ঢাকা, সোমবার   ০৭ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

কেমন ছিল বাঙ্গালির ইতিহাসের চৈত্র সংক্রান্তি?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৯:০৫, ১৩ এপ্রিল ২০২২

Ekushey Television Ltd.

চৈত্র মাসের শেষ দিন। দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ। শুরু হবে বৈশাখ। নতুন বছর বরণের প্রস্তুতি সর্বত্র। একসময় চৈত্র মাসের এই শেষ দিনেই উৎসব পালন করা হতো। চৈত্রসংক্রান্তির আয়োজনে অনেক ক্ষেত্রেই ভাটা পড়েছে। কালের বিবর্তনে বাংলার ঐতিহ্যটি চাপা পড়েছে বৈশাখের উদ্দীপনায়। 

চৈত্র সংক্রান্তিতে শাকান্ন উৎসবের প্রচলন ছিল। এই দিনে গ্রাম-বাংলার নারীরা ঝোপ-জঙ্গল থেকে ১৪ রকমের শাক তুলে আনতেন। সেই শাক একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া হতো। এখনও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের অনেক স্থানে এভাবে শাক তুলে এনে খাওয়ার রীতি রয়েছে। প্রথাটি শাকান্ন উৎসব নামে পরিচিত। কোথাও কোথাও চৈত্র সংক্রান্তির দিনে নিরামিশ খাওয়ার প্রথাও রয়েছে।

পুরনো বিষাদের ছায়াকে বিদায় দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তিতে তিতা খাবারের প্রচলন ছিল একসময়। এখনও দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে এর প্রচলন আছে। এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তিকে অবলম্বন করেই হালখাতা উৎসবের জন্ম নিয়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রামের বাড়িতে খাওয়া হতো গমের ছাতু, দই ও পাকা বেল সহযোগে এক বিশেষ শরবত। এই শরবতেই প্রাণ জুড়িয়ে নিতো সংক্রান্তির উৎসবে যোগ দেওয়া সবাই। কেবল তাই নয়, সংক্রান্তির দিন গ্রামের হাটে কোনো কোনো দোকানে বিক্রেতারা ক্রেতাদের এই শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।

এককালে চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে কেনা হতো চাল, গুঁড়। কোনো বাড়ি থেকে নেওয়া হতো দুধ। সংগৃহীত সেই দুধ, চাল, গুঁড় গাঁয়ের সবচেয়ে উঁচু গাছের নিচে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানেই হাঁড়িতে চড়িয়ে পাক হতো শিরনি। এই শিরনি খেতে গাঁয়ের মানুষ জমায়েত হতো সে গাছের তলে। বেশিরভাগ সময়ই তালগাছ উঁচু হওয়ায় তালগাছের নিচে শিরনি রান্না হতো বলে লোকমুখে সেই খাবারের নাম ছিল তালতলার শিরনি।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে একসময় গ্রাম বাংলার মুসলমানদের মধ্যে নামাজের চল ছিল। এদিনে গাঁয়ের মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা গ্রামের খোলা মাঠে কিংবা উন্মুক্ত প্রান্তরে জামাতে নামাজ আদায় করতেন। এই নামাজের পর হতো বিশেষ মোনাজাত। এই মোনাজাতের উদ্দেশ্য ছিল খরা থেকে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে নিষ্কৃতি লাভ এবং একই সঙ্গে আসন্ন নতুন বছর যেন শুভ হয় সেই প্রার্থনা।

নববর্ষের প্রথম দুই-তিন দিন চলে চড়ক উৎসব। ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন বানিয়ে বন্ধ করলেও গ্রামবাংলার যেসব অঞ্চল মূলত কৃষিপ্রধান, সেখানেই চড়ক পূজা উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

চৈত্র সংক্রান্তিতে আরেকটি বড় আচার-অনুষ্ঠান হলো গম্ভীরা নাচ। আজও বরেন্দ্র অঞ্চল এবং রাজশাহীতে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গম্ভীরার প্রচলন রয়েছে। গম্ভীরা নাচের সঙ্গে হয় গম্ভীরা পূজা এবং শিবের গাজন।

এদিন আরেক উৎসব বিজু বা বৈসাবি উৎসব পালন করে পাহাড়ের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীরা। চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই উৎসবের আমেজ এখনও দেখা যায়। বৈসাবি নামের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ত্রিপুরার বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। উৎসব তিনটির অদ্যাক্ষর মিলে হয়েছে ‘বৈসাবি’।

তবে বিজু বা বৈসাবী পালিত হয় দুই দিন ধরে। চৈত্র সংক্রান্তি এবং পয়লা বৈশাখ নিয়ে এই উৎসব। এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন হয় ফুল বিজু উৎসব। এদিন চাকমা সম্প্রদায়ের মেয়েরা ফুল সংগ্রহ করতে পাহাড়ে যায়। তাদের সংগ্রহ করা ফুলকে তিন ভাগ করা হয়। এক ভাগ দিয়ে বুদ্ধদেবকে পূজা করা, এক ভাগ জলে ভাসিয়ে দেওয়া এবং বাকি এক ভাগ দিয়ে ঘর সাজানো হয়। 

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে পালিত হয় মূল বিজু। এদিন সকালে বুদ্ধদেবের মূর্তিকে স্নান করানো হয়। ছেলেমেয়েরা নদী বা কাছের জলাশয় থেকে জল বয়ে নিয়ে এসে বৃদ্ধ দাদু-দিদিমাকে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। 

এছাড়া চৈত্র মাসের শেষ দিনে পাজন নামে অভিনব রান্নার আয়োজন করা হয় চাকমা সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে। পাজন হলো নানা সবজির মিশ্রণে তৈরি একটি তরকারি। 

তাছাড়া পুরান ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে চৈত্র সংক্রান্তিতে পালিত হয়ে আসছে ঘুড়ি উৎসব। এদিন আকাশ ছেয়ে যায় রঙ-বেরঙের নানান আকারের ঘুড়িতে।

এসবি/ 

 

 

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি