ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৭:৪৭:২১, বুধবার

শাড়ি পরার কারণ জানালেন তসলিমা নাসরিন

শাড়ি পরার কারণ জানালেন তসলিমা নাসরিন

কেন শাড়ি পরেন তার কারণ জানালেন ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
প্রস্তাবিত বাজেট ও আগামী দিনের বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদী সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে গত ১৩ জুন, ২০১৯। বাজেট শুধু বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। শুধু আগামী একবছর নয়, আগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে প্রতিবছরের বাজেট থেকে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশ কিভাবে মোকাবেলা করবে তারও দিকনির্দেশনা থাকে বাজেটে। ভারতের খ্যাতিমান পণ্ডিত ব্যক্তি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম তাঁর রচিত `ইগনাইটেড মাইন্ডস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- একটি রাষ্ট্র সমৃদ্ধি অর্জনের পথে কোন জায়গায় অবস্থান করছে তা দেখার জন্য প্রধানত পাঁচটি সেক্টরের অগ্রগতির দিকে তাকালেই সেটি বোঝা যায়। এগুলো হচ্ছে- কৃষি ও খাদ্য, দ্বিতীয় বিদ্যুৎ, তৃতীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, চতুর্থ তথ্য-প্রযুক্তি এবং পঞ্চম হচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক সেক্টর,যার আওতায় আসে মহাকাশ, পারমাণবিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান। এই সেক্টরগুলোতে বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং গত ১৩ জুন প্রস্তাবিত বাজেটে এগুলো জায়গায় কতখানি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তার একটা বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ইতিহাস আওয়ামী লীগের ইতিহাস

১৯৪৯ সনের ২৩ জুন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। বাংলার মানুষের প্রাণপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের আজ ৭০তম শুভ জন্মদিন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। ঐতিহাসিক ২৩ জুন ১৭৫৭ সনে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাগণ দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দল। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল এবং বায়ান্নের মহান ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছিল। যদিও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার আগেই ’৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে প্রাণপ্রিয় ছাত্রপ্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই বছরের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের উদ্যোগে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রদেশব্যাপী সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ’৫৩ সনে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জনতা ও বুদ্ধিজীবীদের সচেতন প্রতিরোধ প্রচেষ্টাতেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সংগঠিত করে বাঙালির ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এই তিনটি নাম সমার্থক হয়ে আছে। আজ থেকে ৫৯ বছর আগে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। জাতির পিতার নির্দেশে ও উপস্থিতিতে ’৭০-এর ২ জুন আমি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করি এবং একই বছরের ৭ জুন ঐতিহাসিক ‘৬ দফা দিবস’ পালন উপলক্ষে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বক্তৃতা প্রদানের দুর্লভ সুযোগ পাই। সেদিন জাতির পিতা ৬ দফা ও ১১ দফার স্মারক হিসেবে ১৭টি কবুতর উড়িয়ে সভার কার্যক্রম শুরু করেন। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতির পিতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার পর তার সান্নিধ্য লাভ করি। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ধাপে ধাপে তিনি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন। যখন তার কাছে থাকতাম তখন বলতেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই উপলব্ধি করেছি, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে নিয়েই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছি।’ আজ শ্রদ্ধাভরে জাতির পিতাকে স্মরণ করে একথাই মনে করি, বঙ্গবন্ধু তার দক্ষতা, সাহস, সীমাহীন ত্যাগ আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবনের ৪,৬৮২টি মূল্যবান দিন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন।   আওয়ামী লীগের ইতিহাস অবিরাম পরিবর্তন ও বিপ্লবের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস অভিন্ন। ’৫৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ২২৮টি আসনে জয়লাভ কার্যত মুসলিম লীগের কবর রচনা করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিদায় করার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ফলাফল, ’৪৯-এ প্রতিষ্ঠিত ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ ’৫৫-এর ২১ অক্টোবর হয় অসাম্প্রদায়িক ‘আওয়ামী লীগ’। দেশের চরম সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটকে মাত্র ৬ বছরের মধ্যে আমূল বদলে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ’৫৫-তে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জন্ম হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও এর কর্মীগণ এক দিনের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে নাই। অত্যাচার ও জুলুম শাহীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ যে জোরালো প্রতিবাদের ধ্বনি তুলেছিল তারই ফলস্বরূপ জনগণের মধ্যে এসেছিল নব নব চেতনা, নতুন আশা ও উদ্দীপনা এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার বজ্র কঠিন শপথ।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত ‘বজ্র কঠিন শপথ’ চেতনায় ধারণ করে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী পথচলা। ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ’৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ’৬২-তে আমাদের স্লোগান ছিল ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’; ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’। ’৬৬-এর ৫ ফেব্রæয়ারি বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দিয়েছিলেন লাহোরে। তখন তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ’৬৬-এর ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন ‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাবো।’ ছয় দফা দেওয়ার পর স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা তথা আগরতলা মামলার আসামি করে, তাকে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে। জাগ্রত ছাত্রসমাজ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। আমরা ৬ দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভূক্ত করে আসাদ, মকবুল, রুস্তম, মতিউর, আলমগীর, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে ’৬৯-এ প্রবল গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে জাতির জনককে ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে মুক্ত করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করি। তখন আমাদের স্লোগান ছিল ‘পাঞ্জাব না বাংলা, পিন্ডি না ঢাকা’। জাতির পিতাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। যখন ’৭১-এর ১ মার্চ জাতীয় সংসদের পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়, তখন দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। লাখ লাখ লোক রাজপথে নেমে আসে। শুরু হয় এক দফা তথা স্বাধীনতার সংগ্রাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ’৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন এবং বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বর্তমানে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃত অতুলনীয় এই বক্তৃতাই ছিল মূলত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকনিদের্শনা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাতিয়ার তুলে নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সমাপ্ত করে শপথ করাতাম এই বলে যে, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে আমরা হানাদার মুক্ত করতে না পারবো, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লক্ষাধিক শহীদ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়! সেদিন দেশ শত্রুমুক্ত হলেও স্বাধীনতার পরিপূর্ণ স্বাদ আমরা পাইনি। যেদিন ’৭২-এর ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সংবাদ পেলাম, সেদিন সারাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ১০ জানুয়ারি যেদিন তিনি স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, সেদিন মনে হয়েছে আজ আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। এরপর ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আমাকে তার রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। দেশ স্বাধীন করেই বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব শেষ করেননি। দেশ স্বাধীনের পর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। গোলাঘরে চাল নেই, ব্যাংকে টাকা নেই, বৈদেশিক মুদ্রা নেই, রাস্তা-ঘাট-পুল-কালভার্ট সব ধ্বংসপ্রাপ্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্লেন নেই, স্টিমার নেই, কিছুই নেই। কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেগুলো শত্রুবাহিনী ধ্বংস করেছিল সেগুলো পুনর্স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জনপদ। বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধুর একক প্রচেষ্টায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ’৭২-এর ১২ মার্চ বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ’৭২-এর ৪ নভেম্বর মাত্র সাত মাসে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান বলবৎ হওয়ার পর গণপরিষদ ভেঙে জাতীয় সংসদের সফল নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সরকার গঠন করেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ ‘কমনওয়েলথ অব ন্যাশনস্’, ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’, ‘ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা’ ও ‘জাতিসংঘ’সহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেন। আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ সফরের দিনগুলির কথা। বিশ্বসভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন। সফরসঙ্গী হিসেবে কাছে থেকে দেখেছি প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর। মুক্তিযুদ্ধের পরমমিত্র প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা মহানগরীর ব্রিগেড ময়দানে ২০ লক্ষাধিক মানুষের গণমহাসমুদ্রে অসাধারণ বক্তৃতা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে এই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজভবনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর তাকে ’৭২-এর ১৭ মার্চ নিজের জন্মদিনে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান বঙ্গবন্ধুর। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি চাই ১৭ মার্চ আমার জন্মদিনে আপনি বাংলাদেশ সফর করুন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যাবার আগে আমার অনুরোধ আপনি আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করবেন।’ ’৭২-এর ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ১২ মার্চ বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হয়েছিল। তারপর ১ মার্চ ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্রদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোশ্লাভিয়া আমাদের সার্বিক সমর্থন যুগিয়েছিল। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব-সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ, সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পোদগর্নি, সরকারের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু যুগোশ্লাভিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সফরসঙ্গী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেখেছি যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো প্রটোকল ভঙ্গ করে বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কারণ, সেদিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর মার্শাল টিটো প্রেসিডেন্ট। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন ’৭৩-এর ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়াতে। সেখানে ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কমনওয়েলথ সম্মেলন। কিন্তু সব নেতার মাঝে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সদ্য-স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সর্বমোট ৬ জন নেতার নামে তোরণ নির্মিত হয়েছিল। তন্মধ্যে জীবিত দু’নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যজন মার্শাল জোসেফ ব্রোজ টিটো। আর প্রয়াত ৪ জন নেতা ছিলেন মিশরের জামাল আব্দুল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ন, ঘানার প্রেসিডেন্ট কাউমি নক্রুমা এবং ভারতের পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। আলজেরিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ ’৭৩-এর ৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাপান সফরে যান। এ সফরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল। জাপান সফরের মধ্য দিয়ে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়, তা আজও অটুট রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে জাপান। ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যেদিন তিনি ইসলামিক সম্মেলনে যান সেদিন লাহোর বিমানবন্দরে দেখেছি মানুষ রাস্তার দু-পার্শ্বে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলেছে ‘জিয়ে মুজিব জিয়ে মুজিব’, অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ মুজিব জিন্দাবাদ। লাহোরে এই সম্মেলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এমনকি যতক্ষণ তিনি লাহোরে না পৌঁছেছেন, ততক্ষণ সম্মেলন শুরুই হয়নি। বঙ্গবন্ধুর জন্য একদিন সম্মেলন স্থগিত ছিল। বিশেষভাবে মনে পড়ে ’৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের কথা। যেদিন জাতির জনক জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ জাতিসংঘে ভাষণ প্রদানের পর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ১ অক্টোবর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সাক্ষাৎ করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে ৬ দিনের সফরে ’৭৪-এর ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু ইরাকের রাজধানী বাগদাদে পৌঁছান। সেখানেও রাষ্ট্রপ্রধানসহ সবাই বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। আমরা বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) মাজার জিয়ারতকালে মাজারের খাদেম বঙ্গবন্ধুকে মাজারের গিলাফ উপহার দেন। ’৭৫-এর ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ মে পর্যন্ত জ্যামাইকার কিংস্টনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু রেখেছিলেন তার সরব উপস্থিতির উজ্জ্বল স্বাক্ষর ও প্রশংসনীয় নেতৃত্ব। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তারও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধু, ’৭৫-এ বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিনবছর সময় পেয়েছেন। এ সময়ে ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার। বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে দু’টি ভাগে। প্রথমভাগে পুনবার্সন ও পুনর্গঠন এবং দ্বিতীয়ভাগে আর্থসামাজিক উন্নয়ন। ’৭৪-’৭৫-এ বোরো মৌসুমে ২২ লাখ ৪৯ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয় যা ’৭৩-’৭৪-এর চেয়ে ২৯ হাজার টন বেশি। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডিসেম্বরে ঘোষণা দেবেন দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতির পিতা বিধ্বস্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে দেশটাকে যখন স্বাভাবিক করেছিলেন এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, বাংলার মীরজাফর বেঈমান হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিচক্র মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ’৮১-এর ১৭ মে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করে আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে অর্থনৈতিক মুক্তির- যে অর্থনৈতিক মুক্তি বঙ্গবন্ধু সমাপ্ত করতে পারেননি- দায়িত্বভার গ্রহণ করে বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ষড়যন্ত্র শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে এদেশের রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করার। প্রায় দুই যুগ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় আওয়ামী লীগকে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ’৯৬-এর ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। জাতীয় ঐকমত্যের সেই সরকারে আমি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম। উন্নয়ন আর অগ্রগতির লক্ষ্যে গঠিত আমাদের সরকারের বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করায় শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। সরকারের ৫ বছরের কালপর্বে দ্রব্যমূল্য ছিল মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। এই সরকারের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সাফল্য ’৯৭-এর ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’। আওয়ামী লীগ সরকারের সফল কূটনীতির ফলে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের গঙ্গার পানিবণ্টন সংকটের সমাধান হয়। এ কালপর্বে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ক্ষুধা ও দারিদ্রপীড়িত দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। জাতির জনককে হত্যার পর ঘাতকচক্র পবিত্র সংবিধান কলঙ্কিত করে হত্যাকারীদের রক্ষায় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। যে কারণে দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের বিচার হয়নি। বরং খুনিরা পেয়েছে রাষ্ট্রীয় পদ, বিশেষ সুযোগ। ’৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করে। নিম্ন আদালতে হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড়াতে শুরু করে। প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত এবং মুদ্রাস্ফীতি ১ দশমিক ৪৯ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভবপর হয়। অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ’৯৮-এর জুনে ৯৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে যমুনা নদীর উপর নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার ৫ম এবং বিশ্বের ৯২তম দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর মাধ্যমে দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হয়ে ওঠায় সমগ্র দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর সুফল পরিলক্ষিত হয়। মহান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বপ্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বছরটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আমরা ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হয়েছি। এই একটি কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম অনন্য উচ্চতায় উঠেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে। মাত্র ৭ বছরের মধ্যে এর বিনিয়োগকৃত অর্থ উঠে আসবে ও বাকি বছর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। এর আগে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের লাইসেন্স প্রাপ্তির মাধ্যমে ‘নিউক্লিয়ার ন্যাশন’ হিসেবে আমরা বিশ্ব পরমাণু ক্লাবের সদস্য হয়েছি। আর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে দশ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। জাতির জনকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ভাষায়, ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি চমৎকার। এটা আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য অনুসরণীয়।’ নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক সূচকের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকে এগিয়ে।’ অনেক বড় বড় প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করার পরেও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে আজ তা সমাপ্তির পথে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেলপথ, বঙ্গবন্ধু সেতুতে পৃথক রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ, মেট্রো রেল, এলিভেটরি এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩,২০০ থেকে ২১,৬২৯ মেগাওয়াট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩.৫ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানি আয় ১০.৫২ থেকে ৪১ বিলিয়ন ডলার, পায়রা বন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.২৮ শতাংশ করে জনগণের মাথাপিছু আয় ১,৯০৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সবল-সমর্থ আর্থসামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করার ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশ ২০২৩ নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়ে উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নেবে।’ সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের এসব কৃতিত্বের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত ১৪টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত করেছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এতো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং হচ্ছে যা এই ক্ষুদ্র লেখায় প্রকাশ করা অসম্ভব।   ২০০৮-এর নির্বাচনে রূপকল্প তথা ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং মধ্যম আয়ের দেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ স্বপ্ন না বাস্তব। ইতোমধ্যে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়েছি এবং উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করেছি। ২০২০-এ জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে সারাদেশে সগৌরবে পালিত হবে এবং ২০২১-এ যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে, তখন আমরা পরিপূর্ণভাবে মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরবো। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের কারণে। জাতির পিতা দু’টি লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই কাজটি দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা করে চলেছেন। ধীরে ধীরে যেমন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে মর্যাদাশালী ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। আমরা সেই পথেই বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি। এদেশে অতীতে ইতিহাস বিকৃতির বহু প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আজ বাংলার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সত্যিকারের ইতিহাস জানতে পেরেছে। এখন ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও কেউ কেউ ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে। তারা জানে না, সত্যকে কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। সত্য সত্যই। যারা ইতিহাসের সত্যকে বিকৃত করে আওয়ামী লীগকে ছোট করতে চেয়েছে, জাতির জনককে ছোট করতে চেয়েছে, প্রকারান্তরে তারাই ছোট হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী অবদান ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। যতদিন বাংলার মাটি ও মানুষ থাকবে ততদিন বাংলার ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লেখক আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য ও সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ইমেইল: tofailahmed69@gmail.com 

‘ভারত ও বাংলা ভাগ’ ভিতর-বাহির

ভারতীয় উপমহাদেশে ধন-সম্পদ লুণ্ঠন আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নানা সময়ে দস্যুপ্রবৃত্তিমনা বিভিন্ন বণিকদল এসেছিল। অস্ট্রিক-দ্রাবিড়দের সময়কাল থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসকদের সময়কাল পর্যন্ত এ-চিত্র ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। এদের মধ্যে হিংস্রতা থেকে শুরু করে কূটকৌশল সব ধরণেরই আচরণ ছিল। এ দেশের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন আর ভোগ করাই তাদের কাছে প্রধান ছিল। দেশটাকে নিজের মনে করে গ্রহণ করেনি কেউই। ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু তুর্কি ও মুঘোলদের সময়কালে। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলা ভূখ- ছিল ধন-সম্পদ ও কৃষি পণ্যসামগ্রীতে পূণ্যবতী। আর এসবই হয়েছিল ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। ‘অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরি’ চর্যাপদের বহুল পরিচিত এই পংক্তি যেন রীতিমতো ফলেছিল ভারতবর্ষের ললাটে। হরিণ যেমন তার নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্যই নিজেই নিজের বিপদের কারণ, নিজের জীবন বিপন্ন হয়, ভারতবর্ষের অবস্থাও তাই ছিল। ভারত তার নিজের রূপ-ঐশ্বর্য্য-অর্থ-সম্পদ-প্রাচুর্য্যরে জন্য বারবার বহিরাগতদের লোভ আর হিংস্রতার শিকার হয়েছে। দীর্ঘকাল ভারতকে পরাধীনতার নির্মম ও করুণ পরিণতি বহন করতে হয়েছিল। ভারতবর্ষের পরাধীনতা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। ভারতবর্ষ প্রকৃত অর্থে কোন সময়কাল থেকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরেছিল, কিভাবে সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কারা চেষ্টা করেছিল, কোন নেতাদের প্রধান ভূমিকা ছিল, সে সব নেতারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কিভাবে নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তন করেছিল, লেবাসধারী ভূমিকা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের তৈরি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নেতৃত্ব হরণ করেছিল, ভারতকে অখন্ডভাবে স্বাধীন করার প্রত্যয়ে কারা অন্দোলন সংগ্রাম বিপ্লব করেছিল, আবার তারাই কিভাবে নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তন করে নিয়েছিল, কারা বাংলা ভাগের বিপক্ষে জোরালো প্রতিবাদ করেছিল, আবার সেই তারাই কত সহজেই বাংলা ভাগ মেনে নিলেন বা আর এক অর্থে বাংলাকে ভাগ করলেন। এর মূলে ধর্ম বা দ্বিজাতিতত্ত্ব, ব্যক্তি ক্ষমতা ও স্বার্থ কতোটা প্রবল ও হিংস্রতার থাবা ছিল। সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো মহান নেতা যিনি দৃঢ়পত্যয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, তাকে কতোভাবে গান্ধী-নেহেরু-জিন্নাহর কূট ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছিল। এমনকি দেশ ত্যাগের মতো দুর্ভাগ্যের নির্মম পরিণতি বহন করতে হয়েছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বকাঁপানো মহান নেতাজিকে। দেশের স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবী বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম বসু, রাশবিহারী বসু, শহীদ তিতুমীর, মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতি লতাসহ অসংখ্য বিপ্লবী যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন, রক্ত সোপানে লিখে দিয়েছিলেন নিজের জীবন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অগ্নিস্পর্ধিত কবিতা লিখে জেল খেটেছেন একমাত্র বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সব মিলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার প্রয়াস, একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাকে ভাগ করে ফেলা। এসবের অসামান্য এক দালিলিক সুবৃহৎ গ্রন্থ ‘ভারত ও বাংলা ভাগ: এক বিয়োগান্তক অধ্যায়’। গ্রন্থটি রচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ। তাঁর অক্লান্ত শ্রমসাধ্য এই গ্রন্থটি গতানুগতিক ও প্রচলিত বহু ধারণাকে সরিয়ে আলোর মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে ভারতবর্ষ কিভাবে স্বাধীন হয়েছিল। ভারতবর্ষকে কিভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল, কিভাবে বাংলার বুকে স্বার্থের নীতি ও বিবেকহীন ছুরি চালিয়ে তা ভাগ করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে অযৌক্তিকভাবে যুক্ত করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিও তেইশ বছরের মাথায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত হয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই গ্রন্থটি পাঠকের কাছে ভারতবর্ষের ইতিহাস, পরাধীনতার যন্ত্রণা এবং বাংলা ভাগের বিয়োগান্তক বেদনার চির বহমান রক্তক্ষরণের ছবি হয়ে উঠেছে। গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ ঐতিহাসিক বহুমুখী ঘটনা ও ধারাবাহিক গতিধারা, বহুমাত্রিক তথ্য-উপাত্ত ও ভারতবর্ষের দালিলিক পর্যায়ের অসংখ্য দেশি-বিদেশি গ্রন্থ পত্র-পত্রিকা নিবিড় অধ্যয়ন ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ বিচারে প্রকৃত সত্য উদ্ধারে ধ্যানী সাধকের মতো ব্রত নিয়ে কঠিন-কর্মটি সফলভাবে সাধন করতে পেরেছেন। এই গ্রন্থে দ্রাবিড় অস্ট্রিক আর্য থেকে শুরু করে হিন্দুরা কিভাবে এ দেশে এসেছিল, কিভাবে এ দেশকে শাসন করেছিল, তাদের কাছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কতোটা হীনতর ছিল, একই সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের কী ভীষণ রকমের বৈষম্য সৃষ্টি, দ্বন্দ্ব সংঘাত হানাহানি-রক্তপাতের বীজ সেখান থেকেই প্রথম সৃষ্টি। এ সবের কঠিন সত্যটি আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রন্থে। হিন্দু যুগ, মুসলমান যুগ ও ইংরেজ যুগ। এক এক গবেষকের কাছে এক একভাবে মূল্যায়িত বা অবমূল্যায়িত হয়েছে। এ গ্রন্থে এ সবের পরিষ্কার বিশ্লেষণ রয়েছে। হিন্দু শাসকেরা কিভাবে শোষণ-শাসন করেছিল, দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাদের কোন দায়বোধ বা আগ্রহ ছিল না। এমনকি বাংলা ভাষা তারা নিষিদ্ধ করে সংস্কৃতি ভাষাকেই গ্রহণ করতে অধিক আগ্রহী ছিল। তুর্কি ও মুঘলরা এ দেশে আসার পর এ অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটেছিল, অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতার অভূতপূর্ব যে বিকাশ ঘটেছিল এবং শ্রেণিবৈষম্য দূর কওে অসাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ববোধের যে জাগরণ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল, তখন নিম্নবর্গের বহু হিন্দু স্বতঃস্ফূতভাবে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। প্রকৃত অর্থে এক আলোর যুগ হিসেবে তা প্রতিষ্ঠা পায়। তুর্কি ও মুঘলরা এ দেশে ভিনদেশ থেকে এলেও এই দেশটাকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে এখানেই স্থায়ী বসতি নির্মাণ করেছিল, এদের সন্তানেরাই পরবর্তীতে এ দেশটাকে পরিচালনা করেছিল। সে সময়ে হিন্দু মুসলমানের যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। মুসলমানেরা তাদের ক্ষমতায় হিন্দুদেরও অংশীদারিত্ব করে উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা এটা মানতো দেশটা শুধু মুসলমানের নয়। হিন্দু-মুসলমান সকলের। পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল। এর মূলেও ছিল এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকরা। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে রক্তবীজ বুনে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর ছিল। আর এর মূলে ছিল চতুর ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী। এ দেশটাকে তারা শোষণ আর লুণ্ঠনের জন্য বেছে নিয়েছিল, এ দেশটাকে ভাগ করো আর শাসন করো, এটা ছিল তাদের নীতি। আর এদের তাঁবেদারি করেছিল উচ্চবিত্ত হিন্দু শ্রেণি। এ সব জটিল সময়কাল ও কূটিল রাজনীতি এবং এর গহিন সত্য লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় স্বচ্ছতার সাথে এ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস গ্রন্থ বলতে যে গুরুগম্ভীর ভাষা ও তথ্য-উপাত্তে ভরা রসহীন উপস্থাপনা। এ গ্রন্থটি তা থেকে মুক্ত। লেখক গ্রন্থটিতে তথ্য-উপাত্ত যেমন তুলে ধরেছেন, ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মন্তব্য যেমন গ্রহণ করেছেন, তেমনি নিজস্ব বিচারিক ও নির্মোহ যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সে সব বক্তব্যের সঙ্গে এক মত বা দ্বিমত পোষণ করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। এবং এই প্রয়াসকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, পাঠকের মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। লেখকের ভাষার শক্তিতে এটি সুপাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করবে এ আশাবাদ থাকছে। যে কোন দেশের, যে কোন কালের ইতিহাসকে সাবলীল ও প্রাণবন্ত ভাষায় গ্রন্থে রূপদান করা সহজসাধ্য নয়। ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে লেখকের মুন্সিয়ানা বা শিল্পদক্ষতার উপর নির্ভর করে। এই গ্রন্থের লেখক প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহর কাছে সে-কাজটি অনায়াসসাধ্য বলেই বিবেচিত হতে পারে। লেখক হিসেবে এটি তার বড় শক্তি। ইতিহাসকে উপন্যাস বা গল্পে রূপদান করা সহজ। সেখানে লেখকের অনেক স্বাধীনতা থাকে। ইতিহাসের মূল বিষয় সামনে রেখে মনগড়া অনেক ছবি সেখানে যুক্ত করে দুর্দান্ত এক শিল্পকর্ম রচনা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সেটা সৃজনশীল কোন সাহিত্যকর্ম ইতিহাসগ্রন্থ নয়। ইতিহাসগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব স্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না। লেখককে পুরো ইতিহাসের উপরই নির্ভর করতে হয়। সেটাকে ভাষার জোরে পাঠককে কতোটা আকৃষ্ট করা যায়, অতটুকুই লেখকের শক্তি। ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভ্যান হ’, মহাকবি ফেরদৌসের ‘শাহনামা’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’, নজরুলের ‘কুহেলিকা’, ‘অগ্নি-বীণা’, ‘প্রলয়-শিখা’, এমনকি মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সহ অনেক গ্রন্থ আছে যা ইতিহাসকে উপজীব্য করে রচিত। কিন্তু এসব গ্রন্থ কালোত্তীর্ণ মর্যাদা লাভ করলেও এগুলো ইতিহাস গ্রন্থ নয়, সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম। এসব গ্রন্থের ভাষা যত সহজে কাব্যিক, আবেগময় ও অলঙ্কারের ব্যবহারে পাঠকের মস্তিষ্কের কোষে কোষে প্রবল উর্মিমালা তৈরি করা যায়, ইতিহাস গ্রন্থে তা কল্পনা করাও কঠিন। এই কঠিনকে জয় করেছেন গবেষক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ। লেখক এমনভাবে ভাষাকে স্রোতমীয় করে তুলেছেন পাঠক কখন কিভাবে ইতিহাসের গভীর থেকে গভীরে একটা পর একটা দরোজা খুলে ঢুকে পড়েন, তা তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারেন না। অথচ এটি পুরোপুরি ইতিহাসগ্রন্থ। লেখকের ভাষাশৈলীতে গ্রন্থটি ইতিহাস গ্রন্থ হয়েও পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে।গ্রন্থটিতে মোট নয়টি অধ্যায় রয়েছে। শুরুতে পটভূমি। নয়টি অধ্যায়ের পরে আছে উপসংহার, পরিশিষ্ট ও গ্রন্থপঞ্জি। ‘সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক প্রভাব’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের পূবে ভারতকে অখণ্ড ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু যে প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন, তা বিশেষ করে গান্ধী ও নেহেরুর অসহযোগিতার কারণে যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি তার বিস্তারিত আছে। ‘ভারতে বৈষম্য সৃষ্টি’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ এবং দেশ ভাগের ক্ষেত্রে নেহেরু বদ্ধ পরিকর অবস্থান এবং এ প্রেক্ষিতে মুসলমানেদের জন্য জিন্নাহর আলাদা রাষ্ট্র গঠনের মতো হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়। ইংরেজ সরকার প্রথম থেকেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘাত-হানাহানি-বিরোধ সৃষ্টি করার নানা কূটকৌশল গ্রহণ করেছিল, তা অনেকখানি সফলতা পায় এদের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে। আর এর ফলেই সংঘটিত হয়েছিল কলকাতায় ১৯৪৬ এর ভয়াবহ দাঙ্গা। ‘বঙ্গভঙ্গে ভারতে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান’ অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে ভারতভাগের কারণে বাংলা ভাগ হয়েছে অনস্বীকার্য এই সত্য। কিন্তু এই ভাগের পেছনে ক্রীড়ানক হিসেবে কারা ছিলেন এবং কাদের স্বার্থে তারা এটা করেছিলেন । ‘বঙ্গভঙ্গ ও দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক ব্যবধান’ অধ্যায়ে তথ্য-উপাত্তসহ গবেষক তুলে ধরেছেন দেশভাগের আগে প্রায় দেড় শত বছর অবিভক্ত বাংলার উন্নয়ন তা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম বাংলাকেন্দ্রিক। পূর্ব বাংলা অবহেলিত থেকেছে। দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক ব্যবধান যে কত ভয়াবহ ছিল তা এই অধ্যায়ের মূল উপজীব্য। ‘বাংলা ভাগে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও হিন্দুসভার প্রভাব’ এ অধ্যায়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দ্বিজাতিতত্ত্বেও ভিত্তিতে ভারত ও বাংলা ভাগের মাধ্যমে অখণ্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্ন কিভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং এতে কংগ্রেস ও হিন্দুসভার ভূমিকা ও প্রভাব বর্ণিত হয়েছে। ‘বাংলা ভাগ ও দ্বিজাতি তত্ত’ অধ্যায়ে সুভাষচন্দ্র বসুর অখণ্ড ভারতের স্বপ্নপ্রয়াস কিভাবে গান্ধী-নেহেরুদের কূটচালের কাছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পর্যবসিত হয়েছিল তা বিশ্লেষিত হয়েছে। এওছাড়াও ‘সুভাষচন্দ্র বসু এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা’, ‘অবিভক্ত বাংলা আন্দোলন এবং ভারত ও বাংলা ভাগ: প্রকাশিত গ্রন্থ ও পণ্ডিতবৃন্দের মতামত পর্যালোচনা’র মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে এ গ্রন্থে। গ্রন্থের শুরুতে লেখক যে পটভূমি উপস্থাপন করেছেন তা সমৃদ্ধতর। পুরো গ্রন্থের বক্তব্যকে এতো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, সেকারণে মূল গ্রন্থটি পাঠের পূর্বে ‘পটভূমি’ পাঠ করা অতীব জরুরি মনে করি। তাহলে গ্রন্থটি পাঠের আগেই পটভূমি থেকেই পাঠক একটি মূল ধারণা পেয়ে যাবে। যা মূলগ্রন্থ পাঠে পাঠকের দারুণ সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পটভূমিতে ভারতে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক মাঙ্গোলীয় অবস্থান এবং এদের পরে আর্যদের আগমন ও বসবাস ও হিন্দু ধর্মচর্চা এবং ক্ষমতা প্রয়োগ। আর্যদের পরে আরব এবং পরবর্তীতে তুর্কি ও মোঘলরা ক্ষমতায় আসে। এরপর ইংরেজ শাসন ও আধিপত্য এবং সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য তখন নানামাত্রিক যে সব আন্দোলন ও বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ সব বিষয় ধারাবাহিকভাবে সাবলীলভঙ্গিতে পটভূমিতে রূপ পেয়েছে। এসব বিষয়ই মূল গ্রন্থে অধ্যায় বিভাজনের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এই গ্রন্থে দুর্লভ অনেক ছবি স্থান পেয়েছে। এ ক্ষেত্রেও লেখক সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ছবিগুলোও প্রকৃত ইতিহাস আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গ্রন্থ রচনায় লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যা সাধারণত কোন গ্রন্থে লক্ষ করা যায় না। কারণ নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপন করতে হলে লেখকের সাহস ও শক্তি, সঠিক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার এবং অবশ্যই নির্মোহ নিরপেক্ষ বিচারিক ক্ষমতার অধিকারী হতে হয়, না হলে এটি সম্ভব নয়। গ্রন্থের শেষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, গ্রন্থের সময়কাল ক্রমানুসারে সাল হিসেবে সাজানো, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও গ্রন্থপঞ্জির সংযোজন গ্রন্থটিকে যেমন সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ রূপ দিতে সহায়ক হয়েছে, তেমনি গবেষণার গতানুগতিক আঙ্গিক-ধারা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবেও যে গবেষণাকর্ম করা যেতে পারে, এই গ্রন্থটি তার প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা রাখে। ভারতবর্ষের ইতিহাস ও বাংলা ভাগের ভিতর-বাহির নান ঘটনা সম্বলিত এটি একটি আদর্শ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লেখক: ড. রকিবুল হাসান। অধ্যাপক ও কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক।

দুরু দুরু বক্ষ ...

জুন মাসের ১৩ তারিখ এই বছরের বাজেট ঘোষণা করার দিন। সেই হিসেবে যখন আমার এই লেখাটি প্রকাশিত হবার কথা তার আগেই আমাদের বাজেটটি সবার জানা হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে দেশের বাইরে বসে যখন আমি এই লেখাটি লিখছি তখন অবশ্য আমি বাজেট সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। প্রতিবছরই আমাদের বাজেট বেড়ে যাচ্ছে, দেখে বড় ভালো লাগে। প্রতিবছরই আমি বাজেট নিয়ে এক ধরনের স্বপ্ন দেখি, আমার স্বপ্নটা অবশ্য শিক্ষাখাতের বরাদ্দ নিয়ে। প্রতিবছরই ভাবি এই বছর নিশ্চয়ই শিক্ষার জন্য একটা সম্মানজনক বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু আমার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। এই বছর শিক্ষাখাতে কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে জানি না কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি আমাদের বাজেট কমতে কমতে জিডিপির ২.২ শতাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটি কিন্তু শুধু দুঃখের ব্যাপার ছিল না, এটি আমাদের জন্য একটি লজ্জার ব্যাপারও ছিল। যারা আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না তাদেরকে বলবো উইকিপিডিয়াতে গিয়ে কোন দেশ শিক্ষা খাতের জন্য কত টাকা খরচ করে সেটা একবার নিজের চোখে দেখতে। আমি নিশ্চিত তারা অবাক হয়ে দেখবে সারা পৃথিবীতে যে দেশগুলো শিক্ষার পেছনে সবচেয়ে কম খরচ করে বাংলাদেশ তার মাঝে একটি। আমাদের থেকে কম খরচ করে যে দেশগুলো তাদের মাঝে রয়েছে সুদান (২.০ শতাংশ) কিংবা সাউথ সুদানের (১.৮ শতাংশ) মত দেশ। সারা পৃথিবীর উন্নয়নের মডেল হয়ে আমাদের যদি সুদান কিংবা সাউথ সুদানের মত অকার্যকর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সঙ্গে তুলনা করে শান্তি পেতে হয় তাহলে তার থেকে বড় লজ্জার কথা আর কী হতে পারে? আমাদের পাশাপাশি সবগুলো দেশ শিক্ষাখাতে আমাদের চেয়ে বেশি খরচ করে। ভারতবর্ষ খরচ করে জিডিপির ৩.৮ শতাংশ, শ্রীলংকা ৩.৫ শতাংশ। পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্রটিকে আমি আজকাল হিসেবের মাঝেই আনতে রাজী না, সেটি পর্যন্ত জিডিপির ২.৮ শতাংশ খরচ করে। এমন কি যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান তাদের জিডিপির ৩.১ শতাংশ লেখাপড়ার পেছনে খরচ করে। প্যালেস্টাইন এখন পর্যন্ত একটা স্বাধীন দেশই হতে পারেনি তারা পর্যন্ত খরচ করে জিডিপির ৫.৭ শতাংশ। একেবারে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় ফিদেল কাস্ত্রোর দেশ কিউবার কথা শুনলে, তারা খরচ করে জিডিপির ১২.৯ শতাংশ! আর সারা পৃথিবীর উন্নয়নের মডেল হয়ে আমরা এতদিন খরচ করে এসেছি জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ। সারা পৃথিবীর সামনে যদি লজ্জায় মাথা কাটা যাবার অবস্থা হয় তাহলে কী দোষ দেওয়া যায়? শিক্ষার জন্যে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ না করে আমরা ছেলেমেয়েদের ঠিক করে লেখাপড়া করাতে পারছি না বলে লজ্জা নয়, জাতি হিসেবে লেখাপড়াকে আমরা কোনো গুরুত্ব দেই না বলে লজ্জা। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশের মানুষের অভিযোগের কোন শেষ নেই। আমিও মাঝে মাঝে দুঃখ করি, লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলি কিন্তু কখনো অভিযোগ করি না। কোন মুখে অভিযোগ করবো? এতো কম টাকা খরচ করে পৃথিবীর আর কোন দেশ এতো বিশাল জনগোষ্ঠী এতো বেশি লেখাপড়া করাতে পেরেছে? লেখাপড়ার মান যদি বাড়াতে চাই তাহলে তার জন্য টাকা খরচ করতে হবে। যদি এর পেছনে টাকা খরচ না করে শুধু অভিযোগ করে যাই এবং সেই অভিযোগ থেকে রক্ষা পাবার জন্য জোড়াতালি দিয়ে একটা সমাধান খুঁজে পাই তাহলে কোনদিন শিক্ষার মানের উন্নতি হবে না। বিষয়টা যে কেউ জানে না তা নয়। আমি নিজের কানে আমাদের আগের অর্থমন্ত্রীকে দুঃখ করে বলতে শুনেছি দেশের শিক্ষার জন্য যত টাকার দরকার এখন বাজেটে তার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ রাখা হচ্ছে। (কথাটি একশ’ ভাগ সত্যি, বাংলাদেশ ডাকার সম্মেলনে সারা পৃথিবীর সামনে অঙ্গীকার করে এসেছিল যে তারা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষার পেছনে খরচ করবে।) যদি দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা এটা জানেন তাহলে কেন আমরা শিক্ষা খাতে টাকা পাই না? সারা পৃথিবীর সব গুণীজন, সব শিক্ষাবিদ সব অর্থনীতিবিদ জোর গলায় বলে থাকেন শিক্ষাখাতে টাকা খরচ আসলে ‘খরচ’ নয় এটি হচ্ছে ‘বিনিয়োগ’। শিক্ষার জন্য যদি এক টাকাও খরচ করা হয় সেই একটি টাকাও কিন্তু কোথাও না কোথাও কাজে লাগে, কখনোই সেই টাকাটি অপচয় হয় না। তাহলে শিক্ষার জন্য টাকা খরচ করতে আমাদের ভয়টি কোথায়? ২. এই বছর শিক্ষা খাতে কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে আমরা এখনো জানি না। যদি সত্যি সত্যি এই বছর আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়ে থাকে, শিক্ষাখাতে আমরা একটা সম্মানজনক বরাদ্দ পেয়ে থাকি তাহলে আমরা কী কী করতে পারি? সেই স্বপ্নের কথা বলে শেষ করা যাবে না, আপাতত শুধু শিক্ষকদের কথা বলি। সংবাদপত্রে আমরা যেসব খবর দেখি তার মাঝে সবচেয়ে হৃদয় বিদারক খবর কী হতে পারে? আমার কাছে মনে হয় সেটি হচ্ছে একটুখানি বেতনভাতা, একটুখানি নিরাপত্তা এবং একটুখানি সম্মানের জন্য শিক্ষকদের আন্দোলন। (না, আমি মোটেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা বলছি না, আমলাদের মত এতখানি না হলেও তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনী প্যানেল নিয়ে কথা বলার জন্য তারা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আমি স্কুল শিক্ষকদের কথা বলছি।) আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে অনশন, আমরা সবসময়েই দেখি শিক্ষকেরা আমরণ অনশন শুরু করেছেন। সেই অনশনের কী ফল হয় আমরা জানি না, একদিন দেখি কয়েকদিন অভুক্ত থেকে নানা বয়সী পুরুষ এবং মহিলা শিক্ষকেরা নিজের জায়গায় ফিরে যান। এভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে নিজেদের পরিবার-পরিজন কিংবা ছাত্রছাত্রীদের সামনে তাদের মুখ দেখাতে কেমন লাগে কে জানে! যদি শিক্ষা খাতে এবারেই আমরা যথেষ্ট টাকা পেয়ে যাই তাহলে কী আমরা দেশের সব স্কুলের অবকাঠামো ঠিক করে যোগ্য শিক্ষকদের বেতনভাতা দেওয়া শুরু করা যেতো না? আমরা আসলে এটাকে খুব জরুরি মনে করি না, ধরেই নিয়েছি স্কুল শিক্ষকের মান-মর্যাদা জীবন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেভাবে চলছে সেভাবেই চলুক। দেশের বড় বড় জায়গায় ভালো কিছু স্কুল থাকবে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ছেলেমেয়েরা সেই খ্যাতনামা স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করবে। আর দেশের আনাচে-কানাচের স্কুলগুলো ধুঁকে ধুঁকে কোনভাবে টিকে থাকবে এবং সেই স্কুলগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে কীভাবে রসাতলে গিয়েছে সেটি বর্ণনা করে হতাশায় মাথা নাড়বে। খুব ভালো স্কুল বিল্ডিং, সুন্দর ক্লাস রুম, চমৎকার লাইব্রেরী, আধুনিক ল্যাবরেটরি আর বিশাল খেলার মাঠ থাকলেই যে সেখানে খুব ভালো লেখাপড়া হবে সেটি কিন্তু ঠিক নয়। ভালো অবকাঠামো অবশ্যই দরকার কিন্তু সেটা সবকিছু নয়। ভালো লেখাপড়ার জন্য আরো তিনটি বিষয় দরকার, সেগুলো হচ্ছে ভালো পাঠ্যবই, ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি এবং ভালো শিক্ষক। ভালো পাঠ্যবই হলে ছেলেমেয়েরা নিজেরাই অনেক কিছু শিখে নিতে পারে, তাদের প্রাইভেট টিউটর আর কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে হয় না। সবাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে চায়, তাই পরীক্ষা পদ্ধতি ভালো হলে যারা ভালো জানে শুধু তারাই ভালো নম্বর পাবে এবং ছেলেমেয়েরা নিজেরাই মুখস্ত করে শর্টকাট পদ্ধতির জন্য না গিয়ে সত্যিকারের লেখাপড়া করবে। ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতির জন্য যে খুব বেশি বাজেট দরকার তা নয়, তার জন্য দরকার সদিচ্ছা আর সুন্দর একটা পরিকল্পনার। এই দেশে এর যে বড় ঘাটতি আছে সেটা মনে হয় না কিন্তু তার পরেও কেন এই দেশের ছেলেমেয়েরা ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি পাচ্ছে না সেটা বুঝতে পারি না। (যেমন আমি সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির নানা রকম সমালোচনা শুনি, শিক্ষকেরা যেহেতু মান সম্পন্ন প্রশ্ন করতে পারেন না, বিশাল প্রশ্নের একটা ডাটাবেস তৈরি করে রাতারাতি এই সমস্যা মিটিয়ে দেওয়া যায়। সেটা নিয়ে আলোচনাও হয়েছে কিন্তু কার্যকর হতে দেখছি না।) ভালো পাঠ্যবই আর ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি হয়তো সহজেই পাওয়া যাবে কিন্তু ভালো শিক্ষক পাওয়া কিন্তু এতো সহজ নয়। এর জন্য আমাদের টাকা খরচ করতে হবে। আমি সব সময়েই কল্পনা করি শিক্ষকদের জন্য একটা আলাদা বেতন স্কেল হবে এবং সেই স্কেলটি হবে খুব আকর্ষণীয় একটা স্কেল। সেটি এমন আকর্ষণীয় হবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল শিক্ষকদের এতো রকম সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক সম্মান দেওয়া হবে যে একজন তরুণ শিক্ষার্থী পাস করে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতই শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখবে। জীবনটাকে উপভোগ করা যদি বেঁচে থাকার স্বার্থকতা হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষক হওয়ার মত আনন্দ আর কিসে আছে? এসবই কী খুব অবাস্তব কল্পনা? আমার তো মনে হয় না। এখন দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি, এবারের বাজেটে কী শিক্ষাখাতে একটা সম্মানজনক বরাদ্দ রাখা হয়েছে? আরকে//

মোদি সরকার ২.০ এবং আগামী দিনের ভারত

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থের শেষ দিকে আপসোস করে বলেছেন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেল বটে, কিন্তু ভারত মাতার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। দ্বিখণ্ডিত এই দেহ থেকে যে রক্তক্ষরণ শুরু হলো তার শেষ কোনোদিন হবে কিনা তা নিয়ে মাওলানা নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মুসলমানদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের স্লোগান তুলে যেভাবে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো তাতে গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ হাসিল হলেও সমগ্র ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ আগামীতে কিভাবে রক্ষিত হবে তার কোনো কিনারা তিনি দেখতে পাননি। আয়েশা জালালের গ্রন্থ, দ্যা পিটি অব পার্টিশনের বর্ণনা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের কয়েক মাসের মধ্যে উভয় সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ লাখ নিরীহ মানুষ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বলি হয়েছেন এবং চৌদ্দপুরুষের ভিটে মাটি ছাড়া হলেন প্রায় দেড় কোটি। হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি, তারা আলাদা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের বাসিন্দা হলে উপমহাদেশে শান্তি আসবে, এই ধারণার কোনো বাস্তব চিত্র বিগত ৭২ বছরে দেখা যায়নি। তারপর ১৯৭১ সালে তো পাকিস্তানের এক মুসলমান পক্ষ অন্য মুসলমান পক্ষের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করল, ধর্ষণ করল দুই লক্ষ নারীকে। সঙ্গত কারণেই সাধের পাকিস্তান থাকল না, দ্বিখণ্ডিত হলো। এখন বর্তমান যে পাকিস্তান সেখানে তো প্রায় শতভাগ মুসলমান। তারা আগামীতে এক পাকিস্তান হয়ে থাকবে এমন কথা কোনো যুক্তিবাদি মানুষ বিশ্বাস করে না। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। প্রায় একশ কোটির অধিক হিন্দুদের মধ্যে ভারতে এখন প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের আবাস। ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে তীব্র জাতীয়তাবাদি ও সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুলে যেরকম মহাপ্লাবনসম বিজয় অর্জন করেছে তা এক কথায় বিস্ময়কর এবং অভাবনীয়। শুধুমাত্র দক্ষিণের কেরালা ও তামিলনাড়ু বাদে এতদিন রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারি আঞ্চলিক দলগুলো প্রায় ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে। উত্তর প্রদেশে দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বি আখিলেশ যাদবের সমাজবাদি পার্টি (এসপি) এবং মায়াবতির বহুজন সমাজবাদি পার্টি (বিএসপি) এবার জোটবদ্ধ হওয়ায় সকল জায়গা থেকেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসন ২০১৪ সালে প্রাপ্ত আসন থেকে অর্ধেক বা তারও নীচে নেমে আসবে। কিন্তু ২৩ মে ফল প্রকাশের পর দেখা গেল উল্টো চিত্র। ২০১৪ সালে প্রাপ্ত ৭১ আসনের জায়গায় এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৬০টি আসন। একমাত্র রায়ব্রেলির আসনটি ছাড়া উত্তর প্রদেশ থেকে কংগ্রেস একেবারে ছাপ হয়ে গেল। সবচাইতে বিপর্যয় ঘটেছে আমেথি আসনে। গান্ধী পরিবারের মর্যাদার প্রতীক সেই আমেথি আসনে বিজেপির প্রার্থী স্মৃতি ইরানীর কাছে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী হেরে গেছেন। কেউ ভাবতেও পারেনি। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হলেও সৌজন্যতার খাতিরে উত্তরের দুই মহারথী যাদব আর মায়াবতি আমেথি আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। তারপরও রাহুল গান্ধীর হেরে যাওয়াটা আগামীতে ভারতের রাজনীতির জন্য সুদূরপ্রসারি বার্তা বহন করে। বিজেপির উত্থানের পথে উত্তর প্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গকে আরেকটি বড় চেক পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এখানে কোনো অংক এবং হিসাব-কিতাব কাজ করেনি। এখানেও অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। এপ্রিল মাসে নির্বাচন শুরু হওয়ার পরপরই ঢাকায় এসেছিলেন সর্ব ভারতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহুয়া চৌধুরী। কোলকাতার মানুষ এখন দিল্লিতেই থাকেন। ঢাকায় তাঁর সাথে কথা প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এবার হয়তো সাত-আটটি আসন পেতে পারে। তিনি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়েই বললেন, ‘না দাদা দুটি আর টেনে টুনে হলে তিন-চারটির বেশি আসন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে পাবে না।’ সেই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গে আসন পেয়েছে তারা ১৮টি। ২০১৪ সালে যেখানে ভোট পেয়েছিল শতকরা ১৭ ভাগ, সেখানে এবার পেয়েছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ ভোট। পশ্চিমবঙ্গে এমনটার জন্য সবাই মমতা ব্যানার্জিকেই দুষছেন। বেপরোয়া আচরণ এবং ভোট ব্যাংক রাজনীতির অতি তোষণে মুসলিম উগ্রবাদিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ার জন্য মমতার অনড় ভূমিকার পিছনে কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গের উগ্রবাদি মুসলিম রাজনৈতিক গোষ্ঠির বিরোধীতা, যারা বাংলাদেশের জামায়াতিদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় মমতা ব্যানার্জীর বিরোধীতার কারণে যখন তিস্তা চুক্তি হলো না, তার অব্যবহিত পর কোলকাতার গড়ের মাঠে এক বিশাল জনসভায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছিলেন, তিস্তা চুক্তির বিরোধীতা করে মমতা ব্যানার্জী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের মতো জামায়াতপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলে পুনরায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে, এই কঠিন সত্য মমতা ব্যানার্জী বুঝছেন না। তখনই বোঝা গিয়েছিল বিজেপির পরবর্তী টার্গেট হবে পশ্চিমবঙ্গ। এই নির্বাচনের সময়ে বিজেপির প্রচারণার কৌশল ও গুরুত্ব দেখেও সেটা বোঝা গেছে। অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি আলাদা আলাদাভাবে পশ্চিমবঙ্গে সাত-আটবার করে নির্বাচনি জনসভা করেছেন। আগামী ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে তা এখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। তৃণমূল থেকে ইতোমধ্যেই দুইজন বিধায়ক এবং পঞ্চায়েত সভার ৫০ জন কাউন্সিলর বিজেপিতে যোগদানের খবর বেরিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন ডুবন্ত উন্মুখ জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়া শুরু হয়েছে। তৃণমূলের হাতে গত পাঁচ বছর বিজেপির যে ৫০ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে, সেই ৫০ জনের পরিবারকে দিল্লীতে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাম ও কংগ্রেসের এককালের নিবেদিত ভোট সব গিয়ে পড়েছে বিজেপির বাক্সে। খবর বেরিয়েছে তৃণমূলের অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে শক্তিহীন বাম এবং কংগ্রেসের ভোটাররা বিজেপির ঘরে ঢুকেছে। অনেকে বলছেন, বামের ভোট এবার রামে গেছে। এই যে, প্যারডিস শিফট বা ভূমিধস পরিবর্তন তা কি আগামীতে ভারতের জন্য ভাল হবে, নাকি মন্দ হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে উদার প্রগতিবাদি ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর আস্থাবান মানুষ কিছুটা হলেও যে শঙ্কিত সে কথা বলতেই হবে। দক্ষিণে তামিলনাড়ু ও কেরালায় বিজেপি বিরোধী শক্তি অটুট থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অন্ধ প্রদেশ এবং ওডিশায় বিজেপির মিত্র পক্ষই লোকসভার আসনে বিপুল জয় পেয়েছে এবং একই সময়ে অনুষ্ঠিত বিধান সভার নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় উঠেছেন। মোদি বিরোধী ব্লকে থাকা অন্ধ প্রদেশের ক্যারিশম্যাটিক নেতা চন্দ্রবাবু নাইড়ু রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন এবং তার স্থলে মূখ্যমন্ত্রী হলেন মোদি ঘনিষ্ঠ তরুণ নেতা জগমহল রেড্ডি। ওডিশায় বিজেপি মিত্র নবীন পাটনায়েক বিপুল বিজয় নিয়ে পঞ্চমবারের মতো মূখ্যমন্ত্রী হলেন। এক সময়ে বিহারের প্রতাপশালী নেতা লালু প্রসাদ যাদব, তার পরিবার ও দলের কোনো নিশানা নেই। সেখানেও নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডি-ইউ) ও বিজেপি জোট বেশীরভাগ আসন দখল করেছে। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেখানে কোথাও কংগ্রেস নেই। প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলো সব বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। সর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক মেরুকরণে নরেন্দ্র মোদির বিজেপির অবস্থান এখন অনেকটাই ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত পর স্বাধীনতা উত্তর সময়ে জওহরলাল নেহেরুর কংগ্রেসের মতো হতে যাচ্ছে বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। সুতরাং প্রশ্ন ওঠেছে, তাহলে কি নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক পক্ষ আপাতত ভারতে থাকছে না। ভারতের মতো এত বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার দেশে প্রবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে এত বেশী জাত-পাত, ভাষা, সংস্কৃতির বহুত্ববাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিহীন শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠান কি আগামী দিনে ভারতের জন্য মঙ্গলজনক হবে? এই প্রশ্ন ওঠার পিছনে অনেক প্রেক্ষাপট ও সঙ্গত কারণ রয়েছে। বিজেপির সর্ব ভারতীয় বিশাল উত্থানের পিছনে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদি সংগঠন আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) এবং শিব সেনার মত দল। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরপেক্ষ খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া হাউসের ভাষ্যকারদের মতে বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের পিছনে গত পাঁচ বছর তাদের শাসনের সফলতা যতটুকু না কাজ করেছে, তার চাইতে অনেক বেশি কাজ করেছে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত নেতৃত্বের কারিশমা এবং তার সঙ্গে কট্টর জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদের স্লোগান। নির্বাচনের প্রচার অভিযানে যে তিনটি প্রধান ইস্যু বিজেপি সামনে রেখেছে তার বাস্তবায়ন শুধু ভারত নয় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রথমত অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ। ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা এবং সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের প্রচেষ্টার জের ও সূত্র ধরে এ পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে যা ঘটেছে সেদিকে তাকালে এই লেখার একেবারে শুরুতে উল্লেখ করা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কথাই স্মরণে আসে। হিন্দু-মুসলমান, একই বৃন্তে দুটি ফুল, কেউ আর রক্তক্ষরণ চায় না, কারো তা কাম্য হওয়া উচিত নয়। প্রথমত, ভারতে এখন প্রায় ২০ কোটি মুসলমান সম্প্রদায়ের আবাসভূমি। দ্বিতীয়ত, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (এনআরসি) বা নাগরিগত্ব ইস্যু। নির্বাচনের প্রচার অভিযানের সময় বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মুখ থেকে এই ইস্যুতে যেসব কথা বের হয়েছে তা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। তৃতীয়ত, ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তারা বাতিল করবেন বলে বলেছেন। কাশ্মীরের বর্তমান যে অবস্থা তাতে এই ঘোষণা কার্যকর হলে সেটি পরিস্থিতিকে আরো বিপদজনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। ২০১৪ সালে কাশ্মীরের ছয়টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি তিনটি পেলেও এবার এই মহাবিজয়ের সময়ে একটি আসনও পায়নি। তবে একথাও বলতে হবে বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকের শঙ্কা থাকলেও একই সঙ্গে আশাবাদের জায়গাও কম নয়। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে ভোটের রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ২৩ মে ফল প্রকাশের পরপরই দিল্লির পার্লামেন্ট ভবনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সকল দলের ৩৫৩ জন লোকসভার সদস্যদের উদ্দেশ্যে নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘক্ষণ দিক নির্দেশনামূলক গুরত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। সে সময়ে মঞ্চে লাল কৃষ্ণ আদভানি, মরলি মনোহর যোশীসহ জোটের সব শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মোদির পূর্বের স্লোগান সবকা সাথ, সবকা বিকাস, এবার নতুন করে তার সঙ্গে যোগ করেছেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা- সবকা বিশ্বাস। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে সকলের উন্নতি এবং সবার বিশ্বাস তিনি অর্জন করতে চান। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও তাদের জন্যে কাজ করার কথা কয়েকবার ওই ভাষণে উল্লেখ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয়ত জোর দিয়ে বলেছেন তিনি ভারতের সংবিধানকে অক্ষুন্ন রাখবেন এবং তার পবিত্রতা রক্ষা করবেন। উপরোক্ত দুটি অঙ্গীকারের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী তা প্রশংসিত হয়েছে। আগামী দিনে দেশের ভেতরে ও বিশ্ব অঙ্গনে ভারতের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে তার বাস্তবায়ন চাইলে, উপরোক্ত অঙ্গীকার থেকে মোদি এবং তাঁর সরকারের সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভারতের অভ্যন্তরে যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদের বাড়াবাড়ির ঘটনা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অঙ্গনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের একটা বড় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নরেন্দ্র মোদি নিজে এবং বিজেপি নিশ্চয়ই এ সব ইস্যুতে সতর্ক থাকবেন। ভারত নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে মর্যাদাপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চাইবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে ভারতকে অবশ্যই তার বহুত্ববাদের মূল্যবোধকে সর্বত্রই সমুন্নত রাখতে হবে। এটা নরেন্দ্র মোদি নিজে যেমন উপলদ্ধি করেন, তেমনি ভারতের সব পক্ষের পরিপক্ক রাজনীতিক ও সুশীল সমাজও সেটি বোঝেন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনীতির সমীকরণে চীন-আমেরিকার টানাপোড়নে ভারত থাকবে ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকায়। বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি টেনেই লেখাটি শেষ করছি। এতদিনে উভয় দেশের সব পক্ষের রাজনীতিক, মিডিয়া, সুশীল সমাজ সকলেই উপলদ্ধি করেছেন ভারত-বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি একই সূত্রে গাঁথা। সুতরাং প্রত্যাশা করা যায় মোদির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সরকারের মেয়াদেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলোতে ঈদ ও কিছু কথা 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরের একটি শহর। শহরটির নাম বাফেলো। এটিকে আমেরিকার বুকে ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আপনি শুনে অবাক হবেন এই বাফেলোতে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রবাসী বাংলাদেশিরাই নিয়ন্ত্রণ করছে সেই শহরের ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুই! তবে আমেরিকা-কানাডা সীমান্তে অবস্থিত বাফেলো নামের শহরটা ছবির মতো এত সাজানো গোছানো ছিল না। এই শহরে বিশ বছর আগেও বাঙালিদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। কিন্ত এখন এই শহরে গেলে শ্বেতাঙ্গ খুঁজে পাওয়াটাই হবে কষ্টের। নব্বইয়ের দশক থেকে এই শহরে বাংলাদেশিদের আগমন শুরু হয়। ওই সময় বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকেই নিউইয়র্ক ছাড়তে শুরু করেন। কেউ কেউ চলে যান মিশিগানে, আবার কেউ কেউ পাড়ি জমান নিউইয়র্ক থেকে কয়েক ঘন্টা দূরত্বের শহর বাফেলোতে। বাফেলো শহরটা তখন ছিল সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। চোর, ডাকাত, ড্রাগ ডিলার থেকে শুরু করে খুনি, সব ধরণের অপরাধীরাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতো এই শহরে। শহরের বাসিন্দা ছিল খুবই কম, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই দোকানপাট বন্ধ করে সবাই ঘরে ঢুকে যেতো। শহরের অধিবাসীদের অনেকেই চলে গিয়েছিলেন শহর ছেড়ে, তাদের বাড়িঘরগুলো পড়ে ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। আগের তুলনায় বাফেলোর চিত্রটা অনেক পাল্টে গেছে। বর্তমানে বাফেলো শহরে প্রায় ৩০ হাজারের উপরে বাঙালি তথা বাংলা ভাষাভাষী লোকজন বসবাস করে। যেখানে রয়েছে, মুদি দোকান , বাংলা ভাষার ডাক্তার ছাড়াও বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অধ্যাপক ও প্রভাষক। প্রসঙ্গ ছিলো বাফেলোতে ঈদ। গত তিন বছর ধরে এ শহরে ঈদ করছি। অনেকটা দেশের মতোই। এটাই আনন্দ, এটাই খুশি। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য থেকে এখানে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে এখান থেকে চলে যাওয়া সংখ্যাটা খুবই কম। আমার মত অনেকেই বিগত সময়ে যারা নিউইয়র্ক বসবাস করতেন তাদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে। তাদের মধ্যে মানসিক, শারীরিক টেনশন দেখা গেছে। তাদের মধ্যে বাসা ভাড়ার চাপ, গাড়ি পার্কিং করার চাপ, বাচ্চাকে স্কুলে আনা নেওয়ার চাপ। এসব চাপের মধ্যে অনেকেই বাফেলো শহরে এসে পাড়ি জমিয়েছে।   ভিডিও লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম।

এ কে খন্দকারকে দেখে অনেকে শিক্ষা নিতে পারে

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেটাকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে হবে সবাইকে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দল-মত নির্বিশেষে অভিন্ন অবস্থান থাকতে হবে। পাশের দেশ ভারতে আমরা যেটা দেখি, কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। কিন্তু বিজেপি সরকার দেশটির জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করছে না। মহাত্মা গান্ধী একটি দলের নেতা ছিলেন, সত্য। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পর তিনি জাতির পিতা, জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুও একটি দলের নেতা ছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে তিনি জাতির পিতায় পরিণত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এখন জাতীয় সম্পদ। সব দলের উচিত তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেহুদা তর্ক-বিতর্ক করে আমরা অনেক সময় নষ্ট করেছি। এখন আর নয়। এ কে খন্দকারকে দেখে অনেকে শিক্ষা নিতে পারেন।  আর কিছুদিন পর বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হবে একই সময়ে। এটা ঠিক, এই সময়ে এসে আমরা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না। তবে এ কে খন্দকারকে বই সংশোধেনের ক্ষেত্রে যারা বাধা দিয়েছেন,তার অবশ্যই সবার নাম প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করছি। কারণ জাতি তাদের সম্পর্কে জানা উচিত।    নিজের লেখা বইয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ বছর পর জাতির কাছে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। `১৯৭১ :ভেতরে বাইরে` বইয়ে তিনি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন `জয় পাকিস্তান` বলে। দেশের স্বনামধন্য একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইটি বাজারে আসার পর হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্তির নানা চেষ্টা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই একটি মহলের মধ্যে এই প্রবণতা আমরা দেখে এসেছি। কিন্তু এ কে খন্দকারের বইয়ে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য অগ্রহণযোগ্য কেবল নয়, অপ্রত্যাশিতও ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কেবল নন; ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিমান বাহিনীপ্রধান। পরবর্তীকালে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন; মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ছিলেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতা। তিনি যখন খোদ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন, তখন বিক্ষুব্ধ হওয়া তো বটেই, বিস্মিত হওয়াও স্বাভাবিক। এ কে খন্দকারের বইটি প্রকাশের পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দৈনিকে লিখেছিলাম `১৯৭১ :ভেতরে বাইরে নিয়ে তিন প্রশ্ন` শীর্ষক নিবন্ধ। সেখানে যে তিনটি প্রশ্ন তুলেছিলাম, তার প্রথমটি অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এ কে খন্দকারের `জয় পাকিস্তান` শোনা নিয়ে। ঐতিহাসিক ওই সভায় আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। এ প্রসঙ্গে লিখেছিলাম- আমি তো বটেই; আমার ধারণা উপস্থিত গোটা জনসমুদ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনিনাদের প্রতিটি শব্দ শুনছিল। আমরা হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম ওই দিনের পরিস্থিতি। ভাষণের সময় উপস্থিত সব মানুষের মনে এখনও সেই ভাষণ গেঁথে আছে। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ শেষ করেছিলেন `জয় বাংলা` বলে। তিনি যেখানে বলছেন `এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম; সেখানে জয় পাকিস্তান কেন বলতে যাবেন- এটা তো কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়। (সমকাল, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। আমার ওই নিবন্ধে আরও দুটি প্রশ্ন তুলেছিলাম। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনকে `মোটামুটি সফল` বলা নিয়ে। বইটির ৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে এই মূল্যায়ন করেছেন। আমার প্রশ্ন ছিল- একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন যদি `মোটামুটি সফল` হয়, তাহলে পুরোপুরি সফল আন্দোলন তিনি বিশ্বের কোথায় দেখেছেন? আপামর জনসাধারণ ওই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। কৃষক, ছাত্র, জনতা, পেশাজীবী- সবাই সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী `যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে`। এমন অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- বাঙালির একটি মহৎ আন্দোলনকে কি এ কে খন্দকার জেনেশুনেই খাটো করতে চেয়েছেন? তৃতীয় প্রশ্ন তুলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এ কে খন্দকারের সীমান্ত পাড়ি দেওয়া নিয়ে। তার বইয়ের ৭৪, ৭৫ ও ৭৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, ২৮ বা ২৯ মার্চ পুরো পরিবারসহ সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ গিয়ে আবার ফিরে আসেন। এপ্রিলের শেষ দিকে আবার চেষ্টা করে আরিচা থেকে ফিরে আসেন। তৃতীয় ও শেষ চেষ্টায় মে মাসে আগরতলা চলে যান। আমার প্রশ্ন ছিল- তিনি বারবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করলেন এবং প্রত্যেকবারই বিমানবাহিনীর কর্মস্থলে ফিরে এসে দায়িত্ব পালন করে গেলেন; অথচ হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাকে কিছুই বলল না? আমি একাত্তরে তরুণ অর্থনীতিবিদ মাত্র। বেসামরিক প্রতিষ্ঠান পিআইডিতে (বর্তমানে বিআইডিএস) কর্মরত। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর কারফিউ শিথিল হওয়ার প্রথম সুযোগেই ২৭ মার্চ এলিফ্যান্ট রোডের বাসা ত্যাগ করি এবং পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি নিয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ হয়ে ভারতে চলে যাই। আমি ঢাকা ত্যাগ করার পরদিনই আমার বাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হানা দিয়েছিল। অথচ এ কে খন্দকারের মতো একজন বাঙালি সামরিক অফিসার নজরদারিতে ছিলেন না এবং দেশ ত্যাগ করার বারংবার চেষ্টা করেও বিমানবাহিনীর মতো সুরক্ষিত জায়গায় চাকরি করে গেছেন কীভাবে- এটা সত্যিই একটি বড় প্রশ্ন।  যা হোক, এ কে খন্দকার নিজেই শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে সাংবাদিকদের ডেকে এই ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। বইটির বিতর্কিত অনুচ্ছেদটি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিলম্বে হলেও তার যে বোধোদয় ঘটেছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু বইটি কেবল `জয় পাকিস্তান` নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি করেনি। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকে `মোটামুটি` সফল বলেও কি তিনি বিভ্রান্তি তৈরি করেননি? আমার মতে, বইয়ের বাকি বিষয়গুলো নিয়েও তার উচিত বিভ্রান্তি নিরসন করা বা প্রত্যাহার করা। বস্তুত এ কে খন্দকারের বিলম্বিত বোধোদয় এবং সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গ আরও তিনটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে- এত বড় `ভুল` তিনি করেছিলেন কেন? হতে পারে, তিনি বইটি নিজে লেখেননি। কাউকে ডিকটেশন দিয়েছেন। তারপরও পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের পর কি তিনি একবার পড়ে দেখেননি? বইয়ের ভূমিকায় তিনি যেভাবে `প্রচলিত অনেক ধারণা` ভেঙে দিতে চেয়েছেন, তাতে মনে হয় ৭ মার্চের ভাষণের তথ্য নিছক স্লিপ অব পেন নয়। বইটির ভাষ্য কি অন্য কোনো প্রকল্পের অংশ ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন- লেখার সময় বুঝতে না পারলেও এখন ভুল বুঝতে পারছেন কীভাবে? নাকি যে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বইটি লেখা, শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে? যদি তার এই ভুল স্বীকার সত্য হয়েও থাকে, তাহলে আরও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। নিশ্চিত না হয়েই যিনি ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত বিষয়ে এভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারেন; অন্যান্য বিষয়ে তাহলে তিনি কী করেন? এই ব্যক্তি আমাদের দেশের দুই মেয়াদে পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন! তৃতীয় প্রশ্ন- একটি ভুল স্বীকার করতে প্রায় পাঁচ বছর লেগে গেল? তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভুল স্বীকার আগেই করতে চেয়েছেন; কিন্তু নানা কারণে পারেননি। তিনি যদি ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারে আন্তরিক হয়ে থাকেন, তাহলে উচিত হবে এর পেছনের ঘটনা আদ্যোপান্ত খুলে বলা। বইটি কীভাবে লেখা হয়েছিল; মিথ্যা তথ্য দিতে কারা তাকে প্রভাবিত করেছে, কারা তাকে ভুল স্বীকার করতে দেয়নি; কারা বইটি সংশোধন করতে দেয়নি; স্বচ্ছতার স্বার্থে সব খুলে বলা উচিত। পৃথিবীর যত দেশ আছে কোথাও কোনো জায়গায় জাতির জনককে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য না করলেও বাংলাদেশে এমন ঘটনা শোনা যায়। তাই সবার উচিত জাতির জনককে নিয়ে মন্তব্যের বিষয়ে আরো যত্নবান হওয়া।    লেখক: ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

বিশ্বকাপে যেসব দলের জয় চান তসলিমা নাসরিন

শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ, চারিদিকে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। জয় নিয়ে হিসেব কষছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। কে হতে যাচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এরইমধ্যে অনেক ক্রীড়ামোদিরা তাদের প্রিয় দলকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। তেমনি বসে নেই ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের আলোচিত লেখিকা তসিলিমা নাসরিন। তিনিও প্রকাশ করেছেন নিজের অভিব্যাক্তি। বিশ্বকাপে কোন কোন দলের জয় চান তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন তিনি। মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ তালিকা প্রকাশ করেন। তসলিমা নাসরিন স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘যে দল ভালো খেলে সে দল জিতুক, সব সময়ই চাই। কিন্তু কোন দল জিতলে ভালো লাগবে -- তারও তো একটা লিস্ট চাই। রোববার বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জিতুক চেয়েছি। সোমবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তান জিতুক চেয়েছি। আজ শ্রীলংকার বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক চাইবো, পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতে জিতুক চাইবো। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক চাইবো। ৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতুক চাইবো। সাত তারিখে পাকিস্তান আর শ্রীলংকার মধ্যে যে ভালো খেলে সে জিতুক, আট তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, নয় তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারত জিতুক। বাকিগুলো এরকম, চাইঃ ১১ তারিখে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ১২ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাকিস্তান জিতুক, ১৩ তারিখে নিউজিল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১৪ তারিখে ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ওয়েস্ট ইণ্ডিজ জিতুক, ১৫ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শ্রীলংকা জিতুক, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক, ১৬ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১৭ তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ১৮ তারিখে জিতুক ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান, ১৯ তারিখে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতুক দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক, ২১ তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতুক শ্রীলংকা, ২২ তারিখে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে জিতুক ভারত, ২৩ তারিখে জিতুক দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পাকিস্তান, ২৫ তারিখে জিতুক অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, ২৬ তারিখে জিতুক নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তান। ২৭ তারিখে জিতুক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ভারত, ২৮ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শ্রীলংকা জিতুক, ২৯ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক, ৩০ তারিখে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত জিতুক, ১ জুলাই তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জিতুক শ্রীলংকা, ২ তারিখে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে যে ভালো খেলবে সে জিতুক। ৩ তারিখে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড জিতুক, ৪ তারিখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান জিতুক। ৫ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিতুক। ৬ তারিখে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে ভারত জিতুক আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা জিতুক। কিন্তু আমি চাইলেই যে সে দল জিতবে তা তো নয়। বরং আমার লিস্টের ফেভারিটগুলো বেশির ভাগই গোহারা হারবে। কিন্তু কী চাই তা বলতে দোষ কী।’

ওআইসির সমালোচনায় তসলিমা

অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশানের (ওআইসি) সমালোচনা করেছেন ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। গতকাল রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে ওআইসি নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি। স্ট্যাটাসে তসলিমা লেখেন, ‘ও আই সি। অরগানাইজেশান অফ ইসলামিক কোঅপারেশান। এইটা আবার কী জাতের অরগানাইজেশান? আমি তো কোনও অরগানাইজেশান অফ ক্রিশ্চান কোঅপারেশান বা অরগানাইজেশান অফ জুইশ কোঅপারেশান বা এই ধরণের কোনও সংস্থার নাম শুনিনি। যদি থাকেও এই ধরনের সংস্থা তবে সেগুলো নিতান্তই ক্ষুদ্র, নিতান্তই রক্ষণশীল, নিতান্তই অনাধুনিক,অবহেলাযোগ্য। আমরা সবাই অবিজ্ঞান মানি,আজগুবি রূপকথা মানি, আমরা অসভ্য, আমরা বর্বর, আমরা নারীবিরোধী, আমরা মানবতাবিরোধী আমরা গণতন্ত্রবিরোধী আমরা বাকস্বাধীনতাবিরোধী সুতরাং চলো আমরা মিলিত হই এবং পরস্পরকে সাহায্য করি, ব্যাপারটা একজাক্টলি তাই। সভ্য হতে হলে এইসব ধর্মীয় লেবাস, ধর্মীয় ভাইবেরাদরি ত্যাগ করতে হবে। সভ্য হতে হলে ধর্মকে সবার আগে দূরে সরাতে হয়, তারপর ব্যাক্তির সমাজের রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নতির জন্য কাজ করতে হয়। সভ্য হতে হলে গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারীর সমান অধিকার, শিশুর অধিকার, পশুপাখির অধিকারকে রক্ষা করতে হয় ,পৃথিবীকে সবার জন্য বাসযোগ্য করতে হয়, সবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতাকে সবার ওপরে স্থান দিতে হয়। ধর্মের সঙ্গে সভ্যতার বিরোধ চিরকালের। নানা ছুতোছাতায় পেছনে দৌড়োলে সত্যিকার লাভ কিছু হয় না। কিছু একটা পাওয়ার আশায় সভ্যতাবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করেও সত্যিকার লাভ কিছু হয় না ‘

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি