ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:৪৩:৫৬, বৃহস্পতিবার

বল্টু_সমাচার_৯

বল্টু_সমাচার_৯

কাজি সাহেবের অফিসের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে বল্টু এবং তার দুই বন্ধু। বিকেল চারটায় আসার কথা জরিনার। পাঁচটা প্রায় বেজে গেছে। কোন খবর নাই। মোবাইলে কল হচ্ছে। ধরছে না। এমন দিনেও ভেজাল করবে নাকি! বল্টু ভীষণ অস্থিরতায় ভুগছে। গতকাল বিস্তারিত আলোচনা করে সব ঠিক করা হয়েছে।   চারটায় এসে পাঁচটার মধ্যে বিয়ের কাজ শেষ করে সোজা বাসায়। সাক্ষী লাগবে দুজন। সেটাও ম্যানেজ করা হয়েছে। দুই বন্ধু স্বাক্ষী দেবে। দুজনেই চলে এসেছে। এখন পাত্রীর খবর নাই। কাজি সাহেব এরিমধ্যে তিনবার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। দেরি করলে জরিমানা নিয়ে বিদায়। সর্বনাশের আর কি বাকি থাকবে! কতো পটিয়ে পটিয়ে জরিনাকে বিয়ের জন্য রাজি করানো গেছে।   বন্ধু দুজনও দেরি দেখে রেগে যাচ্ছে। একজন তো বলেই ফেললো, : আর আসছে তোমার জরিনা! বিয়ের কাজ মানে হলো আগুন নিয়ে খেলা। এই খেলায় পেট্রোল ঢালতে হয়। তুমি তো কিছুই ঢালতে পারলা না। হবে কেমনে? দ্বিতীয় বন্ধু বললো, : পেট্রোল লাগবে না। কেরোসিন ঢেলে দিলেও হতো। প্রথমজন বলে উঠলো, : তোমাকে আর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সাজতে হবে না! যেই মেয়ে ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করে না, সে কি আর আসবে?   ওদের এসব কথাবার্তা শুনে বল্টুর অবস্থা কাহিল। এরকম ফচকে একটা মেয়ের কথা বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। বল্টু ভাবছে, : কখনো যদি ক্ষমতা পাই, নারী স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে দেবো! পুরুষ শুধু অর্ডার করবে। আর মেয়েরা ওই অর্ডার পালন করবে। নো হাঙ্কিবাঙ্কি! এমন সময় দেখা গেল, জরিনাকে নিয়ে একটা রিকশা এসে থামলো। বল্টুর মুখে হাসি। বিজয়ের হাসি।   বিয়ের ঝামেলা শেষ। সবাই মিলে একটা রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা জমালো। খাওয়া-দাওয়া শেষে বল্টু আর জরিনা একটা রিকশায় করে সোজা বাসায়। বুদ্ধি করে খাট ফাট আগেই গুছিয়ে গেছে বল্টু। আফটার অল বিয়েটা ফাইনাল। বাসর ঘরের মিনিমাম মর্যাদা তো রাখা চাই!   দুজনে প্রথমে ড্রইং রুমে সোফায় বসলো। বল্টুর কেন যেন খুব লজ্জা লাগছে। মুখ ফুটে বাসর ঘরে যাবার কথা বলাটা মুশকিল হয়ে গেল। এক্ষেত্রে জরিনার লজ্জা পাবার কথা। কিন্তু ওকে খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। এতো দিন পরে জরিনাকে নিজের করে পেয়েছে। প্রথম থেকেই টাইট দিয়ে রাখতে হবে। বল্টু একটু গম্ভীর গলায় বললো, : খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে! কিচেনে সবই রাখা আছে। চট করে দুকাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসো! একসাথে বসে খাই। বিকেল থেকে যা ধকল গেল! জরিনা খুবই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, : ভাইয়া, আমি এসব কিচেন ফিচেনের কোন কাজে নেই। এমনিতেই আমার স্কিনটা একটু ডার্ক টোন মারে। মা খুব কড়াভাবে নিষেধ করেছে কিচেনে যেতে। স্কিন নাকি নষ্ট হয়ে যাবে! একটু আদুরে গলায় যোগ করলো, আপনিই কষ্ট করে চা টা বানিয়ে ফেলুন না প্লীজ! একসাথেই খাবো।   স্তব্ধ হয়ে গেল বল্টু। এরকম বেয়াদবির কারণে বল্টুর রেগে যাবার কথা। তার বদলে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো, : এখনও তুমি আমাকে ভাইয়া বলে ডাকছো? এটা কি মশকরা করার টাইম? জরিনা খুবই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, : কেন? বিয়ে করলে কি ভাইয়া ডাকা যায় না? ডাকলে ক্ষতি কি? আমার ইচ্ছা! আমি ভাইয়া বলেই ডাকবো!   কি আশ্চর্য! কথাগুলো বলে আবার খিলখিল করে হাসছে! বল্টু এবার ভয়ংকর রেগে গেল। রীতিমতো থাপড়াতে ইচ্ছে করছে জরিনাকে। কাছে গেল প্রচণ্ড জোরে একটা চড় কষাবে বলে। কিন্তু হাত কিছুতেই ওপরে তুলতে পারছে না। হাত তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।   পরদিন অফিসে লাঞ্চ ব্রেকের সময় বল্টু জরিনাকে ফোন করলো। তার জানা আছে, মেয়েরা স্বপ্নের কথা শুনতে পছন্দ করে। তার উপর, স্বপ্নের লিডিং ক্যারেক্টার যদি নিজে হয়। জরিনা রিসিভ করতেই বলে উঠলো, : খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা কথা বলার জন্য কল দিয়েছি। শর্টকাট কথা। ধৈর্য ধরে শোন! জরিনা বললো, : শর্টকাট কথা শোনার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে কেন? যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। জরিনার জবাব দেবার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো আছে। গাঢ় স্বরে বল্টু বললো, : জানো...গতরাতে তোমাকে নিয়ে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখেছি জরিনা। আমার জীবনের সেরা স্বপ্ন। দেখলাম কাজি অফিসে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আর... জরিনা একটু কঠিন গলায় বললো, : বল্টু ভাইয়া, কি যে ঝামেলা করেন! এগুলো বলার আর টাইম পেলেন না! বাসায় মেহমান এসেছে। খুবই ব্যস্ত আছি। তাছাড়া এসব বিয়ে টিয়ের গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে না। বলেই কোনরকম বিদায় না নিয়ে লাইনটা কেটে দিল। বল্টু জাস্ট বোবা হয়ে গেল।   জরিনাদের অবজ্ঞায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।
বল্টু_সমাচার_৮

বেশ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকাটা বেশ খোলামেলা। তাই বাতাসের তোড়ে সব কিছুই মনে হলো উড়ে যাচ্ছে। জরিনা তার শাড়ি সামলাতে ব্যস্ত। মোবাইল গুঁতোতে গুঁতোতে একটু উৎকণ্ঠিত স্বরে বল্টু জরিনাকে বললো, : ওয়েদারের ভাবসাব দেখে এই এলাকার সব উবার বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়। চলো, আমরা একটা সিএনজি ঠিক করি! জরিনা একটু রাগত স্বরে বললো, : আমি আগেই নিষেধ করেছিলাম! আকাশ কাল হয়ে আসছিলো। দরকার হলে আরেকদিন ছবি তোলা যাবে। কোন কথাই শুনলেন না। অযথাই কষ্ট করে এতো দূর আসলাম। ধ্যাত! বল্টুর সব প্ল্যান মাঠে মারা গেছে! অপরাধী চেহারা নিয়ে একটা সিএনজির দিকে এগিয়ে গেল। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা ক্যামেরা কিনেছে বল্টু। দাম একটু বেশিই পড়েছে। নগদ বায়ান্ন হাজার চলে গেল। ডিজিটাল ভার্সনের ক্যামেরা। অটো অপশনে ছবি তোলার সহজ ব্যবস্থা আছে। শাটার স্পিড, অ্যাপারচার এসব নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামালেও চলবে। উদ্দেশ্য, জরিনাকে নিয়ে নানা জায়গায় ছবি তুলতে যাবে। ছবি তোলা হবে। একসঙ্গে ঘোরাঘুরির সুযোগও পাওয়া যাবে। তার জানা আছে, মেয়েরা ছবি তোলার সুযোগ পেলে পাগল হয়ে যায়। এক ঢিলে দুই পাখি। কিন্তু প্রথম দিনেই বৃষ্টি সব গুবলেট করে দিলো। অনেক পটিয়ে জরিনাকে রাজী করিয়ে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে এসেছে। এটা প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য মোটামুটি রেজিস্ট্রার্ড জায়গা। জরিনা কিছুতেই আসবে না। ক্যামেরা আর ছবি তোলার কথা বলে কনভিন্স করা গেছে। শেষ পর্যন্ত, মেকআপ নিয়ে সুন্দর একটা লাল রঙা শাড়ি পরেছে। তারপর উবারে চড়ে এখানে আসা। বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্ট সফল। সিএনজিতে উঠে বসতে না বসতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। চিকন রডের খাঁচার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে, জরিনার বাঁ পাশটা প্রায় ভিজেই গেল বোধ হয়। বল্টু তার বাম হাতটা ওর কাঁধের ওপর দিয়ে কোমরের উপর রাখলো। এক ঝটকায় জরিনা বল্টুর হাতটা সরিয়ে দিল। ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলো, : এসব কি ভাইয়া! সরে বসেন তো! এরকম করলে কিন্তু আমি নেমে যাবো! বল্টু সাথে সাথেই হাত সরিয়ে নিয়ে একটু সরে বসলো। সিএনজি চালক ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দেখার চেষ্টা করছে। বল্টুর মাথা ঘুরছে। জরিনার কাছ থেকে এতোটা তীব্র প্রতিক্রিয়া আশা করেনি সে। বমি বমি ভাব হচ্ছে। কোন রকমে বললো, : আরে ধুর বোকা মেয়ে! তুমিতো ভিজে যাচ্ছিলে। আমি ওটাই বুঝতে চাচ্ছিলাম। : এটা বোঝার জন্য এরকম করতে হবে! বুঝে কি করবেন আপনি? বৃষ্টি ঠেকিয়ে দেবেন? আমি কিন্তু এরকম গা ঘেঁষাঘেঁষি একদম পছন্দ করি না! জরিনার কথাগুলো শুনে বল্টু একদম ঠাণ্ডা মেরে গেল। ভেতরে ভেতরে খুব রাগ হচ্ছে। ভাবছে, : ক্লাসমেটদের সঙ্গে যখন মটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াস, তখন গা ঘেঁষাঘেঁষি হয় না! কোমর জড়িয়ে ধরে বসে থাকিস। এসব ভাব তখন কোথায় থাকে! বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্টই লস! পরিস্থিতি ম্যানেজ করার জন্য বল্টু ড্রাইভারকে একটু ধমকের সুরে বললো, : এই ড্রাইভার! পর্দা কোথায়? পর্দা থাকলেতো বৃষ্টিতে ভিজতে হতো না! চালাতে চালাতেই ড্রাইভার জবাব দিলো, : আপনের মতো প্যাসেঞ্জাররাই পর্দা ছিঁড়া ফালাইছে। লাগানের টাইম পাই নাই। এহন চুপ কইরা বইসা থাকেন! তার কথা বলার ভঙ্গিতে বল্টু রেগে গেল। বললো, : ফাইজলামির জায়গা পাও না! এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো! ভাড়া পাবে অর্ধেক! ঘ্যাচ করে ব্রেক কষার শব্দ। সিএনজি থেমে গেল। বিশাল দেহের ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে বল্টুর দিকে তাকিয়ে বললো, : নামেন! আইসা চড় দেন! গাড়ি আর যাইবো না! আতংকে বল্টুর গলা শুকিয়ে গেল। জরিনা বল্টুর হাত চেপে ধরলো। ফিসফিসিয়ে বললো, : একদম চুপ করে থাকেন! ব্যাটার সাইজ দেখেছেন! আপনি ছোটখাটো মানুষ। কি দরকার, ঝামেলা করার? জরিনা একটু অনুনয়ের সুরে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললো, : মামা, প্লীজ, গাড়ি চালানতো! বৃষ্টির মধ্যে কোথায় নামবো? কি জানি, কি মনে করে ড্রাইভার আবার তার সিটে এসে বসলো। বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। সিএনজি চলছে। বল্টু একটু অভিমানের সুরে জরিনাকে বললো, : আমাকে ছোটখাটো বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছো? আগেও দেখেছি, সুযোগ পেলেই তুমি আমার হাইট নিয়ে অ্যাটাক করো! জরিনা এবার বিব্রত। নরম কণ্ঠে বললো, : হাইট নিয়ে আপনার এতো কমপ্লেক্স কেন ভাইয়া! নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাইট কতো ছিলো? ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা, ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারের হাইট কতো? তারা যদি বিশ্ব শাসন করতে পারে, আপনি খাটো কিসে! শুনে মন ভালো হয়ে যাবার কথা। কিন্তু কাজ হলো না। বল্টু্র মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। ভাবলো, : আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পৃথিবীর সব বাটুলদের নাম মুখস্থ করে রেখেছিস! আমার বোঝাবুঝি শেষ! এখন থেকে আমিও নিজেকে গুটিয়ে নেবো! কিন্তু ক্ষোভে দুঃখে কিছুই বলতে পারলো না। নামার সময় সিএনজি চালক উপদেশের সুরে বললো, : আফায় ঠিক কইছে! এহন থাইক্যা নিজের সাইজ বুইজ্যা চইলেন! বল্টু্ পাথর হয়ে গেল। জরিনাদের কাণ্ড-জ্ঞানহীন কথাবার্তায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

বল্টু_সমাচার ৭

একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় বসে অপেক্ষা করছে বল্টু। সংসদ ভবনের রাস্তাটার দুই পাশেই সারি সারি কৃষ্ণচূড়া। বসন্তের এই সময়টায় ফুলের কারনে গাছগুলো লাল হয়ে আছে। চমৎকার একটা রোমান্টিক পরিবেশ। ইচ্ছে করেই আজকে এখানে আসতে বলেছে জরিনাকে। ভাইয়া ভাইয়া ডাকের বদলে বল্টু বল্টু করার একটা চেষ্টা। কেবলমাত্র ভাই মনে করলে নিশ্চয়ই এখানে আসতে রাজি হতো না জরিনা। এটা হলো প্রেমিক প্রেমিকাদের স্বর্গরাজ্য। ভাই বোন এখানে অ্যালাউড না। রাজি হওয়া মাত্রই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বল্টু। সে জানে, `ওয়েল বিগান ইজ হাফ ডান`। একটা রিকশায় করে এসে নামছে জরিনা। হালকা গোলাপি রঙের একটা ফতুয়া আর কালো টাইটস পড়েছে। ছিপছিপে গড়নের কারনে বেশ মানিয়েছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বল্টু। ভাড়া দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিলো জরিনা। গম্ভীর মুখে এসে বল্টুর পাশে বসে পড়লো। বিষন্ন দৃষ্টি সামনের লেকের দিকে। কিন্তু এটাতো গম্ভীর থাকার জায়গা না। বল্টু সাবধানে জিজ্ঞেস করলো, : কি হয়েছে? বাসায় কোন সমস্যা? চাইলে আমাকে বলতে পারো! জরিনা ধীরে ধীরে মাথাটা তুললো। বল্টুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললো, : চাইবো না কেন? আপনাকেই তো বলবো। নাকি আরও কেউ আছে এখানে? বল্টু ভয়ানক বিব্রত হয়ে গেল। বললো, : না না। বলো, প্লীজ...! জরিনা বলতে শুরু করলো, : আমার ছোট বোন রুবিনা ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় ফেইল করেছে। লেখাপড়ায় এমনিতে খুবই ভালো! ইন্টারে রেজাল্টও বেশ ভালো। ইংলিশ এ পড়বে বলে আশা ছিলো। এখনতো সবই গুবলেট হয়ে গেল। বল্টু খানিকটা অভিমানহত কন্ঠে বললো, : এগুলো আমাকে আগে বলতে পারো না? ভর্তির ব্যাপার স্যাপার আগেই বলতে হয়। সময়মতো দুএকটা জায়গায় গুঁতো দিলেই কেস ফিট! : বল্টু ভাই, এটা কি ধরনের কথাবার্তা! ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গুঁতোগুতি করলেই ভর্তি হওয়া যায়? জরিনার কন্ঠস্বরে চরম বিরক্তি। বল্টু আবারও বিব্রত হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বললো, : তা না। তবে আগে বললে একটা ব্যবস্থা করা যেতো। আমার এক কলিগের মামা একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। দরকার হলে ওনাকে বলতাম! জরিনা একটু আশাবাদী হয়ে বললো, : এখন বলুন! কে নিষেধ করছে! : ঠিক আছে। আমি দায়িত্ব নিলাম। এখন থেকে আমাকে এসব সমস্যা আগে থেকেই বলবে! এবার একটু স্বাভাবিক হও! কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকাও! দেখো, কি সুন্দর লাল হয়ে সেজে আছে! জরিনা গাছগুলোর দিকে একটু তাকালো। আসলেই সুন্দর! কিন্তু এখন এসব ভাবতে ইচ্ছে করছে না। বললো, : চলুন, বাসার দিকে যাওয়া যাক! রুবিনার ভর্তির ব্যাপারে বাসায় কথা বলি। সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও বল্টু্ উঠে দাঁড়ালো। দুজনে একটা রিকশার দিকে এগিয়ে গেল। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রধানের রুমে তার বিশাল টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বল্টু। থেকে থেকে হাত কচলাচ্ছে। উনি একটা টিস্যু পেপার দিয়ে চশমা মুছছেন। দীর্ঘ মোছামুছি। বল্টুর মনে সন্দেহ দেখা দিলো, : উনি কি আমার কথা ভুলেই গেলেন! এরকম তো হবার কথা নয়। মন্ত্রী সাহেবের স্বাক্ষর দেয়া চিঠিটা ওনার সামনেই রাখা আছে। স্যার হঠাৎ করেই কথা বলতে শুরু করলেন। : আপনার মন্ত্রী মশাইয়ের চিঠি পড়বো। তাই ভালো করে চশমাটা মুছে নিলাম। একটু টিটকারীর আভাস পাওয়া যাচ্ছে ওনার কন্ঠে। বলে মাথা নিচু করে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। পড়ার পর মাথাটা একটু ওপরে তুলে বললেন, : বয়স কতো আপনার? এই বয়সেই মন্ত্রী চিনে গেছেন! আপনার মন্ত্রীকে গিয়ে বলুন যে আমি খুবই বেয়াদব একজন টিচার। মন্ত্রীর তদবির শুনি না। পারলে আমার চাকরিটা খেয়ে ফেলতে বলুন! বলতে বলতে উনি দরখাস্তটা বল্টুর মুখের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। কাগজটা পাতলা বলে মুখ পর্যন্ত পৌঁছালো না। বাতাসে ভাসতে ভাসতে মাটিতে পড়ে গেল। বল্টুর অবস্থা কাহিল। নিজের হাইট নিয়ে সারাজীবনের আফসোস। এখন ভাবছে, : হাইট আরও কম হলে ভালো হতো। টেবিলের ওপর দিয়ে ওই রক্তচক্ষু দেখতে হতো না। তাছাড়া, এখন বাইরে অপেক্ষায় থাকা জরিনা ও রুবিনাকে ফেস করবে কিভাবে! বড় বড় কথা বলে নিয়ে এসেছে। একটাই আশা ছিলো, ভর্তির কাজটা হয়ে গেলে কৃতজ্ঞতায় জরিনা চলে আসবে হাতের মুঠোয়। এবার আর ছাড়াছাড়ি নাই! কোন কথা ছাড়াই প্রায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো বল্টু। দরজার ঠিক বাইরেই ছিলো ওরা। কিছু বলার আগেই জরিনা বলে উঠলো, : থাক! আর ব্যাখ্যা দিতে হবে না! সবই শুনেছি। কি দরকার ছিলো এতো বাহাদুরি ফলানোর? আপনি পারেনও! রুবিনা চল! বলে রুবিনার হাত ধরে হনহন করে হাঁটা দিলো। কিছুই বলা হলো না। চেষ্টার তো কোন কমতি ছিলো না। জরিনা এটাও বুঝলো না! বরং তার হঠকারিতায় লজ্জায় অপমানে বোবার মতো তাকিয়ে রইলো বল্টু। জরিনাদের হঠকারিতায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কষ্ট কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

বল্টু_সমাচার ৬

রিকশা জার্নির পুরো সময়টাতেই বল্টু সোজা টাইট হয়ে বসে রইল। মাঝে মধ্যে খানাখন্দে পড়ে কয়েকটা ঝাকুনি অবশ্য শরীরের কলকব্জা নাড়িয়ে দিয়েছে। সোজা হয়ে বসে থাকার কারণ একটা আছে। নতুন কেনা স্যুট পরেছে। জরিনার বাসায় আসা উপলক্ষে। স্যুট টা গায়ে খানিকটা টাইট লাগছে। টাইট স্যুট গায়ে দিলে টাইট হয়েই বসে থাকতে হয়। কেনার সময় এটা বোঝা যায়নি। ব্র্যান্ড শপের সেলসম্যানটা ভীষণ স্মার্ট! প্রথম কথাতেই বললো, : আপনার তো কোল্ড অ্যালার্জি আছে। আমাদের দোকানের এসির ঠাণ্ডায় হাঁচি দিয়েই যাচ্ছেন। এই স্যুটটাই আপনার জন্য বেস্ট হবে। বলে, একটা স্যুট এগিয়ে দিলো। এক্সট্রা প্যাড দেয়া আছে। দেশি শীততো বটে, সাইবেরিয়ান ঠান্ডাও পাত্তা পাবেনা এর কাছে। অবশ্য প্রাইস একটু বেশি পড়বে। বলে হিপনোটিক একটা হাসি দিয়ে তাকিয়ে রইলো। বল্টু্ও ভাবলো, : তাইতো! দাম বেশি হলেও কাজের জিনিস। নেবোই যখন, ভালোটাই নেই! ভুলে গেলো যে শীত প্রায় শেষ। সেলসম্যান স্যুটটা একটা সুন্দর ব্যাগে ভরে এগিয়ে দিয়ে বললো, : দাম বেশি হলেও ফলাফল হাতেনাতে টের পাবেন! টের অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে। এক্সট্রা প্যাডের ঠেলায় ভেতরটা ঘেমে একাকার! ইচ্ছে করছে, এইসব স্যুটফুট ফেলে দিয়ে খালি গায়ে কোন একটা পুকুরে গিয়ে ডুব দিয়ে বসে থাকে।   জরিনাদের বাসার বাইরের গেটটা দেখা যাচ্ছে। ওরা থাকে দোতলায়। একটা চাপা উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করছে। শেষ পর্যন্ত জরিনা তাকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছে! তাও আবার ঈদের দিনে! এতোটা কখনও বল্টুর কল্পনাতেও আসেনি। জরিনার প্রতি মনটা কৃতজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। হাঁসফাঁস করে নেমে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দিলো। বকশিশ দিলো বিশ টাকা। আজকের দিনে বকশিশ না দিলে আর কবে দেবে!   দুবার কলিং বেল টিপতেই ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল। খোলা দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে জরিনার ছোট বোন রুবিনা। দুই বোনের চেহারায় ভীষণ মিল আছে! কৌতূহলী দৃষ্টিতে বল্টুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখছে। মুখে হাসি। বললো, : আপনি বল্টু ভাইয়া! বল্টু মাথা ঝাকালো। বললো, : ঈদ মোবারক! : ঈদ মোবারক! ভেতরে আসুন! আপনার সাথে এই আমার প্রথম দেখা। প্রথম দেখাতেই আপনি সুপার হিট! বলতে বলতে রুবিনা সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বসতে বললো। তারপর আবার তড়িঘড়ি করে বললো, : এক মিনিট প্লীজ! আপনার হাইট তো শুনেছিলাম পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি। এখনতো দেখছি আরো বাটুল! আচ্ছা, আপনি কি জুতার হিলসহ হাইট মাপেন? প্রশ্নটা করে মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো একটা সোফার উপর। : তাছাড়া, এই গরমে এরকম একটা বস্তা গায়ে দিয়েছেন কেন? ঘেমেনেয়ে তো শেষ অবস্থা! বসুন! আমি পানি নিয়ে আসি! নাহলে, ডিহাইড্রেশনে মরে যাবেন। আফটার অল, আমার আপুর প্রিয় মানুষ আপনি। বলে হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেল।   বল্টুর রীতিমতো কান্না পেয়ে গেল। রুবিনা মেয়েটা ভীষণ রকমের বেয়াদব! ফ্যামিলির হবু জামাইয়ের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়, এখনও তালিম পায়নি। দাঁত কিড়মিড় করে ভাবলো, : সময় আসুক! বেয়াদবি সব বের করবো! তুই বিয়ের সময় কতো লম্বা জিরাফ পাস, দেখা যাবে...! পর্দা সরিয়ে জরিনা উঁকি দিলো। স্মিত মুখে বললো, : ঈদ মোবারক! কেমন আছেন? তরমুজ লাল কালারের পাতলা শাড়ি পরা। শিফন না কি যেন একটা নাম হবে বোধহয়। চমৎকার করে সাজুগুজু চেহারা! হাতে বোধহয় এক্সট্রা নেইল লাগিয়েছে। লাল রঙের নেইল পলিশ ঝকঝক করছে! একদম নায়িকার মতো দেখাচ্ছে! শাড়িটা টানটান করে নাভির বেশ খানিকটা নিচে পরেছে। শারীরিক সৌন্দর্যের বেশ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এই উর্বশীর রুপের ধাক্কায় বল্টুর কন্ঠ শুকিয়ে গেল। ভাবলো, জরিনা যে এতোটা সুন্দর, এটা আগে ভালো করে দেখা হয়নি কেন! বোনটা বেয়াদবের হাড্ডি! কিন্তু জরিনা হচ্ছে লক্ষ্মী একটা মেয়ে। বল্টু আসবে বলে আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। এই তরমুজ লাল রঙের শাড়ি যেখানেই পাবে, জরিনার জন্য কিনে ফেলবে। যাতে অন্য মেয়েরা পরার সুযোগ না পায়। তবে, বুঝিয়ে বলতে হবে, এভাবে বিয়ের আগে এতোটা এক্সপোজ না করাই ভালো। এরকম ঈদের দিনে কতো ধরনের মেহমান বাসায় আসতে পারে। পর্দা বলে শরীয়তে একটা ব্যাপার আছে! একটা সোফায় বসতে বসতে জরিনা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললো, : নেন, পানি খান! চুপ মেরে আছেন যে...! বল্টুর মুখ দিয়ে কথা সরছে না। কোন রকমে বললো, : না না, কই! এইতো বলছি...ঈদ মোবারক! গলার স্বর আরও নামিয়ে বললো, : আমি যে এসেছি, এটা খালাম্মা জানে? : জানবে না কেন! মা`ইতো আপনাকে ইনভাইট করতে বললো। একেতো ঈদ। তার উপর আজকে আবার আমাকে দেখতে আসবে। ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। ইন্জিনিয়ার। শুধু বিয়ের জন্য কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে দেশে। ঈদ টিদের ধার ধারছে না। ফ্যাশনেবল শিক্ষিত মেয়ে চাই। আমার খালার পরিচিত। ওরাই দেখাদেখির আয়োজন করেছে। ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো, : আমার আবার এইগুলাতে কোন আগ্ৰহ নেই! তাই মা বললো, তোর ভাইয়াকে ডাক! কথাটথা বলার লোক লাগবে না! আপনিতো জানেনই যে আব্বু দেশের বাইরে থাকে। তাছাড়া ঈদের একটা ব্যাপার আছে না! এখন কথা যা বলার আপনিই বলবেন। আমি এসবের মধ্যে নেই! পারবেন না ভাইয়া? বলে বল্টুর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জরিনা।   কি হচ্ছে এসব! বল্টু্র মাথা পুরাই আউট হয়ে গেল! এই মেয়ে বলে কি! ভাবলো, : খবিস মাইয়া! কোন আগ্রহ নেই! তাহলে আলগা নখ লাগিয়ে আধা নেংটা হয়ে বসে আছিস কিসের আশায়! নেকু একটা....! এই গরমে নতুন স্যুট পরে তোর বাসায় না এসে আমার এন্টার্কটিকায় চলে যাওয়া উচিত ছিল। অন্ততঃ ঠান্ডা কন্ট্রোলের পরীক্ষাটা হয়ে যেত! বল্টু্র মুখ থেকে কোন কথা বেরুচ্ছে না। শুধু গোঙ্গানির মতো একটা শব্দ বেরুলো।   জরিনাদের চালবাজিতে এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

বল্টু_সমাচার ৫

প্রায় তিন ঘন্টা ধরে টেইলরের দোকানে মন খারাপ করে বসে আছে বল্টু। নতুন বানানো প্যান্ট নিয়ে বিরাট ঝামেলা হয়ে গেছে।ট্রায়াল রুমে গিয়ে পরতেই মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। প্যান্টের ডান পা ছোট হয়ে গেছে। দর্জিকে চার্জ করতেই এক গাল হেসে বলে,: চেইতেন না! আপনের হাইটে ঘাপলা আছে।পঁচিশ বছর ধইরা এইগুলো কইরাই খাই।শুনে বল্টু কঠিন স্বরে বললো,: হাইটে ঘাপলা থাকলে, এক পা ছোট হবে কেন? দুই পা`ই ছোট হবে। ফাজলামি করো!তোমাদের মতো মানুষের জন্য দরকার, কথার আগে চড়!দর্জি ব্যাটার ধৈর্য্য অসীম। মোলায়েম একটা হাসি দিয়ে বললো,: ভাইজানের বোধহয় আজকে মাথাডা একটু বেশি গরম। হইবোইতো! যেই গরম পড়ছে!বলতে বলতে নিজের গালটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো,: দেন! কইষা দুইডা চড় দেন! তবুও মাথা ঠান্ডা করেন!বল্টু কনফার্ম হয়ে গেল যে পৃথিবীর সবচাইতে ঠান্ডা মাথার লোক হলো এই দর্জি ব্যাটারা। হয়তো ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তবে এখনও চোখে পড়েনি।তবে চড় দেবার মতো ভুল করতে বল্টু রাজি না। দর্জি ব্যাটা তার চাইতে কমপক্ষে এক ফুট লম্বা। কখন আবার কি হয়...! টেইলর মাস্টার খুবই শান্ত গলায় পরামর্শ দিলো,: ভাইজান একটু কষ্ট কইরা বসেন! সামান্য হাতের কাজ। কারিগরের কাছে পাঠামু। দশ মিনিটের মধ্যে চইলা আসবো! আপনে বইসা বইসা এক কাপ চা খান!সেই দশ মিনিট তিন ঘণ্টা হয়ে এলো। জরিনাকে নিয়ে সিনেমা দেখবে। প্রোগ্রাম সেট করা। বাসা থেকে নতুন একটা শার্ট আর রাতের পাজামা পরে সরাসরি দর্জি দোকানে চলে এসেছে। প্যান্ট টা অনেক আগেই ডেলিভারি নেবার কথা। তাই কোন কনফিউশন ছিলো না। এখন পড়েছে মহা ফাঁপরে! পাজামার বদলে অন্য কোন প্যান্ট পরে আসলেই হতো। অবশ্য সিনেমা শুরু হতে এখনও দেরি আছে। বাসায় গিয়ে অন্য প্যান্ট পরে আসলেও হতো। কিন্তু নতুন প্যান্টের আশায় আশায়....: ভাইজান, নেন আপনের প্যান্ট! দর্জির বাজখাঁই গলার চিৎকারে বল্টুর তন্দ্রা ভাবটা কেটে গেল। হাত বাড়িয়ে প্যান্টটা নিয়ে সোজা ট্রায়াল রুমে। সিএনজির ভাড়া চুকিয়ে সিনেমা হলের পাশে একটা কফি শপে ঢুকে গেল। জরিনা একটা টেবিল নিয়ে বসে আছে। বেবি পিংক কালারের শাড়ি পরা জরিনাকে রাজকন্যার মতো দেখাচ্ছে। মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসলো বল্টু। হাসি হাসি মুখে বললো,: খুবই খুশি হয়েছি। আমার আগেই তুমি চলে এসেছো, এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না।জরিনাও একটা কমপ্লিমেন্টারি হাসি দিলো।বললো,: ভাইয়া, আপনার পছন্দের রংয়ের শাড়ি পরে এসেছি। ম্যাচিং করার মতো কিছু ছিলো না। শুধু আপনার ভালো লাগবে ভেবে পরেছি। সিনেমা দেখার পর কিন্তু এটার ম্যাচিং এক্সেসরিজ কিনবো আপনাকে নিয়ে!বিরাট খরচের ব্যাপার!প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়েবল্টু্ জবাব দিলো, : কোন সমস্যা নেই!এখন কি আমি আমার গভীর কিছু চিন্তা ভাবনা তোমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারি?জরিনা গাল বেঁকিয়ে বললো,: এটা আপনার গভীর কথা বলার সময়!সিনেমা শুরু হওয়ার পথে। চলুন! ওঠা যাক!মুখে চলে আসা ভালোবাসার কথা মুখেই থেকে গেল। বল্টু উঠে দাঁড়ালো।কি আর করা!অন্ততঃ সিনেমা টা একসাথে দেখা যাক! জরিনাদের অবহেলায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...! লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

গতরাত

সন্ধ্যা থেকেই আকাশে পূর্ণ চাঁদ। আজ মনে হয় পূর্ণিমা অথবা নয়। এ সব নিয়ে মাথা ঘামায় না কিবরিয়া। ও হাঁটছে ক্ষণিক আকাশের দিকে চেয়ে আবার ক্ষণিক হাটছে রাস্তা দিকে চেয়ে। আধা গ্রাম আধা শহরের রাস্তা। আজ প্রায় ছয় মাস পরে ও বাড়ির পথে। নিজের কাছে বেশ ভালই লাগছে। বরিশালের মেহেদীগঞ্জে বাড়ি ওর। নদীর মায়ার কোমলতা দিয়ে ঘেরা ছোট্ট এক শহর। কিবরিয়া চলছে বহুদিন পর বাড়ি ফেরার আনন্দ নিয়ে। বহুদিন বাদে পরিবার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা হবে ওর। উল্টো পথ দিয়ে এগিয়ে আসছিল রিফাত। ইলেকট্রিসিটির আলো ও চাঁদের ঈর্ষাৎ আভায় ওকে অনেক রোগা মনে হচ্ছে। কাছে আসতেই কিবরিয়া ওকে ডাকলো, ‘রিফাত।’ হঠাৎ কিবরিয়াকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে ওঠে রিফাত বলল, ‘কিবরিয়া, কখন এলি তুই?’ -‘এইতো মাত্র আসলাম।’ -‘কোথা থেকে আসলি?’ -‘কোথা থেকে আবার? কুমিল্লা থেকে।’ -‘কয়দিনের জন্য আসলি এবার।’ -‘এইতো দিন বিশেকের জন্য। আরে আমার কথা বাদ দে। শাহীন, সাদি, সেলিম ওদের খবর কি?’ -‘এই ভালই আছে ওরা। তোকে খুব মিস করিরে বন্ধু।’ -‘তোরা কি এখনও নেশা করস?’ করুণ নয়নে চেয়ে প্রশ্ন করল কিবরিয়া। -‘এটা একবার ধরলে আর ছাড়া যায় না। ছাড়তে চাইলেও ছাড়া যায় না বন্ধু।’ -‘কই যাস এখন?’ -‘বাজারের দিকে যাব একটু।’ -‘তোরা তো এখন বাজারেই থাকবি না?’ -‘হ্যাঁ থাকব।’ -‘আচ্ছা তাহলে আমি বাড়িতে গিয়ে এখনই আসছি।’ -‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ রিফাত, কিবরিয়া, শাহীন, সাদি ও সেলিম ওরা সেই ছেলেবেলাকার বন্ধু। ওরা একে অপরের কত্ত কাছাকাছি। মাধ্যমিক থেকে ওদের এক সাথে পড়াশুনা। তবে সবার এক সাথে এসএসসিটা পাশ করা হয়নি। সাদি আর কিবরিয়া এসএসসি পাশ করেছে, কিবরিয়া এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আর দুইবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে সাদি এখন এলাকার কলেজে ডিগ্রি পড়ে। আর রিফাত, শাহীন, সেলিমের এসএসসি পাশ করা হয়েছে দুই-তিনবারে। তারপর কলেজ পর্যন্ত এসে আর পড়া হয়নি। এখন ওদের দিন কাটে বাপের হোটেলে খেয়ে, অশান্তিতে। কোন এক পাপ যেন তাদের জীবনটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। ওদের কাছে এখন জীবন মানেই অস্বস্তি আর হতাশা। একটা অুনশোচনায় ওরা আটকে আছে যেন। একটা পাপের পরবর্তী ফল হিসেবে ওদের দিন কাটে এখন মদ-সিগারেট-গাজা আর অশান্ত মনের শান্তির জন্য টাকার বিনিময়ে নারী। ওদের থেকে সবচেয়ে ভালো আছে কিবরিয়া। ওদের ভিতর কিবরিয়া এখন আদর্শ। কিবরিয়া জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সম্মানজনকভাবে কাজে লাগিয়েছে। হাতে ব্যাটারির টর্চ নিয়ে কিবরিয়া ঘর থেকে বের হল। টর্চের ক্লান্ত আলো রাস্তায় ফেলে বাজারের দিকে যাচ্ছে ও। রাত ৮টা এখন। ছোট মফস্বলের ধারা বাহিত চুনারচর গ্রাম। হালকা করে শহুরে ছোঁয়া মাখা গ্রাম। রাতের প্রথম প্রহরে টুনটুন বেল বাজিয়ে রিকশা চলছে দু-একটা। রিকসার নিচে হারিকেনের ভিতরের সলতের মিটমিট আলোটা যেন বাতাসের সাথে প্রতিযোগীতায় দুলছে। ঝাকুনিতে কাঁপছে আলোটা। কিবরিয়া এসে গেছে তার চিরচেনা বাজারের খুব কাছে। আর মিনিট খানেক লাগবে। সামনের মোড়টা ঘুরলেই ওদের ছোট্ট বাজার। বাজারের প্রথম চায়ের দোকানটি আবুল হোসের ভাইয়ের। ওখানে বসেছিল রিফাত, শাহীন, সাদি, সেলিম। এ চারজন কাস্টমার বাদে অন্য কাউকে দেখতে পেল না কিবরিয়া। কিবরিয়াকে দেখতে পেয়ে শাহীন, সাদি ও সেলিম ওকে জড়িয়ে ধরল। বহুদিন পর বন্ধুকে কাছে পাওয়া বলে কথা। বন্ধুদের অভিনন্দনের পালা শেষ হতে মিনিট দুয়েকের মত সময় লাগল। দোকানের মালিক আবুল হোসেন মুখ তুলে কিবরিয়াকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কবে আইলা কিবরিয়া?’ -‘এইতো সন্ধ্যায়, তো কেমন আছো আবুল ভাই?’ -‘আমাগো আর থাহা।’ -‘আরে এ কথা বলছ কেন? তোমরাও দেশের সম্পদ যে।’ আবুল হোসেন মুখে একটা মুচকি হাসি তুললো। কিবরিয়া ওদেরকে তাড়া দিল, ‘কিরে তোরা কি এখানে বসে থাকবি? ওঠ।’ কিবরিয়ার তাড়া খেয়ে ওরা আবুল হোসেনের চায়ের দোকান থেকে উঠল। আবুল হোসেন কিবরিয়াকে বলল, ‘কিবরিয়া, চা খাইয়্যা যাও।’ -‘এখন না আবুল ভাই। পরে খাব। আছিতো অনেক দিন।’ ওরা পাঁচ বন্ধু হাটছে অন্ধকার রাস্তায়। এই অন্ধকার রাস্তায় হাটার স্বভাব ওদের বহু পুরোনো। বাড়িতে আসলে কিবরিয়া এটাকে খুব উপভোগ করে আর দূরে থাকলে এটার খুব অভাব বোধ করে। এই নিস্তব্ধ রাতে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুদের মাঝে অনেক না বলা কথার বিনিময় হয়। কিবরিয়া বাদে বাকি চার জন বদের হাড্ডি। মেয়েদের শরীরের প্রতি এই চারজনের লোভ অতিমাত্রায়। লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের গোসল, রাতে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়েদের শরীরে সিরিঞ্জ দিয়ে পানি দেওয়া, লাঠি দিয়ে কাপড় উলট-পালট করা এদের নিত্য দিনের স্বভাব। ভাবটা এমন যেন, মেয়েদের শরীর এরা আস্ত গিলে খাবে। কখনও এদের এ সব কাজে সঙ্গ দেয়নি কিবরিয়া। এভাবেই চলত ওদের ছেলেবেলা। অবশ্য ওদের চরিত্রে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। কোন একটা ঘটনা ওদের ব্যথা দেয় সব সময়। -‘তো তোদের দিন কাল এখন কেমন যাচ্ছে?’ কিবরিয়া বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল। একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে রাফি বলল, ‘আমাদের আর দিন কাল।’ -‘আহা, নতুন করে আবার কি জীবন শুরু করা যায় না।?’ -‘শোন জ্ঞান দিবি না। ভাল লাগে না এইসব কথা শুনতে।’ -‘আচ্ছা ঠিক আছে আর বলব না। তবে তোরা কি আর এই নেশার পথ ছাড়বি না।?’ -‘আরে নেশা বলছিস কেন? এটা খুবই শান্তির মামা। এগুলো খেলে পারলেই না নিজেকে খুব ভালো মনে হয়।’ বহু কষ্টে কথা গুলো বলল সেলিম। ওর হাতে একটা দেশী মদের বোতল। তার অর্ধেক খালি। কখন থেকে ওটা হাতে নিয়ে অর্ধেক করে ফেলল তা মোটেও খেয়াল করেনি কিবরিয়া। দুলতে দুলতে হাঁটছে সেলিম। মদের বোতলটা নিতে গিয়েও নিল না কিবরিয়া। -‘সে দিন রাতে কি যে করে বসলাম মামা। মাথা ঠিক ছিল না। মোটেও।’ সেলিম বলল। সাদি কিবরিয়াকে বলল, ‘জানিস কিবরিয়া, সে দিনের পর থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি খারাপ ছেলে মনে হচ্ছে। কিন্তু দেখ আগে কত আজে-বাজে কাজ করেছি, একটি বারের জন্যও খারাপ ছেলে মনে হয়নি নিজেদেরকে।’ ২ কিবরিয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। মাথার উপর সূর্য খাড়া হয়ে তেজ ছড়াচ্ছে সমানভাবে। মেঠ পথের দুই পাশে সুপারি আর আম বাগান। সুপারি গাছের লম্বা লম্বা সারির মাঝখানে ছায়া আর সূর্যের আলো খেলা করছে। বাতাসের তালে তালে গাছের ছায়াগুলো কাঁপছে। আম-সুপারির কালো এই বাগান থেকে বিরতিহীনভাবে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। বসন্তের মাঝামঝি এখন, প্রকৃতির কোলে বসন্ত পূর্ণতা লাভ করেছে যেন। কিবরিয়া রাস্তার মোড় ঘুরে বাম দিকের রাস্তায় চলল। এই মোড়ে রিফাতের সাথে দেখা হল কিবরিয়ার। কিবরিয়া ওকে ডাকল, ‘রিফাত, কৈ গেছিলি?’ -‘সিনেমা দেখতে গেছিলাম।’ কিবরিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘তুই এখন সিনেমা দেখতে গেছিলি আর কয় দিন পর না আমাদের পরীক্ষা।’ -‘তো কি হয়েছে। পরিক্ষা দেব, তোর মত আমার এত পড়াশুনা করতে ভাল লাগে না।’ --‘আজ আমাদের আরও একটা পরীক্ষা হয়েছে। তোর আজ কোচিংয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’ -‘ঠিক আছে কাল থেকে যাব বন্ধু, এবার আসি।’ বলে রিফাত দ্রুত হাঁটা ধরল। কিবরিয়া রিফাতের যাওয়া দেখল। কিবরিয়া ভাবল কি যে হল রিফাত, সেলিম, সাদি ও শাহীনের। পড়ালেখা করছে না তেমন। আর দুই মাস পর এসএসসি পরীক্ষা। ওরা কি পড়ালেখা কে জানে? কোচিংয়েও যায় না ঠিক মত। বিকেল বেলা সূর্যের পড়ন্ত আলো নদীর পানিতে ঝলমল করছে। ঢেউয়ে পানির ঝলমল আরও সুন্দর লাগছে। বাতাসে কলমি লতাগুলো সাদা ফুল নিয়ে দুলছে। বাতাসে একটা শো শো শব্দ তুলছে। নদীর পাড়ে রাস্তার দুই ধারে বছরের পর বছর দাঁড়ানো লম্বা লম্বা তালগাছে ঝুলে পড়া শুকনো পাতা বাতাসের তোড়ে খস খস শব্দ করছে। সারা দিন অনেক পড়াশুনা করেছে কিবরিয়া। এখন ও মনোরম বাতাসে বেরিয়েছে, নদীর পাড়ের রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে বটতলার দিকে। ওখানে বন্ধুদের দেখা পাবে। বটগাছের বড় কয়েকটা শিকড়ের উপর বসে গল্প করছে সেলিম, রিফাত, সাদি ও শাহীন। এক এক জন বট গাছের বিশাল গোড়ার এক এক প্রান্তে বসে গল্প করছে আর হাসছে ইচ্ছা মত। কিবরিয়াকে আসতে দেখে শাহীন বলল, ‘ঐ যে দেখ আমাদের বিদ্বান বন্ধু জনাব আইনস্টাইন আইতাছে।’ শাহীনের কথায় বাকীরা কিবরিয়ার দিকে ফিরে তাকালো। কিবরিয়া ওদের কাছে এসে বলল, ‘কি ব্যাপার তোদের, আমাকে রেখে তোরা আগে আগে এসে বসেছিস?’ কেউ কোন উত্তর না করে একযোগে হেসে ওঠল। হাসতে হাসতে সেলিম বলল, ‘তোমার আবার কি বন্ধু, তুমি তো সারাদিন খালি পড়ো। এত পড়াশুনা করে কি হবে শুনি?’ -‘পড়াশুনা করে কি হবে মানে। পরীক্ষা শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকী।’ -‘জানি, জানি। তোর বলতে হবে না।’ শাহীন বলল। কিবরিয়া ওদের জিজ্ঞাসা করল, ‘তো তোদের পড়াশুনার কি খবর বল।’ সাদি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এ থাম, থাম। এত পড়াশুনার কথা শুনতে ভাল লাগে না। তার চেয়ে বরং শাহীন আজ একটা অভিযান করেছে, সে কথা শোন মজা পাবি।’ কিবরিয়া একটা শিকড়ের উপর বসতে বসতে বলল, ‘কি অভিযান?’ রিফাত বলল, ‘আরে মামা জব্বর অভিযান। আজ দুপুরে শাহীন মিয়া বাড়ির পুকুরে খরাব দেখছে।’ -‘আমি এখনও কিছু বুঝতে পারছি না।’ কিবরিয়া বলল। সাদি রিফাতকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ও তোমার তো আর এ সব মাথায় ঢুকবে না। তো চাদু, শাহীন আজ মিয়া বাড়ির মেয়েদেরকে পুকুরে গোসল করার সময় ল্যাংটা দেখেছে।’ বলেই হো হো করে হেসে উঠল। -‘তোরা এখনও এসব করে বেরাস?’ কিবরিয়া রেগে উঠে যেতেই রিফাত ওকে টেনে ধরল। -‘আরে, দাঁড়া না মামা একটু বস।’ অনেক জোর করেই কিবরিয়াকে বসিয়ে রাখল ওরা। শাহীন বলতে শুরু করল, ‘দুপুরে মিয়া বাড়ির বাগান দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাগান দিয়ে যাওয়ার পথে শুনতে পেলাম কয়েকটা মেয়ে কথা বলছে। কথা বলছে আর হাসছে। বুঝতে পারলাম পাশের পুকুর ঘাট থেকে কথা আসছে। আমি ধীরে ধীরে পুকুর পাড়ে ঝোপের মধ্যে গিয়ে বসে পড়লাম। তাকিয়ে দেখলাম পুকুরের ওপারে ঘাটে সে কি অবস্থা, আমি তো শেষ। তিনটা মেয়ে গোসল করছে দুটার গায়ে জামা নেই। গামছা পেচিয়ে গায়ে সাবান মাখছে। কি কচি দেহ। নাদুস-নুদুস তাকি ভোল যায়।’ শাহীন চোখে এখনও দুপুরের সেই লালসা লেগে আছে। কিবরিয়া আর বসতে পারল না ও উঠে বলল, ‘তোরা কি সারাদিন এমনই করবি। মোটেও ঠিক হবি না!’ কিবরিয়া রাগান্বিত হয়ে কথাগুলো বলে চলে যেতে পথ ধরল। পিছন থেকে সাদি ডাকল, ‘কিবরিয়া দাঁড়া, শোন, দাঁড়া।’ কিবরিয়া ওদের ডাক কানে না তুলে চলে গেল। ওরা আবারও বলতে শুরু করল। কথার মাঝে সেলিম বলল, ‘এ, শোন আজ আমি একটা জিনিস চুরি করেছি।’ সবাই সমস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি কি?’ -‘মেয়েরা জামার নিচে যে জামাটা পড়ে, তার নিচে আবার ছোট যেটা পড়ে সেটা। কি সেটার নাম বলতে পারিস।’ সেলিম সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল। সাদি বলল, ‘আমি জানি ওটার নাম...।’ রিফাত সেলিমকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথা থেকে চুরি করলি ওটা?’ সেলিম উত্তর করল, ‘আমার বাড়ির পাশের বাড়ি থেকে চুরি করেছি গতরাতে। গতরাতে পাশের বাড়ির মেয়েটি যে রুমে ঘুমায় সে রুমের জানালা খোলা ছিল। রাতে মেয়েটা ঘুমে ছিল। ওখানে জানালার পাশের আলনা থেকে চুরি করেছি।’ কিবরিয়া চিন্তা করছে, ওরা কি করছে এসব। কোন লেখাপড়া নেই। এভাবেই চলবে ওদের জীবন। কবে ভালো হবে ওরা। ততক্ষণে তো এরা বেশী দেরী করে ফেলবে। দিনের আলো নেই বললেই চলে। পশ্চিম আকাশে রং ধনু দেখা গল। পাখিরা কিবরিয়ার মাথার উপর দিয়ে যে যার ঠিকানায় যেতে লাগল। মাগরিবের আজানের ধ্বনি কিবরিয়ার কানে আসলে ও নদীর পানির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উঠে চলল মসজিদের উদ্দেশ্যে। ৩ প্রায় আট-নয় মাস হল কিবরিয়াদের এসএসসি পরিক্ষা শেষ হয়েছে। এখন কিবরিয়া ঢাকার একটা কলেজে পড়ে। বন্ধুদের মাঝে শুধু কিবরিয়াই ঢাকায় পড়াশুনার জন্য এসেছে। কিবরিয়া এসএসসি পাশ করেছে ভাল রেজাল্ট পেয়ে। বাকিদের মধ্যে শুধু রিফাত পাশ করেছে টেনেটুনে। সাদি, শাহীন ও সেলিম ডাব্বা মেরেছে ভালভাবেই। তবে এ নিয়ে ওদের মাঝে কোন চিন্তা নেই। ওরা আছে আগের মতই। গরমের এক রাতে সাদি, শাহীন, সেলিম, রিফাত রাস্তায় হাটছে আমোদের সাথে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কিছুক্ষন হল। সবাই মিলে এলাকার রাস্তায় রাস্তায় আড্ডাবাজি করছে। রাত বেশী হয় নাই, আবার কমও বলা যায় না। একটা বাজে এখন। হঠাৎ সাদি বলল, ‘আমাদের জীবনটাই দেখ। কি করলাম আর কিবরিয়া এখন ঢাকায় পড়ে।’ সেলিম বলল, ‘আরে শালায় একটা জিনিস। আর আমাদের মাথায় তো গোবর ছাড়া কিচ্ছু নাই। -‘এ দেখ দেখ। সামনে কি আইতেছে।’ শাহীন কিছু একটা দেখিয়ে সকলকে বলল। সবাই সামনের দিকে তাকাল। রাতটা তেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। আবার তেমন চাঁদের আলোও নাই। পূর্ণিমার রাত নয় তবে পূর্ণিমার কাছাকাছি কিছুটা বলা যায়। সব কিছু স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও অনেকটা দেখা যায়। ওরা দেখল যে, একটা মাঝ বয়সি মহিলা আসছে ওদের দিকে। ত্রিশের কোটায় বয়স হবে হয়ত। মহিলাটা ওদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো। ওদের কাছাকাছি আসলে ওদের কেউ মহিলাকে লক্ষ্য করে শিষ দিল। কিন্তু তাতে মহিলার দিক থেকে কোন প্রতিউত্তর আসল না। ওরা অনেক উত্তেজনামূলক কথা বলল মহিলাটাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাতেও মহিলাটার থেকে কোন জবাব আসল না। এতে ওদের মনে আরও অনেক সাহস বেড়ে গেল। ওদের ভিতর থেকে একজন মহিলাটার হাত ধরল, তাতেও কোন প্রতিউত্তর না পেয়ে ওরা মহিলাটাকে রাস্তার পাথে একটা ঝোপের ভিতর নিয়ে গেল। ঝোপের ভিতর থেকে হালকা গোঙ্গানির শব্দ হল ঘন্টা দুয়েক। এই ছেলেদের দল মহিলাটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে রেখে চরম উত্তেজনার সুধা পান করল। এক সময় ওরা ক্লান্ত হয়ে মহিলার নিস্তেজ দেহটাকে ঝোপের ভিতর ফেলে দিয়ে বাহিরে এল। ওদের সবার ভিতর একটা তৃপ্তি দেখা গেল। ওরা সবাই খুশি। এ রকম একটা কাজ ওরা এত সহজেই করতে পারবে ভাবেনি কখনও। পরদিন দুপুরে ওরা আবুল হোসেন ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে গল্প করছে। সাদি, রিফাত, শাহীন, সেলিম ওরা একে অপরকে বলছে গতরাতের কাহিনী। যদিও কাজটা সবাই একসাথে একই জায়গায় করেছে। কার কাছে কেমন লেগেছে, কে কি রকম করেছে, বলছে সব। আবুল হোসেন ভাই দেখলেন রাস্তার ওপারের বেঞ্চে বসে ওরা কি যেন বলছে আর হাসছে। ওদের এ রকম হাসি আর গোপন আলাপচারিতা আগে কখনও তিনি দেখেন নাই। কথা বলার সময় ওরা দেখতে পেল একজন মহিলা রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এ দিকে আসছে। ওরা মহিলটার দিকে তাকিয়ে থাকল। আর একটু কাছে আসার পর বুঝতে পারল গত রাতের সেই মহিলাটা। ভয়ে ভয়ে ওরা ঊঠে দাঁড়াল। মহিলাটি দোকানের সামনে এসে আবুল হোসেন ভাইয়ের সামনে দাড়াতেই, আবুল হোসেন ভাই মহিলাটিকে কলা আর রুটি খেতে দিল। সাদি, রাফি, শাহীন, সেলিম অনেক্ষণ দেখল মহিলাটিকে। ওরা বুঝলো যে মহিলাটি একটা পাগল। ওদের চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। [মধ্যাহ্ন, ২৮ বৈশাখ, ১৪২০ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা] (গল্পটি অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭ তে প্রকাশিত লেখকের ‘আসমত আলীর অনশন’ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া) এসি  

ব্লেড

আমি আত্মহত্যা করব। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কথাটি বলে এক সেকেন্ড দম নিল মেয়েটি। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে বলল, ‘‘ম্যাসেঞ্জারে এসো। একটা জিনিস দেখাবো।’’ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে মেয়েটি একটি ছবি পাঠিয়েছে। ওর হাতের তালুতে চকচক করছে ব্লেড। স্মার্টফোনের ক্যামেরার ফ্লাশের আলো পড়ায় ব্লেডের উপর থাকা লেখা পড়া যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না কোন কোম্পানীর ব্লেড এটি। প্রেমিক ছেলেটির চোখ গেল মেয়েটির চমৎকার আঙুলের দিকে। কী সুন্দর! আঙুলের মাথায় লম্বা হয়ে থাকা নখগুলোও আকর্ষণীয়। অনিন্দ সুন্দরী মেয়েটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, ভাবতেই ওর শরীরের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসল। প্রচন্ড পানির পিপাসা পাচ্ছে। মুহুর্তেই ভিজে উঠল দু’চোখ। বিগত দিনে দু`জনের একসাথে কাটানো মধুর সময়গুলো মনে পড়ছে। দম বন্ধ হয়ে আসা অনুভূতি নিয়ে প্রেমিক ছেলেটি দ্রুত টাইপ করল- ‘‘পাগলামো বন্ধ করো সোনা। প্লিজ। দরকার হলে আমি চুপ হয়ে যাব, তাও এমন বোকামো করো না। নিজের সামান্য ক্ষতিও করোনা। এ জীবন অনেক মূল্যবান। একদম ভুল করা যাবে না। মৃত্যুই সবকিছুর সমাধান নয় সোনা।‘’ : জানি না প্রিয়তম। এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নাই। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাঁদের মান সম্মানের প্রশ্ন। অন্য কাউকে বিয়ে করলে তুমি সারাজীবন কষ্টে ভুগবে। আমি এসব মানতে পারব না। এসবের চেয়ে আমার মরে যাওয়াই ভাল। কেন যে আমরা একই ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মালাম না জান? - তাই বলে মরে যেতে হবে? এত বোকা তো ভাবি নি তোমাকে। পৃথিবীতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা বিয়ে করছে না? আমরাই কি প্রথম? আমাদের দেশেই কি এমন বিয়ে হয়নি আগে? : পারব না। একদম পারব না। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা কষ্টে-অপমানে হয়তো মরেই যাবেন। ছোট ভাই-বোনগুলোর বিয়েতে সমস্যা হবে। - বোকার মতো কথা বলো না তো সোনা। তুমি আত্মহত্যা করলে তারা কষ্ট পাবে না? সম্মান যাবে না? কোনো সমস্যা হবে না? এরচেয়ে বরং চলো- সবাইকে ম্যানেজ করে বিয়েটা করে ফেলি। ‌: পারব না আমি। তোমাকে বিয়ে করলে মা-বাবা অখুশি। অন্য কাউকে বিয়ে করলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। বিয়ে না করেও উপায় নেই, এই সমাজ উল্টাপাল্টা কথা শুনাতে ছাড়বে না। আমার হয়েছে জ্বালা। তারচেয়ে মরে যাই। - চুপ করো তো। প্লিজ। : হুম। চুপ হয়ে যাব একদম। পঞ্জিকায় দেখলাম আজ রাত তিনটা থেকে একটা ভাল লগ্ন শুরু হচ্ছে। এ সময় মৃত্যু হওয়া নাকি ভাল। মেয়েটির অমন কথা শুনে প্রেমিক ছেলেটি না হেসে পারল না। ধর্মভীরু মেয়েরা বুঝি আত্মহত্যা করতেও লোকনাথ পঞ্জিকা দেখে! অথচ সে ভালই জানে, আত্মহত্যা মহাপাপ। সব ধর্মই এ কথা বলে। ভাল ক্ষণ দেখে কেউ নরকে যেতে চায়! ছেলেটি দুষ্টুমি করার চেষ্টা করে- ``আত্মহত্যাকারীরা স্বর্গের কোন স্তরে থাকবে, এমন কিছু পঞ্জিকায় লেখা আছে সোনা! আমাকে পড়ে শোনাও না! তোমাকে ফোন করি। বল আমাকে।`` : না। ফোন করো না। শোনো, আমি ফান করছি না। সত্যিই মরে যাব। ছবি দেখে কিছু বুঝতে পারছ না? আমি কি করতে যাচ্ছি মাথায় ঢুকেছে? - হুম। ঢুকেছে। ভয়ানকভাবে ঢুকেছে। : মন খারাপ করো না জান। পরপারে দেখা হবে। এ পৃথিবীতে তো তোমাকে পেলাম না। পরপারে যদি ... - আসলে আমি ভাবছি দুনিয়ার কথা। তোমার আঙুল আর নখের কথা। : মরার আগে নখ নিয়ে ভেবে কি হবে। স্যরি, তুমি গত সপ্তায় বলার পরও কাটি নি। জানোই তো, নখ বড় রাখতে আমার ভাল লাগে। প্লিজ, শেষ সময়ে এটা নিয়ে ঝগড়া করো না প্রিয়তম। আমাকে শান্তিতে মরতে দাও? - বকবো কেন? বললাম না, তোমার আঙুল আর নখ নিয়ে ভাবছি? : কি ভাবছ জান? - ভাবছি, জন্মের পর তোমার এই সুন্দর আঙুলগুলো কত নরমই না ছিল। : হুম। -জন্মের সময় তো হাত-পায়ের আঙুলে নখও থাকে। মায়েরা কত সতর্কতার সাথে সন্তানের নখ কেটে দেন। সামান্য ভুলে না আবার কলিজার টুকরা সন্তানের আঙুলের চামরা কেটে যায়, খুব ভয়ে থাকেন তারা। মায়েরা দিনে অসংখ্যবার সন্তানের নরম আঙুলগুলোয় চুমু খান। বাবারাও। এমন পরিস্থিতি দিয়ে গেছেন তোমার মা, আমার মা। গ্রামে নিজ বাড়ির আঁতুরঘরে সন্তান জন্ম দেওয়া সকল মায়েরই এই অভিজ্ঞতা আছে। তাই না? : হুম। ঠিক। - ব্লেড দেখে আরেকটা বিষয় মনে পড়ল। বলব? : বল জান। - জন্মের সময় হয়তো এমনই কোনো ব্লেড দিয়ে তোমার-আমার নাড়ি কেটেছিলেন গ্রামের ধাত্রী! বলাকা নাকি অন্যকোনো নামের ব্লেড ছিল ওগুলো, কে জানে! : মানে? এখন বুঝি দুষ্টুমির মুড এলো তোমার? - খেয়াল করেছো, মায়েরা সন্তান পেটে ধরা থেকে শুরু করে জন্মদান ও লালন-পালনে কত কষ্ট করেন। স্বাভাবিক ডেলিভারীর মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে অভিজ্ঞ মায়ের কাছে প্রশ্ন করলে জানতে পারবে, এ অভিজ্ঞতা কত কষ্টকর। মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তার কলিজায় লাথি মেরে তবেই আমরা পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম কি না! ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া মায়ের এই কষ্টের কোনো তুলনা হয়? : না, হয় না। কিন্তু হঠাৎ এসব বলছ কেনো জান? - কারণ আছে বৈ কি। প্রেমের মানুষটিকে পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে কষ্ট পেয়ে জন্মদাত্রী মায়ের মুখটি একবার খেয়াল করছ না। তার ছবিটা একবার চোখ বুঝে দেখছ না। মরতে চাচ্ছো। তুমি সত্যি এমন করলে তাঁর কি হবে ভেবেছো একবার? খেয়াল করে দেখেছো, নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানকে নিয়ে মায়েরা কত কষ্ট স্বীকার করেন? শোনো, সন্তান বড় হয়ে গেলেও মায়েরা তাদের নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন। আমার ধারণা, তোমাকে নিয়েও তোমার মা এভাবে সারাক্ষণ ভাবেন। : মায়ের কথা বলে মনটা অন্যরকম করে দিলে জান। তুমি এত ভাল কেন বল তো! এমন করে কথাবার্তা বলো বলেই কি না তোমার ওপর কঠিন হতে পারি না। নইলে কবেই প্রেমটাকে কবর দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলতাম! - করে নাও। : পারছি কই? - হুম। ‘এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে...’! ‘শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি/ তুমি আমার সাধনা...’! : ঢং! এই শোনো। ব্লেডটা দিয়ে একটা কাজ করব। প্লিজ বকো না যেন? - কি কাজ সোনা? : তোমার নাম লিখব। - কোথায়? : বামহাতে। - পাগল নাকি তুমি! এই শোনো, হাত কেটে নাম লেখার দরকার নেই। হৃদয়ে লিখেছো, এ-ই আমার পরম পাওয়া, ওটা মুছতে দিও না। : তোমার কথার জবাব নেই জান। - শোনো, ব্লেড দিয়ে হাত-পা কাটলে ইনফেকশন হতে পারে। তারচেয়ে এটা দিয়ে লম্বা নখগুলো কেটে ফেল। চাইলে ব্লেডের অন্য ব্যবহারও করতে পারো! : যেমন? - এই যেমন আমি শেভ করি। গোঁফ-দাড়ি কাটি! : দুষ্টু কোথাকার! এই তুমি আমাকে হাসালে কেন? আজ আর কথা বলব না! ঘুমাবো। শুভরাত্রি। - শুভরাত্রি! সুপ্রভাত জানানোর জন্য ভোরে ওঠো কিন্তু। এসি  

রাশিদ আসকারীর ৭১-এর গল্প ফরাসি অনুবাদের মোড়ক উন্মোচন

লেখক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক রাশিদ আসকারীর ইংরেজি গল্প সংকলন Nineteen Seventy One and Other Stories-এর ফরাসি অনুবাদের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। প্রশাসন ভবনের সম্মেলন-কক্ষে আজ শনিবার দুপুর ১টায় অনুবাদ গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শাহিনুর রহমান এবং ট্রেজারার প্রফেসর ড. মো. সেলিম তোহা। মোড়ক উন্মোচনের প্রতিক্রিয়ায় গ্রন্থটির লেখক রাশিদ আসকারী বলেন, বাংলাদেশের যেকোন শিল্পকর্মের প্রধান প্রতিপাদ্য হওয়া উচিৎ ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিকথা। তিনি বলেন, গ্রন্থটি ফরাসি ভাষায় অনূদিত হওয়ায় এবং মহান বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে মোড়ক উন্মোচন করতে পারায় আমি গভীরভাবে আনন্দিত। উপাচার্যের চেয়ে লেখক হিসেবে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো.শাহিনুর রহমান ফরাসি ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ায় গল্প গ্রন্থটির লেখক রাশিদ আসকারীকে অভিনন্দন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এই অনুবাদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশের মানুষদের নাড়া দিবে, স্পন্দন যোগাবে। ট্রেজারার প্রফেসর ড. মো. সেলিম তোহা তার বক্তব্যে গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদের জন্য উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলা একাডেমির নিকট আবেদন জানান। রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এস. এম. আব্দুল লতিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রক্টর প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান, ছাত্র-উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মো. রেজওয়ানুল ইসলাম এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমিতির উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ আলোচনায় অংশ নেন। তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ অফিসের উপ-পরিচালক মো. আতাউল হক প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ফরাসি ভাষায় অনুবাদের কাজ করেছেন ফরাসি অনুবাদক এনা গ্যাব্রিয়েল কৌশী এবং বইটি প্রকাশ করেছেন ভারতের নিউ দিল্লীর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রুব্রিক পাবলিশিং। রুব্রিক পাবলিশিং-এর সত্ত্বাধিকারী লেখক, কবি ও অনুবাদক ড. বীণা বিশ্বাস বলেন, ‘বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত এই মূল্যবান গ্রন্থটি আমাদের দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে। এর অনুবাদের কাজটিকে আমি সম্পূর্ণ অনুধাবনের রাখার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে নেপালি ভাষাসহ ভারতের আরও একাধিক ভাষায় এটি অনুবাদের পরিকল্পনা রয়েছে। Nineteen Seventy One and Other Stories গ্রন্থটি ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশ করেন প্রকাশনা সংস্থা পাঠক সমাবেশ। গ্রন্থটিতে লেখকের মোট বারোটি গল্প স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটি হিন্দি ভাষায় অনুবাদ করেন ভারতের শিমলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক প্রফেসর ড. উষা বন্দে, যার মোড়ক উন্মোচন হয় এ বছরের ২৫ জুন। কেআই/ এসএইচ/

‘কিছু গল্প অবাঙমুখ’ এর বাঙময় পাঠ-অনুভূতি

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী বিভাগ হলো ছোটগল্প। যুগে যুগে কত শত সহস্র গল্প কতভাবেই না বলা হয়েছে তবু ছোটগল্পের আবেদন ফুরায়নি। ফুরাবেও না আশা করা যায়। ক্ষুদ্র বা ছোট পরিসরের মধ্যে জীবনের সবচেয়ে গভীর ও নিগুঢ়তম অনুভূতির ব্যাপ্তি এই ছোটগল্পের মাধ্যমেই পাওয়া যায় বলেই হয়তো ছোটগল্পের আবেদন শাশ্বত। সমকালীন গল্পকারদের মধ্যে অনেকেই বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই শাখাটিতে প্রগাঢ় নিষ্ঠা ও বিপুল গৌরবের সাথে বিচরণ করছেন। তাদের সহযাত্রী হিসেবে পথচলার আত্মপ্রত্যয়ে গল্পকার নিবেদিতা আইচের প্রথম গল্পগ্রন্থ `কিছু গল্প অবাঙমুখ` প্রকাশিত হয়েছে সদ্য প্রকাশনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘পেন্সিল পাবলিকেশন্স’ থেকে। এই গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় গল্পকার বলেছেন, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঘাত-প্রতিঘাতে জীবনের পর্যুদস্ত গল্পেরা কথকের মুখে অস্ফুটে উচ্চারিত হয় বলে এই গ্রন্থের গল্পগুলো অবাঙমুখ। তবে আমার আমার কাছে এক কথায় বইটি পাঠের অনুভূতি হলো, জীবনের বহুমাত্রিকতার গল্প বারবার বাঙময় হয়ে উঠেছে গল্পকার নিবেদিতা আইচের এই গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বইটি পাঠের অনুভূতি জানানোর তাগিদ অনুভব করছি।                                                                                                 নিবেদিতা আইচ পার্থিব জীবনের চিরচেনা নিক্তিতে যেসব অনুভূতির সূক্ষ্মতা পরিমাপ করা দুষ্কর সেসব অনুভূতির গল্প খুঁজে পাই কিছু গল্প অবাঙমুখে। বিশেষ করে এই বইয়ের `আমাদের পুরনো ছাদ` গল্পটি পাঠকের মনোজগতকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করবে। নিঃসন্দেহে এই গল্পটি এই বইয়ের অন্যতম সেরা গল্প। বাঁকা হতে হতে আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে তবু আমাদের কোনোদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমাদের মৃত স্বপ্নের মাঝে আমরা সাড়হীন বিকলাঙ্গ প্রাণির মতো পড়ে আছি। স্বপ্ন আর আলোহীন জীবন মৃত্যুরই নামান্তর। একসময় আমাদের একটা ছাদ ছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল, এখন আমরা আমাদের পুরনো ছাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগে ভুগে স্বপ্ন ছোঁয়ার সকল সাধ বিসর্জন দিয়ে কোমর বাঁকা করে হাঁটি। এই গল্পগ্রন্থের রূপকাশ্রিত গল্প ` আমাদের পুরনো ছাদ` গল্পটি খুব আটপৌরে ভাষায় শুরু হলেও ক্রমে ক্রমে তা গোটা বাংলাদেশের রূপ ধারণ করে বৃহৎ একটি গল্প হয়ে উঠেছে। এই গল্পের সমাপ্তিতে মনের ভেতরে একটি প্রশ্নের গুঞ্জন চলতেই থাকে-আমি বা আমরা কি সত্যিই মেরুদণ্ডহীন? এখানেই হয়তো গল্পকারের সার্থকতা। পত্রসাহিত্য বরাবর বুকের ভেতরে ঢেউয়ের তোলপাড় তোলে, স্মৃতিকাতর করে। আবলুশের দেরাজে বন্দি একটি চিঠি আর বইয়ের ভাঁজ থেকে পনেরো বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া একটি চিঠি-এই দুটি চিঠি নিয়ে দুজন মানুষের গল্প `অকালবোধন।` যখন বাতিঘরকে সম্বোধন করে ছন্দার চিঠি পড়ছি তখন ক্যাফে রোজ্জোতে ম্লানমুখে অপেক্ষারত একটি মায়াবী মুখের জন্য বুকের ভেতরে মুচড়ে উঠেছে। আবার মধুছন্দার চিঠির জবাবে এত বছর পর বাতিঘরের যে প্রতিউত্তর এলো সেই চিঠির গন্তব্যহীনতা একইভাবে তোলপাড় তুলেছে বুকের ভেতর। `পাপস্নান` গল্পটি শুরু হয়েছে আমাদের খুব চেনা একটি চরিত্রের দিনলিপির বর্ণনা দিয়ে। মেসে রান্না আর ফ্লাটবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে সুফিয়া। একদিন ও কাজে গেলে ওর নয় বছরের মেয়ে আদুরিকে ধর্ষণ করে নরপশুর দল। পুলিশী হাঙ্গামা এড়াতে বস্তির মালিক এরপর ঘর ছাড়তে বলে মা-মেয়েকে। মেয়ের নিরাপত্তার চিন্তা আর ট্রাকচালক নেশাখোর স্বামীর নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা সুফিয়া পাপস্নানে সিক্ত হয়ে নিজের আর নিজের সন্তানের জন্য আলো খোঁজে। বাস্তবতার নিরিখে নির্মিত এই গল্পটি বেশ পরিণত।                                                                                                    সাদিয়া সুলতানা অভাবের সাথে কি ভাগ্য বিড়ম্বনার নিগুঢ় কোনো সংযোগ আছে? গল্পকার যখন লেখেন, `দুলি এত শক্ত শক্ত কথা মনে রাখতে পারে না। রোগের যত নামই হোক না কেন গরীবের জন্য সবই এক আর তা হলো ওই জঠর যাতনা। দুলি তাই এসব মনে রাখে না। ডাক্তার বলে খালি পেটে অমুক ওষুধ আর ভরাপেটে তমুক খেতে হবে, দুলি ভাবে তাদের আবার ভরাপেট আর খালিপেট! এমন কোনো ওষুধ কি আছে যাতে এই ক্ষুধা তৃষ্ণা মিটে যাবে আজীবনের জন্য?’ তখন নিষ্ঠুর ছকে বাঁধা জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম গল্পের আভাস পাই। বানের পানির দুর্ভোগের সাথে চিত্রিত সন্তানসম্ভবা দুলিকে নিয়ে লেখা `বান` গল্পটি ভালো লাগার বোধের চেয়ে মনে বিষাদের বান উসকে দেয়। দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা `দ্বিতীয় জন্ম` গল্পটি ঠিক নিটোল প্রেমের গল্প না। যদিও একজন প্রেমিকের নিপাট ভালোমানুষির গল্পও হয়ে উঠতে পারতো এটি। যা হয়তো অবাস্তবও মনে হতো পাঠকের কাছে। যৌন হয়রানি নিয়ে লেখা এই গল্পটি প্লট সাজানোর দক্ষতার কারণে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। `নির্জনার অহর্নিশ` গল্পের ছকটি খুব চেনা। ভাগ্যবিবর্জিতা নারী বিভার জীবনের নানা সংকটের মাঝে হুট করে উঁকি দেয়া ভাগ্যরেখাটি পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে মামুলি মনে হলেও পিতাকে অবলম্বন করে সন্তানসুখে বিভোর বিভার গল্পটি পাঠক হিসেবে আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। মুক্তিযোদ্ধা আবিদের ডানহাতের তিনটে আঙুল আর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচ কেটে ফেলতে হয়েছিল। লড়াকু আবিদ তবু বেঁচে ছিল। আবিদের পত্রমিতা রিনা। রিনার জন্য বুকপকেটে আবিদের চিঠি নিয়ে যায় গল্পকথক। সেই চিঠি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধদিনের খণ্ডচিত্র। চিঠিটি পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসে, মনের মাঝে কিছু প্রশ্ন উঁকি দেয়। জীবনভর আমরাও এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরি। রিনা, আবিদ বা গল্পকথকের কাছেও হয়তো সেসব প্রশ্নের অজানা। মুক্তিযুদ্ধের গল্প `বুকপকেটে মৌসন্ধ্যা` এই বইয়ের একটি শক্তিশালী গল্প। যুদ্ধোত্তর কালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গল্প লেখার মতো কঠিন কাজটি দক্ষতার সাথেই করেছেন লেখক। `ক্যানভাস আর নিকোটিনের গল্প` গল্পটির ক্যানভাস ছোট কিন্তু ব্যাপ্তি বড়। `পাণ্ডুলিপি` গল্পটির গল্প ছাপিয়ে গেছে গল্পটিতে ব্যবহৃত কবিতার সৌন্দর্য। তাই এই গল্পটি দারুণ একটা গল্প হবার আশা জাগিয়েও দপ করে নিভে গেছে। এই গল্পটি ছাড়াও `মৃত নদীর জীবন`, `মমতাজ মহল` গল্প দুটোতে লেখকের আরেকটু সময় নেয়া জরুরি ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। পরিশেষে নতুন প্রকাশনী ‘পেন্সিল পাবলিকেশন্স’ এর সকল শুভ উদ্যোগের জন্য শুভকামনা রইল এবং যেই বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে `কিছু গল্প অবাঙমুখে`র মাধ্যমে গল্পকার নিবেদিতা আইচের যাত্রা শুরু হলো তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক সেই স্নেহাশীর্বাদ রইল। গল্পগন্থ `কিছু গল্প অবাঙমুখ`গল্পকার `নিবেদিতা আইচ`প্রকাশনী-পেন্সিল পাবলিকেশন্স টিআর/

বৃষ্টি ও জ্যোৎস্নার জন্য ভালোবাসা

গত কয়েক মাস ধরে দিনরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার এ্যান্ড রোবোটিক্স ডিপার্টমেন্টের ল্যাবরেটরিতে খাটাখাটুনি করছি আমরা চারজন। আমি, নিহাল, রুবিনা এবং রাতুল। আমাদের চারজনের টিমে রুবিনা একমাত্র মেয়ে। আমি বাদে প্রত্যেকেই তারা স্ব স্ব ডিপার্টমেন্টে সর্বোচ্চ সিজিপিএ প্রাপ্ত এবং রোবটিক্সের উপর তাদের কাজের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। রাতুল তো বায়ো-রোবটিক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এ বিশ্ব সেরাদের একজন। আমি এখনো অবাক হয়ে ভাবি কিভাবে আমি এই বিশাল বিশাল মেধাবীদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। যাইহোক একটা অপ্রয়োজনীয় তথ্য সবাইকে জানিয়ে রাখি, আমরা কেউই বিবাহিত নয়। কারণ দেশের সেন্ট্রাল কম্পিউটার থেকে আমাদের জন্য এখনো কোনো সঙ্গী ঠিক করে দেওয়া হয়নি।

‘পেছন ফিরে তাকাই যখন’

আজ থেকে চুয়ান্ন বছর আগের কথা। কেমন করে যে এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, তা ভাবতেও অবাক লাগছে।আব্বার রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই সময়টাই ছিল এমন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে যমুনা নদীর তীর ঘেঁষা শহর সরিষাবাড়ী গার্লস হাইস্কুলে পড়তাম। তখনও দেখেছি মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের অনীহা ছিল। আর এ কারণেই স্কুলের চারজন আয়া সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের নিয়ে স্কুলে আসত; আবার স্কুলছুটির পর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত। ১৯৬৩ সালে আব্বা শায়েস্তাগঞ্জে বদলি হলেন। বদলির কারণে আব্বার আর আমাদের মন ভীষণ খারাপ ছিল। বিশেষ করে আমার। কারণ শায়েস্তাগঞ্জে তখন মাধ্যমিক স্তরের কোনো গার্লস স্কুল ছিল না। ইচ্ছে না থাকা সত্তে¡ও আমাদের নিয়ে ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসে আব্বা চলে এলেন শায়েস্তাগঞ্জে। এখানে এসেই আব্বার সঙ্গে গিয়ে আমি আর আমার দুই ভাই শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আমি অষ্টম শ্রেণিতে এবং দুই ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। প্রথম প্রথম ছেলেদের স্কুলে পড়তে বেশ অস্বস্তিতে ভুগছিলাম। নতুন জায়গায় কিছুটা নতুনত্ব ছিল বৈকি! কিন্তু নিজেকে যেন সহজে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। তবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হতে লাগল। স্কুলটি কিন্তু আমার প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল। ছায়া সুনিবিড়। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। শান্ত পরিবেশ। স্কুলের পূর্বদিকে বহমান খোয়াই নদী, উত্তরে শায়েস্তাগঞ্জ-সিলেট রেললাইন সমান্তরাল চলার অনুপম চিত্র ও পশ্চিম পাশেই বিশাল খেলার মাঠ। তাছাড়া রেল স্টেশন ও বাজার থেকে প্রায় এক মাইল দূরত্বে সুন্দর শান্ত পরিবেশ। বৃহদাকারের হৃষ্টপুষ্ট অসংখ্য ডালপালাসমৃদ্ধ শিরিষ গাছগুলোর ছায়া যেন আরো শীতল ও শান্ত করে রেখেছিল স্কুলের পরিবেশ। প্রায় এক হাজার ছাত্রের মধ্যে মাত্র দশ-বারো জন ছাত্রী ছিলাম আমরা। আমাদের জন্য আলাদা বসার কোনো রুম ছিল না। টিচার্স কমনরুমেই তিন-চারটি বেঞ্চে আমরা বসতাম। তাই বলে আমাদের জন্য শিক্ষকদের কোনো অসুবিধা হতো বলে আজো মনে করি না। ক্লাসে যাওয়ার সময় আমরা স্যারদের পেছনে পেছনে যেতাম। ক্লাস শেষে আমরা আবার আমাদের জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকতাম। অষ্টম শ্রেণিতে একশ’র মতো ছাত্র ছিল আর আমরা ছাত্রী ছিলাম মাত্র আটজন। বার্ষিক পরীক্ষার পর মাত্র দুজন ছাত্রী আমি আর হেনা প্রমোশন পেয়ে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। বাকি ছয়জন ঝরে পড়ল। তখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তো আর এখনকার মতো ছিল না। মেয়েদের শিক্ষার হার ছিল খুবই নগণ্য। তাছাড়া ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বাধানিষেধ। লেখাপড়া করার ইচ্ছা সবার; কিন্তু সামাজিক বাধানিষেধের কারণে তা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। মুসলিম পরিবারের মেয়েদের স্কুলে লেখাপড়া করাটাকে মেনে নেওয়ার মনমানসিকতা ছিল না তখনকার সমাজে। কিছু কিছু অভিভাবক মনে করতেন প্রাইমারি পাস করে চিঠিপত্র পড়তে ও লিখতে পারলেই যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ সেটাও মেনে নিতেন না। মেয়েরাও যে উচ্চশিক্ষিত হয়ে চাকরি করে ছেলেদের সমপর্যায়ে বা পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে সেই চিন্তা কোনো কোনো অভিভাবকের মনেও হয়নি। এছাড়া ছিল বাল্যবিয়ের প্রকোপ। বারো-তেরো বছর হলেই বিয়ের কাজটা শেষ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন অভিভাবকরা। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েদের বেশি পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে আমার তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু দেখেছি, তখনকার ছেলেরা অত্যন্ত সভ্য, ভদ্র ও মার্জিত ছিল। সবার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল লেখাপড়া শিখে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। যতদিন এ স্কুলে পড়াশোনা করেছি, এ সময়ের মধ্যে আমরা কোনোদিন কোনো ছাত্রের সঙ্গে কথা বলিনি। এখন কি এটা সম্ভব? অথচ আমরা অনেকেই একই পথে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। আমাদের শিক্ষকরাও তাদের পেশাকে নেশা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাদের যোগ্যতা দিয়েই ছাত্রছাত্রীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। তাঁরা আমাদের স্নেহ, ভালোবাসা, শাসন, আদেশ, উপদেশ দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দু-তিনজন স্যার ছাড়া বাকি সবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। আমরাও মরণসমুদ্রের বেলাভ‚মিতে দাঁড়িয়ে আছি। যতদিন বেঁচে থাকব, আদর্শ মানুষ হিসেবে যেন বেঁচে থাকি। সবার ভালোবাসা ও দোয়া প্রত্যাশা করি। লেখক: ১৯৬৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী

এটি ছাড়া যাবেন না...

কোনোভাবেই রেখে যাবেন না। আর না গেলেই সব আয়োজন ভণ্ডল। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ছেলে লিমন মণ্ডল অপেক্ষার প্রহর গুণছে। হবু স্ত্রীর এমন বায়না। বিয়ের আসরে শ্বাশুড়ি আম্মাকে উপস্তিত থাকতেই হবে। ফ্রান্সের নাগরিক থ্রীয়া পাউয়ে। তার সঙ্গে লিমন মণ্ডলের বিয়ে পাকাপাকি। দিনক্ষণও ঠিকঠাক। থ্রীয়ার এমন আচরণ অনেকটা প্রথাবিরোধী। ফ্রান্সে বিয়ে-অনুষ্ঠানে বর-কনের আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত থাকাটা বাধ্যবাধকতা নেই। থ্রীয়ার এ দাবি তাকে চরম বেকাদায় ফেলে দিয়েছে। তবে লিমন মনে মনে খুশি। অন্তত এ উপলক্ষে আসা হবে মায়ের। অনেক দিন মায়ের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। জীবীকার তাগিদে বৃদ্ধ মাকে একা রেখে আসতে হয়েছে। দেশে মা ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা মারা গেছে বহু বছর আগে। এক মাত্র সন্তান লিমন মণ্ডল। কিন্তু মায়েরও একি বায়না! আত্মীয়রা ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছে। তিনিও বগার মতো এক পায়ে খাঁড়া। এটি ছাড়া যাবে না, পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। একটি মাত্র মুরগির ছানা। ছানাটির মা মারা গেছে রাতকানা রোগে। ছানা নিয়ে আঙ্গিনায় কুত্-কুত্, ছানা মায়ের ডাকে কিত্-কিত্ ডেকে-ডেকে পেছনে পেছেনে ছুটে চলে। আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাবারও খাওয়ায়। তিনি প্রতিদিন এ দৃশ্য দেখে আসছেন, আবার চাউল ভাঙা খুদও খেতে দেন নিজে। না খেয়ে রান্না করা ভাতও খেতে দেন। এভাবে বাচ্চা ছানাটি লালন-পালন করে আসছেন। মরার কাক-চিলে-নেউলে এক এক করে ১০/১১টি ছানা নিয়ে যায়। ছানাগুলো নিজেদের আত্মরক্ষা করার কৌশল শিখার আগেই মা মারা গেল। ঘরের আঙ্গিনায় কাটা ঝুঁপঝাড় রাখা আছে। কাক-চিল আসতে দেখলোই যেন লুকিয়ে যেতে পারে। সর্বশেষ বাচ্চা-ছানা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এখন বাচ্চটা বেশ বড় হয়েছে। তবুও সারাক্ষণ পেছনে-পেছনে কেমন কিক্-কিক্ ডেকে-ডেকে ঘুরে-বেড়ায়। আদার খান পর্যন্ত কিছুক্ষণ শান্ত থাকে। কিন্তু দু’চোখ আড়াল হলেই কেমন আবার ঝাঁপটাঝাঁপটি।   যখন রেখে যাবে না, তা হলে তো আর কোনো উপায় নেই। থলে ভরে নিলে তো হয়। বিষ্টা থলের মধ্যে পরবে। কালো রঙের একটি পলিথিনের মধ্যে শুধু মাথাটা বের করে আছে। সহজে দুনিয়া দেখছে এবং নিশ্বাসও নিতে পারছে। তিনি বহন করছেন, কাউকে স্পর্শ করতে দিচ্ছেন না। সবার তার এমন আচরণে বিরক্ত। তাই, অগোচরে ছোঁড়েও ফেলে দিতে পারে, তিনিও তা বুঝতে পেরেছেন। বিমান বন্দর পর্যন্ত নিজেদের ভাড়া মাইক্রোতে যেতে হলো। এ পর্যন্ত পথে একবার বিষ্টা ছেড়েছে। তিনি নিজে নিজে পলিথিন ঝেঁড়ে নিলেন। ইন্ডিয়া ইয়ারওয়ে। প্রথম স্টেশন কলকাতার নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু। দ্বিতীয় দিল্লির মহাত্মা গান্ধী স্টেশন। দিল্লি থেকে সরাসরি ফ্রান্সের প্যারিসে, মাঝে কোথাও বিরতি নেই। তাই যাত্রীদেরও নামা-উঠার সুযোগ নেই। লাগেজ স্কেনারে, আর বাচ্চাটা বরাবরই তার কোলে। লাগেজ টেস্টে কোনো প্রকার বিপদ-সংকেত দেখায়নি। তিনি যেতেই চেকপোস্ট আপত্তি জানালো। কিন্তু যতসব ঝামেলা তার হাতের পুঁটলিটি নিয়ে। তারা দেখলেন ছোটখাটো একটি প্রাণী। অনেকটা রসাত্বক কৌতুহল সৃষ্টি হলো। এখন এটাই আলোচনার মধ্যমনি। আস্ত একাট প্রাণী নিয়ে যাওয়া। তা আবার মুরগির বাচ্চা; দাম কতবা হবে? এটি কী রেখে যেতে পারেননি? তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। এ যাবত তারা ইমিগ্রেশনে এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পায়নি। রেখে যাওয়া তো দূরে থাক কাউকে ধরতেই দিচ্ছেন না। কী আর করা ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র দিতে হলো, অতি বৃদ্ধ দেখে এ সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রাম্য নারী হিসেবে কিছুটা নমনীয় হলো। তারা তার মনে কষ্ট দিতে চায়নি। এমনিতে এ বয়সে মাতৃভূমি-দেশ পাড়াগ্রাম প্রতিবেশী ছেড়ে যেতে হচ্ছে। ভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতি তাকে মেনে নিতে হবে। প্লেন চাড়ার পূর্ব মুহূর্তে বিমানবালারা চেক করে দেখে। তাদের চোখেও এটি ধরা পড়ে। তারা এমন কাণ্ড কখনো দেখেনি। একজন একজন করে তারা সবাই দেখে গেল। তাদের মনেও কী একটা অজানা ভয় উঁকিঝুঁকি দেয়। ইমিগ্রেশনে তারা মেসেজ দেয়, এমনতর বস্তুর বা প্রাণীর উপস্থিতির কথা। ইমিগ্রেশনে পজেটিব আনসার আসায় কেউ আর কোনো আপত্তি করেনি। প্লেন ছেড়ে যায় আকাশে। খণ্ড-খণ্ড ঝড়োমেঘ কেটে চলেছে। স্থির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লেনের ভেতরে কি একটা কিয়ক্-কিয়ক্ ডেকে উঠে। যাত্রীরা এবং এটেন্ডেনগণ হতচকিত। এমন শব্দ কোত্থেকে এলো, তারা খোঁজতে থাকে। একপর্যায়ে নিশ্চিত হলো মুরগীর ছানার এমন ডাক। খিদে পেয়েছে তো, বৃদ্ধা তা বুঝতে পেরেই কাপড়ের আঁচল থেকে চাউলের খুদ বের করে দেয়। ‘টুক-টুক’ করে খাচ্ছে। সবাই তা দেখে ‘হো-হো’ হেসে উঠে এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এলো। এর মধ্যে তারাও একটি মেসেজ পাঠিয়ে দেয় স্টেশনে। বিপজ্জনক শব্দটি একটি কক্ ছানার শব্দ। প্লেনে কক্ ছানা এলো কোত্থেকে স্টেশন জানতে চাইল। তারাও বৃদ্ধার কাহিনিটি জানালো। সেখানেও হাসাহাসি, তবে তারাও পাল্টা উত্তর দেয়, এমন খেয়ালিপনা করা উচিৎ হয়নি বলে জানালো।  দিল্লিতে ল্যান্ড করায় সব স্টাফ পাল্টে গেল। নতুন স্টাফ-বিমানবালা এলো দায়িত্বে। সঙ্গে সঙ্গে চেকসহ যাবতীয় নিরাপত্তা দেখভাল শুরু হয়। বিমানবালাগন যাত্রীদের নাম-ধাম ঠিকানা ঠিকঠাক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে লাগল।  ‘চাচী, আপকা নাম কিয়া হে? দেশ...? এতনে কিয়া হে, বাবু, মোজে দেখনে-দেখনে।’ হঠাৎ বিমানবালার এমন প্রশ্নে দিশাহারা। অনেকটা বিমানবালার চোখে চোখে তাকিয়ে নড়েচড়ে বসেন তিনি, সঙ্গে পুঁটলিটাও আরও শক্ত করে ধরেন। নজরে পড়লো বিমানবালারও। তিনি আরও পরখ করে দেখতে থাকেন। গায়ে কালো বোরকা, বোরকাটি কেমন কুঁচানো। মনে মনে ভাবেন, কখনও আয়রন করা হয়েছে কিনা কে জানে? ডিম্বা আকৃতির চোখ, মুখ ও কপালে অজস্র বলিরেখা। যুবুথুবু দেহের ভাঁজে ভাঁজে এক ধরণের ভীতি ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ফুটে উঠে। পুঁটলিটি স্বজোরে আগলিয়ে রেখেছেন। সম্ভবত কাউকে এটি ধরতে দেবেনই না তিনি।   বিমানবালা আবারও প্রশ্ন করলেন,‘চাচী, আপনা নাম...?  এতনে...? একপর্যায়ে বিমানবালা এসব বলে হাতবাড়িয়ে দেয়। কিন্তু পুঁটলিটি কোনোভাবেই দেখাতে রাজি নন। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘তুই কারো মাইয়া, দাঙ্ঘর কোত্থোন, ন-দিয়ুম, ন-দেখায়ুম।’ এ বলে আরও শক্ত করে আঁটকে রাখলেন এবং তড়িগড়ি বোরকা টেনে ঢেকে দেয়, যেন না দেখতে পায়। চটে গেলো বিমানবালা। তার চোখেমুখে ভীতিকর-আতঙ্কভাব। তিনি চেঁচিয়ে সহকর্মীদের ডেকে উঠলো। তারাও দল বেঁধে তেড়ে আসে। কী একটা বিপজ্জনক সংকেত। এর মধ্যে আবারও ‘খড়-খড়’ ডেকে উঠে মোরেগের ছানা। যাত্রীগণও তাতে হেসে উঠেন, তারা প্রথম থেকে দেখে আসছেন বুড়ির কাণ্ড। অনেকটা হট্টগোল বেঁধে গেলো।  বিমানবালা আবারও জিজ্ঞেস করলো, ‘চাচী, ইয়া কিয়া হে?’ ‘কী হে কী হে, এ্যান গরি কি জানতে লায়গোজে? কুরার ছা-রি, আই ন-দিয়ুম! আর পোয়ার বিয়ে, আরতন ফ্রান্সে যনপরের। তোরে ন-দিয়ুম। আই বইত কষ্ট গরি পাল্লি-যে।’   বিমানবালাসহ অন্যান্য স্টাফগণও দিশাহারা, খোদ পাইলট এসে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। এমতাবস্থায় যাত্রা বিলম্ব করতে বাধ্য হলো। তারা যাত্রীটির দেশ ও বুকিং স্টেশনে যোগাযোগ করে একটি মেসেজ বার্তা প্রেরণ করে। সঙ্গে সঙ্গে বিমান স্টাফরাও তা শোনে হতচকিত। কী ঝামেলা যে বেঁধে গেলো। জানি না শেষ পর্যায়ে এ নিয়ে কি ঘটনা ঘটে যায়। তারা ডাটাব্যাস ওপেন করে বৃদ্ধার বায়োডাটা দেখে পাল্টা উত্তরে একটি ইমেল বার্তা প্রেরণ করে। এ বৃদ্ধা ফ্রান্সে যাচ্ছেন। ওইখানে তার ছেলে থাকেন এবং তার বিয়ে-অনুষ্ঠান। সঙ্গে একটি ব্যাগ ও পালিত একটি মুরগীর বাচ্চা আছে। তিনি খুবই শান্ত-স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছেন। গ্রামের অতি স্বহজ-সরল নারী। কোনো প্রকার ঝুঁকি নেই। এটি আমাদের স্কীনেও ইনফরমেশন আছে। দিল্লির ইমিগ্রেশন ঢাকার এই ইমেল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় যাত্রার নির্দেশ দিলো। তবে এ ঘটনায় ন্যুনতম এক ঘণ্টা বিলম্বে বিমান ছেড়ে গেল। দীর্ঘ আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে প্যারিসের রোসিয়া এয়ারপোটে ল্যান্ড করলো প্লেন। আর মায়ের জন্য অপেক্ষায় আছেন পুত্র লিমন মণ্ডল। সঙ্গে হবু স্ত্রী থ্রীয়ার পাউয়েও রয়েছে। প্লেন নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা বিলম্বে ল্যান্ড করে। কিন্তু থ্রীয়ার মধ্যে এক ধরণের কৌতুহল কাজ করছে। হবু স্বামীর মুখে অনেক গল্প শোনেছে। গ্রামের সহজ-সরল নারী। একটি শিল্পোন্নত-আধুনিক রাষ্ট্র্যের বৈচিত্রময়তার সঙ্গে কতটুকু বা খাপ-খাওয়াতে পারবেন। এসব নিয়ে সে লিমনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন। এক এক করে যাত্রীরা যার যার অবস্থায় বের হয়ে গন্তব্যে ছুটলেন। কিন্তু লিমনের মায়ের কোন দেখা মিললো না। সে দিগ্বিদিক উঁকি দিয়ে দেখলেন। হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। লোকজনও দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। বোমা-বিস্ফোরক বহনকালে এক যাত্রীকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনি। তাৎক্ষণিক গুঞ্জন-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাইরেন বাজিয়ে বিশেষ ফৌজ, ফায়ার সার্ভিস ও এম্বুলেন্স ধেয়ে আসতে থাকে। যাত্রীরা যার যার অবস্থানে সর্তক অবস্থায় রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনি বিস্ফোরক বহনকারিকে থামিয়ে দেয়। বড় ধরনের সাউন্ড বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বোমা বহনকারিকে কোপাঘাত করা হয়। কিন্তু কোনভাবেই বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা যাচ্ছে না। রীতিমত চেকপোস্টের লাউন্সে জীবন্ত বিস্ফোরকটি দৌড়াদৌড়ি করছিল। এতে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফৌজ পজিশনে। নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা রয়েছে অন্যখানে, এটি জীবন্ত বোমা, লক্ষ্যে গুলি ছুড়লে পাল্টা ধ্বংসযজ্ঞ বাড়বে। এই ধরণের বিস্ফোরক সর্ম্পকে পূর্বে তাদের কোনো ধারণাই নেই। এটি নিয়ন্ত্রণে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ ধরণের শব্দে এটি আরো এলোপাতাড়ি ছুটতে থাকে। অদূর থেকে ডিজিটাল ক্যামরায় ধারণকৃত দৃশ্য ইলোট্রমিডিয়ায় দেখাচ্ছিল। বহনকারীকে অজ্ঞান অবস্থায় একটি ট্রেতে উঠিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসাকেন্দ্রের দিকে নিয়ে যেতে  দেখা যাচ্ছে। বহনকারীর পরনে হিজাব পরা দেখা যাচ্ছে। তাতে তার মুখ-মণ্ডল দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো ‘জঙ্গিগোষ্টি’র অপতৎপরতা। হয়তো প্যারিসে এ এয়ারপোর্ট উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। অবিশ্বাস্য এ ঘটনা। ইতিমধ্যে কয়েকটিও রাষ্ট্রে এমন নাশকতামুলক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এ বিস্ফোরক পরীক্ষা করার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্ভবত দেশটিতে নেই। দেশটির রাষ্ট্রিয় বিস্ফোরকদল অনেকটা বোকা বনে গেছে। কোনো সিদ্ধান্ত দিতেই পারছে না। র্স্পশ করলেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে। জীবন্ত বিস্ফোরকটি অবিকল দেখতে প্রাণী সাদৃশ্য। যেন ছোটখাটো উট পাখি। সামনের অংশ মুখ থেকে ঝোলা এবং পেছেনের দিক পালকশূন্য। শুধু ডানায় হালকা হালকা কিছু পালক আছে।   ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা বিভাগ দিশাহারা। তারা কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তারা মিত্রশক্তির সহযোগিতা কামনা করছে। বিশ্বের সব চাইতে প্রতাবশালী দেশ আমেরিকার পেন্টাগনের সাহয্য চাইলো। বিজ্ঞানিগণ বিকাশমান প্রযুক্তির কাছে প্রতিনিয়ত সংশয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। একের পর এক নতুন আবিষ্কারের স্বাক্ষর রেখে চললেও বিস্ফোরকটি আদৌ কী তারা সনাক্ত করতে হিমসিম খাচ্ছে। খুবই দ্রুতগতিতে পেন্টাগনের একটি উচ্চ ক্ষামতাসম্পন্নদল ছুটে এলো। দলটি প্রথমে বস্তুটির গতিবিধি দেখলো। তারাও ঘাবড়ে গেল। প্রথম থেকে এমন সংশয় সবার স্নায়ূচাপ বেড়ে গেল। আপাতত একটি লোহার খাঁচায় বন্ধী করা হলো। প্রবাহমান রক্তের মধ্যে বিস্ফোরক জাতীয় অতিকায়ক ক্ষুদ্রকণা লুকায়িত রয়েছে কী-না, কোনটিই স্পষ্ট নয়।      দলটিও সিদ্ধান্ত প্রকাশে অপারগতা জানায়। তারা হাইলি ল্যাবলেটরি পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে চায় এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে যা করার তা করবে, ছাড়পত্র পেলেই তাদের দেশে নিয়ে যাবে। এদিকে নিরাপক্তা বাহিনীর হাতে আটক নারীর ছবি বার বার ইলেট্রোমিডিয়ার স্কীনে দেখানো হচ্ছে। তখনো নারীটির জ্ঞান ফিরেনি। সরকারী এক হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালটিরও সম্ভাব্য স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে, হামলা বা দূর্ঘটনা এড়াতে। লিমন মণ্ডল নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন, এ নারী তার মা হবেন। কিন্তু তার মায়ের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর এমন আচরণ কেন, তিনি হিসাব মিলাতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, নিজের আত্মীয় পরিচয় দিতেও ভয় পাচ্ছেন, কখন নিজেকে না আবার হেনস্তা হতে হয়! এ ব্যাপারে তার হবু স্ত্রীর সহযোগিতা চাইলেন। থ্রীয়া নিজেতো ফ্রান্সের নাগরিক। রাষ্ট্রিয় অনেক কিছু তার জন্য সহজ। তিনি পরামর্শ দিলেন, আড়ালে না থেকে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদর দপ্তরে দেখা করার জন্য। এমনিতে এ যাত্রীর দেশ এবং ইমিগ্রেশন বিভাগের খোঁজ-খবর নেবে আইনশৃঙ্খলা বিভাগ। তখন উল্টো সমস্যায় পড়তে হবে। বরং, স্বশরীরে গিয়ে মায়ের সহজ-সরলতা এবং গ্রাম্য আচার-কৃষ্টির কথা জানালে বিশেষ বিবেচনায় সহযোগিতা পাওয়া যাবে। হবু স্ত্রী থ্রীয়ার যুক্তি তার পছন্দ হলো। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন সঙ্গে তাকে নেবেন। থ্রীয়াও তাকে সব প্রকার সহযোগিতার করার আশ্বাস দিলেন।   প্যান্টাগণের বিশেষজ্ঞগণ খুবই গুরুত্বসহকারে দেখছিল বস্তুটিকে। তারাও রক্ত সঞ্চালনসহ দেহের কাঠামো উপ-কাঠামো এং গঠনপ্রণালী পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি চক তৈরি করে। তারা বহনকারীরও খোঁজ-খবর নিল। দেশটির সর্ম্পকেও জানতে চাইলো। তারা এ-ও জানতে পারলো, এটি এশিয়ার একটি দেশ এং অবিভক্ত ভারতবর্ষের একটি রাজ্য। অবশ্য এখন এটি স্বাধীন একটি রাষ্ট্র। তবে সংস্কৃতি ও কৃষ্টি  কিছুটা ভারতীয় আচরণে বেষ্টিত। ভৌগলিকগত অঞ্চলটির মানুষ স্বল্পাহারী। ভেজিটেবল, আমিষ ও শর্করাজাতীয় খাদ্যসহ মাত্রারিক্ত মসল্লাভোগী। তার সঙ্গে তারা গৃহস্থালী যতসব উৎপাদন এবং প্রাণী লালন-পালন করে। এসব তাদের প্রাণের মতো-সন্তানতুল্য। সর্বত্র এসবের বিরজমান। কোথাও কোথাও প্রাণীকুলকে দেবতুল্য এবং জননী হিসেবে সম্মোধন করে। তবে অঞ্চলে ভেদে মতভেদও আছে। হামেশা এ নিয়ে রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামাও হয়। মুহূর্তে উত্থাল, মুহূর্তে শান্ত। তবে তারা অতি মানবিকও। পুরনো আচার-প্রথা মেনে চলে।  আপাতত তারা যে তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে, তাতে দেখা যায় এটি গৃহস্থালী প্রাণী। বৃদ্ধা সন্তানের কাছে আসতে গিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। প্রাণীটির মুল্য খুব বেশি নয়। তাতেও তিনি সেইটি রেখে আসেননি। অতি প্রিয় এবং ভালোবাসার টানে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। প্রণীটি সংশ্লিষ্ট দেশ ও দিল্লিরও নজরে পড়ে। তারাও বিষয়টি এভাবে দেখেই গমনে ছাড়পত্র দেয়।    এতসব ব্যাখ্যার পরও সহজভাবে মেনে নিতে পারছেনা পেন্টাগন। তারা আরও পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালাতে চায়। তারা তাদের দেশের অবসরপ্রাপ্ত এক বিজ্ঞানিকে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি না কী এ যাবতকালের সব আবিষ্কারকদের একজন। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। তার নাম উলিয়াম আব্রাম। বিশেষ ব্যবস্থায় তার আগমন। বয়সেও ন্যূজ এ বিজ্ঞানি। যবুথবু-থুতথুরিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন। সবাই নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, এ বিজ্ঞানি নিজের শরীর নিজে বহন করতেও অক্ষম। তিনি কী বা পরীক্ষা করবেন। তিনি হাত উঁচিয়ে দেখালেন। তারপর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘বের করো ওটি।’ সঙ্গে সঙ্গে বস্তুটি ‘কিক্ কিক্’ শব্দে ডেকে টেবিলে হাঁটাচলা করতে লাগল। একটু অপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে গেলেন। ইনস্টিটিউটের সব কর্মকর্তারা বিশেষ সর্তক অবস্থায রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে বিশেষ ব্যবস্থায় দৃশ্যটি অবলোকন করছিলেন। তার সঙ্গে কয়েকটি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করছিল। দেশব্যাপী নয়, বিশ্বব্যাপীও তা নিয়ে কৌতুহলের কমতি নেই।  উলিয়াম নীল আব্রাম বস্তুটি হাতে উটিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের উপরি অংশের সরু পাতাতে চিমটিকেটে ছেড়ে দেয়, দেখলেন প্রাণীর মতো রেসপন্স করছে কিনা? তিনি কিছুটা আশ্বস্ত। তারপর একটি ক্ষুদ্র পিন দিয়ে ওই অংশে বিঁধলেন। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ফোটা রক্ত বের হয়ে এল। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বস্তুটিকে ছুড়ে দিয়ে বলে উঠলেন- ছোটগল্প। কেএনইউ/ এসএইচ/  

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি