ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৮:০৩:০৫, বুধবার

যে ভবনে শুরু হয়েছিলো আওয়ামী লীগের যাত্রা

যে ভবনে শুরু হয়েছিলো আওয়ামী লীগের যাত্রা

রাজধানীর টিকাটুলি এলাকায় কে এম দাস লেনে নান্দনিক স্থাপনা ‘রোজ গার্ডেন প্যালেস’। যেখানে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন একটি রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এ দলের নতুন নাম হয় ‘আওয়ামী লীগ’। প্রথম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক। জানা যায়, ১৯৩১ সালে প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর বাগানবাড়িটি নির্মাণ করেন ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস। পশ্চিমমুখী ওই দোতলা বাড়ির চারপাশ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা দুর্লভ প্রজাতির গোলাপের বাগানে সাজিয়ে তোলেন তিনি। সেই থেকে এর নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন। বেহিসাবি জীবনযাপনের কারণে একপর্যায়ে দেউলিয়া হয়ে যান রোজ গার্ডেনের মালিক হৃষিকেশ দাস। ১৯৩৬ সালে ব্যবসায়ী খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের কাছে এ সম্পত্তি বিক্রি করে দেন তিনি। কাজী আবদুর রশীদ সেখানে গড়ে তোলেন প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি। মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের কাছ থেকে ১৯৬৬ সালে রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ভাই কাজী মোহাম্মদ বশির (হুমায়ুন)। এর সুবাদে ভবনটি হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭০ সালে রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইজারা নেয় বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেড। ১৯৯৩ সালে রোজ গার্ডেনের অধিকার ফিরে পান কাজী আবদুর রশিদের মেজ ছেলে কাজী আবদুর রকীব। ১৯৯৫ সালে কাজী রকিবের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী লায়লা রকীব রোজ গার্ডেনের সম্পত্তির মালিক হন। এর নিচতলায় রয়েছে একটি হলরুম, আটটি কক্ষ ও করিন থিয়ান কলাম। ওপর তলায় আরেকটি হলসহ আরো পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। প্রাসাদের সামনে বাগানে আছে মার্বেলের তৈরি কয়েকটি সুদৃশ্য মূর্তি। এই ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন গত বছর কিনে নেয় বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে সম্পত্তির বর্তমান মালিক ও তার সন্তানদের কাছ থেকে এ সম্পত্তি ক্রয়ের রেজিস্ট্রিকৃত দলিল গ্রহণ করেন। ‘সরকারি ক্রয় আইন’ অনুযায়ী ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিনিময়ে বর্তমান মালিকের কাছ থেকে এ স্থাপনাটি কেনা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটি চেক এবং ঐতিহাসিক ভবনের বিনিময়ে রোজ গার্ডেনের মালিককে নগরীর গুলশানে ২০ কাঠা জমিসহ একটি একতলা ভবন বিক্রির একটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিল হস্তান্তর করেন। ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরান ঢাকার ইতিহাস তুলে ধরতে ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনকে জাদুঘরে পরিণত করা হবে। রোজ গার্ডেনের একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। কেননা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এখান থেকেই যাত্রা শুরু করে। তিনি বলেন, এই দলের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই ঐতিহাসিক ভবনটি যথা যথভাবে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন স্থাপনা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। সরকার এর আগে নগর ভবনে একটি জাদুঘর স্থাপন করেছে। তবে এখন সেই জাদুঘরটি রোজ গার্ডেন ভবনে স্থানান্তর করা হবে। তিনি ভবনটির মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে এটি সংস্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত দলটি গঠনের পর এর কার্যালয় ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকার ৫৬, সিমসন রোডে স্থানান্তর হয়। এর পর ১৯৬৪ সালে ৯১ নবাবপুর রোডে। এরপর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলি। পুরানা পল্টনে কার্যালয়ের স্থান স্থানান্তরিত হয়েছে কয়েকবার। এরপর যায় সার্কিট হাউস রোডে। ১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলে দলটির কার্যালয় হয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে। এনএম/আরকে
ঐতিহাসিক পলাশী দিবস আজ

আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য। পরাজয়ের পর নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যু হলেও উপমহাদেশের মানুষ নবাবকে আজও শ্রদ্ধা জানায়। তার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। নবাবের সেনাবাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে তরুণ সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতাচ্যুত হন। যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিল ভাগীরথী নদীর তীরে আম্রকাননে। মীরজাফর ও ঘসেটি বেগমের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত হন। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্মসূচি নিয়েছে। আরকে//

যোগ ব্যায়ামের আধুনিক সংস্করণ কোয়ান্টাম ইয়োগা

কোয়ান্টাম ইয়োগা যোগ ব্যায়ামের সহজ ও আধুনিক সংস্করণ। এতে পরিশ্রম কম এবং উপকার বেশি। ফলাফল বহুমুখী বিধায় কোয়ান্টাম ইয়োগাকে বলা হয় বুদ্ধিমানদের যোগ ব্যায়াম।পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ যে চর্চা শুরু করেছিল আধ্যাত্মিক সাধনার নিমিত্তে, আজ বিংশ শতাব্দীতে এসে যোগ ব্যায়াম পরিণত হয়েছে আধুনিক মানুষের দেহ-মন সুস্থ রাখার আন্দোলনে। আর এ ব্যায়ামেরই সেরা ব্যায়াম হচ্ছে কোয়ান্টাম ইয়োগা। যোগ ফাউন্ডেশনের সিকি শতাব্দীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আলোকে এই ব্যায়ামকে করা হয়েছে আধুনিকায়ন। বিভিন্ন আসনে দম নেওয়া ও দম ছাড়া চর্চা করতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে চর্চাকারীরা যে বিভ্রান্তি বা জটিলতার সম্মুখীন হতেন কোয়ান্টাম ইয়োগাতে তা নেই। অথচ একই উপকার পাওয়া যাচ্ছে চমৎকারভাবে। আর এ আসনের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে সুস্থতার মনছবি। ফলে কোয়ান্টাম ইয়োগা হয়ে উঠেছে যোগের সবচেয়ে সহজ ও ফলপ্রসূ একটি প্রক্রিয়া। সাধারণ ব্যায়াম ও পাশ্চাত্যের ব্যায়াম শুধু পেশীশক্তি বাড়ায়। কোয়ান্টাম ইয়োগা পেশীশক্তিকে সংহত করার পাশাপাশি হরমোন প্রবাহকে সুষম, নিরাময় শক্তিকে বেগবান, মনকে তরতাজা আর শরীরকে মনোদৈহিক রোগমুক্ত করে। এবার দেখে নিন যোগের এই আধুনিক প্রক্রিয়ার উপকারসমূহ : ১. দম নেওয়া ও ছাড়ার ঝামেলামুক্তি : প্রচলিত যোগ ব্যায়ামে বিভিন্ন আসন করার সময় দম নেওয়া ও ছাড়ার বিশেষ বিশেষ নিয়ম রয়েছে-যা যথাযথভাবে অনুসরণ করে আয়ত্ত করার জন্যে একজন দক্ষ প্রশিক্ষকের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু কোয়ান্টাম ইয়োগা এই বিশেষ পদ্ধতিতে দম নেওয়া ও ছাড়ার ঝামেলামুক্ত। আসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দম স্বাভাবিক রাখতে হয়। ফলে এর চর্চা খুব সহজ। কোনো প্রশিক্ষক ছাড়া অনুশীলন করতেও কোনো অসুবিধে নেই। ২. স্নায়ু, পেশী ও গ্ল্যান্ডের ব্যায়াম : কোয়ান্টাম ইয়োগায় শুধুমাত্র বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নয়, বরং স্নায়ু, পেশি ও বিভিন্ন গ্ল্যান্ডের ব্যায়াম হয়। এটি সব ধরনের গ্লান্ডের হরমোন প্রবাহ স্বাভাবিক রাখে, ফলে শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রাণবন্ততা দুটোই অর্জিত হয় সমান তালে। ৩. অক্লান্ত দেহমন : কোয়ান্টাম ইয়োগা এন্ডোক্রাইন, ডাইজেস্টিভ ও নার্ভাস সিস্টেমসহ পুরো দেহে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করে। ফলে প্রাণবন্ততা থাকে তুঙ্গে। টানা  ১৮ ঘণ্টা বিরতিহীন কাজ করেও দেহ ক্লান্ত ও অবসন্ন হয় না। ৪. স্মৃতি ও মেধাশক্তি বৃদ্ধি : কোয়ান্টাম ইয়োগার নির্দিষ্ট কিছু আসনে মস্তিষ্কে প্রচুর পরিমাণে রক্ত সঞ্চালন হয়। এটি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও মেধার স্ফুরণে সহায়ক। ৫. আকর্ষণীয় ফিগার : নির্দিষ্ট অঙ্গের নির্দিষ্ট আসন চর্চায় ফিগার হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। ৬. লাবণ্যময় ত্বক : প্রাণায়াম চর্চায় লাভ হয় লাবণ্যময় ত্বক। (তথ্যসূত্র : কোয়ান্টাম মেথড) এএইচ/কেআই

আজ বিশ্ব সংগীত দিবস

বিশ্ব সংগীত দিবস আজ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০৮টি দেশে এ দিবসটি পালিত হবে। সংগীত দিবসের উদ্ভব হয় ফ্রান্সে। ১৯৮২ সালে ফ্রান্সে ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ বা ‘মেক মিউজিক ডে’ নামে একটি দিনের উদ্যাপন শুরু করা হয়। ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং ১৯৮১ সালে ভাবতে শুরু করেন বিষয়টি নিয়ে। ১৯৭৬ সালে ফ্রান্সে মার্কিন সংগীতশিল্পী জোয়েল কোহেন ‘সামার সোলস্টাইস’ বা গ্রীষ্মকে উদ্যাপন করতে রাতভর গান করার প্রস্তাব তোলেন। ২১ জুনের সংগীত দিবস সেই থেকে শুরু। বাংলাদেশেও এ দিবসটিকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পী ও সংগীত সংশ্লিষ্টরা এ দিবসটি আজ পালন করবে নানা আয়োজনে। সংগীতের সর্বজনীন রূপকে আন্তর্জাতিকভাবে বরণ করতেই ২১শে জুন পালন করা হয় বিশ্ব সংগীত দিবস। এমএইচ/    

যোগ ব্যায়াম কেন করব?

  আজ ২১ জুন, বিশ্ব যোগ দিবস। ২০১৪ সাল থে‌কে এই দিবস‌টি জা‌তিসংঘ স্বীকৃতি দেয়। ভারতীয় দূতাবা‌সের সহ‌যো‌গিতায় রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দে‌শের ৮টি শহ‌রে এই দিন‌টি উৎস‌বের সা‌থে পালিত হচ্ছে। ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টে‌ডিয়া‌মে ক‌য়েকহাজার মানু‌ষের উপ‌স্থি‌তি‌তে যোগব্যয়াম প‌রিচালনা করেন কলকতার এক‌টি যোগব্যয়াম স্কু‌লের প্র‌শিক্ষক। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম একটি শাস্ত্রীয় কৌশল-যা পাঁচ হাজার বছরেরও পুরনো। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুনি ঋষিরা তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এবং দীর্ঘজীবনের জন্য বিভিন্ন কলাকৌশল আবিষ্কার বা আয়ত্ত করেন। প্রায় ৪০০ বছর আগে সর্বপ্রথম ঋষি পতঞ্জলি কিছু আসনের কথা বলেন এবং এগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে ধীরে ধীরে এই কলাকৌশল ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সর্বত্র। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর দিকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় ‘পতঞ্জলিআসনা’ নামে গ্রন্থটি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আরো অনেকেই যোগব্যায়াম এর ওপর বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেন। যোগ আসলে কী? কী এর রহস্য? এর উৎস কোথায়?  ‘ইয়োগা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘যুবক’ বা ‘যৌবন’। এটি মূলত সংস্কৃত শব্দ। বাংলায় ‘যোগ’। যার অর্থ গ্রন্থিভূক্ত করা বা সমন্বয় সাধন করা। কীসের সমন্বয় সাধন? অর্থাৎ মানুষের দেহ ও মনের যৌবন ধরে রাখার কৌশল। এটা নিয়ে অনেকে অনেক রকম মতামত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলেছেন আত্মা বা মন ও শরীরকে একত্র করার কৌশলকে ইয়োগা বা যোগ বলে। হটযোগ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী দেহযন্ত্রগুলোর কর্মক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করে স্নায়ুতন্ত্রের পূর্ণ পরিচর্যার মাধ্যমে মনোদৈহিক সম্পর্কসূত্রগুলোকে প্রকৃতিগতভাবেই একাত্ম করা। এর মৌলিক ধারণা হচ্ছে ‘শরীরমাদ্যং খলু ধর্ম সাধনম্। ‘হঠযোগ’ হঠাৎ কোন আবিষ্কার নয়। প্রাচীন মুনি ঋষিরা যোগীশ্বর মহাদেবকে হঠযোগের ৮৪০০০ আসনের প্রকাশক বলে স্বীকার করে নিয়ে তাঁর ধ্যানে এই দুঃসাধ্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করতেন। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম শুধু রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণই করে না; রোগ নিরাময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারত উপমহাদেশে এর উদ্ভাবন হলেও আজ সারা বিশ্বে ইয়োগা চর্চা বিকাশ ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে দুই কোটি মানুষ ইয়োগা চর্চা করছেন। ইতিবাচক চিন্তা, প্রাণায়াম, নিউরোবিক জিম, মেডিটেশনের সমন্বয়ে ইয়োগার পরিপূর্ণ প্রয়োগ মানুষকে তার ভেতরের সুপ্ত অসীম শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। জাতিসংঘ ২১ জুনকে আন্তর্জাতিক ইয়োগা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ১৯০টি দেশের ২৬০টিরও বেশি শহরে তা পালিত হচ্ছে। যোগব্যায়ামকে জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে পারলে দেহ-মনের সুস্থতা ও শান্তি নিশ্চিত হবে। ওজন কমানো, শক্তিশালী নমনীয় শরীর, উজ্জ্বল ত্বক, শান্ত মন, ভালো স্বাস্থ্য ইত্যাদি যা কিছু আমরা পেতে চাই সব কিছুর চাবি আছে যোগাসনে। এতে অনেক রকম শারীরিক সমস্যা যথা- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, করোনারি আর্টারি ব্লকের ইত্যাদি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে সুস্থ জীবন কাটানো সম্ভব। যোগ হল এক জীবনদর্শন, যোগ হল আত্মানুশাসন, যোগ হল এক জীবন পদ্ধতি। যোগ শুধু বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিই নয়, বরং যোগের প্রয়োগ ব্যাধিকে নির্মূল করে। এটি এক বিধাতা প্রদত্ত শুধু শরীরেরই নয়, পুরো মানসিক রোগেরও চিকিৎসা শাস্ত্র। যোগ অ্যালোপ্যাথির মতো কোনো লাক্ষণিক চিকিৎসা নয়, বরং রোগের মূল কারণকে নির্মূল করে আমাদের ভেতর থেকে সুস্থ করে তোলার এক উপায়। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম সাধারণত তিনটি প্রধান কাঠামোর ওপর নির্মিত হয়। যেমন ব্যায়াম, শ্বাস এবং ধ্যান। ব্যায়াম ও বিভিন্ন আসনের মাধ্যমে শরীরকে নিজের আয়ত্তে আনার কৌশল জানা যায় এবং বিভিন্ন রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়। এছাড়া যোগব্যায়াম স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য এবং শিথিলকরণ একটি পথ। যোগাভ্যাস একটি নিয়মিত অভ্যাস। দু’দিন করে ছেড়ে দিলে হবে না, নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমেই এর সুফল পাওয়া সম্ভব। নিজে নিজে অভ্যাস না করে একজন ট্রেনারের অধীনে এগুলো অভ্যাস করা ভালো। এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগব্যায়াম চর্চা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। প্রয়োজন বুঝে ট্রেইনার নির্দেশ দিয়ে থাকেন ঠিক কোন ধরনের আসনগুলো করা উচিত। এর পাশাপাশি নানারকম রোগ যোগাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, অ্যাজমা, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাইগ্রেন, দুশ্চিন্তা এবং অবসাদ ইত্যাদি। বিশেষ কয়েকটি যোগাসন (প্রাণায়াম, মেডিটেশন, রিউরোবিক জিম ও আকুপ্রেসার) নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে এ ধরনের রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেতে পারে এবং অনেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কলস্টেরল ও অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। প্রতিদিন আমাদের নানা ধরনের কাজের চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে ইয়োগা বা যোগব্যায়াম সেসব চাপ কমাতে সাহায্য করে। সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে, স্থিরচিত্তে বসে, শরীর ও মনের যত্ন নিতে শেখায় যোগব্যায়াম। মনের ভারসাম্য বজায় রাখতে যোগব্যায়ামের বিকল্প নেই। যোগব্যায়াম স্নায়ু শান্ত রাখতে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ দূর করে। বেহিসাবিভাবে খেলে শরীরের ক্ষতি হয়। এমন খাদ্যাভ্যাস পরিহারে প্রয়োজন নিজের মনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। যোগব্যায়াম মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে সাহায্য করে। যারা নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন, তারা মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন সহজেই। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যোগব্যায়াম। রাগ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত আবেগ কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করার মতো অভ্যাস গড়ে ওঠে যোগব্যায়ামের মাধ্যমে। হতাশা কাটানোর জন্য যোগব্যায়াম বেশ উপকারী। যোগব্যায়াম মাদকাসক্তি নিরাময়ে কার্যকর। অন্যান্য ব্যায়ামের সাথে যোগ-ব্যায়ামের পার্থক্য কোথায়? এ বিষয়ে বলা যায়, ব্যায়ামের উদ্দেশ্য যদি হয় দেহে অসাধারণ পুষ্টি ও অমিত শক্তিধারণ, তবে তা ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম দ্বারা সম্ভব নয়। আর যদি হয় ব্যায়ামের উদ্দেশ্য শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখা, দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা এবং জ্বরা-বার্ধক্যকে দূরে রাখা, তাহলে এ ক্ষেত্রে ইয়োগার জুড়ি নেই। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলতে যদি দেহের স্বাভাবিক গঠন, পুষ্টি ও শক্তিলাভ বোঝায়, এটা যোগ-ব্যায়াম দ্বারাই সম্ভব। এই সুস্থতার চাইতে স্ফীত পেশী ও অমিত শক্তিলাভ কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? দেহে শুধু মাংসপেশী অস্বাভাবিক স্ফীত হলে বা অসাধারণ শক্তি থাকলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না বা তার অধিকারীকে সুস্থদেহী বলা যায় না। হতে পারেন এরা মাসলম্যান, কিন্তু এদের দেহে প্রায়ই অকালে জ্বরা-বার্ধক্য দেখা দেয় বা মৃত্যু হাতছানি দেয়। এর কারণ আর কিছুই না। দীর্ঘকাল যন্ত্র নিয়ে বা অতিরিক্ত শ্রমসাধ্য ব্যায়াম করলে শরীরের অত্যধিক শক্তি ক্ষয় হয়, দেহে অত্যধিক পৈশিক ক্রিয়া হয়। দেহে যতো বেশি পৈশিক ক্রিয়া হয়, শরীরে ততো বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। আর দেহে যতো বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ততো বেশি বৃদ্ধি পায়। কারণ হৃদযন্ত্র এই বিষাক্ত গ্যাস দেহ থেকে বের করে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। শারীর বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী দেহে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ আমাদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে অতিরিক্ত শ্রমসাধ্য কাজে বা দৌড়ানোর সময় আমাদের হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, জোরে বা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বইতে থাকে। কেন এমন হয়? অত্যধিক পৈশিক ক্রিয়ার কারণে দেহে প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। আর ঐ গ্যাস দেহ থেকে বের করে দিতে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস তার ক্ষমতা অনুযায়ী সচেষ্ট হয়ে উঠে। ঠিক একইভাবে শ্রমসাধ্য ব্যায়ামেও হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু দিনের পর দিন যদি হৃদযন্ত্রকে এইভাবে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, তবে তার কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সেও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শ্রমসাধ্য ব্যায়ামে দেহের পেশীর পুষ্টি ও ওজন বাড়তে থাকায় দুর্বল হৃদযন্ত্র বিশাল দেহ চালানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং একদিন বিকল হয়ে পড়ে। মূলত ওই ব্যায়ামগুলো কেবল পেশীবৃদ্ধির দিকেই নজর দেয় বলে যোগ-ব্যায়াম ছাড়া অন্য কোন ব্যায়ামে দেহের সর্বাঙ্গীন ব্যায়াম হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়োগার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের স্নায়ুতন্ত্র  ও দেহযন্ত্রগুলোর স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা ঠিক রাখা। স্নায়ুতন্ত্র দেহযন্ত্রকে পরিচালিত করে দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে খবরাখবর মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডে পৌঁছে দেয়, আবার সেখান থেকে আদেশ-নির্দেশ বহন করে দেহের প্রয়োজনীয় অঙ্গকে চালিত করে। তাই দেহের কোন অংশের স্নায়ু যদি বিকল হয়ে যায়, দেহের সেই অংশটি অসাড় হয়ে পড়ে। আজ পর্যন্ত অন্য এমন কোন ব্যায়াম আবিষ্কৃত হয়নি যার দ্বারা এই অত্যাবশ্যক স্নায়ুতন্ত্রের ব্যায়াম হয়। কুস্তি বা উগ্র যন্ত্র-ব্যায়ামে এই স্নায়ুজাল অনেক সময় বিকল হয়ে যায়, মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা এই সকল ব্যায়ামে আসলে দেহের শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশের ব্যায়াম হয়। জীবদেহের সকল যন্ত্রই তন্তুময়। এই তন্তু কোষ দ্বারা গঠিত। কোষের গঠন, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য দরকার হয় নিয়মিত প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ এবং নালীহীন গ্রন্থিসমূহের প্রয়োজনমতো রস-নিঃসরণ। অন্যদিকে চাই দেহের বিষাক্ত ও অসার পদার্থের অপসারণ। কোষের গঠন, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য দরকার প্রোটিন, শর্করা ইত্যাদি নানাজাতীয় খাদ্য ও অক্সিজেন। এই অক্সিজেন আমরা প্রায় সবটুকুই পাই প্রশ্বাসের মাধ্যমে। সুতরাং দেহের পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র যদি সবল ও সক্রিয় না থাকে, তাহলে দেহের কোষ, তন্তু বা পেশী কিছুই সুস্থ থাকতে পারে না। শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাক যন্ত্রগুলো দেহের দেহগহ্বরে অবস্থিত। দেহগহ্বর দু’ভাগে বিভক্ত। বক্ষ-গহ্বর ও উদর গহ্বর। হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস থাকে বক্ষ-গহ্বরে। এবং পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, অগ্ন্যাশয় প্রভৃতি পরিপাক-যন্ত্রগুলো উদর গহ্বরে অবস্থিত। এই দুই গহ্বরের মাঝে ডায়াফ্রাম নামে একটি বিশেষ ধরনের শক্ত পেশীর পর্দা আছে। ফুসফুসের নিজের কোন কাজ করার ক্ষমতা নেই। ডায়াফ্রাম-এর পেশী, বক্ষ-প্রাচীর ও পেটের দেয়ালের পেশীর সাহায্যে তাকে কাজ করতে হয়। শ্বাস নেয়ার সময় ডায়াফ্রাম উদর গহ্বরে নেমে যায় এবং চাপ দেয়। ফলে উদরস্থ যন্ত্রগুলি একটু নিচের দিকে চলে যায় এবং তলপেট উঁচু হয়ে উঠে। আবার পেট ও তলপেটের পেশী সংকুচিত হলে এবং ডায়াফ্রামের পেশী প্রসারিত হলে শ্বাস বেরিয়ে যায়। পরিপাক-যন্ত্রগুলি যথাস্থানে ফিরে আসে। এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে পরিপাক-যন্ত্রগুলোও উঠানামা করে। ফলে স্বতঃক্রিয়ভাবে মৃদু মর্দন হয় বা ব্যায়াম হয়। পরিপাক ক্রিয়া সক্রিয় রাখতে হলে পেট ও তলপেটের পেশীগুলোর সঙ্কোচন ও প্রসারণ ক্ষমতা বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। হজমশক্তিহীন ব্যক্তিদের তলপেটের পেশী শক্ত ও দুর্বল হয়ে যায়। ভুজঙ্গাসন, উষ্ট্রাসন, ধনুরাসন, অর্ধ-চন্দ্রাসন প্রভৃতি আসনগুলো তলপেটের সম্মুখস্থ পেশীগুলো প্রসারিত ও পিঠের পেশীগুলো যেমন সংকুচিত করে, তেমনি পদ-হস্তাসন, যোগমুদ্রা, পশ্চিমোত্থানাসন, জানুশিরাসন, হলাসন প্রভৃতি আসনগুলো পেটের পেশীগুলো সংকুচিত ও পিঠের পেশীগুলো প্রসারিত করে। অর্ধ্বমৎস্যেন্দ্রাসন দ্বারা পেট ও পিঠের দু’পাশের পেশীর উত্তম ব্যায়াম হয়। শলভাসনের দ্বারা ডায়াফ্রাম-এর খুব ভালো ব্যায়াম হয়। আবার উড্ডীয়মান ও নোলি দ্বারা তলপেটের পেশীর আরো ভালো ব্যায়াম হয়। এবং প্রাণায়াম-এর মতো হৃদযন্ত্রের জন্য উপযুক্ত আর দ্বিতীয় ব্যায়াম নেই। রক্ত সংবহনতন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের দেহের সর্বত্র রক্ত চলাচল করে এবং রক্ত থেকে দেহকোষগুলো প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে। এই রক্ত-সংবহনতন্ত্রের প্রধান যন্ত্র হচ্ছে হৃৎপিণ্ড। তাছাড়া ধমনী শিরা , জ্বালকশ্রেণী  এবং লসিকানালী এই তন্ত্রের অন্তর্গত। হৃৎপিণ্ড এক বিশেষ ধরনের পেশী দ্বারা নির্মিত। দেহে রক্ত চলাচল এই হৃৎপিণ্ডের পেশীর সম্প্রসারণ ও সঙ্কোচন ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। হলাসন, সর্বাঙ্গাসন, শলভাসন প্রভৃতি আসন দ্বারা হৃৎপিণ্ডের খুব ভালো ব্যায়াম হয়। সমস্ত দেহে রক্ত আনা-নেয়া করতে ধমনী ও শিরার মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। ধমনীর যেমন দেহের উপরাংশে রক্ত পাঠাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, তেমনি দেহের নিম্নাংশ থেকে রক্ত টেনে আনতে শিরার অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। আর এই মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয় হৃৎপিণ্ডকে। সর্বাঙ্গাসন, শীর্ষাসন প্রভৃতি আসনকালে হৃৎপিণ্ড কিছুক্ষণের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম থেকে বিশ্রাম পায়। এই সব আসনে দেহের উধ্বাংশে প্রচুর রক্ত সঞ্চালিত হয়। অক্সিজেন দেহকোষের পুষ্টির অন্যতম উপাদান। অত্যাবশ্যক এই অক্সিজেনের প্রায় সবটাই আমরা শ্বসন প্রক্রিয়ায় বায়ু থেকে ফুসফুসের মাধ্যমে পাওয়া যায়। সুতরাং ফুসফুসের পেশী ও বায়ুকোষের কর্মক্ষমতা কমে গেলে দেহে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে, দেহে দেহকোষ গঠন ও পুষ্টিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, শরীরও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রতি ৩ মিনিটে একবার করে ২৪ ঘণ্টায় ৪৮০ বার দেহের সমস্ত রক্ত ফুসফুসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বা চালিত হয়। দেহের এমন একটি অত্যাবশ্যক যন্ত্রের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য শলভাসন, উষ্ট্রাসন, ধনুরাসন প্রভৃতি আসন ও প্রাণায়াম ছাড়া আর কোন ব্যায়াম আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। দেহযন্ত্রগুলোর স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য দেহে বিপাক ক্রিয়ার  মাধ্যমে উৎপন্ন বিষাক্ত গ্যাস ও অসার পদার্থ দেহ থেকে বের করে দেয়া অবশ্যই দরকার, এটা আগেই বলা হয়েছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ইউরিয়া, ইউরিক প্রভৃতি অ্যাসিড এবং মল-মূত্র প্রভৃতি অসার পদার্থ দেহে জমে থাকলে প্রথমে দেহে নানাপ্রকার ব্যাধির সৃষ্টি করে, পরে দেহের সব যন্ত্র বিকল করে দেয়। শেষ পরিণাম হয়তো অকালমৃত্যু। দেহযন্ত্র কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃশ্বাসের সাহায্যে, কফ-পিত্তাদি মলের সঙ্গে অথবা মুখ দিয়ে, আর ইউরিক ও ইউরিয়া প্রভৃতি অ্যাসিড মুত্রের সঙ্গে দেহ থেকে বের করে দেয়। আর লবণজাতীয় বিষাক্ত পদার্থগুলো ঘর্মগ্রন্থির সাহায্যে ত্বকের মাধ্যমে ঘামের আকারে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। সুতরাং, এই সব নিঃসারক যন্ত্রগুলো সুস্থ ও সক্রিয় থাকলে দেহে উৎপন্ন এই সব বিষাক্ত ও অসার পদার্থ সহজেই দেহ থেকে বের হয়ে যেতে পারে। শ্বাস-যন্ত্রের কথা আগেই বলা আছে, দেহের বৃক্কদ্বয়, মূত্রাশয়, মলনালী প্রভৃতি সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে নোলি, উড্ডীয়মান ইত্যাদি যোগ-ব্যায়াম অতুলনীয়। অন্য কোন ব্যায়ামে শরীরের এই সকল যন্ত্রের সঠিক ব্যায়াম হয় না। মানব দেহের গ্রন্থিগুলো প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। নালীযুক্ত ও নালীহীন। লালাগ্রন্থি, ঘর্মগ্রন্থী, অশ্র“গ্রাবী প্রভৃতি গ্রন্থিগুলো নালীযুক্ত গ্রন্থি। লালাগ্রন্থি থেকে রস নিঃসৃত হয়ে খাদ্যের সঙ্গে মিশে খাদ্য পাকস্থলীতে পৌঁছুতে ও হজম হতে সাহায্য করে। ঘর্মগ্রন্থির সাহায্যে দেহ থেকে ঘাম বের হয়, আর অশ্রুগ্রাবী-গ্রন্থির জন্য চোখ দিয়ে জল পড়ে। থাইরয়েড, প্যারা-থাইরয়েড, পিটিউটারি, পিনিয়্যাল, অ্যাড্রিনাল প্রভৃতি গ্রন্থিগুলো নালীহীন গ্রন্থি। এই সব গ্রন্থি থেকে যে রস নিঃসৃত হয়, তাকে হরমোন বলে। হরমোন রক্তের সঙ্গে সরাসরি মিশে যায় এবং দেহের সকল ইন্দ্রিয় ও যন্ত্রের গঠন, পুষ্টি ও সক্রিয়তায় সাহায্য করে। একমাত্র যোগ-ব্যায়াম ছাড়া আজ পর্যন্ত এমন কোন ব্যায়াম আবিষ্কৃত হয়নি, যার দ্বারা গ্রন্থি সুস্থ ও সক্রিয় রাখা যায়। ওষুধ খেলেই রোগ নিরাময় হয় না, সঙ্গে কিছু নিয়ম-নিষেধও মানতে হয়। তেমনি শুধু যোগ-ব্যায়াম অভ্যাস করলেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় না, কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয় বৈ কি। নিয়মিত যোগ-ব্যায়াম অভ্যাসে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকে, এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু সাথে চাই পরিমিত ও যতদূর সম্ভব নিয়মিত আহার, বিশ্রাম, সংযম, নিয়মানুবর্তিতা, আত্মবিশ্বাস, অটুট মনোবল ও একাগ্রতা। লেখক ও সাংবাদিক

বাবা দিবস আমার জন্য দারুণ এক অপরাধবোধের দিন

বাবা হিসেবে আমি গেল প্রায় পাঁচ বছরে দুই একটা সাবজেক্ট বাদে সবগুলায় ফেইল মারসি! নিজের ত্যাড়ামির জন্য জন্মের পরপরই পোলারে ফেলায় দিসিলাম কঠিন অর্থসংকটে, বেচারাকে দেড় বছর বয়সে একবার রোযাও রাখতে হইসিলো! তখন আমি দেশের এক নম্বর চ্যানেল (ততকালীন) ছেড়ে দিয়ে বিপ্লব করিতেছিলাম। দেশের প্রথম খেলাধুলা বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল (sportstimes24) গড়ায় ব্যস্ত ছিলাম, উফ কি চেতনা! একটা সাইকেলের আবদার মিটাইতে পাক্কা আট মাস তাকে ভুজুং ভাজং দিয়ে কাটাইসি! ২২৪ টাকা পকেটে আর মাথায় একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে অসুস্থ পোলারে নিয়া হাসপাতালে হাজির হইসি! এমন আরো অনেক কেলেঙ্কারির ঘটনা আছে! তাই বাবা দিবস আমার জন্য দারুণ এক অপরাধবোধের দিন। কিছু স্বান্তনাও অবশ্য আছে। এই সংগ্রামের মধ্যেও আমি আমার ছেলেকে প্রথম যেই শব্দটা শিখেয়েছি তা হলোঃ `না`। যারা আমার ছেলেকে চেনেন তারা জানেন ও বোল্ডলি না বলতে জানে। না কইতে হেডাম লাগে! যেইটা আমার নাই! অহন একটু আক্টু হইতাসে! এখন চেষ্টা চলছে ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে ঊঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে শেখানো। আশিভাগ পেরেছি, বাকিটাও হয়ে যাবে। আরেকটা প্রচ্ছন্ন আস্কারা আছে, সেটা আমি করেই ছাড়বো, ঋদ্ধের মাথায় গেঁথে দিব `অলওয়েজ লিসেন টু ইউর হার্ট`। সবকিছু গুল্লি মেরে শুধু হৃদয়েরটা শুনো, দেখবা তুমিই সেরা, তোমার সবকিছুই সেরা! এইটা আমার মা আমাকে ঢুকায় দিয়ে, গ্যাছে সো আমিও দিয়াম! আমি তো পারলাম না, হয়ত পারবোও না আদর্শ বাবা হইতে দোয়া কইরেন আমার বাবাটার জন্য, সে যেনো পারে। আরকে//

বাবার সবটুকু-ই তো সন্তানের

বাবা ঠিক মা নয়। একটু দূরের। বাইরে বাইরেই বেশি থাকেন। কঠিন চেহারা। শক্ত চোয়াল। অত সহজে হাসেন না। বাবার সঙ্গে কথা বলতে হয় মেপে। ভুলচুক হলেই বকা খাওয়ার ভয়। চারপাশে দেয়াল তুলে রাখা এই বাবাকে কোনো না কোনো সময় ঠিক চিনে ফেলে সন্তান। বাইরে তিনি যত কঠিন, ভেতরে ততটাই কোমল। তাই বাবাকে স্মরণ করতে কোন নিদির্ষ্ট দিবসের প্রয়োজন হয় না। তবুও প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। যাদের বাবা আছে তারা এই দিনটিকে স্বরণীয় করে রাখতে নানা আয়োজন করে থাকেন। আর যাদের বাবা নেই তারা অনেকেই তাদের বাবাকে নিয়ে নানান ধরনের স্বরণীয় ঘটনা লিখে থাকেন। তেমনিভাবে বাবা সঙ্গে কাটানো স্মৃতিচারণ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো: আকিদুল ইসলাম। বাবার কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধরে হাঁটা শেখার কথা ঠিক মনে নেই। তাঁর হাতে হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। পঞ্চম শ্রেণীতেই বাড়ির বাইরে হোস্টেলে থাকার ফলে সেই শাসনটাও ঠিক পাইনি। স্বাধীনচেতা মনোভাবে বেড়ে ওঠা মনটাও খুব করে ঐ গুলোর অভাববোধের তাড়না দিতো। “মা” ময় ছিলো পুরোটা। আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই আমার ছাত্র আক্ষেপ আর ভালোবাসার অভাববোধের অনুযোগে বলে উঠলো-“স্যার, বাবার সাথে অনেক দিন দেখা হয় না। ঘুমানোর পরে আসে আবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই বের হয়ে যায়”। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি মায়ার জলে চোখ ছলছল করছে। কিছু বললেই কেঁদে ফেলবে। ভাবলাম তাই করি,কেঁদে সে হাল্কা হোক। কিন্তু সাথে সাথে পরিবেশটা হাল্কা করে ফেললাম তার প্রিয় ক্রিকেটের গল্প করে। কয়েকশ ক্রিকেটারের নাম লেখা তার প্রিয় ডায়রিটা দেখতে চাইলাম। তাতে সে হয়তো ঠিক হলো....!!! কিন্তু আমার ঐ স্বাধীনচেতা মনটা আবার অনুযোগ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো। মনে পড়লো বাবার হাতের উপর হাত রেখে লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করেছি। তাঁর কষ্টের সময় একফোঁটা ঘামকে বাঁচিয়েছি। জমিতে ধানের চারা লাগানোর সময় তাঁর সকালের খাবার নিজ মাথায় করে নিয়ে গেছি। তাঁর অনেকটুকু কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছি। যার বাবার সবটুকু-ই তো সন্তানের জন্য। বাবা ! ও বাবা! আজ খুব করে মনে পড়ছে তোমার ঘামের লবণাক্ত স্বাদটা। যখন তুমি আমাকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে দীর্ঘপথ সাইকেল চালাতে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে পিছনে বসাতে না। তখনকার তোমার কষ্টের নিশ্বাসটা আমার কানে বাজে বাবা। আমি তোমার মুখের দিকে তাকালেই তোমার ঘামের ফোঁটা আমার কাপালে পড়তো। বেয়ে পড়া সেই এ ফোঁটা লবণাক্ত ঘামের স্বাদ আমার সারা জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান বাবা। আমার মনও তাই আক্ষেপ আর ভালোবাসার অভাববোধের অনুযোগে বলে উঠলো,,অনেক দিন তোমার সাথে দেখা হয় না বাবা।     টিআর/

বাবা হতে না পারা মিজানুরের গল্প

বাবা এক অম্লান অভিভাবকত্ব ও পরম যত্নের আশ্রয়ের নাম। বাবা ডাকেই যত অধিকার, ভালোবাসা ও ভরসা নিহিত থাকে। পৃথিবীর সব পুরুষই চান এক সময় বাবার এই অবস্থানে নিজেকে দেখতে, বাবা ডাকটি শুনতে। পৃথিবীর সকল কিছুর বিনিময়ে যেন তারা সন্তানের মুখে এ ডাকটি শুনতে পান। বাবা দিবস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন সনি ইলেকট্রনিক্স এ কর্মরত মিঞা মিজানুর রহমান কাজল। তিনি বাবা না হওয়ার যাতনা নিজের ফেসবুক প্রফাইলে তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের প্রফাইলে তার স্ট্যাটাসটি একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো- ‘এই বিবাহিত জীবনে পরিচিত ও অপরিচিতজন থেকে একটি কথা বহুবার শুনতে হয়েছে- ভাই, ছেলে-মেয়ে কতজন? এ কথা সে কথার বুঝ দিয়ে হয়ত সাময়িক সময় পার করতে চেষ্টা করেছি কিন্তু এত বছরেও সেই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা কিংবা বুঝার বাকী থাকে না অনেকেরই। তারপরেও প্রতিমুহূর্তে এই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে আজও পথ চলছি। তাই জীবনের একটি দুঃখজনক ঘটনা শেয়ারের মাধ্যমে আমি আজ তা প্রথমবারের মত আমার টাইমলাইনে প্রকাশ করছি। যা আমি গত ২০১৬ সালে Justice for Women নামক একটি গ্রুপে লিখেছিলাম এবং লেখাটি ভাইরাল হয়েছিল। হয়ত অনেকেই পড়েছেন কিন্তু কারওই জানা নেই লেখাটি যে আমার ছিল। আজ বাবা দিবসে নিজে বাবা না হওয়ার সেই বিষয়ের লেখাটি হুবহু তুলে ধরলাম। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম সেই অনেক বছর আগে। বিয়ের ৩ বছর পর আমার স্ত্রী গর্ভধারণ করে। কিন্তু ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও সন্তানের কোনো হার্টবিট আসে না। যার দরুন ডাক্তার বাধ্য হয় ডিএনসি করতে। যা হোক আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাই কিন্তু কয়েক বছর পার হলেও কিছুই আর সম্ভব হয় না। এরই মাঝে টেস্ট করে ধরা পড়লো স্ত্রীর ইউটেরাসে টিউমার দেখা দিয়েছে। অনেকগুলো হওয়াতে ডাক্তার পরামর্শ দিলেন অপারেশন করতে হবে। ঢাকার বড় বড় ডাক্তার খুঁজে ডিসিশন নিলাম স্কয়ার হাসপাতালে বসেন নার্গিস ফাতেমা নামের এক ডাক্তার। তার হাতেই করাবো অপারেশন। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ডা. নার্গিস ফাতেমাকে দেখালে তিনিও বললেন ইউটেরাস সেইভ রেখে টিউমারগুলো রিমুভ করবেন। তিনি বললেন, এটি একটি প্যাকেজের মাধ্যমে সেখানে করা হয় যা সবকিছু দিয়ে পয়ষট্টি হাজার টাকা খরচ লাগবে। আমি রাজি হলাম এবং স্ত্রীকে ভর্তি করলাম কিছুদিন পর। অপারেশন ভাল করলেন অনেক সময় নিয়ে। ডাক্তার আমাকে টিউমারগুলো দেখিয়ে বললেন অনেক টিউমার ছিল যা রিমুভ করতে অনেক সময় লেগেছে এবং রুগী এখন ভাল আছে, তবে একরাত পোস্ট অপেরেটিভ কেয়ার ইউনিটে থাকতে হবে। অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়াতে আমি বিকালে দেখতে সেই রুমের সামনে গেলাম। সিকিউরিটিকে অনুরোধ করলে আমাকে রুমে ঢুকতে দিল। কিন্তু গিয়ে দূর থেকে দেখি এ কি অবস্থা! আল্লাহ্ শেষবারের মত দেখাতেই হয়ত আমাকে ওখানে নিয়েছিলেন। ডিউটিরত ডাক্তার ও সিষ্টার সব কাউন্টারে বসে আড্ডা দিচ্ছে অথচ রুগী ওখানে মৃত্যুশয্যায় হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে তা কেউ শুনছে না। যেন গরু জবাই করে ফেলে রেখেছে। আমার স্ত্রীর শরীর সাদা হয়ে গিয়েছে। আমি চিৎকার করে ডিউটি ডাক্তার ডাকতে তারা এসে ব্লাড প্রেসার মেপে দেখে প্রেসার ৩৫ এ নেমে গিয়েছে। সাথে সাথে ডা. নার্গিস ফাতেমা খবর পেয়ে এসে হাজির। তিনি এই অবস্থা দেখে ডিউটি ডাক্তারের উপর চোখ গরম করলেন কিন্তু আমি থাকাতে কিছু না বলে দ্রুত ICU তে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন যত দ্রুত এবং যত ব্যাগ পারেন রক্ত সংগ্রহ করেন এখনই। আমি পাগল হয়ে গেলাম। ICU তে ডাক্তার ব্লাড প্রেসার বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে গেল এবং সবাই বোর্ড মিটিংয়ে বসে গেলেন। আমি ব্যাগের পর ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে থাকলাম। রাতে ডাক্তার আমাকে ICU তে ডাকলেন এবং বললেন রুগীর টিউমার রিমুভ করার স্থান গুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না এ জন্য ব্লিডিং হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললেন যেন তাকে বাঁচানো যায়। আমি আমার স্ত্রীর হাত ধরে বলে আসলাম তোমাকে আমার ঘরে নিয়ে যাবই। সারারাত কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করতে থাকলাম সৃষ্টিকর্তার নিকট। রাত থেকে রক্ত দিচ্ছে অথচ তা বের হয়ে যাচ্ছিল। এভাবে ১১ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়ে গেল। ডাক্তাররা আবার আমাকে ডাকলেন এবং বললেন তাকে আবার অপারেশন করতে হবে এবং পুরো ইউটেরেসটি ফেলে দিতে হবে। যার কারণে আমার স্ত্রী আর কোনদিন মা হতে পারবেন না। আমি সাথে সাথে ডাক্তারকে কাগজে সাইন দিয়ে বললাম আপনি ফেলে দেন আমার বাচ্চার দরকার নাই। আবার অপারেশনে ঢুকালো। সর্বমোট আমি ১৮ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে ক্রসম্যাচ করেছিলাম। অপারেশন হলো এবং ICU তে তিন দিন রেখে বেডে দিল। আল্লাহর রহমতে তখন কিছুটা ভাল। আমাদের রুমের মাঝে পর্দা দেওয়াসহ তখন পাশে আর একজন রুগী ছিলেন। এক আমার স্ত্রী আর অন্যজন সে দিনই বাচ্চা হওয়া এক ভদ্রমহিলা। একজন মা হলেন আর অন্যজন চিরতরে মা হওয়া থেকে বঞ্চিত হলো একই রুমে শুয়া। নির্মম সেই মুহূর্ত কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের পাশের রুগী যখন জানতে পারল আমার স্ত্রীর এই সমস্যার কথা। সাথে সাথে পর্দার এপাশ থেকে শুনতে পেলাম সিস্টারকে ফোন করে বলছে তাকে এই রকম রুগীর কাছে কেন রাখা হয়েছে? তার বাচ্চার নাকি ক্ষতি হবে। শুনেও আমরা না শুনার ভান করলাম। তিনি দ্রুত রুম ছেড়ে অন্য কেবিনে চলে গেলেন। এর তিন দিন পর যখন কাউন্টারে বিল দিতে গেলাম তখন দেখি আমার পয়ষট্টি হাজার টাকার প্যাকেজের বিল দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ টাকা। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। যাদের অবহেলার কারণে আমাদের এত বড় ক্ষতি হলো আবার তারা টাকাতে একটুও ছাড় দিলো না। আমি স্কয়ার হাসপাতালের অপারেশন হেডের কাছে গেলাম ও তাকে সব খুলে বললাম। তার নিকট দরখাস্ত দ্বারা আবেদন করলাম আমাকে কিছু টাকা যেন মওকুফ করা হয়। কিন্তু তিনি মোটেও শুনলেন না। তিনি ডাক্তার নার্গিস ফাতেমাসহ অন্য ডাক্তারদের ডাকালেন এবং সকল বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে আমাকে বললেন, আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো গিয়েছে এটাই বড় কথা আর মৃত্যুশয্যা যাওয়াতে তাদের নাকি কোন দোষ ছিল না। আমি ওদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ফ্যামিলির কাছ থেকে কোনো সাপোর্ট পেলাম না। সবাই বললেন আল্লাহ কপালে রেখেছেন এখন আর কি করার! স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠলো আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের টোনাটুনির সংসারের অনেক বছর পার হয়ে গেল। দুজনই কর্মজীবনে ব্যস্ত। দিন শেষে ঘরে ফিরি। আর মন খারাপ রোধ করতে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াই। দেশ কিংবা সমাজের অনেককেই দেখি মেয়েদের সন্তান না হওয়ার কারণে স্বামী তালাক দিতে চায় কিংবা দিয়ে দেয়। আমি সেই সমস্ত পুরুষদের বলতে চাই, স্ত্রীকে সবার আগে ভালোবাসুন তারপরে অন্য সব চাওয়া পাওয়া। একজন স্ত্রী শুধুমাত্র সন্তান পয়দা দেওয়ার মেশিন নয় যে তা দিতে না পারলে আপনি তাকে ছেড়ে দিবেন। সন্তান আল্লাহ্ দিয়ে থাকেন। তিনি যেমন দিতে পারেন তেমনি নিতেও পারেন। এখানে কারও কোনই হাত নেই। সবার আগে সংসারে সুখ। একটি সুখি সংসার বেহেস্তের বাগান স্বরূপ। আর পৃথিবীটা থাকার জায়গা না। আমরা কেউই থাকবো না। কেউ আজ কেউ কাল। সব কিছুই পড়ে রবে তবে কেন আমাদের এত চাওয়া পাওয়া? এভাবে দিন চলে যায় জীবন থেকে সময় হারিয়ে যায় স্বপ্ন গুলি স্মৃতি শুধু পড়ে রয় !! জগতের এইতো রীতি একদিন হবে যে ইতি সুখে দুঃখে কেটে যাবে মানুষ নামের দেহ বাতি!! মিঞা মিজানুর রহমান কাজলের ফেসবুক থেকে নেয়া এমএস/

‘বাবার জন্যে গর্বে বুক ভরে যায়’

বাবাকে নিয়ে অনেক গান কবিতা লেখা হলেও বাবার অপূর্ণতা কি কখনো পূরণ করা যায়? কে না চায় বাবার আদর ভালবাসা পেতে। এই পৃথিবীতে কারও বাবা আছে আবার কারও নেই। বাবা দিবসে বাবাকে মনে করেন অনেকেই। যাদের বাবা নেই তারাই বোঝে বাবা হারানোর বেদনা। আর যাদের বাবা আছে তারা কি বুঝবে বাবা হারানোর কষ্ট? বাবা দিবস নিয়ে অনেক গুণীজনরাই সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন। তার তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করছেন। তেমনি একজন গুণী ও আলোকিত মানুষ নওশেবা সাবিহ কবিতা। তিনি শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকা “টইটম্বুর” এর সম্পাদক। তিনি লিখেছেন তার বাবাকে নিয়ে। আবেগ, অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তার লেখাটি একুশে টিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- ‘রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে হরহামেশাই বটবৃক্ষ চোখে পড়ে আমাদের। তখন বটবৃক্ষের গুণাগুণ মনে করার চেষ্টা করি। কিন্তু বাস্তবে বটবৃক্ষ কী, সেটা ভালোমতো টের পেয়েছি ২০০৮ সালে । আমার মা সেলিমা সবিহ্ (টইটম্বুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক) হঠাৎ করে গত হলেন (২০০৮ সালের ১২ জানুয়ারি)। সেই থেকে আমার বাবা চিত্রশিল্পী (চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও টইটম্বুর উপদেষ্টা) ও কথাশিল্পী সবিহ্ উল আলম একাধারে আমার মা ও বাবা দুটোই। বলতে গেলে আমরা ৩ ভাইবোনই (নায়ক, কবিতা ও সুমন) একেবারে ছোট থেকেই আমাদের বাবা-মাকে পেয়েছি বন্ধুর মতো । সব কথাই আমরা তাদের সাথে ‘শেয়ার’ করতাম। কোনো রাখ-ঢাক ছিল না। পরিচিত -পরিজনরা ব্যাপারটি লক্ষ্য করে যেমন অবাক হতেন, তেমন প্রশংসাও করতেন । হঠাৎ করে মা চলে গেলেও বাবার সাথে বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি এতটুকুও। আমার বাবা বরাবর চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। কিছুটা আমার দাদা কথাশিল্পী মাহ্বুব উল আলম -এর মতো। আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়। দাদার মতো নিজের ব্যাপারে উচ্চকিত নন। বাবা খুব নিয়ম মাফিক এবং নীতিবান। নিজের কাজ নিরিবিলিতে করতে খুব পছন্দ করেন। এখন তো ৭৮ বছর বয়সেও সকাল থেকে রাত অবধি টানা ব্যস্ত থাকেন। মাশাআল্লাহ্। ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন সময়মতো। আমার মাসহ হজব্রত পালন করেন ২০০৩ সালে। খুব ভোরে উঠে নামাজ পড়ে, কোরআন পড়ে নিয়মিত ডায়েরি লেখেন। খুব স্বল্পাহারী। ছোটবেলা থেকেই দেখছি খুব কম খান। খুব একটা খাদ্যরসিক নন । তবে কারো হাতের রান্না পছন্দ হলে প্রশংসা করেন। আমার হাতের অনেক রান্নাই আমার বাবার প্রিয় - তবে মসুরের ডাল দিয়ে চিংড়ি শুঁটকির রান্না বেশি প্রিয়। আমার বাবার ২ পৌত্র ও ১ পৌত্রি আর ১ দৌহিত্র (আমার ছেলে #যাররাফ)। নাতি-নাতকুড়দের সাথেও রয়েছে বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ওরা ওদের যে কোনো কথা ‘শেয়ার’ করে তাদের দাদা-নানার সাথে। বন্ধুত্বের কথা নিয়ে বলি - আমরা ৩ ভাই বোন ছাড়াও বাইরের আরও অনেক ক’জন ছেলেমেয়েও বাবাকে বন্ধুর মতো ভাবে । শুধু তা-ই নয়, তারা বাবাকে ‘চাচা’ সম্বোধন করলেও ‘পিতৃপ্রতিম’ মনে করে শ্রদ্ধার আসনে বসায়। এখানেই শেষ নয়, যাদের ‘বাবা’ নেই, তাদের তো বাবা নিজের ছেলে-মেয়ে বলেই গণ্য করেন। পাশাপাশি তারাও তাদের যে কোনো সমস্যা, সুখ-দুঃখের কথা বাবার সাথে শেয়ার করে । আর বাবা সানন্দে তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান বাৎলে দেন । বাবা প্রায়ই গর্ব করে বলেন- তার অ-নে-ক ক’ জন ছেলেমেয়ে । আসলেই তাই । আমিও মাঝে মাঝে ভাবি - বাবা এতো এতো ছেলেমেয়েকে একই সঙ্গে ‘স্নেহ-সুধা’ বিলান কীভাবে ? আসল কথা - বিধাতা কাউকে না কাউকে এমন ক্ষমতা দিয়েই দুনিয়ায় পাঠান । আমার ভাবতে ভালো লাগে যে, আমার বাবা এই গুটিকয়েকের একজন । আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করেন - তোমরা ভাইবোন ক’ জন? আমি কিন্তু চটজলদী হিসেব করে উত্তর দিতে পারি না। তার কারণ রক্তীয় ভাইবোনের চেয়ে আমার আত্মিক ভাইবোনের সংখ্যাই বেশি । দিনে দিনে এই সংখ্যা শুধু বাড়ছেই .................................... আর সেটা বাবার কারণেই। এতে আমি অখুশি নই, বরং গর্বিত। আমি এই লেখা শুরু করেছি ‘বটবৃক্ষ’ দিয়ে। হ্যাঁ, আমার বাবা হলেন ‘বটবৃক্ষ’। তাঁর স্নেহ-ছায়ায়, মায়া-মমতায় সবাই আরামে থাকতে পারে। এ মুহূর্তে আমাদের জীবনপথের চলমানতায় বলতে গেলে পুরোটাই জুড়ে আছেন আমার ‘বাবা’। যদি বলি - আমাদের দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্নায়, সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, সাফল্য-ব্যর্থতায়, উত্তেজনায়-অবসাদে, জীবন - সংগ্রামে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো ঘিরে আছেন আমার বাবা। তাহলেও বোধ করি এক বর্ণ মিথ্যে বলা হবে না - এমনই আমার ‘বাবা’ ! বিভিন্ন সময়ে অনেকেই আমায় বলেছে - ইস্ তোমার বাবা যা ভালো আর ফ্রেন্ডলি, আমার বাবাও যদি এমন হতেন?! - এ কথা শুনে বাবার জন্যে গর্বে বুক ভরে যায়। আমার কাছে আমার বাবা অনেক গুণের আধার। পুত্রপ্রতিম কাউকে তিনি ‘বাবা’ আর কন্যাপ্রতিম কাউকে ‘মা’ সম্বোধন করেন। পাতানো সন্তানরা এতে যারপরনাই আনন্দিত হয়, খুশি হয় - এটা বেশ বুঝতে পারি । বাবার চরিত্রের একটি বিশেষ দিকের কথা না বললেই নয়, বাবা তাঁর পজিটিভ অ্যাটিচ্যুড দিয়ে অনেক কঠিন সমস্যা খুব সহজেই মোকাবেলা করেন। অনেকেই জানেন - বাবা তাঁর পজিটিভনেস দিয়ে অনেক ‘বেপথু’ মানুষকে সুপথে এনেছেন। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি বাবা অনেকের বিয়েতে ঘটকালি করেছেন এবং করছেন। আবার অনেকের ভাঙা ঘর (মানে ভেঙে যাওয়া বিয়ে) জোড়া দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর অকাট্য যুক্তি হলো - যে কোনো জিনিস ভাঙতে এক সেকেণ্ডও লাগে না, কিন্তু জুড়তে লাগে অ-নে-ক সময় - অ-নে-ক দিন । বিয়েটাও তেমনই। আমার বাবার সাথে আমার এক উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হলো - হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর তাঁর মেয়ে রানু মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া - ‘আয় খুকু আয় ...... ‘গানটি। আমরা মানে আমি আর বাবা অনেক অনুষ্ঠানে অনেকবারই গানটি পরিবেশন করেছি। সবাই খুব প্রশংসা করেছেন আমাদের দ্বৈত পরিবেশনা। কেন যেন এই গানটি গাইবার সময় আমি আর বাবা অনেক ইমোশনাল আর নস্টালজিক হয়ে পড়ি। তখন আমার ইমোশনাল বাবাকেও আমি ‘ফিল’ করতে পারি। আমি বাবার কাছ থেকে প্রথম জেনেছি যে, আনন্দ শেয়ার করলে বাড়ে আর দুঃখ শেয়ার করলে কমে। আমি নিজেও কোনো সমস্যায় পড়ে যখন থৈ পাই না, তখন শরণাপন্ন হই বাবার । তাঁর সঙ্গে শেয়ার করে হালকা হই, পথের দিশা পাই । অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই । আমার বাবা তাই শুধু আমাদের পরিবারেরই নয়, অন্য অনেক পরিবারেরও বটবৃক্ষ। বাবা দিবসে আমার এই ‘বটবৃক্ষ’ বাবার দীর্ঘায়ু কামনা করি, যেন তিনি দীর্ঘদিন তাঁর এতো এতো ছেলেমেয়ের মাঝে স্নেহ-সুধা বিলিয়ে যেতে পারেন। শেষ করি ছোট্ট একটি কথা দিয়ে -‘বাবা নামের মাহাত্ম্য তাইদামের চেয়েও দামীখুঁজে ফিরি সকল কাজেইগর্বিত এই আমি।’

আমার বাবা ‘লেহা ভাই’

বাবা একটি মধুর নাম। কত কষ্ট করে তিনি আমাদের লালন-পালন করেন। আদর করেন, ভালোবাসেন। আমাদের আহার অন্বেষণ করেন। সারাদিন কাজ শেষে ফিরে পরিবারে সময় দেন। শত কষ্টের পরও কাউকে বুঝতে দেন না তার কষ্ট। গোপনেই থেকে যায় সেই কষ্ট। সেই বাবাকে স্বরণ করেই আজকের এই দিনটি পালন করা হয় ‘বিশ্ব বাবা দিবস’। যাদের বাবা আছে তারা এই দিনটিকে স্বরণীয় করে রাখতে নানা আয়োজন করে থাকেন। আর যাদের বাবা নেই তারা অনেকেই তাদের বাবাকে নিয়ে নানান ধরনের স্বরণীয় ঘটনা লিখে থাকেন। তেমনি বাবা হারানোর ব্যাথা নিয়ে বাবাকে স্বরণ করে স্মৃতিচারণ করেছেন বিশিষ্ঠ সাংবাদিক দৈনিক যুগান্তরের প্রধান প্রতিবেদক মাসুদ করিম। বাবাকে নিয়ে লেখা নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসটি একুশে টেলিভিশন পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো- ‘আমার ছে‌লে‌বেলায় আমা‌দের গ্রা‌মে যাত্রাপালা খুবই জন‌প্রিয় ছিল। রুপবান না‌মের যাত্রা দেখার জ‌ন্যে মঞ্চায়‌নের আগ থে‌কে গ্রা‌মের লোক‌দের ম‌ধ্যে রব উঠে যেত। ওই সম‌য়ে আমা‌দের গ্রা‌মে আমার বাবা ছাড়া লেখাপড়া জানা কোনও লোক ছি‌ল না। তাই গ্রা‌মের যুবকরা যাত্রাপালা কর‌তে গি‌য়ে বিপা‌কে পড়‌তেন। যাত্রার বই প‌ড়ে দেয়ার কেউ ছিল না। আমার বাবা‌কে বই পড়ার জ‌ন্যে ডে‌কে নি‌তেন। গ্রা‌মের লো‌কেরা তা‌কে "‌লেহা ভাই" ব‌লে ডাক‌তেন। বাবার আসল নাম মো. মোফাজ্জল হো‌সেন। ত‌বে সবাই লেহা ভাই না‌মে চিনত। কারণ তি‌নি একমাত্র লেখাপড়া জানা‌ লোক। নন মে‌ট্রিক পর্যন্ত লেখাপড়া ক‌রে‌ছেন, মে‌ট্রিকু‌লেশন মা‌নে এসএস‌সি পরীক্ষা দেন‌নি কিংবা পাশ করেন‌নি। যাত্রাপালার তি‌নি ছি‌লেন ফ্রমমাস্টার। যাত্রার বই পড়‌তেন আর তা শু‌নে  অভিনেতারা ম‌ঞ্চে পারফর্ম কর‌তেন। নন মে‌ট্রিক হ‌লেও বাবার সব বিষ‌য়ে জ্ঞান ছিল। পেশায় তি‌নি কৃষক ছি‌লেন। দিনভর মা‌ঠে গরুর লাঙ্গ‌লে হাল চাষ থে‌কে শুরু ক‌রে কুড়াল দি‌য়ে লাক‌রি সংগ্রহ সবই তি‌নি ক‌রে‌ছেন। আমার ম‌নে আছে, বাবা আমার চুল কে‌টে দি‌তেন, সব সম‌য়েই রাউন্ডছাট, মা‌থার চার‌দি‌কে ‌গোল ক‌রে চুল কাটা। আমি খুব অপছন্দ করতাম। আমা‌দের বা‌ড়ি‌তে পা‌শের গ্রা‌মের র‌ঞ্জিত না‌মের একজন নরসুন্দর আস‌তেন, তার হেয়ার স্টাইল আমার পছন্দ হ‌লেও অর্থ সাশ্রয় কর‌তে বাবা জোর ক‌রে নি‌জে আমার চুল ছে‌টে দি‌তেন। তার অন্য সন্তান‌দেরও তাই কর‌তেন। আমার বাবার পাঁচ ছে‌লে ও চার মে‌য়ে। দুই ছে‌লে ইতিম‌ধ্যে মারা গে‌ছেন। বাবা মারা যান ১৯৯৯ সা‌লে। সারা‌দিন ক‌ঠোর প‌রিশ্রম করার পর চাঁদ‌নি রা‌তে আমা‌দের বা‌ড়ির উঠা‌নে গ্রা‌মের লো‌কেরা সবাই সম‌বেত হ‌তেন । আমা‌দের বা‌ড়ি‌তে ছিল কাসাসুল আম্বিয়া না‌মের বই। এতে আম্বিয়া‌দের জীবন কা‌হিনী কা‌ব্যিক ঢং‌য়ে লেখা ছিল। বাবা সুর ক‌রে বইটি থে‌কে পড়‌তেন, কারবালার বি‌য়োগান্তর কা‌হিনী, পড়ার সম‌য়ে সমবেত কেউ চো‌খের পা‌নি ধ‌রে রাখ‌তে পার‌তেন না । বাবা ছি‌লেন সরল‌সোজা মানুষ। বৈষ‌য়িক চিন্তা তার ছিল না। তি‌নি সংসা‌রের জ‌ন্যে গাধার খাটু‌নি খে‌টে‌ছেন। তার উপার্জ‌নে জ‌মি কেনা হ‌লেও তার রে‌জি‌স্ট্রি আমাদের না‌মে আর মা‌য়ের না‌মে ক‌রে‌ছেন। আমা‌দের ভাইবোন‌দের লেখাপড়া করা‌নোর, সংসার কীভা‌বে চল‌বে সবই দেখ‌তেন মা। বাবা একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ ছি‌লেন। তি‌নি নামাজ পড়‌তেন, আজান দি‌তেন। আমা‌দের গ্রা‌মের নাম কদম দেউ‌লি, থানা বারহাট্টা, জেলা নেত্র‌কোনা। আমা‌দের পাশ্ববর্তি দেউ‌লি গ্রা‌মের বে‌শির ভাগ হিন্দু সম্প্রদা‌য়ের লোক। তা‌দের স‌ঙ্গে বাবার বন্ধুত্ব ছিল। বাবা আমা‌দের খুব ভালবাস‌তেন। তাই স্ত্রী সন্তান‌দের রে‌খে কোথাও যে‌তেন না। মা মা‌ঝে মা‌ঝে ঝগড়া কর‌তেন তাব‌লিগে যাওয়ার জন্য। বাবা তাব‌লিগ পছন্দ কর‌তেন না। আমা‌দের পাশ্বব‌র্তি আরেক গ্রা‌মের নাম সতরশ্রী। ওই গ্রা‌মে আকবর আলী রেজভী না‌মের একজন পীর ছি‌লেন। তি‌নি তাব‌লিগ পছন্দ কর‌তেন না। বাবা ছি‌লেন ওই পী‌রের ভক্ত। ত‌বে তাব‌লি‌গের লো‌কেরা তা‌কে দাওয়াত দি‌তে এলে তা‌দের স‌ঙ্গে বিন‌য়ের স‌ঙ্গে কথা বল‌তেন । মারা যাওয়ার আগে বাবা খুব অসুস্থ ছি‌লেন। ওই সম‌য়ে আমি ঢাকায়। বাংলাবাজার প‌ত্রিকায় জু‌নিয়র রি‌পোর্টার। আমি কখনই ভা‌বি‌নি তি‌নি মারা যা‌বেন। তাই ভে‌বে‌ছিলাম ক‌য়েক‌দিন পর বা‌ড়ি যাব, বাবার সেবা করব। কারণ বাবা আমার ঢাকায় থাকা পছন্দ কর‌তেন না। তি‌নি চাই‌তেন আমিও যেন তার সব সন্তা‌নের ম‌তো বা‌ড়ি‌তে থা‌কি। অসুস্থ থাকার দিনগু‌লো‌তে বার বার বল‌তেন আমি যেন বা‌ড়ি চ‌লে যাই। আমি ভাব‌তেও পা‌রি‌নি বাবা আমা‌দের ছে‌ড়ে চ‌লে যা‌বেন। বাংলাবাজা‌রে আমার চিফ রি‌পোর্টার মোল্লাহ আমজাদ হো‌সেন এক‌দিন আমা‌কে বল‌লেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনা সুন্দরবন যা‌চ্ছেন। সুন্দরবন‌কে বিশ্ব ঐ‌তিহ্য ঘোষণা ক‌রে‌ছে ইউনে‌স্কো। তার উদ্বোধন। হে‌লিকপ্টা‌রে সাংবা‌দিক নি‌য়ে যা‌বেন। মোল্লাহ ভাই আমা‌কে ওই ট্রি‌পে যে‌তে বল‌লেন। আমার পোশাক প‌রিচ্ছদ এত ভাল না। প্রধানমন্ত্রীর স‌ঙ্গে যে‌তে হ‌লে ভাল পোশাক দরকার। মোল্লাহ ভাই আ‌মা‌কে কিছু টাকা দি‌লেন জামা কেনার জন্য। জু‌নিয়র রি‌পোর্টার হিসা‌বে প্রধানমন্ত্রীর স‌ঙ্গে হে‌লিকপ্টা‌রে সুন্দরব‌নের ম‌তো জায়গায় যাওয়া একটা বিরাট সু‌যোগ। আমার কেন জা‌নি যে‌তে ভাল লাগ‌ছিল না। আমি টাকাটা মোল্লাহ ভাইকে ফেরত দি‌য়ে বললাম, আমি যাব না। মোল্লাহ ভাই তখন আমা‌দের আরেক সহকর্মী শাবান মাহমুদ‌কে ওই ট্রি‌পে যে‌তে ব‌লেন । শাবান মাহমুদ খু‌শি‌তে আত্মহারা। তি‌নি তখন ছাত্রলী‌গের রাজনী‌তি‌তে স‌ক্রিয়। শেখ হা‌সিনার স‌ঙ্গে যাওয়ার সু‌যোগ তার জ‌ন্যে বিশাল ব্যাপার। শাবান ভাই সুন্দরবন গে‌লেন। সুন্দরবন থে‌কে প্রধানমন্ত্রী ফি‌রে গে‌লেও সাংবা‌দিকরা বেশ ক‌য়েক দিন সেখা‌নে থাক‌লেন। প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবন যাওয়ার প‌রের দিন আমার ডে অফ। আমি তখন ব্যা‌চেলর। আমি আর আমার ভা‌গ্নে শ‌ফিউল আলম দোলন মুগদাপাড়ায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া ক‌রে থা‌কি। ডে অফের দিন কী ম‌নে ক‌রে বিকাল পাঁচটার দি‌কে অফি‌সে গেলাম। মোল্লাহ ভাই আমাকে কিছু টাকা দি‌য়ে বল‌লেন তাড়াতা‌ড়ি বা‌ড়ি যাও তোমার বাবা অসুস্থ। তোমার বা‌ড়ি থে‌কে ক‌য়েকবার ফোন এসেছে। আস‌লে তখন বাবা মারা গে‌ছেন। ১৯৯৯ সা‌লের ঘটনা। তখন আমার মোবাইল ছিল না ব‌লে জানা‌তে পা‌রে‌নি। তেঁজগাও‌য়ে বাংলাবাজার অফিসের কা‌ছে মহাখালী গি‌য়ে বা‌সে উঠলাম। রাত ১১ টায় নেত্র‌কোনো পৌঁছলাম। নেত্র‌কোনা থে‌কে আমার বা‌ড়ি ২০ কি‌লো‌মিটার দূ‌রে। এত রা‌তে কীভাবে যাব! আমি তখন ‌নেত্র‌কোনায় আমার এক বন্ধু নেত্র‌কোনা সরকারী ক‌লে‌জের সা‌বেক ভি‌পি গাজী মোজা‌ম্মেল হক টুকুর বাসায় যাই। আমা‌কে দে‌খে টুকু আমার বাবার মারা যাওয়ার খবর জানাল। সে আমা‌কে তার মোটরসাইকেলে রা‌তে বা‌ড়ি পৌঁছে দিল। আমি সে‌দিন অজানা কার‌ণে সুন্দরবন যাইনি ব‌লে বাবার জানাজায় শ‌রিক হ‌তে পে‌রে‌ছিলাম। অকার‌ণে ডে অফ অফিসে যাওয়ায় বাবার মরা মুখটা অন্তত দেখ‌তে পে‌রে‌ছিলাম। দুই দশক আগে বাবা চ‌লে গে‌লেও এখনও শূন্য শূন্য লা‌গে। আমি নি‌জে বাবা হওয়ায় সন্তা‌নের প্র‌তি বাবার দরদ খুব বে‌শি অনূভব ক‌রি। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া কর‌বেন।

আজ ১৩ জুন, ‘গোলাহাট গণহত্যা’ দিবস

১৯৭১ সালের ১৩ জুন, সৈয়দপুর শহরে সবচেয়ে বড় গণহত্যা হয়। এ দিন শহরের ৪৭৮ জন মাড়োয়ারি পরিবারের সদস্যকে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার নামে ট্রেনে তোলা হয়। এরপর রেলওয়ে কারখানার উত্তর প্রান্তে সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে তাঁদের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হয়। শিশুদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন নির্বিচারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী অবাঙ্গালী বিহারী ও বাঙ্গালি রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী সম্মিলিতভাবে এদের হত্যা করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রংপুর বিভাগের অধিভুক্ত সৈয়দপুর একটি রেলওয়ে টাউন এবং ব্যবসায়কেন্দ্র। আগে এটি নিলফামারী জেলার অন্তর্গত ছিল। অবিভক্ত ভারতবর্ষে পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের উত্তরপুর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সংযোগস্থল ছিল। ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুবিধার জন্য এ অঞ্চল তাই মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভারত বিভাগের পুর্ব থেকেই তারা এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। তারা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসবাস করে সেখানকার স্থানীয় হয়ে যায় এবং অনেকেই বিভিন্ন জনহিতকর কাজের কারণে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। যেমন : মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তুলসিরাম আগারওয়াল তুলসিরাম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ তে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পরে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হলেও অনেকেই থেকে যায়। যুক্তপ্রদেশ এবং বিহার থেকে আগত উর্দুভাষী মুসলামানেরা সৈয়দপুর শহরে এসে বসবাস শুরু করে। এরা ছিল শহরবাসীর প্রায় ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উর্দুভাষী মুসলমানরা সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে। এজন্য সৈয়দপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়। ১৯৭১-এর ১২ এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে রংপুর সেনানিবাসের অদূরে বিখ্যাত তুলসিরাম আগারওয়াল, যমুনাপ্রসাদ কেরিয়া, রামেশ্বরলাল আগারওয়ালকে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ড মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মাঝে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে। উর্দুভাষী বিহারীরা মাড়োয়ারিদের বাড়িঘর, দোকান, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান লুটপাট শুরু করে। যা হোক; পাকিস্তান সেনা কর্তৃপক্ষ ১৩ জুনের এ গণহত্যার নাম দিয়েছিল, ‘অপারেশন খরচাখাতা’। যদিও এই গণহত্যা ‘গোলাহাট গণহত্যা’ নামে পরিচিত। এসএ/    

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি