৃথিবীর এই দুঃসময়ে নী‌তি-নৈ‌তিকতা, আদর্শ, অপরকে সম্মান করাসহ জাপানিদের কাছ থেকে শেখার আছে বহু কিছু। কাজেই জাপানিদের আমন্ত্রণ লাল সবু‌জের বাংলাদেশে। লেখক: প্রোগ্রাম প্রধান, মাইগ্রেশন, ব্র্যাক। (লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি