ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৮:৪০:৫৬, বুধবার

সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার প্রদান

সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার প্রদান

এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ প্রদান করা হয়েছে। চ্যানেল আই এর ছাদ বারান্দায় এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আনন্দ আলোর সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ফরিদুর রেজা সাগর, সিটি ব্যাংক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন এবং আনন্দ আলোর সম্পাদক ও লেখক রেজানুর রহমান। এ বছর যারা সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তারা হলেন- কথাসাহিত্যে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘কয়লা তলা ও অন্যান্য’ গ্রন্থের জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং প্রথমা থেকে প্রকাশিত ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’ গ্রন্থের জন্য শাহাদুজ্জামান। কবিতায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘পানতুম’ গ্রন্থের জন্য মারুফুল ইসলাম এবং অনন্যা থেকে প্রকাশিত ‘১৯ নম্বর কবিতা মোকাম’ গ্রন্থের জন্য আফজাল হোসেন। প্রবন্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ শাখায় কথা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘সময় বহিয়া যায়’ গ্রন্থের জন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রিয়মুখ থেকে প্রকাশিত ‘১৯৭১ প্রতিরোধ সংগ্রাম বিজয়’ গ্রন্থের জন্য মেজর জেনারেল মো: সরোওয়ার হোসেন। ভ্রমণ ও আত্মজীবনি শাখায় সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘সুদুরের অদুর দুয়ার’ গ্রন্থের জন্য ফারুক মঈনউদ্দীন। শিশুসাহিত্য শাখায় কথা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘ভূত কল্যান সমিতি’ গ্রন্থের জন্য মুস্তাফিজ শফী, শিশুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘রঙের গাছ’ গ্রন্থের জন্য মোকারম হোসেন এবং প্রথম বই শাখায় জার্নিম্যান থেকে প্রকাশিত ‘ঘটনা কিংবা দূর্ঘটনার গল্প’ গ্রন্থের জন্য মাজহারুল ইসলাম, অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার পাখিরা’ গ্রন্থের হক ফারুক আহমেদ ও জার্নিম্যান থেকে প্রকাশিত Ôon days like thisÕ ’ গ্রন্থের জন্য শায়রা আফরিদা ঐশী। দিলরুবা সাথীর উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানটি চ্যানেল আইতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এসএইচ/
গতরাত

সন্ধ্যা থেকেই আকাশে পূর্ণ চাঁদ। আজ মনে হয় পূর্ণিমা অথবা নয়। এ সব নিয়ে মাথা ঘামায় না কিবরিয়া। ও হাঁটছে ক্ষণিক আকাশের দিকে চেয়ে আবার ক্ষণিক হাটছে রাস্তা দিকে চেয়ে। আধা গ্রাম আধা শহরের রাস্তা। আজ প্রায় ছয় মাস পরে ও বাড়ির পথে। নিজের কাছে বেশ ভালই লাগছে। বরিশালের মেহেদীগঞ্জে বাড়ি ওর। নদীর মায়ার কোমলতা দিয়ে ঘেরা ছোট্ট এক শহর। কিবরিয়া চলছে বহুদিন পর বাড়ি ফেরার আনন্দ নিয়ে। বহুদিন বাদে পরিবার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা হবে ওর। উল্টো পথ দিয়ে এগিয়ে আসছিল রিফাত। ইলেকট্রিসিটির আলো ও চাঁদের ঈর্ষাৎ আভায় ওকে অনেক রোগা মনে হচ্ছে। কাছে আসতেই কিবরিয়া ওকে ডাকলো, ‘রিফাত।’ হঠাৎ কিবরিয়াকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে ওঠে রিফাত বলল, ‘কিবরিয়া, কখন এলি তুই?’ -‘এইতো মাত্র আসলাম।’ -‘কোথা থেকে আসলি?’ -‘কোথা থেকে আবার? কুমিল্লা থেকে।’ -‘কয়দিনের জন্য আসলি এবার।’ -‘এইতো দিন বিশেকের জন্য। আরে আমার কথা বাদ দে। শাহীন, সাদি, সেলিম ওদের খবর কি?’ -‘এই ভালই আছে ওরা। তোকে খুব মিস করিরে বন্ধু।’ -‘তোরা কি এখনও নেশা করস?’ করুণ নয়নে চেয়ে প্রশ্ন করল কিবরিয়া। -‘এটা একবার ধরলে আর ছাড়া যায় না। ছাড়তে চাইলেও ছাড়া যায় না বন্ধু।’ -‘কই যাস এখন?’ -‘বাজারের দিকে যাব একটু।’ -‘তোরা তো এখন বাজারেই থাকবি না?’ -‘হ্যাঁ থাকব।’ -‘আচ্ছা তাহলে আমি বাড়িতে গিয়ে এখনই আসছি।’ -‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ রিফাত, কিবরিয়া, শাহীন, সাদি ও সেলিম ওরা সেই ছেলেবেলাকার বন্ধু। ওরা একে অপরের কত্ত কাছাকাছি। মাধ্যমিক থেকে ওদের এক সাথে পড়াশুনা। তবে সবার এক সাথে এসএসসিটা পাশ করা হয়নি। সাদি আর কিবরিয়া এসএসসি পাশ করেছে, কিবরিয়া এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আর দুইবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে সাদি এখন এলাকার কলেজে ডিগ্রি পড়ে। আর রিফাত, শাহীন, সেলিমের এসএসসি পাশ করা হয়েছে দুই-তিনবারে। তারপর কলেজ পর্যন্ত এসে আর পড়া হয়নি। এখন ওদের দিন কাটে বাপের হোটেলে খেয়ে, অশান্তিতে। কোন এক পাপ যেন তাদের জীবনটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। ওদের কাছে এখন জীবন মানেই অস্বস্তি আর হতাশা। একটা অুনশোচনায় ওরা আটকে আছে যেন। একটা পাপের পরবর্তী ফল হিসেবে ওদের দিন কাটে এখন মদ-সিগারেট-গাজা আর অশান্ত মনের শান্তির জন্য টাকার বিনিময়ে নারী। ওদের থেকে সবচেয়ে ভালো আছে কিবরিয়া। ওদের ভিতর কিবরিয়া এখন আদর্শ। কিবরিয়া জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সম্মানজনকভাবে কাজে লাগিয়েছে। হাতে ব্যাটারির টর্চ নিয়ে কিবরিয়া ঘর থেকে বের হল। টর্চের ক্লান্ত আলো রাস্তায় ফেলে বাজারের দিকে যাচ্ছে ও। রাত ৮টা এখন। ছোট মফস্বলের ধারা বাহিত চুনারচর গ্রাম। হালকা করে শহুরে ছোঁয়া মাখা গ্রাম। রাতের প্রথম প্রহরে টুনটুন বেল বাজিয়ে রিকশা চলছে দু-একটা। রিকসার নিচে হারিকেনের ভিতরের সলতের মিটমিট আলোটা যেন বাতাসের সাথে প্রতিযোগীতায় দুলছে। ঝাকুনিতে কাঁপছে আলোটা। কিবরিয়া এসে গেছে তার চিরচেনা বাজারের খুব কাছে। আর মিনিট খানেক লাগবে। সামনের মোড়টা ঘুরলেই ওদের ছোট্ট বাজার। বাজারের প্রথম চায়ের দোকানটি আবুল হোসের ভাইয়ের। ওখানে বসেছিল রিফাত, শাহীন, সাদি, সেলিম। এ চারজন কাস্টমার বাদে অন্য কাউকে দেখতে পেল না কিবরিয়া। কিবরিয়াকে দেখতে পেয়ে শাহীন, সাদি ও সেলিম ওকে জড়িয়ে ধরল। বহুদিন পর বন্ধুকে কাছে পাওয়া বলে কথা। বন্ধুদের অভিনন্দনের পালা শেষ হতে মিনিট দুয়েকের মত সময় লাগল। দোকানের মালিক আবুল হোসেন মুখ তুলে কিবরিয়াকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কবে আইলা কিবরিয়া?’ -‘এইতো সন্ধ্যায়, তো কেমন আছো আবুল ভাই?’ -‘আমাগো আর থাহা।’ -‘আরে এ কথা বলছ কেন? তোমরাও দেশের সম্পদ যে।’ আবুল হোসেন মুখে একটা মুচকি হাসি তুললো। কিবরিয়া ওদেরকে তাড়া দিল, ‘কিরে তোরা কি এখানে বসে থাকবি? ওঠ।’ কিবরিয়ার তাড়া খেয়ে ওরা আবুল হোসেনের চায়ের দোকান থেকে উঠল। আবুল হোসেন কিবরিয়াকে বলল, ‘কিবরিয়া, চা খাইয়্যা যাও।’ -‘এখন না আবুল ভাই। পরে খাব। আছিতো অনেক দিন।’ ওরা পাঁচ বন্ধু হাটছে অন্ধকার রাস্তায়। এই অন্ধকার রাস্তায় হাটার স্বভাব ওদের বহু পুরোনো। বাড়িতে আসলে কিবরিয়া এটাকে খুব উপভোগ করে আর দূরে থাকলে এটার খুব অভাব বোধ করে। এই নিস্তব্ধ রাতে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুদের মাঝে অনেক না বলা কথার বিনিময় হয়। কিবরিয়া বাদে বাকি চার জন বদের হাড্ডি। মেয়েদের শরীরের প্রতি এই চারজনের লোভ অতিমাত্রায়। লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের গোসল, রাতে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়েদের শরীরে সিরিঞ্জ দিয়ে পানি দেওয়া, লাঠি দিয়ে কাপড় উলট-পালট করা এদের নিত্য দিনের স্বভাব। ভাবটা এমন যেন, মেয়েদের শরীর এরা আস্ত গিলে খাবে। কখনও এদের এ সব কাজে সঙ্গ দেয়নি কিবরিয়া। এভাবেই চলত ওদের ছেলেবেলা। অবশ্য ওদের চরিত্রে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। কোন একটা ঘটনা ওদের ব্যথা দেয় সব সময়। -‘তো তোদের দিন কাল এখন কেমন যাচ্ছে?’ কিবরিয়া বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল। একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে রাফি বলল, ‘আমাদের আর দিন কাল।’ -‘আহা, নতুন করে আবার কি জীবন শুরু করা যায় না।?’ -‘শোন জ্ঞান দিবি না। ভাল লাগে না এইসব কথা শুনতে।’ -‘আচ্ছা ঠিক আছে আর বলব না। তবে তোরা কি আর এই নেশার পথ ছাড়বি না।?’ -‘আরে নেশা বলছিস কেন? এটা খুবই শান্তির মামা। এগুলো খেলে পারলেই না নিজেকে খুব ভালো মনে হয়।’ বহু কষ্টে কথা গুলো বলল সেলিম। ওর হাতে একটা দেশী মদের বোতল। তার অর্ধেক খালি। কখন থেকে ওটা হাতে নিয়ে অর্ধেক করে ফেলল তা মোটেও খেয়াল করেনি কিবরিয়া। দুলতে দুলতে হাঁটছে সেলিম। মদের বোতলটা নিতে গিয়েও নিল না কিবরিয়া। -‘সে দিন রাতে কি যে করে বসলাম মামা। মাথা ঠিক ছিল না। মোটেও।’ সেলিম বলল। সাদি কিবরিয়াকে বলল, ‘জানিস কিবরিয়া, সে দিনের পর থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি খারাপ ছেলে মনে হচ্ছে। কিন্তু দেখ আগে কত আজে-বাজে কাজ করেছি, একটি বারের জন্যও খারাপ ছেলে মনে হয়নি নিজেদেরকে।’ ২ কিবরিয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। মাথার উপর সূর্য খাড়া হয়ে তেজ ছড়াচ্ছে সমানভাবে। মেঠ পথের দুই পাশে সুপারি আর আম বাগান। সুপারি গাছের লম্বা লম্বা সারির মাঝখানে ছায়া আর সূর্যের আলো খেলা করছে। বাতাসের তালে তালে গাছের ছায়াগুলো কাঁপছে। আম-সুপারির কালো এই বাগান থেকে বিরতিহীনভাবে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। বসন্তের মাঝামঝি এখন, প্রকৃতির কোলে বসন্ত পূর্ণতা লাভ করেছে যেন। কিবরিয়া রাস্তার মোড় ঘুরে বাম দিকের রাস্তায় চলল। এই মোড়ে রিফাতের সাথে দেখা হল কিবরিয়ার। কিবরিয়া ওকে ডাকল, ‘রিফাত, কৈ গেছিলি?’ -‘সিনেমা দেখতে গেছিলাম।’ কিবরিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘তুই এখন সিনেমা দেখতে গেছিলি আর কয় দিন পর না আমাদের পরীক্ষা।’ -‘তো কি হয়েছে। পরিক্ষা দেব, তোর মত আমার এত পড়াশুনা করতে ভাল লাগে না।’ --‘আজ আমাদের আরও একটা পরীক্ষা হয়েছে। তোর আজ কোচিংয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’ -‘ঠিক আছে কাল থেকে যাব বন্ধু, এবার আসি।’ বলে রিফাত দ্রুত হাঁটা ধরল। কিবরিয়া রিফাতের যাওয়া দেখল। কিবরিয়া ভাবল কি যে হল রিফাত, সেলিম, সাদি ও শাহীনের। পড়ালেখা করছে না তেমন। আর দুই মাস পর এসএসসি পরীক্ষা। ওরা কি পড়ালেখা কে জানে? কোচিংয়েও যায় না ঠিক মত। বিকেল বেলা সূর্যের পড়ন্ত আলো নদীর পানিতে ঝলমল করছে। ঢেউয়ে পানির ঝলমল আরও সুন্দর লাগছে। বাতাসে কলমি লতাগুলো সাদা ফুল নিয়ে দুলছে। বাতাসে একটা শো শো শব্দ তুলছে। নদীর পাড়ে রাস্তার দুই ধারে বছরের পর বছর দাঁড়ানো লম্বা লম্বা তালগাছে ঝুলে পড়া শুকনো পাতা বাতাসের তোড়ে খস খস শব্দ করছে। সারা দিন অনেক পড়াশুনা করেছে কিবরিয়া। এখন ও মনোরম বাতাসে বেরিয়েছে, নদীর পাড়ের রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে বটতলার দিকে। ওখানে বন্ধুদের দেখা পাবে। বটগাছের বড় কয়েকটা শিকড়ের উপর বসে গল্প করছে সেলিম, রিফাত, সাদি ও শাহীন। এক এক জন বট গাছের বিশাল গোড়ার এক এক প্রান্তে বসে গল্প করছে আর হাসছে ইচ্ছা মত। কিবরিয়াকে আসতে দেখে শাহীন বলল, ‘ঐ যে দেখ আমাদের বিদ্বান বন্ধু জনাব আইনস্টাইন আইতাছে।’ শাহীনের কথায় বাকীরা কিবরিয়ার দিকে ফিরে তাকালো। কিবরিয়া ওদের কাছে এসে বলল, ‘কি ব্যাপার তোদের, আমাকে রেখে তোরা আগে আগে এসে বসেছিস?’ কেউ কোন উত্তর না করে একযোগে হেসে ওঠল। হাসতে হাসতে সেলিম বলল, ‘তোমার আবার কি বন্ধু, তুমি তো সারাদিন খালি পড়ো। এত পড়াশুনা করে কি হবে শুনি?’ -‘পড়াশুনা করে কি হবে মানে। পরীক্ষা শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকী।’ -‘জানি, জানি। তোর বলতে হবে না।’ শাহীন বলল। কিবরিয়া ওদের জিজ্ঞাসা করল, ‘তো তোদের পড়াশুনার কি খবর বল।’ সাদি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এ থাম, থাম। এত পড়াশুনার কথা শুনতে ভাল লাগে না। তার চেয়ে বরং শাহীন আজ একটা অভিযান করেছে, সে কথা শোন মজা পাবি।’ কিবরিয়া একটা শিকড়ের উপর বসতে বসতে বলল, ‘কি অভিযান?’ রিফাত বলল, ‘আরে মামা জব্বর অভিযান। আজ দুপুরে শাহীন মিয়া বাড়ির পুকুরে খরাব দেখছে।’ -‘আমি এখনও কিছু বুঝতে পারছি না।’ কিবরিয়া বলল। সাদি রিফাতকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ও তোমার তো আর এ সব মাথায় ঢুকবে না। তো চাদু, শাহীন আজ মিয়া বাড়ির মেয়েদেরকে পুকুরে গোসল করার সময় ল্যাংটা দেখেছে।’ বলেই হো হো করে হেসে উঠল। -‘তোরা এখনও এসব করে বেরাস?’ কিবরিয়া রেগে উঠে যেতেই রিফাত ওকে টেনে ধরল। -‘আরে, দাঁড়া না মামা একটু বস।’ অনেক জোর করেই কিবরিয়াকে বসিয়ে রাখল ওরা। শাহীন বলতে শুরু করল, ‘দুপুরে মিয়া বাড়ির বাগান দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাগান দিয়ে যাওয়ার পথে শুনতে পেলাম কয়েকটা মেয়ে কথা বলছে। কথা বলছে আর হাসছে। বুঝতে পারলাম পাশের পুকুর ঘাট থেকে কথা আসছে। আমি ধীরে ধীরে পুকুর পাড়ে ঝোপের মধ্যে গিয়ে বসে পড়লাম। তাকিয়ে দেখলাম পুকুরের ওপারে ঘাটে সে কি অবস্থা, আমি তো শেষ। তিনটা মেয়ে গোসল করছে দুটার গায়ে জামা নেই। গামছা পেচিয়ে গায়ে সাবান মাখছে। কি কচি দেহ। নাদুস-নুদুস তাকি ভোল যায়।’ শাহীন চোখে এখনও দুপুরের সেই লালসা লেগে আছে। কিবরিয়া আর বসতে পারল না ও উঠে বলল, ‘তোরা কি সারাদিন এমনই করবি। মোটেও ঠিক হবি না!’ কিবরিয়া রাগান্বিত হয়ে কথাগুলো বলে চলে যেতে পথ ধরল। পিছন থেকে সাদি ডাকল, ‘কিবরিয়া দাঁড়া, শোন, দাঁড়া।’ কিবরিয়া ওদের ডাক কানে না তুলে চলে গেল। ওরা আবারও বলতে শুরু করল। কথার মাঝে সেলিম বলল, ‘এ, শোন আজ আমি একটা জিনিস চুরি করেছি।’ সবাই সমস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি কি?’ -‘মেয়েরা জামার নিচে যে জামাটা পড়ে, তার নিচে আবার ছোট যেটা পড়ে সেটা। কি সেটার নাম বলতে পারিস।’ সেলিম সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল। সাদি বলল, ‘আমি জানি ওটার নাম...।’ রিফাত সেলিমকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথা থেকে চুরি করলি ওটা?’ সেলিম উত্তর করল, ‘আমার বাড়ির পাশের বাড়ি থেকে চুরি করেছি গতরাতে। গতরাতে পাশের বাড়ির মেয়েটি যে রুমে ঘুমায় সে রুমের জানালা খোলা ছিল। রাতে মেয়েটা ঘুমে ছিল। ওখানে জানালার পাশের আলনা থেকে চুরি করেছি।’ কিবরিয়া চিন্তা করছে, ওরা কি করছে এসব। কোন লেখাপড়া নেই। এভাবেই চলবে ওদের জীবন। কবে ভালো হবে ওরা। ততক্ষণে তো এরা বেশী দেরী করে ফেলবে। দিনের আলো নেই বললেই চলে। পশ্চিম আকাশে রং ধনু দেখা গল। পাখিরা কিবরিয়ার মাথার উপর দিয়ে যে যার ঠিকানায় যেতে লাগল। মাগরিবের আজানের ধ্বনি কিবরিয়ার কানে আসলে ও নদীর পানির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উঠে চলল মসজিদের উদ্দেশ্যে। ৩ প্রায় আট-নয় মাস হল কিবরিয়াদের এসএসসি পরিক্ষা শেষ হয়েছে। এখন কিবরিয়া ঢাকার একটা কলেজে পড়ে। বন্ধুদের মাঝে শুধু কিবরিয়াই ঢাকায় পড়াশুনার জন্য এসেছে। কিবরিয়া এসএসসি পাশ করেছে ভাল রেজাল্ট পেয়ে। বাকিদের মধ্যে শুধু রিফাত পাশ করেছে টেনেটুনে। সাদি, শাহীন ও সেলিম ডাব্বা মেরেছে ভালভাবেই। তবে এ নিয়ে ওদের মাঝে কোন চিন্তা নেই। ওরা আছে আগের মতই। গরমের এক রাতে সাদি, শাহীন, সেলিম, রিফাত রাস্তায় হাটছে আমোদের সাথে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কিছুক্ষন হল। সবাই মিলে এলাকার রাস্তায় রাস্তায় আড্ডাবাজি করছে। রাত বেশী হয় নাই, আবার কমও বলা যায় না। একটা বাজে এখন। হঠাৎ সাদি বলল, ‘আমাদের জীবনটাই দেখ। কি করলাম আর কিবরিয়া এখন ঢাকায় পড়ে।’ সেলিম বলল, ‘আরে শালায় একটা জিনিস। আর আমাদের মাথায় তো গোবর ছাড়া কিচ্ছু নাই। -‘এ দেখ দেখ। সামনে কি আইতেছে।’ শাহীন কিছু একটা দেখিয়ে সকলকে বলল। সবাই সামনের দিকে তাকাল। রাতটা তেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। আবার তেমন চাঁদের আলোও নাই। পূর্ণিমার রাত নয় তবে পূর্ণিমার কাছাকাছি কিছুটা বলা যায়। সব কিছু স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও অনেকটা দেখা যায়। ওরা দেখল যে, একটা মাঝ বয়সি মহিলা আসছে ওদের দিকে। ত্রিশের কোটায় বয়স হবে হয়ত। মহিলাটা ওদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো। ওদের কাছাকাছি আসলে ওদের কেউ মহিলাকে লক্ষ্য করে শিষ দিল। কিন্তু তাতে মহিলার দিক থেকে কোন প্রতিউত্তর আসল না। ওরা অনেক উত্তেজনামূলক কথা বলল মহিলাটাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাতেও মহিলাটার থেকে কোন জবাব আসল না। এতে ওদের মনে আরও অনেক সাহস বেড়ে গেল। ওদের ভিতর থেকে একজন মহিলাটার হাত ধরল, তাতেও কোন প্রতিউত্তর না পেয়ে ওরা মহিলাটাকে রাস্তার পাথে একটা ঝোপের ভিতর নিয়ে গেল। ঝোপের ভিতর থেকে হালকা গোঙ্গানির শব্দ হল ঘন্টা দুয়েক। এই ছেলেদের দল মহিলাটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে রেখে চরম উত্তেজনার সুধা পান করল। এক সময় ওরা ক্লান্ত হয়ে মহিলার নিস্তেজ দেহটাকে ঝোপের ভিতর ফেলে দিয়ে বাহিরে এল। ওদের সবার ভিতর একটা তৃপ্তি দেখা গেল। ওরা সবাই খুশি। এ রকম একটা কাজ ওরা এত সহজেই করতে পারবে ভাবেনি কখনও। পরদিন দুপুরে ওরা আবুল হোসেন ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে গল্প করছে। সাদি, রিফাত, শাহীন, সেলিম ওরা একে অপরকে বলছে গতরাতের কাহিনী। যদিও কাজটা সবাই একসাথে একই জায়গায় করেছে। কার কাছে কেমন লেগেছে, কে কি রকম করেছে, বলছে সব। আবুল হোসেন ভাই দেখলেন রাস্তার ওপারের বেঞ্চে বসে ওরা কি যেন বলছে আর হাসছে। ওদের এ রকম হাসি আর গোপন আলাপচারিতা আগে কখনও তিনি দেখেন নাই। কথা বলার সময় ওরা দেখতে পেল একজন মহিলা রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এ দিকে আসছে। ওরা মহিলটার দিকে তাকিয়ে থাকল। আর একটু কাছে আসার পর বুঝতে পারল গত রাতের সেই মহিলাটা। ভয়ে ভয়ে ওরা ঊঠে দাঁড়াল। মহিলাটি দোকানের সামনে এসে আবুল হোসেন ভাইয়ের সামনে দাড়াতেই, আবুল হোসেন ভাই মহিলাটিকে কলা আর রুটি খেতে দিল। সাদি, রাফি, শাহীন, সেলিম অনেক্ষণ দেখল মহিলাটিকে। ওরা বুঝলো যে মহিলাটি একটা পাগল। ওদের চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। [মধ্যাহ্ন, ২৮ বৈশাখ, ১৪২০ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা] (গল্পটি অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭ তে প্রকাশিত লেখকের ‘আসমত আলীর অনশন’ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া) এসি  

শত ভাবনার বিকাশে বাতিঘরে লেখক-পাঠক আলাপন 

‘দেশপ্রেমের পাশাপাশি পুরো মানবজাতির কল্যাণে বিশ্বপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। নিষ্ক্রিয় থাকলে চলবে না। আমরা জন্মেছি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। সব সময় আমাদেরকে সামনের দিকেই এগিয়ে যেতে হবে। জীবনে পতন বলতে কিছু নেই। উত্থান-পতন নয়, কাজের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছি কিনা সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’ শুক্রবার (৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বাতিঘরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বিকশিত হোক শত ভাবনা’ এই বই নিয়ে ‘লেখক-পাঠক আলাপন’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আমন্ত্রিত অতিথি লেখকবৃন্দ। লেখক-আলোচকদের মধ্যে অলোচনা করেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. আব্দুল মালিক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম শমশের আলী, ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার, অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানী, অধ্যাপক ডা. তাহমীনা বেগম এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এম রেজাউল হাসান। আলোচকরা আরও বলেন, তরুণদের শুধু বয়স বা শারীরিক বিকাশ নয়, মানসিক বিকাশও ঘটাতে হবে। বস্তুগত চাওয়া-পাওয়া নয়, নৈতকতায় এগিয়ে যেতে হবে,সৃজনশীল হতে হবে। মানসিক উন্নতির মাধ্যমে নিজের জীবনকে স্বার্থক করে গড়ে তুলতে হবে। মৃত্যুকে কতটা মহিমান্বিত করা যায় একজন মানুষের স্বপ্ন সেটাই হওয়া প্রয়োজন।  অনুষ্ঠানে ‘বিকশিত হোক শত ভাবনা’ বই থেকে নির্বাচিত অংশ পাঠের পাশাপাশি চলতে থাকে পাঠকের কাছ থেকে প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর দেন লেখকরা। চলতে থাকে আলোচনা। এভাবেই পুরো অনুষ্ঠান মুখরিত হয়ে ওঠে লেখক-পাঠকের নানামুখী চিন্তা ও ভাবনার আদান-প্রদানে।  লেখক-পাঠকের উপলব্ধি-জগতকে আলোড়িত ও সংহত করার পাশাপাশি কোয়ান্টাম আয়োজিত এমন আয়োজন মানুষের আত্মবিকাশের পথে অক্লান্ত হেঁটে চলার সাহস ও শক্তি জোগাবে। এমনটাই বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের। তারা মনে করেন, মুক্তচিন্তা মনের জানালা খুলে দেয়। নতুন প্রেরণা জোগায়। মানুষকে করে তোলে আশাবাদী। প্রসঙ্গত, দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সমাজ-সচেতন, কর্মপ্রাণ ও সার্থক মানুষদের চিন্তা জ্ঞান প্রজ্ঞার এক অনুপম সম্মিলন ঘটেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘বিকশিত হোক শত ভাবনা’ সংকলন গ্রন্থে। কোয়ান্টামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নানা সময়ে আমন্ত্রিত ৩৩জন গুণী মানুষের প্রেরণার এই সংকলনে তাদের জ্ঞানঋদ্ধ আলোচনায় সমসাময়িক প্রসঙ্গের পাশাপাশি উঠে এসেছে সঙ্ঘবদ্ধতা, সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা ও মানবকল্যাণে কর্মব্যস্ততার সার্বজনীন গুরুত্ব। ডা. আতাউর রহমান সম্পাদিত ‘বিকশিত হোক শত ভাবনা’ বইটি ১৭৬ পৃষ্ঠার। প্রচ্ছদ ও নকশা করেছেন মাসুম রহমান। বইটির মূল্য ২৪০ টাকা। সংকলন-গ্রন্থটি সর্বস্তরের পাঠককে বিশেষভাবে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেআই/

গুণীজন সম্মাননা পেলেন লেখক মিজানুর রহমান

‘আন্তজনপদ গুণীজন স্বীকৃতি ও সংবর্ধনা’ লাভ করেছেন লেখক মিজানুর রহমান মিথুন। তার নিজ জেলা পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আজাহার শিকদার মোমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড মুসলিম কালচারাল সেন্টার’ থেকে তাকে এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মিজানুর রহমান মিথুনের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার পশারীবুনিয়া শিকদারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। ‘আন্তজনপদ গুণীজন স্বীকৃতি ও সংবর্ধনা’ প্রাপ্তিতে আনন্দ প্রকাশ করে মিজানুর রহমান মিথুন বলেন, ‘লেখক হিসেবে জন্মভিটার প্রকৃতজনের কাছ থেকে এমন স্বীকৃতিপ্রাপ্তি আমার লেখালেখি জীবনের পথ পরিক্রমায় আমাকে সীমাহীন তৃপ্তি এনে দিয়েছে।’ মিজানুর রহমান মিথুনের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘তিনি আমাদের জাতির পিতা’, ‘তোমাদের জন্য বঙ্গবন্ধু স্বপ্নজয়ী সেরা মানুষ’, ‘রাসেল তুমি ফিরে এসো’, ‘নতুন সপ্তাশ্চার্য’, ‘যুগে যুগে সপ্তাশ্চার্য’, ‘যে ভূতটা বই পড়তে এসেছিলো’, ‘ফার্স্ট গার্ল সেকেন্ড বয়’, ‘ফুল বালিকা’, ‘ট্যালেন্টপুল টমি’, ‘মিষ্টি মেয়ে টুকটুকি’, ‘বৃষ্টির সাথে দেখা’, ‘হৃদয়ে হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’, ‘ক্লাসের বাইরে একদল দুষ্টু’, ‘মেঘলা আকাশ’, ‘আমাদের পতাকা’, ‘ব্যাক বেঞ্চার’, ‘স্কুলের সাহসী ছেলেটি’, ‘তোমাদের জন্য জন্য বঙ্গবন্ধু স্বপ্নজয়ী সেরা মানুষ’। তাঁর প্রসঙ্গে সাহিত্যিক-সাংবাদিক দীপংকর দীপক বলেন, ‘মিজানুর রহমান মিথুন একজন নিভৃতচারী, স্বলভাষী ও শেকড় সন্ধানী লেখক। ব্যক্তি জীবনেও তিনি অত্যান্ত ধৈর্যশীল, সংগ্রামী, বন্ধুসুলভ ও পরোপকারী। তার এ সম্মাননা প্রাপ্তিতে তরুণ লেখক সমাজ দারুন খুশি। তার জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।’ কেআই/

গীতিকবি আবদুল হাই মাশরেকী’র জন্মবার্ষিকী উদযাপন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গীতিকবি আবদুল হাই মাশরেকী’র জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। সোমবার বেলা ১২টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ভারতের কবি সৈয়দ হাসমত জালাল বলেন, আবদুল হাই মাশরেকীকে অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি ছিলেন সামগ্রিকভাবে বাঙালি জাতির কবি ও সাহিত্যিক। তিনি শুধু লোককবিই নন, গ্রাম-বাংলার জীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার কর্ম এখনও মানুষের মাঝে জীবন্ত। তাই তিনি আধুনিক কবি। এছাড়া শিল্পী শংকর সাওজাল বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির স্বীকৃতি তুলে ধরতে হবে। কালের পরিক্রমায় যে সকল বাঙালি কবি-সাহিত্যকদের শিল্পকর্ম হারিয়ে যাচ্ছে এ ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার কর্মকে স্মরণ করতে হবে। সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বাঙালি জাতি অনেক সমৃদ্ধশালী। সাহিত্যে বাঙালি জাতির যতগুলো অনুষঙ্গ রয়েছে সবগুলো নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তবেই আমাদের সাহিত্য আরও সমৃদ্ধশালী হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক মো. সেলিম ভূঁইয়া, কবি আবদুল হাই মাশরেকীর সন্তান শামীম মাশরেকী ও নঈম মাশরেকী এবং কবি আবদুল হাই মাশরেকী পরিষদের সভাপতি কবি মাহবুব আলম বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানের সঞ্চালনায় গীতিকবি আবদুল হাই মাশরেকী’র জন্মবার্ষিক উদযাপন কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। এর আগে কবি আবদুল হাই মাশরেকী বিখ্যাত গান ‘আমায় এত রাতে ক্যানে ডাক দিলি’, ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে’ সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এ সময় বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। কেআই/

হুমু, হিমু ও আমি

এক. ভাবলাম জনতার বিশাল ঢল নামার আগেই ‘নুহাশ পল্লী’ বেড়িয়ে যাই। হুমায়ুন আহমেদ ব্যতিক্রমধর্মী অনেক ব্যাপারেই, আগামী ক’সপ্তাহ এ নিয়ে অনেক লেখালেখিই হবে, সুতরাং আমি ওদিকে যাচ্ছি না। নুহাশ পল্লীর সুদৃশ্য এবং সুখকর পুষ্প, বৃক্ষ, ভেষজ, ওষধি এবং পাখী, জলপদ্ম আফীম ছড়ানো আঙ্গিনায় অভিভূত হয়ে থমকে দাড়ালাম। হঠাৎ করেই যেন নীল পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা, চটিজুতো পায়ে চশমাধারী এক ব্যক্তির আবির্ভাব। সন্ধ্যা হব হব, গাছগাছালীতে গোধূলী লগ্নটা একটু ভারী হয়ে আসছে। চমকানোভাব না কাটতেই বললাম হুমায়ুন আপনি? এখানে? কেমন করে? নিউইয়র্কে তাহলে তেমন কিছু ঘটেনি? সত্যিই বাচালেন, বাংলাদেশে তো বলছে সুনামি হবার উপক্রম আপনাকে হারানোর ভাবনায়। এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলেই তাকালাম হুমায়ুনের দিকে। স্মিত হাসি লেগে আছে, কিন্তু কথা বলছে না। দীঘশ্বার্স ফেলে বলল ‘জাম্পু ভাই’ ক’দিন পর দেখা। আপনি শুনলাম অনেকদিন দেশ ছাড়া। এখনো আপনি আপনি করছেন আমাকে। বললাম জন-নন্দিত, স্বদেশ স্বীকৃতি ধারক একাধারে বহুগুন সম¦লিত হুমায়ুন আহমদকে আপনি না বললে অস্বস্তি লাগবে। আপনি সবসময়ই যেন শব্দের ছুরি চালান। যাকগে, আপনার ক’টা কবিতা ‘হে প্রভু’ আর ‘তোমাকে’ শীর্ষক পড়েছি- চমৎকার আর ‘অবিনশ্বর’ সাহিত্য পত্রিকায়, যা কিনা দুর্লভ। এ কথা শুনলেই লজ্জা পেতে হবে, হুমায়ুন যেন দুষ্ট এক বালককে রেশমী মেঠাই ধরিয়ে দিচ্ছেন। হিমুর মতো করে আমি দুষ্টু, রেশমী গায়ে মাখালাম না। বললাম আমি কিন্তু তোমার বেশ ক’টা সত্যি বলতে কি সব ক’টা বই পড়েছি। আতকে ওঠার ভঙ্গীতে হুমায়ুন রললো ‘সে কি! কেন? সত্যি?’ বললাম দুটো কারনে’ সুনীল গঙ্গোপধ্যায় এর বই ধরতেই ইচ্ছে করে না, তাই বিকল্প ব্যবস্থা যাকে বলে Plan B হিসেবে আপনার লেখায় ধরা খেয়েছি- এটা নেশাকতামূলক বলা যেতে পারে। কি জন্য পরে বলছি। কিন্তু সুনীল বন্ধু বলেই বলছিনা, ওতো দারুন লেখে। আপনার অনীহার কারনটা কি? বই এর মেলা, অন্য সময়ে বই দোকানে দেখি হি’হি’ করা হাসি দেয়া মেয়েগুলো ‘সুনীলদা কই,’ ‘সুনীলদা দেন, ’নতুন সুনীলদা চাই- এক কেলেংকারী হৈ, চৈ, দেখে ভাবলাম এ মেয়েরা যা পড়ে হন্যে হয়ে , নিশ্চয় সস্তা, বস্তা, রাস্তাপচাঁ মাল। তাই।’ ‘বলেন কি, আপনার হয়ে আমি মেয়েদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ হুমায়ুন, ছোট গল্প লিখছেন অথচ শেষ হইয়াও হইলো না শেষ definition ভুলে গেলেন। আরে তারপর তো সুনীল, সুনীল আর সুনীল- ভূবনে অন্য কোন তারকা, রং কিছুই রইলো না ‘ একটু রহস্য খোলাসা করলে বান্দা আরেকটা ছোট উপন্যাস বা বড় গল্প ফেঁদে ফেলবে, আসন্ন একুশে মেলার সন্মানে এবং ক’টা প্রকাশনার সম¥ানীর বসানো প্রত্যাশায়।’ ‘ও হ্যাঁ,  সুনীল গঙ্গোপধ্যায় যে এ ধরনের বই লিখতে চাইবেন ভাবিনি। ক’বছর আগে পড়লাম তার ‘সেই সময়।’ আমি ইতিহাস আশ্রিত লেখা পড়তে সদা উন্মুখ। কি পারসেন্টেজে ইতিহাস আর কল্পনার মিশ্রন, কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও সময়কাল সমাজ নিষ্ঠার সাথে আবহ হিসেবে উপস্থাপিত হয় তাই নির্ধারন করবে গ্রহনযোগ্যতা এবং পাঠকের আপ্লুতা। সুনীলবাবুর লেখা আমাকে গভীরভাবেই আপ্লুত করে- ইংরেজীতে বলব his writings whelm me overwhelm    শব্দটায় যে ‘উল্টে পড়া’ imbalance এর ছবি আসে আমি তাতে নেই। যা বলছিলাম আকাশ এখন সুনীল, নির্মেঘ !! যাকগে, নুহাশপল্লীর বহমান বাতাসে খানিকটা আদ্রতা গাঢ় হয়ে গায়ে লাগছে। আলো কমে গিয়ে একটা মায়াবী আবহ অনুভবে আসছে। ঘনায়মান ‘কনে দেখা আলো’। হুমায়ুন আপনি ব্যবহার করেছেন ‘কন্যা সুন্দর আলো’  দু’টো ইদানিংকার বইতে, তাইনা -কোন উত্তর নেই। তাকালাম পেছনে, এদিক সেদিক - কেউ কোথাও নেই! এ কি ধরনের ব্যাপার, কথা নেই, বার্তা নেই, বাইবাই, পরে দেখা হবে, না বলেই উধাও। অনেক আলোচনা তো রয়েই গেল। দুই. নুহাশপল্লীর এই দৃশ্য, ঘটনা আলাপচারিতার প্রায় চার দিন পূর্বে, উত্তরায় এ্যাপার্টমেন্টে বসে কম্প্যুটার ইন্টারনেট-ইমেইল করছিলাম। মাঝেমধ্যেই সংবাদ চ্যানেলে তাজা খবর এসে যাচ্ছে। সবচাইতে শোকবহনকারী ন্যু’ইয়র্কে হুমায়ুন আহমদের তিরোধান শীর্ষক বুলেটিন বুলেটের মতো অনেকের হৃদয়ভেদ করেছে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে কথাবার্তায় একটা সমবেত শূন্যতাবোধে সবাই বেশ নিরব। যে যার মতো করেই স্মরন করছে এই অসাধারন মানুষটার কথা। বিরল প্রতিভার সাথে মিশেছে এক সহজাত, নিরহংকার এক ব্যক্তিত্ব। পাঠকদের হৃদয়ে যে বিশাল আর ব্যাপক আসন পেয়েছেন  সেটা আমাকে আশ্চর্য্য করছে না ততটা, যতটা বিস্মিত করেছে সবসময় যে এই বিপুল সন্মাননায় হারিয়ে যাননি। সাধারন মানুষের সাধারন- জীবন, প্রতিদিনের পাঁচালীতে অলৌকিক, আলো ফেলেছেন। ফেমাস হলেন, কিন্তু ‘সেলিব্রেটি’ না। প্রথমটা গুনের সন্মননা। পরেরটা কুবেরদের উন্মাদনা। না, হুমায়ুন আহমদ মানুষদের কাছের লোকই রয়ে গেলেন। নিউইয়র্ক থেকে বৃহস্পতিবার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে, শেষ যাত্রার প্রস্তুতিতে ঢাকা এলেন এবং খানিকটা জটবাধানো ঘটনাবলীর দ্রæত সমাধানে মঙ্গলবার নুহাশপল্লীর একান্ত নিজস্ব প্রাঙ্গনে অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন। এ ক‘দিনের দুঃসহ প্রতীক্ষাকালে ইন্টারনেটে একটা লেখার চেষ্টা করেছিলাম-কিছুটা trending ধরনের, দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনা, কথাবার্তা সেভাবেই, একমত, দ্বিমত, তৃতীয়মত নিয়েই সাজানো। আমি বলব এক ধরনের কথা বা ভাষার ভিডিও-চলমান ভাষ্য। দুটো প্রধান বিষয় যা অনেক সময়ই পরিবারে প্রচন্ড বিপর্যয়ে, শোকে অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেহেতু হুমায়ুন আহমদ সার্বক্ষনিক দৃষ্টির মোড়কে বাধা, তাই এই অস্থিরতা অনিশ্চয়তাও সবার দ্বারপ্রান্তে, মন ছুয়ে ভাবনা ব্যাকুল করেছে। লিখেছিলাম ইংরেজীতে তাই তুলে দিচ্ছি। The theme I refer to the unfolding journey of Humu over thousands of miles seeking that legendary answer to `how much land one requires?’ conundrum. Humu told his tearful spouse moments before his passing away what he wanted for himself and also told her to find his writing bag an almost finished manuscript (In fact, there would be the discovery of al least 18 novellas in his name). Humu himself is the anti-hero in absentia of this ms. titled` Aami Humu Opaar Thekey Bolchi’. Basic thread of his personal travels through family, relatives, friends publishers and peer writers, reading public, cultural activists get reflected in this Himu as he would be heard and read to say ` I am one-name brand and after my death, I will be the mega brand generically called Kamdhenu and this would be the start of a series of everything as Kamdhenu’. ********* In another story that is taking shape Humu reminds me that he met me in 1973 the year he got married and the year before his Nandito Naroke saw the light of the day. At that time I was serving as Deputy Secretary to the Government and handling Agreements and Treaties from the Ministry of Finance. Now Himu recalled some details that still amazes me.   And in this anecdotal story I make some scathing comments about the characters that abound and familiar like old wine in new bottles and some `jadukhela’, `adha bhowtik’ ad-sub, para normal events-now apparently scaled up as a magical realism- an oxymoron, the worst that there can be. Fantasy like `Himu aebong akti Russian pari’, that I just read, has some rare comments that Himu could not respond to. All this and more are in the pipeline. This reference here is an evidence that I am perhaps one of the first to have a take on Humu before he hits the ground.   Internet reports coming in thick and fast about the decision of brutal, cancellation of the decision that was , I thought, pretty logical and clear- Humu’s expressed wish takes precedence over the convenience of his `agonito pathakbrindo’. Hmm.  The division in the family, but his wife, not even the mother, and certainly not the brothers, have any right to dissent. Nuhash Palli can afford a chaya Dhaka, pakhi daka, santi-ghono angina/ prngan/ kone for him to lie in.   But being a brand name is not easy to live with and is certainly difficult to die for.   Humu is rich enough to pay for his grave site and state- owned graveyards gratis plot is the kind of honour Humu would rather not have. Maybe some unclaimed Himu-type corpses could be interred with that saved price. Humu would love that.   He lives in our heart- good and let him repose where he most wished in life, and in death. May be if his bipul, gunamugdha following stay the course, who knows we may see a new Mela, carnival, utshab, Nandanik Likhon and such like dedicated to Nushash Palli`s Humu Shah. I am sure the band of this brand peddler would like nothing else more. And as I guess there are 18 more Humu books unpublished for grabs.   No decision as yet on BIRDEM cold to the earth’s warmth-where? 23/07/12 ///12.17 pm/// Dhaka time 6.06 pm. Monday তিন. সেজন্যই নুহাশপল্লীর নিবিড়তায় এসে ক’টা কথা বলে যাব বলে ভেবেছি। এবং অপ্রত্যাশিতভাবে কথোপকথনের সুযোগ হলো, প্রথম পর্বে। বলছিলাম কোথাও কেউ নেই কিন্তু একটা কথা নিয়ে ভাবছিলাম। হুমুকে জিজ্ঞাস  করব ১৯৭৩ সনে তোমার সাথে দেখা হয়েছে, স্মৃতিশক্তির ধোঁয়াটে ভাব আমার সত্তর বছর বয়সে হবে এটাই স্বাভাবিক । হঠাৎ করেই শুনলাম ‘সরি জাম্পু ভাই’। জীবনটা কোনক্রমেই যেন মসৃন যাত্রায় শোভিত না হয়। একটু টালমাটালে পড়ে গেলাম, যাহোক, সব ঠিক আছে এখন। আপনিই তো সেবার বললেন time is often out of joints এবং  ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ ’দুটো মিলিয়ে কাজ করলে জীবনটা সহজ হতে পারে।’ ‘আমি বলেছি, মানে, কখন, কোথায়, হুমু তোমার সাথে কথা হলো আর আমি মনে করতে পারছি না।’ ‘ঠিক চল্লিশ বছর আগে এক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেল আপনার অফিসে- সচিবালয়ে, অর্থমন্ত্রনালয়ে তার ঘনিষ্ঠ আত্বীয়ের পেনশনের দীর্ঘসূত্রিতার এক অবর্ননীয় ঘটনা আপনাকে বললো। হাসিখুশি মানুষ কতটা গম্ভীর হয়ে যেতে পারে দেখলাম। ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে নিজের লেখা বন্ধুর দেয়া নাম, তথ্যাদি তাকে দিয়ে বললেন খোজ নিয়ে আসতে কোথায় কার কাছে এ কেসটা। বললেন বিষয়টা তার সরাসরি আওতাধীন নয়, সেটা সমস্যা নয়। এর মধ্যে আমার সচিবালয়ে পাফপেস্ট্রী দারুন ভালো লাগে, তাও এসে গেল, আপনি যদ্দুর মনে পড়ছে  ক’দিন আগেই টোকিও থেকে বিমান ফ্লাইট উদে¦াধন সফর করে এসেছেন, তারই গপ্পো চললো। কিছুক্ষন পরে ব্যাক্তিগত সহকারী এক প্রবীন ভদ্রলোককে নথিপত্র নিয়ে হাজির।জানালেন সেকশন প্রধান চূড়ান্ত না-দাবী সনদ বিলম্বিত হচ্ছে কারন AGB থেকে কাগজপত্র আসেনি। তখনকার দিনের সি.এস.পি উপসচিব- কঠিন শীতলভাবে বললেন এক- কাগজপত্র কি পাননি একে জানিয়ে দিন, AGB কে আজকে তাগিতপত্র special messenger  এ পাঠাবেন। দুই- ঠিক সাতদিন আপনার চিঠি তৈরী থাকবে আশা করছি। তিন- আমি চাইনা আপনার বস, আমার কলীগকে এ ব্যাপারে বলতে হয়।  আর শেষ কথাটা আমি অনেককেই-আমার সহকর্মী প্রবীন ও নবীনদের বলে থাকি- জীবনে কতগুলো principles কে মূল্য দিবেন। তারমধ্যে আমি দুটোকে ফলো করার চেষ্টা করি। নিজের শিক্ষকদের প্রাইমারী থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত অত্যন্ত সন্মানের সাথে সম্ভ্রমের সাথে ব্যবহার করা যত উচুঁতেই যান না কেন আর দুই, অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীদের কোন ধরনের হয়রানি বা ন্যুনতম কষ্ট না হয় দেখবেন, কারন আপনি, আমিও ঐ পথে যাব। মৃত্যুর মত অমোঘ-আমার এই কথা আজো মনে আছে। ‘বুঝলাম, হুমু তোমার বন্ধুর কাজটা কি হয়েছিলো; ‘হ্যা, দু’তিন সপ্তাহেই ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়।’ হুমু, তেমার বেশ ক’টা লেখাই হিমু এবং মিসির আলী বইগুলোতে আধাভৌতিক, অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী সবাইকে চমকে দেয়।‘পোকা’ গল্পটাও মনে পড়ছে। তোমার চরিত্র অংকনে ‘রুপবতী’ শব্দটি বারংবার ব্যবহার হয়েছে। ফ্যান্টাসী ম্যাজিক রিয়ালিজম তুমি বলেছো তোমার নভেলে, বড় গল্পে এসে যায়। যাদুকরী ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রচিত্রনে ‘হঠাৎ চমক’ কেন যেন বুদ্ধদের মতই অদৃশ্য হয়ে যায়। চরিত্র যেমন জাকির ভাই থেকে যায়, কিন্তুু কাহিনী, ঘটনা বোধকরি আমি যতটা মনে করছি, ঠিক মনে থাকেনা। যাদু খেলায় তোমার উৎসাহ ছিল স্কুল, ছোট বেলায়। কি করি জাম্পু ভাই। লেখার সময় জ্যামিতিক নিয়মে মাপঝোপ করা সম্ভব কি? হঠাৎ হঠাৎ দৃশ্য পাল্টে যায়, এসে যায়, কলমবন্দী হয়। তোমার রুমালী উপন্যাস আমার কাছে ব্যতিক্রমধর্মী ও হদয়গ্রাহী মনে হয়েছে। তোমার ভ্যাগাবন্ড, পাগলাটে, চরিত্রে আধ্যাতিক এমনকি সহজাত ধর্মীয় বিশ্বাস, সৎকাজ প্রায়ঃশই প্রাধান্য পেয়েছে। আমার মনে হয় তুমি নিজেকে একটু একটু করে এ চরিত্রের  অরন্যে মিশিয়ে দিয়েছ। আমরা সবাই খুজে বেড়াই, কি খুজছি জিজ্ঞাস করলে আমি বলব সেটাই তো খুজছি! হুমুকে ক’টা প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিলো যখন থেকে শুনলাম ন্যু’ইয়র্কে ক্যান্সার চিকিৎসা করাচ্ছে। তখন হুমায়ুন আহমদ যে আমার সাথে দেখা হয়েছে সেটা আমার স্মরনে নেই। ১৯৭২ এ ‘নন্দিত নরকে’ শুরু হলো তার যাত্রা- ৪০ বছের এ আকাশ ছুয়ে যাচ্ছে তার খ্যাতি - একডাকে এপার ওপার বাংলা তো বটেই, বিশ্বের বাঙ্গালী সমাজ যেখানেই ছড়িয়ে আছে, তিনি পরিচিত অভিনন্দিত ও প্রীতিসিক্ত-প্রশ্নটা একটু রূঢ় হতে যাচ্ছে- বাংলাদেশে সাধারন মানুষ যে দুঃসহ সমস্যা রিড়ম্বনা ও বঞ্চনায় বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে, তাঁর কন্ঠস্বর কি ধ্বনিত হতে পারত না। আমি কারো বিরুদ্ধে বা দায়ী করে বলার কথা বলছি না। সমস্যা জর্জরিত অসহায় মানুষের দুঃখের কথা তুলে ধরা কি সম্ভব হতো না? গল্প, নাটক শুধুমাত্র ফ্যান্টাসি হতে পারে জীবন তো নয়? এই একই দুঃখ আমার নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নিয়ে। শান্তি পুরষ্কার কি তাকে দেশের অশান্তির করাল ছায়া দর্শনে বিভ্রান্তির সৃস্টি করেছে। অর্থনীতি নোবেল পুরষ্কার পেলে গ্রামীন ব্যাংক এবং তার অন্যান্য অর্থকরী উদ্যোগ শুধুমাত্র কাঞ্চন প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ হলে অবাক হতাম না। তিনি জনগনের কথা বলতে শুরু করলেন রাজনৈতিক দল গঠনের অভিপ্রায়ে-দেশের প্রধানমন্ত্রী হবার সম্ভবনায়। কিন্তু গনমানুষের জীবন সমস্যা নিয়ে কোন সময়েই, কোন মঞ্চেই, দেশে বা বিদেশে কোন কথা বলেন নি। গ্রামীন ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋন ব্যবসা বানিজ্যিক সংস্থা স্থাপন ব্যতিরিকে আমাদের নোবেল বিজয়ী সাধারন মানুষকে স্বীকৃতি দেননি। তাই আমি অবাক হইনা যখন তার বিদেশ সাহায্যপুষ্ট এবং বিদেশীদের তুষ্ট করার উদ্যোগ এর স্বর্নরথ সরকারের কতগুলো অনিবার্য প্রশ্নঘাতে ধরাশায়ী হলো। দেশের মানুষ ছুটে এলো না, তার কর্দমাক্ত সন্মান ও শরীরকে বাঁচাতে। তিনি ছুটলেন বিদেশ- যেখানে বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র দেশকে  অদৃশ্য শাসনের মারনাস্ত্র পাওয়া যায়। অন্য কোন নোবেল বিজয়ী দেশকে আন্তর্জাতিক ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যস্ত থাকেন আমার জানা নেই। সরকার আইন মাফিক গ্রামীন ব্যাংক পরিচালনা করছেন, তাতে গ্রামীন ব্যাংক ধ্বংস হয়ে যাবে, এ তো রাষ্ট্রদ্রোহীতা না হলেও রাষ্টবিরোধীতা তো বটেই। তিনি প্রয়াত হলে নিশ্চয়ই হুমু এক আধাভৌতিক, অব্সেস্ড্ চরিত্র- মরনোত্তর ইউনুস জি.বি.এম.ডি. নামক বই লিখতে পারতেন। যাকগে, হুমায়ুন আহমদকে দু’নম্বর প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিল তার ’দেয়াল বই সম্পর্কে’। বইটি প্রকাশ হয়েছে কিনা, জানিনা। তবে মাননীয় উচ্চ আদালতে স¦প্রনোদিত আদেশাজ্ঞা যা জারী হয়েছে খবরে প্রকাশিত তথ্যাবলী ভিত্তিতে, তা হলো হুমায়ুন আহমেদকে বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়নের নির্দেশদান। লেখক এই সময়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিরতি দিয়ে ক’সপ্তাহের জন্য ন্যু’ইয়র্র্ক থেকে দেশে এসেছিলেন, সেই সময়েই শুনানী, নির্দেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের সরকারী ইতিহাস গ্রন্থের অনেক ক’টা ভল্যুম তার বাড়িতে পৌছে দেয়া হয়েছিলো। যদ্দুর জানা আছে ক’দিন পরেই তিনি নিউইয়র্কে ফিরে চিকিৎসাধীন হন এবং অল্প কদিন পরেই ইহলোক ত্যাগ করেন। মার্কিন ডক্টরদের ‘কশাস অপটিমিজম’ ঠিক কাজে লাগেনি। তার দেশে ফেরা হলো না জীবন নিয়ে, জীবনীশক্তি নিয়ে। ‘দেয়াল বই’ এর ব্যাপারে মাননীয় উচ্চ আদালতের মত ও নির্দেশ সম্পর্কে তার কোন উক্তি বা তার চরিত্রায়নের কোন ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিনা হুমায়ুন আহমেদ জানা নেই। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারে শিল্প, সাহিত্য, সুর, লেখনী ও অন্যান্য কলা সাধনা ও প্রকাশনার অবাধ বিচরন বোধকরি শাসনতন্ত্র ও আইন সিদ্ধ। চরিত্রহনন, কুৎসিত ধ্যান-ধারনা বা ব্যক্তিগত অবমাননা অবশ্যই বর্জনীয়। সেই মাপে তার ‘দেয়াল’ কতটা উৎরাবে আমাদের জানা নেই। তবে সরকারী ভাষ্য এবং সৃজনমূলক  রচনা ও চরিত্রায়ন কখনোই এক নিক্তিতে ওজন করা যায় না বা হয় না বা সম্ভব না। হুমুকে জিজ্ঞাস করার ইচ্ছা ছিলো যে শিল্পী, লেখকদের এই অধিকার রক্ষাকল্পে, তিনি কি কোন ভূমিকা গ্রহন করার ভাবনায় ছিলেন? এবং জনগননন্দিত ও অবিতর্কিত ব্যক্তিত্¦ এবং সৃজনশক্তির অন্যতম ধারক হিসেবে তার সুচিন্তিত মত দেশ ও দশের জন্য শুধু নয়, আমাদের বুদ্ধিজীবি, নীতিনির্ধারক ও শাসনযন্ত্রের বিভিন্ন শাখার জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গদের চিন্তায় স্বচ্ছতা ও অমলিনতা দানে এবং বিশেষ করে ভবিষ্যতের ইতিহাসের পাতা উজ্জ্বল করতে ও আগামী প্রজন্মের পদচারনা বুদ্ধিদীপ্ত ও মনন আলোকিত করতে অত্যন্ত  প্রয়োজন ছিল। নিশ্চয়ই এই অমূল্য আলোকবর্তিকা ধারন করার মানুষ তার যাত্রা শুরু করেছে দেশের কল্যানকর শুভলগ্নে। লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব।

দুই বাংলার প্রকাশনা ‘বইসাঁকোর’ যাত্রা শুরু

শুধু ভাষাগত মিল নয়, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতির ঐক্য। এই ধারা আরো বেগবান করতে প্রকাশনাশিল্পের মাধ্যমে সমন্বিত পথচলা শুরু করল বাংলাদেশ ও ভারত। দুই বাংলার সাহিত্যের মেলবন্ধনে একসঙ্গে যুক্ত হলো দুই দেশের দুই প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পত্রভারতী শুরু করল যৌথ প্রকাশনার উদ্যোগ ‘বইসাঁকো’। এই যৌথ প্রকাশনার উদ্যোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের চার ও ভারতের তিন সাহিত্যিকের বই প্রকাশিত হয়। গতকাল সোমবার ঢাকায় গ্রন্থগুলোর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হলো এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের পত্রভারতী থেকে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘সেরা দশ গল্প’, ফরিদুর রেজা সাগরের ‘এবারো হাফডজন ছোটকাকু’, মারুফুল ইসলামের ‘নির্বাচিত ১০১ কবিতা’ ও মাজহারুল ইসলামের ‘হুমায়ূন আহমেদের মাকড়সাভীতি এবং অন্যান্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের সমরেশ মজুমদারের ‘কথামালা’, সত্যম রায়চৌধুরীর ‘দুনিয়াদারি’ ও ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘আজও রোমাঞ্চকর : স্বাধীনতার রক্তঝরা গল্প’। ঢাকায় ‘বইসাঁকো’ প্রবর্তনা উপলক্ষে গতকাল বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সে সাতটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়। এ আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ও পশ্চিমবঙ্গের গবেষক অধ্যাপক ইমানুল হক। আলোচনায় অংশ নেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ফরিদুর রেজা সাগর ও মারুফুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম ও পত্রভারতীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। এসএ/  

ঝড়ের মুখে দীপশিখা

ঝড়ের মুখে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। সে রকমই একটি কঠিন কাজ করে চলেছে ঢাকার তেজগাঁয়ের নাখালপাড়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার। ১৯৮৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠার পর নানা সংকট মোকাবেলা করে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পাঠাগারটি ৩০ বছর অতিক্রম করেছে।  বর্তমানে এ পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার এবং সদস্য সংখ্যা আড়াইশ। এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সপ্তাহে প্রতিদিন বিকাল ৪টায় পাঠাগার খোলা হয় এবং রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠাগারের কার্যক্রম চলে। নিয়মিত উপস্থিতি ৪০ থেকে ৪৫ জন। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা যে শোষণ-বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন ও চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই “শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার”-এর প্রতিষ্ঠা। ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যায় দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে নাখালপাড়া-লিচুবাগান-শাহীনবাগ এলাকার যে সমাজ ও রাজনীতি-সচেতন ছাত্র-যুবক ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন তারা এলাকায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৮৯ সালের ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাগারের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধক ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, শাহরিয়ার কবির, নাখালপাড়া হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাহীদ ভূঁইয়া। প্রথমে পাঠাগারের নাম রাখা হয়েছিল শহীদ শহীদুল্লা কায়সার স্মৃতি পাঠাগার। ২৭২, পূর্ব নাখালপাড়ায় পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু হয়। কিছুদিন পর পাঠাগারের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নামকরণ শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার করা হয়। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর কর্তৃক আমাদের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, তালিকাভুক্তি নম্বর : ঢাকা-৭১ (১৯.০৯.২০১৬)।১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও শাহরিয়ার কবীর প্রমুখদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় অঙ্গীকার নামে একটি প্রকাশনা। যার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী ও কার্টুনিস্ট রফিকুন্নবী (রণবী)। এ পর্যন্ত পাঠাগারের মোট ৯টি প্রকাশনা রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের বইমেলায় পাঠাগারের ৩০ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে প্রকাশিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ (প্রকাশক আগামী প্রকাশন)। যাতে ৩২৯ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর জীবন (১৬২ জনের ছবিসহ), মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিভিন্ন বছর এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রয়াত বুদ্ধিজীবী আহমদ শরীফ, কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। পাঠাগারের অনুষ্ঠানে আরও অংশ নিয়েছেন বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক রশীদ হায়দার, আখতার হুসেন, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, পান্না কায়সার, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সলিমুল্লাহ খান, প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট আহসান হাবিব, অধ্যাপক আজফার হোসেন, আবৃত্তি শিল্পী শিমুল মুস্তাফা ও মাহিদুল ইসলাম মাহী। এছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সন্তানরাও আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। নামমাত্র ১০ টাকা ভর্তি ফির বিনিময়ে এখানে স্কুল শিক্ষার্থীদের সদস্যপদ দেওয়া হয়। মাসিক চাঁদা ১০ টাকা। দরিদ্র বা অসমর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো সদস্য ফি বা চাঁদা নেওয়া হয় না। কলেজগামীদের জন্য চাঁদার হার ২০ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়গামী ও চাকরিজীবী-পেশাজীবীদের জন্য মাসিক চাঁদা ৩০ টাকা। ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ মাসে খরচ ১০ হাজার টাকা। পাঠাগারের সাবেক সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ীরা চাঁদা দিয়ে এ খরচ বহন করেন। এছাড়া প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পাঠাগারের পক্ষ থেকে অর্থ ও বই সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া একুশের বইমেলা থেকেও বই সংগ্রহ করা হয়। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাঠাগারের পক্ষ থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, মেডিকেল ক্যাম্প, বন্যা দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, মেয়েদের খালিহাতে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, ক্রিকেট-ফুটবল খেলার আয়োজন, শিক্ষাসফর, দেয়ালপত্রিকা প্রকাশ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, রচনা লেখা প্রতিযোগিতা, সাধারণজ্ঞান প্রতিযোগিতা, গান শেখা, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, বাংলা নববর্ষ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হয়। পাঠাগারের কাজকর্মের তথ্য ও ছবি ফেসবুক পেজে দেওয়া হয় (www.facebook.com/শহীদ-বুদ্ধজিীবী-স্মৃত-িপাঠাগার- Shaheed-Buddhijibi-Smrity-Pathagar-1574398436148310/) পাঠাগারের নিজস্ব কোনো ঘর না থাকায় দোকান ভাড়া নিয়ে পাঠাগার চালাতে হয়। কখনও কখনও অর্থের অভাবে পাঠাগার বন্ধ রাখতে হয়েছে। এছাড়া বারবার স্থান বদল হওয়ায় বহু মূল্যবান বই ও সামগ্রী নষ্ট হয়েছে, কিংবা খোয়া গেছে। কমপিউটার-মোবাইল আসক্তির এ যুগে শিশু-কিশোরদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং পাঠাগার সচল রাখার কাজটি ঝড়ের মুখে প্রদীপ জ্বালানোর মতোই। সে কাজে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন দরকার পাঠাগারটিকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। আশা করা যায়, সমাজের সহৃদয় মানুষদের সহায়তায় সে কাজেও সফল হতে পারবে। এসএইচ/  

ব্লেড

আমি আত্মহত্যা করব। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কথাটি বলে এক সেকেন্ড দম নিল মেয়েটি। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে বলল, ‘‘ম্যাসেঞ্জারে এসো। একটা জিনিস দেখাবো।’’ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে মেয়েটি একটি ছবি পাঠিয়েছে। ওর হাতের তালুতে চকচক করছে ব্লেড। স্মার্টফোনের ক্যামেরার ফ্লাশের আলো পড়ায় ব্লেডের উপর থাকা লেখা পড়া যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না কোন কোম্পানীর ব্লেড এটি। প্রেমিক ছেলেটির চোখ গেল মেয়েটির চমৎকার আঙুলের দিকে। কী সুন্দর! আঙুলের মাথায় লম্বা হয়ে থাকা নখগুলোও আকর্ষণীয়। অনিন্দ সুন্দরী মেয়েটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, ভাবতেই ওর শরীরের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসল। প্রচন্ড পানির পিপাসা পাচ্ছে। মুহুর্তেই ভিজে উঠল দু’চোখ। বিগত দিনে দু`জনের একসাথে কাটানো মধুর সময়গুলো মনে পড়ছে। দম বন্ধ হয়ে আসা অনুভূতি নিয়ে প্রেমিক ছেলেটি দ্রুত টাইপ করল- ‘‘পাগলামো বন্ধ করো সোনা। প্লিজ। দরকার হলে আমি চুপ হয়ে যাব, তাও এমন বোকামো করো না। নিজের সামান্য ক্ষতিও করোনা। এ জীবন অনেক মূল্যবান। একদম ভুল করা যাবে না। মৃত্যুই সবকিছুর সমাধান নয় সোনা।‘’ : জানি না প্রিয়তম। এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নাই। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাঁদের মান সম্মানের প্রশ্ন। অন্য কাউকে বিয়ে করলে তুমি সারাজীবন কষ্টে ভুগবে। আমি এসব মানতে পারব না। এসবের চেয়ে আমার মরে যাওয়াই ভাল। কেন যে আমরা একই ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মালাম না জান? - তাই বলে মরে যেতে হবে? এত বোকা তো ভাবি নি তোমাকে। পৃথিবীতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা বিয়ে করছে না? আমরাই কি প্রথম? আমাদের দেশেই কি এমন বিয়ে হয়নি আগে? : পারব না। একদম পারব না। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা কষ্টে-অপমানে হয়তো মরেই যাবেন। ছোট ভাই-বোনগুলোর বিয়েতে সমস্যা হবে। - বোকার মতো কথা বলো না তো সোনা। তুমি আত্মহত্যা করলে তারা কষ্ট পাবে না? সম্মান যাবে না? কোনো সমস্যা হবে না? এরচেয়ে বরং চলো- সবাইকে ম্যানেজ করে বিয়েটা করে ফেলি। ‌: পারব না আমি। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা অখুশি। অন্য কাউকে বিয়ে করলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। বিয়ে না করেও উপায় নেই, এই সমাজ উল্টাপাল্টা কথা শুনাতে ছাড়বে না। আমার হয়েছে জ্বালা। তারচেয়ে মরে যাই। - চুপ করো তো। প্লিজ। : হুম। চুপ হয়ে যাব একদম। পঞ্জিকায় দেখলাম আজ রাত তিনটা থেকে একটা ভাল লগ্ন শুরু হচ্ছে। এ সময় মৃত্যু হওয়া নাকি ভাল। মেয়েটির অমন কথা শুনে প্রেমিক ছেলেটি না হেসে পারল না। ধর্মভীরু মেয়েরা বুঝি আত্মহত্যা করতেও লোকনাথ পঞ্জিকা দেখে! অথচ সে ভালই জানে, আত্মহত্যা মহাপাপ। সব ধর্মই এ কথা বলে। ভাল ক্ষণ দেখে কেউ নরকে যেতে চায়! ছেলেটি দুষ্টুমি করার চেষ্টা করে- ``আত্মহত্যাকারীরা স্বর্গের কোন স্তরে থাকবে, এমন কিছু পঞ্জিকায় লেখা আছে সোনা! আমাকে পড়ে শোনাও না! তোমাকে ফোন করি। বল আমাকে।`` : না। ফোন করো না। শোনো, আমি ফান করছি না। সত্যিই মরে যাব। ছবি দেখে কিছু বুঝতে পারছ না? আমি কি করতে যাচ্ছি মাথায় ঢুকেছে? - হুম। ঢুকেছে। ভয়ানকভাবে ঢুকেছে। : মন খারাপ করো না জান। পরপারে দেখা হবে। এ পৃথিবীতে তো তোমাকে পেলাম না। পরপারে যদি ... - আসলে আমি ভাবছি দুনিয়ার কথা। তোমার আঙুল আর নখের কথা। : মরার আগে নখ নিয়ে ভেবে কি হবে। স্যরি, তুমি গত সপ্তায় বলার পরও কাটি নি। জানোই তো, নখ বড় রাখতে আমার ভাল লাগে। প্লিজ, শেষ সময়ে এটা নিয়ে ঝগড়া করো না প্রিয়তম। আমাকে শান্তিতে মরতে দাও? - বকবো কেন? বললাম না, তোমার আঙুল আর নখ নিয়ে ভাবছি? : কি ভাবছ জান? - ভাবছি, জন্মের পর তোমার এই সুন্দর আঙুলগুলো কত নরমই না ছিল। : হুম। -জন্মের সময় তো হাত-পায়ের আঙুলে নখও থাকে। মায়েরা কত সতর্কতার সাথে সন্তানের নখ কেটে দেন। সামান্য ভুলে না আবার কলিজার টুকরা সন্তানের আঙুলের চামরা কেটে যায়, খুব ভয়ে থাকেন তারা। মায়েরা দিনে অসংখ্যবার সন্তানের নরম আঙুলগুলোয় চুমু খান। বাবারাও। এমন পরিস্থিতি দিয়ে গেছেন তোমার মা, আমার মা। গ্রামে নিজ বাড়ির আঁতুরঘরে সন্তান জন্ম দেওয়া সকল মায়েরই এই অভিজ্ঞতা আছে। তাই না? : হুম। ঠিক। - ব্লেড দেখে আরেকটা বিষয় মনে পড়ল। বলব? : বল জান। - জন্মের সময় হয়তো এমনই কোনো ব্লেড দিয়ে তোমার-আমার নাড়ি কেটেছিলেন গ্রামের ধাত্রী! বলাকা নাকি অন্যকোনো নামের ব্লেড ছিল ওগুলো, কে জানে! : মানে? এখন বুঝি দুষ্টুমির মুড এলো তোমার? - খেয়াল করেছো, মায়েরা সন্তান পেটে ধরা থেকে শুরু করে জন্মদান ও লালন-পালনে কত কষ্ট করেন। স্বাভাবিক ডেলিভারীর মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে অভিজ্ঞ মায়ের কাছে প্রশ্ন করলে জানতে পারবে, এ অভিজ্ঞতা কত কষ্টকর। মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তার কলিজায় লাথি মেরে তবেই আমরা পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম কি না! ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া মায়ের এই কষ্টের কোনো তুলনা হয়? : না, হয় না। কিন্তু হঠাৎ এসব বলছ কেনো জান? - কারণ আছে বৈ কি। প্রেমের মানুষটিকে পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে কষ্ট পেয়ে জন্মদাত্রী মায়ের মুখটি একবার খেয়াল করছ না। তার ছবিটা একবার চোখ বুঝে দেখছ না। মরতে চাচ্ছো। তুমি সত্যি এমন করলে তাঁর কি হবে ভেবেছো একবার? খেয়াল করে দেখেছো, নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানকে নিয়ে মায়েরা কত কষ্ট স্বীকার করেন? শোনো, সন্তান বড় হয়ে গেলেও মায়েরা তাদের নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন। আমার ধারণা, তোমাকে নিয়েও তোমার মা এভাবে সারাক্ষণ ভাবেন। : মায়ের কথা বলে মনটা অন্যরকম করে দিলে জান। তুমি এত ভাল কেন বল তো! এমন করে কথাবার্তা বলো বলেই কি না তোমার ওপর কঠিন হতে পারি না। নইলে কবেই প্রেমটাকে কবর দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলতাম! - করে নাও। : পারছি কই? - হুম। ‘এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে...’! ‘শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি/ তুমি আমার সাধনা...’! : ঢং! এই শোনো। ব্লেডটা দিয়ে একটা কাজ করব। প্লিজ বকো না যেন? - কি কাজ সোনা? : তোমার নাম লিখব। - কোথায়? : বামহাতে। - পাগল নাকি তুমি! এই শোনো, হাত কেটে নাম লেখার দরকার নেই। হৃদয়ে লিখেছো, এ-ই আমার পরম পাওয়া, ওটা মুছতে দিও না। : তোমার কথার জবাব নেই জান। - শোনো, ব্লেড দিয়ে হাত-পা কাটলে ইনফেকশন হতে পারে। তারচেয়ে এটা দিয়ে লম্বা নখগুলো কেটে ফেল। চাইলে ব্লেডের অন্য ব্যবহারও করতে পারো! : যেমন? - এই যেমন আমি শেভ করি। গোঁফ-দাড়ি কাটি! : দুষ্টু কোথাকার! এই তুমি আমাকে হাসালে কেন? আজ আর কথা বলব না! ঘুমাবো। শুভরাত্রি। - শুভরাত্রি! সুপ্রভাত জানানোর জন্য ভোরে ওঠো কিন্তু। এসি  

বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা

মোদের গরব মোদের আশা,আ-মরি বাংলা ভাষা। কবির বর্ণনায় বাংলা ভাষার মাধুর্য এভাবেই ফুটে উঠেছে। বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলার জন্য জীবন বিসর্জন করেছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেক বিপ্লবী। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শত শত বীর বাঙালি ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছি, রক্ত দিয়ে পিচঢালা পথ রঙিন করে ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রেখেছিল। এরপরই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। এসব ইতিহাস সকলেরই জানা। তবে যে আশা ভরসা, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে ভাষা সংগ্রামীরা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরও আমাদের খুঁজে ফিরতে হয় সেসব উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কিনা? সকলেই জানেন,মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টির জন্যই ভাষা আন্দোলনের সূচনা। একটি ভাষাকে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ব্যবহার করতে হলে তাকে অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু কাগজে কলমে বাংলাকে মর্যাদা দিলেও বাঙালিদের শোষণ নির্যাতন চালাতে থাকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। নিজেদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর বাঙালিরা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র জন্ম নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে সকলের আশা ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার হবে। বিশেষ করে সরকারি দপ্তর,আদালত এসব স্থানে সাধারণ মানুষ বাংলায় সেবা পাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে বাংলা ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই বাংলাকে সর্বস্তরের ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তী রাষ্ট্র প্রধানগণ বাংলায় ভাষণ দেননি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলায় ভাষণ দেন এবং বাংলাকে জাতিংসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জনিয়ে আসছেন। জাতীয় সংসদে একটি শব্দ বারবার আমি শুনি আর ভাবি এই শব্দটির মনে হয় কোন বাংলা শব্দ নেই। যখন সংসদের স্পীকার বলেন, অমুকের বক্তব্য ‘এক্সপাঞ্জ‘ করা হলো তখন আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে কেন বলেন না, অমুকের বক্তব্য বাদ দেওয়া হলো বা বাতিল করা হলো। বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরের ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা থাকার পরও কার্যকর হয়নি এ চাওয়া। এমনকি সুপ্রীম কোর্টের রায় এখনও লেখা হয় ইংরেজীতে, যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেনা। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার প্রচলন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি অন্য ভাষা বিশেষ করে ইংরেজীকে চরম অবজ্ঞা করা হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে ডিগ্রী পাস করা কেউ যেমন বাংলা ভাল জানে না, তেমনি ইংরেজীও শিখে কম। অথচ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ইংরেজী অবশ্যই জানতে হবে। আবার মেডিক্যাল কলেজ বা কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষার বই নেই বললেই চলে। ফলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে মেডিক্যাল বা কারিগরি পড়াশোনা। ফলে জানা বা বুঝার চেয়ে মুখস্থ করে পরীক্ষা পাসের চিন্তা করে অনেক শিক্ষার্থী। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার এমন বেহাল দশার সুযোগ নিয়ে যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল যেগুলোর অধিকাংশ মানসম্মত নয়। ফলে এমন এক প্রজন্ম গড়ে উঠছে তারা বাংলা ভাষা সম্পর্কে যেমন কম জানে তেমনি ইংরেজীও শিখছে ভুল ভাবে। প্রযুক্তির কারণেও বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে হিন্দি সংস্কৃতি। হিন্দি ভাষার অনুকরণে লোকজন ব্যবকরণগত অনেক ভুল শব্দ ব্যবহার করছে প্রত্যাহিক জীবনে। কয়েকদিন আগে নতুন একটি শব্দ শুনলাম ‘কেনকি’। হিন্দী ‘কিউকি‘ শব্দ থেকে নাকি বাংলা করা হয়েছে ‘কেনকি‘। অথচ ব্যকরণগতভাবে এটি ভুল একটি শব্দ। ভাষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক বা ব্যবকরণবিদগণ নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। কিন্তু এখন অন্য ভাষার নাটক সিনেমা দেখে সাধারণ মানুষই মনের মতো করে শব্দ সৃষ্টি করছেন। আমাদের একটি প্রজন্ম এভাবেই ভুল শব্দ শিখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক নতুন নতুন শব্দ বা কথ্য ভাষার শব্দ স্থান পাচ্ছে প্রমিত বাংলা হিসেবে। যেমন আমরা অনেকেই মুঠোফোনে বার্তা পাঠানোর সময় লিখি ‘বলিয়েন’ ‘কইরেন‘ এ জাতীয় শব্দ। ইংরেজীর মিশ্রণ তো ডাল ভাতের মতো হয়ে গেছে। গণযোগাযোগ মাধ্যমেও প্রমিত বাংলার ব্যবহার অনেক কমে গেছে। টেলিভিশনের সংবাদ বা উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়। কিন্তু রেডিওতে বর্তমানে তুমুল জনপ্রিয় ডিজে নামক পদবীতে যারা কাজ করেন তাদের ভাষা শুনলে যেকোন বিদেশি বিশেষ করে ইংরেজী ভাষার কোন বিদেশী নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যাবেন। তারা যেভাবে বাংলা উচ্চারণ করেন এবং এতে দুই একটা শব্দ পরপর ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করেন তাতে সাধারণ মানুষের ভ্যাবচ্যাকা খাওয়ার উপক্রম হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা নাটকে প্রমিত বাংলার স্থলে আঞ্চলিক ভাষা প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেকে এর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, এসব নাটকের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষাগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলা নাটক যদি আপনি বলেন তাহলে সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহারই কাম্য। আমরা দেখি হিন্দি নাটক বা সিনেমায় প্রমিত হিন্দি ভাষা ব্যবহার হয়, ইংরেজী সিনেমায় প্রমিত ইংরেজী ভাষার ব্যবহার হয়। যদি তেলেগু, মারাঠী, অসমীয় ভাষায় নাটক বা সিনেমা বানানো হয় সেগুলোকে তারা কখনো হিন্দি নাটক বা সিনেমা বলে না। বর্তমানে সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে ২১শে ফেব্রুয়ারী। এখন সুযোগ আছে মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার। সাথে সাথে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটিও করা যায় এ সুযোগে। তবে সবচেয়ে জরুরি বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চর্চা সঠিকভাবে করা। সেটা হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যেন বিদেশে কোন অনুষ্ঠানে বাংলায় ভাষণ দেন সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে। সুপ্রীম কোর্ট যেন নিজেরা বাংলা ভাষার চর্চা শতভাগ শুরু করেন এবং তাদের দেওয়ার নির্দেশনা যেন পালিত হয় সেজন্য সরকারকে তাগাদা দিতে পারেন। হয়তো সাধারণ মানুষ ভুল উচ্চারণ করবে, কিন্তু যাদের দেখে তারা শিখবে সে মানুষগুলো বিশেষ করে যাঁরা অভিনয় করেন, সংবাদ পড়েন বা উপস্থাপনা করেন তাঁরা যেন শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বাংলাদেশে ইউটিউব থেকে যেমন অশ্লীলতা দূর করতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে তেমনি বাংলা ভাষার নামে যারা অপভাষা ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে আকাশ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি থেকে রক্ষা করতে হলে বাংলা ভাষার প্রচার এবং প্রসারের কোন বিকল্প নেই। লেখক- সাংবাদিক, লন্ডন

ঝরনার গল্প

আমি জন্ম থেকেই খুব চঞ্চল — নিসর্গ কখনো আমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি; ব্রহ্মা যখন খোদ গঙ্গাকে কমণ্ডলুতে ধরে রাখতে পারেনি তখন কার সাধ্য আমার গতি রোধ করে? তাই আমি আজন্ম ছুটে চলছি — প্রফুল্ল কল্লোলে, সরল চাঞ্চল্যে, মহানন্দে। গঙ্গা যেমন উন্মত্তভাবে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিল আমিও তেমনি অস্থিরসংকল্পে অদ্রিচূড়া থেকে আছড়ে পড়ি স্থলে — অচল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। নির্জন বন — পাখি ও কীটপতঙ্গের ক্রমাগত ডাক এর নিস্তব্ধতাকে আরো প্রকট করে তোলে; মনে হয় বুঝি এ বন গভীর ঘুমে মগ্ন কিন্তু এ নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে উঠে আমার অট্টনাদ। পাথুরে মৃদঙ্গে তান তুলে আমি অহোরাত্র গান গাই। এই অচল, গম্ভীর পর্বতে আমি প্রাণ সঞ্চার করি — ধেয়ে চলি আনন্দে, নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে; সাগ্রহে দেখি হরিণের ছুটোছুটি। গঙ্গার মতো আমিও দ্রুতবেগে নেমে আসি ভূতলে — পাথরগুলিকে নির্দয়ভাবে আঘাত করে আর গঙ্গা যেমন শিবের জটাতে স্থান পেয়েছিল আমার জলও তেমনি স্থান পেয়েছে ধরার বুকে। শৈবালের মসৃণ আস্তরে ঢাকা — আমি কোনো রাণীর চেয়ে কম নই। এভাবেই আমি যুগের পর যুগ হেসে-খেলে কাব্যময় ছন্দে ছুটে চলছি। এই অবিরত ছুটে চলার পথে আমি কত কী দেখেছি, শুনেছি, অনুভব করেছি! বহু প্রাণীর ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্প আমি আপন সত্তায় লিখে রেখেছি — এমনই ২ মর্ত্যবাসীর গল্প এতকাল সযত্নে নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু আজ তা প্রকাশ করার সময় এসে গেছে। একটা সময় ছিল যখন আমি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলাম — কোনো মানুষ জানতনা আমার অস্তিত্বের কথা; আমিও জানতামনা ওদের বিষয়ে। এরপর এক পুণ্যপ্রভাতে, যখন আমি সূর্যের রক্তিম আভায় অভিষিক্ত হলাম, যখন পাখিরা নব উদ্যমে গেয়ে উঠল, যখন ধীরে ধীরে জেগে উঠল ঘুমন্ত বন, এখানে প্রথম এক মানুষের আগমন ঘটল — ওর গায়ে ছিল গেরুয়া বস্ত্র, কাঁধে লম্বা ঝোলা ও হাতে শূন্য ভিক্ষাপাত্র। ও সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল আমাকে — আমিও অবাক হয়ে দেখলাম ওকে। আমি পাখিদের কণ্ঠে মানুষের বর্ণনা শুনেছিলাম — শুনে মনে হয়েছিল এরা অতি নীচ-হীন-বর্বর কিন্তু ঐদিন যে মানুষের সৌম্যমূর্তি দেখলাম ওকে দেখে মোটেই মনে হলোনা ও হিংস্র। লোকটির ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি, মুখে উজ্জ্বল জ্যোতি ও চোখে অপার বিস্ময় কিন্তু ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হলোনা ও হারিয়ে গেছে; মনে হলো বুঝি একদম ঠিক স্থানে এসেছে। ও আস্তে আস্তে এগিয়ে এল আমার দিকে — অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল একটিমাত্র নাম — “মহাশ্বেতা।” ঐ পুণ্যলগ্নে প্রথমবারের মতো আমার নামকরণ হলো — আমি পেলাম এক নতুন পরিচয়, মহাশ্বেতা। ও চিৎকার করল, “আজ থেকে এ নির্ঝরিণীর নাম মহাশ্বেতা — ভিক্ষু কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্র, নির্ঝরিণী মহাশ্বেতা।” আগন্তুকের পরিচয় পেলাম — ভিক্ষু কাণ্ডবীর। কাণ্ডবীর ওর সব আভূষণ ত্যাগ করে আস্তে আস্তে আমার জলাশয়ে নামল — হাতজোড় করে করল মন্ত্রোচ্চারণ। পুণ্যস্নান সেড়ে ও আবার বস্ত্র ধারণ করল। এরপর ১টি বড় কড়ই গাছের তলে বসে চোখ বুজে, হাতের তালুগুলি কোলে রেখে ও ধ্যানে মগ্ন হলো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল — ওর ধ্যান ভঙ্গ হলোনা। অনেকক্ষণ পর ও চোখ খুলল। এরপর ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে কোথায় গেল কে জানে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম কাণ্ডবীরকে ও ভাবলাম, “এ কি তাদেরই একজন যারা নির্বিচারে বনের গাছ কেটে ফেলে, পাখিদের শিকার করে ও বনভূমি উজাড় করে নগর গড়ে তোলে? এ কি সত্যই মানুষ?” ঐদিনের পর থেকে আমি কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্র হয়ে উঠলাম। ও কড়ই গাছের তলে ১টি ক্ষুদ্র কুটিরে থাকত — বেশি আহামরি কিছু নয়; ১টি সাধারণ মাচা মাত্র। উপরে তালপাতার চাল ও সম্মুখে একপ্রস্থ উঠোন। রোজ উষালগ্নে ও আমার কাছে ছুটে আসত — মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখত নতুন দিনের সূর্যোদয়। সূর্যকরে যেমন নিশার অন্ধকার চাদর ক্রমশ খসে পড়ে ও তেমনই আস্তে আস্তে বস্ত্রত্যাগ করে নামত আমার জলাশয়ে — অস্ফুট স্বরে জপ করত কল্যাণ মন্ত্র। কে জানে ঐ কণ্ঠে কী জাদু ছিল — মনে হতো বুঝি কাণ্ডবীরের মন্ত্রবলেই নিশার আঁধার ক্রমশ ঘুচে যাচ্ছে। স্নানান্তে ও কতক্ষণ ঘর ঝাঁট দিত। এরপর ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বেরিয়ে যেত ভিক্ষান্বেষণে — ও ফিরে এসে তরুতলে বসে ফল, ভাত, সবজি, যা কিছু পেত তা পরম তৃপ্তিতে খেত। পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে অন্যান্য কাজ সেড়ে শুরু করত ধ্যান। সূর্য অস্ত যেত, নিশার আঁধার ঘনিয়ে আসত, প্রদীপশিখা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠত — ওর চোখের পাতা একটু নড়তও না; দেহ এতটুকু কাঁপত না। মূর্তিবৎ বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শ্বাপদসংকুল বন — চতুর্দিকে গিজগিজ করে সাপ, গিধড়, পন্নগ, এমন কত বনচর! কিন্তু কাণ্ডবীর ছিল সম্পূর্ণ নির্ভয় — বহুকাল বনবাস করতে করতে ও বন্য জন্তুদের সঙ্গে সহাবস্থান করার কৌশল শিখে গেছিল। একবার ওর ধ্যানের সময় ১টি বিষাক্ত সাপ নেমে এসেছিল গাছ থেকে কিন্তু ওর তেজোদ্দীপ্ত মুখশ্রী দেখে এর চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল — কবার ছোবল দিতে গিয়েও পারলনা। সাপটি ওখানেই অচল হয়ে পড়ে থাকল আর যেই কাণ্ডবীর চোখ খুলল ওটা নীরবে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল। ও কিছু টেরও পেলনা —  কী আশ্চর্য একাগ্রতা! ধ্যান শেষে ও প্রদীপ নিভিয়ে ঘুমোত কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। গভীর রাতে আবার জ্বলে উঠত ওর প্রদীপ — উষা অবধি চলত ওর ধ্যান। এভাবে কতকাল কেটে গেল কে জানে — সময়ের হিসেব শুধু মানুষই রাখে, নিসর্গ নয়। যা হোক, এভাবে চলতে চলতে একদিন এ স্বাভাবিকত্বের ব্যত্যয় ঘটল। এ তপোক্ষেত্রে এক নতুন ব্যক্তির আগমন হলো — এক নারী; এক হাতে ঘট ও অন্য হাতে কুঠার নিয়ে ত্রস্তপদে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ও দারুণ বিস্ময়ে দেখল আমাকে — জ্বলজ্বল করে উঠল ওর চোখের মণি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ধাঁ করে ছুটে এল আমার কাছে — ঘট ও কুঠারটা মাটিতে রেখে সে মহানন্দে মুখে জল ছিটাল, হাত ধুলো ও খিলখিল করে হাসল। কী অপূর্ব হাসি! হাসির চোটে ওর দুলগুলি তরুলতার মতো কেঁপে উঠল — ওর হর্ষধ্বনি শুনে মনে হলো বুঝি জলে মুক্তো ঝরে পড়ছে। এই উদ্দাম হাসিতে ওর আলগা খোঁপা খুলে পড়ল। কে ছিল এই নারী? ও কোথা থেকে এমন ঝড়ের বেগে এসে কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্রের গাম্ভীর্য একদম তছনছ করে দিল? মেয়েটি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘটে জল ভরতে লাগল — মুগ্ধচোখে দেখল আপন প্রতিচ্ছবি কিন্তু ১টির বদলে ২টি মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে ও চমকে উঠল; সাঁই করে কুঠারটা তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। না, কোনো দস্যু/আরণ্যক নয় — এক বৌদ্ধ ভিক্ষু; মেয়েটির অস্ত্র দেখে ও কয়েক পা পিছে দাঁড়াল। ও লজ্জায় তা সরিয়ে নিল — ব্যাপারটা এত অকস্মাৎ ঘটে গেল যে কেউই শুরুতে কিছু বলতে পারলনা। এরপর কাণ্ডবীর বলল, “কে তুমি? এখানে এলে কি করে?” মেয়েটি ইতস্তত করছে দেখে বলল, “ভয় পেওনা — আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবনা। তুমি নির্ভয়ে বলো — তোমার নাম কী? কোথা থেকে এসেছ?” — “আ-আজ্ঞে, আমার নাম দর্শী। আমি ফুল্লন গ্রামে থাকি।” — “ফুল্লন গ্রাম? আমি তো প্রায়ই ওখানে ভিক্ষা করতে যাই কিন্তু ওখানকার কেউ তো এ স্থান সম্পর্কে জানেনা। তুমি জানলে কি করে?” — “শব্দ! শব্দ শুনেছি।” — “শব্দ?” — “হ্যাঁ, বনের ধার অবধি এ ঝরনার শব্দ শোনা যায় — আমার কুটির থেকেও। এ শব্দের পিছে ছুটে ছুটেই আমি এ থান খুঁজে পেয়েছি। অছুঁত বলে গ্রামের লোকে নদী থেকে জলও নিতে দেয়না কিন্তু এখানকার জল নিতে তো আর কেউ আমাকে বারণ করেনি। তাই আমি এখানে চলে এসেছি জল তোলার জন্য।” কাণ্ডবীর অবাক হলো ওর কথা শুনে — বলল, “তুমি জল তোলার জন্য একাই চলে এলে এতদূর? একটু ভয়ও হলোনা?” ও তখন ঋজু হয়ে দাঁড়াল — সদম্ভে বলল, “আমি কোনোকিছুকে ভয় পাইনা — (কুঠার উঁচিয়ে) বাপের কুঠার যদ্দিন আমার কাছে আছে তদ্দিন কেউ আমার ক্ষেতি করতে পারবেনা।” — “তোমার পিতা বুঝি”—  — “মারা গেছেন। পরিবার বলতে আছে শুধু এক বুড়ো মা — ও কাজ করতে পারেনা। তাই আমি কাঠ কেটে হাটে বিক্রি করি। আমরা শূদ্র — সকলে কাঠ কিনতে চায়না, তবু কষ্ট করতে হয়। ভিক্কে করে খাবার চেয়ে তো ভাল আছে।” কাণ্ডবীর মুগ্ধ হলো ওর সাহস ও আত্মবিশ্বাস দেখে — মৃদু হেসে একটু মাথা নাড়ল। এরপর বলল, “তোমার ঘট ভেসে যাচ্ছে।” দর্শী পিছন ফিরে দেখল ঘটটি জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে — ও দ্রুত হাত বাড়িয়ে তা ধরে ফেলল; জল ভরে কাঁধে তুলে কাণ্ডবীরের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা আপনি কে?” ও তখন সবিস্তারে নিজের পরিচয় দিল, “আমি এক বৌদ্ধ ভিক্ষু — একাপর্ণিকাতে যে বৌদ্ধ বিহারটি আছে আমি ওখানকার ছাত্র ছিলাম। ৩ মাস হলো বিহার ত্যাগ করে মহাশ্বেতার পাদদেশে বাস করছি।” — “মহা-কী?” — “মহাশ্বেতা — এ নির্ঝরিণীর নাম। আমি রেখেছি।” — “ও, আপনি বুঝি এখানেই থাকেন?” — “হ্যাঁ, ঐ তো আমার গৃহ।” দর্শী কড়ই গাছের দিকে তাকাল — সত্যিই ওখানে ১টি ক্ষুদ্র মাচা ছিল; ক্রীড়ার উত্তেজনাতে ততক্ষণ লক্ষ্যই করেনি। ও জিভ কেটে বলল, “এ মা, আমি একদমই জানতামনা এখানে আপনার মতো ঋষি থাকে — জানলে আমি এখানে আসতামনা। আমাকে ক্ষমা করবেন।” — “ও মা, এভাবে বলছ কেন? নিসর্গের দানে সবার অধিকার আছে — তোমার যখন ইচ্ছা তুমি এখানে আসতে পার।” — “সত্যি?” — “সত্যি।” ঐদিন আর দুজনার কথা হলোনা — দর্শী কাণ্ডবীরকে প্রণাম করে চলে গেল। ওর অনুমতি পেয়ে ও রোজ এখানে আসতে লাগল। প্রায়ই কাণ্ডবীরের সঙ্গে দেখা হতো কিন্তু ও ভিক্ষান্বেষণে গ্রামে গেলে আর দেখা হতোনা। দর্শী একদিন কাঁদতে কাঁদতে ওর কাছে ছুটে এসে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেবার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। কাণ্ডবীর প্রশ্ন করল, “তুমি কি সত্যই তোমার ধর্ম ত্যাগ করতে চাও?” — “হাহ, আমার আর ধম্ম ভান্তে! আমি শূদ্রানী — মন্দিরে পা দেবারও আমার অধিকার নেই। যে দেবতা আমাকে ছেড়েছে ওর দেয়া ধম্ম আমি চাইনে। দিন ভান্তে, আমাকে দিক্ষে দিন।” ঐদিন থেকেই শুরু হলো দর্শীর দীক্ষা। কাণ্ডবীর ওকে কষ্ট, এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বলত। শোনাত বুদ্ধের জীবনগাথা — কেন সে রাজ্য ত্যাগ করেছিল, কষ্টের কারণ জানতে কত কঠিন তপস্যা করেছিল, কি করে নির্বাণ লাভ করেছিল, এসব। দর্শী সবকিছু বুঝত না কিন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে শুনত — গুরুর আদেশ-উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। দর্শী কাণ্ডবীরের সেবা করতে উদগ্রীব ছিল কিন্তু কাণ্ডবীর ছিল স্বনির্ভর — ও কখনো দর্শীর সেবা গ্রহণ করত না; এতে ও একটু মনোক্ষুণ্ন হতো বটে কিন্তু কখনো গুরুর বিরুদ্ধাচরণ করতনা। দর্শীর মাধ্যমে ফুল্লন গ্রামে কাণ্ডবীরের খ্যাতি ছড়াতে লাগল — ওর ধর্মকথা শুনতে ২-৩জন করে ক্রমে আরও লোক আসতে লাগল এখানে; এতকালের অনাবিষ্কৃত মহাশ্বেতা এবার জনসমক্ষে পরিচিতি লাভ করল। কাণ্ডবীরের নিভৃত জীবন ভরে উঠল কর্মব্যস্ততায় — ভক্তদের ধর্মোপদেশ দিতে দিতেই কেটে যেত দিনের অনেকটা সময় কিন্তু কাণ্ডবীর এতে মোটেই বিরক্ত হতোনা; হাসিমুখে ব্যাখ্যা করত ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, সত্য-অসত্যের জটিল তত্ত্ব। ও কখনো নিজের ভক্তদের মধ্যে বিভেদ করতনা; সদাই শোনাত সাম্যের কথকতা কিন্তু প্রত্যেকে হয়তো ওর সাম্যের বাণী সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি । এদের অনেকেই কাণ্ডবীরের আশ্রমে দর্শীর নির্বিঘ্ন যাতায়াত ভাল মনে মেনে নিতে পারেনি — একজন তো একদিন বলেই ফেলল, “ঐ মাগিকে বেশি লাই দেবেননা ভান্তে — ওর মতিগতি ভাল নয়।” কাণ্ডবীর তখন ওকে কানে কানে কি যে বলল, ঐ ব্যক্তি আর কখনো এখানে আসেনি। হায়, দর্শী তখন গাছের পিছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল — ঐদিন আর ও কাণ্ডবীরের কাছে যায়নি; উল্টো ঘুরে চলে গেছিল। বর্ষা এল — কৃষ্ণবর্ণ মেঘে ছেয়ে গেল অম্বর, নবরূপে সেজে উঠল অটবী, আমি পেলাম নবযৌবন কিন্তু এ আনন্দযজ্ঞ সম্পূর্ণ হলোনা কেননা আনন্দময়ী দর্শীই ছিল অনুপস্থিত। সেই যে এক গ্রীষ্মের ভোরে ও উদাস মনে এখান থেকে চলে গেছিল, আর ও এখানে আসেনি। কাণ্ডবীর হয়তো একটু চিন্তিত হয়েছিল কিন্তু নিজের স্বাভাবিক স্থৈর্য বজায় রেখে ও কাউকে কোনো প্রশ্ন করেনি। এরপর এক পূর্ণিমা রাতে যখন ও ধ্যানে মগ্ন ছিল কারো কান্নার শব্দ শুনে ওর ধ্যান ভঙ্গ হলো — দেখল দর্শী ওর পায়ের কাছে বসে কাঁদছে। ও সবিস্ময়ে বলে উঠল, “দর্শী! তুমি এত রাতে এখানে? কী হয়েছে? ক্রন্দন করছ কেন?” দর্শী চেঁচিয়ে বলল, “আমি পাপ করেছি ভান্তে; আমি পাপী! পাপের জ্বালা সইতে না পেরে আমি আপনার কাছে এসেছি।” — “আহ, কী হয়েছে তা তো বলবে।” — “আমি নষ্টা ভান্তে; আমি পাপী! আমার পাপের কোনো ক্ষমা নেই।” — “তোমার চিত্ত অশান্ত দর্শী — কী হয়েছে আমাকে বলো; আমি তোমাকে মুক্তির পথ বলে দিচ্ছি।” দর্শী আরো এক দফা কেঁদে বলল, “আমি একজনকে মন দিয়ে ফেলেছি ভান্তে!” কাণ্ডবীর কতক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি…প্রেমাসক্ত হয়েছ — এতে পাপের কী আছে?” — “আছে ভান্তে, আছে। আমি যাকে মন দিয়েছি ও মহাপুরুষ — মেয়েলোক ছোঁয়াও ওর বারণ কিন্তু আমি এমনই পোড়ামুখী, আমি ওকেই আমার মন দিয়ে ফেলেছি।” কাণ্ডবীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর জিজ্ঞাসা করল, “তবে তুমি কেন ওকে ভালবাস দর্শী?” ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল, “কি করে না বাসি ভান্তে? ও যে আর ৮-১০টা লোকের মতো নয় —  জীবনে কারো কাছে যে মান পাইনি ওর কাছে ১দিনেই তা পেয়েছি। আর ১০টা লোকের মতো ও কখনো আমাকে হেয় করেনি — কাঙালনী বলে কখনো গাল দেয়নি। ওর কাছে যে মানুষের মান পেয়েছি এই তো আমার ভাগ্যি — ওকে যে আমি আমার সোয়ামি ভেবে নিয়েছি কিন্তু আমার এমনই কপাল, ও আমাকে গেহোন করতে পারেনা!” কাণ্ডবীরের মুখ কঠিন হয়ে গেল — নির্বিকারভাবে বলল, “ও কে দর্শী?” দর্শী কেঁদেই গেল — কিছু বলল না। কাণ্ডবীর কঠিন স্বরে বলল, “আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছি দর্শী — আমি জানতে চাই ও কে।” দর্শী কেঁদে কেঁদে বলল, “ও আমি বলতে পারবনা ভান্তে।” কাণ্ডবীর আরো জোর দিয়ে বলল, “বলতে হবে! আমি আদেশ করছি দর্শী —  আমাকে বলো ও কে।” দর্শী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে বলল, “সে তো আপনার অজানা নয় ভান্তে।” কাণ্ডবীর ক্ষিপ্রগতিতে উঠে দাঁড়াল — দেখে দর্শী একটু চমকে গেল। ও কিছু না বলে ছুটে এল আমার কাছে — দর্শী ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। কাণ্ডবীর চীরবস্ত্র না খুলেই নেমে পড়ল জলে — ১বার, ২বার, ৩বার… কতবার ডুব দিল কে জানে। ঐরাতে ছিল ভরা পূর্ণিমা — চন্দ্র তার দুধেল জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছিল আমার জলে। ঐ চন্দ্রকরে দর্শী অপলক চোখে দেখল কাণ্ডবীরের গৌর কায়া, দীপ্ত মুখ ও নগ্ন বক্ষ। স্নানান্তে ও জলাশয় থেকে উঠে ঘরে ঢুকল — ঝোলা ও ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে বেরিয়ে এল। এরপর ১টি মশাল জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারল ঘরের চালে — দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ঐ মাচা। দর্শী কিছু বলল না — কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেল সব। এরপর কাণ্ডবীর ওর কাছে গিয়ে বলল, “আমি চলে যাচ্ছি দর্শী; আমার শেষ আদেশ — ওকে তোমার ভুলতে হবে।” দর্শী ওকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল কিন্তু মুখ তুলে দেখল ও নেই — এর আগেই ও এখান থেকে চলে গেছিল; ১বার ঘুরেও তাকায়নি। দর্শী বনের মাঝে একা একা পড়ে রইল। এরপর শুষ্ক কণ্ঠে বলল, “ওকে ভুলতে হবে — ভান্তের আদেশ।” এরপর পিছন ফিরে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল ঐ জ্বলন্ত মাচার দিকে। বাদুড়গুলি চেঁচিয়ে উঠল, পেঁচাগুলি “হু হু” করে ডেকে উঠল, দূরে কোথাও শোনা গেল শেয়ালের চিৎকার। দৈবাৎ পূর্ব থেকে ছুটে এল একদল মেঘ — রাহুর মতো গ্রাস করল চন্দ্রকে; বিরহিণীর অশ্রুর মতো নেমে এল জলধারা। পরদিন দুপুরে ভক্তরা যথারীতি চলে এল কিন্তু দর্শী/কাণ্ডবীর কাউকে খুঁজে পেলনা। ঐ বৃষ্টিসিক্ত দুপুরে মহাশ্বেতার পুণ্যক্ষেত্র ছিল শূন্য — কড়ই গাছের তলে পড়ে ছিল শুধু একগাদা ছাই। এরপর বহু শতক কেটে গেছে — কত বিহার বিধ্বস্ত হয়েছে, কত ফুল্লন গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কত একাপর্ণিকা হয়ে গেছে ধূলিসাৎ! কিন্তু আমি এখনো আছি — চিরপ্রফুল্ল, চিরপ্রাণবন্ত, চিরবহমান। আজ আমি পর্যটন কেন্দ্র হয়েছি — লক্ষ লক্ষ মানুষ রোজ এখানে ছুটে আসে আমাকে দেখতে। এরা ঐ ২জনের মতো নয় — এদের ভাষা, চালচলন, জামাকাপড়, সবই ভিন্ন। এরা আজ আমাকে নতুন নামে ডাকে কিন্তু এরা তো জানেনা আমার ১টাই পরিচয় — মহাশ্বেতা। যদি কখনো এখানে আসো তবে দেখবে আমার পাদদেশের ১টি কোণে ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে কাণ্ডবীরের পাথরটি এখনো আছে। অন্তশ্চক্ষু দিয়ে তাকালে দেখতে পাবে — দর্শী কাণ্ডবীরের পায়ের কাছে বসে আছে। হয়তো শুনতেও পাবে — ও কাণ্ডবীরকে বলছে, “ভান্তে, মহাশ্বেতা মানে কী?” এসি    

জীবন সাহিত্যের ছোট গল্পের বই ‘যে তুমি মানুষ খোঁজো’

যে তুমি মানুষ খোঁজো সাহিত্যের ফর্মূলায় ছোট গল্প নয়, ভিন্নভাবে বললে সাহিত্যের বিষয়বস্তু যদি জীবনের অংশ হয় তবে এই বইয়ের গল্পগুলো জীবন সাহিত্যেরই ছোট ছোট গল্প। যেখানে আছে শব্দে গাঁথা জীবনবোধ,অন্তর্ভেদী অনুভব। আছে প্রেমে বিশ্বাস রাখার আকুলতা, পারিবারিক হৃদ্যতার নিবিড়তা। আছে চিরদিনের চেনা মানুষকে হঠাৎ করে আবিষ্কারের তীব্রতা। আছে অচেনা মানুষকে চেনা আলোয় দেখতে চাওয়ার আকুতি। লেখক বই প্রকাশে চূড়ান্ত সংযত, পরিশীলিত। এই বইয়ের জন্য তিনি ততোটুকু সময় নিয়েছেন যতোটুকু সময় তিনি জীবনের বোধে সচেতনভাবে অবগাহন করেছেন। এতে পাঠকের লাভ হলো আট বছর ধরে বইতে থাকা যে বারোটা গল্প লেখক সময়ের দামে লিখেছেন পাঠক সেই সুখপাঠ্য একসাথে নিতে পারবেন কোন এক বিকেলের উপভোগ্য চায়ের চুমুকে। আশা করি, পাঠক বইটি পড়ে বুক পকেটে সুখ সঞ্চয়ের ধারনাটি পাবেন। পাবেন পরিচিত মানুষের ভেতরের মানুষের খোঁজ...বলছিলাম জাহান রিমার প্রথম গল্পের বই ‘যে তুমি মানুষ খোঁজো’র কথা। সমগ্র প্রকাশন থেকে প্রকাশ হওয়া গল্পের বইটির দাম রাখা হয়েছে ১৫০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মেহেদী হাসান। বইটিতে ১২টি গল্প রয়েছে। এরমধ্যে কফি-কাপে পুড়ে যায় ঠোঁট, জিয়ন কাঠি, জীবনগাঙের ঢেউ, তোমার বাড়ি কইগো নারী?, প্রিয় বুয়া, এই চিঠি আপনাকে লিখছি, প্রেম মানে পাপ নয়, বিষয় যখন অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ, ভালোবাসায় হেরে যেতে ভালোবাসি, পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন ভোর, কাঁটা সরালেই ফুলের সুবাস, মানবতার আপ্যায়ন, ভালোবাসার অত্যাচার, পুত্রবধূর আয়নায় শাশুড়ি, আমাদের মা, অজ্ঞান পার্টির সদস্য! ও মরুভুমির মরিয়ম যেভাবে চম্পা ফুল হলো। জাহান রিমা কবি ও কথাশিল্পী। পেশায় ডেন্টাল হাইজেনিস্ট। জন্ম ২১ অক্টোবর ১৯৯০। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। জীবন সমুদ্রে প্রেম শুধু সাহিত্যের জন্য জাগলো কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার বাবা তাঁর ফুলশয্যার রাতে মাকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন; এই তোমার অলঙ্কার! বোধ করি সেই পত্র অনুভব থেকে আজকের এইদিন। পারিবারিক শিল্প সাহিত্যের আবহে আমার কাগজের দিঘীতে শব্দের স্নান। পেশা এবং নেশার বৈপরীত্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যরাতে হাসপাতালের করিডরে রোগীর যে স্বজনটি অস্থিরতায় হাঁটে তারও একটা গল্প আছে। একজন লেখক দেখতে পান সে গল্পটা। বরং লিখতে পারা যায় সেই গল্পটা আরো ধারালো করে, কারণ সেই লেখাতে শুধু সাহিত্য নয় বিজ্ঞানও আছে। আর বিজ্ঞানে মন, মানুষ, মনস্তত্ব কী না আছে এই হলো জাহান রিমা। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সব পত্রিকায় ব্যতিক্রম ও নতুনধারার গল্প লিখে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। ২০১৪ বইমেলাতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার সংকলন ‘প্রণয়কাব্য’। ২০১২ সালে রবি আয়োজিত শ্রেষ্ঠ স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। বিচার-বিবেচনার বোধ হবার পর থেকেই লিখছেন তিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় সব প্রিন্ট মাধ্যমে। পাঠক লেখক তাঁকে জেনে নিয়েছে সেই মাধ্যমেই। ব্যতিক্রম ও নব্যধারার গল্প লিখে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের জননন্দিত বাচিকশিল্পীরা আবৃত্তি করেন তার লেখা কবিতা। এছাড়াও সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার সংশ্লেষণ তো আছে। স্ব স্ব স্থানে সুপরিচিত দুটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক তিনি। সচেতনভাবে তিনি গদ্য লিখলেও অবচেতন মনে যে তিনি পদ্যের মালা গাঁথেন `জাত কবি` এই নিয়ে তাঁর একটি মিষ্টি দুর্নাম (!) আছে। সাহিত্যের বিবিধ সমুদ্রে এই যে তাঁর এইসব শব্দের ঢেউ সমগ্র প্রকাশন তা শুনতে পায়, দেখতে পায়। তাইতো সেই ঢেউদের মলাটে বাঁধতে প্রথম বই `যে তুমি মানুষ খোঁজো` প্রকাশের উদ্যোগ। দ্বীপে জন্মগ্রহণ করা জাহান রিমা বিশ্বব্যাপি কতটা মননশীল-সৃজনশীল তা সাক্ষ্য দিবে আপনার কাছে তাঁর রচনাশৈলী। কেআই/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি