ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫,   চৈত্র ২০ ১৪৩১

রোজার ভুলভ্রান্তির মোচনে ফিতরা, যেভাবে আদায় করবেন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:৪৯ পিএম, ২০ মার্চ ২০২৫ বৃহস্পতিবার

বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস, মাহে রমজান। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় হলো রমজানের রোজা। এ মাসে রোজা, নামাজের পাশাপাশি দান-সদকা করাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এতিম, বিধবা ও দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে জাকাত ও সদকা দেওয়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে অধিক দান-খয়রাত করতেন।

রমজানের এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন দরিদ্রদের খাওয়ানোর জন্য ইসলাম সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছে। এটি ওয়াজিব এবং রোজার সময় হয়ে যাওয়া ছোটখাটো ভুলত্রুটি মোচনের অন্যতম উপায়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন যেন এটি রোজার মধ্যে হয়ে যাওয়া অশ্লীল কথা ও কাজকে পবিত্র করে এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর রোজাকে বেহুদা ও অশ্লীল কথাবার্তা ও আচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি তা (ঈদুল ফিতরের) নামাজের পরে পরিশোধ করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-খয়রাতের অনুরূপ হিসাবে গণ্য। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

বস্তুত এক মাস রোজা রাখতে গিয়ে আমাদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যেসব ছোট ভুলত্রুটি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই সদকাতুল ফিতর।

জাকাত যেমন আর্থিক ইবাদত। সদকাতুল ফিতর বা ফিতরাও ঠিক তেমনি একটি আর্থিক ইবাদত। রোজা পালন করতে গিয়ে অনেক ভুলত্রুটি হয়। তাই এসব ভুলত্রুটির কাফফারাস্বরূপ মহানবী (সা.) এ বিধান দিয়েছেন।

‘জাকাতুল ফিতর ও সাদাকাতুল ফিতর’ এর অর্থ হলো জাকাত বা ফিতরের সদকা কিংবা সদকাতুল ফিতর। রোজাদার যে খাবার খেয়ে রোজা ভঙ্গ করেন, তাকে ফিতর বা ফাতুর বলা হয়।

ফিতরা আদায় করা ইসলামি বিধান মতে ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে—

রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন। এর পরিমাণ হলো- এক সা’ জব বা এক সা’ খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপর এটা ওয়াজিব। প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, যার হাতে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু ব্যতীত অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব।

ফিতরাকে জাকাত সম্বোধন করলেও উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যেমন: ফিতরা এমন ব্যক্তির উপরও ওয়াজিব, যার বাড়িতে সামান্য কিছু খাবার আছে। কিন্তু জাকাত কেবল তার উপর ফরয, যার নিসাব পরিমাণ অর্থসম্পদ রয়েছে। জাকাত বাৎসরিক জমাকৃত ধনসম্পদের কারণে দিতে হয়। আর ফিতরা ছিয়ামের ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে দিতে হয়।

ফিতরা সেই মুসলিমের ওপর ফরয, যে ব্যক্তির নিকট ঈদের রাত ও দিনে নিজের এবং পরিবারের আহারের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ থাকে। আর এই নল হিসাবের মধ্যে প্রতিটি মুসলিম অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে পরিবারে স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট, বড়, বাচ্চা, ধনী ও গরিব, শহরবাসী ও মরুবাসী সিয়াম পালনকারী, ভঙ্গকারী ইত্যাদির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এক কথায় এ দান পরিবারের সকল সদস্যকে হিসাবে রেখে পরিবারে যতজন সদস্য আছে, ততজনের ফিতরা আদায় করতে হবে। সদকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য জাকাতের সমপরিমাণ নিসাব হওয়া শর্ত নয়। যেহেতু তা ব্যক্তির ওপর ফরয, সম্পদের ওপর নয়।

জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণই ফিতরার নিসাব। অর্থাৎ কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত হয়ে ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে— তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমন নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়।

সদকাতুল ফিতর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব। নিজের স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে স্বামী ও বাবার জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়, তারা নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে নিজেরাই তাদেরটা আদায় করবে। তবে স্বামী ও বাবা যদি তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে দেয়, তাহলে সদকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে।

ঈদের আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করে দেওয়া উত্তম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে নবী (সা.) লোকদের ঈদের নামাজের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২১)

তাই সদকাতুল ফিতর রমজানের শেষ দিকে আদায় করা উচিত। কারণ এতে গরিব মানুষের ঈদের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হবে। (আল-বাহরুর রায়েক : ২/২৫৫)

সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক। যথাসময়ে কেউ যদি কোনো কারণে আদায় করতে না পারে, তাহলে ঈদের পরে হলেও যথাসম্ভব দ্রুত আদায় করে দিতে হবে। আর ভবিষ্যতে যেন এমন না হয় এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবেন।

যেসব ভাই প্রবাসে থাকেন তারা যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, এ ক্ষেত্রে বিধান হচ্ছে সদকাতুল ফিতর যিনি আদায় করবেন যে দেশে অবস্থান করছেন সেই দেশের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য হিসেবেই আদায় করবেন।

বাংলাদেশে এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা ও সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর (২০২৪) সর্বনিম্ন ফিতরা ছিল ১১৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৭০ টাকা।

ইসলামি শরিয়াহ মতে মুসলমানরা সামর্থ্য অনুযায়ী গম, আটা, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির- যে কোনো একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা এর বাজারমূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে পারবেন।

ইসলামী শরীয়াহ মতে, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনির ইত্যাদি পণ্যগুলোর যে কোনো একটি দ্বারা ফিতরা দেওয়া যায়। গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা' বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১১০ টাকা প্রদান করতে হবে। যব দ্বারা আদায় করলে এক সা' বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৫৩০ টাকা, খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা' বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা, কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক সা' বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১,৯৮০ টাকা ও পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা' বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২ হাজার ৮০৫ টাকা ফিতরা দিতে হবে।

 

এমবি//