মহামায়ার আরাধনা শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা: স্বামী স্থিরাত্নানন্দ
Ekushey Television

মহামায়ার আরাধনা শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা: স্বামী স্থিরাত্নানন্দ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:৪২ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৮ শনিবার

মহামায়ার আরাধনা শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা: স্বামী স্থিরাত্নানন্দ

মহামায়ার আরাধনা শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা: স্বামী স্থিরাত্নানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মেরই তিনটা দিক আছে। দর্শন,পূরাণ ও অনুষ্ঠান। দর্শন হলো তত্ত্ব বা আসল রহস্য। পৌরাণিক কাহিনীর মাধ্যমে তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করা হয়। আর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আরও স্থূল করে বোঝানো। দুর্গাপূজার তত্ত্ব বা কী আর এর পৌরাণিক কাহিনী বা কী, তা জানার আগ্রহ আমাদের সকলেরই আছে। গল্পের আকারে বললে বুঝতে সহজ হয়।

শ্রীশ্রীচন্ডী গ্রন্থকে দেবীমাহাত্ম্য বলা হয়ে থাকে। দেবীর মাহাত্ম্য অর্থাৎ তাঁর মহিমা আমাদের জানা খুব দরকার। গীতায় ভগবান বলেছেন...নাহঃ প্রকাশঃ সবর্স্য যোগমায়াসমাবৃতঃ। মোঢ়োহয়ং নাভিজানাতি মামজমব্যয়ম্।(গীতা৭/২৫)..অর্থাৎ স্বত্ত্ব, সজঃ ও তমোগুণ স্বরূপ ত্রিগুণাত্মক মায়ায় আমি আবৃত থাকি বলে সকলের কাছে আমি প্রকাশিত হই না। কেবল কোনো কেনো ভক্তের কাছে আমি প্রকাশিত হই। সেই জন্য এই মোহে অন্ধ জগতের মানুষ জন্ম মৃত্যু শুন্য আমার স্বরূপ জানতে পারে না। উপমায় বলা হয়েছে,সামনে রাম পরমাত্না, পেছনে লক্ষণ জীবাত্মা, আর মাঝে মহামায়া সীতা। সীতা একটু সরে না গেলে লক্ষণরূপ জীব রামরূপ পরমাত্মাকে দেখতে পায়না। ভগবান যে মায়ার কথা বলেছেন, তার প্রভাব জানতে পারলে আমরা তাঁকে প্রসন্ন করে মুক্ত হতে পারি। ঈশ্বরলাভ করে জীবনের উদ্দেশ্য পূ্র্ণ করতে পারি। নইলে মনুষ্য জীবনলাভই ব্যর্থ হয়ে যায়। এখানে শ্রী শ্রী দূর্গাপূজার স্বার্থকতা।

মার্কন্ডেয় পূরাণে আছে, সূরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য দুর্গাপূজা করেছিলেন। সূরথরাজাকে একবার শত্রু সৈন্যরা যুদ্ধে পরাজিত করলো। তিনি নিজের রাজ্যে আছেন। কিন্তু এখানেও তার লোভী, দুষ্ট ও বলবান রাজকর্মচারীরা তার রাজকোষ দখল করলো। সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বও নিজের হাতে নিয়ে নিল। রাজা সূরথ হরিণ শিকার করবার ছলে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে জঙ্গলে চলে এসেছেন। সে বনে বাঘ সিংহ এসব হিংস্র প্রাণীরা  খুব শান্ত স্বভাবের-হিংসা করে না। কারণ সেখানে আছে একটা আশ্রম। আশ্রমে থাকেন এক মুনি ও তার শিষ্যরা। সে মুনির নাম মেধস মুনি। সুরথ রাজাকে মেধস মুনি খুব সমাদর করলেন। রাজা মুনির আশ্রমে কতক্ষণ ঘুরে ঘুরে কাটালেন। তার মন বড় খারাপ। তার দুশ্চিন্তা হলো, তাঁর রাজ্য পূর্বপুরুষরা রক্ষা করেছেন আর তিনি তা পরিত্যাগ করে এসেছেন। দুষ্ট কর্মচারীরা ধর্ম অনুসারে রাজ্য পরিচালনা করছে কিনা...তার প্রিয় মহাবল হস্তীবাহিনী কি ঠিকমতো খাদ্য পাচ্ছে? যেসব কর্মচারী রাজার কাছ থেকে পুরস্কার, ভোজন, বেতন পেয়ে রাজার অনুগত ছিল তারা এখন অন্য রাজার চাকর হয়ে কত কষ্ট পাচ্ছে। অনেক কষ্ট করে রাজকোষে যে ধন তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, তাও তার দুষ্ট কর্মচারীরা দ্রুত শূন্য করে ফেলবে। রাজা এসব অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে ভাবতে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।

এমন সময় রাজা সুরথ আশ্রমের কাছে এক বৈশ্যকে দেখলেন। তিনি হলেন সমাধি বৈশ্য। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? এখানে তিনি কেন এসেছেন? তার মন খারাপ কেন? তিনি শোকগ্রস্ত হলেন কেন? উত্তরে সমাধি বৈশ্য বলেন, তার নাম সমাধি বৈশ্য। তিনি ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। তার স্ত্রী পুত্রগণ অসাধু। তারা তার ধন সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আত্মীয় বন্ধু যারা ছিল তারা কেউ তাঁর কথা জিজ্ঞেসও করেনা। তাই দুঃখিত হয়ে তার বনে চলে আসা। পরিবার পরিজন কেমন আছে এসব চিন্তা করে তার মন খারাপ। কিন্তু যে পরি পরিজনরা তার ধন কেড়ে নিয়ে তাঁকে পরিত্যাগ করেছে, তাদের প্রতি কেন বৈশ্যের স্নেহের উদ্রেগ হচ্ছে, এ প্রশ্নের কোনো সদোত্তর দিতে পারলেন না বৈশ্য। তবু তার মন খারাপ হচ্ছে কেন? তার কেন মমতা হচ্ছে?  কারণ তার আত্মীয়স্বজনকে তিনি শত্রু ভাবতে পারছেন না। যারা তাকে দুঃখ দিয়েছে তাদের প্রতিও তার মন আকৃষ্ট হচ্ছে। কেন এরকম হচ্ছে তা বৈশ্য বুঝেও বুঝতে পারছে না। ভ্রান্তি, মোহ ও আসক্তির জন্য এরকম পৃথিবীর সকলেরই হয়ে থাকে।

রাজা সুরথ আর বৈশ্য সমাধি ভাবলেন, এ বনেই তো মেধস মুনির তপোবন। দুজনই যাওয়া যাক মেধস মুনির কাছে। মুনির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন,আমাদের মন খারাপ হচ্ছে কেন?  রাজা বললেন, রাজ্যহারা হয়ে আমি বনে এসেছি, তবু তাদের কথা মনে করে আমার অশান্তি কেন? আমি রাজ্যহারা হয়েছি তবু সে রাজ্যে আমার রাজ্য আমার শরীরের মত বোধ হয় কেন? এই বৈশ্য আত্মীয়স্বজনরা তাড়িয়ে দিয়েছে,ধন কেড়ে নিয়েছে। তবুও তিনি তাদের ভুলতে পারছেন না কেন?  তাদের প্রতি করুণার ভাব আসছে কেন? আমাদের এই মোহ হচ্ছে কেন? তখন মেধা মুনি বলেন, এর কারণ হলেন মহামায়া।

প্রাণীরা দিয়ে দৃশ্য দেখে, কান দিয়ে শব্দ শোনে,নাক দিয়ে ঘ্রান নেয়,জীভ দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে আর চামড়া দিয়ে ইত্যাদি স্পর্শ করতে পারে। কাকতো রাতে দেখেনা, দিনে দেখে।কিন্তু পেঁচা আবার রাতে দেখে, দিনে দেখেনা । কেচো দিনেও দেখেনা, রাতেও দেখেনা, বিড়াল আবার রাতেও দেখে দিনেও দেখে। মানুষেরই কেবল রুপ, রস, গন্ধ,শব্দ, স্পর্শ সম্পর্কে জ্ঞান আছে তা নয়,পশু,পাখি হরিণ,মাছ ইত্যাদি প্রানীরও বিষয়জ্ঞান আছে। খাওয়ার ব্যপারে, ঘুমানোর ব্যাপারে মানুষ ও পশু প্রায় একি রকম। আর একটা দেখার জিনিস এই যে,পাখিরা জানে যে বাচ্চারা খেলে নিজের পেট ভরবে না তবুও নিজেরা না, খেয়ে বাচ্চার জন্য মুখে করে খাবার নিয়ে আসে।বাচ্চাদের  কতো স্নেহ দিয়ে রক্ষা করে। মানুষও উপকার পাবার আসায়, ছেলে বড় হয়ে আমাদের দেখবে,এই মনে করেই সন্তানের প্রতি আসক্ত হয়।

তবুও মানুষ মহামায়ার প্রভাবে ভ্রমে পরে,আর আমার আমার করে কষ্ট পায়,এই মোহ এবং মমতাই সংসারের জাল।এই মহামায়া জগৎপতি বিষ্ঞুর যোগনিদ্রা। এই শক্তি জগতের সকল মোহকে আচ্ছন্ন করে রেখে আসল ব্যাপারটা দেখতে দেয়না। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই,জগত মানেই এই মোহের খেলা। বুদ্ধিমান দিগের মনও মহামায়া মোহযুক্ত করে ফেলেন। এই সমস্ত প্রাণী,বস্তু তিনি সৃষ্টি করেন। তিনি খুশি হলো মানুষকে এই মোহ ও মমতার বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে পারেন। যে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে সকলেই মুক্ত হতে পারে, সেই ব্রহ্মজ্ঞান তিনিই। আবার সংসারের বন্ধনের কারণে যে অবিদ্যা বা অজ্ঞান তাও তিনি।

রাজা সুরথ জিজ্ঞেস করলেন,যাকে আপনি মহামায়া বলছেন তিনি কে?তিনি কিরূপে কোথা হতে উৎপন্ন হয়।মেধা ঋষি বলেন,এই মহামায়ার উৎপত্তি ও নেই,বিকাশও নেই।এইযে জগতের সবকিছু,সবই তার বিরাট শরীর।দেবগণের কার্যসিদ্ধির জন্য তিনি আবির্ভূতা হন।সুতরাং মানুষ যে শোক, মোহ নিয়ে সংসারে কষ্ট পাচ্ছে,তার থেকে মুক্তি লাভের জন্য এই মহামায়ার শরণ নিতে হবে। শক্তিকে ধরেই শক্তিমানকে জানতে হবে।আগুন আর তার পুড়িয়ে ফেলার ধরণ যেমন অভিন্ন,সেরকম ইশ্বর আর তার সৃষ্টি-স্থিতি, প্রলয়ের শক্তি অভিন্ন।সৃষ্টি,স্থিতি আর প্রলয়ের শক্তি না থাকলে তাকে ঈশ্বরই বলা যাবেনা।দুর্গাপুজা তাই ভগবানের সৃষ্ট দেবতার আরাধনা নয়,মাতৃভাবে ঈশ্বরেরই আরাধনা।

দূর্গাতিনাশিনী দূর্গার পুজা তাই মাহাত্ন্যপুর্ণ।দেবতা আর অসুরের সংগ্রাম।মহাকাব্যে মহাকবি এই দ্বন্দ্ব বর্ণনা করেছেন।দেবতা ও অসুরদের সংগ্রামে দেবতাদের সবসময় জয় হয়,কারণ তারা ভগবানের শরণাপন্ন হয়েছেন।অসুরেরা অসুতে রত,মানে ইন্দ্রীয়পরায়ণ।দেবতারা ভোগের দেশের অধিবাসী।সে দেবতারাও স্বর্গভ্রষ্ট।স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে মহিষাসুর স্বর্গের রাজা হয়ে বসেছেন।দেবতাদের অধিকার হরণ করেছে।এই দুর্গাপূজা করে,দুর্গা দেবীকে সন্তুষ্ট করে দেবতারা মহিষাসুরের থেকে স্বর্গরাজ্য এবং তাদের অধিকার ফিরে পেলেন।রামচন্দ্রের রাবণের সাথে যুদ্ধে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আরাধনা করেন।অর্জুনের সঙ্গে যুদে্ধ শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধ জয়ের জন্য অর্জুনকে দুর্গান্তব করতে বলেছিলেন।

 

এই পূজা করে রাজা সুরথ তার রাজ্য ফিরে পেয়েছেন। আবার সমাধি বৈশ্য সমস্ত মোহ আর মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম আনন্দ অনুভব করলেন। আর তার সংসারের দুঃখে জন্মগ্রহণ করতে হবেনা । তিনি মুক্তিলাভ করলেন। প্রাচীনকালে যেমন সত্য ছিল বর্তমানকালেও তাই। বর্তমানেও মানুষ ধন-পুত্র, যশ-রূপ, জয় ইত্যাদি লাভের জন্য দুর্গাপূজা করে থাকে। ভক্তি ও মুক্তিলাভের জন্য মহামায়ার পুজা করে ধন্য হয়।

আমরাও দুর্গা দেবীকে প্রণাম জানাই---

যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেন সংস্তিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ

--যে দেবী সকল প্রাণীতে শান্তিরূপে বিরাজিতা, তাঁকে কায়-মন বাক্যে প্রণাম জানাই।

আমরা তাঁর শরণাগত: সর্বস্বরূপে সর্বেশে সর্বশক্তিসমান্বিতে। ভয়েভ্যস্ত্রাহি নো দেবী দূর্গে দেবী নমোহস্ত তে।।

-হে দেবী, আপনি সর্বরূপিনী সর্বেশ্বরী, সর্বশক্তিময়ী। আপনি আমাদের সকল আপদ থেকে রক্ষা করুন। হে নারায়ণী আপনাকে প্রণাম।

আরকে//