ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৮:৪৬:০২, বুধবার

বল্টু_সমাচার_৯

বল্টু_সমাচার_৯

কাজি সাহেবের অফিসের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে বল্টু এবং তার দুই বন্ধু। বিকেল চারটায় আসার কথা জরিনার। পাঁচটা প্রায় বেজে গেছে। কোন খবর নাই। মোবাইলে কল হচ্ছে। ধরছে না। এমন দিনেও ভেজাল করবে নাকি! বল্টু ভীষণ অস্থিরতায় ভুগছে। গতকাল বিস্তারিত আলোচনা করে সব ঠিক করা হয়েছে।   চারটায় এসে পাঁচটার মধ্যে বিয়ের কাজ শেষ করে সোজা বাসায়। সাক্ষী লাগবে দুজন। সেটাও ম্যানেজ করা হয়েছে। দুই বন্ধু স্বাক্ষী দেবে। দুজনেই চলে এসেছে। এখন পাত্রীর খবর নাই। কাজি সাহেব এরিমধ্যে তিনবার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। দেরি করলে জরিমানা নিয়ে বিদায়। সর্বনাশের আর কি বাকি থাকবে! কতো পটিয়ে পটিয়ে জরিনাকে বিয়ের জন্য রাজি করানো গেছে।   বন্ধু দুজনও দেরি দেখে রেগে যাচ্ছে। একজন তো বলেই ফেললো, : আর আসছে তোমার জরিনা! বিয়ের কাজ মানে হলো আগুন নিয়ে খেলা। এই খেলায় পেট্রোল ঢালতে হয়। তুমি তো কিছুই ঢালতে পারলা না। হবে কেমনে? দ্বিতীয় বন্ধু বললো, : পেট্রোল লাগবে না। কেরোসিন ঢেলে দিলেও হতো। প্রথমজন বলে উঠলো, : তোমাকে আর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সাজতে হবে না! যেই মেয়ে ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করে না, সে কি আর আসবে?   ওদের এসব কথাবার্তা শুনে বল্টুর অবস্থা কাহিল। এরকম ফচকে একটা মেয়ের কথা বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। বল্টু ভাবছে, : কখনো যদি ক্ষমতা পাই, নারী স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে দেবো! পুরুষ শুধু অর্ডার করবে। আর মেয়েরা ওই অর্ডার পালন করবে। নো হাঙ্কিবাঙ্কি! এমন সময় দেখা গেল, জরিনাকে নিয়ে একটা রিকশা এসে থামলো। বল্টুর মুখে হাসি। বিজয়ের হাসি।   বিয়ের ঝামেলা শেষ। সবাই মিলে একটা রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা জমালো। খাওয়া-দাওয়া শেষে বল্টু আর জরিনা একটা রিকশায় করে সোজা বাসায়। বুদ্ধি করে খাট ফাট আগেই গুছিয়ে গেছে বল্টু। আফটার অল বিয়েটা ফাইনাল। বাসর ঘরের মিনিমাম মর্যাদা তো রাখা চাই!   দুজনে প্রথমে ড্রইং রুমে সোফায় বসলো। বল্টুর কেন যেন খুব লজ্জা লাগছে। মুখ ফুটে বাসর ঘরে যাবার কথা বলাটা মুশকিল হয়ে গেল। এক্ষেত্রে জরিনার লজ্জা পাবার কথা। কিন্তু ওকে খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। এতো দিন পরে জরিনাকে নিজের করে পেয়েছে। প্রথম থেকেই টাইট দিয়ে রাখতে হবে। বল্টু একটু গম্ভীর গলায় বললো, : খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে! কিচেনে সবই রাখা আছে। চট করে দুকাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসো! একসাথে বসে খাই। বিকেল থেকে যা ধকল গেল! জরিনা খুবই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, : ভাইয়া, আমি এসব কিচেন ফিচেনের কোন কাজে নেই। এমনিতেই আমার স্কিনটা একটু ডার্ক টোন মারে। মা খুব কড়াভাবে নিষেধ করেছে কিচেনে যেতে। স্কিন নাকি নষ্ট হয়ে যাবে! একটু আদুরে গলায় যোগ করলো, আপনিই কষ্ট করে চা টা বানিয়ে ফেলুন না প্লীজ! একসাথেই খাবো।   স্তব্ধ হয়ে গেল বল্টু। এরকম বেয়াদবির কারণে বল্টুর রেগে যাবার কথা। তার বদলে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো, : এখনও তুমি আমাকে ভাইয়া বলে ডাকছো? এটা কি মশকরা করার টাইম? জরিনা খুবই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, : কেন? বিয়ে করলে কি ভাইয়া ডাকা যায় না? ডাকলে ক্ষতি কি? আমার ইচ্ছা! আমি ভাইয়া বলেই ডাকবো!   কি আশ্চর্য! কথাগুলো বলে আবার খিলখিল করে হাসছে! বল্টু এবার ভয়ংকর রেগে গেল। রীতিমতো থাপড়াতে ইচ্ছে করছে জরিনাকে। কাছে গেল প্রচণ্ড জোরে একটা চড় কষাবে বলে। কিন্তু হাত কিছুতেই ওপরে তুলতে পারছে না। হাত তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।   পরদিন অফিসে লাঞ্চ ব্রেকের সময় বল্টু জরিনাকে ফোন করলো। তার জানা আছে, মেয়েরা স্বপ্নের কথা শুনতে পছন্দ করে। তার উপর, স্বপ্নের লিডিং ক্যারেক্টার যদি নিজে হয়। জরিনা রিসিভ করতেই বলে উঠলো, : খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা কথা বলার জন্য কল দিয়েছি। শর্টকাট কথা। ধৈর্য ধরে শোন! জরিনা বললো, : শর্টকাট কথা শোনার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে কেন? যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। জরিনার জবাব দেবার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো আছে। গাঢ় স্বরে বল্টু বললো, : জানো...গতরাতে তোমাকে নিয়ে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখেছি জরিনা। আমার জীবনের সেরা স্বপ্ন। দেখলাম কাজি অফিসে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আর... জরিনা একটু কঠিন গলায় বললো, : বল্টু ভাইয়া, কি যে ঝামেলা করেন! এগুলো বলার আর টাইম পেলেন না! বাসায় মেহমান এসেছে। খুবই ব্যস্ত আছি। তাছাড়া এসব বিয়ে টিয়ের গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে না। বলেই কোনরকম বিদায় না নিয়ে লাইনটা কেটে দিল। বল্টু জাস্ট বোবা হয়ে গেল।   জরিনাদের অবজ্ঞায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।
ভাত কাব্য

ভাত কম খাবো বলে কত কায়দা যে করি! এক মুঠো ভাতে আট থেকে দশ মুঠো ডাল দিয়ে, সবুজ সবজি ফেলে, ভাত লেই করে যা বানাই তাতে আর ভাতের জাত থাকে না। তা দিয়ে ঘুড়ির সূতোয় মাঞ্জা দেয়া যায়। `ভাত খাওয়া` যায় না। সারাদিন চশমা দিয়ে খুঁজি কোন খাবারে কত কার্বহাইড্রেড (শর্করা) আছে। তারপর তার এক টুকরো নিয়ে সঙ্গে দুনিয়ার শাক পাতা ছাতা-মাথা নিয়ে চিবুই আর চিবুই। ওরা নাকি তখন আমার ব্রেনের সঙ্গে কথা বলে। ঈশিতা বলেছে, ‘মা অত হুড়াহুড়ি করে খেও না। ব্রেন বেচারাকে জানতে সময় দাও, যে তার দেহ খাচ্ছে। না হলে ঐ অত বেশি খেলেও কাজ হবে না। তোমার খিদে রয়ে যাবে আর তুমি আরো খাবে, আরো ভারী হবে গা। তখন আর পা ফেলতে পারবে না।’ শোনো মা, গরীবের মত ভাত খাবে। কি বলিস পাগল। গরীবরা যা ভাত খায়! একেবারে থালা উঁচু করে। পাশে শুধু লবন, বেগুনী রঙা কাঁচা পেঁয়াজ ও পোড়া মরিচ। না গো মা, তা না গরীব মানুষ যেভাবে ভেবে চিন্তে নিজেদের পয়সা খরচ করে, তুমি করবে ভাত। তোমার ভাত হচ্ছে, তোমার টাকা। এখন সব খেয়ে ফেললে আর কিছু থাকবে না শেষের দিকে। কিন্তু কে কারে থামায় আর কার মা কে? আমার কুটিমুটি ধানি-মরিচ চোখের আড়াল হলেই লুকিয়ে আরেক মুঠো নিয়ে নি। তরকারি বা মাছ লাগে না। খালি খালি নুন ডলে খেলেও স্বাদ লাগে। শেষের দিকে আব্বার মত একটু ডালে এক মুঠো ভাত নিয়ে লেবু ও কাঁচা মরিচ থেতো করে ভাত কচলে নিয়ে হাপুস হুপুস শব্দ তুলে খেতে হয়। ওটাই সুপার টেস্টি। বাসী ভাত ভাজির তুলনা নেই। আমরা তখন এই চাইনিজ মাইনিজ চিনতাম না। ফ্রিজ ও ছিলো না। আম্মা আগের দিনের ভাতে একটু কাঁচা মরিচ কুচো, কিমা করে পেঁয়াজ ও সর্ষের তেল দিয়ে ভেজে, নামাবার আগে বাগান থেকে তাজা ধনে পাতা কেটে ফেলে দিয়ে দুবার নাড়া দিয়েই নামিয়ে নিতেন। ভাত বিরান থেকে ধোঁয়া উঠতো। আর শীতের দিনে আমরা চার ভাইবোন পাটিতে বসে হু হা করে সেটা খেতাম। জানালা দিয়ে গায়ে এসে পড়তো পাকা লেবু রং রোদ। আব্বা ইজি চেয়ারে বসে হুক্কায় টান দিতেন। পাশে ‘বেগম’ পত্রিকা। আমাদের খাইয়ে আম্মা পড়বেন। আমরা কেউ চাইলে আম্মা একটা ডিম নিয়ে গনগনে কাঠের কয়লায় তেল ছাড়াই লোহার কালো কড়াইতে একটি ডিম ঘুটে দিতেন। বহু পরে দেখেছি এ অনেকটা চাইনিজ ফ্রাইড রাইসের মত। ও বলতে ভুলে গেছি, আম্মা ভাত ভাজায় একটু গুঁড়ো ধনে, মরিচও দিতেন। কদিন ধরে ভাবছি ঈশিতা লন্ডনে আসার আগেই মন প্রাণ ভরে এক দিন এক বাটি পান্তা খেয়েই ফেলি কি বলেন? নিজেই বানাবো। তারপর খেয়ে টেয়ে পেছনের উঠানে ব্যাংককের প্লাস্টিক পাটিতে পড়ে ভাত ঘুম দিয়ে উঠবো। বিলেতের সামার মানে দেশের শীত কাল। হু, বিলেতেই তা সম্ভব। তবে ব্রিকলেন থেকে রাজা শাইল চাল আনতে হয়। এর গায়ের মধ্যে মধু। অল্প জলের সঙ্গে কচলা কচলি করতে থাকলে গা থেকে ওই মধু নেমে সমস্ত জল ঘোলা করে তোলে। তার সঙ্গে দিতে হবে পোড়া মরিচের ডলা। মাইক্রোওয়েভেই মরিচ রোস্ট করা যায়। খালি একটু কিচেন টাওয়েলে পেঁচিয়ে দেবেন। না হলে কিন্তু বিলেতের বাড়ির কাশি হয়ে যাবে। আরো একটা জিনিস করতে পারেন। পান্তাটা ঘুটে মুটে দলিত করে অনেকটা পাত্রে মরিচ ও কাঁচা পেঁয়াজ কুচোতে দু` চামুচ সর্ষের তেল আর তাজা ধনে পাতা ছিঁড়ে লবন দিয়ে গ্লাভস পড়ে আচ্ছা মত ওদের বাপের দশ ছাড়িয়ে মাখবেন। আর তা দিয়ে রাজা শাইল পান্তা রাজার মত না প্রজার মত হাপুস হুপুস কনুই ডুবিয়ে খাবেন। এমন খাওয়া দেখে পিপীলিকার মনিবও কাঁদিয়া যাবে। লেখক: বিশিষ্ট কবি ও লেখক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী। আরকে//

অন্যরকম ঈদ

প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে ক্লান্তিহীন ভাবে বাবা ডেকে চলেছেন। : সানি, বাবা উঠে সেহরি খেয়ে নাও! রুমে এয়ারকুলার চলছে। তাই দরজা বন্ধ। তারপরও বাবার ডাকাডাকিতে ঘুম নষ্ট হয়ে গেল। প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছাড়লো সানি। দরজাটা খুলে আড়মোড়া ভেঙ্গে জানান দিলো, : আসছি বাবা! তোমরা শুরু করো! রমজানে প্রতি রাতেই সেইম কাহিনী। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কানে এয়ার ফোন লাগিয়ে ঘুমাতে। হয়তো এই ডাকাডাকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। গান শোনাও হল। কিন্তু সাহস হয় না। বাবা মানুষটা এমনিতেই রাশভারী টাইপের। রেগে গেলে ভয়ংকর। রোজার পুরো মাসটাই নামাজ, সেহরি আর ইফতার নিয়ে সবাইকে তটস্থ করে রাখেন। কোনরকম টাল্টুবাল্টু অ্যালাউ করেন না। হাতমুখ ধুয়ে সানি ডাইনিং টেবিলে চলে এল। মা এবং ছোট বোন রুমকি এখনও আসেনি। চান্স পেয়ে বাবাকে আবদারের সুরে বললো, : বাবা, সব ঈদেই তো আমাদের জন্য তোমার আলাদা একটা বাজেট থাকে। বাবা কৌতূহলী হয়ে তাকালেন সানির দিকে। মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলেন, : হুম। তা থাকে। আমার যতো টাকাই থাকুক না কেন, বাজেট ছাড়া চলা যাবে না ডিয়ার সান!এরিমধ্যে পুরোনো কাজের বুয়া সুখি`র মা টেবিলে খাবার সার্ভ করছে। দৌড়ের উপর আছে। কিচেন টু ডাইনিং। সানি বললো, : বাজেট ছাড়া চলতে আমিও বলছি না বাবা। জানতে চাচ্ছি, আমার জন্য এবারের বাজেট কতো? সানির বাবা শিল্পপতি জাহেদুল ইসলাম সাহেব সহজ মানুষ নন। বাতাসের ঘ্রাণ শুঁকেই অন্যদের মনের কথা বলে দিতে পারেন। তার মনে হচ্ছে, সানি হয়তো বড় ফিগারের কোন টাকা চাইতে যাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে সানির দিকে তাকিয়ে বললেন, : এটা তো তোমার মা বলবে। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? মতলবটা পরিষ্কার করো!সানি একটু গলা খাঁকারি দিলো। নার্ভাস লাগছে। জানে, বাবা এখন এই রুমের বাতাসের ঘ্রাণ নিচ্ছেন। সাহস করে বললো, : মতলব টতলব কিছু না বাবা। আমি এখন কলেজে পড়ছি। সেকেন্ড ইয়ারে। সব ফ্রেন্ডরা মিলে প্ল্যান করেছি, নিজেদের ঈদের কেনাকাটা এবার আমরা নিজেরাই করবো। তাই টাকাটা এবার আমাকেই দাও! নিজের পছন্দে সব কিনবো! ধারণা সত্যি হয়েছে। জাহেদ সাহেব নিজের ওপর সন্তুষ্ট হলেন। বললেন, : রুমকি তো তোমার বড়। সেতো আজ পর্যন্ত আলাদা করে কোন বাজেট চাইলো না। সানি একটু হেসে বললো, : আপু তো নীচতলায় গেলেও মাকে নিয়ে যায়। ও আবার আলাদা বাজেট কি চাইবে! একটু রাগ হচ্ছে। কন্ট্রোল করে জাহেদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, : কতো টাকা দরকার তোমার? সানি বললো, : ভালো কিছু কিনতে গেলে একটু বেশি টাকা লাগবে। অন্তত পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার। জাহেদ সাহেবের চোখ আরও সরু হয়ে এলো। বললেন, : এতো টাকার ঈদ বাজেট তো দেয়া সম্ভব না। ত্রিশ হাজার টাকা পাবে তুমি। এটাও অনেক বেশি। আমার আছে বলেই দিচ্ছি। আমার কথা শুনে তোমার কি মন খারাপ হয়েছে? সানি একটু বিমর্ষ ভাবে জবাব দিলো, : না বাবা। মন খারাপ হয়নি। ত্রিশ হাজারই দিও! আমার চলবে। থ্যাংক ইয়ু! জাহেদ সাহেব বললেন, : ওয়েল কাম মাই সান! ঈদের যেহেতু খুব বেশি বাকি নেই। কালই আমি টাকাটা তোমাকে দিয়ে দেবো। তবে প্রয়োজন হলে তোমার মা`র সাথে পরামর্শ করতে পারো। মা আর রুমকি চলে এসেছে। সেহরি পার্ট শুরু। চামচ আর বাটির সংঘর্ষে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। জাহেদ সাহেব তার স্ত্রী শারমিনকে বললেন, : ছেলে বড় হয়েছে। নিজে নিজে কেনাকাটা করবে। তাই ওকে কাল ত্রিশ হাজার টাকা দিও! এটা দিয়েই ওকে ঈদ পার করতে হবে। জাহেদ সাহেবের ধারণা ছিলো, স্ত্রী এটা শুনে কষ্ট পাবে কিন্তু শারমিন হেসে বলে উঠলেন, : বাঁদর টা তোমাকেও পটিয়ে ফেলছে! চিন্তিত চেহারা নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাহেদ সাহেব ভাবলেন, : ছেলে তার মাকে আগেই ম্যানেজ করে রেখেছে। এটা আগে টের পেলাম না কেন! তাহলে কি ঘ্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে! সানি তার সাকসেসফুল মিশন শেষ করে রুমে এসে বসে আছে। ফজরের নামাজের সময় হয়ে এলো প্রায়। ওযু করতে হবে। ভাবছে, : বাবা খুব বেশি বুদ্ধিমান মানুষ। সবার চাইতে এক স্টেপ এগিয়ে থাকে। কিন্তু ছেলের সাথে হেরে গেল। টার্গেট ত্রিশ হাজার ধরেই পঞ্চাশ চেয়েছিলো। জানতো, পরিমাণ কমবেই। আরও কমার আশঙ্কা ছিল। কমেনি। তীব্র আনন্দ চেপে রেখে মন খারাপের ভান করেছে। বাবার স্বভাব জানে বলেই এই অ্যাকটিং টা করতে হয়েছে। ঘ্রাণ নেবার ক্ষমতা ছেলের মধ্যে ট্রান্সফার হচ্ছে। বাবা এটা এখনো টের পায়নি। রক্ত বলে কথা! ড্রইং রুমের টিভি বন্ধ করে বেডরুমে ঢুকলেন জাহেদ সাহেব। রাত সাড়ে দশটার মতো বাজে। এটাই তার রুটিন। দশটার খবর দেখার পর টিভি বন্ধ। গিন্নী ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথায় চিরুনি চালাচ্ছে। কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে শারমিন বললেন, : টাকা পেয়ে ছেলেটা বখে গেল। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। বাসায় এসে ইফতার করে আবার বেরিয়ে যায়। রাত দশটার আগে একদিন ও ফেরে না। চেহারাটা ও কেমন যেন উস্কো খুস্কো হয়ে গেছে। শুনলাম বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে বেড়ায়। নেশা টেশা করে কিনা কে জানে! নাহলে খামোখা ওসব জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছে কেন!আমার আর ভালো লাগে না! জাহেদ সাহেব বললেন, : আমার বিশ্বাস আছে। আমার ছেলে ছোট খাটো ভুল করলেও চরম খারাপ কিছুতে জড়াবে না। তুমি এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না! কথাগুলো বললেও জাহেদ সাহেবের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ভাবছেন, ছেলের সাথে কথা বলতে হবে। ইফতারের সময় টেবিলে পাওয়া গেল সানিকে। শেষ মুহূর্তে কোন রকমে এসে সবার সঙ্গে বসেছে। জাহেদ সাহেব গম্ভীর কন্ঠে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, : বয়স বাড়ছে। দায়িত্বশীল হতে হবে। দুদিন পর ঈদ। নিজে কেনাকাটা করবে বলে এতো গুলো টাকা নিলে। কিনেছো কিছু? পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি, কোন ঝামেলার কথা যেন না শুনি! শুকনো মুখ করে জবাব দিলো সানি, : আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি, চাঁদরাতে সবকিছু কিনবো বাবা! ওটাই হবে আমাদের চাঁদরাতের আনন্দ।জাহেদ সাহেব চিন্তিত স্বরে বললেন, : আমাদের সবার ঈদ শপিং শেষ। শুধু তোমারটাই বাকি। শেষ করে ফেললে ভালো হতো। এনিওয়ে... চাঁদরাতেই করো না হয়! মা এবং রুমকি খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার ভান করছে। বাবা ছেলের কথার মাঝে কোন কথা বললো না। চাঁদরাতের সন্ধ্যা। সানি ফ্যামিলির সবাইকে মহল্লার পাশের বস্তিতে নিয়ে এসেছে। দেখা গেল, ওর বন্ধুরাও সবাই হাজির। কিছুক্ষণ পর সানির দুজন বন্ধু একটা পিকআপ ভ্যান ভর্তি মালামাল নিয়ে পৌঁছালো।বস্তির ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চাদের হৈচৈ এ কান পাতা দায়। সানির বন্ধুরা ভলান্টিয়ারের কাজ করছে। সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে একটা লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলো।জাহেদ সাহেব, শারমিন এবং রুমকি হতভম্ব হয়ে এসব দেখছে। জাহেদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,: পিকআপে কি আছে?সানি একটু রহস্য করে বললো,: আমাদের সবার ঈদের কাপড় চোপড়।বাবা আমরা সবাই মিলে এবার ঠিক করেছিলাম যে এমনিতেই আমাদের যথেষ্ট কাপড়চোপড় আছে। নিজেরা না কিনে ওই টাকা দিয়ে এই বঞ্চিত শিশুদের জন্য ঈদের জামা কাপড় কিনবো।কয়েকদিন ঘুরে ঘুরে আমরা প্রায় তিনশ` ছেলেমেয়ের নাম লিস্ট করে সবাইকে একটা করে কার্ড দিয়েছি। এখন এই কার্ডগুলো জমা নিয়ে নিয়ে আমরা ওদেরকে নতুন জামা উপহার দেবো।বিশ্বাস করো বাবা, তুমি রাগ করবে জেনেও আমি এই কাজটা করেছি কেবল নিজের ভালো লাগার জন্য। বড় হয়েছি না!আমাকে মাফ করে দাও বাবা! স্যরি! জাহেদ সাহেবের মুখ থেকে কথা সরছে না।বুঝে গেছেন, বাতাসে ঘ্রাণ নিয়ে সবাইকে ধরতে পারলেও ছেলের বেলায় ফেইল করেছেন।কোন রকমে বললেন,: কাছে এসো বাবা! বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। দুচোখ ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে।রুমকি এবং মা দুজনেই সানিকে বাবার বুক থেকে ছাড়িয়ে এনে জড়িয়ে ধরে থাকলো। এখন সবার চোখেই পানি।মা রুমকিকে ধরা গলায় বললেন,: গাড়িটা নিয়ে বাসায় যা! আমাদের সব নতুন কাপড়গুলো নিয়ে আয়! এগুলোর সাথে দিয়ে দেবো! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.। এসএ/  

বল্টু_সমাচার_৮

বেশ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকাটা বেশ খোলামেলা। তাই বাতাসের তোড়ে সব কিছুই মনে হলো উড়ে যাচ্ছে। জরিনা তার শাড়ি সামলাতে ব্যস্ত। মোবাইল গুঁতোতে গুঁতোতে একটু উৎকণ্ঠিত স্বরে বল্টু জরিনাকে বললো, : ওয়েদারের ভাবসাব দেখে এই এলাকার সব উবার বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়। চলো, আমরা একটা সিএনজি ঠিক করি! জরিনা একটু রাগত স্বরে বললো, : আমি আগেই নিষেধ করেছিলাম! আকাশ কাল হয়ে আসছিলো। দরকার হলে আরেকদিন ছবি তোলা যাবে। কোন কথাই শুনলেন না। অযথাই কষ্ট করে এতো দূর আসলাম। ধ্যাত! বল্টুর সব প্ল্যান মাঠে মারা গেছে! অপরাধী চেহারা নিয়ে একটা সিএনজির দিকে এগিয়ে গেল। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা ক্যামেরা কিনেছে বল্টু। দাম একটু বেশিই পড়েছে। নগদ বায়ান্ন হাজার চলে গেল। ডিজিটাল ভার্সনের ক্যামেরা। অটো অপশনে ছবি তোলার সহজ ব্যবস্থা আছে। শাটার স্পিড, অ্যাপারচার এসব নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামালেও চলবে। উদ্দেশ্য, জরিনাকে নিয়ে নানা জায়গায় ছবি তুলতে যাবে। ছবি তোলা হবে। একসঙ্গে ঘোরাঘুরির সুযোগও পাওয়া যাবে। তার জানা আছে, মেয়েরা ছবি তোলার সুযোগ পেলে পাগল হয়ে যায়। এক ঢিলে দুই পাখি। কিন্তু প্রথম দিনেই বৃষ্টি সব গুবলেট করে দিলো। অনেক পটিয়ে জরিনাকে রাজী করিয়ে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে এসেছে। এটা প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য মোটামুটি রেজিস্ট্রার্ড জায়গা। জরিনা কিছুতেই আসবে না। ক্যামেরা আর ছবি তোলার কথা বলে কনভিন্স করা গেছে। শেষ পর্যন্ত, মেকআপ নিয়ে সুন্দর একটা লাল রঙা শাড়ি পরেছে। তারপর উবারে চড়ে এখানে আসা। বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্ট সফল। সিএনজিতে উঠে বসতে না বসতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। চিকন রডের খাঁচার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে, জরিনার বাঁ পাশটা প্রায় ভিজেই গেল বোধ হয়। বল্টু তার বাম হাতটা ওর কাঁধের ওপর দিয়ে কোমরের উপর রাখলো। এক ঝটকায় জরিনা বল্টুর হাতটা সরিয়ে দিল। ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলো, : এসব কি ভাইয়া! সরে বসেন তো! এরকম করলে কিন্তু আমি নেমে যাবো! বল্টু সাথে সাথেই হাত সরিয়ে নিয়ে একটু সরে বসলো। সিএনজি চালক ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দেখার চেষ্টা করছে। বল্টুর মাথা ঘুরছে। জরিনার কাছ থেকে এতোটা তীব্র প্রতিক্রিয়া আশা করেনি সে। বমি বমি ভাব হচ্ছে। কোন রকমে বললো, : আরে ধুর বোকা মেয়ে! তুমিতো ভিজে যাচ্ছিলে। আমি ওটাই বুঝতে চাচ্ছিলাম। : এটা বোঝার জন্য এরকম করতে হবে! বুঝে কি করবেন আপনি? বৃষ্টি ঠেকিয়ে দেবেন? আমি কিন্তু এরকম গা ঘেঁষাঘেঁষি একদম পছন্দ করি না! জরিনার কথাগুলো শুনে বল্টু একদম ঠাণ্ডা মেরে গেল। ভেতরে ভেতরে খুব রাগ হচ্ছে। ভাবছে, : ক্লাসমেটদের সঙ্গে যখন মটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াস, তখন গা ঘেঁষাঘেঁষি হয় না! কোমর জড়িয়ে ধরে বসে থাকিস। এসব ভাব তখন কোথায় থাকে! বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্টই লস! পরিস্থিতি ম্যানেজ করার জন্য বল্টু ড্রাইভারকে একটু ধমকের সুরে বললো, : এই ড্রাইভার! পর্দা কোথায়? পর্দা থাকলেতো বৃষ্টিতে ভিজতে হতো না! চালাতে চালাতেই ড্রাইভার জবাব দিলো, : আপনের মতো প্যাসেঞ্জাররাই পর্দা ছিঁড়া ফালাইছে। লাগানের টাইম পাই নাই। এহন চুপ কইরা বইসা থাকেন! তার কথা বলার ভঙ্গিতে বল্টু রেগে গেল। বললো, : ফাইজলামির জায়গা পাও না! এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো! ভাড়া পাবে অর্ধেক! ঘ্যাচ করে ব্রেক কষার শব্দ। সিএনজি থেমে গেল। বিশাল দেহের ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে বল্টুর দিকে তাকিয়ে বললো, : নামেন! আইসা চড় দেন! গাড়ি আর যাইবো না! আতংকে বল্টুর গলা শুকিয়ে গেল। জরিনা বল্টুর হাত চেপে ধরলো। ফিসফিসিয়ে বললো, : একদম চুপ করে থাকেন! ব্যাটার সাইজ দেখেছেন! আপনি ছোটখাটো মানুষ। কি দরকার, ঝামেলা করার? জরিনা একটু অনুনয়ের সুরে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললো, : মামা, প্লীজ, গাড়ি চালানতো! বৃষ্টির মধ্যে কোথায় নামবো? কি জানি, কি মনে করে ড্রাইভার আবার তার সিটে এসে বসলো। বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। সিএনজি চলছে। বল্টু একটু অভিমানের সুরে জরিনাকে বললো, : আমাকে ছোটখাটো বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছো? আগেও দেখেছি, সুযোগ পেলেই তুমি আমার হাইট নিয়ে অ্যাটাক করো! জরিনা এবার বিব্রত। নরম কণ্ঠে বললো, : হাইট নিয়ে আপনার এতো কমপ্লেক্স কেন ভাইয়া! নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাইট কতো ছিলো? ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা, ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারের হাইট কতো? তারা যদি বিশ্ব শাসন করতে পারে, আপনি খাটো কিসে! শুনে মন ভালো হয়ে যাবার কথা। কিন্তু কাজ হলো না। বল্টু্র মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। ভাবলো, : আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পৃথিবীর সব বাটুলদের নাম মুখস্থ করে রেখেছিস! আমার বোঝাবুঝি শেষ! এখন থেকে আমিও নিজেকে গুটিয়ে নেবো! কিন্তু ক্ষোভে দুঃখে কিছুই বলতে পারলো না। নামার সময় সিএনজি চালক উপদেশের সুরে বললো, : আফায় ঠিক কইছে! এহন থাইক্যা নিজের সাইজ বুইজ্যা চইলেন! বল্টু্ পাথর হয়ে গেল। জরিনাদের কাণ্ড-জ্ঞানহীন কথাবার্তায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিক জীবন

কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় জাগরণ,মানবতা, সাম্য-মৈত্রী, প্রেম ও দ্রোহের-অগ্রসেনানী কবি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতি সত্ত্বার বংশীবাদক । যাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে নির্যাতিত নিপীড়িত নিষ্পেষিত মানবতার জয়গান । বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। সে বিদ্রোহ হচ্ছে সকল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে। তবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহ প্রকট রূপ ধারণ করেছিল। নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাযারের খাদেম। নজরুলের ডাক নাম ছিল ’দুখু মিয়া ’ ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যু হলে নজরুল পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হাজী পালোয়ানের মাযারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তিনি গ্রামের মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। শৈশবের এ শিক্ষা ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে নজরুল অল্পবয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান, যেমন পবিত্র কুরআন পাঠ, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ণে ওই অভিজ্ঞতা সহায়ক হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ’ বিদ্রোহী কবি’এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ’বুলবুল’ নামে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণমুক্ত কবিতা রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতার সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদন্ডে দন্ডিত করে। নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়ে এবং প্রায় চল্লিশ দিন একটানা অনশন করে ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান।নজরুল তাঁর কবিতায় ব্যতিক্রমী এমন সব বিষয় ও শব্দ ব্যবহার করেন, যা আগে কখনও ব্যবহূত হয়নি। কবিতায় তিনি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণাকে ধারণ করায় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে মানবসভ্যতার কয়েকটি মৌলিক সমস্যাও ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য।নজরুল তাঁর সৃষ্টিকর্মে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা করেন। কবিতা ও গানে তিনি এ মিশ্র ঐতিহ্য চেতনাবশত প্রচলিত বাংলা ছন্দোরীতি ছাড়াও অনেক সংস্কৃত ও আরবি ছন্দ ব্যবহার করেন। নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস, সমভাবে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব ।আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল। বাংলা সাহিকত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। কাজী নজরুল ইসলাম মূলত কবি। হলেও সাংবাদিক হিসেবে তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় ব্যয় করেছিলেন। তা নিয়ে আমাদের ভেতরেও তেমন আলোচনাও হয় না। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চা একটি অন্যটির পরিপূরক। কেননা গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক যেদিকেই নজরুল কাজ করেছেন। সেদিকেই অনিন্দ্য সুন্দর ফুল ফুটেছে। সে কাননে সবুজ ডাল-পালা চারদিকে পল্লবিত হয়েছে। এমনকি সাংবাদিকতায়ও নজরুল একটি বিশিষ্ট আসন অধিকার করে আছেন। বিভিন্ন সাময়িকপত্র তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এই বিশেষ ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য ও অসাধারণ পান্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। করাচি সেনানিবাসে হাবিলদার পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু হয়। করাচি সেনানিবাস থেকে প্রেরিত তাঁর কয়েকটি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ কলকাতার ‘ সওগাত`, ‘ প্রবাসী` এবং ‘ বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকা` প্রভৃতিতে প্রকাশিত হয়।প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালের মার্চ মাসে নজরুল দেশে ফিরে কলকাতায় সাহিত্যিক-সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। কলকাতায় তাঁর প্রথম আশ্রয় ছিল ৩২নং কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি-র অফিসে সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে।নজরুল এবং মুজফফর আহমদ সমকালীন অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের চিন্তা-ভাবনা করেন। সে সময়ের অন্যতম খেলাফত নেতা ও হাইকোর্ট আইনজীবী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এ ব্যাপারে তাঁদের উৎসাহ দেন এবং আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে সম্মত হন। ১৯২০ সালে ২ জুলাই দৈনিক ’নবযুগ` নামে একটি সান্ধ্য দৈনিক প্রকাশিত হয়। সম্পাদক হিসেবে একে ফজলুল হকের নাম মুদ্রিত হলেও মূলত নজরুল এবং মুজফফর আহমদই ছিলেন এ পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক। সাংবাদিকতায় এ দু`জনের কারোরই কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পত্রিকাটি পাঠক সমাজে বিশেষ সাড়া জাগায় এবং পাঠক প্রিয়তা লাভে সক্ষম হয়। নির্ভীকতা হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রধান ধর্ম, সেই নিরর্ভীকতা ছিল নজরুলের আজন্ম শপথ। সে কারণেই পত্রিকাটি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নজর কাড়তে সক্ষম হয়। আর অন্যদিকে বিশেষত এ কারণেই তদানীন্তন বৃটিশ সরকারের শ্যেন দৃষ্টি পড়ে পত্রিকাটির উপর। পত্রিকায় প্রকাশিত ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে` শীর্ষক প্রবন্ধের জন্য পত্রিকাটির জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। কমরেড মুজফফর আহমদের স্মৃতি কথায় জানা যায় প্রবন্ধ প্রকাশের আগে নজরুলের গরম লেখার জন্য পর পর দু`বার কিংবা তিনবার সরকার ‘নবযুগ` পত্রিকাটিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন`। ‘দৈনিক নবযুগ` পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে নজরুলের জ্বালাময়ী ও আবেগপূর্ণ প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। নজরুলের সাংবাদিক প্রতিভা সম্পর্কে মুজফফর আহমদ নিজেই বলেন, ‘নজরুল ইসলাম বড় বড় সংবাদগুলো খুব সংক্ষিপ্ত করে নিজের ভাষায় লিখে ফেলতে লাগলো। তা না হলে কাগজে সংবাদের স্থান হয় না। নজরুলের বড় বড় সংবাদের সংক্ষেপণ করতে দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম। ঝানু সাংবাদিকরাও এ কৌশল আয়ত্ত করতে হিমশিম খেয়ে যান।`‘দৈনিক নবযুগ` পত্রিকার জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ছিল নজরুলের দেয়া সংবাদ হেডিং। প্রত্যেকটি সংবাদের হেডিং ছিল পান্ডিত্যে ও বৈদগ্ধ্যে সমৃদ্ধ। হেডিং পাঠ করলেই বুঝা যায় যে, এগুলো তাঁর হাতের সৃষ্টি। হেডিংয়ে বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য তিনি লোক সাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলী, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনারও দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পংক্তি ভেঙে নতুন হেড়িং রচনা করেছেন। যেমন-১. আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার পরাণ সখা ফৈসুল, হে আমার।২. কালাতে ধলাতে লেগেছে এবার মন্দ মধুর হাওয়া দেখি নাই। কভু দেখি নাই ওগো, এমনি ডিনার` খাওয়া, নবযুগ` প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৯২২ সালের মে মাসে নজরুল দৈনিক সেবক` পত্রিকায় যোগদান করেন। এ পত্রিকার মালিক ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ। দুর্ভাগ্যক্রমে নজরুল এই পত্রিকার সঙ্গে বেশিদিন যুক্ত থাকতে পারেননি। ১৯২২ সালের ২৫ জুন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরলোক গমনের পর নজরুল এক বিরাট সম্পাদকীয় প্রবন্ধ রচনা করেন। প্রবন্ধটিতে নজরুলের অনেক আবেগ ও উচ্ছবাস ছিল। লেখাটি কর্তৃপক্ষের মনঃপুত হয়নি। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুলের সম্পাদনায় অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু` প্রকাশিত হয়। ‘নবযুগ` পত্রিকায় নজরুলের বিশেষ ভূমিকার পর ‘ধূমকেতু` প্রত্রিকার প্রকাশ ছিল একান্তই যেন অবধারিত। পত্রিকার অভিনন্দন জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ প্রমুখ অনেকেই আশীর্বাণী প্রেরণ করেন।রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী ছিল-আয় চলে আয়, যে ধূমকেতু,আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,দুর্দিনের এই দুর্গ শিরেউড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।অলক্ষণের তিলক রেখারাতের ভালো হোক না লেখাজাগিয়ে দে রে চমক মেরে,আছে যারা অর্ধচেতন।পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় ‘ধূমকেতু` পত্রিকার আদর্শ ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলা হয় :-‘আমার কর্ণধার আমি। আমার পথ দেখাবে আমার সত্য। আমি প্রথমে আমার যাত্রা-শুরুর আগে আমার সত্যকে সালাম জানাচ্ছি- নমস্কার করছি আমার সত্যকে। দেশের যারা শত্রু। দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভন্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে ‘ধূমকেতু` হবে আগুনের সম্মার্জনী। ‘ধূমকেতু` কোন সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ্য ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্যে।`নজরুল ইসলাম ধূমকেতু` পত্রিকাই প্রথম ভারতের পূর্ণস্বাধীনতার কথা তেজস্বী ভাষায় ব্যক্ত করেন। সম্পাদকীয়তে নজরুল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন : ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা এ কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন।ভারত বর্ষের এক পরমাণু অংশ ও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসন ভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকাটুকু পর্যন্ত থাকবে না।`‘ধূমকেতু` দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে` শীর্ষক কবিতার জন্য তিনি কারারুদ্ধ হন। ‘নবযুগ` পত্রিকার ন্যায় ‘ধূমকেতু` পত্রিকায়ও নজরুল বিশেষ কুশলাদি প্রদর্শন করেন। যেমন-লাঠি যার মাটি তার` (৭ম সংখ্যা)‘মহরম নিয়ে দহরম মহরম` (৮ম সংখ্যা)।সুকৌশলে তিনি স্বরচিত কবিতা ও সংযোজন করেছেন- শুরুতেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর সদ্যোরচিত বাঁধন-হারা উপন্যাস এবং বোধন,শাত-ইল-আরব,বাদল প্রাতের শরাব ,আগমনী, খেয়াপারের তরণী, কোরবানী, মোহরর্ম, ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম, প্রভৃতি কবিতা প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বাংলা সাহিত্যের এ নবীন প্রতিভার প্রতি সাহিত্যানুরাগীদের দৃষ্টি পড়ে। কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত এক পত্রের মাধ্যমে নজরুলের ‘খেয়া পারের তরণী’এবং বাদল প্রাতের শরাব’ কবিতা দুটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং বাংলার সাস্বত সমাজে তাঁকে স্বাগত জানান। নজরুল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজালুল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ সমকালীন মুসলমান সাহিত্যিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। অপরদিকে কলকাতার তৎকালীন জমজমাট দুটি সাহিত্যিক আসর ’গজেনদার আড্ডা’ ও ভারতীয় আড্ডায় অতুলপ্রসাদ সেন, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,ওস্তাদ করমতুল্লাখাঁ, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরকুমার ভাদুডী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিডী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলার সমকালীন শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাট্যজগতের দিকপালদের সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পান। নজরুল ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তখন থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত দু দশক বাংলার দু প্রধান কবির মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ ছিল।নবযুগ পত্রিকার সাংবাদিকরূপে নজরুল যেমন একদিকে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক জগতের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা নিয়ে লিখছিলেন, তেমনি মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে উপস্থিত থেকে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল হচ্ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরোয়া আসর ও অনুষ্ঠানে যোগদান এবং সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তরুণ কবির সংস্কৃতিচর্চাও অগ্রসর হচ্ছিল। বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের র্মযাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি,সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল র্সবদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতফিলতি হয়েছে। অগ্নীবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। শোষণ-বঞ্চণার বিরুদ্ধে কবি কাজী নজরুল ইসলামের  কলম ছিলো প্রতিবাদী। স্ব-ধর্মে স্থিত থেকে সব ধর্মকে শ্রদ্ধা আর মানবতার জয়গান গেয়েছেন তিনি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখনী ও বনাঢ়্য কর্মময় জীবন আজো মুক্তির পথ দেখায় এবংঅন্যায়,অবিচার ,সাম্য, মানবতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় অনুপ্রেরণা যোগায়। - আনোয়ারুল কাইয়ুম কাজল  

বল্টু_সমাচার ৭

একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় বসে অপেক্ষা করছে বল্টু। সংসদ ভবনের রাস্তাটার দুই পাশেই সারি সারি কৃষ্ণচূড়া। বসন্তের এই সময়টায় ফুলের কারনে গাছগুলো লাল হয়ে আছে। চমৎকার একটা রোমান্টিক পরিবেশ। ইচ্ছে করেই আজকে এখানে আসতে বলেছে জরিনাকে। ভাইয়া ভাইয়া ডাকের বদলে বল্টু বল্টু করার একটা চেষ্টা। কেবলমাত্র ভাই মনে করলে নিশ্চয়ই এখানে আসতে রাজি হতো না জরিনা। এটা হলো প্রেমিক প্রেমিকাদের স্বর্গরাজ্য। ভাই বোন এখানে অ্যালাউড না। রাজি হওয়া মাত্রই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বল্টু। সে জানে, `ওয়েল বিগান ইজ হাফ ডান`। একটা রিকশায় করে এসে নামছে জরিনা। হালকা গোলাপি রঙের একটা ফতুয়া আর কালো টাইটস পড়েছে। ছিপছিপে গড়নের কারনে বেশ মানিয়েছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বল্টু। ভাড়া দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিলো জরিনা। গম্ভীর মুখে এসে বল্টুর পাশে বসে পড়লো। বিষন্ন দৃষ্টি সামনের লেকের দিকে। কিন্তু এটাতো গম্ভীর থাকার জায়গা না। বল্টু সাবধানে জিজ্ঞেস করলো, : কি হয়েছে? বাসায় কোন সমস্যা? চাইলে আমাকে বলতে পারো! জরিনা ধীরে ধীরে মাথাটা তুললো। বল্টুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললো, : চাইবো না কেন? আপনাকেই তো বলবো। নাকি আরও কেউ আছে এখানে? বল্টু ভয়ানক বিব্রত হয়ে গেল। বললো, : না না। বলো, প্লীজ...! জরিনা বলতে শুরু করলো, : আমার ছোট বোন রুবিনা ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় ফেইল করেছে। লেখাপড়ায় এমনিতে খুবই ভালো! ইন্টারে রেজাল্টও বেশ ভালো। ইংলিশ এ পড়বে বলে আশা ছিলো। এখনতো সবই গুবলেট হয়ে গেল। বল্টু খানিকটা অভিমানহত কন্ঠে বললো, : এগুলো আমাকে আগে বলতে পারো না? ভর্তির ব্যাপার স্যাপার আগেই বলতে হয়। সময়মতো দুএকটা জায়গায় গুঁতো দিলেই কেস ফিট! : বল্টু ভাই, এটা কি ধরনের কথাবার্তা! ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গুঁতোগুতি করলেই ভর্তি হওয়া যায়? জরিনার কন্ঠস্বরে চরম বিরক্তি। বল্টু আবারও বিব্রত হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বললো, : তা না। তবে আগে বললে একটা ব্যবস্থা করা যেতো। আমার এক কলিগের মামা একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। দরকার হলে ওনাকে বলতাম! জরিনা একটু আশাবাদী হয়ে বললো, : এখন বলুন! কে নিষেধ করছে! : ঠিক আছে। আমি দায়িত্ব নিলাম। এখন থেকে আমাকে এসব সমস্যা আগে থেকেই বলবে! এবার একটু স্বাভাবিক হও! কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকাও! দেখো, কি সুন্দর লাল হয়ে সেজে আছে! জরিনা গাছগুলোর দিকে একটু তাকালো। আসলেই সুন্দর! কিন্তু এখন এসব ভাবতে ইচ্ছে করছে না। বললো, : চলুন, বাসার দিকে যাওয়া যাক! রুবিনার ভর্তির ব্যাপারে বাসায় কথা বলি। সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও বল্টু্ উঠে দাঁড়ালো। দুজনে একটা রিকশার দিকে এগিয়ে গেল। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রধানের রুমে তার বিশাল টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বল্টু। থেকে থেকে হাত কচলাচ্ছে। উনি একটা টিস্যু পেপার দিয়ে চশমা মুছছেন। দীর্ঘ মোছামুছি। বল্টুর মনে সন্দেহ দেখা দিলো, : উনি কি আমার কথা ভুলেই গেলেন! এরকম তো হবার কথা নয়। মন্ত্রী সাহেবের স্বাক্ষর দেয়া চিঠিটা ওনার সামনেই রাখা আছে। স্যার হঠাৎ করেই কথা বলতে শুরু করলেন। : আপনার মন্ত্রী মশাইয়ের চিঠি পড়বো। তাই ভালো করে চশমাটা মুছে নিলাম। একটু টিটকারীর আভাস পাওয়া যাচ্ছে ওনার কন্ঠে। বলে মাথা নিচু করে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। পড়ার পর মাথাটা একটু ওপরে তুলে বললেন, : বয়স কতো আপনার? এই বয়সেই মন্ত্রী চিনে গেছেন! আপনার মন্ত্রীকে গিয়ে বলুন যে আমি খুবই বেয়াদব একজন টিচার। মন্ত্রীর তদবির শুনি না। পারলে আমার চাকরিটা খেয়ে ফেলতে বলুন! বলতে বলতে উনি দরখাস্তটা বল্টুর মুখের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। কাগজটা পাতলা বলে মুখ পর্যন্ত পৌঁছালো না। বাতাসে ভাসতে ভাসতে মাটিতে পড়ে গেল। বল্টুর অবস্থা কাহিল। নিজের হাইট নিয়ে সারাজীবনের আফসোস। এখন ভাবছে, : হাইট আরও কম হলে ভালো হতো। টেবিলের ওপর দিয়ে ওই রক্তচক্ষু দেখতে হতো না। তাছাড়া, এখন বাইরে অপেক্ষায় থাকা জরিনা ও রুবিনাকে ফেস করবে কিভাবে! বড় বড় কথা বলে নিয়ে এসেছে। একটাই আশা ছিলো, ভর্তির কাজটা হয়ে গেলে কৃতজ্ঞতায় জরিনা চলে আসবে হাতের মুঠোয়। এবার আর ছাড়াছাড়ি নাই! কোন কথা ছাড়াই প্রায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো বল্টু। দরজার ঠিক বাইরেই ছিলো ওরা। কিছু বলার আগেই জরিনা বলে উঠলো, : থাক! আর ব্যাখ্যা দিতে হবে না! সবই শুনেছি। কি দরকার ছিলো এতো বাহাদুরি ফলানোর? আপনি পারেনও! রুবিনা চল! বলে রুবিনার হাত ধরে হনহন করে হাঁটা দিলো। কিছুই বলা হলো না। চেষ্টার তো কোন কমতি ছিলো না। জরিনা এটাও বুঝলো না! বরং তার হঠকারিতায় লজ্জায় অপমানে বোবার মতো তাকিয়ে রইলো বল্টু। জরিনাদের হঠকারিতায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কষ্ট কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

হাওরবাসীর দিনলিপি

‘আত্মপীড়নের অন্তরালে’ গল্প গ্রন্থটিতে হাওরবাসীর সুখ-দুঃখ ফুটে উঠেছে। এটি মূলত রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত-এর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সঙ্কলিত গল্পগ্রন্থ। হারিয়ে যাওয়া যতসব গল্প ও তার প্রকাশিত ৫টি গল্পগ্রন্থ থেকে বাছাই করা ৩৪টি গল্প নিয়ে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত আপাদমস্তক একজন ছোট গল্পকার। প্রকাশিত কয়েকটি বড় গল্পও রয়েছে তার। ওই সব গল্প আকারে বড় হলেও ছেদ পড়েনি পাঠে। গ্রন্থের ভূমিকায় কবি অরুণ দাস গুপ্ত এমনি অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি লিখেন,‘অজ্ঞাতবাসের দিনরাত্রি’ গল্পগ্রন্থটিতে দুটি বড় গল্প রয়েছে, ওইসব গল্পও সঙ্কলিত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রত্যেকটি গল্প দৈর্ঘ্যে বেশ বড়। তবে ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য হারায়নি। তৃষ্ণার বিলাপ গ্রন্থে ‘তরঙ্গ ভঙ্গ’ ‘সন্দেহ’ ও সুন্দর দাঁড়াও ফিরে গ্রন্থে এবং নামংকিত গল্পটিও আছে ওই গ্রন্থটিতে। এছাড়া ‘আত্মপীড়নের অন্তরালে’ ‘চাক্ষুষ’ ‘আশ্রয়’, কিংশুকের স্বপ্নবিলাস, ‘নিত্যানন্দেন অসুখ-বিসুখ, ‘স্খলন’ এবং আকাক্সক্ষারা উড়ে যায় গ্রন্থে ‘শেষ নেই’ ‘প্রেম পালিয়েছে’ ‘সাগর থেকে ফেরা’ প্রভৃতি গল্পে রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত মনঃকোকনদে মধুবিন্দুর সন্ধান করেছেন। ‘সাগর থেকে ফেরা’ গল্পটি চমৎকার একটি গল্প। এই গল্পের প্রধান চরিত্র মূলত আত্মজৈবনিক, গল্পে তা বর্ণিত হয়েছে। পরস্পর ভালোবেসে বিয়ে করা, তারপর কয়েক বছর ঘর-সংসার করা, দুই কন্যার জন্ম দেওয়া সন্তানদের ফেলে স্বামীকে ছেড়ে অন্য এক পুরুষের হাতধরে চলে যাওয়া, বেশ কয়েক বছর পর আবার স্বামীর ঘরে ফিরে আসার ঘটনা নিয়ে রথীন্দ্র প্রসাদ গল্পটি লিখেছেন। অন্তিম আকুতি-দহনে গল্পটি শেষ হয়। গল্পটি নামকরণেও গল্পকার ভাবসত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এভাবে সংসার-সমুদ্রে নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে ফিরে আসা। গল্পকার নেহাত সাদামাটা নারীর শরীরি-স্থুলতা বা একধরণে আসক্তি হয়ে ছুটেননি। তবে প্রকৃতির কাছে আশ্রিত হয়েছেন। ‘প্রার্থনা’ গল্পে তা ফুটে উঠেছে। ‘পুকুর পাড়ে প্রাচীন একটা বৃক্ষ দণ্ডায়মান। এর শাখা প্রশাখা ছাতার মতো বিস্তৃত হয়ে একটু পশ্চিম দিকে হেলে মন্দিরটাকে যেন স্নেহ-শিতল ছায়া দিচ্ছে। শাখা-প্রশাখায় আশ্রিত আজ পাখ-পাখালি সকাল-সন্ধ্যায় ঈশ্বরের বন্দনায়ও মুখরিত হয়।’ ‘জীবন কাঁদে মোহনার বাঁকে’ গল্পের বর্ণনা মনোমুগ্ধকর। ‘কুমারী বসন্তের সকালে হাল্কা কুয়াশা পড়েছে, কুয়াশা ভেঙে এখনো ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি। রাস্তার দু’পাশে কর্ষিত মাঠভরে আছে রোদের পোড়া মাটির ডেলায়। ধূরস প্রকৃতিতে বাতাসে শীতের আমেজ। আকাশে মেঘের অবস্থানটা জলরঙ চিত্রের পটভূমি হয়ে আছে। দু’জন শিশির ধোয়া ঘাস মাড়িয়ে কথা বলতে-বলতে পাশাপাশি যাচ্ছে। নাহার পড়েছে কচুপাতা রঙের একটি শাড়ি। সত্যের মনে হলো যেন সূর্যালোকের অভার তাড়াতে পারছে কচুপাতার রঙের শাড়িটা।’ গল্পের এই চিত্রকল্প ও আঙ্গিক পরিপূর্ণতা পায়। যা সমাজ ও বাস্তবতার নিরিখে ফুটে উঠে। অন্যদিকে গল্পের ভাষাও ঝরঝরে এবং শক্তিমত্তা ও রোমান্টিকতার আবহে পাঠকে প্রতিক্ষণ উজ্জীবিত করে। গল্পের এ যাদুবাস্তবতায় লেখকের সফলতার স্বাক্ষর মিলে। ব্যক্তিগতভাবে গল্পকার রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত’র সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, যখন তিনি পেটের পীড়ায় ও দুরাগ্য ক্যান্সারে নিদারুণভাবে আক্রান্ত। বলা যায় এক ধরনের বন্দি অবস্থায় দিন অতিবাহিত হচ্ছিল তার ; এই নিত্য সুখ-দুঃখের খুঁনসুটি কাছ থেকে দেখা। গ্রন্থটি প্রকাশ নিয়ে অন্যরকম দহন ছিল তার। হারিয়ে যাওয়া গল্প নিয়ে সে কি উৎকণ্ঠা, প্রতিটি লেখকেরই এমনি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়। গ্রন্থে লেখকের অনু ভূমিকায় সেই আত্মজ বেদনার কথা প্রকাশ পায়। গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলো আমাদের স্বাধীনতার সমসাময়িক। অর্থাৎ ঊনিশ’শ বাহাত্তর থেকে দুই হাজার দুই সাল পর্যন্ত। তবে ওই সময়ের সঙ্গে গল্পগুলো গ্রন্থে ধারাবাহিক সাজানো সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে দীর্ঘ বিরতি হয়েছে। যেটুকু লেখালেখি ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, তার সবটুকু সংগ্রহেও থাকেনি। যেটুকু পাওয়া গেছে সেটুকু দিয়েই গ্রন্থিত করা হয়েছে। তিনি অনুভব করেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে তার প্রকাশিত বইগুলো এখন আর বাজারে নেই। আগোছালো মানুষ হিসেবে পাণ্ডুলিপিসহ সবকটি গ্রন্থেরও একই অবস্থা। এক এক করে সংগ্রহ করতে হয়েছে, এমতাবস্থায় মনে হলো পাঁচটি গ্রন্থকে এক মলাটে নিয়ে এলে গল্পগুলো সংরক্ষিত থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের সামনেও উপস্থাপিত হবে। এ রকম ভাবনা থেকেই বইটি প্রকাশ পেল। তবে গল্পগুলো আগের মতোই থেকেছে। প্রথম-বয়সের আবেগ-অনুভূতি আর এসময়ের আবেগ-অনুভূতি এক নয়; একদিন যেমন ছিলেন, গল্পগুলোও তেমনি সেখানে রেখে দিয়েছেন। রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত হাওয়র অঞ্চল নেত্রকোণার গোপালশ্রম কেন্দুয়ায় ১৯৪৭ সালে ২০ অক্টোবর জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা- ভূপেন্দ্র প্রসাদ দত্ত। মাতা- ইন্দু প্রভা দত্ত। স্ত্রী, তাপসী মজুমদার। মেয়ে, রূপা দত্ত পপি, ছেলে-অভীক প্রসাদ দত্ত। সত্তর দশকে ঢাকা ও কলকাতা বেশ কয়েকটি নামকরা ও খ্যাতিমান পত্রিকায় সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত হন মেজোভাই রমেন দত্ত। তিনি একজন কবিও। অথাৎ পারিবারিক বৃত্তে রথীন্দ্র দত্তের বেড়ে ওঠা। তবে লেখালেখিতে তিনি নিজস্ব সকিয়তা বজায় রেখে সৃষ্টিশীল পরিমণ্ডল গড়ে তোলতে সক্ষম হন। গল্পকার রথীন্দ্র প্রসাদ দত্তের শৈশবের দূরন্তপনা কাটে নেত্রকোণার হাওয়র এলাকায়। গল্পে হাওরবাসীর সুখ-দুঃখের কথা উঠে আসে। প্রত্যয়, সন্ধি, নিত্য আসা-যাওয়া, অজ্ঞাতবাসের দিনরাত্রি, জীবন কাঁদে মোহনার বাঁকে এবং শেষ নেই গ্রল্পে চিত্রায়িত হয়। ‘শেষ নেই’ গল্পের শুরুতেই উল্লেখ করেন, ‘ চৈত্রের দাহে প্রকৃতি জ্বলছিল। বেঙ্গুরা, রাজগাতি, ভাটেরশী, এসব হাওয়রে ধূলোর কুণ্ডলী উড়িয়ে দাপাদাপি করে বাতাসেও খেলছে।’ গল্পে রুস্তম আলী স্বপ্ন দেখে, বাড়ির পেছনে পশ্চিম দিকে ধু-ধু করা বেঙ্গুরা হাওরে কর্ষিত জমির ইটাগুলো যেনো চুলার জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলছে। পূর্বদিকে জালির হাওয়রে মা বসুমতি মুঠো মুঠো রাশি-রাশি সোনা প্রসব করছে, পক্ষকালের মধ্যেই দু’হাত ভরে ঘরে তুলে আনবে তার চার পাড়ের মানুষ। হরালী এসব দুর্গত মানুষের কথা বিবেচনা করে আত্মহুতি দিতে রাজি হয়ে যান; তখন কৃষককে উপদেশ দিয়ে হরালী বললেন, ‘এখন আমি যে নিয়মের কথা বলছি তা যদি তোমরা মেনে চলো তবে এ হাওরে আর কখনোই শিলাবৃষ্টি হবে না; কৃষকরা এই নিয়মের কথা জানতে চাইলে হরালী বলেন, এ হাওরে ফসল কাটার আগে হিন্দুরা পাঁঠা বলী দিয়ে কালী পূজা করবে আর মুসলমানরা বিলাবে শিরনী। এই হাওরের বুকের ওপর দিয়ে কেউ পাদুকা পরে আর ছাতা মেলে চলাচল করতে পারবে না।’ এভাবেই হাওরবাসীর নিত্যদিনের দিনলিপি বয়ে চলছে। ২০১৯ সালে অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় গ্রন্থটি প্রকাশ করে ‘খড়িমাটি’ প্রকাশন। প্রচ্ছেদ করেছেন খালিদ হাসান। ৩৬৮ পৃষ্টা এই গল্পগ্রন্থের শুভেচ্ছা মূল্য ৪০০ টাকা। লেখক: কবি ও মুক্তিযুদ্ধো বিষক গবেষক  

বল্টু_সমাচার ৬

রিকশা জার্নির পুরো সময়টাতেই বল্টু সোজা টাইট হয়ে বসে রইল। মাঝে মধ্যে খানাখন্দে পড়ে কয়েকটা ঝাকুনি অবশ্য শরীরের কলকব্জা নাড়িয়ে দিয়েছে। সোজা হয়ে বসে থাকার কারণ একটা আছে। নতুন কেনা স্যুট পরেছে। জরিনার বাসায় আসা উপলক্ষে। স্যুট টা গায়ে খানিকটা টাইট লাগছে। টাইট স্যুট গায়ে দিলে টাইট হয়েই বসে থাকতে হয়। কেনার সময় এটা বোঝা যায়নি। ব্র্যান্ড শপের সেলসম্যানটা ভীষণ স্মার্ট! প্রথম কথাতেই বললো, : আপনার তো কোল্ড অ্যালার্জি আছে। আমাদের দোকানের এসির ঠাণ্ডায় হাঁচি দিয়েই যাচ্ছেন। এই স্যুটটাই আপনার জন্য বেস্ট হবে। বলে, একটা স্যুট এগিয়ে দিলো। এক্সট্রা প্যাড দেয়া আছে। দেশি শীততো বটে, সাইবেরিয়ান ঠান্ডাও পাত্তা পাবেনা এর কাছে। অবশ্য প্রাইস একটু বেশি পড়বে। বলে হিপনোটিক একটা হাসি দিয়ে তাকিয়ে রইলো। বল্টু্ও ভাবলো, : তাইতো! দাম বেশি হলেও কাজের জিনিস। নেবোই যখন, ভালোটাই নেই! ভুলে গেলো যে শীত প্রায় শেষ। সেলসম্যান স্যুটটা একটা সুন্দর ব্যাগে ভরে এগিয়ে দিয়ে বললো, : দাম বেশি হলেও ফলাফল হাতেনাতে টের পাবেন! টের অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে। এক্সট্রা প্যাডের ঠেলায় ভেতরটা ঘেমে একাকার! ইচ্ছে করছে, এইসব স্যুটফুট ফেলে দিয়ে খালি গায়ে কোন একটা পুকুরে গিয়ে ডুব দিয়ে বসে থাকে।   জরিনাদের বাসার বাইরের গেটটা দেখা যাচ্ছে। ওরা থাকে দোতলায়। একটা চাপা উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করছে। শেষ পর্যন্ত জরিনা তাকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছে! তাও আবার ঈদের দিনে! এতোটা কখনও বল্টুর কল্পনাতেও আসেনি। জরিনার প্রতি মনটা কৃতজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। হাঁসফাঁস করে নেমে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দিলো। বকশিশ দিলো বিশ টাকা। আজকের দিনে বকশিশ না দিলে আর কবে দেবে!   দুবার কলিং বেল টিপতেই ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল। খোলা দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে জরিনার ছোট বোন রুবিনা। দুই বোনের চেহারায় ভীষণ মিল আছে! কৌতূহলী দৃষ্টিতে বল্টুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখছে। মুখে হাসি। বললো, : আপনি বল্টু ভাইয়া! বল্টু মাথা ঝাকালো। বললো, : ঈদ মোবারক! : ঈদ মোবারক! ভেতরে আসুন! আপনার সাথে এই আমার প্রথম দেখা। প্রথম দেখাতেই আপনি সুপার হিট! বলতে বলতে রুবিনা সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বসতে বললো। তারপর আবার তড়িঘড়ি করে বললো, : এক মিনিট প্লীজ! আপনার হাইট তো শুনেছিলাম পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি। এখনতো দেখছি আরো বাটুল! আচ্ছা, আপনি কি জুতার হিলসহ হাইট মাপেন? প্রশ্নটা করে মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো একটা সোফার উপর। : তাছাড়া, এই গরমে এরকম একটা বস্তা গায়ে দিয়েছেন কেন? ঘেমেনেয়ে তো শেষ অবস্থা! বসুন! আমি পানি নিয়ে আসি! নাহলে, ডিহাইড্রেশনে মরে যাবেন। আফটার অল, আমার আপুর প্রিয় মানুষ আপনি। বলে হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেল।   বল্টুর রীতিমতো কান্না পেয়ে গেল। রুবিনা মেয়েটা ভীষণ রকমের বেয়াদব! ফ্যামিলির হবু জামাইয়ের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়, এখনও তালিম পায়নি। দাঁত কিড়মিড় করে ভাবলো, : সময় আসুক! বেয়াদবি সব বের করবো! তুই বিয়ের সময় কতো লম্বা জিরাফ পাস, দেখা যাবে...! পর্দা সরিয়ে জরিনা উঁকি দিলো। স্মিত মুখে বললো, : ঈদ মোবারক! কেমন আছেন? তরমুজ লাল কালারের পাতলা শাড়ি পরা। শিফন না কি যেন একটা নাম হবে বোধহয়। চমৎকার করে সাজুগুজু চেহারা! হাতে বোধহয় এক্সট্রা নেইল লাগিয়েছে। লাল রঙের নেইল পলিশ ঝকঝক করছে! একদম নায়িকার মতো দেখাচ্ছে! শাড়িটা টানটান করে নাভির বেশ খানিকটা নিচে পরেছে। শারীরিক সৌন্দর্যের বেশ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এই উর্বশীর রুপের ধাক্কায় বল্টুর কন্ঠ শুকিয়ে গেল। ভাবলো, জরিনা যে এতোটা সুন্দর, এটা আগে ভালো করে দেখা হয়নি কেন! বোনটা বেয়াদবের হাড্ডি! কিন্তু জরিনা হচ্ছে লক্ষ্মী একটা মেয়ে। বল্টু আসবে বলে আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। এই তরমুজ লাল রঙের শাড়ি যেখানেই পাবে, জরিনার জন্য কিনে ফেলবে। যাতে অন্য মেয়েরা পরার সুযোগ না পায়। তবে, বুঝিয়ে বলতে হবে, এভাবে বিয়ের আগে এতোটা এক্সপোজ না করাই ভালো। এরকম ঈদের দিনে কতো ধরনের মেহমান বাসায় আসতে পারে। পর্দা বলে শরীয়তে একটা ব্যাপার আছে! একটা সোফায় বসতে বসতে জরিনা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললো, : নেন, পানি খান! চুপ মেরে আছেন যে...! বল্টুর মুখ দিয়ে কথা সরছে না। কোন রকমে বললো, : না না, কই! এইতো বলছি...ঈদ মোবারক! গলার স্বর আরও নামিয়ে বললো, : আমি যে এসেছি, এটা খালাম্মা জানে? : জানবে না কেন! মা`ইতো আপনাকে ইনভাইট করতে বললো। একেতো ঈদ। তার উপর আজকে আবার আমাকে দেখতে আসবে। ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। ইন্জিনিয়ার। শুধু বিয়ের জন্য কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে দেশে। ঈদ টিদের ধার ধারছে না। ফ্যাশনেবল শিক্ষিত মেয়ে চাই। আমার খালার পরিচিত। ওরাই দেখাদেখির আয়োজন করেছে। ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো, : আমার আবার এইগুলাতে কোন আগ্ৰহ নেই! তাই মা বললো, তোর ভাইয়াকে ডাক! কথাটথা বলার লোক লাগবে না! আপনিতো জানেনই যে আব্বু দেশের বাইরে থাকে। তাছাড়া ঈদের একটা ব্যাপার আছে না! এখন কথা যা বলার আপনিই বলবেন। আমি এসবের মধ্যে নেই! পারবেন না ভাইয়া? বলে বল্টুর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জরিনা।   কি হচ্ছে এসব! বল্টু্র মাথা পুরাই আউট হয়ে গেল! এই মেয়ে বলে কি! ভাবলো, : খবিস মাইয়া! কোন আগ্রহ নেই! তাহলে আলগা নখ লাগিয়ে আধা নেংটা হয়ে বসে আছিস কিসের আশায়! নেকু একটা....! এই গরমে নতুন স্যুট পরে তোর বাসায় না এসে আমার এন্টার্কটিকায় চলে যাওয়া উচিত ছিল। অন্ততঃ ঠান্ডা কন্ট্রোলের পরীক্ষাটা হয়ে যেত! বল্টু্র মুখ থেকে কোন কথা বেরুচ্ছে না। শুধু গোঙ্গানির মতো একটা শব্দ বেরুলো।   জরিনাদের চালবাজিতে এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

বল্টু_সমাচার ৫

প্রায় তিন ঘন্টা ধরে টেইলরের দোকানে মন খারাপ করে বসে আছে বল্টু। নতুন বানানো প্যান্ট নিয়ে বিরাট ঝামেলা হয়ে গেছে।ট্রায়াল রুমে গিয়ে পরতেই মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। প্যান্টের ডান পা ছোট হয়ে গেছে। দর্জিকে চার্জ করতেই এক গাল হেসে বলে,: চেইতেন না! আপনের হাইটে ঘাপলা আছে।পঁচিশ বছর ধইরা এইগুলো কইরাই খাই।শুনে বল্টু কঠিন স্বরে বললো,: হাইটে ঘাপলা থাকলে, এক পা ছোট হবে কেন? দুই পা`ই ছোট হবে। ফাজলামি করো!তোমাদের মতো মানুষের জন্য দরকার, কথার আগে চড়!দর্জি ব্যাটার ধৈর্য্য অসীম। মোলায়েম একটা হাসি দিয়ে বললো,: ভাইজানের বোধহয় আজকে মাথাডা একটু বেশি গরম। হইবোইতো! যেই গরম পড়ছে!বলতে বলতে নিজের গালটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো,: দেন! কইষা দুইডা চড় দেন! তবুও মাথা ঠান্ডা করেন!বল্টু কনফার্ম হয়ে গেল যে পৃথিবীর সবচাইতে ঠান্ডা মাথার লোক হলো এই দর্জি ব্যাটারা। হয়তো ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তবে এখনও চোখে পড়েনি।তবে চড় দেবার মতো ভুল করতে বল্টু রাজি না। দর্জি ব্যাটা তার চাইতে কমপক্ষে এক ফুট লম্বা। কখন আবার কি হয়...! টেইলর মাস্টার খুবই শান্ত গলায় পরামর্শ দিলো,: ভাইজান একটু কষ্ট কইরা বসেন! সামান্য হাতের কাজ। কারিগরের কাছে পাঠামু। দশ মিনিটের মধ্যে চইলা আসবো! আপনে বইসা বইসা এক কাপ চা খান!সেই দশ মিনিট তিন ঘণ্টা হয়ে এলো। জরিনাকে নিয়ে সিনেমা দেখবে। প্রোগ্রাম সেট করা। বাসা থেকে নতুন একটা শার্ট আর রাতের পাজামা পরে সরাসরি দর্জি দোকানে চলে এসেছে। প্যান্ট টা অনেক আগেই ডেলিভারি নেবার কথা। তাই কোন কনফিউশন ছিলো না। এখন পড়েছে মহা ফাঁপরে! পাজামার বদলে অন্য কোন প্যান্ট পরে আসলেই হতো। অবশ্য সিনেমা শুরু হতে এখনও দেরি আছে। বাসায় গিয়ে অন্য প্যান্ট পরে আসলেও হতো। কিন্তু নতুন প্যান্টের আশায় আশায়....: ভাইজান, নেন আপনের প্যান্ট! দর্জির বাজখাঁই গলার চিৎকারে বল্টুর তন্দ্রা ভাবটা কেটে গেল। হাত বাড়িয়ে প্যান্টটা নিয়ে সোজা ট্রায়াল রুমে। সিএনজির ভাড়া চুকিয়ে সিনেমা হলের পাশে একটা কফি শপে ঢুকে গেল। জরিনা একটা টেবিল নিয়ে বসে আছে। বেবি পিংক কালারের শাড়ি পরা জরিনাকে রাজকন্যার মতো দেখাচ্ছে। মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসলো বল্টু। হাসি হাসি মুখে বললো,: খুবই খুশি হয়েছি। আমার আগেই তুমি চলে এসেছো, এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না।জরিনাও একটা কমপ্লিমেন্টারি হাসি দিলো।বললো,: ভাইয়া, আপনার পছন্দের রংয়ের শাড়ি পরে এসেছি। ম্যাচিং করার মতো কিছু ছিলো না। শুধু আপনার ভালো লাগবে ভেবে পরেছি। সিনেমা দেখার পর কিন্তু এটার ম্যাচিং এক্সেসরিজ কিনবো আপনাকে নিয়ে!বিরাট খরচের ব্যাপার!প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়েবল্টু্ জবাব দিলো, : কোন সমস্যা নেই!এখন কি আমি আমার গভীর কিছু চিন্তা ভাবনা তোমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারি?জরিনা গাল বেঁকিয়ে বললো,: এটা আপনার গভীর কথা বলার সময়!সিনেমা শুরু হওয়ার পথে। চলুন! ওঠা যাক!মুখে চলে আসা ভালোবাসার কথা মুখেই থেকে গেল। বল্টু উঠে দাঁড়ালো।কি আর করা!অন্ততঃ সিনেমা টা একসাথে দেখা যাক! জরিনাদের অবহেলায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

বাংলা একাডেমিতে তিন লেখককে রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান

বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০১৯’ প্রদান করা হলো তিন গুণী লেখক ও গবেষককে। রবীন্দ্রসাহিত্যে গবেষণায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ শিল্পী ইকবাল আহমেদকে। আজ বুধবার সকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিষারদ মিলনায়তনে এই পুরস্কার বিতরণ এবং রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপিত হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও শিল্পীর হাতে পুষ্পস্তবক, সনদ, সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কারের অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ‘রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ : শিক্ষা ও স্বদেশ ভাবনা’ শীর্ষক বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনোয়ারুল করীম। অধ্যাপক আনোয়ারুল করীম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও স্বদেশভাবনা অনন্যতার দাবি রাখে। তাঁর শিক্ষাভাবনা ছিল প্রায়োগিক এবং বৈজ্ঞানিক। তিনি পূর্ববাংলায় জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন কিন্তু একই সঙ্গে পালন করেছেন মানবিক দায়িত্ব। বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জীবন মানোন্নয়নে তাঁর ভাবনার অন্ত ছিল না। তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে তাঁর স্বদেশভূমিকে লুণ্ঠিত হতে দেখেছেন। এই লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে আত্মশক্তি জাগরণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশকে নতুন করে নির্মাণের ব্রত নিয়ে আমৃত্যু সাধনা করে গেছেন।’ জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার মূলে ছিল আনন্দের ধারণা, যে শিক্ষা-কাঠামোয় কঠিন শাসনের পরিবর্তে ছিল উদারতার আবহ। রবীন্দ্রনাথ দেশপ্রেমে স্নাত ছিলেন তবে কোনোভাবেই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর মানবভাবনার মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক বিশ্বনাগরিকের সুদৃঢ় অবস্থান।’ পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী শামা রহমান এবং রবীন্দ্রপুরস্কারে ভূষিত ইকবাল আহমেদ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন বাচিকশিল্পী রূপা চক্রবর্তী। সূত্র : বাসস এসএ/  

‘পথ চলেছি একা’ একটি অনবদ্য জীবনীসাহিত্য

আত্মজীবনী গ্রন্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষের পঠনপাঠনের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। এ ধরনের গ্রন্থে জীবন পাঠশালার অনেক লোমহর্ষক কাহিনী থাকে যা সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জীবনীগ্রন্থে লেখকরা সাধারণত জীবনের অভিজ্ঞতা অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। ফলে আত্মজীবনী রচনায় লেখকের সন্নিবেশিত রকমারি অভিজ্ঞতাগুলো জীবনদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের গ্রন্থে যে যে দর্শন  থাকে তা উন্নত জীবনযাপনে পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে, মন্দ দর্শনকে এড়িয়ে চলা, ভালো দর্শনকে ধারণ করে পাঠকগণ এগিয়ে যায় ইস্পিত লক্ষ্যে। মোদ্দা কথা-প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জীবনীগ্রন্থের লেখকরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন একজন শিক্ষকের মতন। তাদের অভিজ্ঞতা মুলতঃ শিক্ষণীয় বিষয় যা জ্ঞান কোষ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। জীবনী সাহিত্যে লেখক কোন নীতি বা আদর্শ প্রচার করেন যা নিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য সাহিত্যক রসবোধের সঙ্গে চিত্রিত করা প্রয়োজন।                                                 এএএম জাকারিয়া মিলন   এএএম জাকারিয়া মিলনের ‘পথ চলেছি একা’ বইটি পর্যালোচনা করলে এমনই প্রতীয়মান হয় যে, এ গ্রন্থটি নিছক আত্মপ্রচার নয়, তিনি মানব কল্যাণের জন্য ভবিষ্যতে আত্মজীবনী-সামত্মীজীবনী হয়ে উঠবেন নি:সন্দেহে। এটা স্বীকৃত যে, আমাদের দেশের লেখক-কবিরা আত্মজীবনী লেখার সময় নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো গুপ্ত রাখেন, তাদের লেখা পড়লে মনে হবে তাদের মতো ফেরেস্তা আর হয় না। মনে হবে তাদের কোনও দোষ নেই, তাদের জীবনে কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই, তাদের জীবনে কোনও ঈর্ষা-বিদ্বেষ নেই, তারা শুধুই মহামানব। এ ক্ষেত্রে জাকারিয়া মিলন অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। তিনি ব্যক্তি ও কর্মজীবনে ভুল-ত্রুটির বিষয়াবলী সিদ্ধ হস্তে তুলে ধরেন; যাতে পাঠকগণ তার আত্মজীবনীর মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করে একটি পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে পারেন। ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থের অবতারণা অত্যন্ত অর্থবহ। জীবন পথে কখনও কখনও সঙ্গী পাওয়া যায় না। তবুও জীবন থেমে থাকে না, স্রোতস্বীনির মতই জীবন ধাবিত হয় জীবনের অভিষ্ট্য লক্ষ্যে। কখনও দল বেধে-কখনও চলতে হয় একাই। পার্থিব জগতে প্রত্যেক মানুষই মুসাফির, তাই জীবন পরিক্রমায় সুন্দর ঘটনাবলি মাঝে-মধ্যে অসুন্দর হতে দেখা যায়। সে জন্য জীবন থেমে যায় না বরং জীবন চলে সম্মুখপানে, জীবন চলে দুর্বিনীত লক্ষ্যে। জাকারিয়া মিলন তার প্রণীত আত্মজীবনী ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থে ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। চলার পথে তার আহরিত অভিজ্ঞতা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘কখনও কখনও বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে পরিবেশ-পরিস্থিতি। কখনও কখনও আঁধার নেমে আসে আবার ভোরের আলোয় আঁধার কেটে যায়। আলো আর আঁধারের মতো জীবনের জোয়ার ভাটায় পথিককে চলতে হয়।’ তিনি একটি নিষ্ঠুর সত্যকে তুলে ধরেন, জীবনে চলার পথে কখনও কখনও সঙ্গী পাওয়া যায় না, তাতে পথ চলা থেমে থাকে না। একাই চলতে হয়। আত্মজীবনী গ্রন্থকে মূলতঃ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বলা হয়। এ ধরনের গ্রন্থে যে অভিজ্ঞতাগুলো প্রতিফলিত হয় তা জীবন ও সমাজ নির্মাণে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ফলে এ ধরনের গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে আত্মজীবনী লেখককে অবশ্যই সমাজ সচেতন হতে হয়। ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধন থেকে বিরত থাকতে হয়। অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তু সর্বজনীন ও চিরন্তন হলে পাঠকগণ স্ব-স্ব অবস্থানে তা প্রয়োগ করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে উৎকর্ষ সাধনে সমর্থ হবে। অন্যদিকে, সামাজিক উন্নয়নে সর্বজনীন বিষয়বস্তু চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে। পাঠককে মিথ্যা বিশ্বাসে অভিভূত করার লক্ষে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হলে সমাজ বিনির্মাণে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ নিস্ফল হবে। এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, সাহিত্যের প্রাচীনকাল থেকে অদ্যবদি অসংখ্য আত্মজীবনী গ্রন্থ রচিত হয়েছে তন্মধ্যে গুটিকয়েক অন্যতম, বাকি সব জীবনবৃত্তান্তের গ্রন্থ হিসেবে  বিবেচিত। পঠকগণ অতি সহজেই বুঝতে পারেন যে, সাধারণ জীবনী ও আত্মজীবনী গ্রন্থের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, সাধারণ জীবনী গ্রন্থের চেয়ে তুলনামূলকভাবে আত্মজীবনী গ্রন্থকে পাঠকরা বেশি পছন্দ করেন। কারণ আত্মজীবনীগ্রন্থ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যা মানুষের জন্য চিরকালের জ্ঞানকোষ। আত্মজীবনী গ্রন্থ হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের অন্যতম শাখা। অভিজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হলো আত্মজীবনী গ্রন্থ। লেখকের জীবনী সাহিত্যে রূপ নেয় তখন, যখন লেখক তার অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষভাবে উত্থাপিত করেন। সংযত চরিত্র ও উদারতার মাধ্যমে সমাজবান্ধব উপজীব্য বিষয়াবলী জীবনী লেখনীতে বিধৃত হওয়া উচিত। সে জন্য হয়তো রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ বাংলা সাহিত্যে একটি শ্রেষ্ট আত্মজীবনী গ্রন্থ। তিনি এ গ্রন্থে আগের জিনিসকে পাছে এবং পাছের জিনিসকে আগে এনে বিষয়াবলী বর্ণনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন। এ ক্ষেত্রে এএএম জাকারিয়া মিলন পিছিয়ে নেই। তার রচিত ‘পথ চলেছি একা’ নি:সন্দেহে আত্মচরিত গ্রন্থ যা পূর্ণাঙ্গভাবে সাহিত্যের আদলে রচিত। রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘জীবনস্মৃতি’ মতই তিনি তুলে ধরেন, ‘মানুষ আজ উপরে তো কাল নিচে। আমাদের কোনও হাত নেই। নিয়তির হাতে বন্দি আমরা। কেতুর নাচের মত নাচছি। তার (খোদার) ইচ্ছায় সব ঘটছে কিন্তু দৃশ্যমান হচ্ছে মঞ্চের কেতুগুলো’। জাকারিয়া মিলন মানব জীবনের উত্থান-পতনকে নাগরদোলার সঙ্গে তুলনা করেন। নাগরদোলা ঘৃর্ণায়মান। স্থায়ীভাবে কেউ উপরে বা নিচে থাকেন না-সময়ের আবর্তনে অবস্থানের পরিবর্তন হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘আজকের উপরের মানুষটি নিচে এবং নিচের মানুষটিকে উপরে উঠতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই’। চলমান জীবনের আবর্তন ও বিবর্তন এ রকমের, এ যেন চিরন্তন বাণী। চলমান জীবনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ-অনাকাঙ্খিত অনেক সূখ-দুঃখের  খণ্ড খণ্ড কাহিনী ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে দারুণভাবে যা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং অতলস্পর্শী। উল্লেখ্য যে, এএএম জাকারিয়ার ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থটি নিছক আত্মকথন নয় বরং জীবন পরিক্রমায় এই গ্রন্থটি অভিজ্ঞতার অমিয়বাণী। ইতোপূর্বে তার লেখা ‘জীবনের পথে’ এবং মিল-অমিলের এই সংসার’ নামক দুটি আত্মজীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে যা ছিলো পাঠক সমাদৃত। ‘জীবন পথে’ এই গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সবাইকে নিয়েই মানুষ, একা-নিজ-ব্যক্তি এতো সমাজচ্যুতির শামিল। সমাজ মানে হলো সবাইকে নিয়ে, সবাইকে এক ছাতার তলে আনতে পারলে পারিবারিক জীবন সফল হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে’। সমাজ বিনির্মাণে তার এই মন্তব্য যেন চিরন্তনবাণী। নিজের স্বার্থসিদ্ধি, নিজের কার্পণ্যতা পিছে ফেলে তিনি সমাজ বিনির্মাণে স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্নে বিভোর থাকেন, বেদনার অন্ধকারে ছুঁতে চান নীল আকাশ মানবিক কল্যাণে। অন্যদিকে তার রচিত ‘মিল-অমিলের এই সংসার’ গ্রন্থটি পাঠকদের নিয়ে যায় গভীর এক দর্শনে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘জগৎ সংসারে কে কার? এর উত্তর জানা নেই, আজ যাকে আপন মনে হয়, একান্ত নিজের, সময়ের প্রেক্ষাপটে তাকে দেখি ভিন্নরূপে। আপন কে?’ উত্তরে তিনি নিজেই বলেন, ‘আত্মার বন্ধন-মনের মিল, এটাই বড় কথা’। তার ভাষায় মমতা বেরিয়ে আসে, চোখে জল আসে। মানবকল্যাণে তার উচ্চারিত বাণী হচ্ছে-জীবন সংসারে, চলমান জীবনে মিল-অমিল, পছন্দ-অপছন্দ দুটি শব্দ থাকলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানবকল্যাণে ছাড় দিতে হয়, সমঝোতা করতে হয়। সমঝোতার মধ্যেই গড়ে ওঠে পরিবার-সমাজ-জীবন। সমাজ সংসারে কিছু না কিছু মিল-অমিল পরিলক্ষিত হতে পারে, যা মেনে নিয়ে  জীবন ও সমাজকে সুন্দর করতে হবে; তিনি স্বপ্ন দেখেন একটি সুন্দর পৃথিবীর। তিনি লোভ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থে। তিনি উল্লেখ করেন, সুদূরপ্রসারী ফল লাভে বিশ্বাসীর সংখ্যা কম ‘সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের গল্পের নায়কের মতো প্রতিদিন একটি ডিম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কিংবা অপেক্ষার সেই ধৈর্য আমাদের নেই। সব একত্রে পাওয়ার লোভ আমরা সংবরণ করতে পারি না’। অতীতকে ভুলে যাবার জন্য তিনি সুপারিশ করেন। অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামনে চলার আহবান করেন, ‘অতীতকে মনে করে লাভ কী? কষ্ট পাওয়া ছাড়া তো কোনও কিছু হবে না। অতীত ঘেঁটে খামোখা সময় নষ্ট না করাই ভালো। অতীতের কথা ভাবে বোকারা। বুদ্ধিমানেরা কেবল বর্তমানের কথাই ভাবেন’। সাহিত্যের মূখ্য উপাদান হচ্ছে মানবজীবন, সাহিত্যে মানুষের জীবনই রকমারিভবে প্রতিফলিত ও ব্যাখ্যাত হয়। ফলে আত্মজীবনী সাহিত্যে হৃদয়গত উপাদান বিদ্যমান যা সংবেদন জাগায়, বিষয় নির্বাচন এবং রূপ নির্বাচন করে প্রয়োগকৌশলীর মাধ্যমে লেখক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশ্লেষণে বলা বাঞ্চনীয় জাকারিয়া মিলনের ‘পথ চলেছি একা’ গ্রন্থটি আসলে একটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য আত্মজীবনী। লেখক নিজের জীবন ও সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তুল্যমূল্য করে রসোর্ত্তীন হতে পেরেছেন। এ গ্রন্থে লেখক ২১টি টাইটেলে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৫টি বাদে বাকি সব টাইটেলে তার সারা জীবনের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে, অন্য পাঁচটি টাইটেলে যা তুলে ধরেন তা প্রবন্ধ হয়েছে। আত্মজীবনী গ্রন্থে গল্প বলার ছলে অভিজ্ঞতা সন্নিবেশিত হয়, অন্যদিকে প্রবন্ধ হলো ফ্যাক্টবেসিস। প্রবন্ধ বলতে আমরা সাধারণত প্রকৃষ্ট বন্ধনকে বুঝে থাকি। এই বন্ধন বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, চিন্তারাশি সুসজ্জাজনিত হতে পারে। মূলত: সংযত যুক্তিশৃঙ্খলা, সুসজ্জা রচনাসৌন্দর্য থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ ভীষণ সার্থক। ফলে, প্রবন্ধ আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে ভিন্ন। এই সামান্য ক্রটি পরিহার করলে ‘পথ চলেছি একা’ একটি সার্থক আত্মজীবনী গ্রন্থ হতো বলে আমার কাছে স্পষ্ট প্রতীয়মান। একে//

গ্রিসে সম্মাননা পেলেন কবি শামীম আজাদ

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাসকারী বাংলাদেশি কবি শামীম আজাদ, শিল্প-সাহিত্য ও সভ্যতার জন্মভূমি ঐতিহাসিক গ্রিসের আবাসিক কবির সম্মাননা পেয়েছেন। সম্প্রতি এথেন্সের ‘এ পোয়েটস’ আগোরা’ ২০১৯ সালের ‘আবাসিক কবি’র জন্য তাকে মনোনীত করা হয়। শামীম আজাদ প্রাচীন এথেন্সের প্লাকা অঞ্চলে ১৮০১ সালে নির্মিত একটি নব্য-ধ্রুপদি বাড়িতে ১০ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত অবস্থান করবেন। কবি শামীম আজাদ প্রথম কোনো বাঙালি, যিনি আ পোয়েটস অ্যাগোরা রেসিডেন্সির আবাসিকত্ব পেলেন। তিনিই প্রথম এশীয় এবং বাঙালি নারী, যিনি এই দুর্লভ সম্মাননা লাভ করলেন। জীবিত গ্রিক কবি কিংবা গ্রিস-উদ্বুদ্ধ কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনো দেশের কবি-সাহিত্যিকে আবাসিকত্ব দেওয়া হয়। প্রতিবছর সাহিত্যকর্ম বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিককে আবাসিকত্ব প্রদান করে আ পোয়েটস অ্যাগোরা রেসিডেন্সি। গ্রিক শব্দ ‘অ্যাগোরভেইন’ (agorvein) থেকে অ্যাগোরা (Agora) শব্দের উৎপত্তি। এর সাধারণ অর্থ হচ্ছে ‘বাজার’। অবশ্য এর আদি মানে হচ্ছে একটি স্থান যেখানে এক বা একাধিক গোষ্ঠী পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার জন্য মিলিত হতে পারে। এই সম্মাননা প্রসঙ্গে কবি শামীম আজাদ বলেন, ‘এই আবাসিকত্ব লাভের মানে হলো, আমি তাদের সম্মানিত অতিথি। তাই আ পোয়েটস অ্যাগোরা রেসিডেন্সির সৌজন্যে দিতে হবে দুটি বক্তৃতা। নৈশভোজসহ নানানভাবে পরিচিতি ও সংযোগ ঘটবে গ্রিসের সম্মানিত কবিদের সঙ্গে। আবাসিকত্ব আমাকে আমার চিন্তা-চেতনা, লেখালেখির একটি ভাবনাবিহীন নির্জন সুযোগ দেবে। এই সুযোগে জানতে পারব গ্রিসের সাহিত্যের ইতিহাসসহ তার সমসাময়িক অবস্থান। আমাকে লিখতে হবে কিছু ইংরেজি কবিতা, যার ভাষান্তর হবে গ্রিক ভাষায়। এসব কর্ম আ পোয়েটস অ্যাগোরার বার্ষিক প্রকাশনীতে স্থান পাবে।’ উল্লেখ্য, লন্ডনে বসবাসরত কবি শামীম আজাদ একজন দ্বিভাষিক কবি ও লেখক। বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ৩৭টির বেশি বই লিখেছেন ও সম্পাদনা করেছেন। কবি শামীম আজাদের মূল সাহিত্যকর্ম এবং তার অনুবাদ যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী  নিউইয়র্কসহ বিশ্বের নানা প্রকাশনায় বের হয়েছে। কেআই/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি