কাস্টমসের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ
প্রকাশিত : ২২:১৩, ২২ এপ্রিল ২০২০

বাংলাদেশ ও ভারত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। তারই জেরে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর এলাকার অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। বেনাপোলে নেই কোন শিল্পকারখানা বেনাপোল স্থলবন্দরের উপরে জীবিকার জন্য নির্ভরশীল কয়েক হাজার মানুষ। এ পথে আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকার জেরে রোজগারে টান পড়েছে তাদের। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল ও পেট্রাপোল। সেই সাথে বেকার হয়ে পড়েছে বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার শ্রমিক। এছাড়া বন্দর ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট কয়েকশত এনজিও কর্মীরাও একই অবস্থায় পড়েছে। ভারত দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহ ভাগ পণ্য আসে এই বন্দর দিয়ে। আপাতত বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে যুক্ত সীমান্ত এলাকার মানুষজন করোনা নয় রুজি-রুটি হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
গত ২২ মার্চ ভারতে জনতার কারফিউ থাকায় বন্ধ থাকে আমদানি-রফতানি। এর পর ২৩ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত লকডাউন ঘোষনা দেয় ভারত। এর মধ্যে ২৩ মার্চ রাতে এক ঘোষনায় ২১ দিনের লকডাউন ঘোষনা করা হয়। যেটার সময় সীমা ছিল গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। তারপর আবারো বাড়ানো হয় লকডাউন। যা এখনও চলছে। কবে উঠবে লকডাউন তাও কেউ বলতে পারছে না। বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধের ফলে উভয় সীমান্তে আটকা পড়ে আছে শত শত পণ্যবোঝাই ট্রাক। যার অধিকাংশই বাংলাদেশের শতভাগ রপ্তানিমুখি গার্মেন্টস শিল্পের ও দেশীয় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল রয়েছে। যেগুলো বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। গত ২২ মার্চ থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেনি। বেনাপোল বন্দর দিয়ে কোনো পণ্য নিয়ে ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে যায়নি। আমদানি-রফতানি বন্ধ বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩শ‘ থেকে চারশ‘ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের পণ্য ভারত থেকে আমদানি হয়। ভারতে রফতানি হয় দেড়শ থেকে দুইশ‘ ট্রাক বাংলাদেশি পণ্য। প্রতিবছর এ বন্দর থেকে সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আমদানি পণ্য থেকে ও পাসপোর্টধারী যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আর কত দিন আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকবে সেটা কেউ বলতে পারছে না।
এরই মধ্যে বুধবার (২২ এপ্রিল) করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে সরকার দশদিনের (৫ মে পর্যন্ত) সাধারণ ছুটি বাড়িয়েছে। তবে এই ছুটিকালীন সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃংখলা স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে সকল কাস্টমস হাউজ ও কাস্টমস স্টেশনসমূহে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বার্ড (এনবিআর)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস নীতি) মোহাম্মদ মেহরাজ-উল-আলম সম্রাট স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করেছে। (নথি নং-১৭(৩) শূ:নী:ও বা:/২০১৩/১১৪৩) তারিখ-২২/০৪/২০।
আদেশে আরো বলা হয়েছে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার সময় করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক যথাযথ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এবং সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার জন্য অনুরোধ করা হলো। সেই সাথে ইতোপূর্বে জারিকৃত আদেশ বাতিল করা হলো।
এর আগে গত ৩০ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক আদেশে আমদানিকৃত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, জরুরি চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা সামগ্রী শিল্পের কাঁচামাল এবং সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমদানিও অন্তর্ভুক্ত করা, শুল্কায়নসহ খালাস প্রদান এবং রফতানিও ইপিজেডের কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সকল কাস্টমস হাউস ও শুল্ক স্টেশনসমূহে সীমিত আকারে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু পণ্য বেনাপোল কাস্টমস হাউজ থেকে খালাস করলেও অধিকাংশ আমদানিকারক পণ্য খালাসে আগ্রহী ছিল না। তবে পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাসের সাথে ভারতীয় কাস্টমস, বন্দর, বেনাপোল বন্দর, ব্যাংক, ট্রান্সপোর্ট, উভয় দেশের সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর শ্রমিকরা জড়িত রয়েছে। সবার সাথে সমন্বয় করা না হলে কার্যত পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাস প্রক্রিয়া কতটুকু সফলতা পাবে সেটাও ভাববার বিষয়।
এদিকে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম শুরুর ব্যাপারে দু‘দেশের মধ্যে নানা ভাবে আলোচনা চললেও পণ্য নিয়ে যাওয়া আসা ট্রাক চালক ও হেলপারদের ফেরার পথে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করায় কোন চালক পণ্য পরিবহন করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। ভারতের নেতারা স্বাস্থ্য বিধি মেনে এই পথ দিয়ে আমদানি-রফতানির কাজ শুরু করা যায় কিনা সে ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। দু‘দেশে চলছে লক ডাউন। আর লক ডাউন না উঠালে দু‘দেশের মধ্যে যাতায়াতও সম্ভব নয়।
ওপারের বন্দর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে ভারতীয় মোট আটটি খালি ট্রাকসহ চালক এবং হেলপাররা নিজ দেশে ফিরে গেছে। তবে পেট্রাপোল বন্দরে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে ফিরে যাওয়া ট্রাক চালক এবং হেলপারদের প্রতি। প্রত্যেকের স্থানীয় পথের সাথীতে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের ব্যবস্থায় থার্মাল স্ক্রিনিং করে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব চালকরা ভারতের উওর প্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দা।
পেট্রাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস স্টাফ ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ভারতে দফায় দফায় লকডাউন ঘোষনা করায় সকল রকম আমদানি-রফতানিসহ সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে করোনার আতঙ্কের জেরে স্থল বন্দর এলাকার অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। পণ্য বোঝাই যে সমস্ত ট্রাক বেনাপোলে প্রবেশের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন পার্কিং এ দাঁড়িয়ে আছে সেগুলিকে সঠিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে পাঠিয়ে পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করে ব্যবসায়ীদেরকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেস্টা চলছে।
ওপারের সীমান্তে বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ী প্রদীপ দে জানান, আগে মানুষের জীবন তারপর ব্যবসা, গত ২৩ মার্চ থেকে আমাদের কয়েকটি পাট বীজ বোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে পেট্রাপোল বন্দরে। লাখ লাখ টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়ে আছি। তবু আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকেই চুড়ান্ত হিসাবে গন্য করেছি। কারণ কোন ভাবেই কোন দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হোক আমরা কেউ চাইনা।
বেনাপোল আমদানিকারক সমিতির সহ সভাপতি আমিনুল হক আনু জানান, করোনা ভাইরাস আতঙ্ক এতটাই যে সীমান্ত সীল করে দিয়েছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে। পাশাপাশি এর প্রভাবও ব্যাবসা বাণিজ্যতে, চরমে পৌঁছবে বলে আমার মত। এখনই ক্ষতির মুখ দেখতে শুরু করেছে ভারত-বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রফতানিকারকেরা। ক্ষতি কাটিয়ে নিতে জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যবসা যথেষ্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই চরম অর্থনৈতিক সংঙ্কটে পড়ে সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার শ্রমজীবি মানুষ বিকল্প সঠিক পথ না পেয়ে বিপথে পা বাড়াবে বলেই ধারণা তার মত অনেকের, আর তাতেই সমস্যার সম্মুখীন হবে দেশের ব্যবসায়ীসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা। দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃংখলা স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে সকল কাস্টমস হাউজ ও কাস্টমস স্টেশনসমূহে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বার্ড (এনবিআর)। তবে পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাসের সাথে উভয় দেশের কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, ট্রান্সপোর্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর শ্রমিকরা জড়িত রয়েছে। সবার সাথে সমন্বয় করা না হলে কার্যত পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাস প্রক্রিয়া কতটুকু সফলতা পাবে সেটাও ভাববার বিষয় বলে তিনি জানান।
বেনাপোল কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার আকরাম হোসেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আমরা কাস্টমস হাউজ খোলা রেখে কাজ করে চলেছি। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পণ্য নিতে চাইলে আমরা দ্রুত সেটা শুল্কায়ন শেষে খালাসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমাদের সকল কর্মকর্তারা প্রস্তুত আছে।
আরকে//
আরও পড়ুন