ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

করোনা মহামারিতে মানুষের পাশে কিশোর ও বিদ্যানন্দ

সোহাগ আশরাফ

প্রকাশিত : ১২:৫৬, ২৭ মার্চ ২০২০ | আপডেট: ১৩:২৭, ২৭ মার্চ ২০২০

Ekushey Television Ltd.

বিশ্ব আজ করোনায় আক্রান্ত। অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে এই ভাইরাস। সব কিছু বন্ধ। মানুষ ঘরের মধ্যে বন্দি। অসহায় জীবন কাটাচ্ছে শ্রমজীবী পরিবারগুলো। ঠিক যে সময় সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরী, তখন তারা ঘরের মধ্যে খাদ্য মজুদ করে অবকাশে দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু এমন দিনে কিছু মানুষ সমাজের কাছে নিজের দায়বদ্ধতাকে উপলব্ধি করে মানবতার হাত প্রসারিত করছেন নিরবে। শুরুর দিকে দেশে যখন করোনা হানা দিয়েছে তখন অনেকেই এটি নিয়ে হাসি তামাশায় লিপ্ত থেকেছেন। অথচ কেউ কেউ এসময় এসেছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। কিশোর কুমার দাশ তাদেরই একজন। যিনি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। করোনা প্রতিরোধে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন তারা। 

এক সময় যারা নিজেদের অর্থায়নে মানুষের সেবা প্রদান করতেন, আজ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে অনেকেই। এখন দেশের জনগণের অর্থায়নে লক্ষ লক্ষ দুঃস্থ মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী দিচ্ছে বিদ্যানন্দ।

করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ পাঁচ লাখ শ্রমজীবী পরিবারের সদস্যদের কাছে খাবার পৌঁছে দেয়ার টার্গেট নিয়েছে তারা। ৫০০ টন চাল-ডাল-লবন-তেল কেনার কাজ শুরু করেছে সংগঠনটি। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে তারা।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসা সমগ্রী, চিকিৎসদের পিপিই প্রদানও করছেন তারা। যতটুকু পারছেন তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এ কাজে সহযোগীতা করতে অনেকেই নিরবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। কিন্তু বিদ্যানন্দের দাবি- এখন পরিস্থিতি যেমন তাতে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম :
সবার জন্য শিক্ষার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে স্বেচ্ছ্বাসেবীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল সংগঠনটি। পরবর্তীতে তারাই শুরু করে ‘এক টাকার আহার’ প্রকল্প। প্রকল্পটির আওতায় দরিদ্র শিশু ও বৃদ্ধরা এক টাকায় পেট ভরে খেতে পারছে।

মাত্র এক টাকায় আহার! চিন্তা করা যায়? কিন্তু সত্যিই তাই। বাংলার পথে পথে এই আহার চলে খোলা আকাশের নীচে, স্টেশনের প্লাটফর্মে। এঁদের কেউ অভুক্ত থাকে সারারাত, কেউবা আরো বেশি। মাত্র এক টাকায় এক প্যাকেট খাবার পেয়ে কেউ খুশিতে আত্মহারা হয়, কেউবা দৌঁড়িয়ে লাইনে দাঁড়ায়। এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশ।

কে এই কিশোর কুমার দাস?

কিশোর কুমার দাস। চাকরির সুবাদে ঘুরছেন দেশ-বিদেশ। বর্তমানে আছেন সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে। কর্মজীবনে সফল এই পেশাদার কর্মকর্তার জীবনের পেছনের গল্পটা এমন নয়। শৈশব কেটেছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ২৪ বছর আগের চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাটের এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান শেষে খাবার বিতরণ হচ্ছিল। তখন ১৪ বছরের কিশোর অন্যদের মতো লাইনে দাঁড়িয়েছিল এক প্লেট খাবারের আশায়। কিন্তু সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে ফিরে আসতে হয়েছিল খালি হাতে। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন এমন কিছু করবেন যাতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা খাবারের জন্য কোনো কষ্ট না পায়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কলাপাতার ওপর সামান্য খাবার পেয়েছিলেন একবার। তা নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটেছিলেন বাড়িতে। মা’কে নিয়ে একসঙ্গে খাবেন তাই। পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে সব খাবার নষ্ট হয়ে যায়। আজ তার ক্ষুধার কষ্ট নেই। কিন্তু, ভোলেননি সেই অতীত। অতীতকে স্মরণ করেই তিনি দাঁড়িয়েছেন দেশের শ’ শ’ ক্ষুধার্ত সুবিধাবঞ্চিতের পাশে। তারই প্রতিষ্ঠিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এখন প্রতিদিন দুই বেলা ‘এক টাকায় আহার’ বিতরণ করে দেশের হাজার পথশিশুর মধ্যে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের রামুতে প্রতিদিন দুপুরে ও রাতে শিশুরা সংগ্রহ করে এক টাকায় আহার।

এ বিষয়ে কিশোরের বক্তব্য, শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় খাবারের জন্য। খাবার যোগাড় করতে অনেকেই বাধ্য হয় শিশুশ্রমে, চুরি করতে। পড়াশুনার কথাতো চিন্তাই করতে পারে না তারা অন্ন সংস্থানের চিন্তায়। এজন্যই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ‘এক টাকায় আহার’ প্রকল্প চালু করে।

খাবার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, প্রতীকী এই এক টাকা নিয়ে শিশুদের মধ্যে স্বাবলম্বি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির প্রত্যাশা রয়েছে আমাদের। শিশুরা যাতে ভিক্ষা বা দান নির্ভর না হয় সেটাই এই এক টাকা মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য। নিয়মিত খাবার মেন্যুতে থাকে ভাত, সবজি আর ডাল। তবে কেউ অনুদান দিলে খাবারের মেন্যুতে মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, খিচুড়ি আর পোলাও দেয়া হয়। কোনো কোনোদিন করা হয় মিষ্টান্নের ব্যবস্থাও। শুক্রবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রামু ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে বিতরণ করা হয় এক টাকার খাবার।

চট্টগ্রামে খাবার বিতরণের জন্য খোলা হয়েছে ‘ফুডভ্যান’। ঢাকার বিমানবন্দর রেল স্টেশন ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন বিতরণ করা হয় এসব খাবার।

সেচ্ছাসেবীরা জানান, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত লেকদের জন্যই এই খাবার দেয়া হয়। শিশুরা ছাড়াও অনেক দরিদ্র, শ্রমজীবী এই খাবার খেয়ে উপকৃত হন। নিয়মিত খাবার বিতরণের পাশাপাশি বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয় খাবার। রমজান মাসে সেহরি ও ইফতার বিতরণ করা হয়।

কিশোর জানান, আমি নিজে শৈশবে একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু ছিলাম। তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কোনোদিন যদি টাকা উপার্জন করতে পারি তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমিও কিছু করবো।

কিশোর ২০১৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর শুরু করেছিলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

কষ্টের শৈশবের কথা জানিয়ে কিশোর বলেন, আমার নিজের শৈশবের কোনো ছবি নেই। এখন বিদ্যানন্দের উদ্যোগে ১০ হাজার শিশুর ছবি তুলে তা প্রিন্ট ও লেমিনেটিং করে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের অধিকার আছে তাদের শৈশবকে স্মরণীয় করে রাখার। আমি কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্ম নিয়েছিলাম। আমি কিছু মনে রাখতে পারতাম না। আরও নানা কারণে আমার শৈশবটা আসলে আনন্দময় ছিল না। কিন্তু, আমার অন্য ভাইবোনরা ছিল খুব মেধাবী, জীবনের ওই সময়টা ছিল খুব হতাশার। বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। উনি অবসরে যাওয়ার পরে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় টাকার অভাবে। তখন আমি কেবল এসএসসি পাস করেছি। যদিও ভাইবোনদের লেখাপড়া চলছিল। তখন কতোজনকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি, কিন্তু পড়ার জন্য আমি অর্থের সংস্থান পাইনি। শেষ পর্যন্ত দুই বছর পর একজন শিক্ষকের সহযোগিতায় আমি লেখাপড়ার করার সুযোগ পাই আবার। এরপর কম্পিউটার সায়েন্স-এ ভালো একটা ফল নিয়ে পাশ করলাম চুয়েট থেকে।

২০০৬ সালে বিডিকমে চাকরি পান কিশোর। এরপর আর পিছিয়ে থাকতে হয়নি। দ্রতই পদোন্নতি পেয়েছেন সর্বত্র। বিডিকম থেকে এয়ারটেল। আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। ২০১১ সাল থেকে পেরুতে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব মার্কেটিং পদে আছেন কিশোর কুমার।

২০১৩ সালের আগস্টে বড় বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নেন কিছু একটা করবেন সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য। ওই বছরই নারায়ণগঞ্জের বন্দরথানার সাব্দি গ্রামে পাঁচজন ছাত্র নিয়ে স্কুল শুরু করেন শিপ্রা।

শিপ্রা জানান, আমাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। এখন আমরা বিদ্যানন্দের স্কুল ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছি বেশ কয়েকটি জেলায়। চট্টগ্রাম এবং ঢাকার মিরপুরে বিদ্যানন্দের শাখা খোলা হয়েছে। বিদ্যানন্দের প্রতিটি শাখায় সংগ্রহ করা হয় হাজার হাজার বই। সেখানে শিশুরা পড়াশুনা করতে পারে সারা দিন। এছাড়া বিদ্যানন্দের উদ্যোগে এখন চলছে একটি এতিমখানা। এজন্য কক্সবাজারের রামুতে ১৮ শতক জায়গা দিয়েছেন এক ব্যক্তি। সেখানে বাঁশঝাড় পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলা হয়েছে এতিমখানা।

কিশোর জানান, পরিকল্পনা এবং শুরুটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও এখন তিনি সঙ্গে পেয়েছেন আরও ক’জন সহযোদ্ধা ও সেচ্ছাসেবী। টাকারও একটি বড় অংশও দিয়েছেন তিনিই। এখন অনেকেই সেখানে আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন। অনেকে দিচ্ছেন সময় ও শ্রম। ফাউন্ডেশনের রয়েছে কয়েকজন শাখা প্রধান।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমারের স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের সব স্কুলে ও বিভিন্ন জায়গায় এক লাখ সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে প্রতিদিন এক টাকায় খাবার বিতরণ করবেন।

বর্তমানে বিদ্যানন্দের বিভিন্ন শাখায় স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। কিশোর আশা করেন, তার মতো আরও অনেক তরুণ সুবিধাবঞ্চিতদের সেবাই এগিয়ে আসুক।

সংগঠনের কর্মীরা জানান, আমরা প্রতি দিন কতভাবেই না কত টাকা অপচয় করি, একটি সিগারেট কিনি ১০ থেকে ১৫টাকায়। একটি লিপস্টিক কিনি হাজার টাকায়, শ’টাকায় খাই সামান্য বার্গার। আসুন যে যতটুকু পারি এদের পাশে দাঁড়াই, সাহায্য করি।

আগে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার বিতরণ হলেও বর্তমানে ‘এক টাকায় আহার’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। 

‘এক টাকায় আহার’ প্রজেক্টকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেছেন কর্তৃপক্ষ। অনুদানে উৎসাহী দাতাদের পেজের ইনবক্সে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। 
যোগাযোগ : https://www.facebook.com/1Tk.Meal/
এসএ/
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি