ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

স্বাধীনতাসংগ্রামে সংস্কৃতিচর্চার ভূমিকা

প্রকাশিত : ১০:৫৮, ২৬ মার্চ ২০১৯

Ekushey Television Ltd.

জাতিরাষ্ট্র গঠনে সংস্কৃতিচর্চার ভূমিকা

১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। অবশ্য এ অঞ্চলে পাহাড়ি ও সমতলের প্রায় অর্ধশত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করে; সেটি অস্বীকার করা অনুচিত। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরাই জাতীয় নিপীড়নের শিকার হয়। ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। হাজার মাইলের ভারতীয় ভূখণ্ডের ব্যবধানে ভিন্নতর ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বিকাশের তারতম্য নিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন সৃষ্টি এই উদ্ভট দেশ। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তাই অভিন্ন ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো মিলনসূত্র ছিল না। কেউ বিতর্ক তুলতে পারে যে অন্যান্য বহুজাতিক রাষ্ট্রের মতো বিকশিত গণতন্ত্র এবং প্রদেশগুলোকে অধিকতর ক্ষমতা প্রদান করে ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে এই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারত। তবে সে পথেও পাকিস্তানের শাসকরা অগ্রসর হয়নি। ১৯৫৬ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে শাসনতন্ত্র রচিত হয়েছিল, তবে সেটিও স্থায়ী হয়নি। ১৯৫৮ সালে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে সামরিক শাসন জারি করা হয়। সর্বোপরি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়। এটি হয়ে ওঠে প্রায় ঔপনিবেশিক শাসনের নামান্তর। শুধু বাঙালি নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠানরাও এ ধরনের শাসন অনুভব করে।

স্বভাবত এই অপশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর আন্দোলন ছিল মূলত গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারের ২১ দফায় স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়টি প্রাধান্য পায়, ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনেও সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন প্রধান দাবি ছিল। ১৯৬৬ সালে বাঙালি জনগণের আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও ছয় দফার সঙ্গে শিক্ষাবিষয়ক দাবি সমন্বিত করে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। জন্ম হয় ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের। এই গণরোষের মুখে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথমবারের মতো সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু ছয় দফাকে বাঙালির মুক্তির সনদ আখ্যায়িত করে জনগণের ম্যান্ডেট প্রত্যাশা করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের রায়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই গণরায় উপেক্ষা করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সামরিক সরকার গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ মধ্যরাতে জাতির জনক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আর এই পটভূমিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় সূচিত হয়।

বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন পর্বে এশিয়া-আফ্রিকার বহু দেশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত হয়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে এবং মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধা ও অবরুদ্ধ দেশবাসী জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।

২.

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে সংস্কৃতিচর্চার ভূমিকা বিবেচনা করা যেতে পারে। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর থেকে রাষ্ট্রের ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার জন্য শাসকরা মৌলিক নীতি ও কৌশল গ্রহণ করে। বিশ্বজুড়ে প্রত্যেক মানুষ একাধিক পরিচয় বহন করে। প্রতিজনের রয়েছে অন্তত ধর্ম পরিচয়, জাতি পরিচয় ও রাষ্ট্র পরিচয়। পাকিস্তানের শাসকরা জাতিগত নিপীড়নের কৌশল হিসেবে জাতি পরিচয় উপেক্ষা করে আমাদের শুধু ধর্ম পরিচয়ে পরিচিত করতে অপপ্রয়াস চালায়। আর এ জন্য প্রথম আঘাতটি আসে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দীক্ষিত করা হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যথেষ্ট মুসলমান নয় এবং হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের প্রচারণা ও হিন্দুদের প্রভাবে তারা ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। আর বাংলার মানুষ তার ধর্মবিশ্বাস অক্ষুণ্ন রেখে জাতি পরিচয়ে ধন্য হয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র গঠন করে। যেহেতু সংস্কৃতি জাতি পরিচয়ের অন্যতম প্রধান নির্ধারক, তাই মূলত সংগ্রামটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হলেও সর্বজনের চিন্তাধারায় সংস্কৃতিচর্চা তাৎপর্যপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

সাধারণভাবে সংস্কৃতি বলতে নিছক গান-বাজনা বোঝায় না। সংস্কৃতি একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। তার ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভূ-প্রকৃতিসহ নানা যৌক্তিক ও অযৌক্তিক উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে কোনো জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে। ধর্ম তার একটি উপাদান বটে, কিন্তু সমগ্র নয়। এই বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটে তার জীবনাচারে, পোশাকে, এমনকি খাদ্যাভ্যাসে, আর তার প্রকাশ পায় শিল্পকলার নানা মাধ্যমে—সংগীতে, নৃত্যে, চারুকলায়, কিছুটা সাহিত্যে। সংস্কৃতি বহিস্থ উপাদান গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। পাকিস্তান আমলে শাসকরা রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় সমন্বয়ের নামে ধর্মভিত্তিক আরোপিত সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সে জন্য তারা রোমান হরফে বাংলা ভাষা প্রবর্তন, রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসন এবং নজরুলকে খণ্ডিতরূপে প্রকাশের প্রয়াস গ্রহণ করে, শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকীকরণেরও অপপ্রয়াস গ্রহণ করা হয়।

অথচ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি উদার, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী। বাংলায় হিন্দু সেন ও গুপ্ত, বৌদ্ধ পাল, মুসলমান পাঠান ও মোগল এবং খ্রিস্টান ব্রিটিশরা রাজত্ব করেছে। তবে লক্ষণীয়, গ্রামীণ সমাজকে রাজধর্মের চেয়ে লোকগীতিকারদের বহুত্ববাদী ও জীবনবাদী উচ্চারণ অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের অমর সৃষ্টি।

সুতরাং বায়ান্ন থেকেই এ দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলার সংস্কৃতিকে নির্বিঘ্ন করতে রাজনৈতিক সংগ্রামের সমান্তরালভাবে সংস্কৃতি সাধনার মধ্য দিয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করে বাঙালিকে মোহমুক্ত করার কাজে অগ্রসর হয়েছেন। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ নিজেকে বাঙালি বলে শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; আমাদের আত্মপরিচয়ের যে সংকট সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলেছে, তা বহুলাংশে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।

পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরে ১৯৪৮ সালে আর্ট কলেজ স্থাপন এবং ১৯৫৫ সালে বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে নৃত্যকলাসংবলিত বাফার সৃষ্টি সে সময়ের সম্ভবত সর্বাধিক দুঃসাহসী কাজ ছিল। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনাক্রম যথেষ্ট সাযুজ্যপূর্ণ। ১৯৬১ সালে সব প্রতিকূলতার মুখে সাড়ম্বরে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে, ১৯৬২ সালে সূচিত হয়েছে ছাত্রদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। ১৯৬১ সালেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছায়ানট। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলন শুরু করেছেন; ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের প্রথম পহেলা বৈশাখের আয়োজন। ছয় দফাকে কেন্দ্র করে যখন গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তখন বটমূলের আয়োজন প্রকৃত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, মাঠে দর্শকদের স্থানাভাব ঘটেছে। ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রীয় তথ্যমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছে, অনুষ্ঠিত হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে তিন দিনব্যাপী সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান। ১৯৬২ থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠান, যেখানে পরিবেশিত হয়েছে দেশাত্মবোধক রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীত; লোকগীতি ও গণসংগীত। পরিচালনা ও সংগীত পরিবেশন করেছেন আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, আব্দুল লতিফ, ফাহমিদা খাতুনের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরা। আজ যাঁরা চিত্রকলাজগেক আলোকিত করে রয়েছেন, তাঁদের অনেকে পটুয়া কামরুল হাসান ও ইমদাদ হোসেনের নেতৃত্বে পোস্টার লিখেছেন, শহীদ মিনারের অঙ্গসজ্জা করেছেন। সত্তরের নির্বাচনে শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। সত্তরের ঘূর্ণিঝড় কবলিত দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপগুলোতে দুর্যোগ নিরোধ আন্দোলন কমিটির সূত্রে কামরুল হাসান, ওয়াহিদুল হক, আতিকুল ইসলাম ও সৈয়দ হাসান ইমামের নেতৃত্বে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া গেছে। জহির রায়হান প্রতীকী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্মাণ করেছেন। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিক্ষুব্ধ শিল্পীগোষ্ঠী সভা-সমাবেশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধকালেও তাঁরা মুক্তিসংগ্রামী শিল্পীগোষ্ঠী গঠন করে শরণার্থীশিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
আজ স্বাধীনতা দিবসে যেসব শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী বাঙালির জাতিরাষ্ট্র গঠনের মৌলিক কাজটিকে অগ্রসর করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক : নির্বাহী সভাপতি, ছায়ানট

এসএ/

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি