ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:০৬:২২, বৃহস্পতিবার

কর্মক্ষেত্রেই যাদের ঈদ

কর্মক্ষেত্রেই যাদের ঈদ

রাজধানীর রাস্তা ফাঁকা। মহল্লার পর মহল্লা ফাঁকা। ঈদের দিন আজ বুধবার, সকাল ৭টায় ধানমন্ডি এলাকার খোরশেদ আলম তার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়ে ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। চাকরির সুবাদে তিনি ঢাকার বাইরে থাকেন। পরিবারের সকলের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে নিজ এলাকা ঢাকায় এসেছেন। তার বন্ধু সালাউদ্দিন আহমেদ শ্যামলীতে নিজের ফ্লাট ও ব্যবসা রেখে বাড়িতে গেছেন মা, বাবা, ভাই, বোনসহ সকলের সঙ্গে ঈদ উৎসব উদযাপন করতে। খোরশেদ সাহেব যখন ধানমন্ডির একটি ঈদগাহে ঢুকছিলেন ঠিক সেই সময়ে ঈদগাহের গেটে কয়েকজন পোশাকধারী পুলিশ সদস্য অস্ত্র উঁচিয়ে নিরাপত্তার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজ স্বজনদের নিয়ে তাদের ঈদ উদযাপন আর হচ্ছে না। ৪০ উর্দ্ধো এক পুলিশ কনেস্টবলের দিকে এগিয়ে গেলে নাম জানা গেল আব্দুল আলীম। ঈদে নিজের পরিবারের বাইরে ঈদ উদযাপন করার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে তিনি মুখে অম্লান হাসি দিয়ে বললেনে, ‘এটা তো উদযাপন নয়। সুন্দর উদযাপন নিশ্চিত করা। বাস্তবতা তো বুঝি। সারা বছর কাজে থাকতে হয়। জরুরী পরিস্থিতি ছাড়া ছুটি মেলা কঠিন। তবে ঈদে মনটা একটু খারাপ হয়, মন চায় পরিবারের সঙ্গে থাকতে কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে না।’ আলীমের সঙ্গে কথা বলার সময় দাড়িঁয়েছিলেন মঈন নামে ২৫ উর্দ্বো পুলিশ সদস্য। তার চোখটা ভিজে গেলো। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আর কথা বলা গেল না। হয়ত সে এই ঈদের সকালে মায়ের কথা ভাবছে, হয়ত ভাবছে ছোট ভাই ও বোনের কথা। যে বোন মাথায় লাল ফিতার ঝুটি করে ভাইয়ের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে হাটে যাওয়ার আবদার করবে। তা আর হলো কোথায়? পুলিশের অনেক সদস্যরা নগরীসহ পুরো দেশের নিরাপত্তার জন্য এই মহা উৎসবে বাড়ি ফিরতে পারেননি। হয়ত অন্য সময় বাড়ি ফিরতে পারবেন তবে পরিবার, বন্ধু ও এলাকাবাসীর সঙ্গে ঈদ উৎসব হলো না। নিরাপত্তার কারণে ঈদের জামাতের শেষ মুহূর্তে কোন রকম দাড়িঁয়ে নামাযটা পড়েছেন তারা, মোনাজাত করেছেন বুকে বা পিঠে অস্ত্র ঝুলিয়ে। নিরাপত্তা তো তাদেরকেই দিতে হবে। তারা নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এটা তাদের দায়িত্ব। মহান এ দায়িত্ব তারা পালন করছেন ঠিকই তবে মনের মধ্যে সুপ্ত অপ্রাপ্তি থেকেই গেল। তাদেরও মন চাইছে গাঁয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যে মাঠে খেলাধুলায় শৈশব কেটেছে সেই মাঠে আবার ফিরে যেতে, সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে নদী পাড়ে আড্ডা দিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি গ্রুপে ঈদে দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ সদস্যের ছবি আপলোড করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘পাঞ্জাবিটা ট্রাংকে রয়ে গেছে, জামাটাও রয়ে গেছে, এর মধ্যে পুলিশের আনন্দ হলো মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া। শহরের খালি বাড়ি, ব্যাংক, সরকারি স্থাপনা, পার্ক, ঈদের জামাত, ভি ভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়া। ঈদে বাড়ির পথে যাত্রাকারী সকলের যাতায়াত নিরাপদে ও সুন্দরভাবে নিশ্চিত করা। ডিউটি নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে পুলিশের ঈদ আনন্দ।’ এমদাদুল বারি শাওন নামের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের এক শিক্ষা কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রফাইলে লিখেছেন, ‘যাদের আনন্দ ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের আনন্দ উপভোগ।’ পুলিশ সদস্যদের মত ঈদে বাড়ি ফেরা হয়নি অনেক সংবাদকর্মীর। বিশেষ করে টেলিভিশন স্টেশন ও অনলাইন পোর্টালের সংবাদিকদের অনেকেই বাড়ি ফিরতে পারেননি। দুই ঈদে ছুটি পাওয়া যাবে না এই শর্তে এক ঈদে ছুটি মেলে। কিন্তু এক ঈদে আনন্দ করলে অন্য ঈদে আনন্দ করতে মন চায় না এমন তো নয়। উৎসব তো আর বেঁধে রাখা যায় না। মুখে হাসি দেখিয়ে বাস ও রেল স্টেশন, লঞ্চ ঘাটে বাড়ি ফেরা মানুষদের সংবাদ সংগ্রহে ছুটেন সাংবাদিকরা। বাড়ি ফেরা মানুষদের মত তাদেরও ইচ্ছে হয় বাড়ি ফিরতে কিন্তু বাস্তবতার কঠোরতায় আর বাড়ি ফেরার কথা মুখে আসে না। জাতীয় ঈদগাহের সামনে দেখা হয় বাংলা নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক তামিম মজিদের সঙ্গে। তিনি ঈদের জামাতের সংবাদ সংগ্রহে এসেছেন এ ময়দানে। জিজ্ঞাসা করতেই চওড়া হাসি দিয়ে বলেন, ‘ঈদে বাড়ি ফিরতে কার না মন চায়। কিন্তু দুই ঈদে তো আর যাওয়া হয় না। ঈদে সকলে বাড়ি গেলে তো মানুষ খবর জানতে পারবে না।’ সত্যিই সকল সাংবাদিক যদি ঈদের ছুটিতে বাড়ি যেতেন তো দেশ-বিদেশের কোন খবরই পেত না জনগণ। নিরবিচ্ছিন্নভাবে মানুষের ঘরে খবর পৌঁছে দিতেই এসব সাংবাদিকরা নিজ পরিবার ছেড়ে এ দিনেও খবরের পিছনে ছুটছেন। ঈদের সময় সপ্তাহজুড়ে অনুষ্ঠান দেখবেন দেশবাসী, পাবেন সব মুহূর্তের খবর। টিভি খুললে বা অনলাইন পত্রিকায় গেলে সহজেই পাওয়া যাবে সংবাদ বা অনুষ্ঠান। তবে এ অনুষ্ঠান বা সংবাদের পিছনে যে রয়েছে শত শত কর্মীর সুখের আত্মত্যাগ। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী ও গাড়ি চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ রয়ে গেছেন অন্যের ঈদ যাত্রা ও ফিরে আসা নিরাপদ করতে। আপাতদৃষ্টিতে এই ত্যাগ হয়ত বেশি কিছু নয়। তবে এদের হৃদয়ের অনুভূতি বেশ গভীর। সরকারী একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালক আবুল কাশেম। অবিবাহিত আবুল কাশেমের বাবা নেই। গ্রামের বাড়িতে মা ও ভাই আছেন। ঈদের দিনে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন তিনি, খোঁজ খবর নেন। মায়ের জন্য যে শাড়িটা পাঠিয়েছিলেন তা তিনি পরিধান করেছেন কিনা তা জানতে চান কাশেম। ওপাশ থেকে মা কি উত্তর দিলেন তা শুধু আবুল কাশেমই জানেন। তাকে নীড়হারা পাখির মতই দিশেহারা দেখাচ্ছিল, চোখ থেকে নিরবে নোনাপানির স্রোত বইছিল।  ঈদ। দুই অক্ষরের এক শব্দের মাঝে কত শত আনন্দ, বিশাল প্রাপ্তির আকাঙ্খা, পরিবার ও পরিজনের সঙ্গে মহা মিলনমেলা। সেই উৎসবের সঙ্গেও মিশে আছে অনেক অপ্রাপ্তি, আশা ও বেদনা। এমএস/
বিলুপ্তির পথে মৌলভীবাজারে শব্দকরদের ব্যবহৃত দেশীয় বাদ্যযন্ত্র

মৌলভীবাজারে শব্দকর সম্প্রদায়ের ব্যবহার করা দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো বিলুপ্তির পথে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই বাদ্যযন্ত্রগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ভিডিওর শুরুতেই যে বাঁশিটি বাজবে তার নাম লাইনেট। যা নতুন প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। শুধু লাইনেট নয়, টামপেড, সাইট ডাম, ঢোল ও ঢাকসহ এরকম রয়েছে অসংখ্য পুরোনো বাদ্যযন্ত্র। এসব যন্ত্রের সুর ও তাল বাঙ্গালির উৎসবে এনে দেয় আলাদা মাত্রা। কিন্ত সংরক্ষণ ও সচেতনতার অভাবে এসব যন্ত্র আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। উপরকরণের দাম বেড়ে বেশিরভাগ বাদ্যযন্ত্রই আর তৈরি করেন না কারিগররা। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে দেশি বাদ্যযন্ত্রের মতোই অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে শব্দকর সম্প্রদায়। মৌলভীবাজারের শব্দকর সম্প্রদায়ের প্রায় ৭-৮ হাজার মানুষের ঐহিত্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিস্তারিত দেখুন ভিডিওতে : এসএ/    

সম্মানে থাকুন বাবা

তপ্ত দুপুর। ঠিক মধ্য দুপুরও নয় শেষ দুপুর বলা চলে। এরপরও রোদের সে কি তেজ। কোনোভাবেই যেন সূর্যটা সময়ের কাছে হার মানতে চাচ্ছে না। রোদের এমন চির সত্য আয়োজনের মধ্যে উত্তপ্ত পিচঢালা রাস্তা দিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে হেটে যাচ্ছেন আফজাল হোসেন। ৪০ উদ্ধো এই ব্যক্তি রিক্সা বা অন্য কোন যানবাহনে উঠছেন না। শেষ দুপুরে ক্ষুধার চোটে পেটে হাজার ইঁদুর বিপ্লব করলেও আরও দুই ঘণ্টা পার করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই তো দুই ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তখনই না কিছু মুখে দেওয়া যাবে। বাইরে খেতে হলে তো অনেক পয়সা লাগবে। ভাবছেন কিছু টাকা যদি কম খরচ করা যায়। ঠিক এমনভাবে না খেয়ে আজমত আলী রোদের মধ্যে ক্লান্ত দেহে টুংটাং বেল বাজিয়ে রিক্সা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। রিক্সা টেনে নেওয়া যেমন কষ্টের তার চেয়েও নিজের ক্লান্ত দেহ বহন করা আরও কষ্টের। তারপরও যেন থামা যাবে না। সংসারের জন্য কাজ করে যেতেই হবে। যে সংসারের বাতি হলো সন্তান। নিজের সন্তানের জন্য কিছু করতে হবে এবং সন্তানের ভবিষৎ নিজের হাতে গড়ে দেওয়ার জন্য এই বাবা কতশত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বাবারা সব পারেন, সন্তানের জন্য সব করেন। যে তরুণ-যুবক স্বেচ্ছাচারী হয়ে কতই না আড়ম্বরপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে দিননানিপাত করত সেই তরুণই এক দিন অনাড়ম্বরের সারথী হয়ে যান। কারণ তিনি বাবা হয়ে সন্তানের জন্যই যেন পৃথিবীর সব স্বাচ্ছন্দ কিনে আনেন। সন্তানের সুখের সওদাগর বনে যান। ডাক হরকরার মত বাবারা ছোটাছুটি করেন নিরন্তন। সন্তানের জীবনে যেন পঙ্কিলতার কোন স্পর্শ না লাগে এ জন্য বাবা ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী। পরম নির্ভরতায় বাবার হাত ধরেই সন্তানের পথচলা শুরু হয়ে অবিরত চলতেই থাকে। নিরবে-নিভৃতে বাবারা সন্তানের জন্য সুখ ত্যাগ করেই যান। এ ত্যাগ কোন ইতিহাসে গাঁথা হয়ে প্রতিষ্ঠিতভাবে গুনঞ্জন তোলে না, এ ত্যাগ আপাত কোন প্রাপ্তি আশা করে না। এ ত্যাগ শুধুই ভালোবাসার। বাবা। মধুর এক শব্দে পৃথিবী জোড়া নির্ভরতা যুক্ত। প্রতিটি মানবসন্তান এ নির্ভরতার ছায়ায় জীবনভর থাকতে চান। কিন্তু তা কি হয়? বাবারা আসেন সন্তানের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তারপর নিরবে-নিভৃতে চলে যান। বাবা চলে যাওয়ার পরেই না সন্তানের কাছে বাবার অভাব অনুভূত হতে শুরু করে। সন্তানের কোন আবদার অপূর্ণ রাখেছেন কোন বাবা? না রাখেননি। সামর্থ্যে না কুলালেও বাবা মুখে হাসি ফুঁটেয়ে শত অবদার পূরণের আশ্বাস দেন। যে আশ্বাসে সন্তান আনন্দে আন্দোলিত হয়ে চিত্ত নাড়িয়ে লাফয়ে উল্লাস করে অন্য দিকে অসমর্থ্য বাবা দুঃশ্চিন্তায় থাকেন প্রিয় সন্তানের আবদারের বস্তুটি সন্তানের হাতে তুলে দিবেন কিভাবে। বাবার হাতের কড়ে আঙ্গুলটা ধরেই না পথ চলা শুরু। এই তো সে দিনই না বাবার বা হাতের কড়ে আঙ্গুল ধরে গ্রামের মেঠো বাট দিয়ে গ্রাম্য মেলায় প্রথম যাওয়া হয়েছিল। বাবার হাত ধরেই শত ভীড়ে রঙ্গিন পৃথিবী চিন্তামুক্তভাবে আবিষ্কার করা হয়েছিল, হারিয়ে যাওয়ার নেই কোন ভয়; বাবার আঙ্গুল যে আছে হাতের মুঠোয়। সবে মাত্র হাটতে শেখা সন্তান বাড়ির বাইরে প্রথম পা ফেলে বাবা হাত ধরে। বাইরে গিয়ে ছোট্ট অচেনা চোখে ঠেকেছে হাজার হাজার অচেনা-অজানা কত কি…। বাবা ওটা কি, ওটা কি বাবা? ওই যে ওইটা, দেখ দেখ বাবা, এই তো গেল! পৃথিবীর সব কিছুই বাবা আঙ্গুল উঁচু করে চিনিয়ে দেন। শুরু হয় সন্তানের অবিরল পথচলা। সন্তান যখন একটু ঠিকঠাকভাবে পথ চলতে শুরু করে তখন বাবারা চলে যান। আর ফেরেন না। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে বাবাদের যেন চুক্তি হয় চুপটি করে চলে যাওয়ার।  বাবা নেই। নেই শব্দটার সেঙ্গই বুক হু হু করে উঠে না ফেরার শত ক্রন্দন ধারা। বাবা এক চিরন্তন খুঁটি। সেই খুঁটি জীবনের, জীবনের খুঁটিটা হুট করে অদৃশ্য হয়ে গেল। আজ সেই খুঁটি নেই। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি। সব সময় মনে হয় এই তো এখনই প্রকাণ্ড এক ঝড় এসে আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু গেল ২৫ বছরের জীবনে অনেক ঝড় এলেও সে ঝড় আমাকে উড়িয়ে নিবে এ চিন্তা ঝড়ের কল্পনাতেও ছিল না। আজ সেই ঝড় রূপি বাস্তবতা আমাকে গো গ্রাসে গিলে ফেলতে চাচ্ছে। কত সাহস এই বাস্তবতার! সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই বাস্তবতা তার হিসাব নিতে ঠিকই আমার সমনে উপস্থিত হয়েছে। বাস্তবতা বলতে যে কোন বিষয় আছে তা বাবা থাকতে বিন্দুমাত্রও টের পাইনি। সাত ভাইয়ের ছোট, বাবার ছোট সন্তান হওয়ার কারণে ভালোবাসা ও অভিমান একটু বেশিই ছিল যেন। সেই অভিমান এখন আর হালে পানি পায় না, পাবেও না। মাত্র ৭ দিন পূর্বে রাত দশটায় টেলিভিশন স্টেশনের বার্তা কক্ষে ব্যস্ত সময় পার করছিলাম। ঠিক সে সময়ই বড় ভাইয়ের ফোন, ‘আব্বা বেশ অসুস্থ। আমরা হাসপাতালে, তুই অফিস থেকে বেরিয়ে চলে আয়।’ সেল ফোনটা কান থেকে টেবিলে রেখে দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনে এক নাগাড়ে তাকিয়ে কি যেন হাতরাচ্ছিলাম। কিসের যেন একটা প্রতিবেদন লিখছিলাম, তখনও শেষ হয়নি। উঠে দাঁড়ালাম। এর আগেও বেশ কয়েকবার অসুস্থ হলেও এই অসুস্থের খবরে হৃদয়টা কেন যেন কেঁপে উঠল। এরপর ফোনের পরে’ ফোন এলো। আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকায় অপর ভাইয়ের সঙ্গে মধ্যরাতে বাড়ির পথে। শ্বাস বন্ধ হয়ে দেহ থেকে প্রাণ চলেও যাওয়ার শেষ মুহূর্তে যেমন দেহ মৃদু কেঁপে উঠে তেমনি মন কেঁপে উঠল আমার। বাবা অসুস্থ কিন্তু সবার ব্যতি ব্যস্ততায় তো তা মনে হচ্ছে না। চোখ দিয়ে অজান্তেই বারিধারার নহর বইতে লাগল। পথি মধ্যে ভাই আস্তে করে জানালেন, বাবার চলে যাওয়ার কথা। কেউ থাকবে না। এ তো জানা কথা। কিন্তু সেই কেউয়ের ভিতরে কি বাবা আছেন? বাবা না থাকলে কি চলা যায়? বাবা ওই রাত থেকে আর নেই। প্রায় তিনশত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভোরের একটু পরে বাড়ি পৌঁছে দেখি বাবার নিজ হাতে সাজানো ঘরের সামনেটায় ডজন ডজন চেয়ারে চুপ করে বসে আছেন অনেক মানুষ। আমি কারও দিকে তাকাতে পারলাম না। সোজা চলে গেলাম শেষ কক্ষে মায়ের কাছে। এরপর হয় নিজেদের অবলম্বন হারানো মা-ছেলের দুঃখের মহামিলন। বাড়িতে যে কয়দিন ছিলাম, প্রতি রাতে পৌর কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করেছি তার সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু আমি কথা বললেও বাবার কবরটা ছিল একদমই নিরব। আমার বাবা আজ নেই। সব বাবার সঙ্গে সন্তানদের যেমন সুন্দর স্মৃতি থাকে আমার তেমনি অনেক স্মৃতি রয়েছে। বাবার কক্ষে বাবার পানদানি, টর্চ লাইট ও চশমাখানা পড়ে আছে নিরুত্তাপ। ওই বস্তুগুলোও যেন শোকের মাতমে দিশেহারা। আমি বাবার বিছানায় বসে আলমিরা ভরা বই হাতড়ে বাবার স্পর্শ খুঁজেছি। স্পর্শ পেয়েছি কিনা জানি না তবে বিশ্ছেদের কড়া কষ্টটাই অনুভূত হয়েছে। বাড়ির প্রতিটি কানাচে বাবার হাতের ছোঁয়া, নিরাপদ ও ভরসার। বাড়ির এমন কোন ধুলিকনা পেলাম না যেখানে বাবার পদস্পর্শ নেই। বাগানের গাছগুলো যেন আমার মতই চরম শোকে বিহ্বল। অভিভাবকত্ব হারিয়ে বিশাল আসমান উচ্চ আহাজারি করেই চলছে। প্রতি মধ্যরাতে  মাতমে চক্রাকারে গুঞ্জন করছে বৃক্ষরাজি। তারা তাদের যত্ন নেওয়ার মানুষটিকে হারিয়ে নিশ্চল হয়েছে। তারা জনমের মত হারিয়েছে তাদের ভরসা। বাবার শোক কাটিয়ে বাস্তবতার টানে জীবনের সন্ধানে চলবো ঠিকই কিন্তু শোকাতুর হৃদয়ের দাগ কখনও মুছে যাবে না। আগে কখনও বুঝিনি বাবা হারানো কত ব্যাথার। যাদের বাবা এখনও আছেন তারা এ ব্যাথা বুঝবেন না। ব্যাথা না থাকলে ব্যাথার স্বাদ কি বোঝা যায়? আর যাদের বাবা নেই তাদের যে শুধু বাবা নেই তা নয়, তাদের পৃথিবীর অবলম্বনটাই নেই। যুদ্ধে লড়াইরত সৈনিককে তলোয়ারের আঘাত থেকে ঢাল যেমন বাঁচিয়ে রাখে তমনি বাবা সব অপঘাত থেকে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন। ঢাল না থাকলে কি হতো তা সৈনিক কিছুটা বুঝতে পারেন হয়ত কিন্তু ঢাল না থাকার অভাব তাকে তদরুপ তাড়না দেয় না যদরুপ ঢালহীন সৈনিকের হয়। ঢালহীন সৈনিক বুঝতে পারে ঢাল তার জন্য কতটুকু জরুরি। তেমনি বাবা হারানো সন্তান বুঝতে পারে বাবা তার জীবনে কি ছিলেন? বাবার জন্যই সে কতটুকু সাহসী ও প্রাণচঞ্চল ছিল। চিরকাল কেউ থাকবে না সত্য। আমরা কেউ থাকব না। পিরোজপুরের কবি আহসান হাবিব সড়কের ৩৯৭নং বাড়িটা এখন বেশ খালি। বাড়ির স্তম্ভগুলো যেন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। আল্লাহ আমার বাবাকে সুখে ও শান্তিতে রাখুন। বাবাকে সম্মানের সহিত রাখুন। বাবা হারানো সন্তান আল্লাহর কাছে বাবার জন্য দোয়া করছে আজ।    এসএইচ/

বাবার ঋণ

ভালোবাসি কথাটা বাবাকে কখনও বলতে পারিনি। বাবারা মনে হয় বড্ড অভিমানি হয়। বাবা কখনও তার কষ্ট বা পরিশ্রমের কথা বলেন আমাদের। আমরা কখনও তা সেভাবে অনুভব করতে পারিনি বা করার চেষ্টা করিনি। যখন কারো বাবা থাকে না, তখন হয়তো বুঝতে পারে। যেমন এখন বুঝতে পারছি হারে হারে। বাবারা সন্তান পরিবার তথা আমাদের জন্য কত কিছু করে যায়। তাদের কাছে আমরা সব সময় ঋণী থাকি। তাই আজ বাবার অনুপস্থিতিতে শুধু এটাই বলবো, বাবা তোমার ঋণ কখনও শোধ করতে পারবো না। আমাদের ক্ষমা করে দিয়ো। এইতো দিন পনেরো আগের কথা। দুপুরে আব্বু খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরম। রোদের তেজ আর তেজ নেই, যেন জ্বলন্ত অগ্নিদাহ। ক্লান্ত আমি বাসায় ফিরলাম। আব্বু আমার রুমে। দুদিন ধরেই আব্বু আমার রুমে থাকেন। বাসায় মেহমান আসছে। আব্বুকে দেখেছি সব সময় আমাদের বাসায় মেহমান আসলে তিনি তার রুমটা ছেড়ে দিতেন। কখনোই বিরক্ত হতেন না। বরং মনের দিক থেকে ভীষণ উৎফুল্ল থাকতেন। কি করবেন না করবেন অস্থির হয়ে যেতেন। আমি আসতেই বাবা উঠে বসলেন, ওষুধের পাতাটা হাতে দিলাম। তখনো দেখলাম সুস্থ মানুষ। অসুস্থতার বিন্দুমাত্র ছাঁয়া পড়েনি। আমি নতুন একটা চাকরির সুয়োগ পেয়েছি। একটি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে। বাসার সবাইকে বললাম। কিন্তু আব্বুকে বলা হয়নি। ভেবেছিলাম চাকরির নিয়োগপত্রটা হাতে পেয়ে আব্বুকে বলব। আম্মুকে না করলাম আব্বুকে বলতে। ২২ এপ্রিল যেতে হতো। আমি তাড়াহুড়া করে তৈরি হচ্ছি। সময় খুব বেশি নেই। মনের মধ্যে আনন্দের দোল। আব্বু এসে সোফার রুমে বসলেন। আমার দিকে কয়েক নজর ফেলে আবার উঠে গেলেন। আব্বু-আম্মুকে ডেকে বললেন, আমার শরীর খারাপ লাগছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। হঠাৎই আম্মুর চিৎকার `ও নাজমুল আসনা তোর আব্বু যেন কেমন করছে`। তোর আব্বুকে ডক্টরের কাছে নিতে হবে। সবগুলোই ছিল আম্মুর কথা। মামা ভাত খাচ্ছেন। আমি গিয়ে দেখি আব্বুর শ্বাস উঠেছে। মারিয়া তড়িঘড়ি করে রিকসা ঠিক করতে নিচে গেছে। আব্বু নিশ্বাস নিচ্ছেন থেমে থেমে।  নিজ হাতে জামা পড়ালাম আব্বুকে। তখনো ভাবতে পারিনি এই রুমে আব্বু আর কখনও ফিরে আসবে না। আমি আব্বুকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি। নামার সময়ও কেমন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। হেটেই তো আব্বু নামলেন নিচে। একটা হাত ধরা ছিল আমার হাতে। তখনো বুঝিনি এই হাত ধরে এই প্রথম আর শেষ চলছেন আব্বু। ছোট বেলায় এই হাত ধরে আমি হাটতাম। আজ আব্বুকে নিয়ে হাটছি। এটাই ছিল ভিন্নতা। যেন আমার ছেলে আজ বাবা হয়ে ছেলের হাত ধরে চার তলা থেকে নিচে নামছে। নিচে নেমে দারওয়ানের চেয়ারে আব্বুকে বসালাম। মামা নিচে নামলেন। তারপর  নাম ধরে ডেকে ঘুম থেকে জাগানো মানুষটা আর মুখ খোলেনি। জীবনের সঙ্গে লড়াই করা মানুষটা নিস্তব্ধ হয়ে চলে গেলো না ফেরার দেশে।  আকাশের কান্নায় মেঘ নেমে আসে আর মানুষ কান্নায় বাতাসের শব্দ। শুধু আমার চোখের নোনাজল শুকিয়ে গেছে শোকের খড়ায়। কেলেন্ডারের পাতা সাক্ষী হয়ে থাকলো সেদিনের দিন। প্রকাশ্যে এসে গেল জীবনের সহজ কঠিন। ভাইবোন সব আমার ছোট। আমি পরিবারের বড় সন্তান বড়। বড়দের চোখে জল আসতে নেই। এতে বুক হাল্কা হয়ে যায়। আর যারা বড় তাদের হাল্কা হলে সমাজ চলবে না। তাদের হতে হবে ভারী। জীবন যুদ্ধের প্রথম ধাপ। টুকটাক সবাই নিজ ভাষায় সাহস দিয়ে যাচ্ছে। আর আমিও জানি আমাকেই করতে হবে সব। আমি ভেঙ্গে পড়লে চলবে না একদমই। বাবা মারা যাওয়ার পর সবার মতো আমরাও খুঁজতে থাকলে তার কি কি সম্পদ আছে তার সন্ধ্যানে। সেই সঙ্গে কত টাকা ঋণ রেখে গেছেন তাও জানার চেষ্টা করতে থাকি। চারদিকে খবর আসতে থাকলো অনেক টাকা ঋণ রেখে গেছেন আব্বু। সংখ্যাটা মনেই থাক। ভাবতে অবাক লাগে, এই টাকার হিসেব কোথাও লেখা পাইনি। শুধু একটা কথার উপর টাকাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ভাতিজা তোমার আব্বা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার কিছু লেনদেন ছিল। সবাই বাবার ঋণের খোঁজ দিলেও বাবা যে টাকা পান সেটা কেউ বলেনি। কিন্তু আমরা জানতাম বাবা ব্যবসা করেন এবং মানুষের কাছে অনেক টাকাও পান। জীবনে নতুন এক বাস্তবতার মুখে পড়ে গেলাম। বাবা কি সত্যি এতো টাকা ঋণী।  প্রশ্ন আছে উত্তর কোথাও নেই। দিনরাত এক করে পরিশ্রম করা মানুষটা এতো ঋণ কিভাবে রেখে যায়। প্রশ্ন আর প্রশ্ন। বাবার শোক মলিন প্রায় ঋণের শোকে। ছোট বেলা থেকে দেখতাম আব্বু সবার জন্য ভাবতেন। তার ভাবনায় কোন অলসতা ছিল না। আর স্বার্থ সেতো আব্বুকে কোনদিন ছুতেও পারেনি। নির্ভেজাল ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। কখনো বুঝিনি আব্বুর ভালোবাসা এতো গভীর ছিল। ভিতরটা কেমন খা খা করছে। শুধু বাবাকেই মনে পড়ছে। অবশেষ ঠিক করতে হল বাবার ঋণ।  বাবার ঋণ কে ই বেছে নিতো হল আমাকে। স্বপ্নের চাকরি সে না হয় অন্যদিন করবো। কিন্তু চাকরি টা এখন আর স্বপ্ন নেই, চাকরিটা এখন প্রয়োজন। সংসার বাঁচাতে হবে। আয়ের উৎস আজ আমি-ই। বাবাকে কখনো সুখের হাসি দিতে দেখিনি। বরং রাত জেগে কান্না ভেজা হাত তুলতেন আল্লাহর কাছে। প্রায়শই বাবার কান্নায় চোখ খুলতো আমার। আর বাবার রেখে যাওয়া ঋণ শোধ করা আমাদের কর্তব্য। তবে, তার কাছে আমরা সারাজীবন ঋণী থাকবো। কখনও বাবাদের ঋণ শোধ করা যায় না। তার আর্থিক ঋণটা হয়তো শোধ করা যায় কিন্তু বাবার ছায়ার ঋণটা শোধ করা যায় না।  এসএইচ/

‘আমার বয়স কত কইতে পারি না’

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ছেলে রুহুল আমিন। বয়স ১২ থেকে ১৩ হবে। এখনই তার উপর চেপে বসেছে সংসারের বোঝা। কারণ পরিবারে চার ভাই বোন, অভাব অনটনের সংসার। বাবার একার আয়ে চলতো সংসার। এরই মধ্যে হঠাৎ মায়ের মৃত্যু। জীবনের এই কঠিন সময়ে রুহুল আমিন চলে আসে ঢাকায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যাবসা। ব্যাবসাটা এমন, আজ এখানে তো কাল ওখানে। কারণ রাস্তার পাশে ফুটপাতের ব্যাবসা ক্ষণস্থায়ী। বিমানবন্দর এলাকার আশকোনায় রাস্তার পাশে ছোট্ট চকির উপর দোকান তাদের। যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী- আয়না, সুই, চিরুনীসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে সে। ঢাকায় এসেই বাবার এই ছোট্ট ব্যাবসায় সহযোগীতা করছে সে। ঠিক যে বয়সে স্কুলের বারান্দায় থাকার কথা ছিল, তখন সে বাবার সঙ্গে কর্মজীবনে ঢুকে পড়েছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে এখন সে কর্মজীবী শিশু। কেনো স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছে? জানাতে চাইলে সে জানায়, ‘তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে সে। তারপর পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়। কারণ তার বাবার সেই সামর্থ নেই পড়াশুনা করানোর। এ জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় অনেক আগেই। চার ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট সে। বাবার সঙ্গেই থাকে। অন্য ভাই বোনের মধ্যে বড় ভাই ট্রাকের ড্রাইভার। সে তার মতো আলাদা থাকে। একটা বোনের বিয়ে হয়েছে। অন্য বোনের এখনো বিয়ে হয়নি।’ ব্যবসা যদি ভালো হয় তবে দোকানে দৈনিক বিক্রি হয় এক হাজার টাকার মত। যাতে আয় হয় এক থেকে দেড়শ’ টাকা। আর তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। রুহুল যখন কথা বলছিলো, মাথার উপর তখন সূর্যের উত্তাপ। রোদের কারণে ঘামছিলো সে। ঘাম মুছতে মুছতে সে জানালো,‘মানুষ বেশিরভাগ এসে দেখে চলে যায়। কেনে খুব কম।’ রোদ বৃষ্টি উপেক্ষ করে ফুটপাতে বসে থাকতে কষ্ট হয় না? এমন কথার জবাব চুপ থাকে সে। তারপর লাজুক লাজুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলে- ‘কষ্ট তো হয়ই। কষ্ট না করলে চলবে কি করে!’ আনুমানিক ১২-১৩ বছর হবে রুহুল আমিনের। কিন্তু সে নিজেই জানেনা তার বয়স কত। বয়সের কথা জিজ্ঞাস করলে সে বলে- ‘আমার বয়স কত তা কইতে পারিনা’। নিজের বয়স না জানলেও টাকা রোজগার করে নিজের পেট চালাতে হবে, এটা সে ভালো ভাবেই রপ্ত করেছে। তাই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পথচারী মানেুষের দিকে চেয়ে থাকে সে, এই বুঝি কোউ একটা কিছু কিনে নিলো, সেই আশায়!’ এই শহরে এমন করে কত দিন! এখানে টিকে থাকা তো অনেক কঠিন! এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, ‘হ হেইডা তো জানি। কিন্তু কি করুম কন?’ ভবিষৎতে কি করতে চায় এমন প্রশ্নে সে বলে, ‘কি হবে তা তো জানিনা, আল্লাহ কপালে যা রাখছে তাই হবে। তবে ইচ্ছে আছে বাপের লগে থাইকা কিছু একটা করার।’ এসএ/        

জীবনে প্রতিটি প্রতিকূলতাই একেকটি সুযোগ

আদিব হাসান। পেশায় একজন চিকিৎসক। ২০১০ সালে দুপায়ে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তার। ফলে হুইল চেয়ারে প্রতিনিয়ত নিত্যসঙ্গী হয়। শরীরে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হলো অসহনীয় ব্যথা। বিভিন্ন ওষুধেও যখন কাজ হচ্ছিল না, ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্যে তখন তার শরীরে ব্যথানাশক একটি পাম্প বসিয়ে দিলেন চিকিৎসকরা। সাজানো জীবন থেকে হঠাৎ এই ছন্দপতনে তিনি থেমে যাননি। চিকিৎসক স্ত্রী নাফিসা আক্তার ও পরিবারের উৎসাহে শুরু করেছেন নতুন করে পথচলা। দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে যুদ্ধ করে আদিব হাসান শুধু জয়ী-ই হননি, এখন তিনি পুরোদস্তুর কাজ করছেন চিকিৎসক হিসেবে, সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অসুস্থ মানুষদের। গত ৪ মে অনুষ্ঠিত কোয়ান্টাম মেথডের ৮৭তম পর্বের মুক্ত আলোচনায় অতিথি ছিলেন এই চিকিৎসক দম্পতি। নিজেদের সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে ডা. আদিব হাসান ও ডা. নাফিসা আক্তার বলেন, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা শক্তি রয়েছে। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়। জীবনের অংশ হিসেবেই থাকে ভোগান্তি। তখন ভেতরের সেই শক্তি আমাদের সাহায্য করে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে। আমাদের তখন মনে হয়, জীবনে প্রতিটি প্রতিকূলতাই একেকটি সুযোগ। আমরা বিশ্বাস করি, স্রষ্টার রয়েছে এক মহাপরিকল্পনা। আমরা স্রষ্টার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখি যে, স্রষ্টা তার পছন্দনীয় মানুষদের জীবনে প্রতিকূলতা দেন। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমরা আরও যোগ্য হয়ে উঠি। তাই জীবন আসলে স্রষ্টার পক্ষ থেকে একটি সুন্দর উপহার। খোলামেলা আলাপচারিতার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এবারের পর্বটি সঞ্চালনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজের প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ। চিকিৎসক দম্পতি আরও বলেন, আমাদের সুযোগ হয়েছে রোগী এবং চিকিৎসক দুদিক থেকেই জীবনটাকে দেখার। আমরা মনে করি, জীবনটা আরও সুন্দর হতে পারে যদি আমরা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করি এবং যদি একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। সমাজে আমরা যারা সুস্থ আছি, তাদের সহযোগিতা ও সমানুভূতিশীল আচরণ অসুস্থদের জীবনকে আরও সহজ করতে পারে। যেমন-আমরা রাস্তা বানানোর সময় সেই ব্যবস্থা রাখতে পারি, যাতে হুইল চেয়ারে একজন রাস্তা পার হতে পারেন। বাড়ি বানানোর সময় খেয়াল রাখতে পারি, একজন অসুস্থ ব্যক্তিও যেন নিজেই হুইল চেয়ারের সাহায্যে টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন। একটা রেস্টুরেন্টে এমন ব্যবস্থা রাখতে পারি, যেন হুইল চেয়ারে চলাচল করেন এমন একজন স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারেন। তারা আরও বলেন,পৃথিবীতে সমস্যা আছে, ভোগান্তি আছে, নিষ্ঠুরতা আছে, কিন্তু ভালোবাসার পরিমানটাই বেশি। আজ আমরা যেভাবে স্থিতিশীল ও কর্মময় একটা জীবনযাপন করছি, তাও সম্ভব হয়েছে পরিবার-পরিজন ও কাছের মানুষগুলোর অকৃত্রিম ভালবাসা ও সহযোগিতার কারণেই। আই/কেআই    

ডিগ্রি পাস করে ফুটপাতে বই বিক্রি করেন মধুমণ্ডল

পড়ালেখা শেষ করে যুবকরা যখন সার্টিফিকেট নিয়ে বিভিন্ন অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেকে বেছে নিচ্ছে নানা অপরাধমূলক কাজ, ঠিক তখনই মধুমণ্ডল নামে এক যুবক স্থাপন করেছেন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। ডিগ্রি পাস করে তিনি ফুটপাতে বসে বই বিক্রি করছেন। পাশাপাশি নিজে বই পড়েন অন্যকে বই পাঠে উৎসাহিত করেন। রাজধানীর শাহবাগের মোড় থেকে টিএসসি`র দিকে যেতে ঠিক কবি নজরুলের মাজারের সামনে চোখে পড়বে ফুটপাতে ভ্যানের উপর একটি বইয়ের দোকান। কম্পিউটার কম্পোজ কাগজে লেখা `বইপোকা`। যা লেমেনেটিং করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ভ্যানের উপর। দোকানটির মালিক মধুমণ্ডল। মুখ ভর্তি দাড়ি গোফের এই যুবক ২০১৩ সাল থেকে এখানে বই বিক্রী করছেন। ভ্যান ভর্তি নানা রকম বই। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, জীবনী- সব ধরনের বই পাওয়া যায় মধুমণ্ডলের এই ভ্যানে। ক্রেতাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। আসা যাওয়ার পথে অনেকেই কয়েক মিনিটের জন্য হলেও `বইপোকা` নামক এই দোকানটির সামনে দাঁড়ায়। নেড়ে চেড়ে বই দেখে। পছন্দ ও সামর্থ্য মিলে গেলে বই কেনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক, ছাত্রনেতা, প্রক্টরিয়াল বডির অনেকে মধুমণ্ডলকে নামেই চেনেন। এভাবেই বইপোকা`র কর্ণধার মধুমণ্ডল এখন দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন অলিখিত সদস্য। পৃথিবী যদি একটি বড় পাঠশালা হয় প্রতিটি মানুষ এক একটি বই। বা প্রতিটা জীবনই এক একটা পান্ডুলিপি। জীবনের প্রতিটা দিন সেই পান্ডুলিপির এক একটা পৃষ্ঠা। মধুমণ্ডল- এর জীবন ও এর ব্যতিক্রম নয়। জীবনে চলার পথে নানা সংগ্রাম ও লড়াই মধুমণ্ডলকে এনে দাঁড় করিয়েছে ফুটপাতে বই বিক্রীর জীবনে। অনেকের চোখে মধুমণ্ডল এখন উদাহরণ হলেও তার গ্রামের মানুষের চোখে সে সফল হতে না পারা এক যুবক। মধুমণ্ডলের গ্রামের বাড়ী চুয়াডাঙ্গার সদাবরী গ্রামে। তারা বাবা সিরাজমণ্ডল ছিলেন যাত্রাশিল্পী। এখন যাত্রার সেই সুদিন নেই। ফলে সিরাজ মণ্ডলদেরও নেই কদর। কৃষিকাজ করে কোন রকমে জীবন যাপন করেন তিনি। মধুমণ্ডল গ্রামের ওদূদ শাহ ডিগ্রী কলেজ থেকে ডিগ্রী পাস করেন। এরপর ঢাকায় আসেন আইন পড়ার জন্য। মধুমণ্ডলের ভাষায়, "ছোট বেলা থেকেই আমি স্বাধীনচেতা মানুষ। নিজে কিছু করার স্বপ্ন ছিল"। সেই স্বপ্ন থেকে ২০০৭ সালে ঢাকায় আসেন মধুমণ্ডল। ধানমন্ডি ল` কলেজে ভর্তি হন। একটি ছোট বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। মাস তিনেক কাজ করার পর সেই প্রতিষ্ঠান প্রধান তার (মধুমণ্ডল) সঙ্গে অসদাচরণ করলে মধুমণ্ডল রাগারাগি করে চাকরি ছেড়ে দেন। সবে ধন নীলমণি চাকরিটা হারানোর পর অন্য কেউ হলে হয়তো ভেঙ্গে পড়ত। কিন্তু মধুমণ্ডলের ধাঁচটা ভিন্ন। তিনি ঢাকার অলি গলি ফুটপাতে ঘুরেন আর ভাবেন। ভাবেন আর ঘোরেন। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপ করতে গিয়ে মধুমণ্ডল বলেন, একদিন ঘুরতে ঘুরতে আমি এখানে (কবি নজরুলের মাজারের সামনে) এসে দেখি একজন ফুটপাতে বই বিছিয়ে বই বিক্রী করছেন। পরিচয় হলো। জানলাম তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বঙ্গবন্ধু হলে থাকেন। তার সাথে আলাপ করে কিছু বই নিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে বিক্রী শুরু করি। বেশির ভাগ বইয়ের দাম তখন দশ টাকা বিশ টাকা। দিন শেষে হিসাব করে দেখতাম, আমার একশ-দেড়শ টাকা লাভ হতো। এর মধ্যে আইন (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে দেখি আমি ফেল করেছি। দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে দেখা যায়, নানা বয়সি মানুষ বই কিনতে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী শ্রাবনী দত্ত একটি বই কিনলেন। বইটির নাম `যে গল্পের শেষ নেই`। লেখক দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। মধুমণ্ডল জানালেন সরাসরি প্রকাশকের কাছ থেকে বই কিনেন তিনি। বিক্রী করেন ২৫% ছাড়ে। কখনো কখনো ৫০% ছাড় দিয়ে থাকেন। অতীত হাতড়ে মধুমণ্ডল বলেন, আইনে ফেল করার পর আমি গ্রামে ফিরে যাই। ছোটবেলা থেকেই বইপোকা ছিলাম। সেখানে একটি স্কুল সংলগ্ন কক্ষ নিয়ে শিশু কিশোরদের বই দিয়ে একটি ছোট খাট লাইব্রেরী শুরু করি। সেখানে ছেলে মেয়েরা এসে বই পড়তে পারত। আবার ইচ্ছে করলে কেউ বই কিনতেও পারত। ইতোমধ্যে গ্রামে জানাজানি হয়ে যায় আমি আইনে পাস করতে পারিনি। সেটা নিয়ে পরিবারে শুরু হয় অশান্তি। বাবা মায়ের বড় ছেলে। সবার স্বপ্ন ছিল আমি আইনজীবী হব। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন পূরণ করতে না পারায় পরিবারেও আমাকে নিয়ে অশান্তি দেখা দেয়। ছোট ভাই বোনরাও নানা কথা শোনায়। এরপর মধুমণ্ডল ২০১৩ সালে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে শাহবাগে বসেছে গণজাগরন মঞ্চ। উত্তাল ঢাকা। সেই উত্তালময় পরিস্থিতিতে মধুমণ্ডল ভ্যানে বই নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রী শুরু করেন। ভাল বিক্রী হয়। লাভও ভাল। থাকার জায়গা ছিলনা। রাতে কবি নজরুলের মাজারের ভেতর একটি কক্ষে থাকেন (এখন অবশ্য সেই সুযোগ নেই)। ভ্যানটি তাকে কিনে দিয়েছিলেন তার এক বড় ভাই রিপন। যাকে দেখে মধুমণ্ডল বই বিক্রীতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মধুমণ্ডল এখনো বই বিক্রী করে যাচ্ছেন। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও আশে পাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে বই বিক্রী করতেন। গত কয়েকবছর তিনি থিতু হয়েছেন সেই পুরনো জায়গায়। কবি নজরুলের মাজারের সামনে। নিজে যতো বই বিক্রী করেন তার চেয়ে বেশি বই মধুমণ্ডল পড়েন। আলাপকালে মধুমণ্ডল বলেন, বই বিক্রীর আগে আমি নিজে সেই বইটি পড়ি। এতে দুইটি লাভ। আমার নিজের পড়া হয়। দ্বিতীয়ত পাঠকরা যখন সেই বই সম্পর্কে জানতে চায় তাদেরকে বিস্তারিত বলতে পারি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে মধুমণ্ডল বলেন, আমি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করছি। এটা বড় আত্মতৃপ্তির। চাকরি করলে সে তৃপ্তি পেতাম না। তবে খারাপ লাগে তখন যখন দেখি আমি বই বিক্রী করি এটা নিয়ে আমার পরিবার আত্মীয় স্বজন সবাই বিরক্ত। ফুটপাতে বই বিক্রী করি, তাই তারা অনেক সময় আমার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। তাদের ধারণা, আমি ডিগ্রী পাস করেছি এটা অর্থহীন। আমার সার্টিফিকেট নাকি কোন কাজে লাগেনি। আমি বই বিক্রী করে আনন্দ পাই। এই আনন্দের কী কোন মূল্য নেই? সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। টিএসসি থেকে শাহবাগের মোড়- তরুণ তরুণীদের ভীড় বাড়ছে। মধুমণ্ডলের ছোট `বইপোকা` দোকানটিতে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মধুমণ্ডলের চোখে মুখে যে আত্মতৃপ্তি দেখা যায়- তা কী সে চাকরি করলে পেত? আআ/এসি  

সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চায় বেদে সম্প্রদায়

যাযাবর বেদে জীবন, নদীর কোল ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন আর ছেঁড়া কাপড়ের তাঁবু বানিয়ে যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে অভ্যস্থ বেদে সম্প্রদায়রা। বেদে সম্প্রদায় বলে আমরাও সবাই মুসলমান, সাধারণ মানুষরা আমাদের খোটা দেয়। তাই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়। এ বিষয়ে মাওনা পেয়ার আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল খায়ের ও আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে তাদের বাচ্চাদের লেখাপড়া শিক্ষিত করতে হলে, তাদের এ পেশা অবশ্যই ছাড়তে হবে। মানবিক দিক বিবেচনায় রেখে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। এই সম্প্রদায়ের লোকেরা জীবিকার তাগিদে বছরের অর্ধেক সময়ই নৌকা নিয়ে ছুটে বেড়ায় দেশের নানা প্রাণন্তে। সাপ খেলা ও তাবিজ বিক্রিই তাদের আয়ের উৎস। এ আয় দিয়ে সংসার চালাতে হয় তাদের।  ৩০ মার্চ শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,কাওরাইদ কালীবাড়ি এলাকায় সুতিয়া নদীর পার ঘেঁষে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পলিথিন ও ছেড়া কাপর দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রতিটি ঝুপড়ি ঘরে রয়েছে সোলার আর টিভির ব্যবস্থা। বাপ-দাদার পুরোনো পেশাটি তারা আঁকড়ে ধরে আছেন যুগ যুগ ধরে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এ পেশা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। বেদে সরদার আসকর আলী বলেন, আয়ের প্রধান উৎস গাছ গাছালির তাবিজ বিক্রি, সাপ ধরা ও সাপের খেলা দেখানো। ছয় মাসের জন্য আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। এই ছয় মাস প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে সর্দার হিসেবে আমাকে প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর এক দিনের আয় আনুমানিক ৭-৮ হাজার টাকা দিতে হয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্য আমরাও আর এ পেশায় থাকতে চাই না। শুধুমাত্র বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের দলের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য ইচ্ছা হয়। বেদে আল-আমিন বলেন, আমাদের এ পেশা থাকতে আর ভালো লাগে না। বেদে সম্প্রদায় বলে সাধারণ মানুষরা আমাদের খোটা দেয়। আমরা সবাই মুসলমান। তাই এ পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাই।  বেদেরা এখন সড়ক পথে এসে পথ থেকে প্রান্তরে জনগুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজারের সংলগ্নে ছোট-ছোট ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে। সাপ খেলার পাশাপাশি বেদেনীরা তাবিজ-কবজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গাঁয়ের মেঠো পথে। তবে দিন দিন এ বেদে স¤প্রদায়ের সাপ ধরার নেশা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নানা পণ্য এখন তাদের হাতে উঠেছে। বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামেই আজ তাদের ভিন্ন পথে চলা। তারপরও যারা এ পেশাকে আগলে রেখেছে তাদের জীবন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বেদেরা আরও বলেন,আগের মতো এখন আর নদী নেই, নদীতে পানি নেই, বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য এসে নদীর পানি নষ্ট ও দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব পানি দিয়েই আমরা গোসলসহ সকল প্রকার কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারণ আমরা যাযাবর, সরকার আসে সরকার যায়, আমাদের মিলছে না কোনো ঠিকানা। আজ এখানে, কাল ওখানে, এভাবেই চলছে আমাদের জীবন। প্রতিটি বেদে বহর এক একটি রাজ্যের মতো কল্পনা করে এরা। সর্দার এদের রাজা। তার নিয়ন্ত্রণে চলতে হয় বহরের সবাইকে। বেদে বহরের মেয়েরাই আয়ের জন্য দল বেঁধে বের হয়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ায়। পাড়া মহল্লা ঘুরে মানুষের নানা কথা শুনে সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসে। পুরুষরা সারাদিন বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। অভাব অনটনের কারণে পুরুষরাও ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে, কেউ দিচ্ছে বিভিন্ন রোগের ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজ। শাড়ি, চুড়িসহ বিক্রি করছে নানা প্রসাধনী। কেউ কেউ ভানুমতি খেলা ও জাদুমন্ত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে। নানা সমস্যা-সঙ্কট এদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। এরা কয়েক’শ বছরের পুরনো পেশা হলেও এদের নেই কোনো প্রকার নাগরিক অধিকার। নেহাত কচুরিপানা কিংবা নদীর জলে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতোই আজীবন নদীর পানিতে ভেসে বেড়ায়। এ সম্প্রদায়ের নাম স্বাক্ষর করতে পারে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এবং ভূমি সমস্যায় এ সম্প্রদায়ের মানুষের মানবতার জীবন যাপনে বাধ্য। এ সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যু হলে আগেকার দিনে কলা গাছের ভেলায় লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো। আজকের দিনেও নদীর পাড়ে বা কোনো ভূ-স্বামীর পরিত্যক্ত ভিটের দানকৃত ভূমিতে ঠাঁই মিলে তাদের লাশের। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা আকতার বলেন, বর্তমান সরকার, পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠির জন্য কাজ করছে। ঠিকানাবিহীন এই যাযাবর বেদে সম্প্রদায়রা নিজ ভূমে বাস করেও পরবাসী। সাপ নিয়ে খেলা, সাপ নিয়েই তাদের বসবাস। এক সময় নৌকা নিয়ে নৌপথে চলাচল করত। এখন নৌপথে বাধ, সুইসগেটের কারণে নৌকা নিয়ে চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। কেআই/  

দোসা বিক্রি করে মেয়েকে বিবিএ পড়াচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম   

রাজধানী মোহাম্মদপুরের রিং রোডের টোকিও স্কয়ার একটি ব্যস্ততম এলাকা। সবসময় সেখানে জটলা লেগেই থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে এখানে তরুণ তরুনীদের ভীড় বেড়ে যায়। এই জটলার কারণ অনুসন্ধানে উঁকি মারলেই চোখে পরবে পরপর কয়েকটি দোসা`র দোকান। দোকানগুলো ঘিরে রাখা বেঞ্চগুলোতে ক্রেতারা খাচ্ছে। কেউ কেউ খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে।          মাঝখানের দোকানটিতে একটু বেশী ভিড়। বিক্রেতার মাথায় টুপি। হাত দুটি গরম কড়াইয়ের উপর অনবরত কাজ করছে। নন-স্টিক পাত্রে তেল ব্রাশ করে হাল্কা আঁচে গরম করা হচ্ছে। তেল গরম হয়ে গেলে পাত্রে এক টেবিল চামচ দোসা তৈরির মিশ্রণ ঢালছেন জাহাঙ্গীর আলম। পাত্রের চারদিকে চামচ দিয়ে পাতলা ও গোল করে ছড়িয়ে দিচ্ছে। দোসার নিচের অংশ হালকা বাদামী হয়ে ধারগুলো উঠলে খুব সাবধানে তুলে নিচ্ছে দোসা। দোসা তোলার সময় গোল করে মুড়িয়ে নিচ্ছে। প্রতিবার পাত্রে দোসার মিশ্রণ দেয়ার আগে পাত্রটি কাপড় দিয়ে মুছে তেল ব্রাশ করে নিচ্ছে। প্রস্তুত হওয়া দোসা প্লেটে করে ডাল ভুনা, সবজি, তেতুল বা জলপাইয়ের চাটনি, নারকেল মিষ্টি চাটনি, আমের আচার বা দই দিয়ে পরিবেশন করছেন জাহাঙ্গীর আলম ও তার ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া ছেলে। রাজধানী ঢাকার ফুটপাতের খাবারের দোকানে নিয়মিত ক্রেতা পাওয়া কঠিন। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলমের দোকানে সন্ধ্যায় এমন কিছু ক্রেতা আছেন যারা প্রায়ই আসেন।   এই দোসা বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলমের গ্রামের বাড়ী চাঁদপুর। অভাবের সংসারে বাবার লড়াই দেখতে দেখতে এক সময় চলে আসেন ঢাকায়। উদ্দেশ্য ছিল বাবা মাকে সাহায্য করা। এই ঢাকায় প্রথম জীবনে অনেক ধরনের কাজ করতে হয়েছে তাকে। কখনো হোটেলের কর্মচারী, কখনো অফিসের পিয়ন, কখনো ফুটপাতে তরকারি বিক্রি এবং ফুটপাতে চা বিক্রিও করেছেন তিনি। হঠাৎ একদিন পরিচয় হয় জহিরুল হক নামে এক বাবুর্চির সঙ্গে। জাহাঙ্গীর আলমের ভাষায় কারীগর। এই কারীগরের কাছে থেকে পান তিনি দোসা তৈরীর বিদ্যা। দোসা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দোসা দক্ষিন ভারতের খাবার। এদেশে বড় বড় শপিংমলে পাওয়া যায়। বড় লোকেরা অনেক টাকা খরচ করে খায়। আমি গরীবের দোকানদার। আমার এখানে কম দামে দোসা পাওয়া যায়। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি তিন ধরনের দোসা বিক্রি করি। মাসালা দোসা, এগ দোসা ও চিকেন দোসা। মাসালা দোসা পঞ্চাশ টাকা, এগ দোসা সত্তর টাকা, চিকেন দোসা নব্বই টাকা। তবে মাসালা দোসা বেশি বিক্রী হয়। দোসা কীভাবে তৈরী করেন জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি আর কী বানাই! আসল দোসা বানাতো আমার গুরু জহিরুল হক। তার হাতের দোসা যে একবার খেয়েছে তার মুখে লেগে আছে সারাজীবন। সেদ্ধ করা পোলাওয়ের চাল, কলাইয়ের ডাল, খাবার সোডা, লবণ, চিনি ইত্যাদি কোনটা কী পরিমাণে দিতে হবে তা বুঝতে হবে। জাহাঙ্গীর আলম মুচকী হেসে বলেন, খাবারের স্বাদ নির্ভর করে উপাদানের অনুপাতের উপর। অনুপাত কম বেশি হলে শেষ! জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর আদাবরে তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে থাকেন তিনি। বড় মেয়ে লালমাটিয়া কলেজে বিবিএ পড়ছে। ছেলে রিফাত ক্লাস সেভেনের ছাত্র। সবচেয়ে ছোট ছেলেটি ক্লাস থ্রিতে পড়ে। বাসা ভাড়া দেন নয় হাজার টাকা। বাড়ীতে নিয়মিত বাবা মাকে টাকা পাঠাতে হয় তাকে। ছোট দুই ভাইকে দোসা বিক্রির টাকা দিয়ে পাঠিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। দুটি বোন বিয়ে দিয়েছেন তাও দোসা বিক্রির টাকায়। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার বাবা গরীব ছিলেন। তাই আমরা পড়াশুনা করতে পারিনি। আমি চাই আমার সন্তানেরা পড়াশুনা শিখে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচুক। তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায় মানুষের অবমূল্যায়ন দেখে। কেউ কেউ খুব তাচ্ছিল্য করে কারণ আমার পড়াশুনা নাই। কোন কোন ক্রেতাও মাঝে মাঝে অপমান করে কথা বলে। মন খারাপ হলেও হজম করে যাই। আমার সন্তানেরা মানুষ হলে আমিও বুক ফুলিয়ে চলতে পারবো। এসি        

শাহনাজের বাইক উদ্ধার, চোর আটক

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা আলোচিত শাহনাজ আক্তারের চুরি হওয়া মোটরবাইকটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। রাজধানী থেকে ছিনতাইয়ের মাত্র ১৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাইকটি নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার হয়। বুধবার ভোর ৫টায় নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে বাইকটি উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় জনি নামে (২৭) একজনকে আটক করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বলেছেন, আমরা তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় জনির অবস্থান সম্পর্কে জনতে পারি। সে মঙ্গলবার বিকেলেই বাইকটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ চলে যায়। আটক জনি নিজেকে পাঠাও রাইডার দাবি করলেও পাঠাও কর্তৃপক্ষের কাছে জনির কোনও তথ্য ছিল না। তার মোবাইল ট্র্যাক করে ও অন্যান্য তল্লাশি নজরদারি বাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে বাইকটি উদ্ধার ও জনিকে আটক করা হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় প্রতারণার মাধ্যমে বাইকটি চুরি করে নিয়ে যান ওই যুবক। এ ঘটনায় শাহনাজ আক্তার শেরেবাংলা নগর থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জনি নামে ওই যুবক শাহনাজের অল্প দিনের পরিচিত। শাহনাজকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মঙ্গলবার তার সঙ্গে দেখা করেন ওই যুবক। দুপুরে খামারবাড়ি এলাকায় শাহনাজ মোটরবাইকের পাশে ছিলেন, আর ওই যুবক শাহনাজের মোটরবাইকের ওঠে কথা বলছিলেন। রনি শাহনাজকে বাইক চালানোর বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। বাইক চালিয়ে দেখতে চায়। শাহনাজ তাকে বাইকটির চাবি দিলে জনি বাইকটি নিয়ে চলে যায় যায়। এরপর তার কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত, এক মাস ধরে মোবাইল উবারের মাধ্যমে মোটরবাইক চালাচ্ছেন শাহনাজ আক্তার। নারী হয়ে পুরুষদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে রাইড দেওয়ায় সম্প্রতি ফেসবুক ও বিভিন্ন পত্রিকায় ইতিবাচক প্রতিবেদন হয় তাকে নিয়ে। একে//

পতাকা বিক্রির মধ্যে আনন্দ খুঁজে পান ইকবাল

বাবা মারা গেছেন ছোট বেলায়। মা কাজ করতেন মানুষের বাড়ীতে। তিন বোন ও দুই বোনের সংসার। এর মধ্যে ইকবাল শেখ সবার ছোট। বাবার মৃত্যুর পর ভাতের জন্য লড়াই পরিবারের সদস্যদের দিশেহারা করে দিয়েছে। প্রতিদিন পানিতে ভাত মেখে লবন মিশিয়ে খেতে দিতেন মা। খেতে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু উপায় নেই। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, মাকে কখনো কষ্ট দিবেন না ইকবাল। আর তাই ঠিক যখন বই-খাতা নিয়ে ইকবালের স্কুলে যাওয়ার কথা, তখনই শুরু হলো বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। যখন যা পেয়েছেন তাই করেছেন। হেটে হেটে চা বিক্রী করা, হোটেলে কাজ করা, ভ্যানগাড়ীতে খেলনা বিক্রী করা সহ অনেক পেশা বদল করেছেন ইকবাল। তবে যখনই ডিসেম্বর মাস আসে ইকবাল হাতে তুলে নেয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। উদ্দেশ্য একটাই। মাকে ভালোবেসে, দেশ প্রেমবোধ থেকে পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দেওয়া। সারাদিন পতাকা বিক্রি করে দৈনিক যা আয় হয় তা নিয়ে তুলে দেন মায়ের হাতে।ইকবাল শেখ আজ সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পতাকা বিক্রি করছিলো। কথা হয় তার সঙ্গে। গায়ে পুরানো সাদা র্শাট। কুচকানো প্যান্ট। শরীরে অযত্নের ছাপ হলেও চেহারায় একটা মায়া ও আত্মবিশ্বাস ফুটে আছে।কথা বলতে বলতে পতাকা বিক্রি করেছিলেন। ইকবাল শেখের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায়। মা ভাই বোনেরা গ্রামে থাকেন। ছোট বোনদের বিয়ে দিতে হবে। দুই ভাই পড়ে স্কুলে। মাথার উপর অনেক দায়িত্ব। ইকবাল থাকেন গাজীপুর। সকালে পান্তা ভাত খেয়ে ঢাকায় চলে আসেন। গভীর রাতে আবার ফিরে যান গাজীপুর। সারাদিনে কয়টা পতাকা বিক্রী হয় জানতে চাইলে ইকবাল জানান, ঠিক নেই। তবে এবার অন্য বছরের তুলনায় কম মনে হচ্ছে। বড় পতাকা কিনেন সত্তর আশি টাকায়, বিক্রি করেন দেড়শ টাকা। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে একশ টাকা। হাত পতাকা দশ টাকা করে বিক্রি করছেন। এছাড়া বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত ব্যাজ বিক্রি করছেন দশ টাকা করে। ছোট বাচ্চরা এমন ব্যাজ বেশী কিনে। ইকবাল ধারনা করছেন আগামী কয়েকদিন পতাকা ভালো বিক্রি হবে। পতাকা বিক্রির টাকা নিয়ে ফিরে যাবেন গ্রামে। দেশ সম্পর্কে ইকবালের জানা শোনা কতটুকু সেই কৌতুহল থেকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়- ডিসেম্বর মাসে কী হয়েছিল? স্বাভাবিক ভঙ্গীতে তার উত্তর, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছিল।’ ইকবাল শেখ লজ্জিত মুখে জানায়, তার বাবা বঙ্গবন্ধুকে খুব ভালোবাসত। তাই ছেলের নামে যোগ করে দিয়েছেন শেখ। এটা নিয়ে অনেকে তখন হাসাহাসি করত। তবে ইকবাল শেখ এটা নিয়ে গর্ব করে।ইকবাল শেখের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভোট কাকে দিবে? এতোক্ষণের লাজুক ছেলেটি এবার পাল্টে গেল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘নৌকায়’। প্রতিবেদককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইকবাল শেখ জানায়, আমাদের এলাকায় এবার অনেক কাজ হয়েছে। নৌকায় ভোট দিলে আরও অনেক কাজ হবে।  আর কয়েকদিন পর মহান বিজয় দিবস। এ দিনে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় লাভ করেছিল। কিন্তু এখনো ইকবাল শেখরা যুদ্ধ করছে মায়ের মুখে, পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে। এ যুদ্ধে বিজয় লাভ করতেই হবে। আ আ//    

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি