ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৮:৫০:০৭, বুধবার

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা রয়েছে আর তা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পাগল, মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, মানসিকভাবে অসুস্থ বা ভূতের দ্বারা আক্রান্ত। কিন্তু এটি একটি স্নায়বিক সমস্যা। এর ফলে রোগী কথা বলতে বা বুঝতে, নতুন জিনিস শিখতে এবং সমাজে চলতে অসীম সমস্যার সম্মুখীন হন। প্রতিবন্ধী রোগীদের এই স্নায়ুবিক পার্থক্য তাদের অক্ষমতা নয়। এই পার্থক্যের জন্য প্রতিনিয়ত তাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। এর জন্য যারা এই ভিন্ন চিন্তার মানুষ, তাদের জন্য সরকারীভাবে, পরিবার বিভিন্ন জায়গায় সহযোগীতার মানসিকতা তৈরি করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা ভিন্ন মস্তিস্কের তারা আত্মঘাতী পথেরও অনুসরণ করতে পারে। যার কারণে তাদের পারিবার তাদের স্কুলের শিক্ষকসহ তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের আচরণ ক্ষমতা ও তাদের চিন্তা ভাবনা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তাদের জন্য আলাদা পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিবন্ধী কি? প্রতিবন্ধী নিউরোলজিকাল বা স্নায়ুবিক সমস্যা যাতে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বায়োকেমিক্যাল কাঠামোর কারণে এই নিউরণগুলি অত্যাধিক সংবেদনশীল। আর অটিজমযুক্ত শিশুরা উচ্চ আওয়াজ, উজ্জ্বল আলো বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে সহ্য করতে পারেনা। এমন বাচ্চাদের কথা বলাতে সমস্যা, বন্ধু তৈরি বা শারীরিক ফিটনেসেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এছাড়া প্রতিবন্ধী হচ্ছে মস্তিষ্কের বিন্যাসগত সমস্যা। প্রতিবন্ধী শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার ফলে শিশু শুধুমাত্র নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শিশু যখন শুধু নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে তখন তার অন্যদের সাথে যোগাযোগ, সামাজিকতা, কথা বলা, আচরণ ও শেখা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইদানিং প্রতিবন্ধী নিয়ে মানুষ কিছুটা জানলেও এ রোগটি আগে থেকেই ছিল। শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি বলেই রোগটিকে নতুন মনে হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রথম ধারণা দেন হেনরি মোস্‌লে নামে একজন ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট ১৮৬৭ সালে। তিনিই প্রথম লক্ষ্য করেন যে কিছু কিছু শিশুর সামাজিক ও শারীরিক আচার-আচরণ এবং বুদ্ধিমত্তা অন্যান্য বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের থেকে আলাদা । যেসব কারণে প্রতিবন্ধী হয়? প্রতিবন্ধীর জন্য শিশুরা কখনো দায়ী নয়। এটি জন্মগত একটি সমস্যা। প্রতিবন্ধী হওয়ার সঠিক কারণ এখনো অজানা রয়ে গেছে। তবে গবেষণার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীর জন্য অনেকগুলো কারণকে দায়ী করা হয়েছে। ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে, গবেষকরা আবিষ্কার করেছিলেন যে,`এক্স` ক্রোমোসোমের পরিবর্তনগুলি প্রতিবন্ধীর জন্য ঝুঁকি বাড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। যখন ছেলেদের মধ্যে এই পরিবর্তন হয় এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এক বিশেষ জিন যেখানে মিউটেশনগুলি নির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধীর সঙ্গে যুক্ত হয়। যা মানুষের মধ্যে প্রোটিনের একটি প্রকার। কারণ এই জিনের মিউটেশনগুলি মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে হাইপার-কানেক্টিভিটি সৃষ্টি করে। ভ্রুণ বৃদ্ধির প্রারম্ভিক অবস্থায় স্বাভাবিক মস্তিস্কের বৃদ্ধিতে গোলমাল দেখা যায়, জিনের অস্বাভাবিকতার জন্য যা  মস্তিস্কের বৃদ্ধি এবং মস্তিস্কের কোষগুলির নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। সম্ভবত জিন ও  পরিবেশগত উপাদানের প্রভাবে এ এস ডি রোগের সৃষ্টি হয়। পরিবেশগত ও প্রারম্ভিক কারণ অনেক তাত্ত্বিক ও গবেষকগণ জানিয়েছেন যে, কিছু পরিবেশগত এজেন্ট যেমন অ্যালকোহল প্যারাসিটামল এবং থ্যালিডোমাইড মত এক্সপোজার গর্ভবতী মহিলারা ব্যাবহার করে, যা সম্ভাব্য অটিজম ঝুঁকি সম্পর্কিত কারণগুলির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যার কারণে জন্মের ত্রুটি হতে পারে। এছাড়া এমএমআর  টিকা ও প্রতিবন্ধীর মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে। এসব কারণ ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে প্রতিবন্ধী হওয়ার জন্য। মাতৃস্বাস্থ্য গর্ভবতী মহিলাদের যাদের ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা এবং প্রদাহজনক রোগের মতো রোগ রয়েছে তাদের অটিস্টিক শিশু জন্মের বেশি ঝুঁকি রয়েছে। এই রোগগুলি ভ্রূণ এবং ভ্রূণীয় টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যা উন্নয়নশীল ভ্রূণের স্নায়ুতন্ত্রের উপর বিধ্বংসী। জন্মগত ভাইরাল সংক্রমণ প্রতিবন্ধীর জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। গবেষণায় দেখা যায় যে, চাকরি না থাকা, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট বা দুঃখ দুর্দশা জীবনযাত্রার ঘটনাগুলি কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী বা আধ্যাত্মিক বিষণ্ণতার কারণ হয়। যার কারণে গর্ভবতী নারীরা হতাশার মধ্যে থাকে। যা তার অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে। আচরণগুলি ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে প্রতিবন্ধীর সঙ্গে। এ কারণেই পরিবেশগত চাপগুলি জিন-পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে। যা মায়ের অ্যামনিওটিক টেসটোসটের মাত্রা বাড়ায়। মস্তিষ্কের প্যাটার্ন সনাক্তকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জটিল সিস্টেমগুলি বিশ্লেষণ করে যখন শিশুর জন্ম হয় তখন সহানুভূতি ও যোগাযোগ হ্রাস করার ফলে এটি ক্রমবর্ধমান ভ্রূণে মস্তিষ্কের বিকাশকে পরিবর্তন করতে পারে না। প্রতিবন্ধীর ধরন অটিজম সঙ্গে কোন শিশুর সম্পর্ক নেই। এটা যে কোনো ব্যাক্তির হতে পারে। অটিজম নিয়ে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে না। অটিজম সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে। ক্লাসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের ভাষা এবং শব্দ ভাণ্ডারের উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটে ক্লাসিক অটিজমে।  এই প্রতিবন্ধী শিশুরা সামাজিক ও যোগাযোগের চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়। এছাড়া অস্বাভাবিক আচারণের পাশাপাশি পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণও দেখা দিতে পারে।   উচ্চ কার্যকরী প্রতিবন্ধী এই ধরনের অটিজম রোগিরা Asperger সিন্ড্রোম হিসাবে পরিচিত। তাদের মধ্যে অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে অঙ্ক এবং সঙ্গীতে পারদর্শী হতে দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিভা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। সেভেন্ট প্রতিবন্ধী এই ধরনের প্রতিবন্ধী রোগীদের কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। বহির্বিশ্বের জনসাধারণ ও সামাজিক অনুমোদনের মান পূরণের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধীর সঙ্গে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। তবে তারা অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভা প্রদর্শন করে থাকে, যা তাদের ফটোগ্রাফিক মেমরি ব্যবহার করতে সক্ষম করে। এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা শিশুদের প্রতিভাধর হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়। অপটিক্যাল প্রতিবন্ধী এই ধরনের প্রতিবন্ধী রোগীরা সম্পূর্ণ অ অটিস্টিক। এই প্রতিবন্ধী শিশুরাও সাধারণত অনেক জ্ঞানী এবং বুদ্ধিজীবী ধরনের হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধীরা তাদের সামাজিক যোগাযোগমূলক আচরণ ও তাদের অধিকার ভুলে যায়, তবে উচ্চ কার্যকরী অটিজমসহ শিশুদের ক্ষেত্রে আচরণ ও যোগাযোগের সামাজিকভাবে উপযুক্ত উপায়গুলো শেখানো যেতে পারে। প্রতিবন্ধী প্রতিরোধে করণীয় প্রতিবন্ধীর যেহেতু কোনও নিরাময় নেই, তাই সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এটি প্রতিরোধ করতে হবে। পরিবারে কারো প্রতিবন্ধী অথবা কোন মানসিক এবং আচরণগত সমস্যা থাকলে, পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত গর্ভধারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা না করা, পর্যাপ্ত ঘুম, শিশুর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের পিতামাতারা অনেক ধৈর্যশীল হতে হবে। তাদের প্রতি সুন্দর সহজ, সরল ব্যবহার করতে হবে। তাদের প্রতি সর্বদা হাসি, খুশি এবং চলাফেরা খেলাধুলার যেন বিঘ্ন না ঘটে তা সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে। লেখক: রুকমিলা জামানচেয়ারম্যান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (লেখাটি লেখকের ইংরেজি কলাম থেকে ভাষান্তরিত)
বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণ

চতুর্দশ শতকে ইউরোপের রেনেসাঁর শুরু থেকে ষষ্ঠদশ শতকের সায়েন্টিফিক রেভ্যুলেশনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার যে শুরু তা অব্যাহত থাকে একেবারে আধুনিক যুগের বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। এক সময়ে পুরো আমেরিকাসহ আফ্রিকা, এশিয়া জুড়ে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিশ্ব ক্ষমতা বলয়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকে ইউরোপের হাতে। আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পরেও আরো প্রায় দুইশ’ বছর এশিয়া ও আফ্রিকাতে ইউরোপের শাসন বহাল থাকে। সে সময়ের বিশ্বকে এককেন্দ্রিক, অর্থাৎ ইউরোপ কেন্দ্রিক বলা গেলেও ক্ষমতাবলয়ের বিস্তার নিয়ে ইউরোপের দেশসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ অনবরত লেগেই থাকত। ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ছিল প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ। স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের দেশগুলো ক্ষমতাবলয়ের ভাগাভাগিতে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিযোগী হিসেবে লিপ্ত ছিল। তার জের ধরেই দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ হয় এবং দুটো যুদ্ধেরই কেন্দ্রভূমি ছিল ইউরোপের ভূখণ্ড। প্রথম মহাযুদ্ধের পরে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মানচিত্রের সুচনা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ব্লক এবং ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদি ব্লকের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতায় বিশ্ব দুই ভাগ হয়ে যায়। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং তখন থেকে পুঁজিবাদি ব্লক বা পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বের ফ্রন্টভাগে চলে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থেকে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপি ক্ষমতাবলয় বিস্তারের অনেক সুবিধা পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সময়ে বিভাজনটি মূলত ছিল ইউরোপ এবং আটলান্টিক মহাসাগরীয় কেন্দ্রিক। পূর্ব-পশ্চিম দুই অংশে ইউরোপ ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিমের নেতৃত্বে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর পূর্বের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুরু হয় বিশ্বব্যাপি ক্ষমতাবলয় বিস্তারের প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ন্যাটো (NATO) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাকট। দুই পক্ষের অসংখ্য প্রক্সি যুদ্ধের শিকার হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে। আমেরিকার ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে যেতে অস্বীকার করায় সিআইয়ের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হয়েছেন তৃতীয় বিশ্বের অনেক স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রনায়ক। এই তালিকায় আছেন চিলির আলেন্দো, ইরানের মোসাদ্দেক, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণসহ বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব। নিজেদের দোরগোড়ায় আমেরিকার প্রক্সি শাসক বসানোর ভয়ে ভীত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সত্তর দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তান কেন্দ্রিক অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনের সূত্রে বিশ্বে উত্থান ঘটেছে ভয়াবহ ধর্মান্ধ জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর। সেটি এখন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনরূপে আমেরিকাসহ পুরো মানব সভ্যতাকে ধাওয়া করছে বিশ্বের সর্বত্র। ক্ষমতাবলয় বিস্তারের এই অশুভ প্রতিযোগিতার পরিণতির কথা তখনই দুই পক্ষের বাইরে থাকা কয়েকজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ঠিকই বুঝেছিলেন। তৎকালীন সদ্য স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রনায়কগণ, বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং মিসরের বিপ্লবী নেতা জামাল আবদুল নাসের উপলব্ধি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের নেতৃত্বে দুটি ব্লক, তাদের নিজ নিজ ব্লকের স্বার্থে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব ব্লকের দিকে টানার যে চাপ সৃষ্টি করবে তা থেকে বাঁচার জন্য উন্নয়নশীল ও নতুন স্বাধীনতা লাভকারী দেশসমূহের একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম থাকা অপরিহার্য। তা না হলে সম্পূর্ণ পৃথিবী দুটি সামরিক জোটে ভাগ হয়ে পড়বে এবং তা হবে বিশ্ব শান্তির জন্য অশনি সংকেত। আর নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে বৃহৎ শক্তির করতলে পড়ে নামেমাত্র স্বাধীন হয়েও দুই পরাশক্তির আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে। তারা নিজ রাষ্ট্রের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। উপনিবেশ যুগের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। প্রথমে উদ্যোগটি শুরু হয়েছিল মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পক্ষ থেকে। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই জওহরলাল নেহেরুর পাণ্ডিত্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটা বিশ্বব্যাপি পরিচিতি ছিল। দুই ব্লকের বাইরে বড় একটা তৃতীয় ব্লক সৃষ্টি হলে বিশাল আয়তন, বড় জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে ও জওহরলাল নেহেরুর ক্যারিশমায় অতি সহজেই বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে ভারত একটা অন্যতম ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। সেই সুযোগে ভারত প্রথমপক্ষ, দ্বিতীয়পক্ষ, অর্থাৎ উভয় ব্লক থেকে সমাদর পাবে এবং নবগঠিত সংস্থা বা তৃতীয় পক্ষের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন করা সহজ হবে। আজ বিশ্ব অঙ্গনে ভারতের যে অবস্থান তার শুরুটা হয়েছিল এখানেই, এবং তা জওহরলাল নেহেরুর দূরদর্শিতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। নেহেরুর মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণসহ উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বিশ্বে একটা তৃতীয় বলয় সৃষ্টিতে একমত হন। বান্দুং সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। সেদিন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল জোসেফ ব্রজ টিটো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ, মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, ঘানার প্রেসিডেন্ট নক্রুমা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যৌথভাবে দুই ব্লকের বাইরে থেকে একটা মধ্যম পথে চলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। আন্দোলনের আদর্শ হিসেবে জাতিসংঘের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঁচটি নীতিকে গ্রহণ করা হয়। যার অন্যতম ছিল, সকলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং কেউ কারো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের পতনের পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকটাই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে ওয়ারশ সামরিক জোটও ভেঙ্গে যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল ওয়ারশ জোটের বিলুপ্তির সঙ্গে ন্যাটো, সামরিক জোটেরও বিলুপ্তি ঘটবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের ঘুঁটি কোনো একটি অথবা দুটি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না। দুই পক্ষের প্রক্সি ও আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে এশিয়া-আফ্রিকার দেশসমূহ মুক্ত থাকবে। আর বৈশ্বিক সংকট সমাধানে শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হবে জাতিসংঘ। কিন্তু বিশ্বের শান্তিকামি মানুষের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। কেন হয়নি, সে তো বিশাল ইতিহাস। কমিউনিষ্ট বিশ্বের পতন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া, ওয়ারশ সামরিক জোটের বিলুপ্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বিজয় হিসেবে ধরে নেয় এবং ভীষণভাবে প্রলুব্ধিত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ও সামরিক পন্থায় ও কৌশলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক ক্ষমতা বলয় প্রতিষ্ঠার অভিযানে নেমে পড়ে। একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ন্যাটো বাহিনীকে শক্তিশালী এবং পূর্ব ইউরোপের সবগুলো দেশকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত, এই আড়াই দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় যে রকম ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে এবং ভূ-রাজনীতির কূটকৌশলের পরিণতিতে যেভাবে ইসলামিস্ট উগ্রবাদি জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তার পাল্টা হিসেবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে তার কোনো কিছুই বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয়ের সমীকরণের বাইরে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক ক্ষমতাবলয়ের বিপরীতে চীনের মহাউত্থান, ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা (বিআরআই) এবং ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই যাত্রায় এখন সর্বদাই নতুন নতুন অনুষঙ্গ যোগ হচ্ছে। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নুতন সামরিক নীতিতে আটলান্টিক ও ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ায় এতদাঞ্চলের দেশগুলোর ভূমিকা পূর্বের চাইতে এখন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন-রাশিয়ার একই বলয়ে অবস্থানের বিষয়টি এখন স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়া, ন্যাটো বাহিনীর ব্যয়ভার নিয়ে ইউরোপের দেশসমূহের সঙ্গে ট্রাম্পের মতপার্থক্য এবং সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়ার কারণে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের মতো আর দহরম-মহরম সম্পর্ক নেই। আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো অন্য কোনো ইস্যুতে এখন আর ইউরোপ অন্ধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করবে না। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে এতদাঞ্চলের বড় দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের মধ্যে থাকলেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে এসব দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রশান্ত মহাসাগরের উদীয়মান শক্তি ভারত যদিও পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিসহ ক্রমশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেও চীনের সঙ্গে একটা সহযোগিতার করিডোর ভারত খোলা রাখতে চায়, যার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের চীনের পর্যটন নগরী উহানের হৃদ্যতাপূর্ণ বৈঠকের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ভূমিধস বিজয় নিয়ে নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলেন। গত মেয়াদের ধারাবাহিকতায় আগামী পাঁচ বছরে মোদির লক্ষ্য হবে ভারতকে মর্যাদাপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ারস গ্রুপের সদস্য করা এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আপাতত চীনের সঙ্গে ভারত কোনো সংঘাতে জড়াবে না। ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সামরিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার ঘোষণা ও তার কৌশল আগামী দিনে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।। লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক sikder52@gmail.com

বি‌শেষ ধন্যবাদ জাপানকে

দশ বছর আগের ঘটনা। টো‌কিও শহরের এক স্টেশনের কাছে হাতে ম্যাপ নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে একটা ঠিকানা খুঁজছি। কাছাকাছি এসেও খুঁজে না পেয়ে একে ওকে প্রশ্ন করছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। এর মধ্যেই হঠাৎ কোথা থেকে যেনো উদয় হলেন মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা। কাছে এসে জানতে চাইলেন, কী খুঁজ‌ছো? গন্তব্য বলার পর তিনি অনেকটা হেঁটে পথ দেখিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, তার খুব জরুরি কাজ আছে। যেতে হবে। এরপর তিনি প্রায় দৌড়া‌তে লাগলেন। প্রচণ্ড কাজের মধ্যেও বিদেশি বুঝতে পেরে তিনি যেভাবে সাহায্য করলেন তাতে ভালো লাগতে বাধ্য। নাম না জানা সেই জাপানিকে‌ আজীবন ধন্যবাদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সেবার ১৫ দিনের জাপান সফর পৃথিবী সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছিলো। মনে আছে, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনে করে হি‌রো‌শিমা যাওয়ার পথে দলে থাকা এক সাংবাদিক তার পাস‌পোর্ট ভুল ক‌রে ট্রেনে ফেলে গিয়েছিলেন। এরপর তার কী দুশ্চিন্তা। কিন্তু সাথে থাকা জাপানি গাইড বললেন, চিন্তা করো না। আসলেই তার চিন্তা দূর হ‌য়ে গিয়েছিলো। ট্রেন থেকে নামার আধঘণ্টার মধ্যে তার পাস‌পো‌র্টের হদিস পাওয়া যায়। জাপানের ফরেন প্রেস সেন্টা‌রের যে ভবনটায় প্রতিদিন যেতে হতো, সেখানকার দা‌রোয়ানকে দেখা যেতো রোজ সকালে সবাইকে‌ মাথা নুই‌য়ে হা‌সিমু‌খে স্বাগত জানাচ্ছেন। একইরকম হাসিমুখ থাকতো প্র‌তিটি রেস্তোরাঁর ও‌য়েটারা। প্রথম ধাক্কায় যে কারও মনে হবে, জাপানিরা এতো ভা‌লো কেনো! জাপান নি‌য়ে এতো কথা বলার কারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা সড়কপথ আর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর। ঢাকা-চট্টগ্রাম প‌থে বহু বছর ধ‌রে যারা যাতায়াত করেন, তাদের কাছে কুমিল্লার দাউদকান্দির যানজট ছিলো এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। মেঘনা ও গোমতীর দুই সেতুতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব‌সে থাকার দুঃসহ স্মৃতি যে কারো ভোলা কঠিন। তবে সেই ভয়ঙ্কর সময় বু‌ঝি কাটলো। কারণ মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু গত ২৫ মে থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে। আর কিছুদিন আগে চালু হয়েছে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নতুন এই তিনটি সেতু নির্মাণের ফ‌লে মানু‌ষের দু‌র্ভোগ কমে গেছে। ইতিম‌ধ্যেই এর সুফল পেতে শুরু করেছেন কুমিল্লার মানুষ। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যেতে আগে যেখানে কখনও কখনও সাত থেকে আট ঘণ্টাও লাগতো গত তিনদিন ধরে সেখানে মাত্র দেড় ঘণ্টা লাগছে। এবারের ঈদের আগে কু‌মিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভা‌গের মানু‌ষের জন্য সেতুগু‌লো যেনো বিরাট উপহার। এজন্য বি‌শেষ ধন্যবাদ জাপানকে। কেনো শুনবেন? চলুন তিন বছর আগে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে এই তিন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলো। কিন্তু জুলাই মা‌সে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় কয়েকজন জাপানি নাগ‌রিকের মৃত্যুর ঘটনায় সংকটে পড়লো সব। প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ রাখলো জাপানের তিন নির্মাতা কোম্পানি। পরে প্রকল্প মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোরও আবেদন করে তারা। সে অনুযায়ী আরও সাতমাস পরে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ছয় মাস তো লাগলোই না, আগের নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই নির্মাণ শেষ করেছে জাপা‌নিরা। এর নামই জাপান! দেশি কিংবা বি‌দে‌শি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর ধান্দায় থাকে, সেখা‌নে জাপানিরা নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করে অনন্য নজির স্থাপন ক‌রে‌ছে। সময়ের আগে কাজ শেষ হওয়ায় হাজার কোটি টাকাও সাশ্রয় হয়েছে। জাপান কিন্তু বাংলাদেশের নতুন বন্ধু নয়। বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পাশে আছে দেশটি। বলা যায় জাপান বাংলাদেশের দুর্দিনের বন্ধু। এই তো কয়েক বছর আগে পদ্মাসেতুর কাজে ঋণ দিতে বিশ্বব্যাংক যখন অস্বীকৃ‌তি জানালো, জাপান কিন্তু ঠিকই ২২ হাজার কো‌টি টাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শুরু করলো। ২০২০ সা‌লের মধ্যে মেট্রো চালু হ‌লে এই শহ‌রের গণপ‌রিবহ‌নের চিত্র অন্যরকম হবে। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের সহায়তা নজিরবিহীন। অবকাঠামো ছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য খাতেও জাপা‌নি‌দের সহায়তা অনেক। বাংলাদেশকে যতো দেশ উন্নয়ন সাহায্য দেয় জাপান সেই তালিকায় সবার ওপরে। দুই দেশের এই সম্পর্ক‌কে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ মে সরকারি সফরে জাপান যা‌বেন। তিনদিনের এই সফরে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেবেন। তবে এই সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ভ্রমণে জাপান যে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে সেটি নিয়েও অলোচনা হওয়া উচিৎ। জাপান প্রবাসী সাংবাদিক মনজুরুল হক লিখেছেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা জাপানের আরোপিত ভ্রমণ সতর্কতা বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর। আসলেও তাই। এই সংকটের শুরু ২০১৫ সালে। ওই বছ‌রের ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপ‌রেই জাপা‌নি‌দের ভ্রমণে সতর্কতা জা‌রি করা হয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান ঘটনার পর এই নিষেধাজ্ঞা অনেকটা স্থায়ী হ‌য়ে যায়। অনেকেই জেনে থাকতে পারেন, বাংলাদেশে প্র‌তিবছর যে দেশগু‌লো থে‌কে সবচেয়ে বেশি বি‌দে‌শি পর্যটক আসেন, সেই শীর্ষ দেশগু‌লোর একটি ছিলো জাপান। প্র‌তি বছর গ‌ড়ে হাজার বিশেক জাপানি আসতেন যার ম‌ধ্যে অসংখ্য তরুণ-তরুণী ছিলেন। কিন্তু, ২০১৬ সা‌লের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পর থে‌কে সেটি বন্ধ রয়েছে। জাপানি নাগরিকদের এখন ঢাকায় যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর থেকে উত্তরণ জরুরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনা ২৯ মে টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেদিন জাপানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন যে থোক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা আসার কথা, এককালীন হিসেবে সেটা এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশ-জাপানের মধ্যে আড়াই বিলিয়ন ডলারের অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্টেন্স (ওডিএ) চুক্তি সই হবে। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেব, এই সময়টায় আমাদের একটা চাওয়া আছে। প্রধানমন্ত্রীকে অনু‌রোধ, শিনজো আবের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে যেনো সতর্কতা উঠিয়ে ফের জাপা‌নিদের বাংলাদেশ সফরের সফ‌রের অনু‌রোধ করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থে‌কে জাপানিদের এই বার্তা দিতে হবে, তোমরা আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। আমরা চাই তোমরা বাংলাদেশে বেড়া‌তে আসো। তোমাদেরকে আমরা স্বাগত জানাবো। কারণ পৃথিবীর এই দুঃসময়ে নী‌তি-নৈ‌তিকতা, আদর্শ, অপরকে সম্মান করাসহ জাপানিদের কাছ থেকে শেখার আছে বহু কিছু। কাজেই জাপানিদের আমন্ত্রণ লাল সবু‌জের বাংলাদেশে। লেখক: প্রোগ্রাম প্রধান, মাইগ্রেশন, ব্র্যাক। (লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)।

রাজনীতির রূপকল্প, পার্থিব বাস্তবতা ও মহাকালের পরাবাস্তবতা

ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ উষা পাটনায়েক গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, পৌনে দু’শ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতবর্ষ থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের সম্পদ ব্রিটেন নিয়ে গিয়েছে। এ পরিমাণ অর্থ বর্তমান যুক্তরাজ্যের জিডিপির ১৭ গুণেরও বেশি। ভারতের আরেক প্রখ্যাত সাংসদ, লেখক, সাবেক কূটনৈতিক শশী থারুর সেই লুটের ক্ষতিপূরণের দাবি করেন। বাস্তবিক পক্ষেই ভারতবর্ষের তাঁতশিল্প, বিশেষ করে ঢাকার মসলিন আর নারায়ণগঞ্জের বস্ত্রশিল্প, যা ইউরোপের বাজারে খ্যাতির শীর্ষে ছিলো, তা ধ্বংস করেই ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব সাধিত হয়েছিলো। ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে সে লুট হওয়া সম্পদ আমাদেরও ছিলো।   আমাদের সম্পদ ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত লুট করেছে গ্রেট ব্রিটেন আর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে দুই অঞ্চলের মাথাপিছু আয়, উন্নয়ন ও রাজস্বখাতে ব্যয়ের ব্যবধান ছিলো ৬৩ টাকা (২১.৯%)। তার ২০ বছর পর ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন ব্যবধান দাঁড়ায় ২০২ টাকা (৬১.০৫%)। তারপর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হলাম। নিখিল পাকিস্তানের সব সেক্টরের কেন্দ্র যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানে; শিল্পকারখানা, ব্যাংক বিমাসহ সব সেক্টরের সব সম্পদের দখলও তারাই ধরে রাখলো। ১৯৮৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন মতে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে সে সব সম্পদের হিস্যা পাওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান আমাদের তা আজও দেয়নি। ১৯৭০ সালের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান রিপোর্ট আমলে নিয়ে গবেষণা করে প্রখ্যাত গবেষক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন দেখান, ১৯৭৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পায়। ১৯৭৪ সালে ডলারের দাম ছিলো ৮ টাকা। বর্তমানে ডলারের দাম সাড়ে ৮৪ টাকা ধরলে পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা দাঁড়াবে ৩ লাখ ২৫ হাজার মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পাকিস্তান আমাদের সে টাকা দেয়নি, যেমন দেয়নি ব্রিটেন। দাবিকৃত টাকা যদি এখন দেয়ও, তবুও আমাদের ক্ষতিপূরণ সমান হবে না। কারণ আড়াইশ বছর আগের সম্পদ কিংবা আটচল্লিশ বছর আগের সম্পদ আর বর্তমানের সম্পদ এক হবে না। কারণ সম্পদ পুঁজি গড়ে আর পুঁজি আনে মুনাফা, ব্যবসা এবং সম্পদ। পাকিস্তান আমাদের সম্পদের হিস্যাতো দেয়ইনি, উপরন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আইএসআইসহ তাদের এ দেশীয় দোসরদের মাধ্যমে কষ্ট দিয়েছে। সে কারণে আমাদেরকে বাহাত্তরে অনেকটা শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে, পঁচাত্তরে মহাসংকটে পড়তে হয়েছে, সমস্ত আশির দশকে স্বৈরাচারে নিমর্জ্জিত থাকতে হয়েছে, নব্বইয়ের দশকে, এমনকি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেও আমাদেরকে ধর্মঘটে, হরতালে, জঙ্গিবাদে, বিশৃঙ্খলায় বুঁদ হয়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু কোন জাতির অন্তর্নিহিত শক্তি যদি হয় অভিজাতের, প্রাগ্রসরতা ও সফলতা যাদের স্থাবর সম্পত্তি তাদেরকে অনন্তকাল ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। একদিন না একদিন সঠিক নেতৃত্বে তারা দিশা পাবেই। একটি জাতিকে এগিয়ে নেয় নেতৃত্ব এবং রূপকল্প। একজন স্টোরিটেলার ও একটি স্টোরি। দূরদর্শী কোন রূপকল্প যোগ্য ও সঠিক কোন নেতা যদি কোন জাতিকে বিশ্বাস করাতে পারে তবে সে জাতির এগিয়ে যাওয়া হয়ে উঠে জাস্ট সময়ের ব্যাপার। স্বাধীনতার পর অন্তত চারদশক বাংলাদেশ কঠিন সংকটে ছিলো। অথচ মাত্র গত একদশকে দেশটি বারবার বৈশ্বিক খবরের শিরোনাম হচ্ছে,--ইতিবাচক শিরোনাম, সেই তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ নয়। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির গবেষণা মতে, বাংলাদেশ উন্নয়নে অর্থনীতির এক মিরাকল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ’ বলছে বাংলাদেশ ২০৩৩ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশে পরিণত হবে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বলছে, ২০১৯ সালে বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষে থাকবে, যা সম্ভাব্য ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গবেষণা বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয়ে ভারতকে পেছনে ফেলবে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়, মিঠাপানির মাছ ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় এবং চাল উৎপাদনে বিশ্বের মাঝে চতুর্থ অবস্থান অর্জন করেছে। বিশ্বের আয়তন ও ব্যাপ্তির তুলনায় বাংলাদেশ অত্যন্ত ছোট। এই ছোট দেশ এখন মনোযোগ আকর্ষণ করছে, গোল্ডম্যান স্যাকস, প্রাইস ওয়াটার হাউজ কুপারস, ফিল্ড রেটিংস, পিউ রিসার্চ সেন্টার, জেপি মরগ্যান, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্যা গার্ডিয়ান, দ্যা ইকোনমিস্টের মতো বিশ্বখ্যাত জরিপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের! তারা শুধু শুধু বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা করছেনা, এখান হেতু আছে। দু’একটি খাত দেখে নেওয়া যাক। ১৯৭২ সালে আমরা যখন শুরু করি তখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিলো শূন্য দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার। ২০০৮ সালে রিজার্ভ হয় ৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। ২০১৭ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। মানে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তিন যুগে যতটুকু এগিয়েছে, গত দশ বছরে তার সাড়ে চারগুণ বেশি এগিয়েছে। বাজেটের ক্ষেত্রে ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দেয়, যা ২০০৮-০৯ অর্থবছরে হয় ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার। আর বর্তমানে আমরা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতেছি। ১৯৭২ সালে আমাদের জিডিপির আকার ছিলো ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের। ২০০৯ সালে তার আকার হয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আর বর্তমানে আমাদের জিডিপি  ২৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তারমানে গত এক দশকেই আমাদের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আমাদের সামনে এখন অনেক পরিকল্পনা। আমাদের আছে পদ্মাসেতু ও মেট্রোরেলের মতো মেগাপ্রকল্প, যা এবছরই শেষ হবে বলে সরকার আশা করে, আছে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ, যার ভিতরে চারটির কাজ এ বছর শুরু হচ্ছে। আমাদের আছে ২০৩০ সালের ভিতরে এসডিজি অর্জনের প্ল্যান, আছে ২০৪১ সালের ভিতরে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবার প্ল্যান। আছে মহাপরিকল্পনা ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’। তবে আমাদের স্বপ্নের সঙ্গে সংকটও আছে। ব্রিটিশ আর পাকিস্তানিরা ২১৪ বছরের অপশাসনের সময় শুধু আমাদের সম্পদ লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা আমাদেরকে অনেক মন্দজিনিসও শিখিয়ে গেছে। তাই আমাদের দুর্নীতির সমস্যা আছে, সুশাসনের সমস্যা আছে, ব্যাংকগুলো বিশৃঙ্খলা হয়ে আছে। বেশি বিশি মেগাপ্রজেক্টের কারণে বিনিয়োগ যেভাবে হচ্ছে সেভাবে কর্মসৃজন হচ্ছে না। আবার ২০১৭ সালের আগস্টের পর রিজার্ভ আর সেই ৩৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করতে পারছে না। এর কারণও অবশ্য আছে। মেগাপ্রজেক্টগুলোর জন্যে ক্যাপিটাল যন্ত্রাংশ আনতে হচ্ছে। তবে যেভাবেই হোক অতিজরুরি শিল্প সরঞ্জাম, জ্বালানি, সার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ছাড়া আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। রফতানি ও রেমিটেন্সকে উৎসাহিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এশিয়ায় রিজার্ভে যে আমরা বর্তমানে ভারতের পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছি, সে আমরাই ২০০১ সালে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল বাকি রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। আবার যে পাকিস্তানের রিজার্ভ ২০১৬ সালে ছিলো ১৯ বিলিয়ন ডলার, তাদেরই রিজার্ভ ২০১৮ সালের জুনে ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিলো। অপচয়, অবিচার, দুর্নীতি আর রাষ্ট্রীয় অনাচারের কারণে গত বছর তাদের নিট বৈদেশিক রিজার্ভ ঋণাত্মক অবস্থানেও চলে গিয়েছিলো। বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যদ্বাণী করছে, ২০০৮ সালের মতো বিশ্ব আবারো ২০২০তে মন্দায় পড়ে যেতে পারে। চীনের মতো অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০১৮ সালে হয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিন্ম। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বৃহৎ ঘাটতির উপর চলছে, চানয়া তাদের ‘বেল্ট এবং রোড’ শ্লোগানের পক্ষে মেঘ সৃষ্টি করার জন্যে ঋণ করে ঘি খাওয়ার জন্যে তাদের বলয়ের রাষ্ট্রেগুলোকে আশকারা দিয়ে যাচ্ছে, ইউরোপ এখনো মন্দার ঘোর কাটিয়ে উঠার পথেই আছে। এগুলো আমাদের মাথায় রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধের ফলাফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়বে, যা মুদ্রাস্ফীতিতে ঘি ঢালবে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে, তারল্য কমবে। তারল্য কমলে সুদের হার বাড়বে। সুদের হার বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের মূল্য আরও বাড়বে আর পণ্যের মূল্য বাড়লে মানুষ পণ্যের ব্যবহার কমাবে। পণ্যের ব্যবহার কমলে উৎপাদন কমে যাবে। উৎপাদন কমলে কর্মসৃজনও কমে যাবে, তাই বেকারত্ব বাড়বে। বেকারত্ব বাড়লে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আরও কমবে। পরিণামে অর্থনীতি চলে যাবে মন্দার মন্দচক্রের দিকে। আবার যুক্তরাষ্ট্র চীনের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলাফলতো আছেই। আশার কথা হলো এ বছর আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়তেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে চলে গেলে বাংলাদেশ বিশ্বের বাইরে নয়। সুতরাং মন্দার ঢেউ আমাদের গায়েও লাগবে। ইথিওপিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্র্যাণ্ডগুলোর পোষাক তৈরি করে থাকে সবচেয়ে কম রেটে। তারা এখন বলছে, এন্ট্রি লেবেলের একজন তৈরি পোষাক শ্রমিককে ২৬ ডলার দিয়ে কাজ করিয়ে দিবে। ২৬ ডলার মানে আমাদের দেশের হিসেবে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা । আমাদের এন্ট্রি লেবেলের খরচ হলো ৮ হাজার টাকা। সৃতরাং সামনের দিনগুলোতে এইখাত থেকে আমাদের রফতানি আয়ের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। কারণ পুঁজির সাধারণ ধর্ম হলো পুঁজি খাটিয়ে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করা যাবে সেখানেই পুঁজি চলে যাবে। তারমানে রফতানি আয়ে আমাদেরকে বৈচিত্র আনতে হবে। একটি ধরে পড়ে থাকলে চলবে না। আমাদের পরিকল্পনায় রাখতে হবে স্বল্প, মধ্যম এ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের চিন্তা, পরিকল্পনায় রাখতে হবে কর্মচাঞ্চল্যের, কর্মসৃজনের। তবে সবচেয়ে আগে লাগবে সুশাসন আর ন্যায়বিচার। না হলে কোন উন্নয়নই টিকে থাকবে না। আর মানুষকে স্বপ্নদেখাতে হবে। বাস্তবিক স্বপ্ন, বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন। মানুষ রূপকল্প কিন্তু বিশ্বাস করে। আর মানুষ বিশ্বাস করলে মানুষ অসাধ্য সাধন করে। সেটি মানুষ ইতোমধ্যে করে দেখিয়েছে। রূপকল্পই গত একদশকে আমাদেরকে জাগিয়ে তুলেছে। ১৭৫৭ সালের আগে পৃথিবীর যে মানচিত্র ছিলো সেখানে আমরাই ছিলাম ধনী। ইউরোপীয়রা, আরবরা আমাদেরই কাছে আসতো ভাগ্যের অন্বেষণে। আমাদের সম্পদ দিয়েই তারা হয়েছে পুঁজিপতি। আমরা ২১০০ সালের অভিষ্ট ‘মহা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করতে পারলে আগামী পৃথিবীতে নিশ্চিত আমরা আবারো ঘুরে দাঁড়াবো। লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক।

বৈশ্বিক সমস্যা জঙ্গিবাদ ও আমাদের করণীয়

জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। খবরের কাগজ খুললেই কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে মাঝে মাঝে দৃষ্টিগোচর হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশলে জঙ্গি হামলার মত নৃশংস ঘটনা; এবং সেই হামলার দায়ও কোন না কোন জঙ্গি সংগঠন স্বীকার করছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গর্বের সাথে। জঙ্গিদের দৃষ্টিতে এমন সব হামলা করে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রক্তে হলি খেলা মহা পুণ্যের কাজ। অর্থাৎ শান্তির ধর্ম ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সত্যিকারের ইসলামের মূল্যবোধ থেকে নিজেদের শান্তির পথচ্যুত করে জঙ্গিরা এমন জিহাদের কথা বলে মানুষ হত্যা করছে যেই জিহাদের কথা আমাদের ইসলাম ধর্মে বলা হয়নি। শান্তির ধর্ম ইসলামে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে একত্রে যার যার ধর্ম পালন করতে বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। নৈতিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে শালীন এবং পরিমার্জিত জীবন ব্যবস্থার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করাই ইসলাম ধর্মের মূল উপজীব্য। ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে তারা মুসলমানের লেবাজে আদৌ সন্ত্রাসী বাহিনী ছাড়া কিছুই নয়। জঙ্গিবাদ এমন একটি বিষয় যারা প্রতিনিয়ত আক্রমণের ভঙ্গি পরিবর্তন করে সারা পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত। জঙ্গিবাদের মতো এমন একটি বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলায় শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধমূলক কর্মকান্ড গুলোই যথেষ্ট নয় বলে আমি মনেকরি। সাম্প্রতিক ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা এবং কল্যানপুরে হামলার পূর্ব প্রস্তুতির সময়ে জঙ্গি প্রতিহত করা এই সকল ঘটনা গুলোতে একটু সচেতন দৃষ্টি আলোকপাত করলেই খেয়াল করবেন আসলে কারা জঙ্গিবাদ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনে নাম লিখাচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রী নেওয়াই শিক্ষার মূল কথা নয়। আজ যে সকল তরুন জঙ্গিবাদের কালো থাবায় পড়ে পথচ্যুত হয়েছে তারা যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই হোক না কেন, যে ডিগ্রীধারী হোক না কেন তাদের ডিগ্রী তাদেরকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেনি অথবা তারা তাদের পরিবার থেকে মানবতার সঠিক শিক্ষা নিয়ে মানুষিক পরিপক্কতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ভুলে গেলে হবে না যে যতো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আপনি পড়ুন না কেন শিক্ষা যদি আপনার আচরণকে সমাজ কাংখিত ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত করতে না পারে তাহলে আপনি ডিগ্রী অর্জন করলেও প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেননি। যেমন- পুস্তকে পড়ছেন মানুষ হত্যা মহা পাপ; আর সেই মানুষই নির্বিচারে হত্যা করছেন। এখানে পুস্তক থেকে কিছু তথ্য আপনি ধারণ করেছেন হয়তো কিন্তু কিছু শিখে আচরণের পরিবর্তন করতে পারেননি। সূতরাং এই শিক্ষা আপনার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হয়নি। আর ঠিক এই সুযোগই নিচ্ছে জঙ্গি সংগঠন গুলো। জঙ্গিরা ইসলামের দোহাই দিয়ে এমন সব তরুণদের তাদের দলে ভিড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত যাদের ধর্মীয়, সামাজিক, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ক জ্ঞান খুবই সীমিত। অর্থাৎ তারা পরিবার থেকে প্রকৃত মানুষ হয়ে মানবতার জয়গান গেয়ে সবাই একত্রে শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করার যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রয়োজন তা সঠিক ভাবে অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই কারনেই এসব তরুনদের জঙ্গিরা খুব সহজেই ব্রেইন ওয়াস করে বিপথগামী করে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, পরিবার থেকে সামাজিক জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ তরুনরা যখন এমন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিয়েছে যেখানে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঠিক চর্চা করার সুযোগ নেই বললেই চলে সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এনং জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। আমার ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশের মানুষের বুকের তাজা রক্ত এবং মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ আমরা পেয়েছি; সে দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চর্চার ব্যবস্থা থাকবে না ??? আমাদের দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনা অবাদে চর্চার সুযোগ নেই সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নামক স্বাধীনতা বিরোধী ঘাটি পাকিস্তানে থাকতে পারে কিন্তু আমাদের সোনার বাংলায় নয়। অপর দিকে আপনার সন্তানের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আপনার সন্তান আপনার অগোচরে জঙ্গিবাদে নাম লিখিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করবে আর আপনি শুধু দুঃখ প্রকাশ করবেন এমনটা কখনোই কাম্য নয়। বাড়িভাড়া দেওয়ার সময় কাকে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন সে বিষয়ে তথ্য নেওয়া আপনারই নাগরিক দায়িত্ব। আপনার বাসায় ভাড়া থেকে জঙ্গি কর্মকান্ড পরিচালনা করলে তার দায় আপনি কখনোই এড়াতে পারেন না। আপনি যদি ধর্মের সঠিক শিক্ষা দিয়ে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা আপনার সন্তানকে দিতে ব্যর্থ হন তাহলে এ দায় অবশ্যই আপনার। মনে রাখবেন, যে বাঙালি জাতি ৫২ তে রক্ত দিয়েছিল ভাষার জন্য, যে বাঙালি জাতি একাত্তরে প্রাণ দিয়েছিল স্বাধীন ভূখন্ডের জন্য; সেই বাঙালি জাতি কখনোই জঙ্গিবাদের কাছে মাথা নত করবে না। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতার জন্য; আবার প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা`র ডাকে যুদ্ধ করবে জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য।বাঙালি জাতি যেমনি কারো প্রতি অন্যায় করেনি এ কথা যেমন সত্য তেমনি ইতিহাসের এক ধ্রুব সত্য যে বাঙালি জাতি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে তার কাছে মাথানত করেনি। (লেখক পরিচিতিঃ সংস্কৃতি সম্পাদক, ডাকসু, সাহিত্য সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।) আআ//

চাই তাঁর ত্যাগের মূল্যায়ন

১৯৮১ সালের ১৭ মে। বৃষ্টিস্নাত সেই দিনে বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা যখন ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছালেন, দুচোখে তাঁর অঝোর ধারায় ঝরছে অশ্রুজল। তা দেখে কোটি জনতা তাঁর সাথে কাঁদলো, কাঁদলো যেন প্রকৃতিও। কিন্তু কেউ যেটা দেখলো না, বিমান যাত্রার শুরুতে যাত্রা পথের অন্য প্রান্তরে ছোট্ট একটি অবোধ শিশু কেঁদেছিল অঝোর ধারায় সেই যাত্রা পথের দিকে তাকিয়ে। তাদের মা যে চলে যাচ্ছেন দূরে, অন্য দেশে। সেই বাচ্চার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে চলে আসতে যে কি কষ্ট হয়েছিল সে তরুণী মায়ের– আমরা কেউ কি কোনদিন তা চিন্তা করে দেখেছি? এতো শুধু কিছুদিনের বিদেশ যাত্রা নয়। দেশকে ভালবেসে, দেশের জনতার ডাকে, পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পাদন করার গুরু দায়িত্ব নিয়ে সেই তরুণী মা বুকে পাথর বেঁধে, সন্তানকে দূরদেশে রেখে চলে যাচ্ছেন মাতৃভূমিতে। মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হলে হয়ত দেখা হবে, হয়ত সন্তানরাও আসবে মায়ের কাছে। কবে হবে কে জানে? কতদিনের সে অপেক্ষা কে জানে? আদৌ অপেক্ষার শেষ কখনও হবে কিনা তাও জানা নেই। কারণ, ওপারে অপেক্ষমাণ আততায়ী। সেই খুনীরা যারা হত্যা করেছে তাঁর পিতা, মাতা, ভাই, ভাবী, পরিবারের সকলকে। তারা ওঁত পেতে আছে তাকে হত্যা করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারার এক বিন্দুও না রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর। তাই, এই তরুণী মা আদৌ আর ফিরবেন কিনা তা অজানা। আর কি কখনও দেখা হবে ছেলের ঘুমন্ত মুখ? হয়তো এটাই শেষ দেখা। এই মায়ের বুকের ভিতরের হাহাকার আমরা কি কখনও শুনতে পেয়েছি? অথবা শুনতে চেয়েছি কেউ কোনদিনও? কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের জোয়াল কাঁধে নিয়ে সার্বক্ষণিক মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন। ‘৮১-র সেই দিনে, ছেলেটিকে খালার কাছে রেখে, মেয়েটির হাত ধরে ফিরলেন স্বদেশে। তার আরও পরে, দুই সন্তানকেই হোস্টেলে দিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। ফিরে এলেন সেই স্বদেশে যেখানে আছে শুধু স্বজনদের রক্তের দাগ, এক বুক হাহাকার। থাকার জায়গা নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই, নিজের বাবার বাড়ীতেও ঢোকার অনুমতি নেই। জাতির জনকের কন্যা, একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির কন্যা স্বজনের জন্য প্রথম মিলাদ পরতে হল বাসার সামনে রাস্তায়। যখন বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়ীটিতে ঢোকার অনুমতি মিললো, তখন রচিত হল মানসিক নির্যাতনের আরেক অধ্যায়। দেয়ালে, মেঝেতে থোকা থোকা রক্তের দাগ, ছাদে মগজের ছিটা, বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা প্রতিটি দেয়াল, আসবাব সব। সেই সিঁড়ি, যে সিঁড়িতে পরে ছিল পিতার লাশ, সেই সিঁড়ি তাঁর পবিত্র রক্তে রঞ্জিত। যে বাড়ীতে তিনি রেখে গিয়েছিলেন বিয়ে বাড়ীর কোলাহল – তা আজ মৃত্যুপুরী। সেই বিয়ের আল্পনার রঙ ঢেকে গিয়েছে রক্তের দাগে। নববধূর হাতের চুড়ির রিনিঝিনি নেই, নেই ছোট ভায়ের সাইকেলের টুংটাং। আজ শুধু গাঢ় অন্ধকার, মৃত্যুর নীরবতা। আমরা কি সবাই জানি যে, সেই রক্তমাখা ঘরবাড়ী বঙ্গবন্ধুর আদরের বড় মেয়েটি নিজ হাতে ঝেড়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করেছেন? চিন্তা করা যায়? বাবার রক্ত, মায়ের রক্ত, ভাইয়ের রক্ত, ছোট রাসেলের রক্ত – নিজ হাতে ধূলিকণার সাথে ঝেড়েছেন। কিন্তু প্রাণে ধরে ফেলতে পারেননি। ঘরের কোণায় কোণায় জমিয়ে রেখেছিলেন। কি মানসিক নির্যাতন – একটু কি হৃদয় দিয়ে ভেবে দেখবেন সকলে? কিভাবে সম্ভব এ মানসিক আঘাত সহ্য করা? আর ভেঙ্গে না গিয়ে, তারপরও এগিয়ে যাওয়া – কি পরিমাণ শক্তি লাগে, চিন্তা করা যায়? কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা যথার্থ বাপের বেটিই বটে। এগিয়ে চললেন, শুরু করলেন দল পুনর্গঠনের কাজ। জেলায় জেলায়, থানায় থানায়, ইউনিয়ন থেকে ইউনিয়নে গেছেন। আজ সবাই প্রধানমন্ত্রী দেখেন, প্রোটোকল দেখেন। অথচ সেদিনের অনুন্নত বাংলাদেশে পায়ে হেঁটে, রিকশায় চড়ে, নৌকায় চড়ে কত ভাবে যাত্রা করেছেন পথে পথে। যারা গাড়ীতে চড়ে চলেন আর বাসায় বসে টেলিভিশন দেখে বিচার করেন, তারা এই পরিশ্রমের স্বরূপ অনুধাবন করতে পারবেন না। হ্যাজাক জ্বালিয়ে সভা করেছেন। ভাবি, মানুষটার কথা। কোথায় খেয়েছেন, কোথায় বিশ্রাম নিয়েছেন – জানি না। কোন দিন তা জানবার প্রয়োজনও আমরা কেউ বোধ করিনি। আমরা সবাই দেখেছি তাঁর ফিরে আসা। সে ফিরে আসায় পুনর্জন্ম লাভ করেছি আমরা নিজেরা। স্বাধীনতা বিরোধী, দেশ বিরোধী কুচক্রী আততায়ীরাই তখন দেশের মসনদে। তাদের নিষ্পেষণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোটি জনতার তখন মৃতপ্রায় অবস্থা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তখন ভূলুণ্ঠিত। তাঁর ফিরে আশায় জীবন্মৃত সেই মানুষগুলো জেগে উঠলো, নিভু নিভু সেই আদর্শের মশাল আবার জ্বলে উঠলো। এক প্রবাদপ্রতিম বাবার বিশাল পদচিহ্নের পাশে পাশে তাকে হাঁটতে হল। আমাদের বাঁচার তাগিদে নিষপলক তাকিয়ে থেকেছি সেই পথের পানে। উনিশ থেকে বিশ হলে, পান থেকে এতটুকু চুন খসলে রেহাই দেই নি কেউ তাকে। একবার ভাবিনি, কত বড় মহামানবের মত হতে তাকে বলছি এক দিনেই। একবার ভাবিনি, দুই দশকের জঞ্জাল তিনি একাই পরিষ্কার করছেন, এত সহজেই কি তা হয়ে যাবে? এই কঠিন কাজে কেউ কি তাঁকে খুব একটা সাহায্য করেছি? সাহায্য তো নয়ই, বরং সমালোচনার ঝড়, প্রতিপদে বাধা, শত্রুতা, বিশ্বাসঘাতকতা তাঁকে বিদ্ধ করেছে সারাজীবন। ঘরে-বাইরে বিরোধীতার ঝড়ে বিপর্যস্ত করে তুলেছি তাঁকে, তাঁর হৃদয়ের ঝড় বোঝার সুকোমল অনুভুতি অনুভবের মত সময় তখন কোথায় আমাদের? আমরা তখন ডুবন্ত জাতি, তাঁকে আঁকড়ে ধরেছি বাঁচার জন্য, তাঁর শ্বাসের খবর রাখার উপায় ছিল না। মায়ের ভালবাসায় তিনি আমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন নিশ্চয়। কিন্তু আমরা কি তাঁর কষ্টের, ত্যাগের মূল্যায়ন আজও করেছি? সেই ত্যাগের পরিমান পরিমাপ করার মত ভালবাসা দিয়ে, আজও কি তাঁকে আমরা মূল্যায়ন করেছি? আজ শুধু আমরা কেন, দেশের জন্য তাঁর অর্জনের প্রশংসা করে, স্বীকার করতে বাধ্য হয়। দেশের জন্য তাঁর অর্জন শত-কোটি। এ উন্নয়নের প্রতীক্ষ্যদর্শী সারা বিশ্ব। বিনা যুদ্ধে তিনি ভুমি আদায় করে এবং সমুদ্র বিজয় করে দেশের মানচিত্র বদল করেছেন, মহাকাশে আমরা রেখেছি দৃপ্ত পদচিহ্ন। শুধু ২০৪১ নয়, তিনি আগামী একশত বছরের উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের একটি উন্নত জীবন পাবার সংকল্প করেছেন। তিনি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আমাদের ললাট থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার কলঙ্ক মুছে দেবার প্রয়াসে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার করেছেন। করছেন ‘৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। এসবই দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত, এসবই দৃশ্যমান। কিন্তু এই বিশাল অর্জনের পিছনে যে কঠিন পরিশ্রম রয়েছে তা কি দৃশ্যমান? এই অর্জনের পিছনে যে মেধা, দূরদৃষ্টি রয়েছে তা কি এত সহজে চোখে পরে? তাঁর চেয়েও বড় কথা, প্রতিপলে শত বিরোধিতা, হত্যা চেষ্টার মাঝেও এই জাতির জন্য সার্বক্ষণিক যে শুভ কামনা তাঁর মাঝে আছে, যে গভীর ভালবাসা দিয়ে তিনি এ জাতির উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে কাজ করছেন – সেই ভালবাসা, সেই শুভকামনার গভীরতা কি আমরা অনুধাবন করি? বঙ্গবন্ধু কন্যা এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, ত্যাগ দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে, ক্ষুরধার মেধা দিয়ে, ইস্পাত-কঠিন সাহস দিয়ে, সন্তানের জন্য মায়ের বুকের সবটুকু ভালবাসা দিয়ে - আজ আমাদের পুরো জাতির মাতৃস্থানে নিজেকে আসীন করতে পেরেছেন। কিন্তু সেই মায়ের ভালবাসার গভীরতা আজও আমরা কি অনুধাবন করতে পেরেছি? জাতি হিসেবে তাঁকে কি বিনিময়ে ততটা ভালবাসা আমরা দিতে পেরেছি? সবচেয়ে আড়ালে রয়ে যায়, ব্যক্তি মানুষটির কষ্ট ও আত্মত্যাগ। তাঁর দেহের পরিশ্রম, মানসিক চাপ আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। আমি আজ তাঁর এই পরিণত বয়সে সকল সাফল্যে ঘেরা ইস্পাত কঠিন প্রধানমন্ত্রীর আড়ালে সেই শীর্ণ দেহের তরুণী মাকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই। আমার সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কালে আমি সেই মায়ের সেই অবোধ শিশু দুটির কান্নার কষ্টকে মর্যাদা দিতে চাই। আমি আজ এই পরিবারের প্রতিটি মানুষের ত্যাগের মূল্যায়ন দেখতে চাই। যদি কৃতজ্ঞ জাতি হই, বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু বড় মেয়েটির সারাজীবনের ত্যাগের গভীরতা অনুধাবন করতে হবে। সকল অর্জনের পাশাপাশি জননেত্রী শেখ হাসিনার ত্যাগেরও মূল্যায়ন হওয়া আজ একান্ত প্রয়োজন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই ঐতিহাসিক দিনে অন্তত এটুকু যেন আমরা করতে পারি সেই কামনা করি।  

মানুষ মানুষের জন্য

আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই তা হলো-মানবিক দিক। এর মূল বক্তব্য হলো অন্যের জন্য কিছু করার আনন্দ। কথায় আছে, ‘মানুষ মানুষের জন্য’। সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে। আর এই বিষয়টি পৃথিবী সৃষ্টির একেবারে শুরু থেকে চলে আসছে। আমি মনে করি যে এটা আদি এবং অক্ষয়। যদিও আমরা অনেক ক্ষেত্রে এর অনুপস্থিতি দেখতে পাই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই আমার মাঝে আমি এই বিষয়টি জোরালোভাবে ধারণ করি। ছোটবেলার কথাই বলি, অনেকগুলো ভাই-বোন নিয়ে আমাদের পরিবার। তখন থেকেই আমরা মিলেমিশে থেকেছি। সব কিছুতেই এক ধরনের আন্তরিক সম্পর্ক পারিবারিক বন্ধন কাজ করেছে। আমাদের এই বড় পরিবারে বন্ধন কাজ করেছে। আমাদের বড় পরিবারে এই কোন ভুল বুঝাবুঝি নেই। এমনকি দূরত্বেরও সৃষ্টি হয়নি। চাকরি বা পেশার জন্য যে দূরত্ব হয়েছে তা শুধু অবস্থানের দিক থেকে, কিন্তু মনের দূরত্বের সৃষ্টি হয়নি। সুন্দর একটি বন্ধনে আমরা জড়িয়ে আছি। এরপর যখন কৈশোরে পদার্পণ করি, যখন বন্ধু শব্দের আবির্ভাব হয়, তখন বন্ধুপ্রীতি আমার মধ্যে বেশ জোড়ালোভাবে কাজ করে। সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক নিয়ে আমি থাকি। এমনকি আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। কথায়, A friend in need is a friend indeed, সে-ই প্রকৃত বন্ধু যে বিপদের বন্ধু। মানুষের সুদিনে শুধু কাছে থাকা নয় বরং দুর্দিনেও কাছে থাকতে হয়। আমি মানুষের সুদিনে তেমন যোগাযোগ করি না, কারণ সুদিনে অনেকেই কাছে আসে। কিন্তু যখন সে দুর্দিনে পরে সে সময় আমি তার পাশে থাকার চেষ্টা করি ও থাকি। আমার ছোটবেলায়, পাঠশালায়, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং চাকরি জীবনে যেসব বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সেই পরিচয়টিই দৃঢ় হয়েছে। যাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়েছে, তা সুসম্পর্কের সঙ্গে আছে। এমন নয় যে কোন বন্ধুর সঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধুদের জন্য অনেক সময় আমি নিজেকে সমস্যায় ফেলেছি, এমনকি শাস্তি পেয়েছি। বন্ধুর জন্য কিছু করতে গিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। সম্ভবত আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র এবং ক্লাসে আমার অবস্থান প্রথম। আমারই এক বন্ধু খুব গুরুতর অন্যায় করেছিল। শিক্ষক জানতে চাইলেন এ ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে। সবাই চুপ, কেউ মুখ খুলছে না। স্বভাবতই, আমি যেহেতু ফার্স্ট বয় স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি জানি কি না কে এই কাজটি করেছে। আমি মনে মনে ভাবি যে, আমি যদি দোষীর নামটি বলে দেই তাহলে সে অনেক মার খাবে। শিক্ষক সাহেব বেশ ক্ষিপ্ত ছিলেন এমনকি আরো ক্ষিপ্ত হলেন যখন আমি তাঁকে কোন উত্তর দিচ্ছি না। পরিণামস্বরূপ শিক্ষক সাহেব ওই দোষীর ওপর রাগটা আমার ওপর দিয়ে মেটালেন। আমি ছাত্রজীবনে বরাবরই মেধাবী ছিলাম। আমার যে বন্ধুগুলো পড়ালেখায় দুর্বল ছিল তাদেরকে পরীক্ষার সময় বিভিন্ন ধরনের সাহায্য করেছি। ব্যাপারটি সম্ভবত নৈতিকতার ভেতরে পড়ে না তবুও বন্ধুত্বের খাতিরে করেছি। কারণ তখনো স্ট‍ুডেন্ট লাইফ ছিল। অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না, শুধুমাত্র আমার বন্ধুর পাস করা ছাড়া। আমি তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র যখন আমাকে ফোর্স টিসি দেয়া হয়েছিল। এটা আমার কোন অকৃতকর্মের জন্য নয়। আমার বন্ধুর জন্য। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে প্রভাষকের কথা কাটাকাটির রেশ ধরে আমি বন্ধুর পক্ষ নেওয়ায় প্রভাষকের সঙ্গে আরো ঘটনার সৃষ্টি হয়। তার পক্ষ নিয়ে আমি জোরালো পদক্ষেপ নেয়ায় তিনি আরও ক্ষুব্ধ হন। শেষ পর্যন্ত আমাকে ও আমার বন্ধুকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো। আমার বাড়ির সন্নিকটের কলেজ ত্যাগ করে আমাকে চুয়াডাঙ্গায় ভর্তি হতে হলো। আমার স্কুল জীবন থেকেই আমি বন্ধুদের জন্য হেল্পফুল ছিলাম। আর্থিক অসচ্ছলতা বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা আমার বন্ধুদেরকে নানাবিধভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি। আমি আমার টিফিনের পয়সা থেকে জমিয়ে কখনো বা তাদের পড়ার জন্য বই কিনে দিয়েছি। কারও টিউশন ফি দিতে সমস্যা হলে আমার সাধ্যের মধ্যে থেকে আমি সহায়তা করেছি। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল কলেজ, তাই মাঝে মধ্যে খাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি আমার খাবার। আমার চেনা কোন বন্ধুর সমস্যার কথা শুনলে আমি ঠিক থাকতে পারতাম না। মনে হতো যেন আমিই বিপদে পড়েছি। গভীর রাতেও যদি কারো বিপদের কথা শুনেছি তার কাছে ছুটে গিয়েছি। সকল বাধা-বিপত্তি পাড়ি দিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মানুষ মনের দিক দিয়ে খুব দুর্বল থাকে, যখন কেউ অসুস্থ হয়। আমার একটি অভ্যাসের মধ্যে পড়ে যে আমি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াই। তাদেরকে দেখতে যাই, কথা বলে সাহস দেই। তার কোন রকম সাহায্য-সহযোগিতার দরকার হলে আমি সাহায্য করি। একসময় আমি রুটিন করার মতো করে ছুটির দিনে আমার পরিচিত অসুস্থ মানুষের সঙ্গে দেখা করতাম। আমার এই দীর্ঘ জীবনে অনেক ধরনের চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতার লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এই জীবনে কর্মরত অবস্থায় এবং তার বাইরে যে লোকজনের সঙ্গে চলেছি, বসেছি, উঠেছি কখনো কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হয়নি। কাউকে পছন্দ না হলে তার উপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলিনি। হয়তো বা মনে মনে কষ্ট পেয়েছি। তাই দেখা গেছে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে এড়িয়ে গিয়েছি। আমি কখনো কারো কোন ধরনের ক্ষতি হোক চাইনি। কাউকে অপছন্দ হলেও তার কোন ক্ষতি চাইনি, করিওনি। আমার সমগ্র জীবনে আমি এই বিষয়টি পালন করেছি। আমি আমার ছাত্র রাজনীতি জীবনে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি করতাম। আমি কমিউনিস্ট পার্টির সংশ্রবে ছিলাম। কমিউনিস্টদের যে নীতি, আত্মকেন্দ্রহীন, সবার জন্য মানুষের জন্য কাজ করা। সেখানে ব্যক্তিস্বার্থ খুবই তুচ্ছ বিষয়। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। হৃদয়কে উন্মুক্ত করা, মানুষকে ভালোবাসা- এই বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে কাজ করত। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে। সম্প্রতি আমি আমার ধর্ম নিয়ে মনোনিবেশ করছি। আল্লাহ তায়ালার দরবারে বেশি বেশি ইবাদত করার চেষ্টা করছি। আমাদের ধর্মেও বলা হয়েছে যে, তুমি একা সব কিছু ভোগ করো না, এতে তোমার আত্মীয়-স্বজনের অধিকার রয়েছে। তুমি তোমার নিকট আত্মীয় এবং প্রতিবেশীর হক (অধিকার) মেরে খেয়ো না। অর্থাৎ একার জন্য কিছু নয়। একা ভালো থাকবে আর তোমার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকবে, তা প্রশ্রয় দেয় না ইসলাম। যৌবনে কমিউনিজমের যে চিন্তা ধারণ করেছি তার পরিপূর্ণতা খুঁজে পেয়েছি ইসলামে। যদি উদাহরণস্বরূপ বলি, আমরা পাঁচ ভাই। ভাইদের মধ্যে আমি ব্যাংকিংয়ে। ব্যাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। এমন যদি হতো আমার কোন এক ভাইয়ের অবস্থা খারাপ, স্বভাবতই আমি ভালো থাকতে পারতাম না। আমি যদি আমার ফ্যামিলির পরিচয় দিতে যাই তখন যেন আমাদের সবার স্থানই ভালো থাকে-এটা আমি চেয়েছি এবং আল্লাহ তায়ালার রহমতে সবাই ভালো আছি। সব মানুষের মধ্যে এই গুণটি থাকা উচিত। আমার মধ্যে এই গুণটি থাকার জন্য আমি ভালো অনুভব করি। উপকার আমাদের মধ্যে কেউ কারও জন্য করতে পারি না। আমাদের ধর্মের কথা, বান্দা তুমি উপকার করার কে? একমাত্র আল্লাহ তায়ালা উপকার করতে পারেন। আল্লাহর হুকুম ছাড়া উপকার তো দূরের কথা, ক্ষতি করাও অসম্ভব। তবুও উপকার করার যে চেষ্টা আল্লাহতায়ালা আমাদের দ্বারা করান, এই চেষ্টার সঙ্গে শরিক হওয়া খুব বড় আনন্দময়। আমার দ্বারা কারো উপকার সাধিত হলে আমি খুব আনন্দ পাই। ঠিক তেমনিভাবে দেখা গেছে যে, যখন ছাত্র রাজনীতি করেছি তখন সাধারণ ছাত্রদের একটি দাবি বাস্তবায়নের জন্য নিজের ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করেছি। ঠিক একইভাবে যখন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংগঠন করেছি, সেখানে সাধারণ কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির জন্য কাজ করেছি। বিভিন্ন ফোরামে যখন কাজ করেছি তখন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেন বেস্ট বেনিফিট পায় তা নিশ্চিত করেছি। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেই একবার আমাদের বোর্ড বলছে আমার বেতন বৃদ্ধির জন্য। তখন আমি বোর্ডকে বললাম যে,আমি যথেষ্ট টাকা বেতন পাই। আমার বেতন বৃদ্ধি করবেন ভালো কথা, কিন্তু আমার বেতন বৃদ্ধির পূর্বে আমার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ ব্যাংকের অফিসারদের বেতন বেশি না। তাদের বেতন বৃদ্ধি করা দরকার। তাদের বেতন বৃদ্ধি করার পর আমি আমার ব্যাপারে আপনাদের জ্ঞাপন করবো তার আগে নয়। বিভিন্ন ব্যাংকে যখন কাজ করেছি তখন সহকর্মীদের যে সব সুযোগ-সুবিধা আছে তারা যেন তা পায় সেজন্য এবং তাদের প্রাপ্য পদোন্নতির জন্য আমি কাজ করেছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যেন আমার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও কোনভাবে কম সুযোগ-সুবিধা না পায় সে বিষয়ে সব সময় লক্ষ্য রেখেছি। আমার সঙ্গে কাজ করেছে তাদের বেশির ভাগেরই গৃহ নির্মাণখাতে যে সুবিধা ব্যাংকাররা পায়, তা যেন সবার জন্য হয় তার চেষ্টা করেছি। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে গৃহ-বসতি হচ্ছে অন্যতম। অন্তত থাকার মতো একটি আশ্রয়স্থল যেন থাকে। বাস্তবক্ষেত্রে যা হয় আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে, যখন উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির কিছু হলো, এমনকি মারা গেল তখন বাড়িওয়ার ফিলিংস কাজ করলেও সেই ভালো ভাড়াটিয়া পরিবারের দিকে তাকালে তার দুশ্চিন্তা হয় যে তারা ভাড়া দিতে পারবে কি না? বাড়িওয়ালা নানারকম অজুহাতে তখন ভাড়াটিয়াদের উঠিয়ে দেয়। অর্থাৎ তার জায়গা থেকে চলে যেতে হচ্ছে। তাই অন্তত একটি নিজের জায়গা থাকার মানে নিশ্চিত বসবাস। আমি যখন যেখানে কাজ করেছি সেখানে আমি বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী উপকৃত হতে পারে এ ধরনের প্রকল্প প্রণয়ন করেছি। সহকর্মীদের সর্বাত্মক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন স্থানে কাজের ক্ষেত্রে এর জন্য আমার সঙ্গে অনেকের অনেক লড়াপেটা হয়েছে। এই ব্যাংকেই দায়িত্ব পালনের সময় সর্বোচ্চ সংখ্যক পদোন্নতি দেয়ায় আমাদের বোর্ড অসন্তোষ প্রকাশ করে নিন্দা জ্ঞাপন করেছে বোর্ড রেজুলেশনে। প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল কারণ বোর্ড মিটিংয়ে আমার নির্ধারিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে তারা রাজি হয়েছিল। তার পরেও এটা লিখিতভাবে করা, এটা না করলেও পারতো। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখার পর আমার মন আর খারাপ রইল না। কারণ কাজটি আমি আমার নিজের জন্য করিনি। যাদের পদোন্নতির জন্য কাজটা করেছি তারা উপকৃত হবে। সুতরাং নিন্দিত হলেও সবার স্বার্থে কাজ করতে পেরে আনন্দিত। আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ভালো বা উন্নয়ন করাকে আমি আমার নৈতিক দায়িত্ব বলে ভাবি। নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য যদি কেউ নিন্দা জ্ঞাপন করে তাহলে আমার দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। আমি মনে করি এটাই আমার পুরস্কার। এই গুণটি সবারই থাকা বাঞ্ছনীয়। আমার পরিবারের ক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য হক, প্রতিবেশীর হক আদায়ের জন্য কাজ করার দরকার- আমার পরিবারে কারো কোন সমস্যা থাকলে তা জেনে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তার উপকারে আসা উচিত। এই ব্যাপারে সব সময়ই একটি বিষয় কাজ করে যে, কাজটি নীরবে-নিভৃতে সাহায্য করতে হবে। আর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যে কাজ করা দরকার তা সম্পাদন করা। সরকারি ব্যাংক ছেড়ে বেসরকারি ব্যাংকে যোগদান করার পূর্বের তুলনায় এখানে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাই। রোজগারের টাকা-পয়সাকে কিছু ভাগে ভাগ করি। আমার পরিবারের ভাগ, প্রতিবেশীর ভাগ, আত্মীয়-স্বজনদের ভাগগুলো নিজে নিজে করে ফেলি। বিভিন্ন রকমের যে সামাজিক কর্মকাণ্ড বা বিভিন্ন রকম দুস্থ মানুষের জন্য যে সহায়তা করা দরকার আমি আমার সাধ্যের মধ্যে থেকে তা করি। ছাত্রজীবনে একসময় যখন আমি ছাত্র রাজনীতি করেছি তখন এবং কর্মজীবনে কাজের জন্য অনেকে সমালোচনা করেছে। শুধু তাই নয়, অনেক ধরনের খারাপ কথাও বলেছে কেউ কেউ। কিন্তু তবুও আমি কারো কোন অমঙ্গল কামনা করিনি। একবারকার ঘটনা, আমি রূপালী ব্যাংক ছেড়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় আছি ম্যানেজার পদে। একদিন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য রূপালী ব্যাংকের সহকর্মী এলেন। আমার সামনাসামনি কেউ কখনো খারাপ বলেনি। কিন্তু আমি যখন রূপালী ব্যাংকের অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন করেছি, শুনেছি আমার সম্পর্কে তিনি নানা বাজে কথা বলেছেন। আমি তাঁকে বুঝতে না দিয়ে আমার স্বভাবসুলভভাবে তাঁকে বসতে দেই। চা পানে আপ্যায়ন করি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রূপালী ব্যাংক হতে আর্থিক সহায়তা পেতে আমার সহযোগিতার জন্য এসেছেন। রূপালী ব্যাংকে না থাকার কারণে কিভাবে এটা সম্ভব তাঁর কাছে জানতে চাই। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে আমি বললে তাঁর কাজ ইনশাল্লাহ হবে। এটা তাঁর বিশ্বাস। আমি কোন রকম দেরি না করেই রূপালী ব্যাংকের অথরিটির কাছে যাদের চিনতাম তাদের, বিশেষভাবে অনুরোধ জানালাম তাঁর অনুদানের জন্য। পরে রূপালী ব্যাংক তাঁকে বড় ধরনের অনুদান দিয়েছে। এই ঘটনার পর আমি মনে মনে চিন্তা করেছি যে, আমার তো তাঁর প্রতি রাগ করার অধিকার নেই। কারণ যে ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে গালিগালাজ করেছে সে আমার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছে-অবশ্যই সংকোচ, দ্বিধা নিয়ে বিপদে পড়ে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে তাঁকে পাঠিয়েছেন এটাই আমার প্রাপ্য। তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকতে পারে না। বিষয়টিকে আমি এই দৃষ্টিতে দেখেছি। কেউ আমাকে অবজ্ঞা করেছে আমি তখন ধৈর্য্য ধারণ করেছি। আমি অবজ্ঞাটাকে গায়ে মাখিনি। আবার সেই লোকই কোন না কোনভাবে আমার কাছে এসেছে। কথায় আছে যে, অন্যের জন্য যদি গর্ত করো তবে তুমি নিজেই সেই গর্তে পড়বে। আমরা ছোটবেলায় যেসব খনার বচন পড়েছি তা বাস্তব ক্ষেত্রে সত্য। আমাকে বিপদে ফেলার জন্য অনেকে নানাবিধ ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত করেছে কিন্তু তারা জীবনের দৌড়ে তেমনটা ওপরে উঠতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালার রহমতে আমি যে পজিশনে এসেছি তারা তা করতে পারেনি। আমি কখনোই কাউকে গর্তে ফেলার কোন গর্ত খুঁড়িনি। বরং আমার সঙ্গে যখনই এরকম ঘটনা ঘটেছে, আমি তখন তা সহনশীলতার সঙ্গে সুন্দর-স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছি। মানুষের উপকারের জন্য কাজ করতে পারায় যে আনন্দ আছে তা আমি খুব সুন্দরভাবে উপভোগ করি। যোগ্য অফিসারদের যে পদোন্নতি হচ্ছে না এই বিষয় নিয়ে আমার মনটা খুব খারাপ। আমি পেরেশানির মধ্যে আছি। তারপর দেখা গেল প্রমোশন হয়েছে। আবার কোন ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের পদে কাউকে উন্নীত করতে চাচ্ছি, সেটা হচ্ছে না। ছয় মাস বা নয় মাস পর যখন আমার মনোনীত ব্যক্তি পদোন্নতি পেয়েছেন-আমার যে কী আনন্দ তা ভাষায় বলার মতো না। মানুষের জীবনে তার স্ত্রী সবচেয়ে কাছের। কারণ সেসব কিছুই উপলব্ধি করে। কেউ যখন আমাকে গালি দিচ্ছে বা কেউ অপছন্দ করছে তখন কিন্তু আমি তা মুখ বুঝে সহ্য করেছি। আমার স্ত্রী আমাকে তা দেখে বলত যে, আমার নাকি গন্ডারের চামড়া। সারাদিন কাজ করে যখন কর্মক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীরে বাসায় ফিরেও যখন আমাকে বেশ প্রফুল্ল অবস্থায় দেখে আমার স্ত্রী আমাকে বলত ব্যাপারটা কী? দেখা গেছে আমার সকল কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য আনন্দ উদযাপন করছি। আমার এই আনন্দে সেও আনন্দিত হয়। আমি যে মানুষের এত উপকারে আসছি তার জন্য সে আমার প্রশংসা করে থাকে। সর্বোপরি আমি মনে করি যে, একজন হিউম্যান বিইংয়ের মধ্যে এই গুণাবলি থাকা দরকার। এসব গুণাবলি যদি কারো মধ্যে থাকে তবে ব্যক্তি জীবনে একটি পরিবার ভালো থাকতে পারে। সমাজ জীবনে একটি সমাজ ভালো থাকতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে যেমন প্রতিষ্ঠান ভালো থাকতে পারে, তেমনি করে রাষ্ট্রীয় জীবনে রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে। পরস্পরের জন্য কিছু করার চেষ্টা এবং অন্যের উপকারে আসার যে আনন্দ তা মধুর-মধুময়। সবাইকে তার নিজ নিজ জায়গায় থেকে সৎ, পরিশ্রমী, যোগ্য করে তুলতে হবে, তাহলেই নিজের ভালোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের উন্নতি সাধিত হবে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক-আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা পরিহার করতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবে প্রতিনিয়ত এর বিপরীত চিত্রের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা- ব্যক্তিস্বার্থ সমষ্টির ঊর্ধ্বে- দলীয় স্বার্থ সমাজের ঊর্ধ্বে স্থান পাচ্ছে- ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহত্তর স্বার্থের জলাঞ্জলি। লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ফার্স্ট সিকিউরিট ইসলামী ব্যাংক লি.

কৃষকদের নিয়ে ভাবতে হবে এখনই

কয়েক দিন আগে ধান ক্ষেতে আগুন দিয়েছেন এক কৃষক। টাঙ্গাইলে এই কৃষক ধানের দাম কম হওয়ায় ধান ক্ষেতে আগুন দেন বলে দেশের প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোয় উঠে এসেছে। ওই কৃষক অভিযোগ তুলেছেন, ধানের দাম কম এবং ধান কাটার জন্য কৃষাণের মূল্য বেশি হওয়ায় তিনি মাঠ থেকে ধান না কেটে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, এক মন ধানের দাম ৫০০ টাকা আর একটি কৃষি মজুরির মূল্য ৫০০ থেকে ৮৫০ টাকা এলাকা ভেদে। ফলে মাঠ থেকে ধান কেটে নিয়ে আসলে তার লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে বলে তিনি মনে করছেন। এটা শুধু টাঙ্গাইল জেলার চিত্র নয়, এটা সারা বাংলাদেশের খণ্ড চিত্র বলে অনেকেই মনে করছেন। সব সময় একটা কথা বলা হয়ে থাকে কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এক অর্থে অনেকেই মনে করেন, কথাটি সত্য। বিশ্বের সব দেশের কৃষকদের কদর করা হয়। কারণ তারাই মুলত খাদ্যের যোগান দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই অধিকাংশ মানুষ বলে থাকেন কৃষককের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন করা দরকার। আমাদের দেশের নেতাকর্মীরা প্রায় সময় সভা-সমাবেশে কৃষকদের উন্নয়নের কথা বলে থাকে। আসলে কতটা উন্নয়ন করেছেন বা করার জন্য আগ্রহী এটা নিয়ে যতেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মনেই। প্রকৃত পক্ষে কি নেতাকর্মীরা কি দেশের কৃসকদের উন্নয়ন চান? চাইলে কি ধরনের উন্নয়ন চান? এটা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কৃষকদের কথা তুলে ধরছেন অনেকেই। কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরছেন। তাদের ক্ষোভের কথা প্রকাশ করছেন ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয় প্রায় প্রতিবছর। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বোনাস নিয়ে বেশ মাতামাথি দেখা যায়। বেতন ছাড়াও বিভিন্ন সময় তাদের বোনাস দেওয়া হয়। দুই ঈদে সরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস দেওয়া হয়। এছাড়াও বৈশাখী ভাতাও দেওয়া হয়। কিন্তু কৃষকদের জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কি করছেন? তাদের জন্য কি কোনো ব্যবস্থা করতে পারে না সংশ্লিষ্টরা। দেশের কয়েকটি সংবাদ পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের কল্যাণে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ওই ঘটনা। ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর আব্দুল মালেক সিকদার নামের এক কৃষক নিজের পাকা ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ওই জেলার উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা এলাকায় তিনি ধান ক্ষেতে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। মালেক সিকদারের এই প্রতিবাদে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকার অধিকাংশ কৃষক। পাকা ধানে আগুন দেখে অনেকেই ছুটে আসেন। এ বিষয়ে মালেক সিকদার বলেন, প্রতি মণ ধানের দাম থেকে প্রতি শ্রমিকের মজুরীর দাম দ্বিগুণ। এবার ধান আবাদ করে আমরা মাঠে মারা পড়েছি। তাই মনের দুঃখে পাকা ধানে আগুন দিয়েছি। এদিকে কালিহাতীর আউলটিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান মজনু নামের আরেক কৃষক তার ক্ষেতের পাকা ধান এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন। এলাকাবাসী ধান কেটে অর্ধেক অংশ নিজে এবং বাকি অর্ধেক অংশ ক্ষেত মালিককে দিয়ে দিচ্ছেন। এটা শুধু টাঙ্গাইল জেলার নয়, এই চিত্র সারাদেশের কৃষকদের। এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে দেশের কৃষকরা বলে কৃষকরা অভিযোগ করছেন। কৃষকরা দাবি করছেন, তাদের দিকে কেউ নজর দেয় না। তারা রোধে-বৃষ্টিতে পুড়ে ফসল ফলান কিন্তু তারা সুখে নেই। তারা তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারছেন না। তারা তিন বেলা ভালোভাবে খেতে পারেন না। তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সম্প্রতি এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। আর এক  মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। ফলে এক মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি মাংসও কিনতে পারছেন না একজন কৃষক। অনেক কৃষক ইলিশ মাছের স্বাদ ভুলে গেছেন বলে মনে  করেন অনেকেই। একটা বড় ইলিশ এক থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে তা একজন প্রান্তীক কৃষকের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। কৃষকরা ভালো খাবার না খেতে পেরে পুষ্টিহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বর্তমানে এক মণ ধান উৎপাদন করতে যে পরিমান খরচ হয় তা বিক্রি করে উঠে না। ফলে ধান উৎপাদন করা থেকে বিরত রয়েছেন ইতোমধ্যে অনেক কৃষক। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলছেন অনেকেই। ইতোমধ্যে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে যেটা খুবই সামান্য। আর এই প্রণোদনার অর্থ মুলত প্রান্তীক কৃষকদের কাছে পৌঁছায় না বলে অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন। কয়েকজন কৃষকরে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হয় তা সরকারি আমলাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে  শেষে কৃষকদের হাতে পৌঁছে যতসামান্য। তাদের সরাসরি দিতে হবে। অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন, তাদের সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া করাতে পারছেন না। যারা লেখা পড়া করছেন তারাও চাকরি পাচ্ছেন না। এখন সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে।  আর এই সোনার হরিণ জয় করার জন্য কৃষকের সন্তানরা হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি চাকরিতে ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় খুব কম বলেই মনে করেন দেশের সিংহভাগ মানুষ। কিন্তু কষ্ট করে পড়াখেলা করার পর কৃষকদের সন্তানরা চাকরি না পেলেও কৃষি ক্ষেত্রেও তারা আত্মনিয়োগ করতে পারছে না। এখন কথায় কথায় বলা হচ্ছে প্রযুক্তির উন্নয়নে উদ্যোক্তা হওেয়ার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে । কিন্তু কৃষি পণ্যের এই দাম কমের জন্য অনেকেই কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করতে চাইবে না। কৃষির যদিও কোনো কৃষিপণ্যের দাম রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে বেশ চড়া কিন্তু প্রান্তীক কৃষক দাম পান না। মধ্যস্বত্য ভোগীরাই লাভবান হচ্ছে বলে অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন। আর গ্রাম থেকে কৃষি পণ্য রাজধানী ঢাকা বা বিভাগীয় শহরে নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন রুটে দিতে হয় চাঁদা। এটা ফুটে উঠেছে কয়েকদিন আগে একটি সহযোগী টেলিভিশন চ্যানেলের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এছাড়া দেশের একটি অন্যতম দৈনিকে কয়েকদিন আগে ফুটে উঠেছে দেশের চাঁদাবাজির দৃশ্য। ফলে পণ্যের দাম বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বরাবরই এটা যেন দেখার কেউ নেই। দেশের শুধু শোনা যাচ্ছে উন্নয়ন আর উন্নয়ন। হ্যাঁ উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সবকিছুর বিচার করা মনে হয় ঠিক হবে না। বড় বড় দালান কোটা, বড় বড় ফ্লাইওয়ার, বা ব্রিজ নির্মাণ করে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে চাওয়া মনে হয় এক অর্থে বোকামিই হবে। দেশের মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে হবে। দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠীকে পুষ্টিহীন মেধাহীন জাতি তৈরি করে উন্নয়নের শিখরে যাওয়া যাবে না। কৃষক ও তাদের সন্তানদের কথা চিন্তা করতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়েনের জন্য- কৃষকদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে হবে। কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নকে বাদ দিয়ে অন্য উন্নয়ন চিন্তা করা বোকামি ছাড়া কিছুই না।  কৃষকদের জন্য মঙ্গলের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে কৃষকরা আর ধান ক্ষেতে আগুন না দেয়। সে ব্যবস্থা করতে হবে সরকার বা সংশ্লিষ্টদের। কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের মাসিক কোনো ভাতা দেওয়া যায় কি না, এটা নিয়ে সরকার বা সংশিষ্টরা ভাবতে পারেন এখনই। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বা সরকারি চাকরিতে কৃষককের সন্তানদের জন্য বিশেষ কোটা ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়েও ভাবা যেতে পারে। কৃষকদের কল্যাণে তাদের নগদ কোনো প্রণোদনা দেওয়া যায়ি কি, তাও ভাবা যেতে পারে না। সরকারের উন্নয়নের অংশ করে নিতে হবে কৃষকদের। কৃষকদের উন্নয়ন করতে পারলে, তবে সুষম উন্নয়ন হবে বলেই মনে হয়। তাই কৃষকদের উন্নয়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টরা এখনই ভাববেন এমনটাই প্রত্যাশা থাকলো।   লেখক: সাংবাদিক।   এসএইচ/  

জীবনের পথে পথচলা

মানুষের জীবনটা কী? আমাদের এই জীবনটাকে কেন্দ্র করে কত কিছু আমরা করেছি। সারাদিন প্রাণান্তকর পরিশ্রম। সুখ-আনন্দ-স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে আমরা ছুটছি। এই ছোটা অন্তহীন। কিন্তু সুখের সন্ধান সত্যিকারভাবে আমরা কি পাচ্ছি? সাংসারিক-জাগতিক এই জীবনটা আসলে হল একটা লড়াপেটার জীবন। প্রতিটি মুহ‍ূর্তে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে অগ্রসর হতে হচ্ছে। টিকে থাকার জন্য বেঁচে থাকার জন্য নিয়ত আমরা যুদ্ধ করছি। দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা জীবনের নিত্য সাথী। হাসি-আনন্দ ভালো লাগার সময়টা আর কতটুকু?  আমার জানা নেই কোন মানুষ পৃথিবীতে পরিপূর্ণ পরিতৃপ্ত কি? নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ কেউ ভোগ করতে পারছে কি? মানুষের মনের কথা আমরা কতটুকুই বা জানতে পারি। একজন তার কতটা সমাজে প্রকাশ করতে পারে। সমাজ সংস্কারের বেড়াজালে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। লোকলজ্জা সমাজের ভয়ে আমরা কতটুকু প্রকাশ করতে পারি নিজেকে? আর এই অপ্রকাশিতেব্যের যন্ত্রণা অত্যন্ত কষ্টকর, নিন্দনীয়, নিদারুণ পীড়াদায়ক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা পরীক্ষা দিচ্ছি। জীবন পরীক্ষাগারে আমাদের হাতে একটা প্রবেশপত্র ধরিয়ে দিয়ে আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। একের পর এক পরীক্ষা আমরা দিয়ে চলেছি। বিরামহীন এই পরীক্ষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কখনও কখনও আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তবুও ছাড় নেই এই পরীক্ষার। কখনও জীবন বিষাদময় হয়ে পড়ে। তবে হ্যা, পরীক্ষায় পাসের আনন্দের মতো ছোটখাট আনন্দবোধ জীবনে আসে না তা নয়। হাসি-আনন্দের স্বাদ পায় তবে তার ভাগটা খুবই সীমিত। জীবনটাকে একটা পরীক্ষা কেন্দ্র ভেবে নিয়ে এবং নিজেকে ছাত্র মনে করে সিলেবাস অনুযায়ী নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া- এটাই আমাদের করণীয়। আনন্দটা সবার, সবাইকে ভাগ করে উপভোগ করা যায়। দুঃখটা একার কারোর সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। মরিতে চাই না এই সুন্দর ভূবনে। এই উক্তি জ্ঞান হবার পর হতে শুনে আসছি। কিন্তু এই ভূবন সুন্দর না অসুন্দর তার সঠিকভাবে উপলব্ধি করা খুব কঠিন বলে মনে হয়। সামাজিক জীব হিসেবে আমরা পরিবারভুক্ত হয়ে জীবন যাপন করি। এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন মোটেই হাসিখেলার নয়। অত্যন্ত কঠিনভাবে শৃঙ্খলিত। এমনভাবে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। যার যাতনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশ্লেষকরা হাসি-আনন্দ এবং দুঃখ-বেদনাকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় এই দুটোর হিসেবে-নিকেশ করলে বেদনার পাল্লাই ভারী হবে। আমরা কয়জন মানুষের কথা জানি? দৃশ্যত সাদামাটাভাবে চলা মানুষের মনের খবর কি জানি? বাহ্যিকভাবে চলাফেরায় কিছুই আঁচ করা যায় না।  একেকজনের একেক ধরনের সমস্যা। সমস্যার ধরন ভিন্ন হতে পারে কিন্তু বেদনাবোধ এক। গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে আমরা কেউই নিরবচ্ছিন্ন হাসি-আনন্দে নেই। মনের গভীরে লুকিয়ে আছে গভীর যন্ত্রণা, যা প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত করছে। কেউ কখন কিছু প্রকাশ করছে জেনে আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু না জানা রয়ে যাচ্ছে বেশির ভাগের দুঃখবেদনা। জীবনের চলার পথ মসৃণ সমতল নয়।  আঁকাবাঁকা ভঙ্গুর পথ পেরিয়ে চলতে হয় আমাদের। আঁকাবাঁকা পথে হোঁচট খেতে হয়। ক্ষত-বিক্ষত হই আমরা। কষ্ট পাই, দুঃখবোধ আর কষ্ট নিয়ে নিজের মনের মধ্যে গুমরে মরতে হয়। কোনো কোনো বিষয় আছে নিকটজনের সঙ্গে শেয়ার করে হালকা হওয়া যায়। কিছু কিছু বিষয় থাকে, যা কারোর সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। একান্ত নিজের বিষয়। এগুলোর যাতনা সবচেয়ে বেশি, বলা যায় না আবার সহ্য করা কষ্টকর। মনের নিভৃতে লালন করে গুমরে মরতে হয়।  আশাবাদী মানুষ তার পরেও আশায় আশায় দিনগুণে কখন সুদিন আসবে। দুঃখের দিনের অবসান হবে রাতের আঁধার পেরিয়ে ভোরের সোনালি হাস্যোজ্জ্বল সূর্য উঠবে। স্বপ্ন কখনও কখনও সফল হয়, জীবন আকাশের অন্ধকার কেটে যায়। হাসি-আনন্দময় হয়ে ওঠে জীবন। রাতের পর দিন, দিনের পর রাত এই চিরন্তন নিয়মাবলি নিয়েই আমাদের জীবন আবর্তিত হয়। একটানা হাসি-আনন্দ অথবা জীবনের প্রতিটি স্তরেই দুঃখ ভোগ করতে হয়। এ রকম সাধারণত ঘটে না। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নিজের জীবনের পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই আমার ইচ্ছে পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুই ঘটেনি। সবই ঘটেছে বাইরের-নেপথ্যের কোন শক্তির ইচ্ছা মাফিক। ছোটবেলায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে এবং আইন ব্যবসায়ী পিতার পুত্র হিসেবে মনে স্বপ্ন দেখেছিলাম ব্যারিস্টার হওয়ার। এই স্বপ্নকে লালন করে ধীরে ধীরে বড় হয়েছিলাম। প্রথম হোঁচট খেলাম বৃত্তি পেয়ে অষ্টম শ্রেণি হতে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর। Arts-Science গ্র‍ুপে বিভক্ত হওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এই পর্যায়ে আব্বা আমার আইনজীবী হওয়ার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিলেন। তাঁর ডাক্তার হতে না পারার ইচ্ছেটা আমাকে পূরণ করার নির্দেশ দিলেন। ক্যারিয়ার নিয়ে এত কষ্ট মনে হয় আর পাইনি। পরবর্তীতে আব্বার ইচ্ছে পূরণ করার জন্য Science-এ ভর্তি হই। ছাত্র রাজনীতিতে জেল-জুলুম খেটে আইএসসি আর পাস করা হলো না। বড় দুলাভাইয়ের চেষ্টায় গোপনে ভর্তি রাখার কারণে আইএ পরীক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তখন জেল ফেরত তুখোড় ছাত্রনেতা। অতি মেধাবী হওয়ায় ২ বছর পর কোন ক্লাস না করে শুধু বিভিন্ন Reference বই পড়ে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগ পেয়েছিলাম। ছাত্ররাজনীতি করার জন্য নামকাওয়াস্তে বাংলা অনার্সে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। আমার বড় বোন খুব হেয় কথা বলেছিলেন। বাংলা মেয়েদের বিষয়, উনি সেই আমলে ইংরেজিতে এমএ। সুতরাং তাঁর এ অহঙ্কার থাকার কথা। ভাইয়েরও জেদ কম নয় তাই অর্থনীতিতে ভর্তি হলাম। ব্যক্তি জীবনে উদ্দেশ্যবিহীন রাজনীতি ধ্যান। রাজনীতি স্বপ্ন। স্বৈরাচার আইয়ুব শাহীর পতন সর্বহারার রাজ কায়েম। কৃষক-শ্রমিকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করাকালীন ব্যক্তি জীবনের কথা ভাবতাম না। ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা, প্রতিষ্ঠা অর্জন সংসার ধর্ম-এগুলো ছিল চিন্তা-চেতনার ঊর্ধ্বে। খুব সতর্কতায় এগুলো পরিহার করার চেষ্টা করেছি। সহপাঠিনী পার্টির মেয়ে নেত্রীদেরকে নিজের বোন ভেবেছি। সেভাবে দূরত্ব বজায় রেখেছি। হ্যাংলামোপনা অপছন্দ করেছি। ভেবেছি ঘর সংসারী হব না, জীবন বিসর্জন দেব সাধারণ মানুষের জন্য। সেখানেও ওপর আল্লাহর ইচ্ছে উল্টো খাতে প্রভাবিত হয়েছে। আমার সংকল্পে বিধাতা বিদ্রুপের হাসি হেসেছেন। সংসারী শুধু হতে হয়েছে তাই নয় অনেক আগে। তারপরে দল, ব্যক্তি জীবন, সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা সামগ্রিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সব কিছু মিলিয়ে একদিন আবার সেই প্রিয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিতে হয়েছে। এখানেও নিজের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে। যে রাজনীতির জন্য মৃত্যুশয্যায় শায়িত বাবার কাছে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। ভাল ছাত্র হয়েও লেখাপড়ায় ছেদ পড়েছে। জেল-জুলুম-নির্যাতন অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। সেই সাধের রাজনীতি করা হলো না। তখন মনে করলাম পাস করে যশোরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করব। কারোর অধীনে চাকরি করার কথা কোনদিন ভাবিনি। B.C.S ফরম হাতে পেয়েও জমা দিলাম না। সেখানেও ওপরওয়ালার ইচ্ছে অন্য রকম। অনেকটা জেদের বশে Banking Recruitment-এর একটা ফরম জমা দিয়েছিলাম। একবারই চাকরির দরখাস্ত সরাসরি Senior Officer নিয়োগ। গুরুজনের পরামর্শে অনেকটা Test Case-এ মতো চাকরিতে যোগদান। সেখানে ওপরওয়ালার পূর্ণ সহযোগিতায় সুদীর্ঘ ৩৭ বছর কাটিয়ে দিলাম এবং স্রষ্টার অনুগ্রহে চাকরির সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছি। একসময় প্রগতিশীল রাজনীতি করার কারণে বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলাম। ধর্মেকর্মে আস্থা ছিল না। অর্থনীতিতে পড়ার সময়ে খুব আগ্রহে সমাজতন্ত্রের বই পড়াশোনা করতাম। তখন ভাগ্য বিশ্বাস করতাম না। বলতাম মানুষ নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। বিশ বছর পূর্বে যখন আবার ধর্মে বিশ্বাস ফিরে আসতে থাকে তখন মনে হয়েছে আমার জীবনে যা কিছু ঘটছে তা নিয়তির লিখন। দোষে-গুণে মানুষ। আমাদের প্রত্যেকের কিছু দোষ, কিছু গুণ আছে। কারোর দোষ বেশি আবার কারোর বা গুণ বেশি। এর বাইরের আমরা কেউ নই। সুতরাং মানুষকে বিচার করতে হলে আপেক্ষিক শব্দটার ব্যবহার এসে যাবে। ধর্মে যখন পরিপূর্ণ বিশ্বাসে কাজ করছি তখন ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান জনাব সাইফুল আলম মাসুদ সাহেব অনেকভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত-পরিশ্রমী ধর্মপরায়ণ এই মানুষটির ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এত সাধারণ জীবন যাপনকারী নিরহঙ্কার মানুষ খুব কমই দেখা যায়। বুদ্ধির গভীরতার কারণে তাঁর মনের সঠিকতা অনুধাবন করা যায় না বলে একেক সময়ে তাকে একেক আঙ্গিকে আবির্ভূত হয়েছেন বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে অপর একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি অধ্যাপক (ডা.)  আব্দুল ওহাবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। উনার কাছ থেকে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের নানা বিষয়ে জেনেছি। ২০০১ সালে প্রথম যখন হজব্রত পালন করতে যাই ওহাব ভাই নিজে ইহরাম বাঁধা শেখানোসহ নানা পরামর্শ দিয়েছেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দিয়েছেন। ব্যক্তি জীবনে আমার একজন ঘনিষ্ঠ সুহৃদ। এই ওহাব ভাইও এক সময় ফুল বাবু ছিলেন স্যুটেড ব্যুটেড। তাঁর জীবনেও বড় পরিবর্তন এক সময়ে এসেছে এবং আস্তে আস্তে সব কিছু ছেড়ে জুব্বা পড়েছেন এবং ধর্মীয়ভাবে জীবন কঠোরভাবে অনুশীলন করছেন। তার অতীত জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে আমি পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের চিন্তার ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হয়ে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক হয়ে সর্বহারা রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী হয়েছিলাম। কমিউনিস্ট হওয়ার বাসনায় ত্যাগকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। সে জন্য জীবনে অনেক ঘটনা দুর্ঘটনায় জড়াতে হয়েছে, সে এক লম্বা ইতিহাস। মেধাবী ছাত্র হয়েও পড়াশোনায় ছেদ পড়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে যেখানে-সেখানে ঘুমিয়েছি যা পেয়েছি, তা খাওয়ার অভ্যাস করেছি। সাধারণ কাপড়-চোপড় পড়েছি, আমাদের বাড়ির কামলার ঘরে তার বিছানায় শুয়েছি। অতি দরিদ্র ক্ষেত মজুর নিঃস্ব-বিত্তহীন মানুষের নিত্যসঙ্গী হওয়ার জন্য কত প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছি। সমাজ পরিবারের ছেলে হয়ে জোতদারের গোলার ধান ছিনিয়ে নেবার জন্য কৃষকদের, দিন-মজুরদেরকে উৎসাহিত করতে কত জ্বালাময়ী বক্ত‍ৃতা দিয়েছি। ঘরের জিনিস মানুষকে দিয়েছি। লোকের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেয়েছি, বিশ্রাম-ঘুম হারাম করে সর্বহারা রাজনীতির দীক্ষায় উজ্জ্বীবিত হয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলাম। ভোগে নয়, ত্যাগেই মুক্তি। এ আদর্শই ছিল তখনকার জীবন। সাধারণ মানুষের কাতারে মেশার জন্য, শামিল হবার জন্য কত পরিশ্রম করেছি, শ্রেণিচ্যুত হবার লড়াই করেছি। নিজেকে বুর্জোয়া সমাজের ভোগবিলাস থেকে মুক্ত করার জন্য প্রতিনিয়ত ঘরে-বাইরে লড়াই করেছি। একদিকে সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপরদিকে নিজের মনের বিরুদ্ধে লড়েছি। পড়াশোনার ক্ষতি, সুযোগ-সুবিধা পরিহার এমনকি জেল-জুলুম-নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করেছিলাম। রূপালী ব্যাংক বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। ব্যাংক-বীমা জাতীয়করণের দাবিতে ১৯৬৯ সালে আন্দোলন করেছি। সঙ্গত কারণে আশির দশকে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলেও কখনও চাকরি করতে উৎসাহিত হইনি। অথচ সেই বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করলাম দীর্ঘ সময়। ভাবতেও অবাক লাগে, হিসাব মেলাতে পারি না। নিজেকে অচেনা লাগে নিজের কাছে। বড়ই বিচিত্র আমাদের এই জীবন। জীবনের বৈচিত্র্যতা পরতে পরতে উপলব্ধি করা যায়। নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা। কত ঘটনাবহুল এই জীবন আমাদের। মনের আয়নায় দেখলে ভেসে ওঠে ঘটনার পর ঘটনা। ঘটনাগুলি সাজালে নিজেরই বিস্ময় লাগে। কখনও কখনও ঘটনার ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায় আবার কোন কোন সময় পরস্পরের বৈপরিত্য দেখতে হয়। অবাক লাগে নিজেকে মনের দর্পণে অচেনা লাগে এ যেন এক অচেনা আগন্তুক, যার সঙ্গে আমার আজই পরিচয় হচ্ছে। এই আমি যেন অন্য কেউ, আমার সঙ্গে এর মিল নেই। ভাবতে থাকি এ তো আমি নই। আমার ছদ্মাবরণে অন্য কারোর উপস্থিতি টের পাই।   আজ সুদীর্ঘ বছর পাড়ি দিয়ে মনে হয় সেদিনের সে চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত এক মানুষ আমি। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধাভোগী বেসরকারি (ধনিক শ্রেণির) প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, চাকরিজীবী হিসেবে এ দেশে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় তার সবই এখন আমার করায়ত্ব। সময় অবস্থান সবই আমাকে পাল্টে দিয়েছে। সেদিনের তুলনায় আমার আজ আমূল পরিবর্তন হয়েছে। খদ্দরের পাঞ্জাবি-পায়জামার জায়গায় আজ ঝেকে বসেছে স্যুট-কোট-টাই ফলশ্রুতিতে চিন্তা-চেতনারও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ত্যাগের পরিবর্তে ভোগ-বাসনার আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে- ক্রমান্বয়ে আগ্রহী হচ্ছি। এখন মনে হয় মানুষের জীবনে অনেক কিছু ঘটে, যাতে তার হাত থাকে না। এক সময় বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলাম। ধর্মে বিশ্বাস ছিল না। এখন পুরোপুরি ভাববাদী দর্শনে পূর্ণ আস্থাশীল মহান স্রষ্টার হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না। মানুষকে রাব্বুল আলামিন চেষ্টা করতে বলেছেন কিন্তু সব কিছু নির্ধারণ-নিয়ন্ত্রণ উনিই করেন। জীবনের অতীত দিনগুলি এখন শুধু স্মৃতিমাত্র। হঠাৎ কখন কখন বিশেষ মুহূর্তে এসব অতীত মনে উঁকি মারে। মুহূর্তে আমাকে সে দিনগুলিতে নিয়ে যায়। আমাদের শেষ গন্তব্যস্থল কবর। মৃত্যুই জীবনের পরিণতি। ক্ষণিকের আবাসস্থল এই পৃথিবী। অথচ এর মোহ অতি মোহনীয় তাই শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও জীবনে চলতে চাই আমরা। যিনি আমাদেরকে এখানে এনেছেন তিনি একমাত্র জানেন কীভাবে পৃথিবীর সময়গুলি অতিবাহিত হবে। আমরা এত অসহায়, যা ভাবার নয়, বোঝারও নয়। আমার মনে হয় সবচেয়ে কঠিন সময় কাটে এই সংসার জীবনে। বিচিত্র ঘটনাবলি সুখ-দুঃখে গড়া এই জীবন। যেখানে দুঃখ-যাতনা আর কষ্ট ভোগই বেশি। কিন্তু সব কিছুর পরিসমাপ্তি ঘটে মৃত্যুতেই। সব চিন্তা-ভাবনার অবসান টেনে আনে। বন্ধুরা ২-১ জন ফিরে যাওয়া শুরু করেছে। গত ঈদের পরপরই ছোটবেলার বাল্যবন্ধু সদরুল আলম (ডন) আকস্মিকভাবে চলে গেল কোন জানান না দিয়ে। কয়েক দিন আগে ওমরাহ পালন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে প্লেনে পত্রিকায় দেখলাম আমাদের সহপাঠী আব্বাস উদ্দিন আফসারী লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায়। চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া জরুরি। ঘনিষ্ঠ সহপাঠী বন্ধু বিষ্ণুপদ মালাকার দীর্ঘ রোগভোগের পর পরপারে চলে গেল। সেও চলে গেল। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইলিয়াসের স্ত্রী পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। সবার খবর সব সময় আমরা পাই না। বাল্যকালের সেই দিনগুলির মতো বন্ধুত্বের বন্ধন আর এখন মনে হয় নেই। জীবনের যান্ত্রিকতা সবাইকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কর্মজীবনের পরিধিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছি আমরা। লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ফার্স্ট সিকিউরিট ইসলামী ব্যাংক লি.

মায়ের কারণেই আমরা শিল্পপতি

  সম্ভবত ১৯৭৮ সাল, কোন এক সন্ধ্যায় রান্না ঘরে ছোট মামার সঙ্গে মা বিভিন্ন বিষয়ে আলাপরত। আমি লন্ঠন জ্বালিয়ে পাশে বসে পড়ালেখা করছিলাম। কোন এক ফাঁকে কানে আসল মামা মাকে বলছেন, বুবু তোমার ১০ ছেলে চার মেয়ের এত বড় সংসার। বড় ছেলে একার পক্ষে এত বড় সংসার অভাব-অনটনের মধ্যে চালানো সম্ভব হবে না। তুমি তোমার মেঝ ছেলেকে দুবাই পাঠিয়ে দাও। মা শক্ত ও দৃঢ় কন্ঠে বললেন, না ভাই, আমার বড় ছেলেকে আমি এম. কম পাস করিয়েছি। আমার মেঝ ছেলেকেও এম. কম পাস করাব। সে যদি এম.কম পাস করে আমার বাকি ছেলেমেয়েরাও এম. কম পড়বে। প্রয়োজনে ওদের বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও তাকে পড়ালেখা করাব। আমার সেই মা, যার কারণে আজ আমরা ৬ ভাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছি দেশের অন্যতম শিল্পগ্রুপ `ওয়েল গ্রুপ`। মা দিবস উপলক্ষে মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের ফেইসবুক পেজে (ওয়েল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ নুরুল ইসলাম এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের শিল্পপতি বানানোর পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে মা। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুধু আমরা কাজ করেছি। মা যখন মামার সঙ্গে শক্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল প্রয়োজনে সব সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও আমার সন্তানদের লেখাপড়া করাব। সমাজে ভাল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাব। সেই রাত থেকে মায়ের স্বপ্ন আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখি নির্ঘুম রাতে, আর সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলি, একটি স্বপ্ন পুরণ হতেই নতুন স্বপ্ন, আবার স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা...। কখন যে রাত জেগে দেখা সেই সব স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে ৩০টি বছর চলে গেল বুঝতেই পারিনি। তিনি আরো বলেন, যদি কেউ প্রশ্ন করে আমার শিল্পপতি হওয়ার পেছনে কার প্রেরণা ছিল? আমি বলব আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হচ্ছে দুজন নারী। একজন আমার প্রাণপ্রিয় মা, অন্যজন আমার স্ত্রী। মা আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, আর মায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমার স্ত্রী। তাদের দুইজনের সহায়ক অনুপ্রেরণায় আজ এই অবস্থানে আমি। আজ মা দিবসে মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।   টিআর/

মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি

“মধুর আমার মায়ের হাসি, চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে”। এই গানের সঙ্গেই মিলে যায় আমার জীবনের গল্প। সবসময় মনে পড়ে আমার মায়ের কথা। বিশেষ করে মায়ের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ আমার হৃদয়কে নাড়া দেয়। মা সবসময় বলতেন বাবা তোমার বিজয় হবেই, এতো হতাশ হইওনা। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। মায়ের সেই অনুপ্রেরণাই আজকে আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। আমার মা সালেহা বেগম। তিনি তার ভাই-বোনদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত-শিষ্ট ও ভদ্র। তিনি খুবই সহজ সরল জীবন-যাবন করেন। আমাদের দেখা শোনা করার জন্য তিনি তার মূল্যবান সময় ব্যয় করেন। তিনি পেশায় একজন গৃহিণী। আমরা চার ভাই এক বোন। আমাদের সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মা তার সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন। বাড়িতে তিনি হাঁস মুরগি লালন-পালন করতেন। এগুলো লালন-পালন করে পরিবারের খাবার যোগান দেওয়ার পাশাপাশি কিছু টাকা উপার্জন করেন। উপার্জিত টাকা আমাদের পড়াশোনায় ব্যয় করেন। আমি হলাম বাবা-মায়ের সবচেয়ে ছোট সন্তান। তাই তারা আমাকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। মা আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন। প্রাইমারি স্কুলের পড়া শেষ করার পর ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আমার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হতে শুরু করে। এতে আমার লেখাপড়া নিয়ে আমার মায়ের আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। এরপর মায়ের উৎসাহে ক্লাসের পারফরমেন্স ভালো হতে থাকে। আমাকে নিয়ে মার স্বপ্নও বাড়তে থাকে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে আমি একজন ভালো মানুষ হবো, মানুষের সেবা করব। সর্বোপরি একজন সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক হবো। ষাটের অধিক বয়স হওয়া সত্বেও এখনো আমাদের কথা চিন্তা করে সময় ব্যয় করেন মা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছি। এই পড়াশোনার পেছনে আমার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি এখনো আমার কথা চিন্তা করে কান্নাকাটি করেন। আমি কখন আরও ভাল একটা চাকরি পাব সে আশায় বসে আছেন। পরিশেষে আমি আমার মাকে বলব ‘মা আমি তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি যেন তোমার সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থাকতে পারি মহান আল্লাহর কাছে এই মিনতি করছি।’ এমএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি