ঢাকা, ২০১৯-০৪-২৬ ৮:২৬:৫১, শুক্রবার

চ্যালেঞ্জের মুখে বেসরকারি টেলিভিশন

চ্যালেঞ্জের মুখে বেসরকারি টেলিভিশন

গত কিছুদিনে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিকের চাকরি হারানোর ঘটনায় এক অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টদের মধ্যে। উদ্যোক্তারা টিভি স্টেশনগুলো চালাতে গিয়ে সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রায় টিভি চ্যানেলের মালিকদের ভর্তুকি দিয়ে এসব খরচের জোগান দিতে হচ্ছে। ফলে দেশের ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার অজানা আশঙ্কা পিছু ছাড়ছে না। ক`দিন আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো এবং ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টদের সংগঠন বিজেসি এই সংকট মোকাবেলায় যৌথ মতবিনিময় সভা করে। এর আগে ৩০ মার্চ শিল্পকলা একাডেমিতে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার `সংকটে বেসরকারি টেলিভিশন` শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তথ্যমন্ত্রী দেশি চ্যানেলগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবেলায় দেশের বিজ্ঞাপনগুলো বিদেশি চ্যানেলে প্রচার না হওয়ার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেন। এমন সংকট মোকাবেলার জন্য তিনি বিদেশি চ্যানেলে যাতে দেশি বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছেন। অন্যদিকে ২ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে তিনি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, `দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে পরিমাণ বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন পাওয়ার কথা, বর্তমানে তা পাচ্ছে না। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে দেশি বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।` তিনি আরও বলেন, `বিদেশি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপনমুক্ত বা ক্লিন-ফিড হিসেবে অথবা ফিল্টার করে সম্প্রচার করতে হবে। ২০০৬ সালের কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আইনের ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিদেশি কোনো টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এতদিন এ আইনটি পালন করা না হলেও আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশি টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আইনটি কার্যকর করা হবে।` ১০ এপ্রিল তথ্যমন্ত্রী সচিবালয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল অনার্স-অ্যাটকোর সঙ্গে মতবিনিময়কালে বেআইনিভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে সর্বোচ্চ দুই বছর শাস্তি, অর্থদণ্ড ও লাইসেন্স বাতিলের কথা বলেন। একই সঙ্গে যাদুভিশন এবং নেশনওয়াইড মিডিয়াকে বেআইনিভাবে বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করেন। এদিকে ১১ এপ্রিল কেবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী কেবল নেটওয়ার্ক ডিজিটালকরণ এবং প্রতিষ্ঠার ক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের চ্যানেল রেখে বিদেশি চ্যানেল রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কেবল অপারেটরদের পক্ষ থেকেও টিভি কেবল ব্যবসাকে শিল্প, সেটবক্স শুল্ক্কমুক্ত হিসেবে আমদানির অনুমতিসহ বেশ কয়েকটি দাবি মন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করা হয়। একসময় বাংলাদেশে ঘর বিনোদনে শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন থাকলেও যুগের চাহিদা এবং তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বর্তমানে দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংখ্যা এখন ৩০টি। তবে অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়ে আছে মোট ৪৪টি চ্যানেল। সংবাদ দেখা থেকে শুরু করে দর্শকদের বিনোদনের বড় অংশই পূরণ করে থাকে বেসরকারি টিভিগুলো। আশির দশকের শেষ লগ্নে দেশে টেলিভিশন ভার্চুয়াল জগতের একাকিত্বের অবসান ঘটায় বেসরকারি চ্যানেলগুলো। `৯৮ সালে ড. মাহফুজুর রহমানের উদ্যোগে এটিএন বাংলা প্রথম বেসরকারি টিভি চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর একেক করে চ্যানেল আই, ইটিভি, এনটিভি, বাংলাভিশন, বৈশাখী টিভি, আরটিভি, মাছরাঙ্গা টিভিসহ নানা চ্যানেলের আগমন ঘটে। সর্বশেষ একাত্তর, যমুনা, নিউজ টোয়েন্টিফোর, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন, ডিবিসি চ্যানেল দর্শকদের দোরগোড়াতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এ কথা সত্য যে, যখন থেকে দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়, তারপর থেকেই ভারতীয় চ্যানেলগুলোর সঙ্গে এক মহাচ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে এসব টেলিভিশনকে। বর্তমানে ফ্রি এবং পে-চ্যানেল মিলে প্রায় ৩০টির অধিক ভারতীয় চ্যানেল দেখতে পায় বাংলাদেশের দর্শকরা। ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাব নিয়ে অনেক কথাবার্তা, মিছিল-মিটিং, দেনদরবার হলেও আজ পর্যন্ত এর কোনো সুষ্ঠু বা দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রতিদিন সংবাদ, খেলাধুলা, টক শো, সিনেমা, বিতর্ক, নাটক, বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানসহ নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। দর্শকদের পরিতৃপ্ত করতে চ্যানেলগুলোর প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তারপরও আমাদের কিছু কিছু দর্শকের ভারতীয় টেলিভিশনগুলোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রতি একধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারী দর্শকদের বৃহৎ অংশ জি বাংলা, স্টার জলসা, ইটিভি, হিন্দি চ্যানেল জিটিভি, স্টার প্লাস- এসব টিভি চ্যানেলের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত। আমাদের দেশে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রবেশ অবারিত থাকলেও ভারতে আমাদের টেলিভিশন প্রচারে রয়েছে নানা কঠিন শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা। বছরপ্রতি মাত্র দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ফি প্রদান করলেই একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে ডাউনলিংক করা যায়। অথচ ভারতে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেল প্রদর্শন করতে গেলে শুধু বড় ধরনের অর্থ প্রদানই নয়, ভারতীয় কোম্পানি আইন ১৯৫৬ অনুসারে নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির মাধ্যমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। একই সঙ্গে পাঁচ কোটি টাকার মতো ফি প্রদান করতে হয়। এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে টেলিভিশন সম্প্রচারে ফি প্রদানে বৈষম্য রয়েই গেছে। এদিকে কথিত টিআরপি বা টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট জরিপও বেশ কিছু বেসরকারি টেলিভিশনকে বিপদে ফেলেছে। টিআরপি জরিপে পিছিয়ে থাকার কারণে অনেক টিভি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন পায় না। সবশেষে তাই খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করার অমানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। টিআরপি নিয়ে নানা অস্বচ্ছতার অভিযোগ পুরনো। টিআরপি যা কোনো টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নির্দেশ করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, টিভি অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নিয়ে কৌশলে পক্ষপাতমূলক তথ্য পরিবেশন করা হয়। টিআরপির উদ্দেশ্যমূলক তথ্য পরিবেশনের কারণে এ পর্যন্ত অনেক টেলিভিশন, নির্মাতা, প্রযোজক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। টেলিভিশনের উদ্যোক্তা, কলাকুশলীরা বহুবার টিআরপি স্বচ্ছতা নিয়ে জোর আপত্তি তুললেও এর সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য কোনো সুরাহা হয়নি। তাই সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, টিআরপির জরিপ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সবাই বয়কট করা উচিত। একই সঙ্গে দেশি চ্যানেলগুলোর সিরিয়ালের ক্রম চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাকালীন তারিখ অনুযায়ী করার উদ্যোগ গ্রহণ করাটাও এখন জরুরি। আবার ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল নিয়েও আপত্তি রয়েছে। এখন কিছু কিছু টেলিভিশনে ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল দেখানো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অনেক চ্যানেলে বিদেশ থেকে কম দামে কিনে আনা এসব সিরিয়াল দেখানো হয়। এতে করে দেশি কলাকুশলী, নির্মাতাসহ অন্য টিভি মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল নীতিমালা তৈরি করে বন্ধ করে দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি। এদিকে আবার এখন পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের বাইরে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর আর কোনো বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হয়নি বাংলাদেশে। এই খাতে সরকারের কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। তবে কেবল অপারেটররা দর্শকদের কাছ থেকে টেলিভিশনের বিভিন্ন কনটেন্ট প্রদর্শন করে যে অর্থ উপার্জন করে, তার ন্যায্য একটা অংশ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে প্রদান করা উচিত। যে কথা সম্প্রতি খোদ তথ্যমন্ত্রীও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন। সারাদেশে এখন কেবল সংযোগের সংখ্যা দুই কোটির বেশি। এই দুই কোটি গ্রাহক কমবেশি প্রতিমাসে কেবল সংযোগদাতাকে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে প্রদান করছে। সেই হিসাবে কেবল অপারেটররা মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা দর্শকদের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই আয়ের কোনো ছিটেফোঁটা অংশ পান না টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকরা, যা নিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বিতর্ক। এই বিতর্ক এড়িয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে কেবল অপারেটরদের উপার্জনের একটা ন্যায্য অংশ টিভি মালিকদের শেয়ার করা উচিত। সবশেষে বলতে চাই, দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো এখন যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার, কেবল অপারেটরসহ সব স্টেকহোল্ডারকে ঐকমত্যে আসা প্রয়োজন। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, কেবল অপারেটরসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে ভীষণ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। আর্থিক দৈন্যতায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরও কিছু কিছু টিভি চ্যানেল। আশা করা যায়, অ্যাটকোর নবনির্বাচিত সভাপতি মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর টিকে থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাই দেশি চ্যানেলে বিদেশি বিজ্ঞাপন বন্ধ, ডাবিং সিরিয়াল প্রচার না করা, বিজ্ঞাপন বৈষম্য কমানো, কেবল অপারেটর কর্তৃক দর্শক থেকে প্রাপ্ত অর্থ টিভি মালিকদের সঙ্গে সমভাবে বণ্টন করাসহ অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করলে বাংলাদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবে বলে সবার বিশ্বাস। চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিkirondebate@gmail.com এসএ/
শবে বরাত নিয়ে বিতর্ক কেন?

শুরুতেই আমার জিজ্ঞাসা, পবিত্র লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত নিয়ে অহেতুক, অনাকাঙ্খিত বিতর্ক কেন করা হচ্ছে? এই নিউইয়র্কে ৯ বছরের প্রবাস জীবনে লক্ষ্য করলাম, এক শ্রেনীর বাঙালি মুসলমান ইসলাম ধর্মের নানা বিধি বিধান নিয়ে ঘরে-বাইরে, মসজিদে রকমারী তর্ক-বিতর্ক (বেশিরভাগ সময় কুতর্ক) করে যাচ্ছেন। যেমনটি হলো আজ শুক্রবার এখানকার একটি মসজিদে। জুমার নামাজ পড়তে গেলাম। খুতবা পড়ছেন ইমাম সাহেব। খুতবার একেবারে শেষ পর্যায়ে একটু ইতস্তত করে ইমাম সাহেব প্রকারান্তরে ‘শবে বরাত’কে হারাম বলে সম্বোধন করলেন! আমি রীতিমত হতভম্ব এবং বেদনাহত। একি বলছেন ইমাম সাহেব? জানিনা কি কারণে তিনি এমন বললেন? তাহলে আমাদের বাপ-দাদারা যে অনন্তকাল ধরে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যে দিনটি পালন করে আসছিলেন, তারা কি ভুল করলেন? আমরা কি ভুল করছি? বাংলাদেশের লক্ষ কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ কি ভুল করছেন? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে শুধু বুঝি, মোদ্দা কথা একটাই এবং খুব সহজ। যে যত তর্ক, বিতর্ক, কুতর্ক করুন না কেন — এই পবিত্র দিনটির পবিত্রতা নষ্ট করতে পারবেন না। জেনে রাখুন, এটি একটি পবিত্র দিন। শবে বরাতের রাত ইবাদত-বন্দেগীর রাত। দুষ্ট লোকের কুতর্কে কান দেবেন না। প্রভাবিত হবেন না। এই দিনটাকে শ্রদ্ধা করুন, এবং যারা এই দিন ও রাতে আন্তরিকভাবে ধর্মচর্চা করেন তাদের অনুভূতির প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করুন। আপনার যদি শবে বরাত নিয়ে ‘আপত্তি’ থাকে তাহলে সবচেয়ে ভালো হয় আপনি ‘অফ’ যান, আপনার মুখ ও জবান দয়া করে ‘সাইলেন্ট’ রাখুন। আমিন।

চীনের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা

কয়েক বছর ধরে চীনের অর্থনীতির ক্রমাগত রুগ্ণ দশা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের জের ধরে প্রবৃদ্ধিতে প্রভাবের বিষয়টি খানিকটা নিরপেক্ষভাবেই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে, চীনের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় অনেক বেশি তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও), ২০১৯-তে যা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, চলতি বছর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশেরও বেশি হবে, যদিও প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে চীন সরকারের ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া আরো বলা হয়, ২০২০ সালের দিকে হয়তো প্রবৃদ্ধির মাত্রা ৬ দশমিক ৩ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা কিনা সাম্প্রতিক বছরগুলোর শ্লথগতি সত্ত্বেও চীনের শক্তিশালী অর্থনীতিকেই নির্দেশ করে। এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়াসুউকি সাওয়াদা তার পর্যবেক্ষণে বলেন, চাহিদাসাপেক্ষে খরচ বা ভোগ ব্যয়ের ৩ দশমিক ৯ থেকে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি সম্ভব হয়েছে কারণ ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে চীনের সরকার ব্যক্তিগত আয়কর সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নতুন করবেষ্টনী ও উচ্চমান ভাতা কার্যকরের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে তার সমর্থন জোরদার করে। তাছাড়া ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অতিরিক্ত কর্তনের বিষয়টিও সংযোজিত হয়েছে। সরবরাহের দিক থেকে এডিও প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৭ সালে ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় ২০১৮ সালে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমলেও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে সেবা খাত। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, জিডিপি বৃদ্ধিতে চীনের সেবা খাতের অবদান ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তাছাড়া সেবা খাতের কল্যাণে দেশটির জিডিপি ৫১ দশমিক ৯ থেকে ৫২ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিবন্ধের এ পর্যায়ে বিষয়টি উল্লেখ করা সমীচীন, চলতি বছরের মার্চে চীনের ১৩তম জাতীয় পিপলস কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্টেট কাউন্সিলর যে বক্তব্য প্রদান করেন, তাতে বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে। চীনের অর্থনীতির ওপর নিম্নমুখী চাপের বিষয়টি উল্লেখপূর্বক তিনি দেশটির নীতিমালা ও পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল প্রত্যাশা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিশ্চিত করার কথা বলেন। এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণের ফলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতির সমন্বয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকারের অতিরিক্ত সুদ পরিশোধের বোঝা কমাতে বকেয়া ঋণ প্রতিস্থাপনে চীনা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকারের বন্ড ইস্যু সম্প্রসারণ করতে পারে। তিনি আরো আশস্ত করেন, অর্থায়ন প্লাটফর্মগুলোয় স্থায়ী ঋণপ্রাপ্তির সমস্যা সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার বাজারপন্থা উৎসাহিত করবে এবং নিশ্চিত করবে যে উদ্যোগগুলো মাঝপথে বন্ধ হবে না। কার্যকরভাবে এগুলো অবশ্যই বিচক্ষণ পদক্ষেপ। লি কেকিয়াং আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপকের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার বলেছেন। আর তা হলো, স্থিতিশীল ও বৈচিত্র্যময় কর্মসংস্থান সৃষ্টি। চীন সরকার নির্দিষ্ট কিছু পরিমাপকের বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা কিনা বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্যও প্রযোজ্য। দেশটির কলেজ গ্র্যাজুয়েট, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সামরিক কর্মী ও গ্রামীণ অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন সরকার। একই সঙ্গে তারা চাকরির সুরক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি পড়া শহুরে চাকরিজীবীদের সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এ বিষয়টিও লি কেকিয়াংয়েরই প্রস্তাবিত। আর তা হলো, যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিংবা শহুরে বেকারদের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেবে, পরবর্তী তিন বছরের জন্য শুধু তাদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও ফি কাটা হবে। সবার সুবিধার কথা ভেবে চীন সরকার নিয়মনীতিগুলোও শিথিল করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে আইনের বাস্তবায়ন আরো বেশি কার্যকর করে তোলা সম্ভব বলেও তারা জোর দিয়েছে। সব প্রশাসনিক পর্যায়ে আইন ও আইনি বিধানগুলো আরো ঐক্যবদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে যে তা দুর্নীতির সম্ভাবনা হ্রাস কমাবে, নিরপেক্ষ আচরণ করবে এবং বৈষম্য রোধ করবে। আরো একটি আকর্ষণীয় পরিমাপক চীনা কর্তৃপক্ষের সমর্থন পেয়েছে। তারা যথাযথভাবে বুঝতে পেরেছে বর্তমানের ডিজিটাল যুগে অগ্রগতি অর্জনের জন্য একটি ক্রেডিট রেটিংভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মানদণ্ডের মধ্যে সংস্কার প্রয়োজন। চীন উপলব্ধি করে এটি আইন কার্যকর করতে এবং পরিবেশগত সুরক্ষা, অগ্নিপ্রতিরোধ, কর সংগ্রহ ও বাজার তত্ত্বাবধানে সহায়তা করবে। উপরন্তু আইন লঙ্ঘনকারীদের সহজে চিহ্নিত ও শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হবে। বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্ক বিতর্কের ফলে চীন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শুধু সরকারের বিভিন্ন বিভাগে আইন প্রণয়নের সমন্বয় এবং সরকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় না, বরং শাস্তিমূলক প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেয়; যা কিনা এরই মধ্যে চীনের রফতানি শিল্পের জন্য সুফল বয়ে আনছে। চলতি বছর থেকে চীনের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোয় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য গড় ব্রডব্যান্ড সার্ভিসের ব্যয় ১৫ শতাংশ কমিয়ে আনা হচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবার গড় খরচও ২০ শতাংশ কমানো হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের পর চীন সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মসূচি এবং নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কিত গবেষণা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্লাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তথ্য ও প্রয়োজনীয় সেবা ভাগ করে উন্নয়নের গতি বাড়ানোর জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। মূলত আইনিভাবে বৌদ্ধিক সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অগ্রিম প্রয়োগের এক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় গতিবেগ অর্জনের নিমিত্তে মৌলিক গবেষণা ও প্রয়োগিক মৌলিক গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে, যা কিনা উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্যে চীনের কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগারগুলোয় সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ গবেষণাগার চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার করা হবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত এ ধরনের কার্যক্রমগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন ততই তা দেশের জন্য মঙ্গলকর। গত কয়েক বছরে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে চীনের বিপক্ষে উত্থাপিত বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক সত্ত্বেও চীন কীভাবে তার অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে, তা যে কেউই অনুমান করতে পারে। বর্তমানের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচিবিষয়ক ঋণ, স্বচ্ছতা এবং চীনের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পাশাপাশি উদ্যোগটি ঘিরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঘোচাতে এপ্রিলের শেষ নাগাদ গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্মেলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের পক্ষ থেকে নেতিবাচক সাড়া সত্ত্বেও চীন কিন্তু ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি ঘিরে ইতালির সমর্থন আদায় করে নিয়েছে। বিশেষ করে গত মার্চে প্রথম কোনো জি৭ তালিকাভুক্ত দেশ হিসেবে ইতালি ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগে স্বাক্ষর করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কনতেও চীনের ওই সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। তার দেশ ইতালি কেন ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচির অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়টিরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তার কথামতে, এ উদ্যোগ চীন ও ইতালির মধ্যকার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করবে। তবে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি ইতালির সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগমনের দিনকয়েক আগে ইতালির ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে ব্যাপক সংশোধন আনা হয়। গত বছরের অক্টোবরে সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধির ১ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবর্তে যদি শূন্যও হয়, তা সত্ত্বেও রোম কিন্তু খুশিই হবে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক করপোরেশনের (ওইসিডি) সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনটি আরো হতাশাজনক। যেখানে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির অনুমান করা হয়েছে। এ নিম্নগামী প্রবণতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো ইতালির বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যা কিনা তাদের সাবধানী ভোক্তা হতে বাধ্য করছে। উল্লেখ্য, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, গ্রিস ও পর্তুগালের মতো ইউরোপের দেশগুলো চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। যদিও পশ্চিমা অন্য দেশগুলো চীনের উদ্যোগের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করতে অনাগ্রহী। তবে ঘটনা কোন দিকে মোড় নেয়, বিষয়টি তারা খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। বিদ্যমান সন্দেহের প্রতিক্রিয়ার জবাবে চীন বলেছে, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কোনোভাবেই ঋণের ফাঁদ হবে না, এটি বরং সবার জন্য উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ একটি কার্যক্রম। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কীভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে, তার সঙ্গেও বিষয়টির একটি যোগসূত্র রয়েছে। ইইউ বর্তমানে ব্রেক্সিটের মতো একটি জটিল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া আগামী মে মাসের শেষে অনুষ্ঠেয় ইইউ নির্বাচনের আগে বিষয়টি ঘিরে মতপার্থক্যও রয়েছে, যা বিচ্ছেদ ও একত্রীকরণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। সপ্তাহখানেক আগে শি জিনপিং যখন ইউরোপ সফর করেন, তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়, ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় নেতারা চীনের সঙ্গে একটি সুষ্ঠু বাণিজ্যিক সম্পর্ক চান বলে তাকে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি ঘিরেও তারা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যদি কিনা এর মাধ্যমে চীনের বাজারে তাদের প্রবেশের পথ সুগম হয়। যদিও ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচির জনপ্রিয়তাবিষয়ক প্রশ্নে চীন খানিকটা চাপে রয়েছে, বিশেষ করে শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপ সরকারের শীতলতা সত্ত্বেও নতুন প্রশাসন তাদের পূর্বসূরিদের সঙ্গে চীনের চুক্তিগুলোর বিষয়ে সতর্ক। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ৫৭ ডলার মূল্যের অর্থনৈতিক করিডোর উদ্যোগটি সফলতা অর্জন করেছে, যা কিনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। এটিকে ভারত যদিও সন্দেহের চোখে দেখছে। ওই প্রকল্পের সফলতা প্রসঙ্গে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তহবিলের ২০ শতাংশ ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া বাকি অর্থের বন্দোবস্ত করা হয়েছে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ ও অনুদানের মাধ্যমে। যাই হোক, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঠামোর সফলতা এখনো নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান পার্থক্যগুলো সমাধানের ওপর, যার মধ্যে অন্যতম বৌদ্ধিক সম্পত্তি, বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি স্থানান্তর, অশুল্ক বাধা, কৃষি ও সেবাখাত। উভয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে, কোনো পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছেনি। একবার যদি চুক্তি সম্পাদন হয়, তাহলে চীন তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে ইইউ নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের একটি চুক্তিতে আসতে হবে। প্রস্তাবিত যৌথ সম্মেলনের বিবৃতি অনুসারে চীনে শুরু হতে যাওয়া আসন্ন বৈঠকে চীনা প্রশাসন বিষয়টি সম্পাদনের চেষ্টা করছে। এজন্য চীনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্কের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। আর এটি কিন্তু মোটেও সহজ নয়। লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার muhammadzamir0@gmail.com

ভুটানকেও বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলবেন ডা. লোটে!

‘দাদা কেমন আছেন? দিদি আপনি এখন কোথায়? বাসায় চলে আসেন, আড্ডা দেয়া যাবে’- একজন ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীর মুখে এমন দেশি সম্বোধনে, প্রাণটাই জুড়িয়ে গেল! ডা. লোটে সেরিং ভুটানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তিনি, ডা. নুজহাত চৌধুরী ও আমি ঘটনাচক্রে একই সময়ে একই ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি। যদিও তিনি আমাদের একাডেমিক জুনিয়র। যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতা সে সময়ে। ’৯১ এর নির্বাচন-পরবর্তী যে উত্তাল বাংলাদেশকে ডা. লোটে দেখেছিলেন সেটা যে তার জন্য কতটাই অন্যরকম আর অচেনা ছিল সেটা বুঝলাম এবার ভুটান গিয়ে। ভুটানে এটাই ডা. নুজহাত ও আমার প্রথম যাওয়া। কনফারেন্স, লেকচার ইত্যাদি নানা কারণে মাঝে মাঝেই আমাদের এদিক-সেদিক যাওয়া পড়ে। কিন্তু ঘরের পাশে ভুটানে যাওয়া পড়েনি কখনই। ডা. লোটের সঙ্গে প্রথম পরিচয় যতদূর মনে পড়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের আরেক ভুটানি গ্র্যাজুয়েট ডা. ফোব-দর্জির মাধ্যমে। ডা. ফোব ছিলেন আমার সামান্য সিনিয়র। ডা. লোটে যে সময়ে ময়মনসিংহে পা রাখেন সে সময়টায় দেশে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের সদ্য অবসান হয়েছে। ‘৯১’র নির্বাচনে জিতে জাতীয়তাবাদী শক্তি সদ্য ক্ষমতায়। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে যখন চলছে জাতীয়তাবাদী চিরুনি অভিযান। যাদের গায়েই অন্যরকম গন্ধ তাদের হোস্টেলে ঠাঁই নেই। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের বয়েজ হোস্টেলেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সারি সারি খালি হোস্টেলের রুমগুলো আর ময়মনসিংহ শহরের ব্রাহ্মপল্লী, মাসকান্দা, চামড়াগুদাম, রুটিওয়ালাপড়া, খ্রিস্টানপল্লী ইত্যাদি সব জায়গায় ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে অসংখ্য বেসরকারি ছাত্রাবাস-এই ছিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের চালচ্চিত্র। আমাদের ব্রাহ্মপল্লীকেন্দ্রিক ওই নিউক্লিয়াসটা ছিল তাকে কেন্দ্র করে শহরের ওই অঞ্চলটায় গড়ে উঠেছিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন ব্যাচের ছাত্রলীগকর্মীদের একটা বড় কনসেনট্রেশন। হোস্টেল বনাম ব্রাহ্মপল্লী ‘আনফ্রেন্ডলি ম্যাচও’ হয়েছে বার কয়েক। সেখানে ডা. লোটের ব্যাচের কিছু সহপাঠীরও ছিল নিত্য আনাগোনা। সে সুবাদেই মাঝে মাঝে আসা হয়েছে তারও। কাছ থেকে তিনি দেখেছেন, বুঝেছেন সে সময়কার ময়মনসিংহ তথা পুরো দেশের চালচ্চিত্র। কতটা বিস্মিত হয়েছেন, অদ্ভুতুড়ে অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছেন জানি না। তবে থিম্পুর সৌম্য পরিবেশ, ভুটানিদের নিয়ম আর আইনের প্রতি অনুরাগ আর নির্বিবাদী যে চেহারা সদ্য দেখে ফিরলাম, তাতে শুধু লজ্জিতই হয়েছি। কি ধারণাই না সে সব বিদেশিরা এ দেশ থেকে নিয়ে ফিরেছেন যারা সেই নষ্ট সময়ে এ দেশে লেখাপড়া করতে এসেছিলেন। তবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কিবা গুণ আছে জানি না। ভুটানের সদ্য নিযুক্ত অর্থমন্ত্রী ডা. তানডিন দর্জিও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজেরই গ্র্যাজুয়েট। শপথ গ্রহণের পর দেখা হতেই, ‘ভাই আমি কিন্তু এম ২৪ (ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৪তম ব্যাচের গ্র্যাজুয়েট)’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ভালো আছেন ডা. ফোব দর্জি। তিনিও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের গ্র্যাজুয়েট, ডা. তানডিনের ব্যাচমেট। কিছুদিন আগে ভুটানের সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ১৯ ভোটে হেরে গেছেন। ভুটানের বর্তমান শাসকদলের অন্যতম কর্ণধার। আছেন আরও একজন চিকিৎসকও। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের গ্র্যাজুয়েট না হলেও বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। ভুটানে যাওয়ার পর থেকে যার সঙ্গেই দেখা হয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শুনতেই হেসে জানতে চেয়েছেন ওখানে এমবিবিএস’র পাশাপাশি পলিটিক্যাল সাইন্সেও গ্র্যাজুয়েশন করানো হয় কি না। ডা. লোটে আর ডা. ফোব দর্জিও রসিক করে একই প্রসঙ্গ তুলতে ভুলেননি। বা গেলেন না এমনকি ভুটানের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রেসিডেন্ট (উপাচার্য) অধ্যাপক সেরিংও। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়ে আসার পর মাঝে কিছু দিন ডা. লোটের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ছিল। যোগাযোগটা আবার ঘনিষ্ঠ সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডি অব দ্য লিভারের সুবাদে। যদিও তিনি পেশায় সার্জন, অ্যান্ডোসকপি আর বিশেষ করে ইআরসিপিতে তিনি সিদ্ধহস্ত। ভুটানের একমাত্র ইআরসিপি বিশেষজ্ঞ আসলে তিনিই। আমার কাজের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্রটা এভাবেই। তার গ্রুপের কাজ করেন এমনি কারো কারো সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে কাজ করার সুবাদেও যোগাযোগটা আরও গাঢ় হয়েছে। সম্প্রতি নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডি অব দ্য লিভারের কনফারেন্সে সংগঠনটির জিএস নির্বাচিত হওয়ার পরও তার অভিন্নতা পেয়েছি। ডা. লোটে নির্বাচনে জিতেছেন। ভুটানের সংসদের ৪৭টি আসনের মধ্যে ৩০টির বেশিতে জিতে সংসদে তার দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়া আর মূলধারার মিডিয়াতেও এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। দেখেছি, পড়েছি আর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের আর দশজন গ্র্যাজুয়েটের মতই আমিও মনে মনে অত্যন্ত পুলকিত হয়েছি। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেয়ার ব্যাপারটা মাথায় ছিল না। দাওয়াত পাওয়ার পর অবশ্য দ্বিতীয় কোন চিন্তাই আর করিনি। দেশে-বিদেশে এই প্রথম কোন প্রধানমন্ত্রী শপথ অনুষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ। তার ওপর বাড়তি পাওয়া না দেখা ভুটান দর্শন। অতএব অন্য চিন্ত মাথায় আনার সুযোগই বা কোথায়? ভুটানের কালচারটা একটু অন্যরকম। রাজার কাছ থেকে দায়িত্ব পালনের অনুমতি পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আর যার যার নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ আর ভোটারদের আগে সাক্ষাৎ দেন। তারপর সুযোগ পান সাংসদরা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার মত যারা। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে কিঞ্চিত অপেক্ষ। অপেক্ষায় আরো আছেন ভুটানের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল। সদ্যই দায়িত্ব নিয়েছেন, এখনও সবকিছু ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেনি। এ দিকে বিশিষ্ট আগতরা প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায়। বেচারা বিব্রত হতেই পারেন। এ দিকে আলাপচারিতায় জমে উঠেছে দুই সাবেক মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে। তাদের কথায় প্রশংসা বাংলাদেশের, উচ্ছ্বাস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে। তাদের প্রত্যাশা তাদের এই নতুন, তরুণ প্রধানমন্ত্রী ভুটানকেও নিশ্চয় ‘বাংলাদেশ’ বানিয়ে ফেলবেন। ফুলতে ফুলতেই বুকটা শুধু ফাটতে বাকি থাকে। চোখের জল সংবরণ করা অসম্ভবপ্রায়! এর মধ্যেই হঠাৎ ডাক পড়লো আমাদের জন্য অপেক্ষায় নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আর দেখা হওয়ার পর তার আন্তরিকতায় আরো একবার চোখে পানির ধারা। প্রত্যাশা ছিল চিনবেন নিশ্চয়ই। তবে এতটা বেশি আন্তরিকভাবে আরো একবার যে কাছে টেনে নেবেন তা ছিল প্রত্যাশার বাইরে। এতটাই বেশি আন্তরিকতা প্রধানমন্ত্রীর যে আমার ছেলে সূর্য্যর প্রশ্ন, ‘ইনি-ই কি প্রধানমন্ত্রী নাকি’? একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রতি একজন প্রধানমন্ত্রী এত বেশি আন্তরিকতা ছোট্ট সূর্য্যকেও বিস্মিত করেছে। ভুটান থেকে যখন ফিরছি, বিমানে বসে দুটি অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন আমি। ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই গাঢ়। স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী রাষ্ট্র ভুটান। ৭১’র পর এই সম্পর্ক আরো উচ্চতর মার্গে টেনে তোলার এই বোধ করি শ্রেষ্ঠ সময়। দেশটির সরকার আর সরকারি দলের যারা কর্ণধার তারা বাংলায় কথা বলেন, বাংলাদেশকে ভেতর থেকে চেনেন আর সবচেয়ে বড় কথা প্রচণ্ড ভালোবাসেন। পাশাপাশি মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড সৌভাগ্যবান আমি। একজন প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে আশার সুযোগইবা এক জনমে কয়জন পায়? সেখানে আমি সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের মধ্যে যার সৌভাগ্য হয়েছে দেশে-বিদেশে দু’জন প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে আসার, যাদের একজন মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ আর অন্যজন শ্রেষ্ঠতম! লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

কেন রক্ত দান করবেন

মানবদেহের একটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে রক্ত। রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত রক্তের কোন বিকল্প আবিস্কার হয়নি। রক্তের অভাবে যখন কোন মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায় তখন অন্য একজন মানুষের দান করা রক্তই তার জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের এদেশে স্বেচ্ছা রক্তদাতার সংখ্যা খুবই কম। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় সাত লক্ষ ব্যাগ নিরাপদ ও সুস্থ রক্তের চাহিদা রয়েছে। এর  বিপরীতে মাত্র ২৬ ভাগ রক্ত সংগৃহীত হয় স্বেচ্ছা রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি ৭৪ ভাগ রক্তের জন্য রোগীরা ছুটে যায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ পরিচিতজনদের কাছে। সেখানেও ব্যর্থ হলে তারা পেশাদার রক্ত বিক্রেতার স্মরণাপন্ন হয়। এদের রক্ত নিরাপদ নয়। কারণ আত্মীয় ও পরিচিতজনের রক্ত অনেকে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ছাড়াই রোগীর শরীরে দিতে চায় যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের রক্ত আরো বিপজ্জনক। তাদের রক্ত ব্যবহারের ফলে রোগীর দেহে ঘাতকব্যাধির জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। এজন্য স্বেচ্ছা রক্তদাতার রক্তই সবচেয়ে নিরাপদ। বাংলাদেশের স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ে ২ হাজার সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, রেড ক্রিসেন্ট ও এসোসিয়েশন অব ভলান্টারী ব্লাড ডোনার্স, ওয়েস্ট বেঙ্গলে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় উক্ত সংস্থাগুলো তাদের জরিপ উপস্থাপন করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে মাত্র ০.৪ জন স্বেচ্ছায় রক্তদান করে। অথচ ইউরোপে প্রতি হাজারে স্বেচ্ছা রক্তদাতার সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০ জন। সুইজারল্যান্ডে এ সংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ১১৩ জন। অথচ বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে এ সংখ্যাকে প্রতি হাজারে মাত্র ২ জনে উন্নীত করতে পারলে বাংলাদেশের মোট রক্তের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। রক্তদানের বহুবিধ উপকারিতা রয়েছে। রক্তদান করার সাথে সাথে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয় এবং দান করার দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্ত কণিকা জন্ম হয়ে এ ঘাটতি পূরণ করে। বছরে তিনবার রক্তদান রক্তদাতার লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরে আয়রণের ভারসাম্য বজায় থাকে। ইংল্যান্ডের মেডিকেল পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদানকারী দুরারোগ্য রোগব্যাধি যেমন, ক্যান্সার, হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের মতো রোগের ঝুঁকি থেকে প্রায়ই মুক্ত থাকেন। রক্তের কোলেস্টরেল-এর উপস্থিতি কমিয়ে দেহের স্থুলতা কমাতে  সাহায্য করে। শরীরের বিপাকক্রিয়ায় অক্সিজেন ফ্রি রেডিকেল তৈরী হয়। এর জন্য আমরা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুড়িয়ে যাই। রক্তদানে এ কেমিক্যাল শরীর থেকে বেরিয়ে গিয়ে শরীরকে বিষ মুক্ত করে। ফলে বয়সের চাপ দেরীতে পড়ে। মুমূর্ষু মানুষকে রক্তদান করে মানসিক পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করা যায়। সর্বোপরি রক্তদান মানে নিজের ও পরিবারের দুঃসময়ের জন্য রক্ত সঞ্চয় করা। এছাড়াও প্রতিবছর সারাবিশ্বে ৩ লাখের ও বেশি নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। এদের মধ্যে ২৭ শতাংশ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত কারণে মৃত্যু হয়। অথচ সময়মতো নিরাপদ রক্ত সরবরাহ করতে পারলে মাতৃমৃত্যু রোধ করা যায়। নিয়মিত রক্তদান মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বর্গীয় আনন্দ। আঠারো থেকে ষাট বছর বয়সী প্রত্যেক সক্ষম নারী-পুরুষ প্রতি চার মাস পর রক্ত দান করতে পারে। রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুণ্য বা সওয়াবের কাজ। পবিত্র কুরআনে সূরা মায়েদা’য় বলা হয়েছে,‘‘যখন কেউ কোন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল’’। ঋগবেদে বলা হয়েছে,‘‘নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার  পুরস্কার। তারা লাভ করে আর্শীবাদধন্য দীর্ঘ জীবন ও অমরত্ব’’। আমাদের দেশে রক্তদান সর্ম্পকে জনমনে ভুল ধারণা, ভয়,অজ্ঞতা ও কুসংস্কার, পরিবারের সদস্যদের বাধা, সুযোগের অভাব, মোটা সূঁচ ভীতি, উদ্ধুদ্ধকরণের অভাব, নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনে সময়মতো রক্ত না পাওয়া, ডোনার কার্ড না পাওয়া, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব ইত্যাদি কারণে এদেশে স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলন প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অথচ প্রতিবেশি দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারী ব্লাড ডোনার্স পুরো ভারতের স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেশের স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনে শুরু থেকে এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে সন্ধানী, রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন, অরকাসহ আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা প্রয়োজনে তুলনায় অপ্রতুল। একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন দেশেই পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের রক্ত কেনা-বেচা হয় না। এ সুযোগে অনিরাপদ ও দূষিত রক্ত কেনাবেচার জন্য ঢাকাসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্লাড ব্যাংক বাণিজ্য। এ দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনে মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন ও উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। এর মাধ্যমে বন্ধ হবে রক্তের কেনা-বেচা। রক্তের অভাবে কোন মুমূর্ষু মানুষ মারা যাবে না, দূষিত রক্ত নিয়েও দূরারোগ্য ব্যাধিতে কাউকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না। তাই নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে আমাদের পরিপূর্ণ সুস্থ থাকা ও প্রাণবন্ত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে।  লেখক- মাসুদ আলম 

রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা

ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রাটা শুরু করতেই বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসেছে রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো কঠিন ও জটিল এক সমস্যা, যা আমাদের এগিয়ে চলার পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন পথে এর সমাধান আমরা তা খুঁজে পাচ্ছি না। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের এক সময়ে মনে হতো আমাদের বোধ হয় আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দেশটা হয়তো আরেকটি আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো ধর্মান্ধ উগ্রবাদী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি, খাদ্য পরিস্থিতির ক্রমাবনতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্ত রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলোর সমাধানের পথও রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সব কিছুতেই যেন একটা অচল ও স্থবির অবস্থা বিরাজ করছিল। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশাল আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন সরকারের শুরু হওয়া নতুন যাত্রাটিও কিন্তু তখন মসৃণ ছিল না। পিলখানার কলঙ্কজনক হত্যাযজ্ঞই তার প্রমাণ। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সাহস, দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা এবং ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিপক্ব কৌশলী নীতি বাংলাদেশের জন্য এগিয়ে যাওয়ার যাত্রাপথের দুয়ার খুলে দেয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জায়গায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটে। ১৯৪৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় সমস্যার অভূতপূর্ব সমাধান হয়ে যায়। অচিহ্নিত সীমান্ত যতখানি ছিল তারও চিহ্নিতকরণ চূড়ান্ত এবং স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক অর্জন বয়ে আনে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, তথ্য-প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব সূচক ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্বের তিনটি দ্রুত অর্থনৈতিক বর্ধনশীল দেশের একটি বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। এত আশাবাদের পরও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী সময়ে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে যা ঘটে চলেছে, তাতে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছে সব কিছু না জানি আবার কোনো মহাসংকটে পড়ে। এত দিনের অভিজ্ঞতাই বলে দেয়, রোহিঙ্গা সংকটকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক নিরাপত্তার কথায় আসা যাক। কক্সবাজার হচ্ছে বাংলাদেশের লাইফ লাইন এবং স্ট্র্যাটেজিক্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকের যে সংখ্যা তার থেকে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন সেখানে অবস্থান করছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করায় নিজেরাই একটা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাদের সহযোগিতা করে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত ক্ষমতাশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি। মানবপাচার, মাদকপাচার এবং অস্ত্র চোরাচালানের মতো কড়কড়ে কাঁচা টাকা উপার্জনের পথে রোহিঙ্গাদের সহজে ব্যবহার করতে পারে বিধায় ওই সব ক্ষমতাশালী দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়। এটা রাষ্ট্রের জন্য কত বড় ক্ষতিকর কাজ, সেটি ওই দুর্বৃত্তদের বোঝার মতো আক্কেল নেই, আর নয়তো জগেশঠের মতো টাকার বিনিময়ে দেশ বিক্রি হয়ে গেলেও সেটি তাদের ভ্রুক্ষেপে আসে না। আগের প্রায় চার লাখ এবং তার সঙ্গে ২০১৭ সালের পরে আসা আরো সাড়ে সাত লাখ—মোট সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার মতো একটা বিস্ফোরণোন্মুখ জনসংখ্যা কক্সবাজারের মতো জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থান করলে সেটি আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না, সে কথা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে। বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের রশি টানাটানিতে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা বিস্তারে কখন কী পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে কাজ করে তা সব সময় বুঝে ওঠা যায় না। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের লেগেসির দিকে তাকালে কোনো কিছুকেই সন্দেহবাদের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের এ সময়ের পরম স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু রাষ্ট্র চীনের ভূমিকা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব অনেক হাঁকডাক করলেও এত বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার পরও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অবরোধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না। আগামী ১০ বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ক্রুশিয়াল টাইম, সমৃদ্ধি অর্জনের এই সময়ে যদি এখন থেকে চার-পাঁচ বছরের মাথায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা কিশোর ও যুবকের একটি অংশও যদি ধর্মান্ধ উগ্র জঙ্গিবাদের খপ্পরে পড়ে, তাহলে তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কতখানি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে, সেটি সময় থাকতে ভাবা দরকার। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। এখন মিয়ানমারের কথায় আসা যাক। অনেক উসকানি সত্ত্বেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সব সামরিক শাসকের মতো মিয়ানমারের সামরিক গোষ্ঠীও নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে চায়, যাতে দেশের জনগণকে জুজুর ভয় দেখিয়ে তারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে পারে। জনগণকে বলতে পারে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় থাকা ও শক্তিশালী করা দরকার। এ রকম দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, মিয়ানমার সহজে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। সুতরাং রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে রকম নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আমরা পড়তে পারি, সেটি যাতে আমাদের অপার সম্ভাবনার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে তার জন্য বহুমুখী তৎপরতা ও পদক্ষেপ সময় থাকতে গ্রহণ করা উচিত। যেমন—এক. দীর্ঘ মেয়াদে এত বিশালসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসহ সব মানবিক চাহিদা পূরণ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে তো সম্ভবই নয়, এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যখন যা প্রয়োজন এমন বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনায় চালিয়ে নেওয়া যাবে না। তাই ফিলিস্তিনে শরণার্থীদের জন্য যেমন জাতিসংঘ রিলিফ ওয়ার্ক এজেন্সি (UNRWA) স্থায়ীভাবে গঠন করা হয়েছে, তেমন একটা স্থায়ী আন্তর্জাতিক সংস্থা বা এজেন্সি গঠন করা উচিত, যাতে এই রোহিঙ্গাদের সব মানবিক দায়িত্ব ওই সংস্থা পালন করতে পারে। দুই. কক্সবাজার থেকে এত বিশাল রোহিঙ্গা জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য ভাষাণ চরের মতো দেশের অন্যান্য জেলায় আরো প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্যাম্প তৈরি করে দ্রুত সেসব স্থানে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া উচিত। দেশি-বিদেশি কিছু সুবিধাবাদী এনজিও এবং ধর্মীয় কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে তারা অন্যত্র স্থাপিত নতুন ক্যাম্পে না যায়। তিন. যত দিন পর্যন্ত নতুন ক্যাম্পে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না, তত দিন বর্তমান ক্যাম্পগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা একটা বিশেষ টাস্কফোর্সের আওতায় রাখা হলে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর একটা শঙ্কামুক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো। ১৩ এপ্রিল বহুল প্রচারিত একটি সহযোগী দৈনিকে সচিত্র প্রতিবেদনসহ প্রধান শিরোনাম ছিল—রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গ্রুপ। খুনাখুনি, অপহরণ, গুম, লুটপাটসহ নানা জঘন্য অপরাধজনক ঘটনা লেগেই আছে। তারা নিজেরাই খুনাখুনির ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং তাতে এ পর্যন্ত লাশ পড়েছে ৩০টি। জঙ্গি সংগঠন আল ইয়াকিন ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামের জঙ্গিদের তৎপরতার কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এগুলোর সবই জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অশুভ সংবাদ। এসবের দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্যই ক্যাম্পগুলোর ওপর অধিকতর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। চার. মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের স্থল, নৌ এবং উপকূলীয় সীমান্তের নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ মিয়ানমার থেকে সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ইয়াবা, অস্ত্র চোরাচালান এবং মানবপাচার আমাদের অভ্যন্তরীণ জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। স্থলভাগে এখনো যেখানে নেই, সেখানে বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) স্থাপন এবং সীমান্তের সমান্তরাল পাকা সড়ক নির্মিত হলে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা সহজ হবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় গেটওয়ে সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে সম্প্রতি আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েনের কাজটি অত্যন্ত সঠিক হয়েছে। কেন এত দিন সেখানে বিজিবি মোতায়েন ছিল না, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। অন্যান্য সীমান্তের মতো সেন্ট মার্টিনসও আমাদের সীমান্তের ভূখণ্ড। সেখানে যথাযথভাবে আমাদের সীমান্ত বাহিনী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা বা উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। উপসংহারে এসে বলতে হয়, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বিষফোঁড়াস্বরূপ। এটি যাতে আমাদের শরীরে পচন ধরাতে না পারে তার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক sikder52@gmail.com

বাংলা বর্ষবরণ আমাদের কালে

জয়তু ১৪২৬। নতুন বছরের পহেলা বৈশাখ এসেছে আমাদের দোরগোড়ায়। জানি, বাংলাদেশের আনাচ-কানাচ রঙ আর রেখায় ভরে গেছে। রঙ উঠে এসেছে মেয়েদের শাড়িতে, ছেলেদের পাঞ্জাবিতে, নানান ফুলের সমাহারে, তোরণের বর্ণচ্ছটায়। রেখা তার স্থান করে নিয়েছে আলপনায়, দেয়ালে, প্রতিচিত্রে। ওই তো দেখতে পাই আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা সারা রাত জেগে ঢাকার রাস্তায় আলপনা এঁকেছে, দেয়ালচিত্র শেষ করেছে, নানান রঙের আর ঢঙের মুখোশ বানিয়েছে, রঙিন কাগজের প্রতিমূর্তি গড়েছে প্রভাতের শোভাযাত্রার জন্য। কী উন্মাদনা, কী উৎসাহ চারদিকে—আনন্দ, স্ফূর্তি আর উৎসবের আমেজ আকাশে-বাতাসে। আজ বরণ করে নেয়া হয়েছে নতুন বছরকে প্রীতি-সম্ভাষণে, গানে, আমোদে আর মুখরোচক খাদ্যে। সব শহরের মতো ঢাকা শহরেও মেলা বসেছে নানান জায়গায়, রমনার বটমূলে বসেছে গানের আসর, চিরায়ত বাঙালি খাবার উঠে এসেছে আমাদের রসনায়। নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো, শিশুদের কলকাকলিতে ঘন হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। কিন্তু এসব চালচিত্র পেরিয়ে মন কখন যেন চলে যায় অনেক দূরে, প্রায় ৬০ বছর আগে। ছবির মতো বরিশাল শহরের বেশির ভাগ ভবনই ছিল লাল সুরকির। ব্রজমোহন কলেজসংলগ্ন আমাদের দোতলা কাঠের বাড়ির ধার ঘেঁষে যে পথটি চলে গেছে, তা শহর পেরিয়ে কাশীপুর হয়ে চলে গেছে। ওই পথ ধরেই বাস যেত রহমতপুর, ভূরঘাটা, গৌরনদী, চাখার আরো কত জায়গায়। যতবার বাস যেত, ততবারই একটি লাল ধুলোর ঘূর্ণি উঠত রাস্তার ওপর ক্ষণিকের জন্য। তারপর তা মিলিয়ে যেত। কিন্তু একদিন সেই লাল ধুলোর ঘূর্ণি ঘন হয়ে বসে যেত বাতাসে এবং সেটা ওই পহেলা বৈশাখেই। সারা বরিশাল শহরের মানুষ ওই পথ ধরে রওনা হতো পশ্চিমে বেলা ৩টায় শুরু হওয়া কাশীপুরের বৈশাখী মেলার দিকে। রিকশায়, সাইকেলে, পদব্রজে লোকের যাত্রা শুরু হয়ে যেত সেই দুপুর ১২টা থেকেই। সে জনস্রোতের একটা বিরাট অংশই ছিল শিশুরা, ওই যে মেলার মাটির পুতুলের জন্য। গরুর ক্ষুরের সৃষ্ট ধূলি থেকে ‘গোধূলি’ শব্দটি এসেছে, কিন্তু আমাদের বরিশালে পহেলা বৈশাখে হেঁটে চলা পায়ে পায়ে যে মনুষ্যধূলির সৃষ্টি হতো, তার কাছে গোধূলি তো নস্যি। বেশ মনে আছে, ছোটবেলায় বড় কারো হাত ধরে আমরা দুই ভাই-বোন প্রতি বছরই যেতাম সেই বৈশাখী মেলায়। বাবা না যেতে পারলেও পাঠিয়ে দিতেন বড় কারো সঙ্গে। আমাদের দুজনের হাতে দেয়া হতো একটি করে টাকা পুতুল বা যা খুশি তা কেনার জন্য। সেই সঙ্গে মিলত মাটির বটুয়ায় জমানো আমাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয়। মায়ের নিষেধাজ্ঞা ছিল বাইরের খাবার না কেনার জন্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মেলার ধূলিমিশ্রিত নকুল দানা কিংবা চৌকো করে কাটা তিলের খাজা অথবা ঝুরঝুরে ঝুরিভাজার স্বর্গীয় স্বাদ কি ঘরের বানানো খাবারে হয়? সুতরাং মায়ের নিষেধাজ্ঞা তত্ত্বেই থাকত, বাস্তবে নয়। মেলায় গিয়ে পড়তে হতো এক কঠিন সমস্যায়। এত সব সুন্দর মাটির পুতুল-ঘোড়া, বর-বউ, গরু, হাতি, পাখি—কোনটা ছেড়ে কোনটা নিই। পোড়ামাটির ওপর সুন্দর উজ্জ্বল রঙের চোখ-মুখ আঁকা ওইসব পুতুলের দিকে তৃষিত নয়নে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো দুহাতে আঁকড়ে ধরে সব পুতুল নিয়ে নিই, কিন্তু সাধ আর সাধ্যে যে বিরাট ফারাক। তারই মধ্যে ছোট্ট মাথা খাটিয়ে পছন্দ করতাম কিছু পুতুল। কুমোরেরা যখন তাদের ডালি থেকে পুতুলগুলো আমাদের কচি হাতে তুলে দিতেন, তখন মনে হতো হাতে স্বর্গ পাওয়া গেল। বাড়ি ফিরে সেই সব ঘোড়া, হাতি আর পাখিকে উল্টেপাল্টে কতবার যে দেখা হতো! রাতে ঘুমোনো হতো ওইসব পুতুলকে বালিশের পাশে সাজিয়ে। দুটি ঘটনার কথা মনে আছে। একবার নিজের সঞ্চয় থেকে মায়ের জন্য একটা শিশু কোলে মা-পুতুল নিয়ে এসেছিলাম। সেদিন মায়ের মুখে যে খুশির আভা দেখেছিলাম, তা কখনো ভুলব না। আর একবার আমার হাত থেকে আমার ঘোড়া পুতুলটা ভেঙে গিয়েছিল। আমার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বোন তার ঘোড়াটা আমাকে দিয়ে দিয়েছিল। তার মূল্য তখন হয়তো বুঝিনি, আজ বুঝি। সন্ধ্যের দিকে আবার শুরু হতো আরেক পালা—হালখাতা। বাবা আমাকে নিয়ে বেরুতেন মাখন কাকা আর হারাধন জেঠার বইয়ের দোকানে, জহুর চাচার কাপড়ের প্রতিষ্ঠান চিটাগং বস্ত্রালয়ে, অশ্বিনীদার কাঠের কারখানায়। সুবেশ বিপণি মালিকরা আমাদের যত্ন করে বসাতেন, সুস্বাদু সব খাবার আসত। তাকিয়ে দেখতাম লাল রঙের নতুন হালখাতা। যতদূর মনে পড়ে, বাবা একটা টাকা প্রতীকী হিসেবে তাদের হাতে তুলে দিতেন। সেইসব কর্মকাণ্ডে আমার যে কী যত্ন-আত্তি! কাকা-দাদারা হাঁক দিচ্ছেন তাদের কর্মচারীদের গরম গরম রসালো মিষ্টান্ন আনার জন্য, পরম যত্নে তুলে দিচ্ছেন আমার পাতে, জোর করছেন এটা-ওটা খাওয়ার জন্য। তারই ফাঁকে ফাঁকে বাবার কাছে আশীর্বাদ চাইছেন, যাতে সারা বছরটা ভালো যায়। খাওয়া শেষে পিতলের ঘটি-গ্লাসে জল আসত, বাবা একটি পান তুলে নিতেন হাতে, বিপণি মালিকরা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। কিন্তু সবসময় যা আমার দৃষ্টি কাড়ত, তা হচ্ছে ওই হালখাতা। সাদা সুতোয় বাঁধা লাল খাতাটা এলিয়ে থাকত টাকা-পয়সার বাক্সের পাশে। অদূরেই পিতলের ঘটিতে জলে পাঁচটি আমপাতা মুখ উঁচিয়ে থাকত। তার পাশেই কলম আর দোয়াত হিসাব লেখার জন্য। আমি প্রায়ই ওই লাল খাতার ওপর হাত বুলোতাম। লাল সালুর ওই খাতাটি দেখতে দেখতে কেমন যেন ঘোর লেগে যেত। তারপর সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসত। বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নেমে চোখে পড়ত পাশের বাড়ির বন্দনা মাসিমা তাদের উঠোনের মাঝখানে তুলসীতলায় দাঁড়িয়ে। সামনে মাটির প্রদীপ জ্বলছে আর তার আভায় সিঁদুর রাঙা সিঁথি আর জ্বলজ্বলে টিপে মাসিমাকে দেবীর মতো মনে হতো। তার গলায় জড়ানো লাল-সাদা শাড়ির আঁচলে আর তার নিমগ্নতায় কী যে সুন্দর লাগত তাকে। বাবা খুব নরম করে বলতেন, ‘যাও, মাসিকে প্রণাম করে এসো।’ আমি তাদের উঠোনের দিকে যেতে যেতে মনে হতো কাল রাতে আমার ঘরের জানালা থেকে দেখেছি, বন্দনা মাসি তাদের তুলসীতলা নিকিয়েছেন, বারান্দায় আলপনা এঁকেছেন চালের গুঁড়োর, মঙ্গলঘট বসিয়েছেন সিঁড়ির দুধারে। আজ খুব ভোরে ঘুমচোখে দেখেছি, তাদের বাড়ির পেছনের ছোট্ট পুকুরটা এক ডুবে পার হয়ে ওপাড়ে ছোট্ট আম গাছটা থেকে দুটি কচি আম তুলে আবার এক ডুবে ফিরে এসেছেন এ পাড়ের ঘাটে। আমার পায়ের সাড়া পেয়ে বন্দনা মাসির তন্ময়তা ভেঙে যেত। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন, ‘কি রে, বাবার সঙ্গে গিয়ে পেট পূজা সেরে এলি?’ আমি কিছু না বলে বন্দনা মাসিমার পায়ের কাছে প্রণত হই। টের পেতাম মাসিমার স্নেহময় হাত আমার পিঠে। আজ মনে হয়, ওই আশীর্বাদ, ওই মমতা আর মায়াই তো ঘিরে রেখেছে আমাকে, শুধু বছরের প্রথম দিনে নয়, সারা বছর এবং সারা জীবনও বটে।   লেখক: ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

নূরুল হক কতদূর যাবেন?

মানুষ অভিজ্ঞতার আলোকে কথা বলে। ডাকসুর নির্বাচন ও নেতৃত্ব নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। সে কথায় যেমন আশা আছে, তেমনি আছে আশঙ্কা। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের ভূমিকা জনগণের মধ্যে আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। ডাকসু নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসে তখন সেই আশার প্রতিফলন তথা আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা দেখতে চায় সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সবাই আশঙ্কা করছিল জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়বে ডাকসু নির্বাচনে। তাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। শেষ রক্ষা হিসেবে ডাকসু ভিপিসহ আরও কয়েকটি হলে ক্ষমতাসীন দলের বিরোধী নেতৃত্ব হওয়ায় মানুষ তা ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে মেনে নেয়। দ্বিধাদ্বন্দ্ব অতিক্রম করে অবশেষে ভিপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন নূরুল হক এবং অন্যরা। তখন ক্ষমতাসীন দলের অনুগামীরা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও এক মাস যেতে না যেতেই তার ব্যতিক্রম ঘটে। এ মাসের প্রথম দিকে ভিপি নূরুল হক এসএম হলে গেলে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়। এ সময়ে সম্ভবত নূরুল হককে অসম্ভব দ্বিমুখী চাপের মোকাবেলা করে পথ চলতে হচ্ছে। নেতৃত্ব সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তবে ম্যাক্সওয়েলের সংজ্ঞাটিকে সবাই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এ লিডার ইজ ওয়ান হু নোজ দি ওয়ে, গোজ দি ওয়ে, অ্যান্ড শোজ দি ওয়ে’। সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ণীত হয় অনেকটা নেতৃত্বের গুণে। সততা, স্বচ্ছতা, আত্মবিশ্বাস, উদ্দীপ্ত করার ক্ষমতা, দৃঢ়তা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা ইত্যাদি হচ্ছে- নেতৃত্বের গতানুগতিক গুণাবলি। একজন নেতার ভালো গুণ হচ্ছে তিনি পরিস্থিতিকে সতর্কতা, দায়িত্ববোধ ও দূরদৃষ্টি দ্বারা পরিচালনা করেন। ব্যর্থতা, শত প্রতিকূলতা ও অনেক প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে যখন নেতা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছান- তখন নেতৃত্বের সফলতা প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে ব্যক্তি যখন অন্যায়, অনাচার, নিপীড়ন, নির্যাতনকে সহ্য করে, ধারণ করে অকুতোভয়ে এগিয়ে যান তখন স্বাভাবিকভাবেই জনগণ বা তার নিজস্ব পরিমণ্ডল তার পক্ষে দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো কাজ করে। বিজ্ঞজনরা নেতার এ গুণকে একটি শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করেন, আর তা হচ্ছে ‘স্ট্রেসর’। বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে, চাপ ধারণ করার ক্ষমতা, কষ্টকর এবং বিপদের সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। এসব কথা প্রযোজ্য হতে পারে সাধারণ ঘরের অসাধারণ সন্তান ডাকসু ভিপি নূরুল হক নূর সম্পর্কে। ইতিমধ্যে সরকারি দলের চাপ এবং বিরোধী দলের আশার মাঝে তাকে সমন্বয় করতে হচ্ছে। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যদি পরিবেশের কোনো মূল্য থাকে, তা নূরুল হকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সাগর সৈকতে তার জন্ম। পটুয়াখালীর সুদূর চরবিশ্বাসে তার বাড়ি। তাব বাড়ির অদূরে আগুনমুখা নদী। ওই এলাকার মানুষের স্বভাব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য গড়নে আগুনমুখা তথা প্রকৃতির রুদ্র রোষের প্রভাব রয়েছে। মধ্য যুগের সমাজতত্ত্ববিদ ইবনে খলদুন তার ‘আল মুকাদ্দীমা’য় ভৌগোলিক প্রভাবের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। হয়তো নূরুল হকের মানস গঠনে ওই প্রভাব ক্রিয়াশীল হয়ে থাকবে। আমার বাড়িও ওর বাড়ির কাছাকাছি। ওর সঙ্গে দেখা হয়নি কখনও। কোটা আন্দোলনের আগে ওর নামও শুনিনি। হতদরিদ্র না হলেও গরিব পরিবারই বলা যায়। দারিদ্র্য মানুষকে মহৎ করে- একথা একমাত্র কবিরাই বলতে পারেন। আর মার্কস বলেন, ‘দারিদ্র্য মানুষকে সংগ্রামশীল করে তোলে।’ নূরুল হকের ব্যাপারে একথাও হয়তো সত্য। তবে সে স্বপ্ন দেখতে পারত। তার শৈশবের লেখাপড়া ওই চরেই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। সংশ্লিষ্ট হন ছাত্রলীগের সঙ্গে। তিনি ছিলেন মুহসীন হল ছাত্রলীগের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক উপসম্পাদক; ছাত্রলীগ অবশ্য তাকে শিবির বানানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে তার স্পষ্টবাদিতা, সাহস ও দৃঢ়তা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একই সময়ে ছাত্রলীগের একাধিক হামলার শিকার হন তিনি। হামলা ও মামলার মধ্য দিয়ে প্রথম সারির নেতায় পরিণত হন নূরুল হক। গত বছরের ৩০ জুন ছাত্রলীগের বেদম মার খেয়ে বাঁচার আকুতি জানান এক শিক্ষকের কাছে। তার সেই আকুতি ভরা ছবি সারা দেশে বিবেকবান মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে। আন্দোলনের তীব্রতার মুখে প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালে ঘোষণাটি আনুষ্ঠানিকতা না পাওয়ায় আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি সরকার। তাদের পেটোয়া বাহিনী বার কয়েক আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করে। সেসব আক্রমণ থেকেও রেহাই পায়নি নূরুল হক। আন্দোলন থেমে থাকেনি। সরকার তার গদি রক্ষার কৌশল হিসেবে গত বছরের ৪ অক্টোবর কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। আন্দোলনের সফলতায় হিরো বনে যান বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নেতারা। সেক্ষেত্রে নূরুল হকের সঙ্গে ছিলেন মোহম্মদ রাশেদ খান, ফারুক হোসেন প্রমুখ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছিলেন যে, এই পরিষদ যেহেতু আন্দোলন করে সফল হয়েছে, সেহেতু সাধারণ ছাত্রদের অকুণ্ঠ ও একরকম নিরঙ্কুশ সমর্থন এদের প্রতি অব্যাহত থাকবে। ডাকসু নির্বাচন যখন ঘোষিত হল তখন এ ধারণা দৃঢ়তা পায় যে নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয় তাহলে এদের বিজয় অনিবার্য। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলও তার প্রমাণ দেয়; যা ঘটেছে সবাই তা জানেন। নূরুল হকের বিজয় এ পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর! এর মানে হল নূরুল হকের জনপ্রিয়তা ও প্রাধান্য এতটাই প্রবল ছিল যে সেখানে সরকারি দলের কারসাজি কাজে আসেনি। ডাকসুতে ভিপি পদে নূরুল হকের বিজয় একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সরকারি দল কোনোক্রমেই তার বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি। নির্বাচিত হওয়ার পরদিন যখন তিনি ক্যাম্পাসে আসেন ছাত্রলীগ তাকে অপমান-অপদস্ত করেছে। কিন্তু যখন ‘উপরের নির্দেশ’ এসেছে তখন ভবিষ্যতে সবকিছু হারানোর চেয়ে তারা নূরুল হককে মেনে নেয়াকেই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে। নূরুল হক যদি নির্বাচিত না হতো তাহলে চলমান ডাকসু নির্বাচন বাতিলের আন্দোলনের সাফল্যের শতভাগ নিশ্চয়তা সম্ভব ছিল। এখন ডাকসু সহসভাপতি ও আরেকটি পদে অর্থাৎ ২৫ পদের মধ্যে দুটি পদে নির্বাচনের ফলে সরকারি দল আইনগত ভিত্তি পেয়েছে। এটি ব্যক্তি হিসেবে নূরুল হকের অবস্থানকেও নড়বড়ে করেছে। ছাত্রলীগের কোলাকুলির পর পদ গ্রহণের আগ্রহ এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা নূরুল হককে তার সঙ্গীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। চাপের মুখে নূরুল হক সমগ্র নির্বাচন বাতিল আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। অবশ্য মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার কারণে ছাত্রলীগের সামনেই তিনি বলতে পারেন যে, ‘ক্ষমতাসীনরা যখন সুবিধাজনক মনে করে, আমাদের লাগে, তখন বুকে টেনে নেয়। আবার যখন মনে করে আমরা শত্রু তখন মার দেয়।’ একপর্যায়ে নূরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ভিপির দায়িত্ব নেবেন এবং সবার সঙ্গে মাঠে থেকে ভবিষ্যৎ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। নূরুল হক তার কর্মধারার মাধ্যমে গত এক মাসে তার প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রেখেছেন। তবে ক্ষমতার বাস্তবতাও তাকে মেনে নিতে হয়। ১৬ মার্চ বিকালে গণভবনে তাদের সঙ্গে চা চক্রে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে এ অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক যোগদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মায়ের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছেন ভিপি নূরুল হক। শেখ হাসিনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন তিনি। এসময় তিনি ভিপি নূরুল হকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। গণভবনে যাওয়ার আগে নূরুল হক বলেছিলেন তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তার সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তিনি তা করেছিলেন কিনা তা জানা যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তিনি যে সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন তা বাংলাদেশের কালচারে স্বাভাবিক। পুনরায় ডাকসু নির্বাচনের জন্য যে আন্দোলন সূচিত হয়েছিল, প্রোভিসির আশ্বাস এবং ছাত্রছাত্রীদের অনশন ভঙ্গের মাধ্যমে আপাতত তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে বিশ্বাস করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নূরুল হকের দৃশ্যমান শুভেচ্ছা এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেছিলেন। এমনকি তার সংগ্রামী সঙ্গীরাও হয়তো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কিন্তু নুরুল হক ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আন্দোলনের সঙ্গী থেকে যান। তার এসএম হলে যাওয়া তারই প্রমাণ বহন করে। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ ১ এপ্রিল এসএম হলে এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। হল সংসদের নির্বাচনে জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ফরিদ হাসান। এর জের ধরে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাকে মারধর করে। এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষের কাছে অভিযোগপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন নূরুল হক নূর। তাকে ও ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদককে প্রায় ২ ঘণ্টা আটকে রাখে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। পরে প্রাধ্যক্ষের সহায়তায় তারা বেরিয়ে এলেও তাদের ওপর ডিম ছুড়ে মারা হয়। হল প্রাধ্যক্ষের গায়েও ডিম ছোড়া হয়েছে। হামলা হয়েছে হলের গেটে অবস্থানরত বিরোধী ছাত্রনেতাদের ওপর। ঘটনার প্রতিবাদে নূরুল হক নূরের নেতৃত্বে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি প্রফেসর মো. আক্তারুজ্জামান বিচারের আশ্বাস দিলে তারা অবস্থান ধর্মঘট স্থগিত করেন। ইতিমধ্যে হলের আবাসিক শিক্ষক প্রফেসর সাব্বির আহমেদকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ভিপি নূরুল হক এবং আন্দোলনকারীরা কর্তৃপক্ষকে আলটিমেটাম দেন। ওই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ফের আন্দোলন কর্মসূচিতে যাবেন তারা- এ ঘোষণাও দেন। এদিকে ভিপির ওপর ডিম নিক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন। তবে তিনি বলেন, ডিম ছোড়া আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একটি নীতিগর্হিত ও শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করার কারণে ডাকসুর ভিপিকে এমন অবমাননাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি এসএম হলে ছাত্রীদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার অভিযোগকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেন। তিনি আরও বলেন, এসব বলে ছাত্রলীগের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি ভিপি নূরুল হকের সমালোচনা করে বলেন, তিনি নৈরাজ্যবাদীদের মতো মিছিল নিয়ে গেছেন, ডাকসু ভিপি পদটির ধারাবাহিক অবমাননা করছেন এবং এর ঐতিহ্যবাহী গুরুত্বকে হাস্যকর করে তুলছেন। এর আগে শপথগ্রহণের পরের মিঠেকথা ভুলে ভিপিকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ছাত্রলীগ। এসব আলামত থেকে বোঝাই যায়, সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা মুখে বললেও কার্যত তার বিপরীতটি হচ্ছে এবং করবে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। নূরুল হক নূরের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ডাকসু বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার বলে পরিচিত। বিগত তিন দশকে এ পরিচয়ে মরিচা ধরেছে। সব শাসক এ থেকে আন্দোলনের শঙ্কায় থেকেছে। তাই জাতীয় নির্বাচনের আদলে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে যদি সত্যি সত্যি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো তাহলে বর্তমান ফলাফলের উল্টোটাই ঘটত। এক নূরুল হককে সামলানোর জন্য সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছে। গণভবন, এসএম হল-পরবর্তী ঘটনাবলি এবং নূরুল হকের নেতৃত্বের গুণাবলি ও দোষাবলির ওপর নির্ভর করবে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ। ডাকসুর ভিপি আওয়াজটিই আলাদা। যেহেতু তার সঙ্গে সাধারণ ছাত্রসমাজ রয়েছে, সুতরাং আশা করা অন্যায় নয় যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নূরুল হকের ভিপি পদ একটি ভূমিকা রাখবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নৈতিকভাবে নূরুল হকের দিকেই রয়েছে। তাদের আশায় গুড়েবালি পড়তে পারে যদি নূরুল সুবিধাবাদী চরিত্র গ্রহণ করে। বাংলাদেশের বড় বড় নেতার ক্ষেত্রে বিশ্বাসভঙ্গের কারণ ঘটেছে। নূরুল হক যদি তা করেন তাহলে তিনি অনেক সম্পদ ও সুখের মালিক হতে পারবেন বটে, তবে এর বিনিময়ে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসার সম্পদ তিনি নিশ্চিতভাবেই হারাবেন। নূরুল হক নিকট অতীতে দেখিয়েছেন, ‘চলতে চলতে মার খাবে, মচকাবে কিন্তু ভাঙবে না’- এটাই জনগণের প্রত্যাশা। ড. আবদুল লতিফ মাসুম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

যা হয়েছে ভাল হয়নি যা হচ্ছে ভাল হচ্ছে না

(এক) নুসরাত জাহান রাফি মারা গেছেন। নিজের সহপাঠীদের দেওয়া আগুনে পোড়া মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো। এই মুহুর্তে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে তার একটি হলো ফেনী`র একটি মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত নিজ সহপাঠীদের হাতে অগ্নিদ্গ্ধ হওয়ার ঘটনা। যে ঘটনার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন একই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। পুলিশ ইতোমধ্যে সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে রিমাণ্ডে নিয়েছে। সারাদেশে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে ঝড় উঠলেও ঐ মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত সিরাদ উদ দৌলা`র মুক্তির দাবিতে মিছিল করতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারও কারও ইন্ধন থাকতে পারে। অন্যদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি মক্তবের সিঁড়ির নিচ থেকে মনির নামে এক শিশুর জবাই করা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার দিন সকালে মনির আরবী পড়তে গেলেও আর বাসায় ফেরেনি। পরক্ষণে মনিরের মায়ের মোবাইলে ফোন করে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। মনিরের মা অনেক কষ্টে একলাখ বিশ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিলেও নিজের বুকের ধনকে আর ফেরত পান নি। পরে পুলিশ ঐ মসজিদের ইমামকে গ্রেফতার করলে ইমাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে। উভয় ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাণের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের আবেগ ও শ্রদ্ধার বড় জায়গা থেকে এমন ঘটনা ঘটানোয় স্বাভাবিক ভাবেই ধাক্কা খেয়েছে দেশবাসি। তারা একদিকে যেমন অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ফুঁসে উঠেছে তেমনি এটাও আশঙ্কা করছে, অতীতের বিভিন্ন ঘটনার ন্যায় এবারো প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাবে অন্যায়কারীরা। এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়। সব সময় ঘটছে, ঘটে আসছে। কিন্তু নতুন ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় পুরনো ঘটনা। এবারো তার পুণরাবৃত্তি হবে না তো? (দুই) তৌকির আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র `জয়যাত্রা`। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটির একটি অন্যতম চরিত্রে অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত। যুদ্ধকালীন নানা ঘটনায় তিনি অন্যদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য গীতার সারাংশ আওড়ান। বলেন, "যা হয়েছে তা ভালই হয়েছে, যা হচ্ছে তা ভালই হচ্ছে, যা হবে তাও ভালই হবে। তোমার কি হারিয়েছে- যে তুমি কাঁদছো? তুমি কি নিয়ে এসেছিলে- যা তুমি হারিয়েছো? তুমি কি সৃষ্টি করেছো- যা নষ্ট হয়ে গেছে? তুমি যা নিয়েছো, এখান থেকেই নিয়েছো। যা দিয়েছো, এখানেই দিয়েছো। তোমার আজ যা আছে, কাল তা অন্য কারো ছিল। পরশু সেটা অন্য কারো হয়ে যাবে। পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।" কিন্তু ঘটনার একপর্যায়ে আবুল হায়াতের আপন নাতি মারা যায়। তিনি নিজেই যখন পরিস্থিতির শিকার হন, তখন তিনি বলেন, "যা হয়েছে তা ভাল হয়নি, যা হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না, যা হবে তা ভাল হবে না"। অর্থাৎ, আমরা পরিস্থিতি তখনই অনুধাবন করতে পারি যখন আমি-আমরা নিজেরা ঘটনার শিকার হই। (তিন) জনপ্রিয় বলিউড সিনেমা থ্রি ইডিয়টস। সেখানে আমীর খান প্রায় একটি সংলাপ দেন। সংলাপটি হলো, all is well. সিনেমায় উচ্চারণটি করা হয় "আল ইজ ওয়েল"। বুকে হাত দিয়ে " আল ইজ ওয়েল" বলে ধরে নেওয়া হয় সব ঠিক আছে। কোথাও কিছু হয় নি, কোথাও কিছু হচ্ছে না। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। (চার) ফেনী`র নুসরাত যখন নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের শরীরের আশি ভাগ আগুনে পুড়িয়ে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে তখন আমরা ভাবি, " যা হয়েছে ভালই হয়েছে, যা হচ্ছে ভালই হচ্ছে, যা হবে ভালই হবে"। ছোট শিশু যখন সকালে মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে গিয়ে শিক্ষকরূপী হায়েনার হাতে প্রাণ হারায়, তখনো আমরা নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলি, " all is well", "all is well". আমাদের বোধ হবে তখন যখন ঘটনা এসে আমার বা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে। জয়যাত্রা ছবিতে আবুল হায়াত বিলাপ করে বলেন, " যা হয়েছে ভাল হয়নি, যা হচ্ছে ভাল হচ্ছে না, যা হবে তা ভাল হবে না"। তবে ততোক্ষণে সব শেষ। সেই ধাক্কা শেষ পর্যন্ত তিনি সামলাতে পারেন না। এই বোধ আমাদেরও হবে তবে তখন কিছুই করার থাকবে না। আমরা ঠিকই ঘুরে দাঁড়াব। তবে তার আগে নুসরাতের মতো আমাকে আপনাকেও অগ্নিদগ্ধ হতে হবে। যাত্রাবাড়ীর সেই শিশুটি, যে মক্তবে পড়তে গিয়ে লাশ হয়- তার স্বজনদের জায়গায় নিজেকে দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাঙ্গালী তখনই ঘুরে দাঁড়ায় যখন তার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়। তখন আমরা all is well (আল ইজ ওয়েল) বলি না, বলব না। এসি  

মানুষ শুদ্ধ না হলে কাঠামো পরিবর্তন বৃথা

আগামী প্রজন্ম নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক পরামর্শমূলক সভার আয়োজন করে দুদক। তরুণ ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে এসেছিল। তারা নিঃশঙ্ক চিত্তে দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করেছে। তাদের একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত আরা বৃষ্টি। বলিষ্ঠতার সঙ্গে সে বলেছে, কীভাবে মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী চেতনা তৈরি করা যায়, সে বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। অফিসগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর আলোকপাত করে সে জানায়, এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যার কারণে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারবে না। বৃষ্টির প্রস্তাবিত কাঠামোগত পরিবর্তন কিংবা সিস্টেম পরিবর্তনের পরও তার সুফল পাওয়া এত সহজ নয়। কারণ এর পশ্চাতে থাকে যে মানুষ, সে মানুষটি সৎ ও শুদ্ধ না হলে সিস্টেম অকার্যকর হয়ে যায়। বহু প্রতিষ্ঠানে এভাবে পদ্ধতিগত সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু যেসব মানুষ এসব সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা হয় অদক্ষতায় ব্যর্থ হয়েছেন অথবা দুর্নীতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছেন। ফলে দুর্নীতিমুক্ত চেতনা সৃষ্টির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারছি না। একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ডেসা নামক এক বিশাল প্রতিষ্ঠান ছিল, যার মূল দায়িত্ব ছিল সমগ্র ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ বিতরণ করা। ওই প্রতিষ্ঠানে বল্কগ্দাহীন দুর্নীতি বন্ধে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যার নাম ছিল কাঠামোগত সংস্কার। এর আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ডেসা ভেঙে সৃষ্টি করা হলো কোম্পানির আদলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (ঝঅচ)-এর আওতায় এটি ছিল বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ফলে এসব কোম্পানিতে সুশাসনের ঢেউ লেগেছিল। কোম্পানির বেতন-ভাতা হয়ে গেল দ্বিগুণ-তিন গুণ। করপোরেট স্টাইলে অফিস সুসজ্জিত হলো, আইএসও সনদ পেল। এর পরই সৃষ্টি হলো দুর্নীতির ডালপালা। সুতরাং কাঠামোগত পরিবর্তন হলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না। কাঠামোর ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্তরাই কাঠামো অকার্যকর করে দেয়। আরও দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে চালু হলো অটো সিগন্যাল সিস্টেম। কিন্তু তা আবার ম্যানুয়েলে ফিরে গেছে। কারণ অটো সিগন্যাল বহাল রেখে ১০ মিনিটের জন্য ঢাকা শহর থেকে ট্রাফিক পুলিশ রাস্তা থেকে তুলে নিলে দেখা যাবে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একযোগে প্রতিযোগিতামূলক আইন ভেঙে সড়কে ভয়ঙ্কর এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি  করে ফেলবে। একই চিত্র কয়েকটি সেবা সংস্থার, যেখানে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ থেকে সার্ভিস ডেলিভারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই অটোমেটেড। কিন্তু মাঝপথে ব্যাঘাত ঘটছে। সিরিয়াল ভেঙে কেউ কেউ সুবিধা নিচ্ছে। আরও বিচিত্র গল্প বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। বিদ্যুতের চুরি কমাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটাল মিটার চালু হয়। কিন্তু এর পর শুরু হয় শিল্প-কারখানা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে `সেন্সর` বসিয়ে অদ্ভুত কৌশলে দুর্নীতি। নতুন প্রযুক্তিতে কারচুপির আশ্রয় নিয়ে মিটার থেকে মুছে ফেলা হয় বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ ইউনিট। এমনকি সফটওয়্যারে লজিক্যাল মিটার পরিবর্তন দেখিয়ে লাখ লাখ বিদ্যুৎ ইউনিট গায়েব করে ফেলা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, এক লাখ ইউনিট বাস্তব রিডিং থাকা সত্ত্বেও ২০ হাজার ইউনিট কনজাম্পশন দেখানো হয়েছে। এমনকি প্রি-পেইড মিটারেও অনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে। হার্ডওয়্যার ও ডাটা পরিবর্তন করা হয়েছে। একইভাবে মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ওভারলোডিং রোধে ওজন স্কেল বসানো হয়েছিল; কিন্তু কেউ মানতে চায় না। এটাও এক ধ্বংসাত্মক দুর্নীতি। কারণ ওভারলোডিংয়ের দুর্নীতির পরিণতিতে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক। এভাবে  আঙুল ফুলে বটগাছে পরিণত হয়েছে বিচিত্র সব দুর্নীতির সুফলভোগী। বিশ্বজুড়ে অটোমেশনের জয়জয়কার। অথচ এর সমান্তরালে চলছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। ঘটছে বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি। অনলাইনে অভিনব কায়দায় ভারতের সিটি ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে দুই মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। সাইবার আক্রমণে কত হাজার ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে, তার হিসাব নেই। ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বড় বড় দুর্নীতি ঘটার দৃষ্টান্তও আছে অজস্র। প্রযুক্তির শক্তিও দুর্নীতির থাবা স্তব্ধ করতে পারছে না। সুপ্ত অন্তরে বাস করা এবং রক্ত-মজ্জায় মিশে যাওয়া এ এক কঠিন ব্যাধি, যার নাম দুর্নীতি। মানুষের সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই দুর্নীতি নামক এ রসায়নের উৎপত্তি। সেই রসায়নের গভীরতা এখন এত বেশি, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মতো সৎ লোক খুঁজে বের করে আনতে হয়। তাহলে দুর্নীতি বন্ধের উপায় কী? একমাত্র পথ সততায় উজ্জীবিত ও দেশপ্রেমে আলোকিত মানুষ। আমরা নিখুঁত সততার বীজ রোপণ করতে চাই তারুণ্যে। সঞ্চারিত করতে চাই সততার চেতনা তাদের মস্তিস্কে, রক্তে ও নিউরনে। তরুণরাই ভবিষ্যতের জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, প্রকৌশলী এবং সৎ ও সুনাগরিক। এ প্রজন্মের তরুণদের একটা অংশ এখন চাকরি বা পেশায় প্রবেশ করেই অর্থ, ক্যারিয়ার ও ঐশ্বর্যে ভরা জীবনের অমোঘ আকর্ষণে অসহিষুষ্ণ হয়ে ছুটে বেড়ায়। এমনকি বেতন-ভাতা বাড়িয়েও অনেকের দুর্নীতির চিরায়ত অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আবার অনেক করপোরেট সেক্টরেও দুর্নীতি ঘটছে অবলীলায়। মেধাবীরাও অনৈতিক অর্থের প্রতিযোগিতায় ছুটছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কয়জন কমিটেড হয়? ব্যক্তিক লাভ, অর্জন ও অভিলাষের স্রোতে চাপা পড়ে যায় রাষ্ট্রস্বার্থ, জনস্বার্থ এবং বৃহৎ স্বার্থ। তারুণ্য মানে অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ সত্তা, অপরিমেয় শক্তির আধার একজোড়া ডানা। কিন্তু সে তারুণ্য যদি বস্তুবাদিতা, ভোগবাদিতা আর বিপথগামিতার এক মোহনায় মিশে যায়, তাহলে দুর্নীতির নিকষ অন্ধকারে ধাবিত হওয়া জাতিকে আলোর পথ কে দেখাবে? মরচে পড়া সততাকে কে শানিত করবে? বৃষ্টির মতো তরুণদের বুঝিয়ে সততা শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু বড়দের সততার বোধোদয় জাগাতে হয় ভয় দেখিয়ে, শাস্তি দিয়ে। মানুষের সততার বীজ অঙ্কুরিত হয় পরিবারে এবং বিকশিত হয় স্কুল-জীবনে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মিথোজীবিতা (ঝুসনরড়ংরং) থেকে পাওয়া সৎ জীবনযাপনের রূপরেখা সারাজীবনের পথচলার দীক্ষা। আমাদের পিতামাতার অল্পে তৃপ্ত এবং শিক্ষকদের স্বল্পে তুষ্ট জীবনগুলো আমাদের জন্য অনির্বাণ আদর্শ। শৈশব ও কৈশোরে সততার যে শিক্ষা; যৌবনে তার চর্চা, প্রৌঢ়ত্বে তার পূর্ণতা। প্রত্যাশা করি, তরুণদের  দিয়েই শুরু হবে শুদ্ধ ও সরল পথে চলা। কাদায় আটকে যাওয়া চাকাকে তুলতে হবে। দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এগিয়ে আসুক তারুণ্য; দেশ এগিয়ে যাবে। মহাপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক কোন পর্যায়ে

অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও এশিয়ার এই দুটি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী উদ্যাপনের নানা আগ্রহ-আয়োজনের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বার্থ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রোথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত জাপানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এশিয়ার সমৃদ্ধ দেশগুলোর অন্যতম জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে মিত্রশক্তির নেতৃত্ব দানকারী যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় জাপান তখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রভাববলয়েরই একটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে জাপান ওকিনাওয়া দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সে বছর। ১৯৭২ সালেই জাপানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমিত হয়ে সিনো জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে বিপরীত অবস্থানে ছিল। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপান সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং বিজয়ের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবাহী ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। জাপানিদের ভৌগোলিক অভিজ্ঞানে বর্তমান বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের নিজেদের নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বলয়ভুক্ত দেশগুলোর সীমান্ত। তাদের বিবেচনায় বার্মা বা অধুনা মিয়ানমারই হচ্ছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্ত। হিমালয়, আসাম, লালমাই পাহাড় পেরিয়ে সমতল ভূমিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা আরব বণিকদের প্রবেশ এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা মোগল আর ইউরোপ থেকে আসা ইংরেজ শাসনাধীনে দীর্ঘদিন থাকার কারণে এ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ভাবধারার অবগাহনে গড়ে ওঠা দেশগুলোর সদস্য ভাবা হয়। বাংলাদেশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্য এশীয়-ইউরোপীয় দেশগুলোর ঠিক মধ্যবর্তী দেশ। বাংলাদেশকে এ দুই ভিন্ন ধারার মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টির দ্যোতক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এশীয় ঐকতান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রয়াস এবং এর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে বিশেষ তাৎপর্যবহ বলে জাপান মনে করে। বাংলাদেশ এবং এর জনগণের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ বেশি হওয়ার যে সব কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় তার মধ্যে প্রথমটি হলো নৃতাত্ত্বিক। বাংলাদেশের উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মুখনিঃসৃত ভাষা এবং তাদের শারীরিক আকার-আকৃতির সঙ্গে জাপানিদের কিছু মিল লক্ষ করা যায়। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড কিংবা এমনকি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জনজীবন ও সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় কারণ ধর্মীয়। জাপানিদের একটি বড় অংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ নেপালের কপিলাবস্তুতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পাল ও মৌর্য যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলেই বৌদ্ধ ধর্মের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার ঘটে। বাংলাদেশের পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় ও ময়নামতিতে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা এবং এ সব বিদ্যায়তন ও ধর্মশালাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটে। বিক্রমপুর অঞ্চলে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানসাধনার দীপ্তি এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে এক সময় বাংলা অঞ্চলই বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারের তীর্থক্ষেত্র ছিল। বাংলাদেশের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ সেই নাড়ির টানেই। তৃতীয় কারণটি হলো ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাংলাদেশের গাঢ় সবুজ অরণ্যানীশোভিত পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমির সমন্বিত সমাহার, অবারিত নৌপথ আর কৃষিজমি, পাহাড় আর সমুদ্রমেখলা ও নদী-নালাবিধৌত অববাহিকা ও এর আবহাওয়া যেন জাপানেরই প্রতিচ্ছবি। সমপর্যায়ের ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক অবস্থানে জীবনযাপনকারী বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের অন্যতম খাদ্য ভাত ও মাছ। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ হলো চতুর্থ কারণ। প্রাচীনকাল থেকেই উভয় অঞ্চলের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সখ্য ও যোগাযোগ ছিল বোঝা যায়। যেমন-জাপানে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি রঙের নাম বেঙ্গারু। জাপানিরা বেঙ্গলকে বেঙ্গারু আর বাংলাদেশকে বাঙ্গুরা দেশ বলে। জাপানিরা ‘ল’-এর উচ্চারণ ‘র’ করে থাকে। বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ প্রভাব সম্পর্কে বিদগ্ধ জাপানি গবেষক অধ্যাপক সুয়োশি নারা জানিয়েছেন, প্রায় ৪০০ বছর আগে জনৈক জাপানি শিল্পী বাংলা অঞ্চল থেকে যে বিশেষ রংটি নিয়ে যান এবং জাপানে যার বহুল ব্যবহার প্রচলিত হয়, তার নাম হয়ে যায় বেঙ্গারু। বাংলার চারু ও কারুশিল্প চর্চার সঙ্গে জাপানিদের আগ্রহ ও সম্পর্কেরও এটি একটি প্রাচীন নিদর্শন বলে তিনি মনে করেন। বিশ শতকের শুরু থেকেই জাপানিদের সঙ্গে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ চারু ও কারুশিল্প চর্চার বিনিময়ের মাধ্যমেই। সর্বোপরি দুই দেশের মধ্যে মেলবন্ধন ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃজিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাসবিহারী বসু, নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু, বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাকেশি হায়াকাওয়া প্রমুখর প্রচেষ্টায়। ১৮৬৮ সালে জাপানে মেইজি সরকার প্রতিষ্ঠার পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। ভারতবর্ষ থেকে পি সি মজুমদার ১৮৮০ সালে আর স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) ১৮৯০-এর দশকে জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে স্বামী বিবেকানন্দ জাপানতত্ত্ববিদ আর্নেস্ট ফেনোলোসার সঙ্গে বোস্টনে আলোচনার সময় জাপান সম্পর্কে তার আগ্রহ প্রকাশ পায়। স্বামী বিবেকানন্দ ‘জাপানি চরিত্রে সৌন্দর্য’, মর্যাদাবোধ, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস আর আচার-আচরণে বিমুগ্ধ হন। স্বামীজি জাপানকে দেখেছিলেন আধুনিকতার প্রতীক এবং শিল্পে অগ্রগতির দিশারি হিসেবে। তিনি মনে করতেন, জাপানের কাছ থেকে ভারতবর্ষের শেখার আছে অনেক কিছুই। তার প্রত্যাশা ছিল, ভারত ও জাপানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে জাপানে বাংলাদেশ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম সফরের সময় বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাকেশি হায়াকাওয়া ছিলেন তার অন্যতম রূপকার। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হায়াকাওয়া সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরে এলে রাষ্ট্রাচার উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে পদ্মা গেস্টহাউসে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সম্মান প্রদর্শনে আসার ঘটনাটি জাপান-বাংলাদেশের মধ্যে সুদূরপ্রসারী সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সোপান বলে হায়াকাওয়া তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আট সদস্যের জাপানি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরে নেতৃত্ব দেন হায়াকাওয়া। ১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাপান এয়ারলাইনসের বিমান ছিনতাই ঘটনার সফল নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতার প্রতি জাপানের সরকার ও জনগণের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ২৭ অক্টোবর জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে হায়াকাওয়া চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন এবং সে বছর ১৬ ডিসেম্বর জাপান বাংলাদেশকে একটি বোয়িং ৭৭৭ উপহার দেয়। ১৯৭১ সালে জাপানের বুদ্ধিজীবী-ছাত্র-শিক্ষক সমন্বয়ে গঠিত জাপান-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন এবং পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি লীগ ও জাপান-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন দুই দেশের মধ্যে ভাববন্ধন প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রেখেছে। এ পর্যায়ে প্রফেসর সুয়োশি নারা, জাপানের সাবেক অর্থমন্ত্রী হিরোশি মিত্সুজুকা এবং জাপানের হাউস অব কাউন্সিলরের প্রভাবশালী সদস্য শিন সাকুরাইয়ের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান বাংলাদেশ-জাপান মৈত্রী সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সভাপতি হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ টোকিওতে গঠিত প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন-জাপান, যা ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ সিটিজেনস ফোরাম-জাপান নামে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানি জনমত ও সমর্থন আদায়ে এবং পরবর্তীকালে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে গঠনমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই সংগঠনের সর্বজনাব আনোয়ারুল করিম, ইস্কানদার আহমেদ চৌধুরী, শেখ আহমদ জালাল, আমিনুল ইসলাম (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক), ড. মুস্তাফিজুর রহমান, মমতাজ ভুইয়া প্রমুখ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। জাপানে প্রবাসী বাঙালিদের অধুনা সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি নানা টানাপড়েনের মধ্যেও জাপানে বাংলাদেশের এবং প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করেছে। জাপান থেকে প্রকাশিত মাসিক মানচিত্র, মাসিক মাকু, টোকিও বার্তা প্রভৃতি পত্রপত্রিকা দুই দেশের মধ্যে জানাশোনার সুযোগ করেছে অবারিত। জাপানে বর্তমানে কমবেশি ১৫ হাজার বাংলাদেশি পড়াশোনা ও চাকরি সূত্রে অবস্থান করছেন। দুই দেশের মৈত্রীবন্ধনে এদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ২০ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণসহ প্রবাসীরা বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারে রেখেছেন কার্যকর ভূমিকা। প্রবাসীরা জাপানি ভাষা আয়ত্ত করে জাপানি পরিবার ও তাদের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জাপানি শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশে জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধার কথা সহজে তুলে ধরতে পারে। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তারা জাপানে তাদের বাংলাদেশি কর্মচারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসতে উদ্বুুদ্ধ হয়েছেন। লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, জাপানে বাংলাদেশের সাবেক বাণিজ্যদূত।

লিভার চিকিৎসার উন্নয়নে স্বপ্নীল স্যারের ভূমিকা

প্রফেসর মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান। আমার শিক্ষক। এই নামটি কোন সাধারণ নাম নয়। বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতে এক অনন্য সাধারণ নাম। একজন অসাধারণ চিকিৎসক, অসাধারণ শিক্ষক, একজন অসাধারণ ব্যাক্তিত্ব এবং বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। আমি আমার ক্ষুদ্র ডাক্তারি জীবনে এত মেধাবী মানুষ এখন পর্যন্ত দেখিনি। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, ছাত্র হিসাবে তাঁর মত একজন মেধাবী মানুষের সংস্পর্শ ও সহচর্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। এদেশের লিভার চিকিৎসাকে স্যার এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। প্রচলিত লিভারের চিকিৎসার (Conventional Hepatology) বাহিরে যুগোপযোগী, অত্যাধুনিক লিভারের চিকিৎসার (Interventional Hepatology) যাত্রা স্যারের হাত দিয়েই এদেশের মাটিতে শুরু হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই `He is the father of interventional Hepatology in Bangladesh`। তাঁর অসামান্য দক্ষতা ও নৈপুণ্যের ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশেই বিশ্বমানের লিভারের চিকিৎসা সূচিত হয়েছে। লিভার ক্যান্সার চিকিৎসায় TACE (Trans arterial chemoembolization), RFA (Redio-frequency ablation) পদ্ধতি স্যারের হাত দিয়েই এদেশে শুরু হয়েছে। লিভার সিরোসিসের প্রচলিত চিকিৎসার বাহিরে Stem cell therapy এবং সর্বশেষ Liver dialysis in hepatic failure স্যারের এক অনন্য অবদান। ডঃ শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর স্যার এবং প্রফেসর মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) স্যারের যৌথ গবেষণায় আবিষ্কৃত ন্যাসভ্যাক (NASVAC) ঔষধটি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের উপর প্রয়োগ করে অত্যন্ত আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। তাই বলতেই পারি হয়তবা আমরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জয়ের দ্বারপ্রান্তে অবস্হান করছি। দেশের সীমানা পেরিয়ে আজ বাংলাদেশের হেপাটোলজী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুলভাবে সমাদৃত। আর এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) স্যারের জন্য। ১৬৬ টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের লেখক এবং হেপাটোলজীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গাইডলাইন কমিটির সন্মানিত সদস্য আমাদের স্বপ্নীল স্যার। স্যার হচ্ছেন সেই মানুষ যিনি শুধুমাত্র নিজের কথা চিন্তা না করে সবসময় উনার হেপাটোলজি পরিবারটির কথা চিন্তা করেন। আমরা আমাদের স্যারের কাছে মন খুলে সব সুবিধা অসুবিধার কথা বলতে পারি। নবীণ লিভার বিশেষজ্ঞদের আরও দক্ষ ও যুগোপযোগী করে তৈরি করার জন্য স্যার স্ব উদ্যোগে নিজের অবস্হানকে কাজে লাগিয়ে তাদের জন্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছেন। দেশের লিভার চিকিৎসার সার্বিক উন্নয়নে এই মানুষটি দিন-রাত প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে চলেছেন। আমি স্যারকে দেখি আর ভাবি আমি কবে স্যারের মত এত বিশাল হৃদয়ের মানুষ হব ? কিংবা আদৌ কোনদিন হতে পারব কিনা ?!! ছাত্র হিসাবে নিজের শিক্ষককে মূল্যায়ণ করে কিছু লেখা নিতান্তই ধৃষ্টতার শামিল। কিন্তু মনের আবেগ উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারলাম না বিধায় লিখে ফেললাম। ভাল থাকবেন স্যার। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট আপনার সুস্হতা কামণা করছি।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি