ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:০৮:০৬, বৃহস্পতিবার

নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধের কারিগর

নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধের কারিগর

শিক্ষা মানুষকে বিকাশিত করে। গাছ যেমন ডালপালা ছড়িয়ে বড় আকার ধারণ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। তেমনি শিক্ষা মানুষের অস্তিত্বকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিটি স্তরে সেই মানুষের চিহ্ন থাকে যার ভেতর শিক্ষা রয়েছে। আর নৈতিকতা এই শিক্ষাকে উঁচু স্তরে নিয়ে যায়। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দৃঢ়তা, আদর্শবাদী মনোভাবে নৈতিকতার স্বরুপ প্রকাশিত হয়। মানুষের বড় সম্পদ হলো মূল্যবোধ। নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধের কারিগর। সৎ ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য নৈতিক শিক্ষা অপরিহার্য। যার ভেতর নৈতিক শিক্ষার গুণগুলো রয়েছে সে দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেন। নৈতিকতার ইংরেজি Morality. ল্যাটিন শব্দ মোরালিটাস থেকে আগত। যার অর্থ ভদ্রতা, সঠিক আচরণ, ভাল বা সঠিক এবং খারাপ বা ভুল বিষয়সমূহের মধ্যে পৃথকীকরণ। নৈতিকতাকে একটি আদর্শিক মানদণ্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয়সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নৈতিকতা-মূল্যবোধ মানুষের জীবনের এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেখা দেয় নানামুখী প্রতিক্রিয়া। যার পরিণতি হতে পারে পাপবোধ, অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, অশান্তি। যদিও অধিকাংশ মানুষই স্বীকার করতে চান না- এসব ভোগান্তির কারণ হচ্ছে তাদেরই অনৈতিক, অবিবেচনাপ্রসূত, দুর্নীতিপরায়ণ ও প্রতারণাপূর্ণ আচরণের ফলাফল। কোনো একটি কাজ শুরু করতে গিয়ে এর প্রয়োজনীয়তা কিংবা এর ভালো-মন্দ পরিণতি চিন্তার আগে আমরা হয়তো ভাবি, কাজটি করে আমাকে কী কী সুবিধা পাব বা আমি এতে কতটুকু লাভবান হবো? কিন্তু নৈতিক শিক্ষার মানুষ কখনো এ রকম ভাববে না।  কাজটি কাউকে কষ্ট দিবে কি না বা ক্ষতিকর কিনা, সামগ্রিকভাবে কল্যাণকর কিনা এসব চিন্তা করেই সে কাজ করবে। নৈতিকহীনতা শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অশান্তি ও অসুস্থতা সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন মানুষের সার্বিক সুস্থতার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা এবং সমুন্নত নৈতিক চেতনা। বর্তমানে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মনের শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে যথাযথ নৈতিক শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা করি, সোজা কথায়, আমাদের অন্তর্গত সত্তার প্রকৃত ধরনটিই আসলে আমাদের চরিত্র। আর ভালো ও উন্নত চরিত্রের অন্যতম প্রধান শর্তটাই হলো ভালো কাজ। তা যত কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণই হোক না কেন। আর আপনি নিজে যে আচরণ অন্যের কাছে প্রত্যাশা করেন না, তা অন্যের সঙ্গে করাটা কখনোই সৎ-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ নয়। মনোবিদরাও বলছেন, যদি অন্যের কাছ থেকে ভালো আচরণ প্রত্যাশা করেন তবে আপনিও তাই করুন। এতে আপনার একটা অনুপম চারিত্রিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলেও আপনি পরিচিত হয়ে উঠবেন একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ হিসেবে। ফলে চারপাশের পরিবেশও আপনার জন্যে ক্রমশ হতে থাকবে সুখকর, আনন্দময় এবং নিশ্চিতভাবেই কর্মোপযোগী। সামাজিক প্রভাব বা প্রতিপত্তি যাই হোক না কেন, শুধু সদাচরণের পথ ধরেই সবার দৃষ্টিতে হয়ে উঠতে পারেন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। আপনার এই নৈতিকতাসম্পন্ন মূল্যবোধ অন্যদেরও প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে। গবেষকরা বলছেন, চরিত্র-শিক্ষার শুরু হওয়া উচিত শৈশব থেকেই। আর এ দায়িত্ব মা-বাবার একার নয়। আত্মীয়-পরিজন, শিক্ষক এমনকি সমাজের প্রতিটি মানুষের। অর্থাৎ শিশু যাদেরই সংস্পর্শে আসবে সকলের কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে শিশুর চরিত্র গঠনে। এর জন্য শিশুর উপর কিছু চাপিয়ে দিয়ে নয়, ভীতিকর পন্থায়ও নয়, বইয়ের ভাষায়ও নয়। সহজভাবে নিজে করে শিশুকে দেখানো, যাতে শিশুটি অতি সহজে বুঝতে পারে। যেমন ভাল বাক্য বিনিময়, সহযোগিতা করা, সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা, সম্মান প্রদর্শন, আত্মনির্ভরশীল হওয়া ইত্যাদি। আপনার অজান্তেই শিশু তার ক্ষুদে চোখ, কান, মনস্তত্ত্ব দিয়ে সে নীরবে প্রত্যক্ষ করছে আপনার সমস্ত আচরণ ও কথাবার্তা। এগুলো কিন্তু শিশু অনুকরণ করে থাকে। সন্তানের দৃষ্টিতে যদি অনুকরণীয় হতে চান, তবে তাকে যা করতে বলছেন নিজেও তাই করুন। তাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে শেখান ক্ষমা আর সমমর্মিতার মতো মহৎ গুণগুলো। এতে তার অন্তর্গত সত্তা ক্রমশ বিকশিত ও আলোকিত হয়ে উঠবে। এছাড়াও গল্প বলার ছলে শিশুকে কোনো কিছু শেখানোটা বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে শিশু-মনোবিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে। প্রতিদিন না হোক, সপ্তাহে অন্তত যে-কদিন যখনই সময় পান আপনার শিশু সন্তানটিকে সময় দিন। আমাদের নৈতিক সংস্কৃতির আবহে রচিত চিরন্তন গল্প, ঘটনা, উপাখ্যানগুলো তাকে শোনান। এর মর্মকথা তাকে বুঝিয়ে বলুন। গল্পগুলোর অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষা তাকে পরিশ্রমী, বাস্তববাদী ও চরিত্রবান হতে অনুপ্রাণিত করবে। আর এভাবেই তার সঙ্গে গড়ে উঠবে আপনার এক চমৎকার বোঝাপড়ার সম্পর্ক। গল্পের শেষে তার কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত জানতে চান। জিজ্ঞেস করুন, সে কী বুঝল কিংবা গল্পের কোন অংশটি তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এবং কেন? এতে আপনিও তাকে সহজেই বুঝতে পারবেন। প্রযুক্তির আগ্রাসন আর শত কাজের ব্যস্ততায় শিশুর চরিত্র গঠনে বর্তমানে আমরা প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকাই পালন করেছি। কিন্তু যেসব মা-বাবা সচেতনভাবে এ লক্ষ্যে সন্তানদের সময় দিচ্ছেন তারা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান ও সফল। এ উদ্যোগ একদিকে যেমন তাদের সন্তানদের মাঝে সমমর্মিতা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জন্ম দিচ্ছে তেমনি এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুস্থ, সৎ ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক সৃষ্টির মাধ্যমে উপকৃত হবে দেশ ও সমাজ। তথ্যসূত্র : শিশুর উপর বিভিন্ন গবেষণা এবং ইন্টারনেট। এএইচ/
মানুষকে বিকৃত নামে ডাকা মারাত্মক অপরাধ

আমরা হাসির ছলে মানুষকে মন্দ নামে বা বিকৃত নামে ডেকে ফেলি। কারো নাম পদবি বা কার্যকলাপ নিয়ে উপহাস না করলে অনেক সময় সামাজিক আড্ডাই জমে উঠে না। কিন্তু যা আমাদের দৃষ্টিতে হাস্যরসিকতা তা আল্লাহর দৃষ্টিতে জুলুম অর্থাৎ মানুষের মান সম্মান ভূলুণ্ঠিত করার মতো মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ মানুষকে মন্দ নামে ডাকা বা উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। এ উপলক্ষে কোরআনে আল্লাহ বলেন : ‘হে ঈমানদারগণ। তোমাদের কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে কেননা সে উপহাসকারীদের অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী যেন অন্য কোন নারীকে উপহাস না করে কেননা তারা উপহাসকারিণীদের অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যকে দোষারোপ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না, ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত অপরাধ। আর যারা এহেন অপরাধ থেকে তওবা না করে তারাই প্রকৃত জালেম। (সূরা হুজরাত ৪৯:১১) তাই প্রতিটি মানুষের উচিত কারো চালচলন বা আচরণ নিয়ে কোন ধরনের বিব্রতকর মন্তব্য না করা। কোন অবস্থাতেই কাউকে গালিগালাজ না করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্ট বলে দিয়েছেন- মুসলমানকে গালিগালাজ দেয়া ফাসেকি এবং মুসলমান মুসলমানের সঙ্গে লড়াই করা কুফরী। (বুখারী ৩৬১১) যখন কোন মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে গালিগালাজ (সহকর্মী বা অধীনস্থ হোক) করে তখন সে মারাত্মক ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত হয় ও ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তাই আমরা যারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হতে চাই না তাদের উচিত ভুলক্রমেও কাউকে গালিগালাজ না করা। আমাদের সমাজে গালিগালাজ এমনভাবে সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে যে, এটাকে কেউ অপরাধ মনে করে না। এমনকি এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে, এক ব্যক্তি আর এক ব্যক্তিকে ফাসেক বা কাফের বলে অভিহিত করে। অন্যকে কাফের বলা মারাত্মক অপরাধ। হযরত আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) বলেন, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ফাসেক বা কাফের বলে অভিহিত করো না। যাকে অভিহিত করা হয়, সে যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে তা অভিহিত কারীর প্রতি ফেরত আসবে। (বুখারী ৩৫১২) কোন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে কাফের বলে গালি দিলে যার ওপর গালি আরোপ করা হলো সে যদি কাফের না হয় তাহলে গালিদানকারীর দিকেই কাফের হবার অভিশাপ ফেরত চলে আসবে। আমরা যেন প্রত্যেকেই মানুষকে গালিগালাজ করা থেকে বিরত থাকি। কেননা গালমন্দ অভিশপ্ত আগুনের মতো যা মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয় ও মানুষকে কাফের হবার পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে যায়। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/    

দান করলে কি পাবেন জেনেনিন

দান যেমন সমৃদ্ধি আনে তেমনি মর্যাদাও বৃদ্ধি করে। নিঃস্বার্থ ও নীরব দানের মাধ্যমে মানুষ তার মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারে তা অন্য কোন পন্থায় সম্ভব হয় না। এর মর্যাদা এতই যে দানকারি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন। দান করার জন্য কাউকে ধনী হবার প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য অনুযায়ী একটি খেজুর দান করলেও আল্লাহ তা বৃদ্ধি করে পাহাড় পরিমাণ করে দিতে পারেন। যে দানে আন্তরিকতা যত বেশি আল্লাহর কাছে তার ওজন তত বেশি। হযরত আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, হাশরের দিন যখন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া অবশিষ্ট থাকবে না তখন আল্লাহতায়ালা যে সাত ধরনের ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি যে গোপনে দান করে। তার দান ডান হাত কি দান করে তা বাম হাত টের পায় না।’ (মুসলিম) দানের মর্যাদা এতো বেশি যে অভাবপ্রস্ত অবস্থায়ও দান বন্ধ রাখা উচিত নয়। আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী করীম (সা.) এর নিকট আগমন করে জিজ্ঞেস করলো হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কোন প্রকার দান সর্বাদিক সওয়াবের। তিনি বললেন, তুমি সুস্থ ও তোমার অর্থের প্রয়োজন থাকা অবস্থায় এবং তুমি অভাবগ্রস্ততার আশঙ্কা করছ ও ধনী হওয়ার আশা পোষণ করছো এমন অবস্থায় যে দান করবে। আর ওই সময় পর্যন্ত বিলম্ব করবে না যখন তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে তার তুমি বলবে, অমুককে অত আর অমুককে এত পরিমাণ দিলাম। বস্তুত তা তো অপরের হয়ে গেছে। (বুখারী) উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে সর্বাবস্থায় মানুষের সহযোগিতায় নিজের হস্তকে প্রসারিত রাখতে হবে তা সচ্ছল অবস্থায় হোক আর অসচ্ছল অবস্থায় হোক। হযরত সালেম (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, শুধুমাত্র দু’জন লোকের ওপর ঈর্ষা করা যায়। একজন হলো যাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের জ্ঞান দিয়েছেন আর সে রাত দিন তা চর্চা করে। অপরজন হলো যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন আর রাতদিন সে মানব কল্যাণে খরচ করে। (বুখারী) দান দুশ্চিন্তা ও সমস্যা থেকে দাতাকে মুক্তি দেয়। তবে এই দান হতে হবে আন্তরিক। দান করে প্রচার করা যাবে না অথবা কাউকে খোটা দেয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে তা চর্চা করে বেড়ায় না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্যই সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার তাদের পালন কর্তার কাছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।’ (সূরা বাকারাহ ২৬২) আল্লাহ নিজেই নিশ্চয়তা দিয়েছেন, শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা নিঃস্বার্থ প্রচারবিমুখ দান সব ভয়-শংকা, দুশ্চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি দান করবেন পৃথিবীর জীবনে ও পরকালে। দানের ফলাফল পুরোপুরি নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। প্রতিটি বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত দান করার আগে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ করে নেয়া। শুধু স্রষ্টার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করা, তা যত সামান্য হোক না কেন। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন : যারা প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য সবর করে, সালাত আদায় করে, আমি যা  দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দিয়ে মন্দ দূর করে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালের শুভ পরিণাম। (সূরা রাদ ২২) দান পরকালের কঠিন সময়ে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করে, ইহকালে প্রাচুর্যময় ও দুশ্চিন্তাহীন মর্যাদাপূর্ণ জীবন উপহার দেয়। তথ্যসূত্র : ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরীর প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ। এএইচ/

নিয়ত ও দৃষ্টিভঙ্গি সৎকর্মের ভিত্তি

কোনো কাজ সৎকর্ম কিনা তা নির্ধারিত হয় কর্তার দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়তের উপর। ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকর্মের মর্যাদা শুধু কর্মের ফলাফলের উপর নয় বরং তার পেছনে কর্তার নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। এককথায় নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গি হলো সৎকর্মের অঙ্কুর। যে কোন কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হতে হবে অর্থাৎ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজটি সম্পাদিত হতে হবে। নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গিই সৎকর্মকে প্রচলিত সমাজসেবামূলক কার্যক্রম বা Charity থেকে পৃথক করে দেয়। সাধারণ মানুষ কাজের ধরণ বা ফলাফল দেখে মূল্যায়ন করে আর আল্লাহ কাজের পেছনে সুপ্ত বাসনা, অন্তরের গতিবিধিকে প্রত্যক্ষ করে মূল্যায়ন করেন কেননা তিনি অন্তর্যামী। দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়ত বিশুদ্ধ হলে অর্থাৎ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন কাজ শুরু করার পর যদি কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যায় তাহলেও তা আল্লাহর কাছে সৎকর্ম বলে গৃহীত হবে। হাদীসে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে প্রতিটি কাজ নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। ওমর ইবনে খাত্তাব হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন- যত কাজ আছে সবই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং যার হিজরত দুনিয়া লাভের বা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যে হবে। (বুখারী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পার্থিব বা দুনিয়ার কোন বিনিময় বা প্রতিদান লাভের উদ্দেশ্যে হিজরতের মতো কষ্টদায়ক ইবাদাত করবে সে আল্লাহর কাছে পরকালে কিছুই পাবে না। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই সৎকর্মের কলেবর বৃদ্ধি করার চাইতে দৃষ্টিভঙ্গি পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে সৎকর্মের ভিত্তি মজবুত করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করলে সামান্য সৎকর্মই পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট হবে। রাসূল (সা.) মুয়ায বিন জাবাল (রা.)কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, আপন নিয়ত বা দৃষ্টিভঙ্গিকে সবসময় সংমিশ্রণ থেকে পাক (মুক্ত) রেখো; যে আমল কর তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কর তাহলে সামান্য আমলই তোমার পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট হবে। (তারগীব, তারহীব) অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে কাজ কিছুটা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং কিছুটা পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় তার বিনিময়ে আল্লাহ কি দেবেন আর তা কি সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে? কেউ যদি ইহজীবনে সামাজিক স্বীকৃতি, ইলেকশনে জয়লাভ, জাতীয় সম্মান অর্জন করা ও সঙ্গে সঙ্গে পরজীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার উদ্দেশ্যে জনকল্যাণমূলক কাজ করে থাকেন তাহলে তা কি সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে? তার বিনিময় কি আল্লাহ পরকালে দেবেন? আল্লাহ তার রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে এর উত্তর বলে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, একজন লোক আখেরাতে প্রতিদান পাবার উদ্দেশ্যে ও দুনিয়াতে প্রশংসা পাবার উদ্দেশ্যে জিহাদ করতে থাকে সে কি সওয়াব পাবে? রাসূল (সা.) বললেন, সে কিছুই পাবে না। প্রশ্নকর্তা তিনবার প্রশ্ন করলে, রাসূল (সা.) তিনবারই একই উত্তর দেন। অবশেষে রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ কেবলমাত্র সেই আমল কবুল করবেন, যা কেবল তার জন্যই করা হয়ে থাকে এবং তার সন্তুষ্টি ওই আমলের সঞ্চালক হবে। (আবু দাউদ, নাসায়ী) নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে কর্মের বহর যত বেশিই হোক না কেন তা নিস্ফল হয়ে যাবে। আর যদি নিশ্চিত হোন যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তাহলে আদাজল খেয়ে লেগে যান, অফুরন্ত পুরস্কার পাবেন। বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যে কাজই করবেন তাতে প্রাকৃতিক আনুকূল্য পাবেন, অফুরন্ত শক্তি পাবেন, স্বর্গীয় আনন্দ ও প্রশান্তি পাবেন, প্রাচুর্যের সন্ধান পাবেন, স্রষ্টার সান্নিধ্য পাবেন ইহজীবনে ও পরজীবনে। যারা মানুষের কাছ থেকে কোন বিনিময় বা কৃতজ্ঞতা আশা না করে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজ করে তাদের লক্ষ্য্ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতিম, বন্দীকে সাহায্য দান করে তারা বলে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে সাহায্য দান করি; আমরা তোমাদের নিকট থেকে প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না। আমরা আশঙ্কা করি পালনকর্তার নিকট হতে ভীতিপ্রদ ও ভয়ঙ্কর দিনের। পরিণামে আল্লাহ তাদের সে দিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের দেবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। (সূরা দাহর ৭৬: ৮-১১) অর্থাৎ একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রেমে করা প্রতিটি কাজই মানুষকে দিতে পারে চিরস্থায়ী মুক্তি, প্রশান্তি, নিরাপত্তা, উৎফুল্লতা ও আনন্দ। কেননা আল্লাহ কাজ নয়, কাজের পেছনে ক্রিয়াশীল মনকে দেখেন। (প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের সোপান গ্রন্থ) এএইচ/

রাসূল (সাঃ) এর ৯ উপদেশ

একদিন এক লোক এসে রাসূল (সাঃ) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে কিছু নসিহত করুন। হুজর পাক (সাঃ) বললেন- যখন নামাজ পড়বে তখন মনে করবে এই আমার জীবনের শেষ নামাজ। আর যখন কথা বলবে তখন ওজন করে কথা বলবে। এমন কথা কখনো বলবে না, যা বললে তুমি অনুতপ্ত হবে। কারণ কথা হচ্ছে ধনুকের তীরের মত। একবার মুখ থেকে ফসকে গেলে তার উপর তোমার আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। শোন-১. আল্লাহকে প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে ভয় করবে। ২. আল্লাহর ভয় মনে রেখে ইনসাফের কথা বলবে, রাগে বা আনন্দে আল্লাহকে ভুলে যাবেনা। ৩.ধনী বা দরিদ্র যে অবস্থায়ই থাক না কেন, ইসলামে সাবেত থাকবে অর্থাৎ বিশ্বাসে অবিচল থাকবে।৪. আত্মীয়-স্বজন তোমাদের ত্যাগ করলে, তোমরা তাদের ত্যাগ করো না। ৫. যারা তোমার উপর শান্তি কেড়ে নেয়, তাদের তোমরা শান্তি দেবার চেষ্টা করবে।৬. যারা তোমার উপর জুলুম করেছে তাদের মাফ করে দেবে। ৭. বেশির ভাগ সময় নীরবতা অবলম্বন করে আল্লাহর চিন্তায় মগ্ন থাকবে। ৮. কথাবার্তায় এবং কাজের ফাঁকে অল্লাহর জিকর অব্যহত রাখবে। ৯. যেখানেই থাক, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং অন্যকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। সূত্র: হযরত সৈয়দ রশীদ আহমদ জৌনপুরির (রহঃ) সঙ্গে ধর্ম ও দর্শনকেন্দ্রিক কথোপকথন- ‘সংলাপ সমগ্র’ থেকে সংকলিত। আরকে//

রমজানে দাঁত-মুখের যত্নে করণীয়

মুখের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে দাঁত। তবে, দাঁতে আক্রমণ করতে পারে বিভিন্ন ধরণের রোগ-জীবাণু। তাই একটু বাড়তি যত্ন নিলে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। অন্যান্য সময়ের মতোই রমজানেও দাঁতের যত্ন নিতে হবে। রমজানে আপনি কিভাবে দাঁতের যত্ন নিবেন? এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সম্প্রতি একুশে টিভির জনপ্রিয় ‘সিয়াম ও আপনার স্বাস্থ্য’ অনুষ্ঠানে ‘রমজানে মুখের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকার’ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক, ডা. মো. শফি উল্লাহ, মেন্ডি ডেন্টাল কলেজ ও চিফ কনসালট্যান্ট স্মাইল স্পেশালাইজড ডেন্টাল সার্ভিসেস। উপস্থাপনায় ছিলেন অধ্যাপক ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ। অধ্যাপক, ডা. মো. শফি উল্লাহ বলেন, সুস্থ থাকার জন্য দাঁতের যত্ন সব সময়ই নিতে হবে। তবে রমজান মাসে যেহেতু সুবহে সাদিক থেকে সূযাস্ত পর্যন্ত কোনো খাবার গ্রহণ করা যায় না। সেক্ষেত্রে রাতের বেলায় দাঁত ব্রাশ করতে হবে। দিনের বেলায় মেসওয়াক দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা গেলেও পেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা যাবে না। দাঁত সুস্থ রাখার জন্য ইফতার ও সেহরীর পরে ভালোভাবে দাঁত ব্রাশ করে নিতে হবে। এ সময় সাধারণত দাঁতের ব্যথা এবং মাড়ি দিয়ে রক্ত বা পূজপড়া জনিত সমস্যা নিয়ে রোগীরা আমাদের কাছে আসে। অনেকগুলো কারণে দাঁতে ব্যথা দেখা দিতে পারে। মুলত দুই কারণে হতে পারে। এক. মাড়ি ব্যথার কারণে দুই. ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে। আর এই ব্যাকটেরিয়ার খালি চোখে দেখা যায় না। তাই কিছু খাওয়ার আগে অবশ্যই সর্তক থাকতে হবে, মুখের যত্ন নিতে হবে। সুস্থ থাকার জন্য অবশ্যই মুখ ভালোভাবে পরিস্কার করতে হবে। অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা খাবার দাঁতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বেশি বেশি শাক-সবজি এবং ভিটামিন সি এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। এটি মুখের দুর্গন্ধকে বাড়িয়ে দেয়। দাঁত পরিষ্কারে নরম, নমনীয়, ছোট টুথব্রাশ ব্যবহার করতে হবে। বড় বা শক্ত টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা যাবে না। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ দেশি ফল খেতে হবে। প্রচুর পানি পান করতে হবে। পানি পানের মাধ্যমে মুখের আদ্রর্তা রক্ষা পায়। ফলে অনেক রোগ প্রতিরোধ হয় ও মুখের দুর্গন্ধ কমে যায়। অন্য চায়ের পরিবর্তে গ্রিন টি খাওয়া যেতে পারে। রমজানে মুখের প্রধান সমস্যা হলো মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসা। মূলত মুখে দুর্গন্ধ হওয়ার জন্য দায়ী জমে থাকা খাদ্যকণা ও মুখের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সালফাইড ও অ্যামোনিয়া তৈরি হওয়া। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অজু করার আগে নিয়মিত মেসওয়াক করা যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে, পানি ও টুথপেস্ট যেন গলার ভেতর প্রবেশ না করে। শ্রুতি লেখক: মাহমুদুল হাসান।   এমএইচ/ এসএইচ/      

কাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

কাজের মাধ্যমেই স্রষ্টাকে খুঁজে পেতে হবে। প্রতিটি কর্মকে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতার রসে রঞ্জিত করতে হবে- যাতে কর্মের প্রতিটি মুহূর্তকে নান্দনিক শিল্প হিসেবে স্রষ্টার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পেশ করা যায়। শুধু পরিশ্রম করলেই তা স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাহন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। কাজকে সচেতনভাবে কৃতজ্ঞতায় রূপান্তরিত করতে হবে। এ জন্য অন্তরকে বিশুদ্ধ করতে হবে। কাজ করার যোগ্যতা যে স্রষ্টার দান তা উপলব্ধি করতে হবে ও আনন্দচিত্ত কাজ করতে হবে। যে কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেন না কেন তা স্রষ্টা নির্ধারিত পন্থায় ও সৃষ্টির কল্যাণে উৎসর্গীকৃত করতে হবে। কর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে অহঙ্কারী নয় বরং স্রষ্টার প্রতি সমর্পিত হতে হবে। কাজের মধ্যেও স্রষ্টাকে স্মরণ করতে হবে, যাতে প্রতিটি সম্পাদিত কাজ গুণগত মানে অতুলনীয় হয়ে ওঠে। স্রষ্টা সবাইকে সব ধরনের কাজের যোগ্যতা দেন না। বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ধরনের কাজের দক্ষতা দিয়ে থাকেন। এসব দক্ষতা স্রষ্টার অনুগ্রহ। যাকেই আল্লাহ যে কাজের দক্ষতা দিয়েছেন তা যদি গভীর মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে আনন্দচিত্তে করে মানবসেবায় কাজে লাগানো যায়, তবে তাই হবে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আল্লাহর দেয়া চোখ, কান, হাত, পা, মেধা দিয়ে যে কাজই করুন না কেন তা স্রষ্টা নির্ধারিত পন্থায় ব্যবহার করতে হবে এবং এ কাজের ফলাফল মানব কল্যাণমূলক হতে হবে। কেননা সৃষ্টির অকল্যাণ করে স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়া যায় না। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা রাত-দিন আলহামদুলিল্লাহ বলতে থাকেন কিন্তু তারা প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করেন, মেধা যোগ্যতাকে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেন, মানুষের সমাজে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যে রাতদিন কাজ করেন তারা সম্মানিত হলেও স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত নয়। আল্লাহতায়ালা প্রতিটি কাজের সঙ্গে কৃতজ্ঞ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন অধিকাংশ মানুষই রাত দিন কাজ করে কিন্তু অকৃতজ্ঞ থেকে যায়। আসুন আমরা সবাই, যে যে পেশায় থাকি না কেন, আমাদের পেশাগত দক্ষতাকে মহাপ্রভুর দান মনে করে বিনয়ী হই। নিজের সব কাজ বিন্দুসম উপহার হিসেবে কৃতজ্ঞার সঙ্গে পেশ করি সেই মহাপ্রভুর সামনে। (শোকরিয়া, প্রশান্তি ও প্রাচুর্যের রাজপথ গ্রন্থ) এএইচ/

‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত লাইলাতুল কদর’

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, আসসালামু আলাইকুম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অপার করুণায় আমরা (মুহাম্মদ সা. এর উম্মত) লাইলাতুল কদর পেয়েছি। আমাদের জন্য এটা আল্লাহ তা আলার বড় অনুগ্রহ। অন্যান্য নবীর উম্মতরা পাঁচশ ছয়শ বছর হায়াৎ পেত। কিন্তু আমাদের ( মুহাম্মদ সা. এর উম্মতদের) গড় আয়ু মাত্র ষাট-সত্তর বছর। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) কে একদিন অতীত যুগের উম্মতদের আমলনামা দেখানো হলো। তখন আল্লাহর নবী ভাবলেন, আগেকার নবীদের উম্মতরা অনেক বেশি হায়াৎ পেয়েছে বিধায় এতো বেশি নামায, রোজা করেছে। বেশি সওয়াব কামিয়েছে। কিন্তু আমার উম্মতরা হায়াৎ পাবে কম। তারা তো এতো আমল করতে পারবে না। তাহলে কী আমার উম্মতরা পেছনে পড়ে থাকবে। এমন চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ ( সা.) খুব ব্যথিত হলেন। মনে মনে কষ্ট পেলেন। তখন আল্লাহ আমাদের রাসূলকে লাইলাতুল কদর দান করলেন। বলেন, লাইলাতুল কদরের খায়রুম মিন আলফে সাহার। এই একটা নাত এতো মর্যাদার যেটা হাজার মাসের চেয়ে বহুগুনে উত্তম। অন্যান্য নবীর উম্মতেরা হাজার মাস এবাদত করে যে সওয়াব পেয়েছে মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতরা একরাত ইবাদত করে তার চেয়ে অনেক বেশি গুণ সওয়াব পাবে। লাইতালুল কদরের দুটো দিক। কদর শব্দের দুটো অর্থ। একটা হলো `ভাগ্য নির্ধারণ ` আর অন্য অর্থটা হলো সম্মান। আল্লাহ তা আলা নিজেও রাতটিকে মর্যাদাবান করে আমাদের জন্য দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত এ রাতে যারা ইবাদত বন্দেগী করে এমানুষগুলো আল্লাহর কাছে খুবই সম্মান পায়। এই লাইলাতুল কদরেই কোরআনুল কারীম নাযীল হয়েছিল। মর্যাদার ওপরে মর্যাদা, সম্মানের ওপর সম্মান, প্রাপ্তির ওপর প্রাপ্তির রাত লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদরের আরেকটা দিক হলো `নির্ধারণ`। আল্লাহ তা আলা দুনিয়াটা পরিচালনা করেন একটা নিয়মের ভিত্তিতে। আল্লাহ `ক্বুন ফায়াকুন` বললেই হয়ে যায়। কিন্তু শৃংখলার জন্য একটা নিয়মের ভিত্তিতে পৃথিবী পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে আগামী এক বছর হায়াৎ, মউত, সুখ, দুঃখ, ভালো, মন্দ, আয়, উপার্জন, এই এক বছরের ফয়সালা হবে লাইলাতুল কদরে। এজন্য এটার নাম নির্ধারনী। লাইলাতুল বরাতে রিযিক মোটামুটি বরাদ্দ হয় আর লাইলাতুল কদরে তা নির্ধারিত হয়ে যায়। আল্লাহ তখন দায়িত্বগুলো ভাগ করে ফেরেশতাদের মাঝে বণ্টন করে দেন। অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি লাইলাতুল কদর একদিকে সম্মানের রাত অন্যদিকে আমাদের তাকদীর নির্ধারণের রাত। আমরা যে যে অবস্থায় থাকি, আমরা সবাই শান্তি চাই। আমরা সবাই একটা উন্নত জীবন চাই। সেজন্য লাইলাতুল কদরের রাতে আমরা জনে জনে আল্লাহর কাছে আগামী এক বছর যেন আমাদের হায়াতে বরকত হয়, সুস্বাস্থ্য হয়, পরীক্ষার্থীদের যেন পড়াশোনা ভালো হয়, কর্মজীবীদের যেন আয় রোজগার ভালো হয়, সুখ বৃদ্ধি পায়- এজন্য আল্লাহর কাছে বলব। আরো অধিকতর প্রাচুর্য্য, অধিকতর সাচ্ছন্দ্যের জীবন চাইব। লাইলাতুল কদরের সূর্যাস্তের পর থেকে ফেরেশতারা জিবরাঈল (আ.) এর নেতৃত্বে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। ওই রাতে যারা ইবাদত বন্দেগী করেন, জিবরাঈল (আ) ফেরেশতাদের বহর নিয়ে এসে সবার জন্য দোয়া করেন। ইবাদতরত লোকদের সঙ্গে মোসাহাবা করেন। হাত মেলান। অন্যান্য ফেরেশতারাও জনে জনে মুমিন মুসলমানদের সালাম দিয়ে যায়। আল্লাহ আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বুঝার মতো জ্ঞান দিয়েছেন। তাই লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে আমরা ফরজ, সুন্নাহ, ওয়াজিবতো আদায় করবই- পাশাপাশি নফল নামাজ, তাসবীহ, কুরআন তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদ আদায় করব। সদকা করব। মানুষের একটা ভালো কথাও আল্লাহর কাছে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। আমরা আমাদের নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, বিশ্বের জন্য দোয়া করবো। সব মানুষ যেন এই জগতেও সেই জগতেও সুখ- শান্তি পায়, আল্লাহর কাছে সেই দোয়া করব।   লেখক : খতিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।   অনু লেখক: আলী আদনান।   এসএইচ/

মক্কা বিজয় ও হযরত মুহাম্মাদ (সা.)

ইসলাম ও বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে মক্কা বিজয় এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৪৩২ বছর আগে ২০ রমজান নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হিজরতের অষ্টম বছরে ১০ হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে মক্কা নগরী জয় করেছিলেন।   তৎকালীন আরব ভূমির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জনপদে বিজয় নিশান উড়িয়েছিলেন বিশ্বনবী। এ ঘটনা ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের, সাফল্যের ও সন্তুষ্টির। তাইতো ঐতিহাসিকদের মতে মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। যদিও আল কুরআনে হুদাইবিয়ার সন্ধিকেই প্রকাশ্য বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয় দুটিই মুহাম্মদ (সা.) এর অতুলনীয় দূরদর্শীতার ফল। হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে যে বিজয়ের সূত্রপাত হয়েছিল তার চূড়ান্ত রূপই ছিল মক্কা বিজয়। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পক্ষে আরবের অন্যান্য এলাকা বিজয় করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে। হুদাইবিয়ার সন্ধি মোতাবেক সন্ধির পরবর্তী বছর মুহাম্মদ ২০০০ সাহাবা নিয়ে মক্কায় উমরাতুল ক্বাযা পালন করতে আসেন এবং এ সময়ই তিনি মক্কার কুরাইশদের মধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতা লক্ষ্য করেন। তাদের বাহ্যিক শক্তির সঠিক পরিমাপ করতে পেরেছিলেন তিনি এবং এজন্যই অধীর ছিলেন মক্কা বিজয়ের জন্য। এর ১ বছরের মাথায়ই তিনি তা সম্পন্ন করার জন্য মনস্থির করেন। মক্কা অভিযানের আগে আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে (সা.) বিজয়ের আগাম সংবাদ দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমের ভাষায়, ‘যখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে; তখন আপনি দেখবেন মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। তখন ‘হে নবী!’ আপনি আপনার মালিকের প্রশংসা করুন এবং তারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। অবশ্যই তিনি তওবা কবুলকারী পরম ক্ষমাশীল’ (সূরা আন নাসর)। রাসূল (সা.) মক্কার নিকটে গিয়ে ১৬ রমজান তাঁবু গাড়লেন। রান্নার জন্য আলাদা আলাদা চুলার ব্যবস্থা করলেন, যাতে করে শত্রুর মনে ভয় সৃষ্টি হয়ে যায়। মক্কায় প্রবেশের জন্য রাসূল (সা.) মুসলমান সৈন্যদের চারটি ভাগে বিভক্ত করে দিলেন। প্রথম ভাগের দলনেতা ছিলেন হযরত যুবায়ের (রা.)। দ্বিতীয় দলের দলনেতা ছিলেন হযরত আবু উবায়দা (রা.)। তৃতীয় দলের নেতা ছিলেন হযরত সা’দ বিন উবাদা (রা.)। চতুর্থ দলের দল নেতা ছিলেন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। ১৭ রমজান হযরত আব্বাস (রা.) আবু সুফিয়ানকে বন্দি করে রাসূলের (সা.) সামনে পেশ করলে আবু সুফিয়ান রাসূলের (সা.) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় প্রবেশ: ২০ রমজান খালিদ বিন ওয়ালিদকে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিলেন, তুমি পেছন দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করবে, তবে কাউকে হত্যা করবে না, কারো ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করবে না। রাসূল (সা.) বিনা বাধায় সাদা ও কালো পতাকা নিয়ে সামনের দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি উচ্চস্বরে সূরা আল ফাতাহ তিলাওয়াত করছিলেন। তার মধ্যে ছিলো বিনয় ও নম্রতা। রাসূলের (সা.) সেজদাবনত মস্তক যেন উটের কুঁজ পর্যন্ত স্পর্শ করছিলো। কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদের কাফেলার ওপর কুরাইশদের তীর বর্ষণের ফলে তিনজন মুসলমান শাহাদাতবরণ করেন। এর জবাবে খালিদ বিন ওয়ালিদের আক্রমনে কুরাইশদের ১৩ জন লোক নিহত হয়। রাসূল (সা.) বিষয়টি জানতে পেরে খালিদের কাছে এর কৈফিয়ত চাইলে তিনি বিস্তারিত বর্ণনা দেন। নিরাপদ অঞ্চল ঘোষনা: সব ধরণের রক্তপাত, ক্ষয়ক্ষতি ও জানমালের নিরাপত্তা বিধানে রাসূল (সা.) নিরাপদ ও সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, (১) যারা আপন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ, (২) যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ এবং (৩) যারা কা’বা ঘরে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ। কা’বা ঘরে প্রবেশ: রাসূল (সা.) কা’বা ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে মূর্তিগুলো সরানোর নির্দেশ দিলেন। তখন কা’বা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি ও কা’বার দেয়ালে অসংখ্য চিত্র অঙ্কিত ছিলো। এসব কিছুই নিঃশেষ করা হলো। অতঃপর রাসূল (সা.) তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে কা’বায় দু’রাকাত সালাত আদায় করেন। মক্কায় বিজয় সমাবেশ: মক্কা বিজয়ের পরদিন ২১ রমজান বিশ্বনেতা হযরত মুহাম্মদের (সা.) নেতৃত্বে এক জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়। মক্কার সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এতদিন যারা মুসলমানদের গালাগালি করেছে, মারধর করেছে, তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়ন করেছে, লুটপাট করেছে, মুসলমানদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে, রাসূলের (সা.) চাচার কলিজা চিবিয়ে খেয়েছে, রাসূলকে (সা.) হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, মক্কা থেকে হিজরত করতে বাধ্য করেছে তারাসহ সর্বস্তরের মানুষ এ সমাবেশে উপস্থিত ছিল। মহানবি (সা.) এ সব শত্রুদের হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দেন। মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা: জন্মভূমি মক্কা হতে বিতাড়িত হওয়ার ৭ বছর ৩ মাস ২৭ দিন পর বিজয়ী বেশে পুনরায় মক্কায় ফিরে এলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান বিশ্ব মানবতার মুক্তিরদূত, নবীকুল শিরোমণি, শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। বিনা যুদ্ধেই মক্কার নেতারা তার নিকটে আত্মসমর্পণ করেন। এতদিন যারা রাসুল (সা.) ও তার অনুসারিদের শত কষ্ট দিয়েছেন, অত্যাচার করেছেন আজ হাতের কাছে পেয়েও তিনি তাদের থেকে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। সবাইকে উদারতা ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাদের উপর আমার কোন অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত’। রাসূলের (সা.) এ ভাষণ শুনে আর তার আচরণ দেখে সমবেত সবাই ঘোষণা করলেন, সত্যি আপনি আল্লাহর নবী; আপনি কোন দেশ বিজয়ী সাধারণ বীর যোদ্ধা বা বাদশা নন। মক্কা বিজয়ের পর পরাজিত শত্রুর প্রতি মোহাম্মদ (সা.)-এর আচরণ ও তার ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। যা আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় মানবিক সমাজ গঠনে এবং ভ্রাতৃত্ব পুনঃস্থাপণ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে এক অনুপম, অনুকরণীয় ও অনুস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, সে যেন জেনে রাখে, অবশ্যই এটা হচ্ছে সাহসিকতার কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম’ (সূরা আশ শুরা: ৪৩)। প্রায় রক্তপাতহীন এ বিজয় অভিযানে ইসলাম ও রাসূলের পর্যাদা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যদিয়ে সত্য ধর্মের গৌরব প্রতিষ্ঠিত হয় আরবের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরীতে। আই// এসএইচ/

সব কর্মকাণ্ডই রেকর্ড হয় আমলনামায়

কর্মের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও মানুষ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। তার কর্মের যথাযথ ফল সে পাবে। আমলনামায় সব কার্যকলাপ, ছোট-বড় সবকিছু রেকর্ড হয়েছে সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায়। এই আমলনামার ভিত্তিতে শেষ বিচারের দিন কর্মফল পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আল্লাহ। আমলনামা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন : ‘আল্লাহর সঙ্গে যারা শরিক করে, এ শিরকের মাধ্যমে তারা নিজেরাই সত্য অস্বীকার করছে। অতএব শরিককারীরা কখনোই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণকারী হতে পারে না। শিরক ওদের সব আমল বরবাদ করে দিয়েছে। জাহান্নামেই থাকবে ওরা চিরকাল।’ (সূরা তওবা ১৭) ‘আমি প্রত্যেক মানুষের আমলনামাকে (কর্মবিবরণের রেকর্ড) তার গলার সঙ্গে যুক্ত করেছি। মহাবিচার দিবসে এ রেকর্ড তার সামনে দৃশ্যমান করে বলব, ‘পড়ো তোমার আমলনামা। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল ১৩-১৪) ‘এরপর হাজির করা হবে আমলনামা। পাপীরা এতে ওদের কার্যকলাপের বিবরণ দেখামাত্র আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠবে। আর ওরা বলবে, হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এ কেমন কিতাব! ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি। এতে সবকিছুরই রেকর্ড রয়েছে। ওরা যা যা করেছে সব এখন ওদের চোখের সামনে। (তখন ওরা বুঝবে) তোমাদের প্রতিপালক কারো প্রতিই অন্যায় করেন না।’ (সূরা কাহাফ ৪৯) ‘পৃথিবী তার প্রতিপালকের নূরে উদ্ভাসিত হবে। আমলনামা উন্মুক্ত করে পেশ করা হবে। নবী-রাসূল ও সব সাক্ষীকে হাজির করা হবে। সবার প্রতি ন্যায়বিচার করা হবে, কারো ওপরই অন্যায় করা হবে না।’ (সূরা জুমার ৬৯) ‘মহাকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। যেদিন কেয়ামত হবে সেদিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রত্যেক দলই হবে ভয়ে নতজানু। প্রত্যেক দলকেই তাদের রেকর্ড (আমলনামা) দেখতে ডাকা হবে। তাদের বলা হবে, ‘তোমরা যা করতে তার প্রতিফলই আজ তোমাদের দেওয়া হবে।’ এ হচ্ছে তোমাদের কাজের রেকর্ড, যা তোমাদের ব্যাপারে সত্য সাক্ষ্য দেবে। তোমাদের সব কর্মকাণ্ডই রেকর্ড করা আছে এখানে।’ (সূরা জাসিয়া ২৭-২৯) ‘ওদের সমস্ত কার্যকলাপ, ছোট-বড় সবকিছু রেকর্ড হয়েছে সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায়-ওদের আমলনামায়।’ (সূরা কামার ৫২-৫৩) ‘যখন তারকারাজি নিজেদের আলো হারাবে, যখন পর্বতমালা মরীচিকার ন্যায় উধাও হবে, যখন পূর্ণ গর্ভবতী উটনী পরিত্যক্ত হবে, যখন সব বন্যপশুকে একত্র করা হবে, যখন সমুদ্রের জলরাশি স্ফীত হবে, যখন দেহে আবার আত্মা সংযুক্ত হবে, যখন জীবন্ত কবর দেওয়া শিশুকন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? যখন প্রত্যেকের আমলনামা দেখানো হবে, যখন আকাশের আবরণ সরানো হবে, যখন জাহান্নামের আগুন গনগনে লাল করা হবে, যখন জান্নাতকে দৃশ্যমান করা হবে, সেদিন প্রত্যেকেই জানতে পারবে, কী পরিণতির জন্যে সে নিজেকে প্রস্তুত করেছে (বুঝতে পারবে কী করা উচিৎ ছিল, আর কী করা উচিৎ হয়নি)। (সূরা তাকভির ২-১৪) আমলনামা ডান হাতে : ‘ভাবো সেই দিনের কথা, যেদিন সব মানুষকে সমবেত করবো। জীবনে যা-কিছু করেছে তার বিচার করে (আমলনামা তৈরি করা হবে)। যাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তারা (তৃপ্তির সঙ্গে) তাদের আমলনামা পড়বে। তাদের ওপর সামান্য পরিমাণও অবিচার করা হবে না।’ (সূরা বনি ইসরাইল ৭১) ‘সেদিন যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ হবে খুবই সহজ। সে তার প্রিয়জনদের কাছে আনন্দিত চিত্তে ফিরে যাবে।’ (সূরা ইনশিকাক ৭-৯) আমলনামা বাম হাতে: ‘মহাবিচার দিবসে যার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে, সে আর্তনাদ করে বলবে, ‘হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা দেওয়া না হতো আর আমি যদি আমার রেকর্ড না দেখতাম! হায়! আমার দুনিয়ার মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হতো! আমার ধন-সম্পত্তি তো কোনো কাজে এলো না। আর আমার ক্ষমতাও তো হাতছাড়া হয়ে গেছে।’ (সূরা হাক্কা ২৫-২৯) আমলনামা পেছন থেকে দেওয়া হবে : ‘সেদিন যার আমলনামা পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে, সে তখন মৃত্যু কামনা করবে। আর সে ঝলসাতে থাকবে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে। দুনিয়ায় সে তার স্বজনদের সঙ্গে আনন্দেই ছিল। তখন সে ভাবত, কোনদিনই তাকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে না। নিশ্চয়ই সে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে, তার প্রতিপালক তার সব কাজকর্মই পর্যবেক্ষণ করছেন।’ (সূরা ইনশিকাক ১০-১৫)   এসএইচ/

কোরআন: সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতায় অনন্য

কোরআন নাজিলের সূচনা ৬১০ সালে। জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তু নিয়ে নাজিল হয়েছে খণ্ডে খণ্ডে, দীর্ঘ ২৩ বছরে। কোরআন পরিপূর্ণ রূপ পায় ৬৩২ সালে। কোরআনের প্রথম পঙক্তিমালাই বদলে দেয় নবীজীর (স.) জীবন। এরপর নবীজী (স.) ও সাহাবীদের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর কালাম এই কোরআনকে ঘিরেই। তাই কোরআনের প্রতিটি আয়াত বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণে প্রচেষ্টার কোনও কমতি ছিল না। কোরআনের আয়াতাংশ, আয়াত, সূরা—যখনই যা নাজিল হতো, তখনই নবীজী (স.) তা নিজে বার বার তেলাওয়াত করতেন এবং উপস্থিত সাথিদের শোনাতেন। সাহাবীরা তা বার বার তেলাওয়াত করে মুখস্থ করে ফেলতেন। আর কাতিব অর্থাৎ লিপিকররা তা লিপিবদ্ধ করতেন। বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০-এর অধিক সাহাবী কোরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন। নাজিলের সূচনা থেকেই মক্কায় নবীজীর (স.) সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাহাবীরা মুখস্থ করা ও লেখার মাধ্যমে কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। কোরআন লিখে রাখার কাজে মোটা কাগজ, চামড়া, পাথরখণ্ড, জন্তুর হাড় ও খেজুর পাতা ব্যবহার করা হয়। আলী ইবনে আবু তালিব, উবাই ইবনে কাব, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জায়েদ বিন সাবিত (রা.) কোরআন লিপিবদ্ধকারী হিসেবে বিশেষ খ্যাতিলাভ করেন। জায়েদ বিন সাবিতকে নবীজী (স.) তার সামনে বসেই কোরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কোনও আয়াত নাজিল হলেই তিনি তাকে ডেকে নিয়ে তেলাওয়াত করে শোনাতেন। আয়াতটি কোন সূরার কোন আয়াতের আগে বা পরে কোথায় বসাতে হবে, সে-সম্পর্কে নির্দেশনা দিতেন। জায়েদ সেভাবে লিপিবদ্ধ করে শুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্যে তা আবার নবীজীকে (স) পড়ে শোনাতেন। এভাবে পুরো কোরআন সূরা আকারে বিন্যস্ত, লিপিবদ্ধ ও মুখস্থ করার নির্ভুল প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হয় নবীজীর (স.) জীবদ্দশাতেই। নবীজী (স.) মদিনায় হিজরত করার পর কোরআন চর্চা নতুন গতি লাভ করে। মসজিদে নববী সংলগ্ন চত্বরে নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীদের এক বিশাল দল কোরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়ার জন্যে নিজেদের উৎসর্গ করেন। নবীজীর (স.) জীবদ্দশাতেই পুরো কোরআন মুখস্থ করেছেন এমন হাফেজের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। আর জায়েদ বিন সাবিত, আলী ইবনে আবু তালিব, উসমান ইবনে আফফান, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কাব, সাঈদ ইবনুল আস, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, আনাস ইবনে মালেক, আবদুর রহমান ইবনে হারিস, মুয়াজ ইবনে জাবল, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আবদুর রহমান ইবনে শিহাব, আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) প্রমুখসহ ৬৫ জন সাহাবীর কাছে কোরআনের সব সূরা লিখিত আকারে ছিল। অর্থাৎ পুরো কোরআনই নবীজীর (স.) জীবদ্দশায় সূরা আকারে বিন্যস্ত ও লিপিবদ্ধ অবস্থায় ছিল; শুধু একত্রে ‘মসহাফ’ আকারে গ্রন্থিত হয়নি। নবীজীর (স.) ওফাতের পরই আরবের বিভিন্ন এলাকায় ভণ্ড নবীর প্রাদুর্ভাব ঘটে। এদের বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বহু হাফেজ শহিদ হন। তখন হযরত ওমরের (রা.) পরামর্শ ও অনুরোধে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) পবিত্র কোরআনকে একত্রে গ্রন্থাকারে সংকলনের উদ্যোগ নেন। রসুলুল্লাহর (স.) সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কাতিব জায়েদ বিন সাবিতকে প্রধান করে হযরত আবু বকর (রা.) একটি টিমকে এ-কাজের দায়িত্ব দেন। খলিফা ফরমান জারি করেন যে, যার কাছে কোরআনের যে অংশ লিখিত আছে, তা জায়েদের কাছে হাজির করতে হবে। জায়েদ একইসঙ্গে হাফেজ ও কাতিব ছিলেন। তিনি শুধু নিজের স্মৃতি ও লেখার ওপর নির্ভর করেননি। তিনি তার কাছে লিখিত প্রতিটি আয়াতের সমর্থনে দুজন করে কাতিবের লেখার সঙ্গে তা মিলিয়েছেন এবং সেই কাতিব যে রসুলুল্লাহর (স) সামনে এই আয়াত লিপিবদ্ধ করেছেন, তার সপক্ষে দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। একইসঙ্গে সেই আয়াত দুজন হাফেজ একইভাবে মুখস্থ করেছেন কি না এবং তিনি যে রসুলুল্লাহর (স.) সামনে সেই আয়াত শুনে মুখস্থ করেছেন, তার সপক্ষে দুজন সাক্ষী তলব করেছেন। রসুলুল্লাহ (স.) যে রকম নির্ভুলভাবে আল্লাহর কালামকে পেশ করেছেন, সংকলনের ক্ষেত্রেও সাহাবীরা ছিলেন একইরকম আন্তরিক ও সত্যনিষ্ঠ। গ্রন্থাকারে সংকলন যাতে নির্ভুল হয়, সেজন্যে তারা সবরকম সতর্কতাই গ্রহণ করেছিলেন। রসুলুল্লাহর (স.) জীবদ্দশায় লিপিবদ্ধ কোরআন আর জায়েদ বিন সাবিতের নেতৃত্বে সংকলিত এই মসহাফের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, রসুলুল্লাহর (স.) সময় কাগজ, চামড়া, পাথর, খেজুর পাতা—যা পাওয়া গেছে তাতেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে আর মসহাফে একই সাইজের কাগজে লিপিবদ্ধ করে একটার পর একটা কাগজ সাজিয়ে ওপরে-নিচে শক্ত মলাট দিয়ে বাঁধাই করা হয়েছে। শক্ত মলাট দিয়ে বাঁধাই করার কারণেই এর নামকরণ হয়েছে ‘মসহাফ’। মসহাফ তৈরি হওয়ার পর সাহাবীরা সর্বসম্মতভাবে একে সঠিক বলে সত্যায়িত করেন এবং হযরত আবু বকরের (রা.) কাছে সংরক্ষণের জন্যে পেশ করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় মহাফেজখানায় তা সংরক্ষণ করেন। রসুলুল্লাহর (স.) ওফাতের একবছরের মধ্যেই পুরো কোরআন একত্রে গ্রন্থাকারে সংকলনের এই কাজ সম্পন্ন হয়। হযরত আবু বকরের (রা.) পর হযরত ওমর (রা.) এই মসহাফ সংরক্ষণ করেন। তার সময় খেলাফতের সীমানা পারস্য থেকে লিবিয়া এবং আরব সাগর থেকে আজারবাইজান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তিনি এই বিশাল অঞ্চলে অভিন্ন উচ্চারণ ও বাক্-রীতিতে পবিত্র কোরআন পঠনপাঠনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পুরো কার্যক্রম তদারকির জন্যে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবু মুসা আশয়ারী, মুয়াজ ইবনে জাবলসহ ১০ জন বিশিষ্ট সাহাবীকে খেলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন। হযরত ওমরের (রা.) মৃত্যুর পর এই মসহাফ তার কন্যা ও উম্মুল মোমেনিন হযরত হাফসা-র (রা.) হেফাজতে সংরক্ষিত হয়। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমানের (রা.) সময় খেলাফতের আরও বিস্তৃতি ঘটে। তিনি সব অঞ্চলে অভিন্ন পঠনপাঠনরীতি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কোরআনের কপি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হযরত হাফসা-র (রা.) কাছে সংরক্ষিত মসহাফ চেয়ে পাঠান। তিনি কোরাইশদের পঠন ও লিখনরীতি অনুসারে মসহাফের কপি করার জন্যে প্রধান কাতিব জায়েদ বিন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, সাঈদ ইবনুল আস, আবদুর রহমান ইবনে হারিস, উবাই ইবনে কাবসহ ১২ জন সাহাবীর একটি টিম গঠন করেন। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ভুলভাবে এই মসহাফের কপি করেন। হযরত উসমান (রা.) একটি কপি নিজের কাছে এবং একটি মদিনার মহাফেজখানায় রেখে অবশিষ্ট কপিগুলো সত্যায়ন করে বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তাদের কাছে প্রেরণ করেন। আর মূল কপি ফেরত পাঠান হযরত হাফসা-র (রা.) কাছে। হযরত উসমানের (রা.) সময় কপি করা হয়েছিল বলে ইতিহাসে এ মসহাফ পরিচিতি লাভ করে ‘মসহাফে উসমানী’ নামে। মসহাফে উসমানী-র সত্যায়িত একটি কপি এখনও সংরক্ষিত আছে মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের তাসখন্দ মিউজিয়ামে। দামেস্কে প্রেরিত মসহাফের অবিকল প্রতিলিপি সংরক্ষিত আছে তুরস্কে ইস্তাম্বুলের টপকাপি মিউজিয়ামে ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে। হরিণের চামড়ায় তৈরি কাগজে এই মসহাফের প্রতিলিপি সংরক্ষিত আছে মিশরের দারুল কুতুব সুলতানিয়ায়। মসহাফে উসমানী বিভিন্ন স্থানে প্রেরিত হওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোরআন কপি করার প্রচলন শুরু হয়। শতাব্দী পরিক্রমায় কোরআনের হাজার হাজার কপি সর্বত্র প্রচার লাভ করে। ইসলামের ইতিহাসের সব যুগের কপি করা কোরআনের পাণ্ডুলিপির বিশাল সংগ্রহ রয়েছে ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, আয়ারল্যান্ডের চেস্টার বিয়াটি মিউজিয়াম ও ইংল্যান্ডের লন্ডন মিউজিয়ামে। এসব পাণ্ডুলিপির সঙ্গে তাসখন্দ মিউজিয়াম, ইস্তাম্বুলের টপকাপি মিউজিয়াম ও মিশরে কায়রোর আল-হোসেন মসজিদে সংরক্ষিত মসহাফ মিলিয়ে দেখা গেছে যে, মূল মসহাফের লিখনের সঙ্গে এগুলোর কোথাও কোনও অমিল নেই। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের The Institute for Koranforschung হাতে লেখা ৪২ হাজার কপি পূর্ণ বা আংশিক কোরআন সংগ্রহ করে। দীর্ঘ ৫০ বছর গবেষণা করার পর ইনস্টিটিউট এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, পাণ্ডুলিপি পাঠে কোনও পার্থক্য নেই। দুর্ভাগ্যবশত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমাবর্ষণে ইনস্টিটিউটটি ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর অনুগ্রহ আর সাহাবীদের আন্তরিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রয়াসের ফলে নাজিল হওয়ার সময় যেভাবে পঠিত হয়েছে, ১৪ শত বছর ধরে সারা পৃথিবীর ঘরে ঘরে এই একই কোরআন সেভাবেই পঠিত হচ্ছে। কোরআন একমাত্র ধর্মগ্রন্থ, যা তার মূল ভাষাকে ধরে রেখেছে এবং মূল ভাষাতেই পঠিত ও চর্চিত হচ্ছে। সেই একই কোরআন। ১১৪টি সূরা। ৬ হাজার ২৩৬টি আয়াত। কালের বিবর্তনে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে কোরআনের লেখ্যরূপ বিবর্তিত হয়েছে। মসহাফে উসমানী লেখায় নোকতা, জের, জবর, পেশ ইত্যাদির কোনও ব্যবহার ছিল না। সাধারণ আরবি লেখায় এখনও ওপরে বা নিচে বর্ণ পার্থক্যকারী কোনও চিহ্ন ব্যবহৃত হয় না। আরবরা শব্দের গঠন দেখেই বর্ণের উচ্চারণ করে। আর বাক্যের গঠন দেখেই আরবরা হ্রস্ব-স্বর উচ্চারণে পার্থক্য করে নেয়। হযরত ওমরের (রা.) সময় খেলাফত অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়। হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলীর (রা.) সময় খেলাফত আরও ভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। বর্ণ ও পাঠসহায়ক চিহ্ন ছাড়া কোরআন পাঠে ভবিষ্যতে তারা ব্যাপক ভুলত্রুটির শিকার হতে পারে, এই আশঙ্কা দেখা দেয়। হযরত আলী (রা.) বিশিষ্ট ভাষাবিদ আবুল আসাদ দোয়েলীকে বিষয়টি সুরাহা করার দায়িত্ব দেন। তিনি মসহাফে উসমানী-তে তাশকিল অর্থাৎ পাঠসহায়ক জের, জবর, পেশ ব্যবহার করেন। বর্ণপরিচায়ক নোকতা ব্যক্তিগত মসহাফে প্রথম ব্যবহার করেন হযরত হাসান আল বসরী ও আল্লামা ইবনে শিরিন। আবুল আসাদ দোয়েলী ও তার ছাত্র নসর ইবনে আসিম ও ইয়াহিয়া ইবনে আমর ৫০ হিজরিতে কোরআন লেখায় ‘বর্ণপরিচায়ক’ নোকতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মসহাফে ব্যবহার করেন। ৬০ হিজরিতে খলিফা আবদুল মালেকের নির্দেশে সব মসহাফে বাধ্যতামূলকভাবে নোকতা ও তাশকিল প্রয়োগের কাজ সুসম্পন্ন হয়। কোরআনের প্রাথমিক কপি মসহাফে উসমানী-তে কোনও সূরার আগে সূরার নাম লেখা হয়নি। রেখা টেনে বা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমকে আলাদা করে ওপরের লাইনে লিখে এক সূরা থেকে আরেক সূরাকে পৃথক করা হয়নি। আয়াতগুলোও কোনও চিহ্ন বা সংখ্যা দিয়ে আলাদা করা হয়নি। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক লিখে যাওয়া হয়েছে। হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে সূরার ওপর সূরার নাম এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ ওপরের লাইনে আলাদা লেখার এবং দুই আয়াতের মাঝে চিহ্ন বা সংখ্যা দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়। হিজরি দ্বিতীয় শতকের প্রথমভাগে প্রতিদিন সমপরিমাণ তেলাওয়াত করে সাত দিনে পাঠ সম্পন্ন বা খতম করার সুবিধার জন্যে কোরআনকে ‘সাত মনজিলে’ ভাগ করা হয়। প্রতিবার তেলাওয়াতের হিসাব রাখার সুবিধার্থে হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে কোরআনকে ৫৫৮ ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগের নাম দেয়া হয় রুকু। ৩০ দিনে কোরআন খতম করার সুবিধার্থে কোরআনকে ৩০ পারায় ভাগ করা হয় হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে। আর হাজার বছর ধরে কোরআনের এই লিখিত রূপই চালু রয়েছে সারা বিশ্বে। কোরআনের আয়াতমালা অবিকৃত ও বিশুদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রেখেছে একে মুখস্থ রাখার সহজাত আগ্রহ। রসুলুল্লাহর (স.) জীবন হচ্ছে কোরআনের শিক্ষার প্রতিচ্ছবি। আর কোরআন নাজিল হয়েছে ২৩ বছর সময় নিয়ে। তিনি শুধু কোরআন শিক্ষাই দেননি। পুরো কোরআন তার মুখস্থ ছিল। তাকে অনুসরণ করে কোরআন মুখস্থ করতে সাহাবীদের আগ্রহের কোনও অভাব ছিল না। হযরত আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ বিন আমর, হযরত আয়েশা, হযরত হাফসা, হযরত উম্মে সালমা (রা.) প্রত্যেকেই হাফেজ ছিলেন। পুরো কোরআন তাদের মুখস্থ ছিল। রসুলুল্লাহর (স.) জীবদ্দশায় মদিনাতেই হাফেজের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের জীবন আবর্তিত হয়েছে কোরআনকে ঘিরে। তারা কোরআন মুখস্থ করেছেন, কোরআনের জ্ঞানে নিজেরা জ্ঞানী হয়েছেন এবং অন্যকে কোরআনের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে। আর দিনে পাঁচ বার কোরআনের মুখস্থ করা অংশ থেকে তেলাওয়াত করা তো নামাজ কায়েমের জন্যে বাধ্যতামূলক। আবার রাতে দীর্ঘসময় নামাজে দীর্ঘ সূরা পাঠ পরিণত হয় অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে। সেই যুগে এমন কোনও শিক্ষিত পরিবার ছিল না, যেখানে অন্তত একজন হাফেজ ছিলেন না। কালের বিবর্তনে কোরআন মুখস্থ করা শিক্ষার একটি অংশে পরিণত হয়। হাজার হাজার হিফজখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআন নাজিলের ১৪ শত বছর পরও কোরআন মুখস্থকারীর সংখ্যা কোনোভাবেই হ্রাস পায়নি, বরং বেড়েছে। মুসলমানদের এমন কোনও পাড়া বা মহল্লা নেই, যেখানে আরব-অনারব, কালো-সাদা, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ কেউ না কেউ কোরআন মুখস্থ পারেন না। এই হিফজ শিক্ষার শুরু রসুলুল্লাহ (স.) থেকে। তার মাধ্যমে শিখেছেন সাহাবীরা। আর তাদের সত্যায়িত প্রক্রিয়াতেই এখনও প্রতি বছর হিফজ করছেন হাজার হাজার হাফেজ। দুনিয়ায় অনেক ধর্মগ্রন্থ রয়েছে— তাওরাত, জিন্দাবেস্তা, উপনিষদ, বেদ, বাইবেল, গীতা, ধম্মপদ। আছে অনেক সেক্যুলার গ্রন্থ—দর্শন, কাব্য, উপন্যাস। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, এই গ্রন্থ ও রচনাবলির কতটা কতজন মুখস্থ বলতে পারবেন? খোঁজ করলে কদাচিৎ দুই-একজনকে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু যদি কোরআন মুখস্থকারীর সংখ্যা জানতে চান, তবে এ সংখ্যা হবে লাখ লাখ। আর এই লাখ লাখ হাফেজের স্মৃতিতে সংরক্ষিত কোরআন এবং মসহাফে উসমানী থেকে কপি করা মুদ্রিত কোটি কোটি কোরআন একই কোরআন। সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতায় কোরআন এ ক্ষেত্রে অনন্য। এই বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক তথ্যই প্রমাণ করে কোরআনে প্রদত্ত আল্লাহর অঙ্গীকারের সত্যতা: ‘নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন (ধাপে ধাপে) নাজিল করেছি এবং (সব প্রকার বিচ্যুতি থেকে) আমি একে রক্ষণাবেক্ষণ করব।’ (সূরা হিজর: ৯)

আল্লাহ সব সৃষ্টিকে নির্দিষ্ট কাজ দিয়েছেন

আল্লাহ সব সৃষ্টিকে নির্দিষ্ট কাজ দিয়েছেন। ফেরেশতাদের যার যার কাজ নির্ধারিত। যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। যিনি বসে আছেন তিনি অনন্তকাল ধরে বসে আছেন। কিন্তু মানুষকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন, ইচ্ছার স্বাধীনতা। সুতরাং মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা বিরাজমান-একটি তার দেহ-নির্ভর নফস বা প্রবৃত্তি, অন্যটি তার মধ্যে আল্লাহর যাতের একটি অংশ। একটির প্রবণতা হচ্ছে মঙ্গল, সত্য এবং সুন্দরের দিকে। অন্যটির প্রবণতা হচ্ছে পশু প্রবৃত্তির দিকে যা তাকে সহজে আকর্ষণ করে। এ দুয়ের মাঝে তার বিবেক স্থাপিত একটি প্রদীপের মত। সে প্রদীপ তাকে কোনদিন আলো দেখাবে সেটা নির্ভর করবে তার নিজস্ব প্রকৃতি বা স্বভাবের উপর। তার দেহ যে চারটি আনাসির বা উপাদান দিয়ে তৈরি তার উপর।  মানুষকে আল্লাহ তিনটি ক্ষমতা দিয়েছেন- ক. চরম মঙ্গল অর্জনের ক্ষমতা। খ. চরম অমঙ্গলের ক্ষমতা। গ. মঙ্গল ও অমঙ্গলের তারতম্য বুঝতে পারার ক্ষমতা। মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা রয়েছে: একটি মানবিক সত্তা, অন্যটি পশু সত্তা। মানুষের প্রকৃতিতে পশুসত্তাই প্রবল। চারটি আনাসির বা এলিমেন্ট দিয়ে মানুষের দেহ তৈরি: আগুন, হাওয়া, মাটি ও পানি। এর অনুপাত অনুসারেই মানুষের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। মনে রাখতে হবে যে, এই আনাসিরের মধ্যে মাটি ছাড়া অন্য তিনটি মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। এই ক্ষতিকারক দিকগুলেকে নিয়ন্ত্রণ করে মানবতার বিকাশ ঘটানোর নামই আধ্যাত্মিক সাধনা। মানুষের মধ্যে স্থিত মঙ্গল ও অমঙ্গলের দ্বন্দ্ব প্রতি পালের দ্বন্দ্ব। যে মানুষের কোন নিয়মন্ত্রণকারী শক্তি নেই সে মানুষ যে কোন মুহূর্তে বিভ্রান্ত হতে পারে। সেটা নারীর প্রতি আসক্তি হতে পারে। অর্থবিত্তের লোভ হতে পারে। মানুষ পাপ থেকে বিরত থাকে- হয় ভয়ের জন্যে, তা না হলে ভালোবাসার জন্য। এ জন্যই বলা হয়েছে ঈমানের স্থান হচ্ছে ভয় এবং ভালোবাসার মাঝাখানে। জীবনকে সম্পূর্ণভাবে হালাল পথে উপভোগ করতে হবে। যার যার হক পূরণ করতে হবে। খাওয়া-দাওয়া, অর্থ উপার্জন, আনন্দ সবই করবে-একজন মুসলমানের জন্য এ সবই এবাদত। কিন্তু মুমিন মনে রাখবে এর মধ্যে সে নিমজ্জিত হবে না। তার নৌকা চলবে জীবন নামক সমুদ্রে কিন্তু তার নৌকায় পানি উঠবে না। ভগবত গীতায় একেই বলা হয়েছে নিষ্কাম কর্ম। মানুষ কাজ করবে কিন্তু ফলাফলের প্রত্যাশা করবে না। কথা হচ্ছে জীবনের কোন কাজেই কোন মোহ থাকবে না। মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। জীবনকে সত্যিকার অর্থে অর্থহীন করে দেয়। প্রত্যেক জিনিসই তার মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মানুষের শরীর যে উপাদান বা আনাসির দিয়ে তৈরি সেগুলো তাদের নিজ নিজ সত্তায় বিলীন হয়ে যায়। মাটি মাটিতে মিশে যায়, আগুন আগুনে মিশে যায়, হাওয়া হাওয়ায় মিশে যায়, পানি মিশে যায় পানিতে। কিন্তু তার মধ্যে যে ‘আমরে রাব্বি’ আল্লাহর হুকুম হয়ে তার রুহে অবস্থান করছিল সেটা কোথায় যায়? সেটাও ফিরে যায় তার মূলে। মূলে ফিরে যাওয়া ছাড়া জীবনের আর কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে? নাকি থাকা উচিৎ? মুসলমানের যখন জন্ম হয় তখন আজান দেওয়া হয়। শিশুর কানে সে আজানের ধ্বনি শোনানো হয়। সে শিশু জীবনের শেষে যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তাকে দাফন করার আগে একটা নামাজ হয়, জানাযার নামায। কিন্তু এ নামাজের কোন আজান হয় না। অর্থাৎ মানব জীবন হচ্ছে একটি আজান থেকে নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত  একটা সংক্ষিপ্ত সময়। এ সময় আমরা কিভাবে ব্যবহার করবো আমরাই জানি। কিন্তু আমাদের রব বলেছেন, ‘আমি জ্বিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি আমার এবাদতের জন্য।’ আমাদের গোড়াতেই একটা অঙ্গিকার রয়েছে। সে কথা মানুষ বিস্মৃত হয়। কিন্তু যিনি সত্যিকারের মানুষ তিনি জানেন দেহকে নির্ভর করে যে ‘আমি’ প্রতিনিয়ত আমিত্বের আস্ফলন করে সে ‘আমি’ কোনদিনই মূলে প্রত্যাবর্তন করবে না। তাই তার অন্তহীন প্রয়াস হচ্ছে তার নিজের মধ্যে সেই ‘বৃহৎ আমি’কে জাগিয়ে তোলা। পথ তো যার যার নির্দিষ্ট, কিন্তু গাছের ফুল ফল বীজের দিকে, বীজকে আমরা মাটির নচে পুঁতে দেই। সে বীজ যতক্ষণ পর্যন্ত পচে গিয়ে নিঃশেষে মাটির সঙ্গে না মিশে ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন জীবনের অংকুর উদগম হয় না। ক্ষুদ্র আমিত্বকে নিঃশেষে বিসর্জন দেবার পরই ‘বৃহৎ আমি’ এসে স্থান করে নেয়। বোতলে পানি ভরলে বাতাস বের হয়ে যায়। পানি আর বাতাস যেমন একই পাত্রে একই সাথে অবস্থান করতে পারে না তেমনি ক্ষুদ্র ‘আমি’ এবং ‘বৃহৎ আমি’ একসঙ্গে থাকতে পারে না। এজন্যই সব শাস্ত্রেই বলে ‘নিজেকে জান’, ‘নো দাইসেলফ’ বা ‘আত্মানং বিদ্ধ’। এমনভাবে যখন মানুষ জীবনকে দেখতে শেখে তাখন প্রতিটি মানুষের মধ্যে সে নিজেকেই দেখতে পায়। এ জন্যই কোরআনুল করিমে বলা হয়েছে, যারা ইহকালে অন্ধ তার পরকালেও অন্ধ হয়ে উঠবে। যে স্বেচ্ছায় অন্ধত্বকে বরণ করে তার স্বেচ্ছাচারিতার দায় দায়িত্ব তার প্রভু নেবেন কেন। এ জন্যই রয়েছে বেহেশত ও দোজখ। কিন্তু যে মানুষ পুরুষোত্তমের সাধনায় নিমগ্ন সে কিন্তু বেহেশত দোজখ নিয়ে মাথা ঘামায় না। তার প্রেমাস্পদ যেখানে রয়েছে সেটাই তার দোজখ। তার বেহেশত দোজখের শুরুও এখান থেকেই। এখন চোখ খুলে পৃথিবীর দিকে তাকাও, দেখবে মানুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। পশুত্বের সব চিহ্ন তার স্বভাবে। কেউ হায়েনার মত হিংস্র, কেউ শিয়ালের মত ধূর্ত। এই মানুষের সঙ্গে পশুর তফাৎ কোথায়? এদের মুখে কোরআন হাদিস থাকতে পারে। এরা চেহারা সুরতে ধার্মিক হতে পারে কিন্তু এদের সেজদায় কখনো ‘মেরাজ’ হবে না। আজকের এই সমাজে এদে সংখ্যাই বেশি। এদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা হয়তো আছে কিন্তু পবিত্রতা নেই। তথ্যসূত্র: হযরত সৈয়দ রশীদ আহমদ জৌনপুরির (রহ) এর ‘সংলাপ সমস্র’ বই থেকে সংগৃহীত।   এমএস// এসএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি