ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:২৬:১১, বৃহস্পতিবার

কানাডায় স্কলারশিপের সুবিধা নিয়ে পড়তে চাইলে

কানাডায় স্কলারশিপের সুবিধা নিয়ে পড়তে চাইলে

বাংলাদেশি অনেক শিক্ষার্থী কানাডায় পড়াশোনা করতে আগ্রহী। এইচএসসি ও অনার্স পাস করেই অনেক শিক্ষার্থী কানাডার বিভিন্ন কলেজগুলোতে আবেদন করে থাকেন। গত আট/১০ বছর ধরে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা কানাডার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পাড়ি জমাচ্ছে। তবে বৈচিত্র্যপর্ণ আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের প্রথমে কানাডার আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নিতে একটু অসুবিধা হয়। কানাডার নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রিসমূহ বিশ্বমানের তো বটেই, আমেরিকা এবং কমনওয়েলথভুক্ত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিরও সমতুল্য। তাছাড়া পড়াশোনা চলাকালীন কানাডার নাগরিকত্বও পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পড়াশোনার ভাষা : ইংরেজি ও ফরাসি দুটি ভাষাতেই কানাডার প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করা যায়। তবে যে ভাষায় পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক সে ব্যাপারে আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতাও থাকতে হবে। ভর্তির শুরুতেই ভাষার ওপর দক্ষতা যাচাই করার জন্য অনলাইনে বিভিন্ন পরীক্ষা দেওয়া লাগে। যেমনÑ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় TOEFL এ ১২০ নম্বরের পরীক্ষায় নূন্যতম ৭৯ পেতে হয়। তবে ১০০-এর বেশি নম্বর পেলে ভালো। এছাড়া বিজনেসের শিক্ষার্থীদের GMAT টেস্টে ভালো স্কোর পেতে হয়। শিক্ষাব্যবস্থা : কানাডায় একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছা করলে দুভাবে পড়াশোনা করতে পারে। ফুলটাইম অথবা পার্টটাইম পড়াশোনায় এখানে রয়েছে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডক্টরাল, পিএইচডি কোর্স। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও রয়েছে কো-অপারেটিভ এডুকেশন, ডিসট্যান্ট লার্নিং, কন্টিনিউয়িং এডুকেশন এবং স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মতো আরও অনেক কোর্স ও পদ্ধতি। এখানে শিক্ষার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ওয়ার্কশপ ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা রয়েছে এবং আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপ দেওয়া হয়ে থাকে। যে বিষয়ে পড়া যায় : কম্পিউটার সায়েন্স, বায়োলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ফুড সায়েন্স, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড রিসোর্সেস, ইলেকট্রনিক্স, মেডিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সার্ভিসেস, মেরিন অ্যাফেয়ার্স, এগ্রিকালচার, ইকোনোমিক্স, অ্যাপ্লায়েড কম্পিউটার সায়েন্স, ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট, অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাসট্রোনমি, অ্যাপ্লায়েড জিওগ্রাফি, আর্কিটেকচারাল সায়েন্স, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এডুকেশন, হোম ইকোনোমিক্স, মিউজিক, ফিলোসফি, হিস্ট্রি অ্যান্ড রিলিজিওন, ইংলিশ, ল, থিয়েটারসহ আন্ডার গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার বিষয় এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে প্রায় তিন হাজার বিষয় পড়তে পারবেন। আবেদনের সময় : কানাডার অ্যাকাডেমিক বছর সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে মে মাসে শেষ হয়। বছরে দুটি সেমিস্টার থাকে। সেপ্টেম্বর অথবা জানুয়ারি সেমিস্টারে ভর্তির জন্য আবেদন প্রক্রিয়া আট মাস আগে শুরু করা ভালো। কানাডায় পড়াশোনাবিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট: ১. কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনাবিষয়ক তথ্যের ওয়েবসাইট: https://www.univcan.ca/ ২. কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ওয়েবসাইট: https://www.ouac.on.ca/ ৩. স্টুডেন্টবিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট: https://www.canada.ca/en/immigration-refugees-citizenship/services/study-canada.html ৪. উপকারী ওয়েবসাইট: https://www.studyincanada.com/ এবং http://immigrationandsettlement.org/ কানাডায় জনপ্রিয় তিনটি স্কলারশিপ প্রোগ্রাম: ১. ভেনিয়ার কানাডা গ্রাজুয়েট স্কলারশীপ (Vanier Canada Graduate Graduate Scholarships (Vanier CGS): প্রতিবছর কানাডিয়ান সরকার মোট ১৬৭টি এই বৃত্তি প্রদান করে থাকে এবং বছরের যে কোনো সময়েই বিভিন্ন কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য ভ্যানিয়ার স্কলারশিপসহ মোট ৫০০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকে। আপনাকে প্রথমে কানাডিয়ান কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হতে হবে। এই বৃত্তির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫০ হাজার কানাডিয়ান ডলার, যা পিএইচডি প্রোগ্রামের তিন বছর পর্যন্ত দেওয়া হয়। যোগ্য হওয়ার জন্য একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, গবেষণার সম্ভাব্যতা এবং নেতৃত্ব গুণাবলি এই তিনটিকেই সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয়। প্রার্থীরা যে কানাডিয়ান ইন্সটিটিউশনে পড়তে চান, তাদের দ্বারা অবশ্যই মনোনীত হতে হবে। প্রতি বছর প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়, আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার জন্য এই বৃত্তি পেয়ে থাকে আবেদনের সময়সীমা: জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে আবেদনকারীরা প্রতিষ্ঠান সিলেক্ট করে আবেদনপত্র প্রস্তুত এবং জমা দিতে হবে। এই সময়ের মধ্যেই Vanier CGS প্রোগ্রামে মনোনয়ন জমা দিতে হবে। ২০১৯ সালের মার্চের শেষের দিকে মনোনয়নকারীদের ইমেল করা হবে। ১ মে ২০১৯, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ অথবা ১ জানুয়ারি ২০২০ এ স্কলারশিপের টাকা দেওয়া শুরু হয়। লিঙ্ক: www.vanier.gc.ca/en/home-accueil.html ২. ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স এবং ডক্টরাল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ডস (International Master’s and Doctoral Student Awards at the University of Waterloo): এই বৃত্তি মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য প্রতি সেমিস্টারে $২,০৪৫ দুই বছরের জন্য এবং পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য প্রতি সেমিস্টারে $৪,০৪৯ তিন বছরের জন্য দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য বৃত্তির বিশাল সুযোগ হচ্ছে ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স এবং ডক্টরাল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ডস। এই বৃত্তির জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীদের ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রোগ্রামগুলোতে পূর্ণ-সময় নথিভুক্ত থাকতে হবে এবং একটি বৈধ কানাডিয়ান স্টাডি পারমিট থাকতে হবে। লিঙ্ক: ​uwaterloo.ca/graduate-studies/awardsandfunding/international-student-funding ৩. ওজিএস (The Ontario Graduate Scholarship (OGS): ওজিএস প্রোগ্রামটি স্নাতকোত্তর গবেষণায় মাস্টার্স এবং ডক্টরেট পর্যায়ে উৎসাহিত করার জন্য প্রাদেশিক সরকার অর্থায়ন করে। এই বৃত্তির মূল বিষয়গুলো হচ্ছে এটির মূল্য বছরে $১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার। সর্বনিম্ন স্কলারশিপ হতে পারে দুই সেমিস্টার পর্যন্ত। এই বৃত্তির যোগ্যতা অর্জনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্টুডেন্টকে স্টাডি পারমিট নিয়ে অন্টারিওতে থাকতে হবে। নির্বাচন প্রক্রীয়া: একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, যেটার ওয়েট ৩০-৫০ শতাংশ এবং একাডেমিক মার্কস, প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি, পুরস্কার এবং অনার্সের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। রিসার্চ এবিলিটি ও পটেনশিয়াল ইন প্রোগ্রাম স্টাডি, সম্মেলন, উপস্থাপনা এবং মৌলিকত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয়। কমিউনিকেশান ও লিডারশিপ এবিলিটি, এটার ওয়েট কম মাত্র ০-২০ শতাংশ এবং এতে প্রাসঙ্গিক স্বেচ্ছাসেবক, নেতৃত্ব এবং একাডেমিক কাজের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়। লিঙ্ক: uwaterloo.ca/graduate-studies/awardsandfunding/external-awards/ontario-graduate-scholarship-ogs-and-queen-elizabeth-ii স্কলারশিপ ও ভিসা সহযোগিতায়: কানাডায় স্কলারশিপ, স্টুডেন্ট ভিসা এবং ইমিগ্রেশন নিয়ে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেটেলমেন্ট’-এর স্বেচ্ছাসেবীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। সম্পূর্ণ অলাভজনক কার্যক্রম হিসেবে পরিচিত ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেটেলমেন্ট‘-এর ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক গ্রুপ থেকেও বিনামূল্যে এসব বিষয়ে সহযোগিতা লাভ করা সম্ভব। বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের চোখেই থাকে। কিন্তু পড়তে যাওয়ার আগে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ভালোভাবে জেনে যাওয়াটা অনেক জরুরি। এজেন্সি এবং দালালরা কাগজ প্রসেসিং করে টাকা নিতেই আগ্রহী। কিন্তু একজন স্টুডেন্টকেই কানাডা আসার ব্যাপারে সঠিক তথ্য অনুসন্ধান এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। টিআই/এসএইচ/
বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে পড়তে চাইলে

জার্মানি শুধু ইউরোপ নয় বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অন্যতম একটি। তথ্য-প্রযুক্তিতে অগ্রসরমান এই দেশটি শিক্ষাসহ নানা দিক দিয়ে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয়। বিশেষ করে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক এবং যুগোপযোগী। রয়েছে বিশ্বের অনেক নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষার জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পছন্দের অন্যতম গন্তব্য এখন ইউরোপের সমৃদ্ধ দেশ জার্মানি। শিক্ষা ও গবেষণায় শূন্য টিউশন ফি ও শিক্ষাবৃত্তির সুবিধা। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেধাবীসহ সব ধরনের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিকে নির্দ্বিধায় বেছে নিচ্ছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে পিছিয়ে নেই। স্কলারশিপ ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা : বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও মানবিক সব শাখাতেই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। জার্মানির উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে লুদভিক ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ, ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন, হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি, উলম ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাড হনেফ প্রভৃতি। প্রতিবছর আড়াই লাখ বিদেশি শিক্ষার্থী এবং ২৩ হাজার পিএইচডি গবেষক জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হন। এই বিশাল সংখ্যার শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৃত্তি পেয়ে থাকেন। ডিএএডি বা জার্মান ছাত্রবিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী জার্মানি পড়াশোনার সুযোগ পান। এছাড়াও, ডিএএডি বা জার্মান ছাত্রবিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী জার্মানিতে পড়াশোনার সুযোগ পান। বর্তমানে ৪৫ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের বৃত্তিভোগীদের ৭০ শতাংশই আসেন বিদেশ থেকে। স্নাতক কোসের্র শিক্ষার্থীরা মাসে ৬৫০ ইউরো, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা ৭৫০ ইউরো আর পিএইচডি গবেষকেরা এক হাজার ইউরো পেয়ে থাকেন বৃত্তি হিসেবে। তবে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বৃত্তির সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বৃত্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য জার্মানিতে যান শিক্ষার্থীরা। স্টিপেন্ডিয়াটেন ডেয়ার স্টুডিয়েনস্টিফটুং ডয়েচেস ফল্ক, ডয়েচলান্ড স্টিপেন্ডিয়ুম নামের বৃত্তিসহ বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের বৃত্তি পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। ডিএএডি কনরাড আডেনাওয়ার ফাউন্ডেশন, হাইনরিশ ব্যোল ফাউন্ডেশন, ফ্রিডরিশ এবার্ট ফাউন্ডেশন, বোরিংগার ইংগেলহাইম ফাউন্ডেশন প্রভৃতি ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তি পেয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। জার্মানিতে পড়ার বিষয় : জার্মানিতে বর্তমানে ৪৫০টির বেশি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গভর্ন্যান্স, পলিটিক্যাল সায়েন্স, অ্যাডভান্সড ম্যাটারিয়ালস, অ্যাডভান্সড অনকোলজি, কমিউনিকেশন টেকনোলজি, এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ফিন্যান্স, মলিকিউলার সায়েন্স, বিভিন্ন ভাষা বিষয়ে পড়াশোনা, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্সসহ প্রকৌশল ও জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। নিজ খরচে পড়াশোনা : অনেকেরই জানার আগ্রহ থাকে জার্মানিতে নিজ খরচে পড়াশোনায় কেমন টাকা লাগে। প্রশ্নটা অনেক সহজ হলেও এক কথায় উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন! এর অন্যতম কারণ হল: কেউ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছেন এবং সেখান থেকে অফার লেটার পেয়েছেন আবার কেউ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে একটি থেকে অফার লেটার পেয়ে জার্মানিতে এসেছেন। কেউ ইউনি এসিস্ট দিয়ে আবেদন করেছেন আবার কেউ সরাসরি ভার্সিটিতে আবেদন করেছেন। যদি সরাসরি আবেদনের সুযোগ খুব কম। কারো ইউনি এসিস্ট ফি ও ব্লক একাউন্ট এর টাকা তাদের বিদেশে থাকা আত্মীয় পরিশোধ করতে তাদের ট্রান্সপার ফি দিতে হয়নি ও ইউরোর রেট নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। কারো ক্ষেত্রে জার্মানিতে থাকা আত্মীয় তাকে স্পন্সর করতে রাজি হয়েছে সেকারণে তাকে ব্লক একাউন্টে টাকা রাখতে হচ্ছে না । আবার কয়েকটা ভার্সিটি ডকুমেন্ট মূল্যায়ন করতে আলাদা করে টাকা নেয় যেমন: Hochschule Worms আবেদন খরচ:৫টি আবেদনই ইউনি এসিস্ট দিয়ে করবেন ধরে নিলাম সেক্ষেত্রে খরচ প্রথম আবেদনে ৭৫ ইউরো, এর পরে সবগুলোর জন্য ৩০ ইউরো করে। সেক্ষত্রে সর্বমোট পড়বে ১৯৫ ইউরো। ট্রানফার খরচসহ ২০০ ইউরো ধরে নিলাম। যেটা ১০০ টাকা ইউরো রেট ধরে ২০০০০ টাকা। ডকুমেন্ট পাঠাতে ১০০০ থেকে ২৫০০ পর্যন্ত খরচ হতে পারে। আমরা ২৫০০ কে স্ট্যান্ডার্ড ধরবো। পরবর্তীতে আর্থিক লেনদেন করার জন্য আপনাকে বাংলাদেশের কোন ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে হবে। স্টুডেন্ট ফাইলের খরচ ৫০০০ টাকা থেকে ১৫০০০ টাকার মধ্যে। আমরা ১৫০০০ টাকা ধরে নিলাম। এছাড়াও ব্লক একাউন্ট করতে লাগবে ৮৬৪০ ইউরো। ব্লক একাউন্ট করতে আপনাকে জার্মান ব্যাংকে ফি দিতে হবে ৯৯ ইউরো থেকে ২০০ ইউরো। আপনি পার্টটাইম জব পাবার পর ওই টাকা আর খরচ করা লাগবে না যদি আপনার যথেষ্ট ইনকাম থাকে। তবে, আপনাকে ১০০ টাকা রেটে ৮৬৪০০০ টাকা ব্লক একাউন্টে রাখতে হবে। যা প্রতি মাসে ৭২০ ইউরো করে পাওয়া যাবে। ট্রাভেল ইন্সুরেন্স: ট্রাভেল ইন্সুরেন্স খরচ ৫০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকার মধ্যে। আনুষাঙ্গিক খরচ: ফটোকপি করা, এম্বাসির জন্য ছবি তোলা ইত্যাদি বাবদ ১০০০ টাকা। এম্বাসি ফি: ৭৫ ইউরো যা বাংলাদেশি টাকায় কম-বেশি ৭৫০০ টাকা। বিমান ভাড়া: জার্মানিতে একমুখী বিমান যাত্রার খরচ ৪০০০০ টাকা থেকে ৬০০০০ হাজার টাকা। যা যা জানা প্রয়োজন: প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নিতে আসে৷ জার্মানিতে কম খরচে উচ্চমানের শিক্ষা পাওয়া যায়৷ তবে জার্মানির উদ্দেশ্যে বিমানে চড়ার আগে শিক্ষার্থীদের কিছু বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন৷ পড়ে নিন সেগুলো৷ ১. জার্মানির ১৬টি রাজ্যের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো টিউশন ফি নেই৷ এটা সত্য৷ তবে এক্ষেত্রে শর্ত প্রযোজ্য৷ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সুনির্দিষ্ট ডিগ্রি প্রোগ্রামে আবেদন করলে বিনা খরচায় পড়ার সুযোগ আছে৷ সেক্ষেত্রে স্থানীয়রা যেসব শর্ত মেনে লেখাপড়া করে, বিদেশিদেরও সেগুলো মানতে হবে৷ স্টাডি এবরোড প্রোগ্রাম এবং প্রাইভেট ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা ফ্রি নয়৷ ২. একজন বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার ফাঁকে আপনি কতটা কাজ করতে পারবেন, সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া থাকে৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ-র কোনো দেশের পাসপোর্টধারী নয়, এমন শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০ দিন পূর্ণদিবস কিংবা ২৪০ দিন অর্ধদিবস কাজ করতে পারেন৷ এছাড়া সেমিস্টার চলাকালে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করা যাবে না৷ ভালো কথা, গোপনে বাড়তি কাজের চেষ্টা করবেন না৷ ধরা পড়লে বড় সমস্যা হতে পারে৷ ৩. আশার কথা হচ্ছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন অনুদান এবং ফেলোশিপের ব্যবস্থা রয়েছে জার্মানিতে৷ আপনার বিষয় যাই হোক না কেন, আপনি যদি তাতে মেধাবী হন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য পরিশ্রমে আগ্রহী হন, তাহলে অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারেন৷ জার্মান অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিস বা ডিএএডি এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে থাকে৷ তবে অনুদানের আবেদন প্রফেশনালদের মতো হওয়া চাই৷ ৪. উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে জার্মানিতে পড়তে আসার ভিসা পাওয়া একটু জটিল৷ তাঁদের বেশ কিছু দিন সময় হাতে রেখে ভিসার আবেদন করতে হয়৷ আর জার্মানিতে আসার পর মাঝেমাঝেই যেতে হয় আউসলান্ডারবেহ্যোর্ডে বা বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত সরকারি কার্যালয়ে৷ ৫. জার্মানিতে আসার পর আপনি নিয়মিতই বিভিন্ন চিঠি পাবেন৷ এমনকি কবে কবে বাড়ির সামনে কোন কোন ধরনের ময়লা রাখা যাবে, সেটাও জানবেন চিঠির মাধ্যমে৷ বুদ্ধিমানের কাজ হবে সব চিঠি জমা করে রাখা৷ তবে প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তর দিতে ভুল করবেন না যেন৷ জার্মানিতে বসবাসের এক বিরক্তিকর দিক হচ্ছে দেশটির জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া৷ সেই প্রক্রিয়ার অংশ এ সব চিঠি৷ ৬. এটাও সত্য, জার্মানির বড় শহরগুলোতে জার্মান না জেনেও বসবাস করা য়ায়৷ এছাড়া বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ইংরেজিতে পড়ালেখার সুযোগ রয়েছে৷ তবে কিছুটা জার্মান ভাষা শিখতে পারলে দেশটিতে জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে যাবে৷ আর আপনি যদি পড়ালেখা শেষে জার্মানিতে চাকরি করতে চান, তাহলে ভাষা জানাটা অনেক জরুরি৷ এক্ষেত্রে ডয়চে ভেলের জার্মান ভাষা শিক্ষা কোর্স আপনাকে সহায়তা করতে পারে৷ ৭. জার্মানির বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করে থাকে৷ তবে তাদের সেবা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়৷ অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেছে দেওয়া অ্যাপার্টমেন্ট শিক্ষার্থীর পছন্দ হয় না৷ আশার কথা হচ্ছে, অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে যেগুলো থেকে থাকার জায়গা বেছে নেওয়া যায়৷ কাজটা কঠিন৷ তবে চেষ্টা করবেন এমন জায়গায় থাকার যেখানে জার্মান শিক্ষার্থীরা থাকেন৷ তখন ভাষা শেখাটা আপনার জন্য সহজ হবে৷ আবেদন করবেন যেভাবে: অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের সব প্রক্রিয়া ও বৃত্তি সম্পর্কে জানা যায়। বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যান্ড অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইন জার্মানির ওয়েবসাইট (bsaagweb.de) থেকেও শিক্ষার্থীরা জার্মানিতে বর্তমানে পড়ছেন এমন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ নিতে পারেন। জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা, দৈনন্দিন জীবনযাপন, পড়ালেখা-চাকরির সুবিধাসহ যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে এ সাইট থেকে। প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট: ১. স্টাডি ইন জার্মানি : study-in.de ২. ডিএএডি : daad.de/en ৩. ঢাকার জার্মান দূতাবাস : dhaka.diplo.de ৪. গ্যেটে ইনস্টিটিউট, ঢাকা : goethe.de/ins/bd/en/dha.html   টিআই/এসএইচ/

এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভাবনা

১. এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় একুশ লাখ ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল এর মাঝে প্রায় বিরাশী শতাংশ পাস করেছে। সময়মত পরীক্ষা নেয়া হয়েছে সময়মত পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। মনে আছে একটা সময় ছিল যখন হরতালের পর হরতাল দিয়ে আমাদের জীবনটাকে একেবারে এলোমেলো করে দেওয়া হতো? আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার রুটিন দেওয়ার সময় রুটিনের নিচে লিখে রাখতাম অনিবার্য কারণে পরীক্ষা নেয়া না গেলে অমুক দিন পরীক্ষা নেওয়া হবে। আমরা যারা একটু বেশি দুঃসাহসী ছিলাম তারা সারাদিন হরতাল শেষে সন্ধ্যাবেলাও পরীক্ষা নিয়েছি। হঠাৎ করে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে যেন পরীক্ষা নিতে পারি সে জন্যে মোমবাতি রেডি রাখতম। শুধু মুখ ফুটে কোন একটা রাজনৈতিক দলকে উচ্চারণ করতে হতো অমুক দিন হরতাল, ব্যাস সারাদেশ অচল হয়ে যেতো! মনে আছে আমি অনেকবার রাজনৈতিক দলের কাছে অনুরোধ করতাম, হরতালের সময় যে রকম হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্সকে হরতালমুক্ত রাখা হতো সেরকম স্কুল, কলেজ এবং পরীক্ষা যেন হরতালমুক্ত রাখা হয়! কিন্তু কে আমাদের কথা শুনবে? সেই হরতাল দেশ থেকে উঠে গেছে। আমার মাঝে মাঝে নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে হয় সত্যিই এটা ঘটেছে নাকি স্বপ্ন দেখছি! এভাবে আরও কিছুদিন কেটে গেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে একদিন বোঝাতে হবে হরতাল জিনিসটি কী! শুধু যে হরতাল উঠে গেছে তা নয়, মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস থেকেও আমরা মুক্তি পেয়েছি। এই মাত্র কয়দিন আগেও মায়েরা রাত জেগে বসে থাকতেন, ফেসবুক থেকে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন ডাউনলোড করে সেটা সমাধান করিয়ে নিজের বাচ্চাদের হাতে তুলে দিতেন মুখস্ত করার জন্য। (হয়তো বাবারাও কিংবা অন্য আত্মীয়-স্বজনও এটা করেছেন কিন্তু আমার কাছে যেসব তথ্য এসেছে সেখানে মায়েদের কথাটাই বেশি এসেছে তাই মায়েদের কথা বলছি এবং সুস্থ স্বাভাবিক মায়েদের কাছে অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এরকম কুৎসিত একটা বাক্য লেখার জন্যে।) প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আমার ক্ষোভটা একটু বেশি, কারণ মনে আছে আমি এটা নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করার পর হঠাৎ করে আবিষ্কার করেছিলাম আমার এই বিশাল নাটক করার পরও আমার সঙ্গে কেউ নেই! আমি মোটামুটিভাবে একা। কোনভাবেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বোর্ডগুলোকে একবারও স্বীকার করানো যায়নি যে আসলেই দেশে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাটির অস্তিত্ব স্বীকার করা না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই সমস্যাটির সমাধান হবে কেমন করে? শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় যখন স্বীকার করতে শুরু করল যে আসলেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে তখন মোটামুটি ম্যাজিকের মত সমস্যাটি দূর হয়ে গেল! পরীক্ষার খাতা দেখার ব্যাপারেও এটা শৃঙ্খলা এসেছে, চোখ বন্ধ করে বেশি নম্বর দেওয়ার প্রক্রিয়াটাও মনে হয় বন্ধ হয়েছে, বাকী আছে শুধু প্রশ্নের মান। আগের থেকে যথেষ্ট উন্নত হয়েছে কিন্তু এখনও মনে হয় মানসম্মত প্রশ্ন করা শুরু হয়নি। শিক্ষকেরা সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না বলে অভিযোগ আছে। এখনও মাঝে মাঝেই গাইড বই থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন চলে আসে। সে কারণে গাইড বইয়ের প্রকাশক এবং কোচিং ব্যবসায়ীদের অনেক আনন্দ। ভালো প্রশ্ন করা খুব সহজ কাজ নয়, একজনকে এই দায়িত্ব দিলেই সেটা হয়ে যায় না। কিন্তু যেহেতু একটা প্রশ্ন প্রায় বিশ লাখ ছেলেমেয়ে ব্যবহার করে সেই প্রশ্নটি অনেক মূল্যবান, তার জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়ানো দরকার। এরকম প্রশ্নগুলো যারা করেন তাদেরকে যে সম্মানী দেওয়া হয় সেটা রীতিমত হাস্যকর। আমি সুযোগ পেলেই শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের বলি প্রশ্ন করার জন্যে হোটেল সোনারগাঁয়ে একটা সুইট ভাড়া করতে, প্রশ্নকর্তারা সেখানে থাকবেন ভাবনা-চিন্তা করে সুন্দর প্রশ্ন করে সেটা টাইপ করে একেবারে ক্যামেরা রেডি করে দিয়ে বাড়ি যাবেন। গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা আমার কথা বিশ্বাস করেন না। তারা ভাবেন আমি ঠাট্টা করছি। আমি কিন্তু ঠাট্টা করে কথাগুলো বলি না, সত্যি সত্যি বলি। স্কুল-কলেজের শিক্ষক হলেই তাদেরকে হেলাফেলা করা যাবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। যখন তারা বিশ লাখ ছেলেমেয়ের জন্য প্রশ্ন করছে তখন তারা মোটেও হেলাফেলা করার মানুষ না। তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। পরীক্ষার মানসম্মত প্রশ্ন করা হলে অনেক বড় একটা কাজ হবে। সবাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে চায়, মান সম্মত প্রশ্ন হলে শুধু তারাই ভালো নম্বর পাবে যারা বিষয়টা জানে। কোচিং সেন্টার থেকে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার টেকনিক শিখে লাভ হবে না। সেজন্যে ভালো প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো প্রশ্ন করার পরও আরও একটা বিষয় থেকে যায়। আমরা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম তখন সকালে এক পেপার বিকালে আরেক পেপার পরীক্ষা দিয়েছি! প্রত্যেকদিন পরীক্ষা, মাঝে কোন গ্যাপ নেই। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ঝড়ের গতিতে পরীক্ষা শেষ! এটা নিয়ে যে আপত্তি করা যায় সেটাও আমরা জানতাম না। খুব যে কষ্ট হয়েছে কিংবা পরীক্ষার পর অর্ধেক ছেলেমেয়ে পাগল হয়ে গেছে সেরকম কিছু শুনিনি। সেই বিষয়টা ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়। (আমার এই বক্তব্য শুনে পরীক্ষার্থীরা চাপাতি হাতে নিয়ে আমাকে খুঁজবে সেরকম একটা আশঙ্কা আছে, তারপরও বলছি!) পরীক্ষা লেখাপড়া নয়, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়ার মাঝে কোন আনন্দ নেই। ঝটপট পরীক্ষা শেষ করে বাকী সময়টা নির্ভেজাল আনন্দের মাঝে কাটানো হচ্ছে জীবনকে উপভোগ করা। বাচ্চাদের কেন জীবন উপভোগ করতে শেখাব না? ২. প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর আমরা পত্র-পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে পরীক্ষার্থীদের আনন্দোজ্জ্বল ছবি দেখতে পাই। এই বয়সটিতে সবকিছুকেই রঙিন মনে হয়, তাই পরীক্ষার পর তাদের আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসটিও হয় অনেক বেশি স্বতস্ফূর্ত। অনেক বেশি তীব্র। দেখতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু প্রতিবছরই এই আনন্দে উদ্ভাসিত ছেলেমেয়েগুলোর ছবি দেখার সময় আমি এক ধরনের আশঙ্কা অনুভব করি। এই বয়সটি তীব্র আবেগের বয়স, আমি নিশ্চিতভাবে জানি অসংখ্য ছেলেমেয়ের তীব্র আনন্দের পাশাপাশি কিছু ছেলেমেয়ে রয়েছে যাদের পরীক্ষার ফলাফলটি তাদের মনোমত হয়নি। সেজন্যে কয়দিন মন খারাপ করে থেকে আবার নতুন উৎসাহ নিয়ে জীবন শুরু করে দিলে আমার কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু সেটি হয় না, প্রতিবছরই দেখতে পাই পরীক্ষার ফলাফল বের হবার পর বেশ কিছু ছেলেমেয়ে একেবারে আত্মহত্যা করে ফেলে। এই বছর এখন পর্যন্ত পাঁচটি ছেলেমেয়ের খবর পেয়েছি যারা আত্মহত্যা করেছে। সারাদেশে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের মাঝে ছেলে আছে, তবে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। এসএসসি পরীক্ষার্থী আছে সেরকম দাখিল পরীক্ষার্থী আছে। পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি সেজন্যে আত্মহত্যা করেছে যেরকম আছে, যথেষ্ট ভালো করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিপিএ ফাইভ হয়নি বলে আত্মহত্যা করেছে সেরকম ঘটনাও ঘটেছে। কী ভয়ঙ্কর একটি ঘটনা। একজন মানুষের জীবন কত বড় একটি ব্যাপার সেই জীবনটি থেকে কতো কী আমরা আশা করতে পারি, সেই জীবনটিকে একটি কিশোর কিংবা কিশোরী শেষ করে দিচ্ছে কারণ তার পরীক্ষার ফলাফল ভালো হয়নি, এটি আমরা কেমন করে গ্রহণ করব? যখনই এরকম একটি ঘটনার কথা পত্রপত্রিকায় দেখি আমার বুকটি ভেঙ্গে যায়। শুধু মনে হয়, আহা আমি যদি তার সঙ্গে একটুখানি কথা বলতে পারতাম। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারতাম জীবনটা কত বড়? তুচ্ছ একটা পরীক্ষার তুচ্ছ একটা ফলাফলকে পেছনে ফেলে জীবনে কত বড় একটা কিছু করে ফেলা যায়। পৃথিবীতে সেরকম কতো উদাহরণ আছে। প্রত্যেকটা মানুষকেই জীবনে কতো ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়, একজন মানুষের জীবনে যতটুকু সাফল্য তার থেকে ব্যর্থতা অনেক বেশি। সেই ব্যর্থতা এলে কী কখনো হাল ছেড়ে দিতে হয়? ভবিষ্যতে আরও কতো সুন্দর জীবন অপেক্ষা করছে আমরা সেটি কী কল্পনা করতে পারি? কিন্তু আমার কখনো এই অভিমানী ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে দেখা হয় না। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার সুযোগ হয় না। শুধু পত্রপত্রিকায় খবরগুলো দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমি আশা করে থাকি আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এবং তাদের বাবা-মায়েরা বুঝতে পারবেন যে পরীক্ষার এই একটি ফলাফল পৃথিবীর বিশাল কর্মযজ্ঞের তুলনায় কিছুই না।  পরীক্ষায় মনের মত ফলাফল না করেও একটি চমৎকার জীবন হওয়া সম্ভব। শুধুমাত্র ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়াই জীবন নয়, ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে এই পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ আশ্চর্য রকম সুখী হয়ে জীবন কাটিয়েছে, তারা পরিবারকে দিয়েছে, সমাজকে দিয়েছে, দেশকে দিয়েছে এমনকি পৃথিবীকে দিয়েছে। লেখাপড়ার সত্যিকার উদ্দেশ্যটি মনে হয় আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে কিংবা তাদের বাবা-মা’দের এখনও বোঝাতে পারিনি! ৩.  আত্মহত্যার খবর পড়ে যখন মন খারাপ করে বসে থাকি, তখন অদম্য মনোবলের একজনের কাহিনী পড়ে আবার মনটি আনন্দে ভরে উঠে। তামান্না আখতার নামে একটি কিশোরী জন্ম নিয়েছে দুই হাত এবং একটি পা ছাড়া। সে সেই ছেলেবেলা থেকে অসাধারণ লেখাপড়া করে এসেছে, এসএসসিতে তার মনের মত পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে। আমার আনন্দ সেখানে নয়, আমার আনন্দ তার স্বপ্নের কথা পড়ে। সে বড় হয়ে প্রথমে ডাক্তার হতে চেয়েছিল এখন সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে! আমি মাঝে মাঝে নতুন সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের সামনে বক্তৃতা দেই। যদি বেঁচে থাকি তাহলে এমন তো হতেও পারে যে সেরকম কোন একটি সভায় হঠাৎ করে দেখব সামনে একটি হুইল চেয়ারে মাথা উঁচু করে তামান্না বসে আছে। স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? এবারে আরও একটি আনন্দের ব্যাপার হয়েছে। আমি সবসময়েই বলে থাকি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি যে এখানে ছেলেরা এবং মেয়েরা সমানভাবে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। আমি মোটামুটিভাবে বিশ্বাস করি মেয়েরা যখন জীবনের সবক্ষেত্রে ছেলেদের সমান সমান হয়ে যায় তখন এই দেশটি নিয়ে আমাদের আর কোন দুর্ভাবনা করতে হবে না। এবারে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে মনে হলো আমরা সেদিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছি! মেয়েরা এর মাঝে ছেলেদের থেকে ভালো করতে শুরু করেছে। /এএইচ/

হাতিরঝিলের এম্ফিথিয়েটারে তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ৭ থেকে ৯ মার্চ হাতিরঝিলের এম্ফিথিয়েটারে তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব এর আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান চলবে প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত । রাজধানীর হাতিরঝিলে অবস্থিত এম্ফিথিয়েটারে (গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনে) তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবে থাকছে অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, সংগীত, নৃত্য, যন্ত্রসংগীত, মঞ্চনাটক, যাত্রাপালা, পালাগান, পাপেট শো, ব্যান্ড সংগীত ও দেশবরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনা। অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রথমদিনে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী এর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ এবং ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান। এছাড়া ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে বিশেষ ও নাটক মুজিব মানে মুক্তি মঞ্চস্থ হয়। আগামী ৮ ও ৯ মার্চ অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল ৫টায়। এসএইচ/

মনোজগতের পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন আবশ্যক

আমাদের দেশের একজন শিক্ষার্থীকে মোটামুটি ১৭-১৮ বছর কাটাতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পেছনে। অর্থাৎ জীবনের একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটায়। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক সবলতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিশু-কিশোর ও তরুণের মনস্তাত্ত্বিক জগৎ এক রকম নয়। তাই শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই শিক্ষাদান কৌশল যেমন আলাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়, তেমনি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রেও আলাদা কৌশল প্রয়োজন। কৈশোরে একজন শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অনেক বেশি থাকে। হরমোন পরিবর্তনজনিত কারণে তারা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বাংলাদেশের পটভূমি বিচার করলে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। ফলে তার ওপর মানসিক চাপ থাকে। বাংলাদেশের প্রচলিত ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক পড়াশোনা যে সামাজিক জীবন তৈরি করে, তাতে টেক্সট বইয়ের বাইরে শিক্ষার্থীরা অন্য জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে খুব সামান্যই। তাই পরিবার, সমাজ, পরীক্ষা ও তার শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীরা একটা বড় রকমের মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু এই চাপকে মুক্ত করার মতো বন্ধু তার খুব একটা থাকে না। মেয়েদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও প্রকট। ফলে তাদের ভঙ্গুর মানসিক চিত্ত নিয়ে কৈশোরকাল পার করতে হয়। এতে খুব অল্পেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় তারা। তাই কৈশোরের মানসিক চাপ দূর করতে প্রতিটি স্কুল-কলেজে স্টুুডেন্ট কাউন্সেলর থাকা খুবই জরুরি। যার নিয়মিত তত্ত্বাবধান একজন বয়ঃসন্ধিকালের শিক্ষার্থীর মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। শিক্ষার্থী যদি তার যে কোনো প্রকার মানসিক অবস্থা শেয়ার করতে পারে এবং যুক্তিযুক্ত পরামর্শ পায়, তাহলে তার মনের চাপ অনেক কমে যায়। `বাংলাদেশ জার্নাল সাইকিয়াট্রি`তে প্রকাশিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, ভর্তিকৃত ৯৯২ জন মানসিক রোগীর ৭২ শতাংশ শৈশবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৬৬ শতাংশ আবেগীয় নিপীড়ন এবং ৬০ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বর্তমান সময়ে সাইবার বুলিং শিশু-কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০১১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যকারীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৪২, যা এর পর প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে ১৭ জন ছেলে এবং ২২ জন মেয়ে আত্মহত্যা করে। কিশোর-কিশোরীদের তারুণ্যের সিঁড়ি বেয়ে ঢুকতে হয় কর্মজীবনে। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে সংকট। কেউ সে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে, কেউ পারে না। ব্যর্থরা মানসিক সমস্যার জালে জড়িয়ে যায় বা যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন জয় ছিনিয়ে আনতে নিজের যোগ্যতাকে শানিত ও ব্যর্থতাকে বরণ করার শক্তি সঞ্চয় করা। এই শক্তি মানসিক রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে উদ্বেগ, হতাশা, বিষণ্ণতা শিক্ষার্থীদের যখন মারাত্মকভাবে গ্রাস করে, তখন তারা বেঁচে থাকার আনন্দ হারিয়ে ফেলে। এক সময় মানুষের জীবনে এতটা চাপ ছিল না। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সবকিছুই যেন জটিল হয়ে যাচ্ছে। এ জীবনে তাই প্রত্যাশার বোঝাও বেশি। আর এটি তো সত্যি যে, আমাদের সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কখনোই শিক্ষার্থীবান্ধব ছিল না। এখন তো পরিস্থিতি আরও জটিল। শুধু এক পক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। অনেক অভিভাবকের অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিভিন্নভাবে খরচ করা হয়। অভিভাবকদের জীবনও সুশৃঙ্খল বলা যাবে না। সন্তানরাও দেখে দেখে তাই শেখে। স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত। তারা আচার-আচরণে বাড়িতে, সমাজে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খল। তাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? অভিভাবকরাও লাগামহীন। এই ঘুণে ধরা সমাজে শিক্ষক কোত্থেকে আসবেন? তাদের কাছ থেকে আমরা ফেরেশতার মতো আচরণ আশা করতে পারি না। এখন মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীদের একজন শিক্ষক কীভাবে মোকাবেলা করবেন? তার সে ধরনের প্রশিক্ষণ নেই, সামর্থ্য নেই, সময় নেই, ইনসেনটিভ নেই। এ বিষয়গুলোও আমাদের দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ বিনির্মাণে সমাজ কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে, তা আমাদের দেখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমাজেরই একটি অংশ। শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটি যতটা না এ ক্ষেত্রে মুখ্য, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমাদের অসুস্থ ও স্থূ্থল মানসিকতা। আমরা নিয়মনীতির কথা মুখে বললেও সন্তানদের সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই না। প্রচলিত অর্থে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর নিয়মকানুনের মর্মান্তিক জাঁতাকলে পিষ্ট করছে শিক্ষার্থীদের। বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর মানসিক আশ্রয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র- কোথাও নেই। অবিরাম সে প্রত্যাশার চাপের মাঝে পার করছে তার যাপিত দিনগুলো। ফলে সে আশ্রয় খোঁজে অনলাইন, ফেসবুক, হোয়টসঅ্যাপ কিংবা ইমোতে। অতঃপর বেলাশেষে এই শিক্ষার্থী দেখে, তার জীবনের সবকিছু সে হারিয়ে বসে আছে। অথচ তার বাবা-মা, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার কাছে অনেক কিছু আশা করে। এই আশা এত দুর্বিষহ যে, তখন সে নিজেকে সফলদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার জন্য অসদুপায় অবলম্বন করে। এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা, বিতর্ক, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে হবে। এটা শুধু বিজয়ের জন্য নয়, পরাজয় মেনে নিতে শেখার জন্য। খেলা বা বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন জয়কে ধারণ করা শিখি, তেমনি পরাজয়কে বরণ করাও শিখি। এগুলো জীবনের বাস্তব শিক্ষা। পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস পারিবারিকভাবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে উঠতে হবে। খেলাধুলা, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। জীবনের হাসিকান্নার মধ্যেও এক অপূর্ব মাধুর্য আছে, যা শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে। শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ; ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজের সাবেক শিক্ষক masumbillah65@gmail.com

শিক্ষায় নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

পৃথিবীর সব মহামানব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন আপন চরিত্রবলে। তাঁরা তাঁদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। একটি দেশ ও জাতির জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো দেশ বা জাতির টেকসই উন্নয়নে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা অত্যাবশ্যকীয়। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি না পেলে কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর নৈতিকতা ও মূল্যবোধই তাঁকে পাকিস্তানিদের অনৈতিক নিগ্রহ থেকে বাঙালিকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তাই বলা যায় মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও পরিশীলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিশল্যকরণী ও প্রথম সূর্যসিঁড়ি হলো নৈতিকতা। নীতির প্রতি মূল্যায়ন, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেই আসে নীতিবোধ আর এই নীতিবোধ থেকেই নৈতিকতা। অন্যদিকে  নিজের বুদ্ধি ও সক্ষমতার দ্বারা প্রতিটি জিনিস ও কাজের ভালো-মন্দ, দোষ-গুণ বিচার-বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করার মানসিকতাই হলো মূল্যবোধ। সুষ্ঠু, গতিশীল সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, আর এ ধরনের শিক্ষা মূলত একটি চলমান প্রশিক্ষণ। এটি শেখার জন্য ব্যবস্থাপনা, অনুশীলন ও চর্চার প্রয়োজন জরুরি। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে; কিন্তু বিকশিত হয় সমাজে। এই সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ার ধাপ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সর্বোপরি রাষ্ট্রে নিহিত। শিশুর বা সন্তানের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উৎস হলেন তার মা-বাবা ও অভিভাবকরা। তাঁরা যদি সৎ ও সুন্দর পরিশীলিত চরিত্র ও মার্জিত আচরণের অধিকারী হন, সন্তানরা দেখে দেখেই তা আয়ত্ত করবে। এই শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হবে আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবেন শিক্ষকরা। শিক্ষাজীবন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন এবং চর্চার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। আমাদের দেশে শিক্ষার তিনটি স্তর রয়েছে; যেমন—প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরটি যেকোনো শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন বিকাশে সর্বোচ্চ সহায়ক সময়। প্রাথমিক শিক্ষাই একজন শিক্ষার্থীর অঙ্কুরোদ্গমের সময়। তাই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। শিক্ষকরা তাঁদের অভিভাবক হিসেবে সততা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা দেবেন। আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মের কোনো বিকল্প নেই—কথাটি মাথায় রেখে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা কেন্দ্র হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমকে বেগবান করতে হলে শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নৈতিক শিক্ষা সংবলিত গল্প, কবিতা, ছড়া ও উপন্যাস ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত কাজগুলো নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভালো কাজ করতে উৎসাহিত এবং খারাপ কাজে নিরুৎসাহ করতে হবে। তারা যেন তাদের আশপাশের মানুষদের সুখে-দুঃখে, বিপদে, আনন্দে পাশে থাকে, তা শেখাতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনের জানালা খুলে দিতে হবে, যাতে ঠিকমতো তাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব শিক্ষকদেরই নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে দেশে জঙ্গিবাদ, মাদক, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের এই সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক গুণাবলির বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার কোনো বিকল্প নেই। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অন্তরে ধারণ করাতে শিক্ষকদের সচেষ্ট হতে হবে। বিদ্যালয়ের স্তর পার করে যখন একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও পরবর্তী সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করে তখন তার ভেতরে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটা বিকশিত হয়। আগে যেই মূল্যবোধ ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক, তা পূর্ণতা লাভের পথে পরিব্যাপ্ত হয় সামাজিক পরিমণ্ডলে। শৈশবে শিখে আসা ধ্যান-ধারণার বীজটি তখন চারাগাছ থেকে বৃক্ষে পরিণত হওয়ার পথে ধাবিত হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রায় প্রতিটি ধর্মেই করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বলা আছে। ধর্মের প্রকৃত পাঠই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এ ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কেউ যাতে শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের ওপর পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রভাব প্রকট। সুতরাং আমাদের সমাজজীবনের প্রতিচ্ছায়া শিক্ষার্থীর মন, মানস ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন যেহেতু সমাজের দ্বারাই পূর্ণতা পায় এ জন্য সহায়ক পরিবেশ, ন্যায়বিচার, সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অনুশীলন মানুষকে তার শিকড়কে ভালোবাসতে শেখায়, তার মাটি ও মানুষকে আপন করে নিতে শেখায় এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বকীয়তা অর্জন করেছি, সেই স্বকীয়তা সততার মাধ্যমে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের মননে তা প্রোথিত করতে হবে। লেখক: জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, নরসিংদী

বেকারত্ব দূর করতে দরকার জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা: তানজীম উদ্দীন

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দীন খানের। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে, আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দেব? চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগী তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই।  আমাদের জীবন  মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ব দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারেও কোনো পদক্ষেপ নেই। তাই বেকারত্ব দূর করতে জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? তানজীম উদ্দীন খান: ছেলে-মেয়ে পাশ করে বের হচ্ছে কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র। এর দুটো কারণ আছে। একটি কারণ হচ্ছে-চাকরির ক্ষেত্রে যে ধরণের দক্ষতা জরুরী, বিশেষ করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া ও ভাবনার যে দক্ষতা, সেটার ঘাটতি তো থাকেই। কিন্তু শুধু যে এটার জন্য বেকারত্ম বাড়ছে তা না। এটার জন্য আমাদের যে উন্নয়ন ভাবনা, এ উন্নয়ন ভাবনা বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক চিত্র, সে চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব না। আমাদের শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে তো বেকারত্ব দূর করা সম্ভব না। এ উন্নয়নে প্রবৃদ্ধি নামক সংখ্যার চমক থাকে। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে কতটা সহায়ক, সেটা দেখার বিষয়। আমাদের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর পাশ করে যে পরিমান শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বের হচ্ছে- তাদের বেকারত্ব দূর করার জন্যে যে ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা দরকার ছিল, সেই ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা  নেই। সেই ক্ষেত্রে আমাদের শিল্প উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়ন হচ্ছে না। আমরা কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজের কথা বলে থাকি, সেটা সব সময় কৃষিতে ছিল। আমাদের ভৌগলিক বৈশিষ্ট বিবেচনায় নিলেও কৃষি এগিয়ে। কিন্তু আমরা পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল অনুস্মরণ করতে গিয়ে আমাদের কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজ গুলিয়ে ফেলেছি। আমরা বেশি মনোযোগী হয়ে উঠলাম আমাদের শ্রমটাকে সস্তা রাখার। স্বস্তা শ্রমটাকে পুঁজি করে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি শিল্প গড়ে তুল্ল। যেখানে কৃষি উপেক্ষিত হলো। এছাড়া আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে, এই ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আসলে আমাদের জনগোষ্ঠীকে জন সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব না। আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে , আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দিব। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগি তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই।  আমাদের যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের উন্নয়ন দর্শনই সমস্যাবহুল। উন্নয়ন শুধু মাত্র সংখ্যা বা  প্রবৃদ্ধি দিয়ে হয় না। জীবন  মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ম দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? তানজীম উদ্দীন খান: আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন এক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলছি, যাদের উপর আমরা নিজেরাই ভরসা করতে পারছি না। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে লোকবল আমদানি করছি। আমাদেরও জনশক্তি বিদেশে আছে। তবে সে জনশক্তি অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের। সেদিক থেকে আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার তার ঘাটতি আছে। আমাদের মূলত কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেয়ার দরকার। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যারা ভাববেন, তাদের বেশির ভাগেরই ছেলে-মেয়ে দেখা যায় বিদেশে লেখা-পড়া করছেন। আবার যারা কলকারখানার মালিক তাদের ছেলে-মেয়েও বেশিরভাগ বিদেশে লেখা-পড়া করছে। ফলে বলা যায়, আমাদের মধ্যে আমাদের দেশ, শিক্ষা, জনশক্তি কোনটার প্রতি আমাদের নিজেদেরই আস্থা নেই এবং এ আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও আমরা নিতে পারি নাই। ফলে আমাদের এখানে যারা লেখা পড়া করছে তারা ওই প্রতিষ্ঠানে বড় জোর একজন কর্মকর্তা হতে পারবেন। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের গুরু দায়িত্ব নিতে পারবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন এসেছে। যা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক শোনা যায়। শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন সংযোজিত সৃজনশীল পদ্ধতি কিভাবে দেখছেন? তানজীম উদ্দীন খান: প্রচলিত ‘সৃজনশীলতা’ আসলে কতটুকু সৃজনশীল এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিষয়টা হচ্ছে সৃজনশীলতার জন্য যে ধরণের শিক্ষক দরকার। আমার সে ধরণের শিক্ষক তৈরি হয়েছে কি না? সৃজনশীল পড়তে গিয়ে যদি আমাকে আবার বাজারের গাইডের প্রতি আকৃষ্ট হতে হয়, তবে সেটা সৃজনশীর কিভাবে হলো। আমার বাচ্চা যখন বড় হবে তখন তার তিনটা বিষয় সবচেয়ে বেশি জানানো দরকার। সেটা হলো-ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা। কিন্তু আমি যদি বাচ্চাকে ১শ’টি বিষয় পড়তে দেয়, তবে সেটার মধ্যে জড়তা চলে আসে। তাকে যদি তিনটা বিষয়কে কেন্দ্র করে পড়তে দেয়। তবে সে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার বিনোদন বা খেলারও সুযোগ পাচ্ছে। ফলে তার লেখা-পড়ায় ভাবার সযোগও সে পাবে। কিন্তু আমরা বাচ্চার উপর ১০ থেকে ১৫টি বই চাপিয়ে দিলে সে হাফিয়ে উঠে। ফলে ভাবার সুযোগ পায় না। যতটুকু পারে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। যার সর্বশেষ পর্যাযে সৃজনশীল আর সৃজনশীল থাকে না। বিদেশে বাচ্চাদের শিক্ষা গ্রহণে সবচেয়ে যেটির উপর গরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হলো বাচ্চার সময়। এখন আমরা বাচ্চাদের যেভাবে টেক্সট বুকের মধ্যে ব্যস্ত রাখি তাতে সৃজনশীল হয় না। সৃজনশীল করতে হলে শিক্ষকদের সৃজনশীল হতে হবে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষা ও পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমাতে হবে। বাচ্চাদের ভাবার সময় দিতে হবে। খেলার সময় দিতে হবে। তাদেরকে পরিবেশ থেকেই শিক্ষা নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  তানজীম উদ্দীন খান: বাণিজ্যের এ অভিযোগ শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর না। এটা বেসরকারি হাসপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যমান। এখন কথা হচ্ছে শিক্ষা তো আসলে ব্যবসা না। শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক কল্যাণের একটি উপাদান। সমাজকে এগিয়ে নেয়ার উপাদান। এই উপাদানকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দরকার সামাজিক ও যৌথ প্রচেষ্টা। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার এ বেসরকারিকরণের পক্ষে না। এখন রাষ্ট্র যখন এ কাজটি যথাযথ করতে পারছে না। তখন সে সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের একটি মজ্জাগত বিষয় হলো সবাই তার ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করতে চাই। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে সবাই তার ভাগ্যকে বদলাতে চাই। ভাগ্য বদলানোর এ সুযোগটা নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় তারা শিক্ষার্থীরা বেসরকারি পর্যায়ে ঝুঁকে পড়ে। / এআর /

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবকটি বিজনেস ওরিয়েন্টেড: আবুল কাসেম

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়?  অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিক জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের।যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। তিনি নিরপেক্ষ রাজনীতি চিন্তা ও তত্ত্বে বিশেষভাবে পরিচিত। দুই পর্বের বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেকারত্ম আমাদের দেশে অনেক বড় একটি সমস্যা।মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এ সমস্যা বাড়তে বাড়তে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী বেকারত্মের গ্নানি নিয়ে জীবন যাপন করছে।তারপরও আজও আমরা কার্যকরি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি।বেকারত্ম দূর করতে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে পারিনি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে করতে পারিনি কর্মমুখী।চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষি ও শৈল্পিক উৎপাদনের বিষয় আনতে পারলে বেকারত্ব অনেক কমে যেত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: এটা জাতি হিসেবে আমাদের বড় একটি সমস্যা।যদি বেকারদের কর্মসংস্থান হতো, জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা হতো, তবে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো অনেক এগিয়ে যেত।তবে বেকারত্বের এমন ভয়াবহতা সৃষ্টির কারণ হলো আমাদের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা না থাকা। বেকার সমস্যা সামনে রেখে জাতিকে উন্নত করতে শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনের কোন পরিকল্পনা নেই।স্বাধীনতা পরবর্তী এমন কোনো পরিকল্পনা কেউ নিতে পারেনি। ফলে বেকারত্ব দিনের পর দিন বেড়ে আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। যদি কর্মসংস্থানের বিবেচনা সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা হয়, তবে বেকার সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান করতে না পারলেও অনেকটা সমাধান হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কর্মসংস্থানের বিবেচনায় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন কোন দিক স্পষ্ট হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? আবুল কাসেম ফজলুল হক: শিক্ষা ব্যবস্থার একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত- দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা লাভ করার পরে সরাসরি উৎপাদনের কাজে জড়িত হতে পারে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ক্লাস ফাইভ পাশ করার পরেই কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প উৎপাদনের মতো কিছু প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া যায়। এটা করলে ক্লাস ফাইভ পাশের পরই বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এই কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা নিতে উৎসাহিত হবে। মোট কথা শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে যে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ উৎপাদনমুখী হবে। আর একটা অংশ প্রশাসনিক কাজে যাব।তৃতীয় অংশটি বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বা আবিষ্কারক হবে।অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে রাখতে হবে উৎপাদনমূখী শিক্ষা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষা কারিকুলাম শতকরা ১০ ভাগ উপযোগিতা রাখে।এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা কমিশন। শিক্ষা কমিশন যাদের নিয়ে গঠিত তাদের মধ্যে শিক্ষার কোন উপলব্ধি-ই নাই। সর্বশেষ ২০১০ সালে গৃহিত শিক্ষা নীতিতে শিক্ষাবীদ ও শিক্ষকের ভূমিকা কম আছে। এখানে ভূমিকা আছে যারা এনজিও করেন তাদের মতো লোকের।যারা বিদেশী নানা সংস্থার সঙ্গে জড়িত বা সুশিল সমাজের হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।শিক্ষা কমিশন করতে যথেষ্ঠ জাতীয়তা বোধের দরকার আছ।শিক্ষা উপলব্ধির দরকার আছে।এটা করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চেতনা না আসলে হবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে নতুন সংযোজন সৃজনশীল। এ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: সৃজনশীল পদ্ধতি ও ঘন ঘন পরীক্ষা পদ্ধতি অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ।এমন একটি পদ্ধতি চালু করা উচিত যেখানে ছাত্ররা আনন্দ খুঁজে পায়। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলে যে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। প্রাইমারী-মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের সিলেবাস পরিবর্তন করতে হবে।সেখানে যুগের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক বিষয় আনতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  আবুল কাসেম ফজলুল হক: এতে কোন সন্দেহ নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক একটা ব্যবসা কেন্দ্র।যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, তারা অর্থ আয়ের জন্যেই বিশ্ববিদ্যালয় করেছেন।দেখা যাচ্ছে একজন কোনো ব্যবসা করতেন। তিনি ভাবলেন একটা শিল্পকারখানা করবেন। হিসেব করে দেখলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য শিল্পকারখানা তৈরির চেয়ে লাভজনক।তাই সে লাভের হিসেব করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।সেখানকার শিক্ষায় সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক দিকটা দেখা যায় বেশি। এই ব্যবসায়িক লাভের কারণেই আজকে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এর প্রত্যেকটাই বিজনেস ওরিয়েন্টেড। যেটা একটা জাতির জন্য কখনও কল্যাণকর নয়।তারা যুক্তি দেখাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ওই সব দেশের মতো বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। এ অবস্থায় আমাদের যেটা করণীয় সেটা হলো-বেরসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালযে যে  বৈষম্য সেটা কমিয়ে আনা।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেশ, ভাষা ও জাতীয়তার বিষয়গুলোও সন্নিবেশ ঘটানো। আমাদের সংস্কৃতি সেখানে ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী চেতনা নিয়ে চলছে।এটা বন্ধ করা দরকার।এরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করছে,যারা বিদেশি নাগরিকত্বে আগ্রহী। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?  আবুল কাসেম ফজলুল হক: আজকে যে গাইড বই, কোচিং সেন্টার এটা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুবই ক্ষতি বয়ে আনছে।শিক্ষার গতি গাইড ও কোচিং সেন্টারমুখী হওয়ার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আনন্দ নেই। তারা এক প্রকার গলাধকরণের নীতিতে বেড়ে উঠছে।অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মনে করে কোচিং সেন্টারে যাওয়া উচিত নয়, তবে তারা এটা মনে করলেও বাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। এ সংক্রান্ত আরও খবর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকার জন্য শিক্ষাকে টার্গেট করেছে / এআর /  

বেকারত্ব দূর করতে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি: অধ্যাপক শফি আহমেদ

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিক জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় অধ্যাপক শফি আহমেদের। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৪১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার, শিক্ষার্থীদের নানাবিধ সমস্যা ও তরুণ সমাজের বেকারত্ম নিয়ে ছিলেন সরব। বর্তমানে তিনি পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে যে, উচ্চ শিক্ষা নিয়ে চেয়ার-টেবিলের চাকরি করবো। বরং চাকরি ছাড়াও সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়-এ ধারণা পোষণ করতে হবে। তিনি বলেন. শুধু যে চাকরিতেই  সম্মান এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিদেশিরা সব ধরণের কাজকে সম্মানের সঙ্গে দেখে। সে কারণে সেখানে বেকার কেউ থাকে না। বাংলাদেশে চাকরি না পেলেই শিক্ষিতরা নিজেকে বেকার ভাবেন। কিন্তু তাকে বুঝতে হবে যে শিক্ষিত হওয়ার মানে এই নয় যে, তাকে চাকরিই করতে হবে। সে সব কাজই করতে পারবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? শফি আহমেদ: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ নিয়ে অনেক আগে থেকেই কথা বলে আসছি। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দেশ ও দেশের বাইরে প্রশংসিত ও নিন্দনীয় দুটিই হয়েছে।কিছু ভালো দিকের কারণে প্রশংসিত হয়েছে।আবার শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু গলদ রয়ে গেছে, যার কারণে নিন্দনীয় হয়ে আসছে। আমাদের শিক্ষাদান ও গ্রহণের মধ্যে একেবারে মৌলিক ত্রুটি রয়ে গেছে। আর এই ত্রুটির কারণেই আমাদের গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছেলে-মেয়েদের জ্ঞান সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এ সমস্যা খ্যাতিমান স্কুলগুলোর ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেও। আমরা সড়কে যানজট নিয়ে অনেক কথা বলি। অনেক কিছু করি। আমাদের বিশ্লেষকরাও নগর পরিকল্পনার কথা বলতে থাকেন। কিন্তু আসলে যে কি কি ক্ষতি হচ্ছে এ রকম তালিকা তৈরি করে আমরা কথা বলি না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও সেই রকম কিছু মৌলিক ও বাস্তবিক বিষয়ের ঘাটতি আছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, আমি মেহেরপুরে গিয়েছিলাম একটি স্কুলের ভিজিটে। সেখানে ছেলে-মেয়েদের জিজ্ঞাসা করা হলো শব্দ শক্তি কি? তারা সহজে বইয়ের গদবাধা মুখস্থ উত্তর দিয়ে দিল।কিন্তু যখন জানতে চাওয়া হলো কি করে শব্দ শক্তি তৈরি হয়।এর ব্যবহারিক দিক বল। তখন কেউ উত্তর দিতে পারলো না।বোঝা গেল শিক্ষার্থীরা বইয়ের মুখস্ত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ আছে। তাদের জ্ঞান সম্প্রসারিত হয়নি এবং শিক্ষকরাও তাদের জ্ঞান সম্প্রসারণের শিক্ষা দেয়নি। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে প্রতিনিয়ত সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী আমরা কি আমাদের শিক্ষাকে সাজাতে পেরেছি? পারি নাই। দিন গেলেই প্রযুক্তিগত দিকগুলোর চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেটা কতটুকু ঢোকাতে পেরেছি? পরিবর্তীত এ বিষয়গুলি অবশ্যই পাঠ্যবইয়ে আনতে হবে। তবেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মমুখী হবে। এছাড়া আমাদের মনোভঙ্গির মধ্যে এখনও আছে যে, আমাদের এমএ পাস করতেই হবে। এমএ পাস করলে আমার বাবা ও পরিবার খুশি হয়, আমিও খুশি। আমি মনে করি আমাদের বেকারত্বের বড় কারণ হচ্ছে আমি কি ধরণের কর্ম করতে চাই, কিসের মাধ্যমে আমি আমার জীবনকে গড়ে নিতে পারি, কিসের মাধ্যমে আমি প্রতিষ্ঠিত হতে পারি সেই জায়গাটা স্পষ্ট হওয়া উচিত। সেই স্পষ্টটা শিক্ষার মাধ্যমেই করতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে যে প্রতিষ্ঠিত শুধু উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে নয়, কারিগরি জ্ঞান নিয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায়। আমাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে যে উচ্চ শিক্ষা বা চেয়ার-টেবিলের চাকরি নয়, অল্প শিখে এবং চাকরি ছাড়াও সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  শফি আহমেদ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রাই সবই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। তারা কখনও কেউ হয়তো শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা তাদের শিক্ষা নিয়ে ভাবনা কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল, এমন দাবি থেকেই তারা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছে। আমাদের দেশে গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে। যারা কিছুটা ভালো করছে। বাকিরা সবই তো নামকা অস্তে। তারা ভাড়া বাসায় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছে। ব্যবসায়িক মনোভঙ্গির কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এমন একটি পর্যায়ে এসেছে যে চাকরিদাতারা তাদের শিক্ষার্থীদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। অর্থাৎ ব্যবসায়িক কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে গ্রেট বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের এ গ্রেট পাওয়া ছাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বি গ্রেট পাওয়া ছাত্রের মেধার সঙ্গে পেরে উঠছে না।টাকার বিনিময়ে অল্প সময়েই শিক্ষার্থীদের গ্রেট ও সনদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।যে সনদে শিক্ষার্থীরা চাকরির আবেদন পর্যায়েই পিছিয়ে পড়ছে। কারণ যখন দেখা হয় যে ভালো রেজাল্ট করেও তাদের ভীত দুর্বল। তখন বাছাই পর্ব থেকেই তাদের বাদ দেওয়া হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গ্রেটিংয়ের কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের গ্রেটিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। আগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রেটিং ছিল না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?  শফি আহমেদ: আমরা ছাত্র থাকাবস্থায় কোচিং নামক শব্দও ছিল না। কিন্তু এখন শিক্ষার জন্য কোচিং একটা অবিচ্ছেদ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দিন ধরেই এটা চলছে। এখানেও চলছে এক ধরণের বাণিজ্য। যেখানে মূল শিক্ষার ধারাকে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থলে কোচিংকে বড় করে দেখা হচ্ছে। যার জন্য আমাদের শিক্ষকরাও দায়ী। শিক্ষকরা মূল প্রতিষ্ঠান স্কুলে পাঠদানে মনোনিবেশ যতটা না হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে কোচিংয়ে। কারণ কোচিং থেকে তার বাড়তি আয় হচ্ছে। ফলে কোচিং আর স্কুলের বিষয়টি এখন ডাক বিভাগ আর কুরিয়ার সার্ভিসের মতো হয়ে গেছে। সাধারণ ধারণায় ডাক বিভাগ সেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আর কুরিয়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই বলা যায় কোচিং বন্ধে স্কুলের শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষককে নৈতিকতায় ফিরে আসতে হবে। স্কুলের বেতন তুলে কোচিংয়ের সামান্য আয়কে বড় করে দেখলে হবে না। আবার অভিভাবকদেরও কোচিং মুখীতা বন্ধ করতে হবে। মোট কথা  শিক্ষক, অভিভাবক ও সরকার সবাইকে চাইতে হবে যে কোচিং বন্ধ হবে। সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। / এআর /

শিক্ষায় বাণিজ্য বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে: অধ্যাপক আমিনুল হক

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনসংখ্যার বোনাসকাল পার করছে দেশ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারেও প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, বিশাল এ অর্জন ও সম্ভাবনার পেছনে চ্যালেঞ্জ ও তা টপকানোর উপায় কি হতে পারে। অন্যদিকে একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? এসবের সুলক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের। একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) অনলাইনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বাণিজ্য বন্ধে সরকারের এককভাবে চাপ দিয়ে কিছু হবে না। প্রকৃত অর্থে এটা বন্ধ করতে হলে দরকার সঠিক অ্যাসেসমেন্ট। দরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। উদ্যোক্তারা যদি চায় দেশের পরবর্তী প্রজন্মকে তারা সেবা দিবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গড়ে ওঠার অন্তরায় সৃষ্টি করবেন না। তাদের এমন সিদ্ধান্তে এক দিনেই শিক্ষা বাণিজ্যে পরিণত না হয়ে সেবায় পরিণত হবে। এ ব্যাপারে সবার আগে উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?   আমিনুল হক: একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একচ্ছত্রভাবে কাজ করছে। কেন তারা  খেয়ালখুশি মতো ফি নির্ধারণ করছে। এর কারণ হচ্ছে যে সমাজে শিক্ষা অর্জনের যে ইতিবাচক ধারা আমরা তৈরি করতে পেরেছি। সেখান থেকেই মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে যে না ছেলে-মেয়েদের পড়াতে হবে। তাই শিক্ষার এতো প্রসার ঘটেছে। শিক্ষা এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসা কিন্তু একটা আন্দোলনের ফসল। এখন সব বাবা-মা চাচ্ছেন যে, তাদের সন্তানরা লেখা-পড়া করুক। তাদের পিছনে খরচ করি। কিন্তু সেখানে ফি কত হবে? কি পরিমান খরচ হবে? এই অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। অ্যাসেসমেন্টটা দুই জায়গা থেকে হতে পারে। একটি হলো-সরকার এখানে রেগুলেট করবেন। আর একটা জায়গা হলো-শিক্ষা খাতে যারা উদ্যোক্তা হিসেবে আসেন তাদের মানবিক হওয়া। উদ্যোক্তাদের ভাবতে হবে যে আমি সেবা দিব?  নাকি শুধুই ব্যবসা করবো? উদ্যোক্তাদের এ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি না আসলে সরকার চাপিয়ে দিলেও কাজের কাজ কিছু হবে না। কারণ সরকার চাপ দিরে যা হবে সেটা হলো সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়বে। যারা আজ উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠা তারা যদি চিন্তা করেন যে, যারা আমার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি তাদের আমি সেবা দিতে চাই। তাহলে কিন্তু চিত্র একদিনে পরিবর্তন হয়ে যাবে। তারা যদি সিদ্ধান্ত নেন যে , তাদের যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে তার থেকে ৫ শতাংশ লাভ করবেন। দেশের স্বার্থে এর বেশি আর লাভ করব না তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে আর বাণিজ্যের উৎস থাকবে না। শিক্ষা সেবায় পরিণত হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?   আমিনুল হক: এখন ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর অনুপাতে একজন শিক্ষক আছেন। এসব শিশুদের অভিভাবকরা কোচিংয়ে টাকা দিচ্ছেন। তাদেকরে যদি বলা হয় আপনারা কোচিংয়ে টাকা দিয়েন না। আমি স্কুলে ২০ জন ছেলে-মেয়ের অনুপাতে একজন শিক্ষক নিচ্ছি। অভিভাবকরা কিন্তু স্কুলে টাকা দেবে না। অভিভাবকরা কোচিংয়ে টাকা দিয়ে শ্রম নষ্ট করে, সময় নষ্ট করলেও স্কুলে কখনও টাকা দিবে না। অভিভাবকদের এ কোচিংমুখী হওয়ার কারণে বাচ্চাদের খেলার সুযোগ নাই। সারাদিন কোচিংয়ে দৌঁড়ে সময় পার করছি। এখন কোচিংয়ে যে ছেলে বা মেয়ারা পড়াচ্ছে তাদের যদি রাষ্ট্র কর্মসংস্থান দেয় এবং অভিভাবকদের যদি কোচিংয়ের পরিবর্তে স্কুলমুখী করতে পারি তবে তো কোচিং থাকবে না। উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান ও স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বাড়িয়ে অভিভাবকদের স্কুলের প্রতি আস্থা তৈরি করতে পারলে কোচিংয়ের রমরমা কমানো যাবে। তাছাড়া বারবার ঘোষণা দিয়ে কোচিং প্রকৃত অর্থে কমানো দূরহ ব্যাপার।   আমাদের স্কুলে ছেলে-মেয়েরা কতটুকু পড়বে কি কি বিষয় পড়বে তার  সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই ২০ ছাত্রের জায়গায় একজন শিক্ষক আছে। তারা স্কুলে সেসব শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নিয়ে সুন্দরভাবে লেখা-পড়া শেষ করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? আমিনুল হক: এখন বাচ্চাদের বড় হওয়া বা গড়ে ওঠার ধরণ পাল্টেছে। আগে আমরা অনেক সময় পরিবারে বাবা বা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ভয়ে কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু এখন ছেলে-মেয়েরা বাবার সঙ্গে কথা বলছে। বাবার সঙ্গে খেলছে। তাদের আবদার জানাতে পারছে নির্ভয়ে। পরিবারের সেই যে বেড়ে ওঠাটা আগের তুলনায় ভিন্ন। সেই ভিন্নতা স্কুল পর্যায়েও। আগে আমরা স্কুলের শিক্ষক দেখলে সামনে যেতে ভয় পেতাম। দূর  থেকেই মাথা নুয়ায়ে ফেলতাম। এসবের মধ্যে ভয়ও যেমন ছিল। সম্মানও তেমন ছিল। আগে একজন শিক্ষকের পরিচয় পেলেই সবাই একটা শ্রদ্ধা দেখাতো। এখন  সেই  শ্রদ্ধাবোধটা এমন পর্যায়ে এসেছে যে  একজন ছাত্র শুধু তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষককেই সালাম দিচ্ছে। আর অন্য ডিপার্টমেন্টের হলে সালাম দেওয়াটা ততটা প্রয়োজন মনে করছে না। তবে এ সালাম না দিয়ে যে সুস্পষ্টভাবে শিক্ষকের সম্মান দেওয়াকে ইগনোর করছে তা কিন্তু না। আসলে বর্তমান প্রজন্মে কাছে সেই চলটায় কমে গেছে যে একজন বয়স্ক মানুষ তাকে সম্মান করতে হবে। এটা সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও বন্ধন থেকে বেরিয়ে নগরায়ন প্রবণতার কারণে হয়েছে। যার কারণে দেখা যায় একটি ছেলে যখন ঢাকায় থাকছে তখন তিনি কোন বয়স্ককে সম্মান করছে না। পাশে বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাকে সালাম তো দিচ্ছেই না, উল্টো তার সামনে সিগারেট টানছে। কারণ যুবক তাকে চিনে না। সেই একই যুবক যখন গ্রামের বাড়ীতে যাচ্ছে-তখন কিন্তু  সে গ্রামের ছোট দোকান থেকেও একটি বিড়ি কিনে খেতে ইতস্তত করছে। ভাবছে কে কোথা থেকে দেখে ফেলবে। সেখানে তার সামাজি  শাসনের ভয় আছে। সেখানে বয়স্ক কেউ সিগারেট খেতে দেখলে খারাপ ভাববে, তার পরিবার বা বংশের সম্মান নষ্ট হবে। সে ধারণায় যুবককে সিগারেট টানা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে। আবার   বয়স্ককে সালামও দিতে হচ্ছে। অবশ্য যে গ্রামে যত বেশি নগরায়ণের প্রভাব পড়েছে সে গ্রামে তত বেশি এ  সম্মান দেয়ার প্রচলন কমেছে। অধিক নগরায়ণের ফলে আজ শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষক ও বয়স্কদের সম্মান দেয়া যেমন কমেছে। তেমন বেড়েছে অনৈতিক কার্যকলাপ। বলার কেউ না থাকায় বা সামাজিক শাসন না থাকায় তারা সহজেই অপকর্মে লিপ্ত হতে পারছে। ফলে মাদক, জুয়া ও বড় ধরণের অপরাধের জন্ম হচ্ছে। / এআর /       

দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষাকে করতে হবে আন্তর্জাতিক মানের: মাহফুজা খানম

অধ্যাপক মাহফুজা খানম। ১৯৬৬ সালে যিনি ছিলেন ডাকসুর ভিপি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। বর্তমানে বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের দিত্বীয় মেয়াদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক  ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বেকারত্ব-কর্মসংস্থান, ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনসহ নানাবিধ দিক নিয়ে বরেণ্য এ শিক্ষাবীদের মুখোমুখী হয়। তিন পর্বের বিশেষ এ সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? মাহফুজা খানম: আজ বাংলাদেশে চাকরি নাও পাওয়াটা  একটা বড়  প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ লাভ করেছিলাম। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া একটি জাতিকে তিনি দাঁড় করাতে পারবেন না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে জাতি একটা শিক্ষার ভিতর দিয়ে বিশ্বপ্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করবে। সেই কারণেই তিনি কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশন করলেন। ড. কুদরহ এ খুদাকে নিয়ে ১৯৭৩ সালে শিক্ষা কমিশন হলো। এটা প্রকাশিতও হলো। কিন্তু কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু চলে গেলেন। ফলে কমিশনের বাস্তবায়নটা থমকে গেলে। এরপর যারা ক্ষমতায় এলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তাদের অবস্থান ছিল। যে কারণে পরবর্তীতে অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে। কিন্তু এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাটা কি হবে? সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন দিয়েছেন। কিন্তু তা কতটা কার্যকরী তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ড. কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশন বলেছিল একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে। ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষা অবর্শই থাকতে হবে। এ কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। কারণ সব তরুণ যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে সেটা দরকার ছিল না। তাই ৬০ শতাংশ যদি আমার সাধারণ শিক্ষা হয় তবে ৪০ শতাংশ আমি কারিগরি শিক্ষায় নেব। আমরা সে সময় নতুন জাতি হিসেবে মাত্র যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমরা সে সময় একটা ভগ্নদশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। সে সময়ের কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশনের ভিতর দিয়ে শিল্প  ও কৃষি প্রত্যেকটা বিষয়ের কারিগরি শিক্ষাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেটা সম্ভব হয়নি। এরপরে আমরা দেখলাম আমাদের শিক্ষায় ৩টা দিক চলে এলো। প্রথমটি হলো সাধারণ শিক্ষা। দ্বিতীয়টি হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। তৃতীয়টি হলো ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা। শিক্ষার এ তিন ধারায় তরুণ প্রজন্মকে বিভাজিত করা হলো। যেমন মাদ্রাসা শিক্ষাগুলোতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণীর ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া শুরু হলো।যেখানে আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান কোথায় গিয়েছে তার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা আর একটা পিছনের দিকের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। আর একটা হলো ইংরেজি মাধ্যম। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলে-মেয়েরা ও লেভেল, এ লেভেল সম্পন্ন করছে। এরপর তারা এদেশে থাকছে না। তারা এদেশে জন্মেছে। এ দেশের বায়ু নিচ্ছে, শ্বাস গ্রহণ করছে। খাদ্য খাচ্ছে। বড় হচ্ছে। তারপর অন্য দেশ নিয়ে ভাবছে। কারণ তাদের শিক্ষা কারিকুলামে নজরুল নাই। সুকান্ত নাই। রবীন্দ্রনাথ নাই। বঙ্কিম চন্দ্র নাই। ফলে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক –বাহক কিন্তু  তারা হচ্ছে না। তারা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি অবহে গড়ে উঠছে। এদের শিকড়টা বাংলাদেশে হলেও পাস করার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশই তাদের পছন্দের জায়গা হচ্ছে। আর থাকলো সাধারণ শিক্ষা। এখন সাধারণ শিক্ষা আসলে কত শতাংশ এ শিক্ষায় শিক্ষিত। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সাধারণ ছাত্রদেরও যে সিলেবাস তাতে ছাত্রদের সঙ্গে যেন একটা গিনিপিকের মতো আচারণ করছে। এ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে চলছে একটার পর একটা পরীক্ষা। না তারা সিলেবাসের বিষয় আত্মস্থ করতে পারছে। না তারা প্রফুল্ল চিত্তে লেখা-পড়া করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? মাহফুজা খানম: যে শিক্ষা ব্যবস্থাটি আজকে আমাদের দেশে চালু রয়েছে, সেটা অবশ্যই জ্ঞানের। তবে সেটা কোনভাবেই পরবর্তী জীবনে ব্যবহারের নয়। আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে, সেটা আমরা বাধ্য হয়ে গ্রহণ করছি। এটা আমাদের আশা আকাঙ্খার জায়গা পূরণ করতে পারছে না। এ শিক্ষায় যদি আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিজেদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিতে না পারে। তবে ভবিষ্যৎ তো আমাদের কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমি বলবো যথেষ্ঠ দেরি হয়ে গেছে। এখন আমাদের সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনার। আমাদের বড় সম্পদ আমাদের তরুণ সমাজ। এদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তারা যেন দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কিছুদিন আগে আমরা লক্ষ্য করলাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের পরীক্ষায় মাত্র ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ পাস করেছে। পাসের এ হারকে আপনি কিভাবে দেখছেন? মাহফুজা খানম:  দেখুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তারাই অংশ নিয়েছিল যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস, গোল্ডেন প্লাস বা ভালো রেজাল্ট করেছে। এখন এমন একটি পরীক্ষায় যদি ৮৯ দশমিক ১১ শতাংশ পাসই না করে। তবে কি আমি বলবো যে উচ্চ শিক্ষায় আমার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে? বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে সোনার বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সেটা পূরণ হচ্ছে? না। মেধার কোথাও না কোথায় ঘাটতি রয়েই গেছে। যার কারণে এটা হলো। এটার জন্য তৎপর হওয়া দরকার। আমাদের ঘাটতি খুঁজে বের করে তা দূর করতে হবে।  ছেলে-মেয়েদের সঠিকভাবে শিক্ষা বা জ্ঞান পাওয়ার সুযোগ করতে হবে। / এআর /

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকার জন্য শিক্ষাকে টার্গেট করেছে

বাংলাদেশে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক অনবদ্য নাম অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম । ছাত্র জীবন থেকেই শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ছিলেন আগ্রসৈনিক। ১৯৬৬ সালে হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসুর) প্রথম নারী ভিপি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। একইসঙ্গে বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের দ্বিতীয় মেয়াদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বেকারত্ম-কর্মসংস্থান ও ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতাবিষয়ক তিন পর্বের বিশেষ এ সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম।     একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাগামহীন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যের এ বেড়াজাল থেকে কিভাবে বের করে আনা যেতে পারে? মাহফুজা খানম: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রান্টস কমিটি দিচ্ছে। সেখানে শিক্ষার বদলে হচ্ছে ব্যবসা। ব্যবসা করার জন্য আমরা শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছি। এর চেয়ে দুঃখের ও লজ্জার কি হতে পারে। যিনি পড়াচ্ছেন, তিনি প্রশ্ন করছেন, তিনিই খাতা দেখছেন, আবার তিনিই আমার ডিগ্রি দিয়ে দিচ্ছেন। বিষয়টি এমন হয়েছে- আমি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আরো ছাত্র চাই। আরো টাকা চাই। যার কারণে একই ব্যক্তি পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন ও মূল্যায়ন করছেন। আমি জানি না গ্রান্টস কমিশন কতটুকু এটার লাগাম টানতে চেষ্টা করছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের সে আগ্রহকে পুঁজি করে বেপরোয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা সরকার বারবার ঘোষণা দিয়েও বন্ধ করতে পারছে না। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? মাহফুজা খানম: এরই মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি যে শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছিল- ‘এসো নিজে করি’। যেখানে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন হয়েছে। তারপর তাদের উপর আনা হলো সৃজনশীল পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষকরাই জানতে পারলো না সৃজনশীলতা সম্পর্কে। সেখানে ছাত্ররা কিভাবে ভালো করবে। শিক্ষক ও ছাত্ররা যখন বুঝতে পারছেন না, তখন অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছুটছেন। কার কাছে গেলে তার বাচ্চাকে শেখানো যাবে এ চিন্তায় তারা ব্যস্ত থাকছেন। তারা কোচিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ফলে কোচিং বাণিজ্যও রমরমা হয়ে উঠছে। কোচিংগুলোতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রদের রেজাল্ট ভালো করতে তারা অসদুপায় অবলম্বন করে প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে। যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারে না। তাই আমাদের গোটা শিক্ষা পদ্ধতিকেই ঢেলে সাজাতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? মাহফুজা খানম: মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ছেলে-মেয়েদের তৈরি হচ্ছে না। যেভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম নানা ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত হচ্ছে। অপকর্মের মধ্যে শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরাও আশঙ্কাজনক হারে জড়িয়ে পড়ছে। তারা মাদক সেবনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাতে নানা ধরণের সামাজিক সমস্যা তারা সৃষ্টি করছে। কিন্তু আগে আমাদের সময় ছাত্র সমাজ-ই ছিল মানবিক মূল্যবোধের সোপান। আমরাই তো ছয় দফা দিয়েছেলাম। মানুষ সেগুলো গ্রহণ করতো। এখন শোনা যায় ছাত্ররা চাঁদাবাজিও করে। আবার তারা দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবে না। তাদের আন্দোলনও এখন পূর্ণমাত্রায় জাতির স্বার্থে হয় না। জাতিও তাদের উপর ভরসা রাখতে পারে না। কারণ ছাত্রদের মাঝে সেই মানবিকতা নেই। আজ আমাদের তরুণ সমাজ যেন অপরাধে ডুবে গেছে। ছেলে-মেয়েদের জীবনবোধ সম্পর্কে যেমন ধারণা বা আচরণ থাকা উচিত, তেমনটি পাওয়া যাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের কথা। ঢালাওভাবে যদি এ কথা না বলি তবে বলবো হ্যা কিছু ছেলে-মেয়ে এখনও ভালো আছে। ভালো করছে। তবে তারা এক পাসে চলে গেছে। আমি বলবো যারা আমাদের সমাজপতিরা আছেন, যারা শিক্ষক আছেন, যারা আগামীতে পথ দেখাবেন, তারা যেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় গলদ আছে, তা নিয়ে ভাবেন। এই গলদগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার জোর দাবি উঠেছে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে। তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক মনে করছেন? মাহফুজা খানম: এখন সেশনজট আগের মতো নেই। ৩৫ বছরে যদি একটি ছেলে বা মেয়ে চাকরি জীবনে ঢোকে। তো সে জীবনে অন্য কাজগুলো কিভাবে করবে? তার একটা সংসার জীবন হবে। তার পেশাগত জীবন হবে। তাকে দক্ষ ও পেশাদারি হতে হবে। যদি ৩৫ বছরে চাকরিতে প্রবেশ করে তবে এ দক্ষ হওয়ার সময়টা কখন পাবে? আমি তো চাকরিতে ঢুকেছিলাম ২২ বছরে। আমি মনে করি ৩০ বছর-ই যথেষ্ঠ। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছে। আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিভাবে দেখছেন তাদের এ কোটা সংস্কার দাবিকে? মাহফুজা খানম: তুমি ভালো ছাত্র- আর আমি খারাপ, কিন্তু কোটার কারণে আমি চাকরি পেলাম। তুমি বেকার থাকলে এটা হতে পারে না। আমি মনে করি মেধাকে সর্বোচ্চ স্থান দিতে হবে। কোটা পিছনে পড়ে থাকাদের জন্য থাকতে পারে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য থাকতে পারে। আমি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এ কোটা কখনও কাজে লাগায়নি। সার্টিফিকেটও নেয়নি। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই-যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানদের ক্ষেত্রে ঠিক আছে। অর্থাৎ নাতি-নাতনী পর্যায়ে সঠিক নয়। আমার কথা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সম্মানের জায়গাতে থাকবে। তাদের অর্থ দেয়া হচ্ছে, বাড়ি করে দেয়া হচ্ছে, আরো কিছু দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোটা রাখা হবে এটা আমি একেবারেই সমর্থন করি না। এমজে/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি