ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

তাযকিয়াতুন নাফস-এর গুরুত্ব

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:২৯, ১০ এপ্রিল ২০২০

Ekushey Television Ltd.

দেহের রয়েছে দুটি অবস্থা: সুস্থতা ও অসুস্থতা। ঠিক তেমনি আত্মারও রয়েছে সুস্থতা ও অসুস্থতা। দেহ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তুলতে হয়, তেমনি আত্মা রোগাক্রান্ত হলে তাকে সুস্থ বা পরিশুদ্ধ করে তুলতে হয়।

মহান আল্লাহ বলেন:
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا قَدْأَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا

আর শপথ নাফসের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর অবশ্যই সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজকে কলুষিত করবে। (আশ-শামস ৯১/৭-১০)

এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য প্রথমে জ্ঞানের প্রয়োজন আর মানুষকে দুই রকম জ্ঞান দেয়া হয়েছে।
১। অসৎকর্মের জ্ঞান
২। সৎকর্মের জ্ঞান।

এই আয়াতের আলোকে পরিশুদ্ধির বিষয়টি দুইভাবে ব্যাখ্যা দেয়া যায়ঃ
১. নঞর্থক: যা আখলাকে সায়্যিয়াহ বা মন্দ চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যাবতীয় পাপ, অন্যায় ও অপবিত্র কাজ থেকে মুক্ত হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় অসৎ গুণাবলী বর্জন করা। যেমন: শিরক, রিয়া, অহংকার, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, হিংসা, ঘৃণা, কৃপণতা, ক্রোধ, গীবত, পরনিন্দা, চোগলখুরি, কুধারণা, দুনিয়ার প্রতি মোহ, আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া, জীবনের প্রতি অসচেতনতা, অর্থহীন কাজ করা, অনধিকার চর্চা প্রভৃতি হতে নিজেকে এবং দেহ ও আত্মা মুক্ত করা। আত্মা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয় যখন সে তাকে পাপাচার ও সীমালংঘনের দিকে আহবান করে। কেননা এই অপরিশুদ্ধ, পাপাচারী, ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

মহান আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালাম কে নির্দেশ দিয়েছিলেন;
اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ فَقُلْ هَلْ لَكَ إِلَىٰ أَنْ تَزَكَّىٰ وَأَهْدِيَكَ إِلَىٰ رَبِّكَ فَتَخْشَىٰ

‘তুমি ফির‘আউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করেছে’। অতঃপর তাকে বল ‘তোমার কি ইচ্ছা আছে যে, তুমি পবিত্র হবে’? ‘আর আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাব, যাতে তুমি তাঁকে ভয় কর?’ আন-নাযিআত, ৭৯/১৭-১৯

২. সদর্থক: যা আখলাকে হাসানা বা সচ্চরিত্র-এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। উত্তম গুণাবলী দ্বারা আত্মার উন্নতি সাধন করা অর্থাৎ প্রশংসনীয় গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে পরিত্যাগকৃত অসৎ গুণাবলীর শূন্যস্থান পূরণ করা। সৎ গুণাবলী হল তাওহীদ, ইখলাছ, ধৈর্যশীলতা, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, তওবা, শুকর বা কৃতজ্ঞতা, আল্লাহভীতি, আশাবাদিতা, লজ্জাশীলতা, বিনয়-নম্রতা, মানুষের সাথে উত্তম আচরণ প্রদর্শন, পরস্পরকে শ্রদ্ধা ও স্নেহ, মানুষের প্রতি দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ, পরোপকার প্রভৃতির মাধ্যমে সর্বোত্তম চরিত্র অর্জন করা।

সহীহ হাদীসে এসেছে;
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَىُّ النَّاسِ أَفْضَلُ قَالَ ‏"‏ كُلُّ مَخْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ ‏"‏ ‏.‏ قَالُوا صَدُوقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا مَخْمُومُ الْقَلْبِ قَالَ ‏"‏ هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لاَ إِثْمَ فِيهِ وَلاَ بَغْىَ وَلاَ غِلَّ وَلاَ حَسَدَ ‏"‏

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হলো, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তারা বলেন, সত্যভাষীকে তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেনঃ সে হলো পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার নাই কোন পাপাচার এবং নাই কোন দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা। (ইবনে মাজাহ হা/৪২১৬, সনদ ছহীহ)
আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আ করতেন।

যাযিদ ইবনু আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের কাছে তেমনই বলবো যেমন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলতেন? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলতেনঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلاَهَا اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, অক্ষমতা, অলসতা, কাপূরষতা, কৃপণতা, বার্ধক্য এবং কবরের আযাব থেকে। হে আল্লাহ! তুমি আমার নফসে (অন্তরে) তাকওয়া দান কর এবং একে পরিশুদ্ধ করে দাও। তুমি সর্বোত্তম পরিশোধনকারী, মালিক ও আশ্রয়স্হল। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই অনুপোকারী ইলম থেকে ও ভয় ভীতিহীন কলব থেকে; অতৃপ্ত নফসের অনিষ্ট থেকে ও এমন দু‘আ থেকে যা কবুল হয় না। সহিহ মুসলিম: ৬৭৯৯
অন্তর যদি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়, তাহলে মানবদেহের বহ্যিক কার্যক্রমও পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও কল্যাণকর হয়। আর যদি অন্তর অপবিত্র ও কলুষিত থাকে, তাহলে মানুষের বহ্যিক আচার-আচরণসহ তার সকল কার্যাবলি অপরিচ্ছন্নতা ও অকল্যাণের কালো ছায়া পাওয়া যায়। নাফ্সের পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির ঈমান, আমল ও আখলাক পরিশুদ্ধ হয়।

আল্লাহ বলেনঃ
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

নিশ্চয়ই সে সাফল্য লাভ করবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধি করবে, আর তার রবের নাম স্মরণ করবে, অতঃপর সালাত আদায় করবে। বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ পরকালের জীবন সর্বোত্তম ও স্থায়ী। (আল-আলা, ৮৭/১৪-১৭)

এই আয়াত থেকে বুঝা যায় নিজেকে পরিশুদ্ধির জন্য তিনটি বিষয়ের প্রয়োজন ১) আল্লাহকে অধিক স্মরণ করা ২) সালাত আদায় করা ৩) পরকালকে প্রাধান্য দেয়া ও দুনিয়ার জীবনকে তুচছ মনে করা।

দেহের ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে মুমিন হতে হবে। আল্লাহ বলেন;
وَمَنْ يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَٰئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَىٰ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ جَزَاءُ مَنْ تَزَكَّىٰ

আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে স্থায়ী হবে আর এটা হল তাদের পুরষ্কার যারা পরিশুদ্ধ হয়। (ত্ব-হা, ২০/৭৫-৭৬)

এই আয়াত থেকে বুঝা যায় ব্যক্তির পরিশুদ্ধ করার জন্য প্রথমে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে তারপর সৎকর্ম করতে হবে তাহলে ব্যক্তির পরিশুদ্ধতা সাফল্য লাভ করবে। আর ঈমান বিষয়টি অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। আর মানবদেহ পরিচালিত হয় তার কল্বের মাধ্যমে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

لاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ‏.‏ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ ‏

জেনে রাখো, দেহের মধ্যে এক টুকরা গোশত আছে। যখন তা সুস্হ থাকে তখন সমস্ত শরীরই সুস্হ থাকে। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন সমস্ত শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। স্মরণ রেখো, তা হল কালব বা অন্তর। সহীহুল বুখারী: ৫২, সহিহ মুসলিম: ৩৯৮৬
এসএ/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি