ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

অঙ্কে কাঁচা ছেলেটি আজ শীর্ষ কোম্পানির মালিক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৭:১৬, ১১ জুন ২০১৮ | আপডেট: ১৪:০২, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

Ekushey Television Ltd.

ছাত্রজীবনে সবচেয়ে সঠিন সময়ের মুখোমুখি দশম শ্রেণিতে ওঠে। ছোটকাল থেকেই আমি অঙ্কে কাঁচা। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ফাইনালের আগে টেস্ট পরীক্ষা বা  অ্যালাও পরীক্ষা পাস করতে হবে। নইলে এসএসসি দেওয়া যাবে না। মানে ছাত্র জীবনের যবনিকাপাত। অনেক চেষ্টা করেও অঙ্কে মেলাতে পারি না। সহজ-সরল অঙ্কেও শূন্য পাই ক্লাস টেস্টে। তারপরও প্রচুর খাটাখাটনি করে। কিছুটা নকলের ওপর ভর করে টেস্ট দিলাম। রেজাল্টের দিন অঙ্কের শিক্ষক জহরলাল ধর স্যার ডেকে বললেন, তোকে অঙ্কে ৩৩ মার্কস দিয়ে পাস দিলাম। এখন চেষ্টা করে দ্যাখ ফাইনালে পাস করিস কি না। ওখোনে আমি থাকবো না। জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো অঙ্কে পাস।

এসএসসিতে যথারীতি ওই অংকেই ফেল। ২৩ মার্ক পেলাম। ১০ গ্রেস পেয়ে ৩৩। ৫৭৩ মার্ক পেয়েও গ্রেসের কারণে তৃতীয় শ্রেণি। উচ্চ মাধ্যমিক, অর্নাস মাস্টার্স, ছাত্রভীতির প্রতিটি অধ্যায়েই অঙ্ক, আর অঙ্কের প্রথম শ্রেণির কাছাকাছি পৌঁছেও দ্বিতীয় শ্রেণি তকোমা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। হায়রে অঙ্ক এখানো যোগ ৯ এর ফল মেলাতে ভাবতে হয় তিন মিনিটি!

১৯৭৭ সাল। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরটি শেষ হয়ে গেলো। মধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি পাওয়া এক কিশোরের জীবনের নতুন বাঁক। একদিকে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাত অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণি পাওয়ার গ্লানি সব মিলিয়ে পড়ালেখা পালিয়ে যাওয়াতে কেমন যে অনিশ্চিয়তা উঁকি দিয়ে গেলো। তারপরও মায়ের স্বপ্ন আর বড় ভাইয়ের উৎসাহকে সম্বল করে ভর্তি পরীক্ষায় হাজির হলাম। চট্টগ্রাম সরকারি বাণিহ্য কলেজ। দেশের নামকরা কলেজগুলো একটি। লিখিত পরীক্ষায় টিকে গেলাম। মৌখিক পরীক্ষায় মুখোমুখি হলাম লম্বা, রাশভারি সাহেবি চেহারার অফসার খান স্যারের প্রথম আমি সাঁতরাতে পারি ইংরেজি কি বলো। বেশিক্ষণ না ভেবে বললাম, আই নো হাউ টু সুইম! আর প্রশ্ন করলেন না । স্যার বলেন গুড।

কয়েকদিন পর জানলাম ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। মুখে হাত বুলিয়ে অনুভাব করলাম সদ্য গজানো দাড়ি-গোঁফের অস্তিত্ব। মনের ভেতর যুবক-যুবক অনুভূতি। প্রতিদিন আগ্রবাদ থেকে বাসে চকবাজার নেমেই সেই সবুজ হোটেল। দুটো সিঙাড়া আর এক কাপ চা ….  অর্ডার দিয়েই বসে যাওয়া।

কমার্স কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। একদিকে আন্দনে মাথায় উত্তেজনা অন্যদিকে শংকা। অভাবের সংসারে বাবা সবেমাত্র দীর্ঘ কালাজ্বর সেরে বিছনায় উঠে বসেছেন। বড়ভাই একা স্কুলপড়ুয়া আরও চার ভাই এক কোনের পড়ালেখা  বোনটা ভালো জায়গায় পাত্রস্থ করা। এসব ভেবে ভেবে পড়াশোনা চালিয়ে পাওয়ার হিসেবটা আর মেলে না।  এই ভাবনা মাথায় রেখে চকবাজার থেকে কালুর ঘাট বাসা ধরে মোহরা মৌলভিবাজার যায়। সেখান থেকে এক মাইল পথ হেঁটে বাড়ি। মা ও বাবাকে মালাম করে নিয়ে বড় ভাইয়ের অপেক্ষা। আমার ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট শুনে মা আমার যেন আকাশে চাঁদ হাতে পেলেন। এমন আনন্দ তাঁর চোখেঁমুখে।

কর্মাস কলেজের প্রথম ক্লাস করতে গিয়ে বন্ধু শওকত, হাফিজ, নওশাদ, মুস্তাফিস, প্রদীপ, শহীদ, হারুন, সেলিম, সুফিয়ান, মকসুদ, আইয়ুব হাবিবুল্লাহ বাজার কেই নেই কাছে। সুফিয়ান অসুস্থ যে কারণে সে এসএসসি দিতে পারেনি। হারুন, মকসুদও কেন যানি ড্রপলি অন্যেরা সবাই ভালো ছাত্র। বিজ্ঞান-মানবিক নিয়ে পড়ালেখা করবে। তাদের চোখেমুখে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কবি, সাহিত্যিক সাংবাদিক হবার স্বপ্ন। সবাই চট্টগ্রাম কলেজে আর মহসিন কলেজে (তখন ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট আই আই কলেজে) ভর্তি হলো। আমি একা কমার্স কলেজে। কলেজ জীবনের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে। স্যার রহিম চৌধুরী ক্লাসরুমে ঢুকেই আমাদের ক’জন দাঁড়াতে বললেন। হাত-পায়ে মৃদু-কাঁপন রয়ে গেলো। অনেকটা চাটগাঁইয়া ভাষা বললেন, এখনি পাশের নাপিতের দোকানে যাও তোমরা, চুল কেটে আসো। এটা কমার্স কলেজ এখানে রোমিও তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মনটা একেবারেই দমে গেল। মনের ভেতরের যুবক-যুবক ভাবটা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেলো।

 চলবে…

লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ)

 

এসএইচ/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি