ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৮:১৪:৩৮, বুধবার

হজ-ফ্লাইট ৪ জুলাই থেকে শুরু

হজ-ফ্লাইট ৪ জুলাই থেকে শুরু

আগামী ৪ জুলাই থেকে চলতি মৌসুমের প্রথম হজ-ফ্লাইট শুরু হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (বিজি-৩০০১) এর একটি ফ্লাইট ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টা ১৫ মিনিটে ৪১৯ জন হজ-যাত্রী নিয়ে জেদ্দার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যাবে।
ওমরাহ ভিসা স্থগিত করলো সৌদি

সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত সোমবার থেকে ওমরাহ ভিসার জন্য আবেদন গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেটের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিন বদি বলেছেন, হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় ওমরাহ ভিসা দেয়া বন্ধ করেছে। আরবি জ্বিলহাজ মাসের ১৫ অর্থাৎ আগামী ১৫ আগস্ট থেকে পুনরায় এই ভিসা দেয়া হবে। হজ ও ওমরাহ বিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরও জানান, আবেদন পড়ার পাঁচ দিনের মধ্যে ওমরাহ ভিসা প্রদান করা হবে। তবে এই ভিসার মেয়াদ কোনোভাবেই এক মাসের বেশি অতিক্রম করবে না। চলতি বছরে রেকর্ড পরিমাণ ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৭৩৬ জনকে ওমরাহ ভিসা প্রদান করেছে সৌদি আরব। মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ওমরাহ ভিসা পাওয়া সেসব হাজির ৭৩ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৭ জন ইতোমধ্যে সৌদি পৌঁছেছেন। ওমরাহ হজ পালন করতে যেসব হাজি সৌদি পৌঁছেছেন তাদের মধ্যে ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ৫২০ জন আকাশ পথে দেশটিতে প্রবেশ করেন। বাকিদের মধ্যে ৭ লাখ ৭ হাজার ৯৫৫ জন স্থলপথে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮২ জন সমুদ্রপথে সৌদিতে প্রবেশ করেন। এসব হাজির মধ্যে সবচেয়ে বেশি হলো পাকিস্তানের। দেশটির ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৭ জন সৌঁদি গেছেন ওমরাহ হজ পালন করতে। পাকিস্তানের পরেই ৯ লাখ ৬৭ হাজার ১২৫ জন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ইন্দোনেশিয়া। এরপর ধারবাহিকভাবে ভারতের ৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৮০, মিসরের ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫, আলজেরিয়ার ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৮, ইয়েমেনের ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৮ তুরস্কের ৩ লাখ ২১ হাজার ৪৯৪ মালয়েশিয়ার ২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৭৪, ইরাকের ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ এবং জর্ডানের ২ লাখ ১৬৫ জন সৌদি গেছেন ওমরাহ পালন করতে। আরকে//

অতিথি পরায়নতা একটি সৎকর্ম

সামাজিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে অনেক উঁচুমানের খাদ্য যদি অতিথির উদ্দেশ্যে পরিবেশন করা হয় তাহলে তা হবে প্রদর্শনীমূলক। আর সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য খাবারও যদি মমতার সঙ্গে অতিথির প্রতি সম্মানের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় তাহলে তা হবে সৎকর্ম। আতিথেয়তা সৎকর্ম হিসেবে আল্লাহর কাছে কতটুকু গ্রহণীয় হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে অতিথি আপ্যায়নকারীর আন্তরিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর। আন্তরিকতার সঙ্গে অতিথি আপ্যায়ন শাশ্বত ধর্মবাহকদের অনুসৃত পন্থা এবং আদি পিতা ইব্রাহিমের সুন্নাত। অতিথি পরায়নতা শেষনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের প্রাত্যহিক সৎকর্ম। রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানকে সম্মান করে এবং তার হক আদায় করে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সা.)। তার হকটা কি? তিনি বললেন, একদিন ও একরাত (সাধারণ নিয়মের চেয়ে উত্তম খাবার) এবং তিনদিন পর্যন্ত মেহমানদারী করা। এর চেয়ে বেশি হলো সাদাকাহ। (বুখারী ও মুসলিম) অতিথিকে কি ধরনের খাবার পরিবেশন করা হলো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কিভাবে খাবার পরিবেশন করা হলো ও অতিথির প্রতি কত সম্মান প্রদর্শন করা হলো। আল্লাহর রাসূল (সা.) এ জন্য অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে উপস্থিত করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন, যে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন অবশ্যই তার মেহমানকে সম্মান প্রদর্শন করে। (বুখরী ৩৫৭১) আমরা যদি সামাজিক মর্যাদা ও রীতিনীতি মেনে চলার স্বার্থে খাবারের পদ ও পরিবেশনের বাহুল্যের মধ্যে জড়িয়ে যাই তাহলে অতিথি আপ্যায়ন লোক দেখানো, নিষ্প্রাণ, আন্তরিকতাবিহীন আনুষ্ঠানিক বোঝায় রূপান্তরিত হবে এবং আতিথেয়তার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবো। কেননা আল্লাহ খাবারের পদের দিকে তাকান না। তিনি অতিথিকে আপ্যায়নকারীর মনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হযরত আবু হুরায়রা বলেন, একবার রাসূল (সা.) এর কাছে একজন লোক এসে বললো, আমি ক্ষুধার্ত। তিনি তার স্ত্রীদের নিকট লোক পাঠানোর পর তারা সবাই বললেন যে, তাদের ঘরে পানি ছাড়া আর কিছু নেই। তারপর তিনি বললেন, আজ রাতে কে এই লোকের মেহমানদারী করবে? জনৈক আনসারী ব্যক্তি উঠে বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমি করাব। আনসারী মেহমানকে নিয়ে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে স্ত্রীকে বললো, তোমার নিকট কোন খাবার আছে কি? সে বললো, না, শুধু বাচ্চাদের জন্য সামান্য কিছু খাবার আছে। সে তার স্ত্রীকে বললো, তুমি ওদের কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখো। আর খাবার জন্য যখন মেহমান ঘরে প্রবেশ করবে তখন তুমি বাতি নিভিয়ে দেবে। তুমি তাকে দেখাবে যে, আমরাও আহার করছি। এভাবে তারা বসে রইলেন আর মেহমান খেতে থাকলো। সকাল বেলা উক্ত আনসারী নবী করীম (সা.) এর কাছে এলে, তিনি বললেন আজ রাতে মেহমানদের সঙ্গে তোমাদের দু’জনের আচরণে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। (মুসলিম ৩৪৫৭) অর্থাৎ সৎকর্ম হিসেবে আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য খাবারের উপাদান নয় বরং আন্তরিকতাই মূখ্য। আতিথেয়তার সময় আমাদের অন্তর যেন অতিথির প্রতি সম্মান ও আন্তরিকতায় পূর্ণ থাকে আর আমরা যেন অতিথি আপ্যায়নের বিনিময়ে অতিথির কাছ থেকে কোন সুবিধা আশা না করি। অনেকে আছেন যারা সামাজিক সম্মান, সামাজিক যোগাযোগ ও বৈষয়িক লাভ সামনে রেখে অতিথি আপ্যায়ন করেন। এ ধরনের অতিথি পরায়নতা আল্লাহর কাছে সৎকর্ম হিসাবে গৃহীত হয় না। ইসলাম যে অতিথি পরায়ণতাকে সৎকর্ম হিসেবে উল্লেখ করেছে তা হবে নিঃস্বার্থ, আন্তরিক ও শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং তা অতিথি আপ্যায়নকারীর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/  

মমতা স্বর্গীয় গুণ

সৃষ্টির প্রতি মমতা ও ভালবাসা প্রকাশের মাধ্যমেই আল্লাহর ভালবাসা পেতে হবে অন্য পথে নয়। কেননা আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি আমাদের প্রার্থনা উপাসনারও মুখাপেক্ষী নন। হাজার বার জপলেও তিনি সাড়া নাও দিতে পারেন। কিন্তু যখন তার কোন সৃষ্টির প্রতি দয়া বা মমতা করা হয় তখন তার করুণার সাগরে ঢেউ লাগে এবং তিনি প্রীত হন। সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শন না করে আল্লাহর দয়া লাভ করা অসম্ভব। আল্লাহতায়ালা মমতার আধার। সৃষ্টজীবের মধ্যে বিরাজমান মায়া-মমতা স্রষ্টার মমতার প্রকাশ মাত্র। যখনই কেউ সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শন করে সে সত্যিকার অর্থে স্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে মমতার প্রকাশ ঘটায় মাত্র। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা মায়া-মমতাকে একশত ভাগে ভাগ করেছেন তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ রেখেছেন নিজের জন্য। আর একভাগ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। প্রাণীকূল যে একে অপরের প্রতি মায়া-মমতা দেখায় তা ওই একভাগের কারণে। এমনকি শাবক ব্যাথা পাবে এই ভয়ে ঘোড়াটি যে তার শাবকের উপর হতে পা তুলে নেয় তাও ওই মমতার কারণে। (বুখারী ৩৪৭৬) অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি মমতা একটি স্বর্গীয় গুণ। যে সৃষ্টির প্রতি মমতাকে আয়ত্ত করলো সে যেন অফুরন্ত কল্যাণের অধিকারী হলো। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সৃষ্টির প্রতি দয়া করে না তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া করা হয় না। (বুখারী ৩৪৮৮) বস্তুত আল্লাহর সৃষ্টিকূলের প্রতি এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে স্রষ্টার রহমত পেতে হবে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন না করে পাহাড় পরিমাণ ইবাদত করলেও মানুষ আল্লাহর করুণা লাভে সক্ষম হবে না। সৃষ্টির প্রতি মমতাই স্রষ্টাকে পাবার রাজপথ। যুগে যুগে মহামানবরা ওই রাজপথ ধরেই স্রষ্টাকে পাবার সাধনা করেছেন। যুগ শ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন জীবের প্রতি দয়ার জীবন্ত মডেল। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো তাহলে আল্লাহ তোমাদের উপর দয়া করবেন। (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনুল আস হতে আবু-দাউদ ও তিরমিযিতে বর্ণিত) সৃষ্টির প্রতি দয়া এমন এক ধরনের সৎকর্ম যার মাধ্যমে অতি সহজে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। শুধু নিজে দয়ার চর্চা করলে হবে না অন্যদেরকেও দয়া করার উপদেশ দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা পরস্পরকে দয়ার উপদেশ দেয়ার কাজকে সৎকর্মের ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।  তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

সুন্দরভাবে কথা বলা সৎকর্মের ভাণ্ডার

মানুষের মন যেমন জয় করা যায় তেমনি আল্লাহকেও সন্তুষ্ট করা যায় সুন্দর বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে। সুন্দর কথা বলার জন্য শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম করতে হয় না, কোন আর্থিক ত্যাগের প্রয়োজন হয় না। সুন্দর বাক্য এমন এক সৎকর্ম যা প্রতিমুহূর্তে করা যায়। ছোট ছোট বালুকণা যেমন বিশাল পাহাড় তৈরি করে তেমনি প্রতিটি মুহূর্তে উচ্চারিত সুন্দর বাক্য পরকালে নেকির এমন পাহাড় গড়ে তুলবে যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাবে। সুন্দরভাবে কথা বলা ও ভালো ব্যবহার কোন ঐচ্ছিক ব্যাপার নয় বরং আল্লাহর নির্দেশ। আমরা নামাজ, রোজাসহ আল্লাহর নির্দেশগুলো যে চেতনা নিয়ে ফরজ মনে করে পালন করি ঠিক সেই চেতনা নিয়েই সুন্দর কথা বলার চেষ্টা চালাতে হবে। আল্লাহ পবিত্র আল কোরআনে বার বার মানুষকে সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন : মানুষের সঙ্গে ভালো কথা বলো সুন্দর কথা বলো। (সূরা বাকারা ২:৮৩) আরও বলেন : তাদের সঙ্গে (যেসব যাঞ্চাকারীকে তুমি কিছু দিতে অপারগ) নম্রভাবে কথা বল। (সূরা বনিইসরাইল ১৭:২৮) আল্লাহতায়ালা বলেন : চাল চলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর। মোলায়েম কণ্ঠে কথা বল। নিশ্চয়ই স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর (অর্থাৎ গাধার মতো কর্কশ কণ্ঠে কথা বলো না)। (সূরা লোকমান ৩১:১৯) আল্লাহ তায়ালা পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমনকি সমাজের নীচু পর্যায়ের যাঞ্চাকারীর (ভিক্ষুকের) সঙ্গেও সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দিচ্ছেন। হয় মানুষ সুন্দরভাবে মোলায়েম কণ্ঠে কথা বলবে অথবা চুপ থাকবে। কোন অবস্থাতেই কর্কশ কণ্ঠে কথা বলার অনুমতি আল্লাহ দেন নাই। আমাদের প্রত্যেককে প্রতিমুহূর্তে শব্দ চয়নে সতর্ক হওয়া উচিত এবং সুন্দরভাবে, শুদ্ধভাবে, শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার সাধনা করা উচিত। কেননা একটি ফলবান বৃক্ষ যেমন বছরের পর বছর মানুষকে তৃপ্ত করে তেমনি একটি সৎবাক্য বা ভালো কথা স্থানকালের সীমানা অতিক্রম করে অগণিত মানুষকে আলোকিত করে ও পথ নির্দেশনা দেয়। সুন্দর বাক্য এমন এক ধরনের সৎকর্ম যার প্রতিদান শেষ হবার নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন : একটি ভালো কথা বা সৎবাক্য এমন একটি ভালো গাছের মত, যার শিকড় মাটির গভীরে সুদৃঢ় আর যার শাখা-প্রশাখা দিগন্তব্যাপী বিস্তৃত এবং যা সারাবছর ফলদান করে। (সূরা ইব্রাহিম ১৪:২৪) সুন্দর বাক্য শুধু সৎকর্মের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে না দোযখের আগুন থেকে মানুষকে বাঁচায়। কিয়ামতের বিভিষীকাময় পরিস্থিতিতে দোযখের আগুন থেকে বাঁচার জন্য একটি সুন্দর কথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রতিনিয়ত দান ও সুন্দর বাক্যের মাধ্যমে দোযখের আগুন থেকে বাঁচার উপদেশ দিয়েছেন। আলী ইবনে হাতেম (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো যদি এক টুকরা খেজুর দান করেও হয়। তাও করা না গেলে একটি সুন্দর কথা বলার বিনিময়ে হলেও। (বুখারী ৩৪৯৬) আল্লাহর অপছন্দনীয় বিষয় যেমন গীবত, চোগলখোরী, ঝগড়াঝাটি, কটুবাক্য থেকে যেমন একদিকে বিরত রাখার চেষ্টা চালাতে হবে অন্যদিকে সুন্দর বাক্য বিনিময়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কেননা সুন্দর কথা প্রতিমূহূর্তে সৎকর্মের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে। তাই বুদ্ধিমানদের উচিত সুন্দরভাবে কথা বলার সাধনা করা যাতে সৎকর্মে অগ্রবর্তীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায়। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

সৎকর্মের প্রতিদান দশ গুণ

কিয়ামত দিবসে যারা সৎকর্ম নিয়ে আসতে পারবে তাদেরকে আল্লাহ দশগুণ বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ পুরস্কার দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত মেহেরবান। তিনি তার সকল বান্দার মঙ্গল চান। এ জন্য তিনি সৎকর্মের প্রতিদিন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন এবং অসৎকর্মের জন্য যতটুকু পাপ করা হয়েছে ততটুকু শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। পবিত্র আল কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন : যে একটি সৎকর্ম নিয়ে আসবে (পরকালে), সে তার দশগুণ পাবে এবং যে একটি অসৎকর্ম নিয়ে আসবে সে এটিরও প্রতিফল পাবে। তাদের (অসৎ কর্মশীলদের) ওপর জুলুম করা হবে না। (সূরা আনআম ৬:৬১) সৎকর্ম সম্পাদন করার পর মনে যদি গর্ব-অহঙ্কার দানা বাঁধে তাহলে তা ত্রুটিযুক্ত হয়ে যাবে। আর সৎকর্ম সম্পাদন করার পর যদি ভালো কাজ করার শক্তি দেবার জন্য স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতায় মন অবনত হয়ে আসে তাহলে সেই সৎকর্ম অক্ষত থাকবে এবং এর মান উন্নত হয়ে যাবে। যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে মানুষকে সন্তুষ্ট করা বা মানুষের কাছ থেকে বিনিময় পাবার উদ্দেশ্যে সৎকর্ম করা হয়ে থাকে তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাতে আল্লাহর কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাবে না। যদি কাউকে আর্থিক, সামাজিক বা শিক্ষাগত অনুগ্রহ (সাহায্য) করার পর খোটা দেয়া হয় তাহলে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যদি অসহায় বঞ্চিতদের সেবা দান করার সময় তাদের সম্মান না দেখিয়ে তাচ্ছিল্য করা হয় তাহলে আল্লাহ সে সৎকর্মকে গ্রহণ করবেন না ও ক্ষেত্রভেদে শাস্তি দিবেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা: অতঃপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে তিনি তাদের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো বেশি দেবেন কিন্তু যারা হেয় জ্ঞান করে ও অহঙ্কার করে তাদেরকে যন্ত্রণায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। আল্লাহ ছাড়া সে বন্ধু বা সাহায্যকারী পাবে না। (সূরা নিসা ৪:১৭৩) অতএব সৎকর্মের পূর্ণ ও বর্ধিষ্ণু প্রতিদান পেতে হলে আমাদের কিছু নিয়মনীতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে অন্যথায় সব প্রচেষ্টা পণ্ডশ্রম হয়ে যাবে। সৃষ্টির সেবামূলক কাজ যেমন দুস্থ, বঞ্চিত, অসুস্থ, ধূলিমাখা অসহায় অভিভাবকহীন জনগোষ্ঠীকে আমরা যখন সেবা-সাহায্য বা পরামর্শ দান করি তখন আমরা যেন তাদের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা, মমতা ও সম্মান প্রদর্শন করি। আমরা মনে রাখবো তারা হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত মেহমান। আমরা যেন তাদেরকে করুণার পাত্র মনে না করি বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করি। যদি বঞ্চিতদের সেবা করার সময় সামান্যতম তাচ্ছিল্য ভাব আসে তাহলে সৎকর্ম ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ রাগান্বিত হবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ভেতর পড়তে হবে। কাউকে রক্ত দেবার পর যদি অহঙ্কারে বুক ফুলে ওঠে আর মনে হয় অনেক কিছু করে ফেলেছেন। তবে আপনার সৎকর্মটি অহঙ্কার মিশ্রিত হবার সম্ভবনা থাকে এবং আল্লাহ সৎকর্ম হিসেবে কবুল নাও করতে পারেন। তাই রক্তদান করার পর স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করুন- ‘হে সৃষ্টিকর্তা আমাকে রক্তদান করার যে সুযোগ দিয়েছো সে জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমাকে সুস্থ রাখো যাতে আমি সব সময় মানুষের কল্যাণে রক্তদান করে যেতে পারি। আমার সৎকর্মকে তুমি কবুল কর।’ যদি কোন নিকটাত্মীয় এতিমকে পড়াশুনার জন্য বা স্বাবলম্বী করার জন্য নিয়মিত আর্থিক সাহায্য করে থাকেন তাহলে আমি সাহায্য করেছি এ কথা বলে বুক ফুলিয়ে গর্ব করবেন না বা কারো কাছে এই তথ্য প্রকাশ করবেন না, এমনকি পরবর্তীতে এর বিনিময়ে কোন উপকার নেবার চেষ্টা করবেন না নচেৎ আপনার সৎকর্মটি অর্থহীন হয়ে যাবে। আপনার সাহায্যের কথা গোপন রাখুন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। যদি কোন ডাক্তার গরিব রোগীকে চিকিৎসা দেবার সময় তাকে হেয় জ্ঞান করেন, রোগীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেন তাহলে তা সৎকর্ম না হয়ে শাস্তির কারণ হবে। একই রোগীকে যদি কোন ডাক্তার সম্মানজনক আচরণের সঙ্গে যত্ন সহকারে রোগী দেখেন ও মমতার স্পর্শে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন তা সৎকর্ম বলে গণ্য। হবে। মোটকথা সৎকর্ম কতটুকু করা হলো তার চেয়ে তা কিভাবে করা হলো, ওই সময় মনের অবস্থা কেমন ছিল আর সৎকর্ম করার পর মনের অবস্থা কেমন হলো এবং যাদেরকে সেবা দান করা হলো তাদের সঙ্গে কি আচরণ করা হলো এসবই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় পরিমাণ সৎকর্ম করেও যদি গর্ব, অহঙ্কার, খোটা ও প্রদর্শনেচ্ছা থেকে বাঁচা না যায় তাহলে কিয়ামতের দিন কৃত সৎকর্মের ওজন একটি মাছির পাখার সমানও হবে না। আর স্রষ্টার কাছে সমর্পিত হয়ে সঠিক পন্থায় সামান্য সৎকর্ম করলে তা আল্লাহ বৃদ্ধি করে দেবেন ও কিয়ামত দিবসে পাহাড় পরিমাণ সৎকর্ম হিসেবে দৃশ্যমান হবে।   তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশন্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধের কারিগর

শিক্ষা মানুষকে বিকাশিত করে। গাছ যেমন ডালপালা ছড়িয়ে বড় আকার ধারণ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। তেমনি শিক্ষা মানুষের অস্তিত্বকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিটি স্তরে সেই মানুষের চিহ্ন থাকে যার ভেতর শিক্ষা রয়েছে। আর নৈতিকতা এই শিক্ষাকে উঁচু স্তরে নিয়ে যায়। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দৃঢ়তা, আদর্শবাদী মনোভাবে নৈতিকতার স্বরুপ প্রকাশিত হয়। মানুষের বড় সম্পদ হলো মূল্যবোধ। নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধের কারিগর। সৎ ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য নৈতিক শিক্ষা অপরিহার্য। যার ভেতর নৈতিক শিক্ষার গুণগুলো রয়েছে সে দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেন। নৈতিকতার ইংরেজি Morality. ল্যাটিন শব্দ মোরালিটাস থেকে আগত। যার অর্থ ভদ্রতা, সঠিক আচরণ, ভাল বা সঠিক এবং খারাপ বা ভুল বিষয়সমূহের মধ্যে পৃথকীকরণ। নৈতিকতাকে একটি আদর্শিক মানদণ্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয়সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নৈতিকতা-মূল্যবোধ মানুষের জীবনের এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেখা দেয় নানামুখী প্রতিক্রিয়া। যার পরিণতি হতে পারে পাপবোধ, অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, অশান্তি। যদিও অধিকাংশ মানুষই স্বীকার করতে চান না- এসব ভোগান্তির কারণ হচ্ছে তাদেরই অনৈতিক, অবিবেচনাপ্রসূত, দুর্নীতিপরায়ণ ও প্রতারণাপূর্ণ আচরণের ফলাফল। কোনো একটি কাজ শুরু করতে গিয়ে এর প্রয়োজনীয়তা কিংবা এর ভালো-মন্দ পরিণতি চিন্তার আগে আমরা হয়তো ভাবি, কাজটি করে আমাকে কী কী সুবিধা পাব বা আমি এতে কতটুকু লাভবান হবো? কিন্তু নৈতিক শিক্ষার মানুষ কখনো এ রকম ভাববে না।  কাজটি কাউকে কষ্ট দিবে কি না বা ক্ষতিকর কিনা, সামগ্রিকভাবে কল্যাণকর কিনা এসব চিন্তা করেই সে কাজ করবে। নৈতিকহীনতা শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অশান্তি ও অসুস্থতা সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন মানুষের সার্বিক সুস্থতার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা এবং সমুন্নত নৈতিক চেতনা। বর্তমানে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মনের শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে যথাযথ নৈতিক শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা করি, সোজা কথায়, আমাদের অন্তর্গত সত্তার প্রকৃত ধরনটিই আসলে আমাদের চরিত্র। আর ভালো ও উন্নত চরিত্রের অন্যতম প্রধান শর্তটাই হলো ভালো কাজ। তা যত কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণই হোক না কেন। আর আপনি নিজে যে আচরণ অন্যের কাছে প্রত্যাশা করেন না, তা অন্যের সঙ্গে করাটা কখনোই সৎ-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ নয়। মনোবিদরাও বলছেন, যদি অন্যের কাছ থেকে ভালো আচরণ প্রত্যাশা করেন তবে আপনিও তাই করুন। এতে আপনার একটা অনুপম চারিত্রিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলেও আপনি পরিচিত হয়ে উঠবেন একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ হিসেবে। ফলে চারপাশের পরিবেশও আপনার জন্যে ক্রমশ হতে থাকবে সুখকর, আনন্দময় এবং নিশ্চিতভাবেই কর্মোপযোগী। সামাজিক প্রভাব বা প্রতিপত্তি যাই হোক না কেন, শুধু সদাচরণের পথ ধরেই সবার দৃষ্টিতে হয়ে উঠতে পারেন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। আপনার এই নৈতিকতাসম্পন্ন মূল্যবোধ অন্যদেরও প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে। গবেষকরা বলছেন, চরিত্র-শিক্ষার শুরু হওয়া উচিত শৈশব থেকেই। আর এ দায়িত্ব মা-বাবার একার নয়। আত্মীয়-পরিজন, শিক্ষক এমনকি সমাজের প্রতিটি মানুষের। অর্থাৎ শিশু যাদেরই সংস্পর্শে আসবে সকলের কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে শিশুর চরিত্র গঠনে। এর জন্য শিশুর উপর কিছু চাপিয়ে দিয়ে নয়, ভীতিকর পন্থায়ও নয়, বইয়ের ভাষায়ও নয়। সহজভাবে নিজে করে শিশুকে দেখানো, যাতে শিশুটি অতি সহজে বুঝতে পারে। যেমন ভাল বাক্য বিনিময়, সহযোগিতা করা, সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা, সম্মান প্রদর্শন, আত্মনির্ভরশীল হওয়া ইত্যাদি। আপনার অজান্তেই শিশু তার ক্ষুদে চোখ, কান, মনস্তত্ত্ব দিয়ে সে নীরবে প্রত্যক্ষ করছে আপনার সমস্ত আচরণ ও কথাবার্তা। এগুলো কিন্তু শিশু অনুকরণ করে থাকে। সন্তানের দৃষ্টিতে যদি অনুকরণীয় হতে চান, তবে তাকে যা করতে বলছেন নিজেও তাই করুন। তাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে শেখান ক্ষমা আর সমমর্মিতার মতো মহৎ গুণগুলো। এতে তার অন্তর্গত সত্তা ক্রমশ বিকশিত ও আলোকিত হয়ে উঠবে। এছাড়াও গল্প বলার ছলে শিশুকে কোনো কিছু শেখানোটা বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে শিশু-মনোবিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে। প্রতিদিন না হোক, সপ্তাহে অন্তত যে-কদিন যখনই সময় পান আপনার শিশু সন্তানটিকে সময় দিন। আমাদের নৈতিক সংস্কৃতির আবহে রচিত চিরন্তন গল্প, ঘটনা, উপাখ্যানগুলো তাকে শোনান। এর মর্মকথা তাকে বুঝিয়ে বলুন। গল্পগুলোর অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষা তাকে পরিশ্রমী, বাস্তববাদী ও চরিত্রবান হতে অনুপ্রাণিত করবে। আর এভাবেই তার সঙ্গে গড়ে উঠবে আপনার এক চমৎকার বোঝাপড়ার সম্পর্ক। গল্পের শেষে তার কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত জানতে চান। জিজ্ঞেস করুন, সে কী বুঝল কিংবা গল্পের কোন অংশটি তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এবং কেন? এতে আপনিও তাকে সহজেই বুঝতে পারবেন। প্রযুক্তির আগ্রাসন আর শত কাজের ব্যস্ততায় শিশুর চরিত্র গঠনে বর্তমানে আমরা প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকাই পালন করেছি। কিন্তু যেসব মা-বাবা সচেতনভাবে এ লক্ষ্যে সন্তানদের সময় দিচ্ছেন তারা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান ও সফল। এ উদ্যোগ একদিকে যেমন তাদের সন্তানদের মাঝে সমমর্মিতা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জন্ম দিচ্ছে তেমনি এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুস্থ, সৎ ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক সৃষ্টির মাধ্যমে উপকৃত হবে দেশ ও সমাজ। তথ্যসূত্র : শিশুর উপর বিভিন্ন গবেষণা এবং ইন্টারনেট। এএইচ/

আরাফার দিনেও জুলুমকারী ক্ষমা পাবেন না

একজন মানুষ যতই নেককার হোক, যতই নামাজ-রোজা তাসবীহ-তাহলীল করুক, যদি সে জুলুমকারী হয় তবে তার জন্য শাস্তি অনিবার্য। সে পৃথিবীতে ও পরকালে লাঞ্ছিত হবে। জুলুম বা অত্যাচার জঘন্যতম অপরাধ। জুলুমকারী যত সৎকর্মই করুক না কেন তা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শেষ বিচারের দিনে শাস্তি প্রদান থেকে বাঁচতে পারবে না। যে জুলুম করে সেই জালেম। জালেমের কোনো ধর্ম নেই, তারা মানবতার শত্রু। জালেমের শাস্তি আল্লাহ খুব দ্রুত দিয়ে দেন কেননা মজলুমের অভিশাপ আল্লাহর কাছে সরাসরি পৌঁছে যায়। আর আল্লাহ জালিমকে অভিশাপ দেন। সে লাঞ্ছিত হবে পৃথিবীতে ও পরকালে। আল্লাহর রাসূল (সা.) এ জন্য আমাদের সবাইকে জুলুম তথা আল্লাহর অভিশাপের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, সাবধান, জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ। (সাফওয়ান ইবনে আল মাহদী : বুখারী ১৩৭১) বল প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যের জমি দখল করা, নির্ধারিত কাজের চেয়ে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেয়া, অহেতুক কাউকে শাস্তি দেয়া, অবিচার করা, নিয়োগকৃত শ্রমিককে পর্যাপ্ত খাবার না দেয়া, নির্ধারিত সময়ে মজুরি না দেয়া ইত্যাদির সঙ্গে খারাপ আচরণও জুলুমের মধ্যে পড়ে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) বলেন, জুলুম জালিমের জন্য কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে আসবে। (বুখারী) ১৩৭৫) জুলুম বা নির্যাতন এত মারাত্মক অপরাধ। হজের আরাফার দিনেও আল্লাহ জুলুমকারীকে ক্ষমা করবেন না। আব্বাস বিন মায়দাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) আরাফার দিনে তার উম্মতের ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ উত্তরে বললেন- আমি জুলুমের অপরাধ ব্যতীত অন্যদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি জালেমের কাছ থেকে নির্যাতিতের পক্ষে যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিয়েই ছাড়বো। (তিরমিযি) অত্যাচারী আচার-আচরণে যতই ধার্মিকের মুখোশ পরে থাকুক না কেন আল্লাহর অভিশাপ তার উপর পড়বেই। জালেম যতই পূণ্যের ভাণ্ডার জমা করুক না কেন তার কোন মুক্তি নেই। কেননা আল্লাহ কিয়ামতের দিন মজলুমের পক্ষ নিয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবেন। যার বিরুদ্ধে আল্লাহ স্বয়ং দাঁড়িয়ে যাবেন সে কিভাবে মুক্তি পেতে পারে। এ জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) যিনি মানবতার মুক্তিদূত ও মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শুভাকাঙ্ক্ষী তিনি জুলুম না করতে ও জালেমকে সাহায্য না করতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল (সা.) বলেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে সোপর্দও করবে না। যে কেউ তার ভ্রাতার অভাব পূরণ করবে আল্লাহ তার অভাব পূরণে তৎপর থাকবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের বিপদ দূর করবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহের মধ্যে বড় বিপদ দূর করবেন। যে ব্যক্তি মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণিত : বুখারী ১৩৭২) যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি চায় তার উচিত মানুষকে কষ্ট দেয়া বা জুলুম করা থেকে বিরত থাকার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা। কেননা জুলুমের বদলা মজলুমের কাছ থেকে নেয়া হবে এবং আল্লাহ জুলুমের পাপ নিজে ক্ষমা করবেন না। সামান্যতম জুলুম ও অবিচার পাহাড় পরিমাণ সৎকর্মকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারে। তাই নিজেদের স্বার্থেই আমাদের প্রত্যেককে জুলুমের আগুন থেকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

সদাচরণ নামাজ রোজার মতোই দামি

সদাচরণ এমন এক সৎকর্ম যার মাধ্যমে অতি সহজে পরকালীন সাফল্যের সর্বোচ্চ স্তরে মানুষ পৌঁছে যেতে পারে। যে সদাচারী হতে পেরেছে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম নিয়ামত অর্জন করেছে। সদাচার এমন একটি সৎকর্ম যা পরকালে নেকীর পাল্লায় সবচেয়ে ভারী এবং যা সদাচারীকে অতি সহজে জান্নাতে নিয়ে যায়। সদাচার নবীদের ভূষণ। সব মহাপুরুষরা সদাচারী ছিলেন। আমাদের মহানবী ছিলেন সদাচারের মূর্ত প্রতীক। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: নিশ্চয়ই আপনি সচ্চরিত্রতার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন। (সূরা কালাম ৬৮:৪) যারা রাসূলের (সা.) অনুসারী বলে দাবি করেন তাদের অবশ্যই সদাচারী হতে হবে। যে যত বেশি সদাচারী সে তত বেশি নবীজীর জীবনের অনুসারী। সত্যিকার অর্থে নবীজীর অনুসারী কখনো বদরাগী বা কটুভাষী হতে পারে না। নবীজীর প্রিয়ভাজন হতে হলে, শেষ বিচারের দিনে নবীজীর উম্মতের কাতারে শামিল হতে হলে অবশ্যই সদাচারী হতে হবে। সদাচরণ জান্নাতে যাবার মহাসড়ক। যে কেউ অতিসহজে জান্নাতে যেতে চায় তাকে সদাচারী হতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলে করীম (সা.) বলেন, তোমরা কি জান কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে? এটা হলো আল্লাহর ভয় ও সদাচরণ। আর কোন জিনিস সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তাহলো মুখ ও লজ্জাস্থান। (তিরমিজি) সদাচারের ওজন ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজে মুসলমানরা সদাচারী হবার চর্চা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। যে যত বড় মুসলমান ততো অসদাচারী হবার দিকে ঝুকে যাচ্ছেন। অথচ আল্লাহর রাসূল (সা.) সদাচরণকে নামাজ রোজার মতোই দামি বলেছেন। আয়শা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, একজন বিশ্বাসী শুধুমাত্র তার সদাচরণের মাধ্যমে এমন ব্যক্তির সমান মর্যাদা অর্জন করতে পারে যে রাতভর নামাজ পড়ে ও দিনভর রোজা রাখে। (আবু দাউদ) রাসূল (সা.) এর পক্ষ থেকে সদাচরণের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার পরও সমাজের অধিকাংশ মানুষ নামাজ রোজা পালনের জন্য যতটুকু যত্নশীল তার একশতাংশও আচার আচরণের সংশোধনের জন্য তৎপর নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত সদাচরণকে প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত করা। যাতে আল্লাহ আমাদেরকে সার্বক্ষণিক রোজা পালনকারী ও নামাজ আদায়কারীদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করেন ও জান্নাতে সর্বোচ্চ স্থানের উত্তরাধিকারী করেন। নবী করীম (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে সেই আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় যে সর্বোত্তম উন্নত চরিত্রের অধিকারী, নম্র ব্যবহারকারী, যে মানুষকে ভালবাসে ও মানুষ তাকে ভালবাসে। (হযরত আবু হুরায়রাহ হতে তারগীব ও তারহীবে বর্ণিত) আমাদের মধ্যে অনেকেই কাজেকর্মে রাগান্বিত আচরণ, দুর্বব্যবহার, কাউকে উপহাস, অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকেন। এগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিজের এই আচরণগুলো পরিশুদ্ধ করে হাসিমুখে কথা, সুন্দর বাক্য বিনিময়, মানুষকে ভালবাসা, অন্যের কষ্টকে অনুভব করা ইত্যাদি সদগুণাবলীর অভ্যাস গড়ে তুলুন। সদাচার ধর্ম গোত্র বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রতি হওয়া উচিত। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

মানুষকে বিকৃত নামে ডাকা মারাত্মক অপরাধ

আমরা হাসির ছলে মানুষকে মন্দ নামে বা বিকৃত নামে ডেকে ফেলি। কারো নাম পদবি বা কার্যকলাপ নিয়ে উপহাস না করলে অনেক সময় সামাজিক আড্ডাই জমে উঠে না। কিন্তু যা আমাদের দৃষ্টিতে হাস্যরসিকতা তা আল্লাহর দৃষ্টিতে জুলুম অর্থাৎ মানুষের মান সম্মান ভূলুণ্ঠিত করার মতো মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ মানুষকে মন্দ নামে ডাকা বা উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। এ উপলক্ষে কোরআনে আল্লাহ বলেন : ‘হে ঈমানদারগণ। তোমাদের কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে কেননা সে উপহাসকারীদের অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী যেন অন্য কোন নারীকে উপহাস না করে কেননা তারা উপহাসকারিণীদের অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যকে দোষারোপ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না, ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত অপরাধ। আর যারা এহেন অপরাধ থেকে তওবা না করে তারাই প্রকৃত জালেম। (সূরা হুজরাত ৪৯:১১) তাই প্রতিটি মানুষের উচিত কারো চালচলন বা আচরণ নিয়ে কোন ধরনের বিব্রতকর মন্তব্য না করা। কোন অবস্থাতেই কাউকে গালিগালাজ না করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্ট বলে দিয়েছেন- মুসলমানকে গালিগালাজ দেয়া ফাসেকি এবং মুসলমান মুসলমানের সঙ্গে লড়াই করা কুফরী। (বুখারী ৩৬১১) যখন কোন মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে গালিগালাজ (সহকর্মী বা অধীনস্থ হোক) করে তখন সে মারাত্মক ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত হয় ও ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তাই আমরা যারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হতে চাই না তাদের উচিত ভুলক্রমেও কাউকে গালিগালাজ না করা। আমাদের সমাজে গালিগালাজ এমনভাবে সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে যে, এটাকে কেউ অপরাধ মনে করে না। এমনকি এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে, এক ব্যক্তি আর এক ব্যক্তিকে ফাসেক বা কাফের বলে অভিহিত করে। অন্যকে কাফের বলা মারাত্মক অপরাধ। হযরত আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) বলেন, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ফাসেক বা কাফের বলে অভিহিত করো না। যাকে অভিহিত করা হয়, সে যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে তা অভিহিত কারীর প্রতি ফেরত আসবে। (বুখারী ৩৫১২) কোন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে কাফের বলে গালি দিলে যার ওপর গালি আরোপ করা হলো সে যদি কাফের না হয় তাহলে গালিদানকারীর দিকেই কাফের হবার অভিশাপ ফেরত চলে আসবে। আমরা যেন প্রত্যেকেই মানুষকে গালিগালাজ করা থেকে বিরত থাকি। কেননা গালমন্দ অভিশপ্ত আগুনের মতো যা মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয় ও মানুষকে কাফের হবার পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে যায়। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/    

দান করলে কি পাবেন জেনেনিন

দান যেমন সমৃদ্ধি আনে তেমনি মর্যাদাও বৃদ্ধি করে। নিঃস্বার্থ ও নীরব দানের মাধ্যমে মানুষ তার মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারে তা অন্য কোন পন্থায় সম্ভব হয় না। এর মর্যাদা এতই যে দানকারি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন। দান করার জন্য কাউকে ধনী হবার প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য অনুযায়ী একটি খেজুর দান করলেও আল্লাহ তা বৃদ্ধি করে পাহাড় পরিমাণ করে দিতে পারেন। যে দানে আন্তরিকতা যত বেশি আল্লাহর কাছে তার ওজন তত বেশি। হযরত আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, হাশরের দিন যখন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া অবশিষ্ট থাকবে না তখন আল্লাহতায়ালা যে সাত ধরনের ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি যে গোপনে দান করে। তার দান ডান হাত কি দান করে তা বাম হাত টের পায় না।’ (মুসলিম) দানের মর্যাদা এতো বেশি যে অভাবপ্রস্ত অবস্থায়ও দান বন্ধ রাখা উচিত নয়। আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী করীম (সা.) এর নিকট আগমন করে জিজ্ঞেস করলো হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কোন প্রকার দান সর্বাদিক সওয়াবের। তিনি বললেন, তুমি সুস্থ ও তোমার অর্থের প্রয়োজন থাকা অবস্থায় এবং তুমি অভাবগ্রস্ততার আশঙ্কা করছ ও ধনী হওয়ার আশা পোষণ করছো এমন অবস্থায় যে দান করবে। আর ওই সময় পর্যন্ত বিলম্ব করবে না যখন তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে তার তুমি বলবে, অমুককে অত আর অমুককে এত পরিমাণ দিলাম। বস্তুত তা তো অপরের হয়ে গেছে। (বুখারী) উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে সর্বাবস্থায় মানুষের সহযোগিতায় নিজের হস্তকে প্রসারিত রাখতে হবে তা সচ্ছল অবস্থায় হোক আর অসচ্ছল অবস্থায় হোক। হযরত সালেম (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, শুধুমাত্র দু’জন লোকের ওপর ঈর্ষা করা যায়। একজন হলো যাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের জ্ঞান দিয়েছেন আর সে রাত দিন তা চর্চা করে। অপরজন হলো যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন আর রাতদিন সে মানব কল্যাণে খরচ করে। (বুখারী) দান দুশ্চিন্তা ও সমস্যা থেকে দাতাকে মুক্তি দেয়। তবে এই দান হতে হবে আন্তরিক। দান করে প্রচার করা যাবে না অথবা কাউকে খোটা দেয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে তা চর্চা করে বেড়ায় না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্যই সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার তাদের পালন কর্তার কাছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।’ (সূরা বাকারাহ ২৬২) আল্লাহ নিজেই নিশ্চয়তা দিয়েছেন, শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা নিঃস্বার্থ প্রচারবিমুখ দান সব ভয়-শংকা, দুশ্চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি দান করবেন পৃথিবীর জীবনে ও পরকালে। দানের ফলাফল পুরোপুরি নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। প্রতিটি বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত দান করার আগে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ করে নেয়া। শুধু স্রষ্টার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করা, তা যত সামান্য হোক না কেন। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন : যারা প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য সবর করে, সালাত আদায় করে, আমি যা  দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দিয়ে মন্দ দূর করে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালের শুভ পরিণাম। (সূরা রাদ ২২) দান পরকালের কঠিন সময়ে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করে, ইহকালে প্রাচুর্যময় ও দুশ্চিন্তাহীন মর্যাদাপূর্ণ জীবন উপহার দেয়। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

নিয়ত ও দৃষ্টিভঙ্গি সৎকর্মের ভিত্তি

কোনো কাজ সৎকর্ম কিনা তা নির্ধারিত হয় কর্তার দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়তের উপর। ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকর্মের মর্যাদা শুধু কর্মের ফলাফলের উপর নয় বরং তার পেছনে কর্তার নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। এককথায় নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গি হলো সৎকর্মের অঙ্কুর। যে কোন কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হতে হবে অর্থাৎ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজটি সম্পাদিত হতে হবে। নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গিই সৎকর্মকে প্রচলিত সমাজসেবামূলক কার্যক্রম বা Charity থেকে পৃথক করে দেয়। সাধারণ মানুষ কাজের ধরণ বা ফলাফল দেখে মূল্যায়ন করে আর আল্লাহ কাজের পেছনে সুপ্ত বাসনা, অন্তরের গতিবিধিকে প্রত্যক্ষ করে মূল্যায়ন করেন কেননা তিনি অন্তর্যামী। দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়ত বিশুদ্ধ হলে অর্থাৎ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন কাজ শুরু করার পর যদি কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যায় তাহলেও তা আল্লাহর কাছে সৎকর্ম বলে গৃহীত হবে। হাদীসে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে প্রতিটি কাজ নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। ওমর ইবনে খাত্তাব হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন- যত কাজ আছে সবই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং যার হিজরত দুনিয়া লাভের বা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যে হবে। (বুখারী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পার্থিব বা দুনিয়ার কোন বিনিময় বা প্রতিদান লাভের উদ্দেশ্যে হিজরতের মতো কষ্টদায়ক ইবাদাত করবে সে আল্লাহর কাছে পরকালে কিছুই পাবে না। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই সৎকর্মের কলেবর বৃদ্ধি করার চাইতে দৃষ্টিভঙ্গি পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে সৎকর্মের ভিত্তি মজবুত করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করলে সামান্য সৎকর্মই পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট হবে। রাসূল (সা.) মুয়ায বিন জাবাল (রা.)কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, আপন নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গিকে সবসময় সংমিশ্রণ থেকে পাক (মুক্ত) রেখো; যে আমল কর তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কর তাহলে সামান্য আমলই তোমার পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট হবে। (তারগীব, তারহীব) অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে কাজ কিছুটা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং কিছুটা পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় তার বিনিময়ে আল্লাহ কি দেবেন আর তা কি সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে? কেউ যদি ইহজীবনে সামাজিক স্বীকৃতি, ইলেকশনে জয়লাভ, জাতীয় সম্মান অর্জন করা ও সঙ্গে সঙ্গে পরজীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার উদ্দেশ্যে জনকল্যাণমূলক কাজ করে থাকেন তাহলে তা কি সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে? তার বিনিময় কি আল্লাহ পরকালে দেবেন? আল্লাহ তার রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে এর উত্তর বলে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, একজন লোক আখেরাতে প্রতিদান পাবার উদ্দেশ্যে ও দুনিয়াতে প্রশংসা পাবার উদ্দেশ্যে জিহাদ করতে থাকে সে কি সওয়াব পাবে? রাসূল (সা.) বললেন, সে কিছুই পাবে না। প্রশ্নকর্তা তিনবার প্রশ্ন করলে, রাসূল (সা.) তিনবারই একই উত্তর দেন। অবশেষে রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ কেবলমাত্র সেই আমল কবুল করবেন, যা কেবল তার জন্যই করা হয়ে থাকে এবং তার সন্তুষ্টি ওই আমলের সঞ্চালক হবে। (আবু দাউদ, নাসায়ী) নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে কর্মের বহর যত বেশিই হোক না কেন তা নিস্ফল হয়ে যাবে। আর যদি নিশ্চিত হোন যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তাহলে আদাজল খেয়ে লেগে যান, অফুরন্ত পুরস্কার পাবেন। বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যে কাজই করবেন তাতে প্রাকৃতিক আনুকূল্য পাবেন, অফুরন্ত শক্তি পাবেন, স্বর্গীয় আনন্দ ও প্রশান্তি পাবেন, প্রাচুর্যের সন্ধান পাবেন, স্রষ্টার সান্নিধ্য পাবেন ইহজীবনে ও পরজীবনে। যারা মানুষের কাছ থেকে কোন বিনিময় বা কৃতজ্ঞতা আশা না করে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজ করে তাদের লক্ষ্য্ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতিম, বন্দীকে সাহায্য দান করে তারা বলে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে সাহায্য দান করি; আমরা তোমাদের নিকট থেকে প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না। আমরা আশঙ্কা করি পালনকর্তার নিকট হতে ভীতিপ্রদ ও ভয়ঙ্কর দিনের। পরিণামে আল্লাহ তাদের সে দিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের দেবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। (সূরা দাহর ৭৬: ৮-১১) অর্থাৎ একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রেমে করা প্রতিটি কাজই মানুষকে দিতে পারে চিরস্থায়ী মুক্তি, প্রশান্তি, নিরাপত্তা, উৎফুল্লতা ও আনন্দ। কেননা আল্লাহ কাজ নয়, কাজের পেছনে ক্রিয়াশীল মনকে দেখেন। (প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ) এএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি