ঢাকা, ২০১৯-০৬-২৬ ৭:৫৬:২৭, বুধবার

‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা’ নামের বই নিয়ে তোলপার

‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা’ নামের বই নিয়ে তোলপার

ফ্রান্সের একজন লেখক ‘দ্যা ভ্যাটিকান ইজ আ গে অর্গানাইজেশন’ অর্থাৎ ‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা’ নামে বই লেখেন। বইটি লেখার পর ব্যাপক তোলপার শুরু হয়েছে। ফ্রেঞ্চ এই লেখক দাবী করছেন ক্যাথলিক চার্চের প্রাণকেন্দ্রে কীভাবে দুর্নীতি এবং ভণ্ডামি লুকিয়ে আছে সেটাই তিনি উন্মোচন করেছেন। ফ্রান্সের লেখক ফ্রিডেরিক মারটেল বলেছেন তিনি চার বছর ধরে অনুসন্ধান করে বইটি লিখেছেন। তিনি দাবি করেছেন কয়েক হাজার যাজক গোপনে সমকামী জীবনযাপন করেন। আবার তারাই জনসাধারণের সামনে এই সমকামিতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে। তিনি বলেছেন, ‘তারা সমকামিতা নিয়ে যতটা সমালোচনা করেছে তারা গোপনে সমকামী জীবন উপভোগে ততোটাই কামুক।’ মারটেল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চার বছরের অনুসন্ধানের ফলাফল এই বই। আমি কয়েকটা দেশে গিয়েছি। এবং কয়েক ডজন কার্ডিনাল, বিশপ এবং যারা যাজক হওয়ার জন্য শিক্ষা নিচ্ছে এবং যারা ভ্যাটিকানের সাথে যুক্ত তাদের সাক্ষাতকার নিয়েছি।’ মারটেল বলেছেন তিনি ৪১জন কার্ডিনাল, ৫২ জন বিশপ এবং দুইশর বেশি যাজক, শিক্ষার্থী এবং রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। তিনি আরো বলেন অনেক তরুণ যারা তাদের গ্রামে নিজেদের যৌন বৈশিষ্ট্যের জন্য নিগৃহীত হয় তারা পালানোর একটা পথ হিসেবে যাজক জীবনকে বেছে নেয়। এভাবেই চার্চ ‘একটা ইন্সটিটিউশনে পরিণত হয়েছে যেখানে বেশিরভাগ সমকামী।’ লেখক দাবি করেছেন, ‘আমি আবিষ্কার করেছি ভ্যাটিকান একটা উচ্চ পর্যায়ের সমকামী সংস্থা।’ সমকামীরা একটা কাঠামো তৈরি করেছে যার ফলে দিনে তারা তাদের যৌন বৈশিষ্ট্য দমন করে রাখে। কিন্তু রাতে প্রায় ক্যাব (গাড়ী) নিয়ে সমকামী বারে যায়। মারটেল কে একটা সূত্র বলেছে ভ্যাটিকানে ৮০ শতাংশ সমকামী কিন্তু ফ্রেন্স এই লেখক নিরপেক্ষভাবে সংখ্যাটি নিশ্চিত করতে পারেনি। লেখক বলেছেন তিনি এমন অনেক প্রমাণ পেয়েছেন যেসব যাজকরা জনসাধারণের কাছে সমকামিতা নিয়ে কটাক্ষ করে কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তারা সমকামী। এমন হাজারো উদাহরণ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। মারটেল যে অভিযোগ করেছে সেটা নিয়ে মন্তব্য করার জন্য বিবিসি ভ্যাটিকানের সাথে যোগাযোগ করে কিন্তু তাৎক্ষণিক কোন মন্তব্য পাওয়া যায় নি। কিন্তু ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ জেমস মার্টিন ফ্রেঞ্চ এই লেখক যে উপায়ে সাক্ষাতকার থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মারটেল তার বই এর জন্য গভীর অনুসন্ধান করেছে এবং তিনি চার্চে সমকামিতা এবং ভণ্ডামির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। কিন্তু এই ধারণা বরফ ধসের নীচে যেমন চাপা পরে তেমনি ভাবে চাপা পরে যাবে পরোক্ষ বক্রোক্তি, রটনা, গুজবের মত করে। এবং এটা পাঠকদের হতবিহবল করে দিবে । এটা তাদের জন্য কঠিন হবে বাস্তবতা এবং মিথ্যা গল্পের মধ্যে পার্থক্য করা যেমন কঠিন কাজ তেমনটা।’   তথ্যসূত্র: বিবিসি এমএইচ/
কাজী মেহেদী হাসান’র বয়ানে ফারদুন সিরিজ-এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া

“আমিই সেই বদ্ধমূল সাজা কারারুদ্ধ করেছি কবিজীবন” ফারদুন সিরিজ। সুবর্ণ আদিত্য। দুটো নাম আলাদা করে লেখা যায়? লাগছে আলাদা? তা লাগুক। উপরের দুটো লাইন যদি তিনি আত্মস্থ করে থাকেন তবে কী যায় আসে আর!   সিরিজ কবিতাকে আমি দুঃসাহস বলি, মানে কঠিন ব্যাপার। কবিরাই সেই কাজগুলো করবেন সেও স্বাভাবিক। তবে কতটুকু উৎরে গেলেন সেটা পাঠক ভালো বলতে পারবেন। প্রথম কাজটা পড়ার। কিন্তু কেন পড়বেন? সুবর্ণ আদিত্য প্রেমের কবিতা লেখেন। টানছে না?সুবর্ণ আদিত্য দ্রোহের কবিতা লেখেন। টানছে না?সুবর্ণ আদিত্য বোধের দেয়ালে ধাক্কা দিতে জানেন। ধাক্কা কি লাগলো?কেমন হয় যদি সবগুলোই একেবারে পেয়ে যান? ফারদুন ডেনমার্কে, শীতের দেশ। কবি বলছেন,“ভরা ডিসেম্বরেও এখানে শীত নেই— সবটাই নিয়ে গেছ?” এই হাহাকার কেবলই প্রেমের? বলছেন,“ট্রেনে চেপে দুইশ মাইল পথনির্বিঘ্নে কুড়ি মিনিটে চলে যেতে পারআমি সাধারণ বাঙালি— আফসোস করি দূর থেকে বুঝি— আরো কতটা গতিময় হয়েছ তুমি” এই ধাক্কাটা আমি ভালোবাসি। পাঠককে ধাক্কা দিয়ে দূরত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেন বলতে পারা— নেই বলেই সমস্তে আছি আমি। “নীলক্ষেতের পথে একবার বলেছিলেঃ যানজট থাকলে, যানবাহন কিংবা যাত্রী কারো জন্যই তোমার কষ্ট হয় নাদুঃখ হয় রাস্তাটার জন্য— কতটা ভার বয়ে রাখে সে” বলেছিলাম সব একসাথে পাবার কথা, আরও ভিন্ন কিছু চোখ আরও কিছু পথ পাবে। সে পথের সৌন্দর্য্যও আলাদা হবে কিন্তু সবই কবিতা। শুদ্ধতম স্বর। “ফারদুন গণিতে কাঁচাএকটা টিউটর নিয়োগ দিলে পাখিদের ভাষা বুঝে নিতে পারত” কিছু দৃশ্য, কিছু কথা, সেটাকে ভিজ্যুয়াল করে চোখের সামনে আছড়ে ফেলা। “নদীটা গণিতে খাটোগাছটা ছায়া বাঁকাএকদিনহঠাৎ... ফারদুন চমৎকার উড়ে গেল” মুগ্ধতার সংজ্ঞা এইখানে পাওয়া গেল। পাওয়া গেল—“খাবারের প্লেট থেকে গড়িয়ে যাবেছাপ্পান্ন হাজার মাইল দুর্ভিক্ষ” “বনমন্ত্রী কী জানে, যশোর রোডের গাছগুলোও গাছ!” কিংবা“পুরো পৃথিবীর দুর্ভিক্ষটাকে চুরি করে নিয়ে যাবে— এমন চোর কোথায়?” এবং“ধর্ম জানে না, মাথা ছাড়া মানুষের আয়ু থাকে না” পাঠকের ধর্মকে যদি হৃদয়ঙ্গম করা বলি, তবে আপনি আমন্ত্রিত সুবর্ণ আদিত্যে। যিনি লিখেন, “গোলাপের আয়ুর কাছাকাছি ছিলআমাদের ঝরে পড়া” মূলত সবকিছুই তাই, অপার মুগ্ধতা নিয়ে সমস্ত কিছু বিনাশ হবার অপেক্ষা করছে এক বোধের পৃথিবীতে। না পাওয়াঃ আগেই বলেছিলাম সিরিজ কবিতা লেখা দুঃসাহস। কবি আশাকরি ভালো প্রস্তুতি নিয়েই করেছেন। তথাপিও বেশ কিছু জায়গায় ফারদুন নামের বাহুল্যতা লক্ষণীয়। আরেকটু সতর্ক হলেই এগুলো কাটাতে পারতেন, সে সামর্থ্য কবির আছে। কিছু পাঞ্চ লাইন তৈরি করতে চেয়েছেন। বেশিরভাগ জায়গাতেই সফল। কিন্তু ঐ যে তৈরি করতে চাওয়া এখানেই সমস্যা হয়েছে কয়েকটা জায়গায়। হয়তো তৈরি করার চেয়ে তৈরি হয়ে গেলে সেখানেই থেমে যাওয়াটা উচিত। একই কথা প্রযোজ্য আগের মতোই। যেহেতু বেশকিছু জায়গায় পেরেছেন চাইলে সবখানেই পারবেন। কবিতার লাইনগুলোর কানেক্টিভিটিও কম। ইমেজারি, গল্প বলা সবমিলিয়েই কিছুটা ছাড়া ছাড়া ব্যাপার আছে। ফারদুন সিরিজে তিনি পাঠককে দুর্বোধ্যতা, পরাবাস্তবতার ফাঁদে একেবারে আটকে ফেলেননি, ছেড়েও দেন নি। বরং যথেষ্ট জায়গা দিয়েছেন প্রত্যেকের মগজের মনন যাচাই করে নেবার। এটা সমালোচনা নয় তবে পাঠককে টেনে ধরে রাখবার যে ক্ষমতাকে আমি শ্রদ্ধা করি সেটা পরাবাস্তবতা আর বাস্তবতার সম্মিলন ঘটাতে উনার যে সতেচন প্রচেষ্টা ছিল সেটাই কিছু ক্ষেত্রে শেষ করার আনন্দটুকু পেতে দেয়নি। পুনশ্চঃ আমি বলবো সব মিলিয়ে এই বইটা টাকা দিয়ে কিনে টাকাটা জলে ভাসানো হবে না, যে ভালোবাসে, বাসতে চায়, বাসাতে চায় সে পায়ের ধুলোকেও প্রেমের ইশারা করে তুলতে জানে এইটুকু বলা ভালো। কবি লিখেছেন,“জাদু দেখাবার পর তিনিও মানুষের মতো হেঁটে গেলেন...” এই লাইনটাতে কবি সুবর্ণ আদিত্য থাকুন, পাখির আর পাঠকের চোখে। হ্যাপি জার্নি। নোট: বইটি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ঢাকা ৫৭৩ ও চট্টগ্রামে ৮১+১০১ নাম্বার পেন্সিলের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। দাম ১শ টাকা। এসি   

১৯৭১: প্রতিরোধ সংগ্রাম বিজয়

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশটি নিজেদের করে পেয়েছি প্রায় চার যুগ আগে। দীর্ঘ এই সময়েও আমাদের স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের আবেদন ফুরোয় নি এতটুকু। কেননা, বাজারে স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে যে সব বইপুস্তক দেখি, তার বেশিরভাগই কোনো না কোনো একটি বিষয় নিয়ে রচিত। স্বাধীনতার নয়মাস, কিশোর, নারীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম কাহিনীসহ নানা ঘটনার বিষয়ভিত্তিক বর্ণনা এসেছে খন্ড খন্ড আকারে। সব গল্পগুলোও আলাদা। একেকজনের অভিজ্ঞতা, একেকজনের উদ্ধৃতি একেক রকম। সব অভিজ্ঞতা ও গল্পই স্বতন্ত্র, গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু পাকিস্তানের অধীনে থেকে ২৩ বছরের নির্যাতন আর শোষণ, এরও আগে ইংরেজদের অধীনে শাষিত হওয়াসহ মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক পুরো প্রেক্ষাপটকাল এক মলাটে পাওয়া ভার। আবার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যেসব বই পাওয়া যায়, তার গুণগত মান, তথ্যের সঠিকতা আর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এক শ্রেণির কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস মানে অস্বস্তির। কেননা, সে সময়ের প্রকৃত ইতিহাস কারও কারও অবস্থান নড়বড়ে করে দিতে পারে।    আবার, বড় একটা শ্রেণিই নির্মোহভাবে লিখতে পারেননি। যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে আমাদের জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, সে সব ঘটনা নিয়ে আমাদের মধ্যে একধরণের আবেগ, ভালোবাসা, ঘৃণা, পছন্দ বা অপছন্দের বিষয়গুলো জড়িত। কাজেই, পরবর্তীতে সে সব ঘটনা যখন আমরা বর্ণনা করি, নিজেদের মতো করে বলি বা লিখি তখন তাতে আমাদের ব্যক্তিগত ওই আবেগ ভর করে। এর ফলে প্রকৃত ঘটনাতে রং লাগে। তবে, `১৯৭১ প্রতিরোধ সংগ্রাম বিজয়` গবেষণাগ্রন্থটি ব্যতিক্রম। যাতে এক ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে স্বাধীনতাকেন্দ্রিক ইতিহাসের পুরো অবয়ব। গুম হয়ে যাওয়া সত্যকে খুঁজে বের করা, ঠিকঠাক যাচাইবাছাইয়ের পর তা সামনে টেনে আনা বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল একাত্তর সালে। তবে, তা হুট করে আসেনি। তার গৌরবোজ্জল উত্থান পর্ব আছে। রয়েছে তথ্যনির্ভর প্রেক্ষাপটও। তবে, অনিবার্য ধারাবাহিকতায় আমরা সশস্ত্র প্রতিরোধ পর্বের সূচনা দেখতে পাই একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এই পর্বের সমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। আসলে কি তাই? এ যুদ্ধ তো এক দিনে শুরু হয়নি। এর আছে একটি বিস্তৃত পটভূমি। এ ঘটনা সে সময়ের মাত্র ৭ বছরের একটি বালকের মনে এতটা গভীরভাবে দাগ কাটে যে পরবর্তীতে সেই বালক, বর্তমানে মেজর জেনারেল মো. সরোয়ার হোসেন কে বইটি রচনায় উৎসাহ জোগায়। প্রায় দুই দশক এর চিন্তা চেতনার ভিত্তিতে লেখক পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত সুসমন্বিত কাঠামোর মধ্যে একটি বিশ্লেষণধর্মী উপাখ্যান হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। যা সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে গবেষণাকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনার অনন্য উদাহরণ।   ২.`১৯৭১: প্রতিরোধ সংগ্রাম বিজয়` বইটিতে সর্বমোট দশটি অধ্যায় রয়েছে। যা অতীত পরিপ্রেক্ষিতসহ মুক্তিযুদ্ধকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করেছে। সহজ লেখনীতে ঘটনার কাঠামো বিন্যাস বা বর্ণনার ঢং পাঠককে যেমন আকৃষ্ট করবে সহজে, তেমনি মনে রাখাও সহজ হবে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আকাশ থেকে টুপ করে পড়া বৃষ্টির ফোটা নয়। আবার, কেবল ৪৭ এর দেশভাগের পরেই কেবল বাঙালির মনে প্রথম স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্খা জেগে ওঠে, তাও নয়। প্রকৃত ইতিহাস জানতে ইতিহাসের দিনপঞ্জিকায় আরেকটু পেছনে যেতে হবে। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের উত্থান, দ্বি-জাতি তত্বের উদ্ভব, ব্রিটিশ শাসনের কাঠামোর মতো বিষয়গুলো জানার পরই মস্তিষ্কে কেবল পাকাপোক্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্থায়ী রূপে গ্রথিত হতে পারে। লেখক সেদিকেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়েছেন। কয়েক শতক আগে চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লংয়ের ভারতবর্ষের অভিযান, ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ, লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা, বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত একটু আলোকপাত করা হয়েছে প্রথম অধ্যায়ের পটভূমিতে। যা পাঠককে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের আলোকে সার্বিক বিষয়টি বুঝতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী মন্তব্য করেছেন বইটি নিয়ে। বলেছেন, ‘মেজর জেনারেল সরোয়ার রচিত এই বইটি একটি নিখুঁত গবেষণার ফসল। সম্ভবত এটাই প্রথম প্রকাশনা যেখানে বাংলাদেশীদের দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপরে একটা গ্রহণযোগ্য ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটির রচনাশৈলী বেশ সহজাত এবং উপস্থাপনা চমৎকার। অত্যন্ত সুখ পাঠ যোগ্য এই বইয়ে দখলদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন যুদ্ধের বিবরণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংকলিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী যে কারও জন্যই এটি একটি অবশ্য পাঠ্য বই।’ দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপরে একটি ভূ-রাজনৈতিক আলোচনাসহ পাকিস্তানী বাহিনীর প্রাথমিক অবস্থান। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের পর বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ও বিকৃত ভূখন্ড নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, যার সীমান্তটি অবিরত আঁকাবাঁকা হওয়ার কারণে অনেকগুলো চোখে পড়ার মতো সংকীর্ণ খাঁজকাটা ভূখন্ডের সৃষ্টি করেছে। কোথাও সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল মূলত সে স্থানের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল। সে স্থানের বিদ্যমান ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ঠিক মতো না জেনে সেখানকার সামরিক ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যুদ্ধের গভীরে প্রবেশের আগে পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য জানা প্রয়োজন। সামরিক বাহিনীর সে সময়ের তথ্যসহ ভূ-প্রাকৃতিক নানা ইতিহাস আলোচনা হয়েছে দ্বিতীয় অধ্যায়ে। প্রয়োজনীয় মানচিত্র ও নকশার সাহায্যে খুব সহজে কিভাবে বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জনগণের সমর্থন নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হীন চক্রান্তকে নস্যাত করে দেয়, তা সাবলীলভাবে উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে। যা পড়লে পাঠক সহজেই ঘটে যাওয়া ঘটনার একটি স্কেচ অংকন করতে পারবেন, যা ঘটনা বোঝার জন্য সহায়ক। সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল মুবিনের মন্তব্য, ‘এই বইটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত, পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক দলিলের এক গুপ্তধন। নিঃসন্দেহে এই বইটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খু গবেষণার ফল।’ ইতিহাসের ধারাক্রমের সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাও উঠে এসেছে বইটির প্রতিরোধ পর্ব বিষয়ক তৃতীয় অধ্যায়ে। ২৫ মার্চ পরবর্তী বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীন পরিস্থিতির মধ্যে কঠিন এক অবস্থায় গঠিত হয় বাংলাদেশ বাহিনী। তা ঐতিহাসিক নানা দলিলাদির সাহায্যে অকাট্য প্রমাণ দিয়ে তুলে ধরেছেন লেখক। পাকবাহিনীর পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই সামরিক বাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাঙালি সদস্যদের নিয়ে হাতে গোণা কয়েকটি ব্যাটালিয়ন গঠিত হয়। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও একাত্তরের মার্চ-এপ্রিলে চাকুরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত অল্প সংখ্যক কর্মকর্তা ও বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সমন্বিতভাবে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। কেননা, একজন সৈনিকের জীবন সবসময় বেঁচে থাকার সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে পরিচালিত। যা তাকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা জয় করার তাড়না দেয়। সাধারণত জীবন পাল্টে দেয়ার মতো একটা ঘটনাই মানুষকে নিজের মধ্যে দুঃসাধ্য কিছু করার ক্ষমতা আবিষ্কার করতে প্রভাবিত করে। ২৫ শে মার্চের রাত ছিল এমনি একটি ঘটনা যা বহু বাঙালি সৈনিক আর যুবককে যুদ্ধে যোগ দিতে প্রেরণা দেয়। সহজভাষায় ইতিহাসের উপাদান ছড়িয়ে পাঠককে আকৃষ্ট করার বিষয়টি উঠে এসেছে সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলার মন্তব্যে। তিনি লিখেছেন, ‘এই বইটি ইতিহাসের বৃহৎ কলেবরের প্রেক্ষাপটে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত একটি অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন প্রকাশনা। এই বইটি আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক বাস্তবতাকে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে খুব সহজে আর অধিক উপলব্ধি দিয়ে বুঝতে সাহায্য করছে।’ বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর বিবর্তন প্রক্রিয়া, ক্রমবিকাশ ও উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা রয়েছে চতুর্থ অধ্যায়ে। সিলেটের তেলিয়াপাড়া বৈঠক হিসেবে খ্যাত প্রথম বৈঠকে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা, যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সুষ্ঠু দিক নির্দেশনার গুরুত্ব উঠে আসে। সামরিক বাহিনীর অভ্যূদয়ের সময় যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল, তা বর্ণনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। যথাযথ আদেশ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অনুপস্থিতি, বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের শূণ্যতা, নির্দিষ্ট দায়িত্বপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার অভাব, সামরিক কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব কাটিয়ে উঠার মতো যে সমস্যা ছিল, তাও তুলে ধরা হয়েছে বইয়ের এই অধ্যায়ে। সেই সঙ্গে নানাবিধ বাধা অতিক্রম করে একটি পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার বর্ণনা রয়েছে। যা পাঠককে সমৃদ্ধ করবে। একাত্তরের প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি সরকারি কর্মজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবীসহ আপামর জনসাধারণের ভূমিকা সাবলীলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কচি বয়সে লেখকের মনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। তা থেকেই পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় ইতিহাস সংকলনের বিষয়টি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছাতেই শুরু করেন। তবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ঘটনা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরার প্রচেষ্টা অনেকটা দুঃসাধ্য। যেখানে কেবল মনের মাধুরি মিশিয়ে গল্প বলা নয়। তথ্য পাওয়ার পর সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা নিঃসন্দেহে আরও কঠিন। একজন গবেষক হিসেবে এই কাজটি করতে হয়েছে মেজর জেনারেল মো. সরোয়ার হোসেনকে। তাই কাজটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘এই বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ব্যাপক গবেষণা ও তথ্য উপাত্ত দ্বারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঐতিহাসিক সঠিকতার দিকে খেয়াল রেখে রচনা করা হয়েছে। বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক দিকসহ সার্বিক যুদ্ধের ওপর তথ্যবহুল ও অন্তদৃষ্টিপূর্ণ আলোচনা স্থান পেয়েছে। আমার মনে হয়েছে, এটি একটি অবশ্য পাঠ্য বই।’   সময়ের স্বল্পতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার জন্য যুদ্ধকালীন সময়ে একটা পূর্ণাঙ্গ সামরিক বাহিনী গঠনের কাজটি ছিল বেশ কঠিন। যথাসময়ে ও সুনিপুণভাবে যেকোনো লক্ষ্য অর্জনে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সবসময় পারদর্শীতার সাক্ষর রেখে থাকেন। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রাপ্তসম্পদ ও জনবলের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংগঠিত করা হয়। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন বাহিনী গঠনের। পরে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ, স্বেচ্ছাসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও সশস্ত্র সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১টি সেক্টর, তিনটি ফোর্স, আর্টিলারি কোর, বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ভূমিকার বর্ণনা রয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে। এই বইটির ব্যাপারে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিত্তব্রত পালিতের মন্তব্য এমন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের উপরে রচিত প্রায় সকল রচনাতেই জাতীয়তাবাদী সুখানুভব প্রকাশের একটা তীব্র প্রবণলতা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু এই বইয়ের লেখক কোনো প্রকার জাতীয়তাবাদী আনন্দচাঞ্চল্য ছাড়াই বস্তুনিষ্ঠতার সাথে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন, যে বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে।’ সত্যিই এমন মন্তব্য যে কোন লেখকের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। বাংলাদেশ সরকার যখন বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড গঠনে ব্যস্ত, প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে তখন অঞ্চলভিত্তিক কিছু স্থানীয় নেতাদের নামে বিভিন্ন অনিয়মিত বাহিনী গড়ে ওঠে। স্বঘোষিত নেতাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এসব ছোট ছোট স্থানীয় ও অরাজনৈতিক বাহিনীগুলো ছিল মূলত অনিয়মিত বাহিনী। এসব বাহিনীর ওপর বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্সের কোনো প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। নেতাদের আত্মবিশ্বাস ও শৌর্যবীর্যই এসব বাহিনীর উত্থানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন। কাদেরিয়া বাহিনী, মুজিব বাহিনী (বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী-বিএলএফ), মির্জা আবদুল লতিফ বাহিনী, আফসার ব্যাটালিয়ন, হালিম বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আকবর বাহিনী, প্রকৌশলী আবুল হোসেনের বাহিনী, বাতেন বাহিনী, কুদ্দুস বাহিনী ও গফুর বাহিনীর নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে বইটির ষষ্ঠ অধ্যায়ে। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ মন্তব্য করেছেন ইতিহাসের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার পাশাপাশি বইটির ভাষা শৈলী নিয়ে। তার মতে, ‘এই বইটির সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক বিষয় হলো, এর সুস্পষ্ট শব্দ প্রবাহ- যা পাঠককে খুব সহজেই জটিল যুদ্ধ কৌশলসহ মুক্তিযুদ্ধের সামরিক অসমারিক পরিপূরকতার বিষয়ে যুক্ত করে দেয়। বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তের একটি ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং যুদ্ধ, শান্তি ও সংঘর্ষ বিষয়ক অধ্যায়নে এটি একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে পাঠ্য হতে পারে।’ গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে অনেক আলোচনা থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গেরিলা যুদ্ধ কখনোই রাজনৈতিক সম্বন্ধ থেকে আলাদা হতে পারে না। একাত্তরে বাংলাদেশে গেরিলা যুদ্ধের ক্রমবিকাশ রাজনৈতিক কারণেই হয়েছিল। যার প্রয়োজনীয়তাও ছিল অপরিহার্য। যদিও কখনো বিপ্লবের ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ ভূমিকা থাকে না। বরং গেরিলা যুদ্ধকে একটা বিপ্লব পরবর্তী পরিণতি হিসেবেই দেখা হয়। এটি সচারচর তখনই ঘটে যখন বিদ্রোহীরা অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল থাকে, সশস্ত্র বিপ্লব অথবা অভ্যুত্থান করতে অসমর্থ হয়। যেখানে ক্ষমতাসীনরাও থাকেন একগুঁয়ে ও প্রভাবশালী। যারা শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পথ প্রত্যাখান করেন। এমন বিশেষ কিছু গেরিলা যুদ্ধসহ মধ্যাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল, দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এর বেশ কিছু অভিযানের বর্ণনা রয়েছে সপ্তম অধ্যায়ে। পড়লে মনে হবে যেন তা ঘটছে চোখের সামনে। কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর এবং প্রেসিডেন্ট অমিত চাকমা বলেছেন, ‘লেখক এত সুসমন্বিতভাবে সম্পূর্ণ যুদ্ধের বিবরণ উপস্থাপন করেছেন যে, এই বইটি ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী সকলের কৌতুহল মেটাতে সক্ষম হবে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলিকে তথ্য উপাত্ত এবং নথিপত্রের সাহায্যে শ্রমসাধ্য গবেষণা দ্বারা এই বইটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। বইটির শুরুতে তিনি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সংক্ষিপ্তাকারে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেছেন, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নেয়। এই সব ঘটনাবলি গ্রন্থখানা পড়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। যা এর পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানদন্ডকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষভাবে সামরিক বাহিনীর শিক্ষার্থীদের নিকট বাংলাদেশ বাহিনী কর্তৃক প্রচলিত এবং অপ্রচলিত যুদ্ধের যুগপৎ প্রয়োগের বিষয়টি যথেষ্ট আগ্রহোদ্দীপক বিবেচিত হবে।’ চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে বাংলাদেশ বাহিনীর ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে অষ্টম অধ্যায়ে। এতে বর্ণনা রয়েছে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ও হতাহতের সংখ্যার ভিত্তিতে মুক্তিবাহিনী গৃহীত বিভিন্ন আভিযানিক পদক্ষেপের প্রভাব। লেখক বলছেন, মুক্তিবাহিনীর দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের বিপরীতে মিত্রবাহিনীর দুই সপ্তাহব্যাপী (৩ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত) খন্ডকালীন যুদ্ধকে একটি অসম তুলনায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের গতিপথ পর্যালোচনা করলে এটি পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, তখন অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু প্রথম যুদ্ধটি ছিল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে। নানাবিধ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতা এই যুদ্ধে অনেকগুলো শক্তিধর দেশকে সম্পৃক্ত করেছিল। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই পুরো আঞ্চলিক পরিস্থিতি আবর্তিত হয়। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ এর পাকিস্তানি সামরিক আগ্রাসন ছাড়া কোনোভাবেই পরবর্তী যুদ্ধগুলো সম্ভব হতো না। তাই ২৬ মার্চের পর যা কিছু ঘটেছে, তার সবটাই প্রথম যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দীর্ঘদিনের সন্দেহ আর ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণের জন্য এই বিষয়গুলো ঐতিহাসিক এবং গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যানের আলোকে উপস্থাপন করা জরুরি। চূড়ান্ত পর্যায়ের অভিযান, পাকিস্তানিদের পরিকল্পনা আর মিত্রবাহিনীর আক্রমণের বর্ণনা রয়েছে নবম অধ্যায়ে। রয়েছে ভারতীয় পরিকল্পনা, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল আর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা ও বিজয় কাহিনী। বলা হয়েছে, সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাকিস্তানি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দূর্গ এবং শক্তিশালী অবস্থানভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু সৈন্যের স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মিত্রবাহিনী তাদের অগ্রযাত্রার পথে বড় ধরণের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার কৌশল অবলম্বন করে। ভারতীয় ইস্টার্ণ কমান্ডকে প্রাথমিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানে শত্রুর একটি বিশাল অংশ দখল করতে আদেশ দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য অংশ দখলের পর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ বিশেষ করে চট্টগ্রাম আর খুলনার বন্দর এলাকা দখল করতে বলা হয়। শেষ অধ্যায়ে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়ের উপর আলোকপাত। যুদ্ধের কারণ, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে সামরিক শক্তির ব্যবহার, বাঙালি জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা, ন্যায়সঙ্গত কারণ, জনসমর্থন নিয়ে রয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দলিল-দস্তাবেজ আর ইতিহাসের ঘটনার আলোকে তথ্যবহুল বর্ণনা। কৌশলগত ও আভিযানিক, প্রতিরক্ষাকারীর স্বর্গ, প্রচলিত ও অপ্রচলিত রণ কৌশলের যুগপৎ ব্যবহার, পাকিস্তানি দুর্গ ও শক্তিশালী অবস্থানভিত্তিক যুদ্ধ কৌশল, মিত্রবাহিনীর এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল, অরক্ষিত ঢাকা, পরিকল্পনায় নমনীয়তা, বিমান- গোয়েন্দা সহায়তা, মাইন ও বিস্ফোরকের ব্যবহার, সামুদ্রিক রণক্ষেত্র নির্যাস পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার আলোচনা আগ্রহী পাঠক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। জলবায়ু, রসদ সরবরাহ, আন্তঃবাহিনী সমন্বয়, গণমাধ্যমের ভূমিকা আগ্রহীদের বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচ্য হবে। ৩.কেবল অজানা কিছু তথ্য নিজের মতো করে তুলে ধরাই নয়, তার যথার্থতাও যাচাই করা জরুরি। আমরা চলমান ইতিহাস দেখে অভ্যস্ত। কয়েক ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা মুহুর্তেই অতীত হয়ে পড়ে, প্রশ্ন তোলা যায় তার সত্যতা নিয়ে। কাজেই, পুরনো ঘটনা ঠিকভাবে তুলে ধরার কাজটি করতে গেলে কেবল ঘটনাই নয়, পারিপার্শিকতার নানা অনুষঙ্গও হাজির করতে হয়। ইতিহাসের পাশাপাশি গবেষণার গুণগত মান ও সংখ্যাতত্ত্ব বৈশিষ্ট্যও মানা হয়েছে পুরোপুরি। পুরো বইয়ের আলোচনায় রয়েছে প্রয়োজনভিত্তিক নকশা, মানচিত্র ও তথ্যের গ্রাফিক্স। যা বইটিকে অন্য বইয়ের চেয়ে ভিন্নতা এনে দিয়েছে। প্রতিটি আলোচনার পর রয়েছে লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ। অনেক ক্ষেত্রেই বিষয় পড়ার পর পাঠক বিভ্রান্ত হন বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। এই বিশ্লেষণ বিভ্রান্ত হওয়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার দোদুল্যমনতা থেকে পাঠককে বের করে নিয়ে আসবে। ৪. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা নেই খুব একটা। যা আছে, তারও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের বাইরে ভারতীয় বা পাকিস্তানি সামরিক অফিসাররাও এ বিষয়ে বেশ কিছু পুস্তক রচনা করেছেন। তবে, তাদের লেখনীতে তাদের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার একটা প্রয়াস ছিল। দেশের বাইরের গণমাধ্যম কর্মীরাও কিছু লিখেছেন। আমাদের অনেকেই পুরনো ঘটনা বা ইতিহাস লিখতে গেলে চালুনি ব্যবহার করি। সবটা বলি না। পাছে লোকে কিছু বলে ধরনের চিন্তা-ধারা থেকে, কে পছন্দ করেন, গোস্বা করেন আবার কে। কেউ যদি বিব্রত হন বা অপছন্দ করেন। ফলে সেসব লেখায় সামগ্রিক চিত্র উঠে আসেনি। বরং সেক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়নই বেশি ফুটে উঠেছে। এতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের নিজ দেশ ও মানুষের উপস্থিতি যত বেশি, বাংলাদেশের উপস্থিতি ততটা নয়। তবে কিশোর বয়সের ঘটনা, পিতার কর্মসূত্রে নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের সাক্ষী হওয়ার পরেও মেজর জেনারেল মো. সরোয়ার হোসেন অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠার সাথে এই গবেষণামূলক বইটি লেখার কাজ সম্পন্ন করেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ও বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মুক্তিযুদ্ধকে সমীক্ষা করা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যায়তনিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং সামরিক- বেসামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতীর জীবনে অমূল্য আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবদান রেখে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণ করেছে, তা জাতির ভবিষ্যত পথচলার স্বার্থে জানা ও অনুধাবণ করা অপরিহার্য। সম্প্রতি স্ট্র্যাটেজিক সায়েন্স, পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ, সোস্যাল চেঞ্জ অ্যান্ড পিপলস মুভমেন্ট বুঝতেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান যে রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ঘটনা- তা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশ থেকে, বাংলাদেশের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত তেমন আকর্ষক মেধার বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা গ্রন্থের অভাব আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পর্যায়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ অনুভব করি। কিন্তু অপ্রতুল গ্রন্থের মধ্যে কোনো কোনোটি ঊষর মরুভূমিতে তৃপ্তিদায়ক মরুদ্যানের মতো আশার সঞ্চার করে। মেজর জেনারেল মো. সরোয়ার হোসেনের `১৯৭১: প্রতিরোধ সংগ্রাম বিজয়’ তেমনই একটা তথ্যবহুল সংকলন। লেখক একজন নেতৃস্থানীয় সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ইতিহাস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সেই সুবাদে তার গ্রন্থে নিবিড়ভাবে গবেষণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক ছাড়াও তিনি যুদ্ধে বাংলাদেশ বাহিনীর গঠন, ভূমিকা, কার্যক্রম সবিস্তারে তুলে এনেছেন। চূড়ান্ত বিজয়ে বাংলাদেশ বাহিনীর অবদান এবং যুদ্ধ ও বিজয়ের শিক্ষাকে তিনি চমৎকারভাবে সুগ্রন্থিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতির জন্যই বইটি প্রমাণ হিসেবে রাখার মতো। গবেষণা গুরুত্বের দিক থেকে বইটি অন্য বইগুলোর চেয়ে এগিয়ে। রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা, প্রয়োগগত মূল্য, মর্যাদার দিক থেকেও এর তাৎপর্য অনেক। লেখক# বিজনেস রিপোর্টার, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। এসি      

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দীপকের পাঁচ কবিতা   

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দীপংকর দীপক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পাঁচটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাগুলো হচ্ছে ‘পিতৃবন্দনা’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘অমর তুমি’, ‘মুজিবীয় আঙুল’ ও ‘সোনার নাওয়ের মাঝি’। এ পাঁচটি কবিতা তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘হে বঙ্গ’ বইয়ে সংযোজন করা হয়েছে।    এবারের একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বইটি প্রকাশ করেছে মিজান পাবলিশার্স। বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন কবি অসীম সাহা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শতাব্দী জাহিদ।    বঙ্গবন্ধুর কীর্তিগাথা ছাড়াও এ বইয়ে স্বদেশপ্রেম, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, নারীমুক্তি, প্রকৃতিপ্রেমসহ গবেষণামূলক নানা বিষয় ফুটে উঠেছে। একইসঙ্গে কবিতার দৃশ্যপটে ধর্মনিরপেক্ষতা, জীবনমুখী সংগ্রাম, প্রথাবিরোধী মনোভাব, শ্রেণিচেতনা ও সমাজ বাস্তবতা জীবন্ত উপাদান হয়ে পরিস্ফূটিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দীপংকর দীপক বলেন, ‘বাংলাভাষার মাধুর্যতায় আসক্ত হয়ে কাব্যচর্চা করছি। আর মনের পিপাসা নিবারণে গল্প কিংবা উপন্যাস লিখছি। গতবারের কবিতার বই কালচক্রে সময়ের সঙ্গে মানব জীবনের সম্পর্ক খোঁজা হয়েছিল। এবারের বইয়ে শুধু দেশমাতৃকার বন্দনা করা হয়েছে। আশা করি, আমার বইটি পাঠক হৃদয়কে কিছুটা হলেও আন্দোলিত করবে।’ এ পর্যন্ত দীপকের ডজনখানেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘বুনো কন্যা’, ‘নাস্তিকের অপমৃত্যু’ ও ‘ঈশ্বরের সঙ্গে লড়াই’ পাঠকমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তা ছাড়া তার সিক্যুয়াল কাব্যগ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ যৌবন-প্রথম খণ্ড’ এবং ‘নিষিদ্ধ যৌবন-দ্বিতীয় খণ্ড’ও পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। কিছুদিন আগে ‘অন্ন কিংবা আত্মহত্যা’ শিরোনামে দীপকের একটি নাটক প্রচারিত হয়েছে। শিগগিরই তাঁর লেখা দুটি দেশাত্মবোধক গান প্রকাশিত হবে। তা ছাড়া সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর তিনি ‘বেগম রোকেয়া সাহিত্য সম্মাননা’ অর্জন করেন। এসি    

`কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন` গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন

একুশে বই মেলায় এসেছে চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুল্লাহ জেয়াদ-এর লেখা ‘কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন’ গ্রন্থটি। গত বৃহস্পতিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) এফডিসি’র জহির রায়হান কালারল্যাব ভিআইপি প্রজেকশন হলে গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক আবদুল্লাহ জেয়াদ-এর লেখা ‘কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন’ এর গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রবীণ চলচ্চিত্রকার আজিজুর রহমান,অভিনেত্রী কোহিনুর আখতার সুচন্দা, নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থার সভাপতি আবদুল লতিফ বাচ্চু, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান, ফিল্ম এডিটরস গিল্ডের সভাপতি আবু মুসা দেবু, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন এবং প্রযোজক-পরিবেশক খোরশেদ আলম খসরু। অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, সুচিত্রা সেন আমার আইডল। তাঁর অভিনীত ‘উত্তর ফাল্গুনী’ ছবিটি দেখে আমি চলচ্চিত্রে আসার অনুপ্রেরণা পাই। এ ছবিতে তিনি ব্যারিষ্টারি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যারাই তাঁর অভিনয় দেখেছেন তাঁরাই মুগ্ধ হয়েছেন। সুচিত্রা বাঙালি নারীর আদর্শের প্রতীক। সে সময় তাঁকে অনুসরণ করেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ‘কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন’ গ্রন্থটিতে লেখক আবদুল্লাহ জেয়াদ তাঁর জীবনের নানা বিষয় তুলে এনেছেন। যা সত্যিই ভালো লাগার মতো অবস্থা। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন আমাদের গর্ব কারণ তিনি এদেশেরই মেয়ে। তাঁর উপর এই গ্রন্থটি একটি দলিল হিসেবে বিবেচ্য হবে। শুধু যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের উপর নয়,যারা জীবিত আছেন তাদের উপরও লেখার আহবান জানান। ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যাসিত ‘কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন’ গ্রন্থটিতে নায়িকা সুচিত্রার তিনটি সময়ের জীবনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। এক. শৈশব ও কৈশোরকাল দুই. বিবাহোত্তর ও চলচ্চিত্রীয় জীবন এবং তিন.অন্তরীণ জীবন। এছাড়া পরিশিষ্ট-১ এবং পরিশিষ্ট-২ তে যথাক্রমে ভারত ও বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক এবং সেলিব্রিটিদের স্মৃতিকথা তুলে ধরেছেন লেখক। এছাড়া আরও আছে অনেক দুর্বল স্থিরচিত্র। ৩৩৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে জ্যোতি প্রকাশ। দাম ৪০০ টাকা। গ্রন্থটি পাওয়া যাবে বই মেলার ১৮৮ নং জ্যোতি প্রকাশ এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ৬৭ নং স্টলে। কেআই/  

‘হৃদিতা তুই এমন কেন’ তানভীর আলাদিনের ভাবনা জাগানিয়া নতুন উপন্যাস

স্বৈরাচার যুগের তান্ডব সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েনি তখনও। শান্ত-স্নিগ্ধ অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতি লালন করা একটি হৃদ্যতাপূর্ণ মফস্বল শহর ছিল সুখিপুর। শহরের গল্পটা এগুতে পারতো কিশোর অপু আর কিশোরী হৃদিতার প্রেম-খুনসুটিতে। কিন্ত পারেনি, পারতে দেয়নি সময়! হঠাৎ করেই সময়টা বদলে গোলা। শহরটাকে গ্রাস করল গ্রহণেরকাল। স্বৈরাচার যুগকে পুঁজি করেই শহরে গড়ে উঠল সশস্ত্র ‘হালুয়া বাহিনী’! ওদের নগ্ন থাবার অমানিশায় সুখিপুরের মানুষ ভুলেই গেল এই শহরের আকাশেও একদিন পূর্ণিমার চাঁদ উঠতো...।    হৃদিতার মেয়ে শুভ্রা। তার জন্ম আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে স্বৈরাচার যুগে। শুভ্রার জন্মটা সুখিপুর থেকে প্রায় দু’শ কিলোমিটার দূরে শুভলংয়ের ছোট্ট পাহাড়ী এক দ্বীপে। যেখানে তার মা হৃদিতা কখনো প্রেমিকা আবার কখনো যেনো যৌনদাসী। অপুকেই শুভ্রা আব্বু ডাকে। এতদিনতো ওকেই আব্বু জানতো। তাই পিতৃপরিচয়ের বিষয়ে শুভ্রার মনে কোনোদিন কৌতুহল না থাকাই স্বাভাবিক ছিল। শুভ্রা কি তবে কুমারি মাতা হৃাদিতার সন্তান? একদিন হৃদিতার দু’টো ডায়েরি এসে গেলো শুভ্রার হাতে। তখন কৌতুহলটা কঠিনভাবে দেখা দিয়েছে শুভ্রার মনে। সেই সঙ্গে ভয়ও আব্বুকে নিয়ে। শুভ্রা সত্যান্বেষণে নামলে যদি আব্বু মনে কষ্ট পায়! তবুও শুভ্রা ভাবে অপু কি তার মায়ের বন্ধু? নাকি প্রেমিক ছিল? এনিয়ে তার মনেও যে নানান প্রশ্নের উদয় হয়নি, তা কিন্তু নয়। তাহলে শুভ্রার জন্মদাতা কী অন্য কেউ? পিতৃ পরিচয়ের সংকট ডিজিটাল প্রজন্মের করর্পোরেট দুনিয়ায় চলতে অসঙ্গতি কিংবা অসংকোচও বেধে রাখেনি শুভ্রাকে! যতটুকু বাধ সেধেছে তার রোগটা, সে তার মা হৃদিতার মতোই থেলাসেমিয়া রোগবহণ করে চলছে। স্বামী-সংসারও করছে। চালাচ্ছে মনোচিকিৎসক হিসেবে পেশাগত দৈনিন্দিন কর্মকান্ড। পিতৃপরিচয়ের খোঁজ তাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে সাদা-কালো অধ্যায়ের সামনে, যেখানে অদৃশ্য পিতাকে তার কাছে কখনো সাইকো, আবার কখনো ভয়ঙ্কর খল মনে হতে লাগলো, তাই সেই না দেখা বাবা চরিত্রটাকে কেবল মনে-মনে করুণাই করতে চায় শুভ্রা। এরমধ্যে একদিন রহস্যজনক কারণে অপহৃত হয় শুভ্রার স্বামী জিসান। সাংবাদিক কবি ও সংগঠক তানভীর আলাদিনের প্রথম উপন্যাস ‘হৃদিতা তুই এমন কেন’র গল্পে দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধনের মধ্যে মানবিক বিষয়টা বার-বার প্রাধান্য পেতে দেখা গেছে। প্রায় তিনযুগ সময়ের স্রোত হৃদিতা’কে টেনে টুকরো-টুকরো করে বিভিন্ন ঘাটে নোঙর করিয়েছেন লেখক। লম্বা একটা সময়কে বুনতে গিয়ে গল্পটা কোথাও থমকে যায়নি একটু সময়ের জন্যেও। তিনি প্রেম-দ্বন্ধ-সংঘাত, সম্পদ-লোভ-সম্ভ্রম, আন্দোলন-ত্রাস-লাশ, সংস্কৃতি-সম্প্রীতি-অবিশ্বাসকে পায়ে-পায়ে হাটতে যেনো বাধ্য করিয়েছেন। উপন্যাসটি পড়া শুরু করলে একটানা পড়ে শেষ না করা পর্যন্ত স্বস্থি নেই। ছোট-ছোট ৩৭টি পর্বে সাজানো উপন্যাসের প্রতিটি বাঁকেই ভাবনার প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন লেখক। এখানেই লেখক হিসেবে তানভীর আলাদিন নান্দনিক মুন্সিয়ানার ছাপ রেখে গেছেন। পাঠককে ভাবনার দুয়ার-জানালার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন একাধিকবার। ভাটিয়াল প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘হৃদিতা তুই এমন কেন’ উপন্যাসটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাব্য কারিম। দাম ২৫০ টাকা। একুশে বইমেলায় তানভীর আলাদিনের ‘হৃদিতা তুই এমন কেন’ উপন্যাসটি পাওয়া যাবে একুশে বইমেলার ভাটিয়াল, স্টল # ৫২, লিটল ম্যাগ চত্বরে ও বাংলা একাডেমি, ঢাকা ও সাহিত্যদেশ স্টল # ৫৩৪, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এসি    

সোহাগের লেখনীতে নগরীর গন্ধমাখা প্রেম-বিরহের আখ্যান  

কোনো ঘোর নেই, নেই কোনো প্রহেলিকা৷ সোজাসাপ্টা ভাষায় নিজের কথাটাকেই কবিতার ছাঁচে ফেলে বলা৷ পেশাদার জীবন এবং প্রেম-বিরহ-আবেগ আর ভালোবাসার আশ্চর্য মিশেলে নিজের জীবনদৃষ্টির এক সরল সৃষ্টিশীল প্রকাশ৷ বইটির নাম ‘শাওন রাতে সুনয়না’৷ ৪২টি কবিতার সংকলন এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে কারুবাক প্রকাশনী (স্টল নম্বর:৫৩৭, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)৷      বইটির লেখক কামরুল হাসান সোহাগ পেশায় নগর পরিকল্পনাবিদ৷ পেশাদারিত্বের বাইরেও তাঁর ধ্যান লেখালেখিতে৷ শব্দের শক্তিতে তাঁর পূর্ণ আস্থা৷ এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শাওন রাতে সুনয়না’৷ গত বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভালোবাসা এই চিরহরিৎ’৷ কামরুল হাসান সোহাগ বলেন, ‘আমার নতুন এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা অর্থবহ। খুবই অল্প সময়ে বইটির কাজ শেষ করতে হয়েছে। আমি কবিতার মাধ্যমে মানুষের জীবনের ভেতরের রুপটাকে বের করে আনার চেষ্টা করেছি। যেমন- রিকশাওয়ালারা বেপরোয়া গাড়ি চালায়, তাদের যে বোধ নেই সে বিষয়টিকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। খেলার মাঠ নিয়েও আমি চিন্তা করি। পূর্বাচলের সাহেব আলীকে নিয়ে লিখেছি যার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে মানবিক ও সমসাময়িক বিষয়গুলো আমার কবিতায় স্থান পেয়েছে।’    কামরুল হাসান সোহাগের প্রতিভাও বহুমাত্রিক৷ তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার৷ এবারের বইমেলায় কারুবাক থেকেই আসছে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ছায়া মামনি’৷ ব্যস্ত ও যান্ত্রিক শহুরে জীবনে বাবা-মার স্নেহবঞ্চিত শিশুদের দুঃখ ও অসহায়ত্বের এক মানবিক উপাখ্যান `ছায়া মামনি`৷ ডে কেয়ার সেন্টারে প্রতিপালিত শিশুদের যন্ত্রণার এক কোমল ভাষ্য এই উপন্যাস৷ এছাড়াও, ভাষাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ `বিট্টুর নতুম বেব্লেড`৷ কামরুল মনে করেন তাঁর বইগুলো পাঠকেরা গ্রহণ করবেন৷ তাঁর বক্তব্য, বাস্তব জীবনের সত্য ছবিকে তিনি সাবলীল ভাষারূপ দিয়েছেন৷ তাঁর প্রতিটি বাক্যই খুব সহজে বোধগম্য৷ বর্তমান সময়ের মানুষ জটিলতা তেমন পছন্দ করে না৷ তাই তাঁর প্রত্যাশা, তিনি সত্যিকারের পাঠকদের সাড়া পাবেন৷ সৃষ্টিশীল এসব কাজেই শুধু নয়, পেশাদার জীবনেও কামরুল হাসান সোহাগ সমান সব্যসাচী৷ ২০০৪ সালে রাজউকে যোগ দেন৷ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করছেন৷ নগরায়ন ও সরকারব্যবস্থা এবং নগর পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের ওপর তাঁর দুটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে৷ নগর পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) বোর্ড মেম্বারও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি৷ বিআইপি জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের একজন সদস্য কামরুল হাসান সোহাগ৷ ১৯৭৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর খুলনার ডুমুরিয়ায় এই লেখকের জন্ম৷ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার বাবা ও শিক্ষিকা মায়ের সন্তান তিনি৷ তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়৷ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতকোত্তর শেষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থায় কাজের মধ্যে দিয়ে কর্মজীবন শুরু৷ `কেয়ার বাংলাদেশ`-এ টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে বগুড়া ও রংপুর অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন চার বছর৷ সবশেষ ২০০৪ সালে যোগ দেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকে৷ এসি     

একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস

আহ্ কো চাহিয়ে এক ওম্র আসর হোনে তক্কওন জীতা হ্যায় তেরে যুলফ কে সর হোনে তক (একটি দুঃখের যন্ত্রণা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকে,তোমার কেশের বেনী বাঁধা পর্যন্ত কে বেঁচে থাকবে?)   ----মীর্জা গালিব   বেলভেদ্রের বিনোদনী উপন্যাসের পটভূমি মির্জা গালিবের উপরে উদ্ধৃত গজল। স্থান, সুইজারল্যান্ডের দাভোজ শহরে অবস্থিত ৭ তারকা মানের স্টাইগেনবার্গার গ্র্যান্ড হোটেল বেলভেদ্রে। এখানেই নাইট অডিটর পদে কর্মরত অবস্থায় এক গভীর রাতে লেখকের সাথে পরিচয় হয় মিরিয়াম জোনাথন নামে হোটেলের নথিবদ্ধ একজন কম্পেনিয়ন বা হোস্টেজ-এর সাথে। যাকে বাংলায় বলে বারাঙ্গনা। লেখকের ভাষায় ব্যক্তিগত আবেগ, সম্পর্কের বিষন্নতা, থ্রিল ও মর্মস্পর্শী করুণ অভিজ্ঞতা বইটি লেখার প্রধান প্রেরণা। মিরিয়াম জোনাথন জন্মগতভাবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে গোড়া ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে উঠা, পাড়াশোনা, চাকরি এখানেই। ব্যাংকার বাবার সংসারে জন্ম নেয়ার ৬ বছরের মাথায় মা মারা গেলেন। বাবা আর বিয়ে করেননি। ইউরোপের মতো দেশে যা একটি বিরল ঘটনা। ডরোথী নামের একজন কাজের মেয়ের কাছে মানুষ হতে লাগলেন। অর্থনীতি বিষয়ে পড়শোনা শেষ করে জুরিখের একটি ব্যাংকে চাকরিও নিলেন। এরপরে তার জীবনে আসে বহরম জামসেদি নামের ১৮ বছরের এক ইরানি যুবক। সেলুলয়েডের ফিতার মত এরপরেই মিরিয়ামের জীবনে একের পর ঘটতে থাকে রোমাঞ্চ, দুর্ঘটনা, হতাশা আর না পাওয়ার করুণ কাহিনী। একজন নারীর জীবনে যে চাওয়া-পাওয়া থাকে তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছেন মিরিয়াম। একমাত্র কন্যা লেইলার ভবিষ্যৎ, তাকে লালনকারি ডরোথীকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে করতে একদিন তাকে সমর্পিত হতে হয় পৃথিবীর আদিম পেশাটির দিকে। প্রথমেই তার জীবনালেখ্য পড়ে হয়ত মনে হবে জগতের অন্য আর দশজন নারীর মতই আটপৌরে, গতানুগতিক। কিন্তু যতই কাহিনীর গভীরে যাওয়া যাবে ততই পাঠকের মন আর্দ্র হয়ে পড়বে মিরিয়ামের প্রতি। চোখ সজল হয়ে উঠবে মিরিয়ামের দুঃখ গাঁথায়। তার বর্ণনায়ই জানা যাবে পৃথিবীর কত নামকরা রথি-মহারথী, রাষ্ট্র আর সরকার প্রধানরা তার বিছানায় সঙ্গী হয়েছেন। মনে হবে স্বামী বহরামের সাথে অনিবার্য পরিণতি হয়েছে বিচ্ছেদে। কিন্তু না, তার পরিণতি এতটাই উত্তেজনায় ঠাসা যে পাঠককে প্রতিটি লাইনই পড়লে মনে হবে তিনি এক ভয়াবহ রহস্য গল্প পড়ছেন। কাহিনীর প্রতিটি চরিত্রই বৈচিত্র্যময়। মিরিয়ামকে লালনকারি ডরোথীও এক রহসম্যয় সার্বজনীন নারীর রূপ। সুইজারল্যান্ডের প্রত্যন্ত এক গ্রামের পিতৃপরিচয়হীন এই নারী জীবনে বিয়ে করেননি। অনাথ মিরিয়ামকে তিনি মায়ের স্নেহে মানুষ করেছেন। বহরামের সাথে বিয়ের পরে তার হাতেও লাঞ্চিত ও ধর্ষিত হয়েছেন। এসব সয়েও মিরিয়ামের কন্যা লেইলাকে তিনি মিরিয়ামের মতই আদর দিয়ে বড় করে তার জীবনের সকল সঞ্চয় লেইলার নামে উইল করে দিয়েছেন। তবে কাহিনীর আরো বড় চমক মিরিয়ামের কন্যা লেইলা। বাবা ইরানী, মা ইউরোপীয়। বংশগতির ধারা সূত্র আবিস্কারক জীববিজ্ঞানী ম্যান্ডেলের তত্ত¡ অনুযায়ী বাবা ও মা’র জিন সন্তান বংশ পরম্পরায় বহন করে। ফলে উভয়েরই কিছু না কিছু চরিত্র সন্তান লাভ করে। লেইলা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সে তার বাবার পুরো চরিত্রই পেয়েছে। পঞ্চদশী এই মেয়েটি কিভাবে প্রতিটি ঘটনার ঘটনপটিয়সি, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তগ্রহণে স্বার্থপরতায় পরিপক্ক সে বর্ণনা পাওয়া যায় তার চরিত্র পঠনে। ১৮ বছরের বহরাম জামসেদী তেহরান থেকে পালিয়ে ছদ্মবেশে আজারবাইজান, রোমানিয়া, হাংগেরি অস্ট্রিয়া হয়ে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে মিরিয়ামের বাসায় আসেন। বহরামসহ আরো ২ জনের জুরিখে পালিয়ে আসার বর্ণনা লেখক এতটাই রোমাঞ্চ আর নিখুঁতভাবে দিয়েছেন যে পাঠকের মনে হবে নিজেই এই দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছে। দুর্গম অভিযাত্রার গল্পকেও হার মানিয়েছে শিহরণ জাগানো এই বর্ণনা। মিরিয়ামও তখন ষোড়শী। সঙ্গত কারণে যা হওয়ার তাই ঘটলো। বহরামের সাথে প্রেম, শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভধারণ, অতঃপর বিয়ে ও লেইলা নামে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়া। ইরানের শিয়া সম্প্রদায়ে জন্ম নেয়া বহরামের কাছে নারী মানেই ভোগের বস্তু। যে দেশে আজো নারী মানে এই মূল্যায়ন। স্বভাবে চরম উচ্ছৃংখল মদ এবং নারীলোভী বহরামও তার ব্যতিক্রম নন। মিরিয়ামকে ভোগের বস্তুর বাইরে কখনই স্ত্রী হিসেবে ভাবেন নি। বিপর্যয়ের শুরু মিরিয়ামের বাবার মৃত্যুর পরে। আস্তে আস্তে বহরামের স্বরূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। গোঁড়া ক্যাথলিক খ্রিস্টান বলে মিরিয়াম বহরামকে তালাকও দেয় না। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে যায় যে, মিরিয়াম জুরিখ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে দাভোজ শহরে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এখানেই একদিন রাতে লেখকের সাথে দেখা হয় মিরিয়ামের। লেখকের ভাষায়, ‘ইউরোপে যে এত সুন্দরী মেয়ে থাকতে পারে তা আমার জানা ছিল না।’ লেখক প্রথম দেখায় মিরিয়ামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু মানসিক নৈকট্যে পোঁছায় তার সায় ছিলো না মোটেই। কারণ তিনি তখন সদ্য জার্মান ফেরত। ১৮ বছর একত্রে থাকা বান্ধবীর সাথে বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় কাতর। মিরিয়ামের প্রচণ্ড ইচ্ছা, বেলভেদ্রের এক সমকামি সহকর্মী গরান ও ২০ অনূর্ধ মেরীর সহায়তায় তারসাথে মানসিক নৈকট্যে পৌঁছেছেন আরো পরে। সে বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত কৌশলে। সম্পর্কের বর্ণনাটি এমনভাবেই করেছেন, যাতে পাঠকের মনে ক্রমাগত ঔৎসুক্য আর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এরকম যে মিরিয়ামের সাথে না জানি কি হচ্ছে তার সরস কাহিনী। লেখক এখানে বর্ণনার রাশ টেনেছেন অত্যন্ত নির্মোহভাবে। সতর্ক ছিলেন ঘটনার বিবরণ যেনো ইরোটিক পর্যায়ে না যায়। নিঃসন্দেহে লেখকের এটা বড় মুন্সিয়ানা। এই উপন্যাসটি আত্মজৈবনিক হলেও ঘটনার উপস্থাপন পাঠককে ঘোরের মধ্যে রেখে দিবে-এতে সন্দেহ নেই। প্রতিটি চরিত্রই আলাদা। প্রতিটি চরিত্রেরই একটি নিজস্ব জগত আছে এবং প্রতিটি চরিত্রেরই সমাপ্তি হয়েছে রোমাঞ্চকর, করুণ এবং রহস্যময়তা দিয়ে- যা কি না যে কোনো প্রেম, রহস্য, দুঃখ আর রোমাঞ্চে ভরা উপন্যাসেও বিরল। এছাড়া দেশটির নৈসর্গিক বর্ণনাও ভ্রমণপিপাসুদের তৃপ্তি দেবে। বিশেষ করে দাভোজ শহরের প্রতিটি রাস্তা, হোটেল, জঙ্গল-এর বর্ণনা লেখক এতটাই নিখুঁতভাবে দিয়েছেন যে, পাঠক নিজেই সেই স্থানের মধ্যে নিজেকে আবিস্কার করবেন।    সুইজারল্যান্ডকে অনেকেই ভূস্বর্গ বলে। অসম্ভব ও নয়নমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দশভাগের নয়ভাগই ছোট-বড়-মাঝারি পাহাড়-পর্বত। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত যাতায়াত ছিল গিরিপথ দিয়ে। পাহাড়ি আর পাথুরে খঞ্জর এলাকা। চাষাবাস প্রায় অসম্ভবই। মধ্যযুগে গরু-মেষ-শুকুর ইত্যাদি পশুপালনই ছিল প্রধান জীবিকা। এসব কারণে লোকসংখ্যা বরাবর নয় লাখের কম। এখনও এখানে বেশ কিছু ‘মাত্র একটি পরিবার বা এক বাড়ির গ্রাম’ রয়েছে। এই বর্ণনাগুলো এসেছে তথ্যসহ। দীর্ঘ বাক্য, কোনো কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ছাড়া সার্বিকভাবে সুসম্পাদিত বইটি যে কোন পাঠককেই আকৃষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে লেখকের তরুণ বন্ধু ও কবি শিমন রায়হানকে। অফসেট কাগজে ছাপা, প্রচ্ছদ এবং উন্নত বাঁধাই বইটির গুনগত মান বজায় রেখেছে। লেখক পরিচিত: বোহেমিয়ান লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুন প্রায় চার দশক ইউরোপ প্রবাসী। বর্তমানে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের নিকটবর্তী নয়ে-ইজেনবুর্গ শহরে থাকেন। ঘুরেছেন পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক দেশ।    ২০০২ সালের ডিসেম্বরে চলে যান সুইজারল্যান্ড। সেখানে তিনি অ্যাঙ্গেলবার্গের একটি হোটেলে এবং পরে দাভোজের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাত তারকা হোটেল গ্র্যান্ড স্টাইগেনবার্গার বেলভেদরে নাইট অডিটর পদে চাকরি নেন। দাভোজে বছরে একবার, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক কনফারেন্স’ নামে পাঁচদিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়ে থাকে। যেখানে সারা পৃথিবীর সেলিব্রিটি, গায়ক-নায়ক-শিল্পী, শিল্পপতি এবং রাজনীতিকরা যোগদান করেন। তাদের মধ্যে যারা রাজার রাজা, সবাই বেলেভেদ্রেতে রাত্রিযাপন করেন। সেই সুবাদে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে ক্ষণিকের জন্য হলেও লেখকের ঘনিষ্ট সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। কয়েকজনের সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে কথাবার্তাও হয়েছে। এদের মধ্যে বিল ক্লিন্টন, নেলসন ম্যান্ডেলা, কফি আনান, পিটার উস্তিনভ, পল ম্যাকার্টনি, ম্যাডোনা, রোমান পোলানস্কি, বিল গেটস, টনি ব্লেয়ার, প্রিন্স চার্লস প্রমুখ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। জার্মানিতে ফিরে আসেন ২০০৫ সালে। বিচিত্র ও চমকপ্রদ এসব অভিজ্ঞতা তার লেখার অনুপ্রেরণা। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষ অনুরাগী। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বড় ভাই বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যজন আবদুল্লাহ আল-মামুন।   বইয়ের নাম: বেলভেদ্রের বিনোদনীলেখকের নাম: আবদুল্লাহ আল হারুন শ্রেণি: আত্মজৈবনিক উপন্যাসমূল্য: ৪০০ টাকাপ্রকাশক: ঐতিহ্য প্রকাশনী , ঢাকাপ্রকাশকাল: বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এসি      

‘গ্রেট টিম লিডার’দের যে পাঁচ প্রলোভনে পা ফেললেই বিপদ...!

জীবনে সাফল্য পেতে চায় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য। তবে ‘সাফল্য ছেলের হাতের মোয়া নয়, যে চাইলেই পাওয়া যাবে। সাফল্যের জন্য চাই অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর অধ্যবসায়। যাঁরা জীবনে সাফল্য পেয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের সাফল্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক একটি গল্প। যে জীবনযুদ্ধের গল্পগুলো মোটেই সুখকর নয়। অনেক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছতে হয় সত্যিকারের সাফল্যের বন্দরে। জীবনসাফল্যের অভিযানে প্রতি পদক্ষেপেই ওঁৎ পেতে থাকে একের পর এক প্রলোভনের ফাঁদ। জীবনের কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে যে প্রলোভনসমূহের কোনো একটি ফাঁদে পা ফেললেই আর রক্ষে নেই। তখন তাকে নিশ্চিতভাবে নিমজ্জিত হতে হয় চোরাবালির চরে। গড়পড়তা মানুষের জন্য যেমন, তেমনি একজন টিম লিডারের ক্ষেত্রেও কথাগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন টিম লিডারকে সাধারণত যে প্রলোভনগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে, যে প্রলোভনগুলোর ফাঁদে পা দিয়ে নিজের অজান্তেই একজন টিম লিডার তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়, সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করে একটি চমৎকার বই লিখেছেন (২০০২) বিশিষ্ট আমেরিকান লেখক প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি (জন্ম : ১৯৬৫)। বইটির শিরোনাম দিয়েছেন- `The Five Temptations of a CEO`| প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্বনামধন্য ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম ‘দ্য টেবিল গ্রুপে’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তিনি বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিতে সহস্র সিনিয়র এক্সিকিউটিভের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি গত পনের বছর ধরে একজন পরামর্শদাতা ও বক্তা হিসেবে পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়েছেন, এবং দিয়েই চলছেন। মূলত সেই অভিজ্ঞতার সারাৎসার বাণীবদ্ধ করেই লিখেছেন ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশনস অব এ সিইও’ বইটি। বইটিতে ‘সিইও’ (CEO or Chief Executive Officer) বলতে তিনি বুঝিয়েছেন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী তথা দলপ্রধানকে; এবং ‘টেম্পটেশনস’ বলতে বুঝিয়েছেন এমন সব প্রলোভনকে, যেগুলো একজন শ্রেষ্ঠ দলপ্রধান হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে যে বা প্রলোভনগুলো প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে, যেসব প্রলোভনসমূহ একজন দলপ্রধানকে তার অজান্তেই আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে, যেগুলো থেকে প্রতিমুহূর্তে সতর্ক না-থাকলে বিপদ অবিসম্ভাবী, সেগুলোকেই রূপক গল্পের মোড়কে ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও’ বইটিতে তুলে ধরেছেন লেখক। লিঞ্চিওনি ‘সিইও’ তথা ‘টিম লিডার’ বা দলপ্রধানদের কথা মাথায় রেখে বইটি লিখলেও এই প্রলোভনগুলো যেকোনো মানুষের সাফল্যযাত্রার পেছনেই অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন (২০১৭) বাংলাদেশের স্বনামধন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘রকমারি ডট কম’-এর হিউম্যান রিসোর্স টিমের কো-অর্ডিনেটর জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর (জন্ম : ১৯৮৭)। স্মরণীয় যে, বইটির অনুবাদক জনাব মারুফ সাহেবও একজন টিম লিডার। তিনি যে লিঞ্চিওনি’র বক্তব্যগুলো স্বয়ং আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পাদন করেছেন, তা অনূদিত বইটির প্রাঞ্জল ঝরঝরে গদ্য আর প্রকাশভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়। বইটি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে : লেখক এই বইটির নাম দিয়েছেন ‘The Five Temptations of A CEO’। তিনি এই ‘সিইও’ শব্দটি দিয়ে আসলে একজন ‘লিডার’ কে বুঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। একজন লিডার যখন তার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়ে যান, তখন তিনি নিজেকে একটু আলাদা ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় এই আলাদা ভাবাই তাকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। যে লিডার তার ফলোয়ারদের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভাবতে পারেন না, সে খুব দ্রুতই ফলোয়ারদের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা হারান। গ্রেট লিডার হতে হলে পাঁচটা টেম্পটেশনের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হয়। ...লেখক একটি রূপক গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ঐ টেম্পটেশনগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ...কিশোর বয়স থেকেই এই টেম্পটেশনগুলো জেনে নিয়ে সেগুলো ওভারকাম করার ক্রমাগত প্রাকটিস করতে থাকলে গ্রেট লিডার হওয়ার পথ কেউ রুখতে পারবে না। (‘অনুবাদকের কথা’ অংশ : দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও) লেখক মোট চারটি প্রধান খণ্ডে ভাগ করে তাঁর বক্তব্যগুলোকে গ্রন্থবন্ধ করেছেন। প্রথম খণ্ডে স্থান দিয়েছেন এগারোটি অধ্যায়ের। প্রথম অধ্যায়ে পাঠকের সাথে সাক্ষাৎ মিলবে “এন্ড্রু ও’ব্রেইন”, সংক্ষেপে “এন্ড্রু” নামধারী এই গল্পের নায়কের। সে ‘ট্রিনিটি সিস্টেম’ নামক একটি টেকনোলজি কোম্পানির সিইও। ‘গত এক বছরের কাজের রিপোর্ট আর জবাবদিহি নিয়ে আগামীকাল তার প্রথম বোর্ড মিটিং’। এ-নিয়ে সে খুবই চিন্তিত। সাধারণত সে অফিস থেকে দেরি করে না বের হলেও সে আজ অফিস থেকে সবার শেষে বেরিয়েছে; অফিসের হলরুমে হাঁটার সময়ও আজ তার খুব অস্বস্তি বোধ করছিল; বিচলিত মনে সে ভাবছে, কাল সদস্যদের কাছ থেকে তার কতই না নেতিবাচক কথা শুনতে হবে, কেউ হয়তো তার কাঁধ চাপড়ে বাহবাও দেবে না; এক কথায় বলা চলে সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে তার তত্ত্বাবধানে কোম্পানি যে খারাপ ফলাফল করেছে তা নিয়ে সে খুবই উদ্বিগ্ন। তার তখন মনে পড়ে একটি প্রবাদ— ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’। এভাবেই এগিয়ে চলে গল্পের গতি। পাঠকরাও এন্ড্রু’র সাথে সাথে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে দেখা যাবে, যে পথ দিয়ে এন্ড্রু গাড়ি নিয়ে যাত্রা করেছে, সে পথ দিয়ে আর কোনো গাড়ি-ই যাচ্ছে না। যদিও ‘মেরামতের জন্য সেই রাস্তাটি বন্ধ থাকবে’ এমন নোটিশ এন্ড্রু গত দু’সপ্তাহে বহুবার দেখেছে, তা-সত্ত্বেও আগামীকালের বোর্ড-মিটিংয়ের দুশ্চিন্তায় ভুল করে সেই পথেই সে চলে এসেছে। এন্ড্রু যেন আজ এক উদ্ভ্রান্ত পথিক। সে আজ কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না! তার এই উদ্ভ্রান্তদশাকে লেখক উপস্থাপন করেছন এভাবে— একবার ভাবল, অফিসের কাছে ভালো একটা হোটেলে থাকবে। রাতে জামা কাপড় লন্ড্রি সার্ভিসে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেবে। হোটেলে বসেই মিটিংয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু নাহ্! পরক্ষণেই তার মনে হলো নিজের বাড়িতে গিয়ে অন্তত দু’ঘণ্টা শান্তিতে ঘুমানো দরকার। যদিও এন্ড্রু নিজের বউ বাচ্চাদের সামনে খুব ভাব নিয়ে থাকে, তবুও তার মনে হল- নৈতিক ও মানসিক সাপোর্টের জন্য বউ-বাচ্চাদের সঙ্গ তার একান্ত প্রয়োজন। (পৃ. ২৫) অতঃপর এন্ড্রু দরকারি কাগজপত্র ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে, কোট হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। উঠে গিয়ে একটি লোকাল ট্রেনে। সেখানে বিধ্বস্ত এন্ড্রু’র সাথে দেখা হয় ধূসর শার্ট পরিহিত এক বয়স্ক ভদ্রলোকের। যার নাম— “চার্লি”। চার্লি গল্পের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। চার্লি একরকম গায়ে পড়েই এন্ড্রুর সাথে গল্প করতে চায়। চার্লিকে প্রথমে বিশ্বাস করতে না পারলেও পরবর্তীতে চার্লির ইচ্ছাতেই এন্ড্রু তার সাথে কথোপকথন শুরু করে। চার্লি নিজেকে পরিচয় দেয় একজন রেইলরোড কোম্পানির প্রেসিডেন্টের ছেলে হিসেবে। চার্লির সাথে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে তৃতীয় অধ্যায়ে। চতুর্থ অধ্যায়ে এসে দু’জনের মধ্যে গল্পটা জমে ওঠে। চার্লি ও এন্ড্রুর মধ্যকার কথোপকথনের শুরুর অংশটি চমৎকার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন লেখক। বইটি না-পড়ে সে নাটকীয়তার নাট্যরস আস্বাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যা-ই হোক, শুরুর দিকে চার্লিকে এন্ড্রু বিশ্বাস করতেই পারছিলো না। তবুও একটা অবজ্ঞামিশ্রিত সংশয়াচ্ছন্নতার মধ্য দিয়েই চার্লিকে সে তার সমস্যাগুলো বলতে শুরু করে। লেখক এন্ড্রুর মানসিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে— ...অবশ্য এন্ড্রুর মনের মধ্যে সংশয় কাজ করছিল। সে ভাবল, ‘আমি একটা কোম্পানির সিইও। আর আমি আমার সমস্যার কথা এক পাগল বুড়োর কাছে বলতে যাচ্ছি। আমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? মনে তো হয় কিছুটা হলেও খারাপ হয়েছে। এ কারণেই তো তাঁকে এসব কথা বলতে যাচ্ছি।’ (পৃ. ৩৫) আলোচনার প্রারম্ভেই চার্লি বুঝে ফেলে এন্ড্রুর বিপর্যস্ত মানসিক পরিস্থিতির কথা : চার্লির জবাব, “ও! তাই নাকি! তুমি কি জান, তুমি যে টেম্পটেশনের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছো। ভাবছ, কী করে বুঝলাম? আর তা বুঝা একেবারেই সহজ কাজ। ঐ যে তুমি জানো যে, তোমার কোম্পানির দুর্দিন যাচ্ছে, কিন্তু তুমি নাকি তার জন্য দায়ী না। সিইও’দের সাধারণত পাঁচটা টেম্পটেশন থাকে। তুমি কিন্তু ইতোমধ্যে এক বা একাধিক টেম্পটেশনের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছ।” (পৃ. ৩৮) এরপর চার্লি এক এক করে সিইও’দের পাঁচটি টেম্পটেশন নিয়ে এন্ড্রুর সাথে আলোচনা করে। পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করে প্রথম টেম্পটেশন নিয়ে। চার্লি এন্ড্রুর কাছে জানতে চায়, এন্ড্রুর ক্যারিয়ারের সেরা দিন কোনটি, সে-সম্পর্কে। এন্ড্রু দু’সেকেন্ড ভেবেই জানিয়ে দেয়— সে যেদিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটাই ছিল ক্যারিয়ারের সেরা দিন। কিন্তু এখানেই আপত্তি চার্লির। সে এন্ড্রুর বক্তব্যকে ‘হাউ ফানি’ বলে উড়িয়ে দেয়। সে একের পর এক যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট কখনোই নির্বাচিত হওয়ার দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন বলবে না, বলবে— যেদিন সে দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে সেই দিনকে; একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান কখনো সরকারি অনুদান পাওয়ার দিনকে তার ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যেদিন সে অনুদানের টাকাগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে সে-দিনকে; একজন বাস্কেটবল কোচ কখনো যেদিন কোনো দলের সাথে বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যে-দিন দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারবে, সে-দিনকে; ঠিক একইভাবে, একজন সিইও’রও উচিত যে-দিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন না-ভেবে যে-দিন কোম্পানির জন্য ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে, সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাবা এবং সব সময় নিজের ক্যারিয়ারের চেয়ে কোম্পানির সাফল্যের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চার্লির ভাষায় : ...মূলত যাঁরা গ্রেট সিইও তাঁরা এসব ব্যাপার নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। তাঁরা শুধু তাঁদের কাজের মাধ্যমে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তাঁরা চান কোম্পানির আরো উন্নতি হোক, নিজের ইগো নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। (পৃ. ৪৪) এমনিভাবে কীভাবে একজন সিইও নিজের ক্যারিয়ার, পদমর্যাদা, ভাবমূর্তি ও ইগোর কবলে পড়ে প্রথম টেম্পটেশনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন, তা চার্লি ও এন্ড্রুর সুবিস্তৃত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নাট্যিক আবহে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বইটির ঘটনাপ্রবাহ পড়তে গিয়ে পাঠকদের জন্য সবচেয়ে পরিতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে— বর্ণনাগুলোকে কখনো একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর মনে হবে না লেখক মোটেই নিরস তত্ত্বকথা উপস্থাপন করেননি, অত্যন্ত সরসভাবে একেবারে গল্পের ভঙ্গিতে দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্ণনাটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাষারূপ দিয়েছেন চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির। হঠাৎ করেই ট্রেনের বগিতে আলো চলে যাওয়া, আলো চলে যাওয়ার পরের ভূতুরে পরিবেশ, আবার আলো জ্বলে ওঠার রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা প্রভৃতি বিষয়গুলো খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইয়ে। বইটির প্রথম খন্ডের ‘ছয়’সংখ্যক অধ্যায়ে চার্লি আলোকপাত করে দ্বিতীয় টেম্পটেশন সম্পর্কে। চার্লির মতে, সিইও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াটা কঠিন হলেও সিইও’র কাজগুলো পরিচালনা করা মোটেই জটিল নয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এন্ড্রু তা মেনে নিতে পারে না। এন্ড্রুর যুক্তি : কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন টেকনোলজি, বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক পরিবর্তন, ব্যবসার নিয়ম কানুনের অদল-বদল, সস্তা শ্রমবাজার, ট্যাক্স, ভ্যাট, ঘুষ ইত্যাদি কত ধরনের ব্যাপার স্যাপারের কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক জটিল হয়ে গিয়েছে। চার্লিও নাছোড়বান্দা! এন্ড্রুর এসব যুক্তি মানতে সে পুরোপুরি নারাজ। এভাবেই জমে ওঠে গল্প। এন্ড্রু তার জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অফিসের অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি, সে টেরিকে (টেরি ছিল এন্ড্রুর কোম্পানির ‘মার্কেটিং বিভাগে’র প্রধান, তাকে এন্ড্রু কোনো রকমের পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে) সঠিক উপায়ে চাকরিচ্যুত করেনি, যদি তাকে পূর্ব-সতর্কতা ব্যতীত চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয় তাহলে এন্ড্রুর কেমন লাগবে- এমনি নানা প্রশ্নে এন্ড্রুকে জর্জরিত করে চার্লি। যুক্তির পর যুক্তি উপস্থাপন করে চার্লি এন্ড্রুকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে আসলে নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের সঠিক জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি; আর এটিই হচ্ছে একজন সিইও’র দ্বিতীয় টেম্পটেশন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর ভাবনাগুলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন সিইও কী করে থাকে, অথচ তার কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় প্রভৃতি নানা বিষয় এন্ড্রু ও চার্লির কথোপকথনের মধ্যে ফুটে উঠে। তাদের আলোচনায় পাঠকের সামনে বেরিয়ে আসে মজার মজার সব তথ্য। নাট্যরসে ভরপুর সেসব তথ্যাবলি সত্যি-ই খুব উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়। পরবর্তী অধ্যায়ে তৃতীয় টেম্পটেশন ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা’সম্পর্কে আলোকপাত করে চার্লি। কেন একজন সিইও স্বল্প তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক সময়ে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, তার দুর্বলতাগুলো কী কী, এন্ড্রু-ই বা কী কী ভুল করেছিল, একজন সিইও হিসেবে এন্ড্রুর কী করা উচিত হয়নি বা কী করা উচিত সে-সব সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করে চার্লি। গল্পের শুরুতে চার্লির প্রতি এন্ড্রুর যে বিরক্তি ও সংশয় ছিল, এ-পর্যায়ে এসে তা আর অবশিষ্ট থাকে না। এখন সে নিজের আগ্রহ থেকেই চার্লির কাছে তার সমস্যা তুলে ধরতে শুরু করে, এবং সমাধানের পথ জানতে চায়।  আর চার্লিও দিয়ে চলে একের পর এক উপদেশ। একটি দৃষ্টান্ত : ...একজন সিইও’র ‘I was wrong’ এ তিনটি শব্দের বাক্যটি বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যাবার জন্য বললে হবে না বরং এমনভাবে বলতে হবে, যেন অন্য টিম মেম্বাররা বুঝতে পারে, সিইও সাহেব সত্যিই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ...একজন সিইও তাঁর সিদ্ধান্ত হতে ভুল প্রমাণিত হলে কখনোই অস্বস্তিতে পড়বেন না। তিনিই ‘গ্রেট সিইও’ যিনি ওই ধরনের অবস্থায়ও খুবই স্বাভাবিক থাকতে পারেন। তাহলে পরবর্তীতে কোম্পানির মারাত্মক দুর্দিনেও অল্প তথ্যের সাহায্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সৎ সাহস পাবেন। (পৃ. ৭০) অষ্টম অধ্যায়ে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে আরও তিনজন বৃদ্ধ লোকের সাথে- একজন লম্বু লোক, একজন টেকো লোক ও অপরজন ফিটফাট বাবু। লোকগুলোর নামের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, তাদের সাথে এন্ড্রু ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কতোটা হাস্যরসাত্মক ও উপভোগ্য হতে পারে। তাদের মধ্যে আলোচনা হয় চতুর্থ টেম্পটেশন নিয়ে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এন্ড্রু জানতে পারে তারা সকলেই এক একজন সিইও ছিলেন; এবং সকলেই কোনো না কোনো টেম্পটেশনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গল্পের এই অংশটিও বেশ চমৎকার। এন্ড্রু কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই তার সামনে ঘটনাগুলো ঘটে যায়। এন্ড্রু যেন একটি গোলকধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে যায়। তবুও সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নেয়। কারণ আলোচনায় বেরিয়ে আসছে এক একজন সিইও’র এক একটি দুর্বলতার কথা। যেমন­— ...তখনই লম্বুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ঠিক এই কাজটি না করার কারণেই আমার অধপতন হয়েছে। টিম মেম্বাররা একজন আরেক জনকে চ্যালেঞ্জ করবে, এটা আমি মোটেও মেনে নিতে পারতাম না। আমি তাদের মাঝে তীব্র বা কড়া ভাষার যুক্তিতর্ক হতে দিতে ভয় পেতাম। আমার ভয় করত তারা যদি একে অপরকে খুবই ঘোরতর আক্রমণ করে বসে তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।” (পৃ. ৮০) এই যে নিজে সমালোচিত হওয়ার ভয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে ‘প্রোডাক্টিভ আইডিওলজিক্যাল কনফ্লিক্ট’ হতে না-দেয়া, এটাই চতুর্থ টেম্পটেশন। কোম্পানির উন্নয়নের জন্য এবং অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মিটিংয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে গঠনমূলক তর্কবিতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তাহলে সকলের মতামত যেমন জানা যাবে, তেমনি কোম্পানির জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা যাবে। সময় গড়িয়ে যায়। ট্রেন চলতে থাকে তার আপন গতিতে। চতুর্থ টেম্পটেশন সম্পর্কে কথোপকথন শেষ হতে-না-হতেই ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যে। এন্ড্রুকে রেখে চার্লিসহ অন্যান্যরা ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এন্ড্রু অনেক চেষ্টা করেও চার্লিদের নেমে যাওয়া থেকে বিরত করতে পারে না। এ-পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খুবই চমকপ্রদ ও রহস্যাবৃত। চার্লিদের অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়ে এন্ড্রু হন্তদন্তভাবে চার্লিদের পিছু পিছু ট্রেন থেকে নেমে যায়। সে তখন পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এতোটা উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল যে ট্রেন থেকে নামার সময় নিজের মূল্যবান ব্রিফকেসটি নিতেও ভুলে যায়, যে ব্রিফকেসে ছিল তার পরবর্তীদিনের বোর্ড-মিটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসমূহ। যা-ই হোক, এভাবে ট্রেন থেকে নেমে অনেক অনুনয়-বিনয় করে চার্লির কাছ থেকে এন্ড্রু জেনে নেয় পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে। পঞ্চম টেম্পটেশনের মূলকথা হচ্ছে : সিইও’রাও যেহেতু মানুষ, তাই তাদেরও ভুল হতে পারে; সিইও’র কোনো কাজে যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে সিইও’র উচিত বিন্দুমাত্র লজ্জা অনুভব না-করে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল করার প্রত্যাশায় নিজের ভুলগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরা এবং সবার কাছ থেকে গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া। নিজের দুর্বলতাগুলোকে লুকিয়ে না-রেখে টিম মেম্বারদের ওপর বিশ্বাস রেখে তাদেরকে গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ করে দেয়া উচিত, যা অনেক সিইও’-ই নিজের মর্যাদার কথা ভেবে টিম মেম্বারদের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে এবং গঠনমূলক তর্ক করা সুযোগ দিতে ভয় পায়। এভাবেই উদ্ভ্রান্ত এন্ড্রু চরিত্রের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে শত-সহস্র যুক্তি-তথ্য উপস্থাপন ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন সিইও’দের পাঁচটি ‘টেম্পটেশন’ তথা ‘প্রলোভন’ সম্পর্কে, যে পাঁচ প্রলোভনের ফাঁদে নিজের অজান্তেই পা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন একজন সিইও। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে- এন্ড্রুর এ-ট্রেনভ্রমণ তথা মানসভ্রমণ এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া উপর্যুক্ত ঘটনাবৃত্ত ঘটে যায় মাত্র ২০ মিনিটে। এমনকি চার্লিদের সাথে তাড়াহুড়ো করে ট্রেন থেকে নামার সময় এন্ড্রু তার যে ব্রিফকেস ফেলে এসেছিল, পরে দেখা গেল সেটাও আগের যায়গাতেই আছে। তবে কী তার সাথে কিছুই ঘটেনি! সত্যি-ই লেখক এক অদ্ভুত চমৎকারিত্বপূর্ণ রহস্যজাল তৈরি করে সাজিয়েছে ঘটনাবৃত্ত, যে রহস্যজাল উন্মোচনের জন্য গ্রন্থপাঠের কোনো বিকল্প নেই। গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে শেষ হতে বইয়ের আরও দুটি অধ্যায় বাকি থেকে যায়। দশম অধ্যায়ে লেখক পরবর্তী দিনের বোর্ড-মিটিংয়ের ঘটনাবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। কীভাবে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির বাৎসরিক বোর্ড-মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হয়, কর্মী নিয়োগে সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, কোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, অন্য কোম্পানির সাথে কোনো চুক্তি কীভাবে সম্পন্ন করা হয়, কীভাবে একজন সিইও’র কাছ থেকে তার কাজের জবাবদিহিতা গ্রহণ করা হয়, কীভাবে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ড ও কর্মপরিকল্পনাকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, কীভাবে কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় প্রভৃতি মিটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তের অতিসূক্ষ্ম বর্ণনা তুলে ধরেছেন লেখক। এমনকি চরিত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মানসিক পরিস্থিতি এবং চিন্তাভাবনাগুলোও বাণীবদ্ধ করতে ভুল করেননি। শুধু সিইও’দের জন্যেই নয়, যেকোনো পাঠকের জন্যেই এসব ঘটনাক্রম নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি অনুষঙ্গ। একাদশ অধ্যায়ে তিন বছর পরের আর একটি বোর্ড-মিটিংয়ের বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে দেখানো হয় গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সাফল্যের যাত্রায় অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।ইটির দ্বিতীয় খন্ডে লেখক এন্ড্রুর মতো বহু লিডার কীভাবে নিজেদের সামান্য ভুলের কারণে, কখনও বা নিজের অজান্তে এক বা একাধিক প্রলোভনে পা দিয়ে ব্যর্থতার আস্তাকুঁড়ে নিমজ্জিত হন, তার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। পাশাপাশি কীভাবে সে-সব কাটিয়ে ওঠা যায় সে-সম্পর্কে পরামর্শ দেন। তৃতীয় খন্ডে উপস্থাপন করেন একটি রোল মডেল, যেখানে ব্যাখ্যা করে দেখান ‘কেন এক্সিকিউটিভরা বিফল হয়’তার ইতিবৃত্ত। এ-পর্যায়ে প্রতিটি টেম্পটেশনের মূল বক্তব্যগুলো পুনরায় তুলে ধরেন লেখক, এবং এক একটি টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একজন সিইও’র কী করা উচিত, সে-সম্পর্কে একটি একটি করে ‘সিইও’দের জন্য সহজ-সরল দিকনির্দেশনা’ উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি একটি চার্ট তৈরি করে ‘পাঁচটি টেম্পটেশন দূরীকরণের উপায়’ও লিপিবদ্ধ করেছেন। একজন সিইও কোনো টেম্পটেশনে আক্রান্ত হচ্ছেন কিনা, কীভাবে তা নিজে নিজে মূল্যায়ন করবেন, সিইও’দের আত্মমূল্যায়নের এমনি একটি মডেল উপস্থাপন করে লেখক সাজিয়েছেন বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টি। নিজেকে প্রশ্নকরণের মাধ্যমে কীভাবে একজন সিইও তার মধ্যে কোনো টেম্পটেশন ভর করেছে কিনা তা মূল্যায়ন করতে পারবে, এমন উপযোগী কিছু কার্যকরী টুলসের উল্লেখ করা হয়েছে বইয়ের এই শেষ অংশে। সর্বোপরি, প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি যদিও দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও বইটি কেবল সিইও’দের কথা বিবেচনা করে লিখেছেন, তা-সত্ত্বেও বইয়ের বক্তব্যসমূহ যেকোনো মানুষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। জীবনসাফল্যের পথযাত্রায় যেকোনো মানুষেরই জীবনপথে ওঁৎ পেতে থাকা নানা প্রলোভনের ফাঁদ, যে-সব থেকে বাঁচাতে এই বইয়ের বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে সকলের উপকারে আসবে। প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র ইংরেজি ভাষায় রচিত এই মহামূল্যবান বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য খুবই উপকার সাধন করেছেন জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর। তাঁর অনুবাদের ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল, ঝরঝরে ও সহজবোধ্য। ছোট ছোট বাক্যে বক্তব্যগুলোকে তিনি এতোটা সরলভাবে বাণীবদ্ধ করেছেন যে কোথাও গদ্যের স্বাভাবিক গতিময়তা বিঘ্নিত হয়নি। যেহেতু তিনি নিজেও একজন টিম লিডার, একজন টিম লিডার হিসেবে তিনি যে মূল লেখকের বক্তব্যগুলো গভীরভাবে আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেছেন, তা গ্রন্থটি পাঠ করলে সহজেই অনুধাবন করা যায়। এতো সুন্দর একটি অনুবাদকর্মের জন্য বাংলাভাষী পাঠকদের পক্ষ থেকে অনুবাদককে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ‘অন্যরকম প্রকাশনী’ কর্তৃপক্ষকে, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। লেখক : এমএসএস শিক্ষার্থী, প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়           e-mail : arif.du.bd11@gmail.com

মীর হুমায়ূন কবীরের গবেষণাগ্রন্থ “আনিস চৌধুরীর নাটক:জীবন ও শিল্প”

আনিস চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯০) বাংলাদেশের বাংলাসাহিত্যের একজন স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। আটাশিটি ছোটগল্প ও দশটি উপন্যাসের সফল রচয়িতা হলেও নাট্যকার হিসেবেই তিনি অর্জন করেছেন সমধিক খ্যাতি। এমনকি বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও লাভ করেছেন তিনি। তবে দুঃজনক হলেও সত্য যে, এই দীর্ঘ সময় পর্বে আনিস চৌধুরীর সমগ্র নাট্যবিষয় নিয়ে মূল্যায়নধর্মী কোনো গবেষণাগ্রন্থ তো নয়-ই, কোনো গবেষণা-প্রবন্ধও রচিত হয়নি। যাকে বাংলা নাটক গবেষণার দৈন্যতা হিসেবেও চিহ্নিত করা চলে। যা-ই হোক, নাট্যকারের মৃত্যুর প্রায় পঁচিশ বছর পর এই দৈন্যদশার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন বিশিষ্ট গবেষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক, মীর হুমায়ূন কবীর (জন্ম : ৩০ অক্টোবর ১৯৮৬)। সম্প্রতি অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮-কে সামনে রেখে  প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প”। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। মূল্য ৩৬০ টাকা। “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প” মূলত মীর হুমায়ূন কবীর-এর এমফিল অভিসন্দর্ভের (২০১৫) পরিমার্জিত গ্রন্থরূপ। গবেষক প্রধানত তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করে এই গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন ‘আনিস চৌধুরীর জীবন ও মানসগঠন’। এ অংশে তিনি নাট্যকার আনিস চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠার সূত্রধরে পারিবারিক ঐতিহ্য, অধ্যয়ন-সূত্র, কর্ম-পরসর, সংসার-পর্ব, সাহিত্য-সাধনা ও রাজনৈতিক সচেতনা চিহ্নিতকরণ সহ সামগ্রিক জীবন-পরিসর তুলে ধরেছেন। সাবলীল ভাষায় গ্রন্থবদ্ধ করেছেন নাট্যকারের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য-নির্ভর উপস্থাপনা। জীবন-পরিক্রমা ও মানসবিকাশের সূত্রে শিশু ‘আনিসুজ্জামান কামরুদ্দীন’ কীভাবে হয়ে উঠলেন নাট্যকার ‘আনিস চৌধুরী’, তা বিশদ ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ সহযোগে গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করেছেন এই গ্রন্থের লেখক।     গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায় বিন্যস্ত করা হয়েছে ‘বাংলা নাট্যধারায় আনিস চৌধুরীর অবস্থান’ শিরোনামে। এ অধ্যায়ে গবেষক প্রাচীন সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের নাট্যব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে বাংলা নাটকের পথযাত্রার ইতিবৃত্ত, আনিস চৌধুরীর পূর্ববর্তী ও তাঁর সমসাময়িক বিশিষ্ট নাট্যকারদের নাটক ও নাট্যপ্রবণতা, নাটকে জীবন-উপস্থাপনের কলাকৌশল ও রীতি-পদ্ধতির অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেছেন; এবং দেশ-কাল-প্রতিবেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা নাট্যচেতনার রূপান্তরের একটি পরিপ্রেক্ষিত-পরিক্রমা উপস্থাপন করে চিহ্নিত করেছেন বাংলা নাট্যসাহিত্যের ধারায় আনিস চৌধুরীর স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা। বাংলা নাট্যধারার বিশিষ্ট নাট্যকারদের নাটক ও নাট্যপ্রবণতার সারবক্তব্য উপস্থাপন করে আনিস চৌধুরীর নাট্যপ্রবণতা সম্পর্কে যে মন্তব্য গবেষক উপস্থাপন করেছেন, তা এখানে উল্লেখকরণের দাবি রাখে : “বাংলা নাটকে আনিস চৌধুরীর স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, সমকালীন অন্য নাট্যকারদের মতো ইতিহাস, পুরাণ কিংবা হৃত-ঐতিহ্যের ধূসর জগতে বিচরণ করেননি তিনি; বরং তাঁর সমস্ত নাট্যকর্ম জুড়েই বাংলার নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত জনশ্রেণির জীবন-যন্ত্রণার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাঁর শিল্পদৃষ্টি প্রখর প্রতিবাদী না-হলেও এ শ্রেণির প্রতি তাঁর সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে যথেষ্ট।”   ‘আনিস চৌধুরীর নাটকে উপস্থাপিত জীবনের স্বরূপবৈশিষ্ট্য’ শিরোনামে গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়টি সাজিয়েছেন লেখক। অধ্যায়টি শুরু করা হয়েছে এভাবে “আনিস চৌধুরীর নাট্যভাবনা মূলত আবর্তিত হয়েছে সমকালকে কেন্দ্র করে। বিভাগোত্তর পর্যায়ে পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে নবীন সমাজের গোড়াপত্তন হয়, যে ভাঙাগড়াময় জীবনবৃত্তে তিনি বিচরণ করেছেন, সেই জীবন ও সমাজের ঘনিষ্ঠ রূপকার তিনি। নাটকের কাহিনি নির্বাচনে তিনি ইতিহাসের দ্বারস্থ হননি, দূর কিংবা নিকট অতীতকে গ্রহণ করেননি, বরং সমকালীন। ... বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভে মধ্যবিত্ত সমাজে যে নাগরিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে  তারই বাস্তব চিত্র রূপায়িত হয়েছে তাঁর নাটকে। মধ্যবিত্ত জনজীবনের বিচিত্র আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-দাহ, হতাশা-বেদনা, নৈরাশ্য-যন্ত্রণার রূপচিত্রাঙ্কনে তাঁর পারদর্শিতা বিস্ময়কর। গ্রামীণ ভূস্বামী, শাহরিক ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমজীবী নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা রূপায়ণে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর নাটকের মজিদ মাস্টার, ইনাম, কবির, আলিম, কলিম, কাইউম, রাশিদা, কিংবা মিনু সকলেরই বিচরণ মধ্যবিত্ত পরিবৃত্তে। দারিদ্র্যের কঠিন নিপীড়ন এবং উত্তরণের আকাক্সক্ষায় তারা সংগ্রামলিপ্ত। এ সংগ্রামে কেউ বিজয়ী হয়েছে, কেউ জীবনযুদ্ধে পরাজয় বরণ করে তলিয়ে গেছে অতল গহ্বরে।” এমনিভাবে আনিস চৌধুরীর নাটকের চারিত্র্য, নাট্যনির্মাণের কলাকৌশল ও রীতিপ্রকৃতি, বিভিন্ন নাটকে উপস্থাপিত প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রসমূহের সৃজনকৌশল, জীবন-বৃত্তান্ত ও জীবনপ্রবণতা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে নাট্যকারের সামগ্রিক প্রবণতার বিশদব্যাখ্যা একের পর এক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তির মালা গেঁথে উপস্থাপন করেছেন গবেষক মীর হুমায়ূন কবীর। অতঃপর তিনি একটি একটি করে নাটক ধরে ধরে প্রতিটি নাটকের চুলচেরা পর্যালোচনা করেছেন। পর্যালোচনার এই প্রক্রিয়ায় স্থান-দেয়া বারোটি নাটককে সাজানো হয়েছে দুটো পৃথক পরিচ্ছেদে। ‘বিভাগোত্তরকালের নাটক’ শিরোনামের প্রথম পরিচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে দেশ-বিভাগের পরে এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে রচিত পাঁচটি নাটক : ‘মানচিত্র’ (১৯৬৩), ‘এ্যালবাম’ (১৯৬৫), ‘প্রত্যাশা’ (১৯৬৭), ‘ছায়াহরিণ’ (১৯৬৮) এবং ‘যখন সুরভী’ (১৯৬৯)। অন্যদিকে ‘স্বাধীনতা-উত্তরকালের নাটক’ শিরোনামের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বিশ্লেষিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রচিত ‘যেখানে সূর্য’ (১৯৭৪), ‘চেহারা’ (১৯৭৯), ‘তবু অনন্য’, ‘নীলকমল’ (১৯৮৬), ‘তারা ঝরার দিন’, ‘বলাকা অনেক দূরে’ এবং ‘রজনী’ শীর্ষক সাতটি নাটক। প্রতিটি নাটক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নাটক রচনায় নাট্যকারের প্রবণতা ও স্বাতন্ত্র্য, উপস্থাপিত নাট্যকাহিনির প্লট-বিন্যাস ও ঘটনা-পরিপ্রেক্ষিত, চরিত্র-পরিচয় এবং চরিত্র-সৃজনের যৌক্তিকতা সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, চরিত্রানুগ সংলাপ তৈরির কারিশমা, ভাষা-শৈলী ও অলংকার উপস্থাপনের অভিনবত্ব অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায়, অথচ সুগভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনা করেছেন গবেষক। এ-গ্রন্থ সম্পর্কে গ্রন্থের ‘প্রস্তাবনা’ অংশে গবেষণাকর্মটির তত্ত্বাবধায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর গিয়াস শামীম যথার্থই বলেছেন “... এ-গ্রন্থে আনিস চৌধুরীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। বিশেষত পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, আকাঙ্ক্ষিত কর্মপরিসর এবং অনুকূল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ তাঁর জীবন ও মানস গঠনে কতটুকু কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে তা তথ্যপ্ রমাণযোগে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। সর্বমোট বারোটি নাটকের পর্যালোচনাসূত্রে তিনি দেখিয়েছেন, আনিস চৌধুরী মূলত মধ্যবিত্ত জীবনের নিপুণ রূপকার এবং সমকাল-পরিসরে তিনি ছিলেন দলছুট ও স্বতন্ত্র। প্রকৃতপক্ষে আনিস চৌধুরীর নাট্যবিষয়ে প্রণীত এ-গ্রন্থ বাংলাদেশের গবেষণা-সাহিত্যে একেবারেই অভিনব। ইতঃপূর্বে তাঁর সমগ্র নাট্যবিষয়ে মূল্যায়নধর্মী একটি প্রবন্ধও রচিত হয়নি। সেই বিবেচনায় এই গবেষণাকর্ম নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবহ। গবেষণা-অভিসন্দর্ভ প্রণয়নে লেখক তাঁর সর্বোচ্চ অভিনিবেশ প্রয়োগ করেছেন; প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তযোগে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। বক্তব্যবিন্যাসে ও বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন পূর্বাপর তথ্যনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী। আমার বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যবিষয়ক ‘গবেষণায় আনিস চৌধুরীর নাকট : জীবন ও শিল্প’ একটি প্রশংসনীয় কাজ।”   অধ্যাপক ডক্টর গিয়াস শামীম-এর সাথে সহমত প্রকাশ করে বলা যায়, গবেষক মীর হুমায়ূন কবীর-এর “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প” প্রকৃতবিচারেই বাংলা সাহিত্যবিষয়ক গবেষণায় একটি প্রশংসনীয় কাজ। নাট্যকার আনিস চৌধুরীর জীবন-পরিসর, নাট্যদৃষ্টি ও নাট্যকর্ম বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গবেষকের স্বতন্ত্র অনুসন্ধিৎসু শ্যেনচক্ষু সর্বত্রই সজাগ থেকেছে। লেখক: সহযোগী সম্পাদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গবেষণা পত্রিকা (বাংলা ও ইংরেজি)          e-mail: arif.du.bd11@gmail.com

যে প্রবন্ধগুলো রয়েছে ‘কবি শহীদ কাদরী ও অন্যান্য প্রবন্ধ‘ প্রন্থে

তান্ত্রিকগণ। আটটি প্রবন্ধের একটি বৃক্ষ। তবে এটি কোনো একজাতীয় বৃক্ষ নয়। এর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের ডালপালা। রয়েছে বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের গুণিনদের উপস্থিতি। রয়েছে তাঁদের কাজ এবং অবস্থানের কথা। প্রতিটি রচনায় আমি সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এই সময় হয়তো একদিন নতুন সময়ের হাতে তার উত্তরাধীকারের স্বীকৃতি দেবে। বাংলা গদ্য সাহিত্যে এমন কাজ প্রচুর রয়েছে। তাই প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধে আমি প্রেক্ষাপট এবং রচনার ভাষাভঙ্গী ও রীতি প্রয়োগে স্বকীয় অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। বাকিটুকু পাঠক আবিস্কার করে নিতে পারবেন। ‘যাদুরবংশীবাদক মার্কেজ‘। ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এর সাহিত্য কর্মের বিষয়ে রচিত এই প্রবন্ধ। ম্যাজিক রিয়েলিজমের এই যাদুকরকে আমি নানান দিক থেকে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করেছি। তাঁর লেখক জীবনের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব রচনা তিনি রেখে গেছেন, প্রায় প্রত্যেকটি লেখা ও সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। উঠে এসেছে মার্কেজের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক চিন্তা ও দর্শন। আমি মনে করি এই প্রবন্ধে পাঠক একসাথে পেয়ে যাবেন তাঁকে। যে কোন পাঠক মার্কেজকে পাঠের পূর্বে এই প্রবন্ধ পাঠ করলে তাঁর রচনা বুঝতে অনেক সহজ হবে বলেও মনে করি। কেননা যে কোন সাহিত্যিকের বই পাঠের পূর্বে তাঁকে চেনা এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশের সাথে পরিচিত হওয়া জরুরি বলে মনে করি। ‘তখন টেড হিউজ অন্য নারী শয্যায় ছিলেন‘। ব্রিটিশ কবি টেড হিউজ এবং আমেরিকান-ব্রিটিশ কবিসিলভিয়া প্লাথ সম্ভবত ইংরেজি সাহিত্যের সবেচেয় বেশি আলোচিত নিজেদের ব্যক্তিগত এবং সাহিত্যের কারণে। আত্মবিধ্বংসী কবি সিলভিয়াপ্লাথের মৃত্যুর এতো বছর পরও রহস্যের খোলস উন্মোচনে এখনো চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওরসেস্টার কলেজের শিক্ষক, গবেষক স্যার জোনাথন বেট, ‘টেড হিউজ: দি আনঅথরাইজড লাইফ‘ নামে এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটি ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয় (আমার রচনাটি এই গ্রন্থ প্রকাশের কয়েকদিন পূর্বে রচিত)। সেখানে তিনি সিলিভিয়া প্লাথ আত্মহত্যার সময় স্বামী টেড হিউজ কোথায় ছিলেন এবং সেই মুহুর্তের দৃশ্য উপস্থাপন এবং তা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। গ্রন্থটি প্রকাশের আগেই ব্রিটেন, আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বে আলোচনার ঝড় ওঠে। তারই প্রেক্ষাপট আমার আগ্রহের স্থান। ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবশালী এই দুই কবি সব সময় আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলো। সেজন্যেই এ রচনায় আমি প্রসঙ্গের সাথে তুলে এনেছি আরো বিস্তারিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘স্ট্রে বার্ড‘স‘ এর চায়না অনুবাদ নিয়ে তুমুল বিতাণ্ডা শুরু হয়েছিলো একবার। গ্রন্থটির অনুবাদ করেছিলেন চীনের তরুণ লেখক ফ্যাং টাং। তাঁর রচনার প্রেক্ষাপটে আমার প্রবন্ধ ‘ তীব্র সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথের স্ট্রে বার্ড‘স এর চায়না অনুবাদ‘। এই অনুবাদ গ্রন্থ নিয়ে ব্রিটেন-আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারত-চীনসহ পুরো বিশ্বে সমালোচনা চলে। তবে এ নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা তো দূরে থাক বেশ কয়েকজন তুখোড় সাহিত্যকর্মীর সাথে আলোচনা করে বুঝি তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। ব্রিটেনের দি গার্ড়িয়ান, ডেইলী মেইল, ডেইলি টাইম, বিবিসি থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো এ নিয়ে মেতে ওঠে। বাংলাদেশে একমাত্র দৈনিক সমকাল এর ‘কালোর খেয়া‘ তে আমার এ সংক্রান্ত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। সেই আগ্রহ থেকেই প্রবন্ধটি এই গ্রন্থভুক্ত করলাম। ‘নীলপদ্মের উদ্যান জিংকি বয়েস‘। নোবেল বিজয়ী বেলারুশের সাংবাদিক সেটলানা আলেক্সিয়ভিস এর রিপোর্টিংধর্মী উপন্যাস ‘জিংকি বয়েস‘ বিষয়ে আমার এই প্রবন্ধের অবতারণা। ২০১৫ সালে তাঁর নোবেল বিজয়ের পর পরই এটি রচনা করি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র এই উপন্যাসের পটভূমি। তাতে যুদ্ধবিরোধী এই সাংবাদিক মানবিকতা ভুলণ্ঠিত হওয়ার দৃশ্য তুলে এনেছেন অনুপুঙ্খ। সাংবাদিকের চোক যখন ঔপন্যাসিকের চোখ হয়ে ওঠে তখন দৃশ্য কেমন হয়, সেই বিষয়টি উঠিয়ে আনার জন্যই আমার এই রচনা। আমি কবি আবুল হাসান-এর রচনাকে সব সময় বুকে আগলে রেখেছি। এখানে সেখানে চিরিকুটের মত অসংখ্য কথা তাঁকে নিয়ে লিখেছি। এই গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধ ‘অনন্তযাত্রার কবি আবুল হাসান‘ সম্ভবত পূর্ণাঙ্গ রচনা। তাঁকে নিয়ে অসংখ্য রচনা রয়েছে। তবে কোন রচনা আমার দেখার দৃষ্টির সাথে এক নয়। আমি আবুল হাসানকে পাশ্চাত্যের আলো ফেলে নতুনভাবে আবিস্কার করেছি। এতে করে আমি আবারো বুঝতে পেরেছি সব ভাষার কবিতার সুর কিন্তু এক। এর চিন্তা, দর্শনও এক। কেবল কবির ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন। এটি আবুল হোসেনকে দিয়ে আমি আবিস্কার করেছি। শহীদ কাদরী দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কবি। রচনার বহর খুব বেশি নয়, কিন্তু জনপ্রিয়। তাঁকে নিয়ে রচিত আমার প্রবন্ধ ‘পাখি জীবনের কবি শহীদ কাদরী‘। এতে আমি মূলত বলতে চেয়েছি নতুন কোন কবিতা রচনা না করার ভেতর দিয়ে কবি কিভাবে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আমি বলতে চেয়েছি একজন কবি সব সময় কবিতা রচনা করেন। এমন কি কবি মৃত্যুর পরেও কবিতা রচনা করেন। অনেকেই বলে থাকেন শহীদ কাদরী প্রবাস জীবনে তেমন কোর কবিতা রচনা করেন নি। এই কথাটিকে আমি ভুল প্রমাণ করেছি। বলেছি তিনি কখনো কাব্য রচনা থেকে বিরত থাকেন নি। এটি গভীর নীরিক্ষণের বিষয়। কবি শামীম আজাদ এর কাব্যগ্রন্থ ‘জিয়ল জখম‘ নিয়ে আমার রচনা ‘দীর্ঘ সহবাসের জিয়ল জখম‘। কবির অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ থেকে আমি বিশেষ কারণে এটি নির্বাচন করেছি। আমার মনে হয়েছে এখানে কবি শামীম আজাদ নিজেকে মেলে ধরেছেন। এখানে তিনি চিন্তা, ভাষা, দর্শন, পারিপার্শ্বিকতা, প্রকৃতি নিয়ে নতুন কাব্যভাষা তৈরি করেছেন। কবি বিলেতে অবস্থান করেন বলে তাঁর কাব্যভঙ্গি যে নতুন বাঁক নিতে দেখেছি তাকে তুলে ধরার জন্যই আমার এই রচনা। বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় হুমায়ূন আজাদ বিষয়ে আমার রচনা ‘তান্ত্রিক হুমায়ুন আজাদ‘। এতে হুমায়ুন আজাদ এর সাথে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতর্পণের মাধ্যমে তুলে এনেছে তাঁর অভিব্যক্তিক চেহারা। যেখানে একজন হুমায়ুন আজাদকে আমি দেখেছি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রভাব বিস্তারি ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সম্ভবত হুমায়ুন আজাদই একমাত্র সাহিত্যিক যাঁর মধ্যে কোনো রকম রাগঢাক ছিলো না। তিনি স্পষ্টভাষী এবং চিন্তুক। আমার এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর রাজকীয় চেহারা উপস্থাপন করতে চেয়েছি।   লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক টিকে

আল মাহমুদের কবিতায় নারী ও প্রেম

ছয় দশকের অধিক সময় ধরে সাহিত্য সৃষ্টির পথে হাঁটছেন বিশিষ্ট কবি আল মাহমুদ। গদ্য-কবিতা মিলে তার রচনাসম্ভারের পরিধি অনেক বিস্তৃৃত। দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের কারণে তিনি গ্রহণযোগ্যতার ভিন্ন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন। নতুন দার্শনিকতায় নিজের অবস্থান স্থির করেছেন। ফলে পূর্বের অনুরক্তদের সঙ্গে তার দূরত্ব রচিত হয়েছে। নন্দিত-নিন্দিতকালের সাহিত্যে তার দর্শনগত পরিবর্তন সহজবোধ্য হয়ে উঠেছে। আল মাহমুদ অকপটে স্বীকার করেন, তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো প্রেম ও নারী। তবে নারী ও সৌন্দর্যকে তিনি আলাদা করে দেখতে চান। এক নারী একজনের কাছে সুন্দর, অন্যের কাছে তা না-ও হতে পারে। তাই আল মাহমুদ নারীকে সৌন্দর্য না বলে আকর্ষণীয় বলতে চান। তার মানে নারী আকর্ষণ করে, তার মধ্যে আকর্ষণ করার শক্তি আছে। সেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বলেই নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় এত ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি আর্টের অংশ হিসেবেই দেখতে চান। কবি তার ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতায় লিখেছেন— ‘বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল/ পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না/ তুমি যদি খাও তবে আমাকে দিও সেই ফল/ জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হবো চিরচেনা/ পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা/ দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।’ আবার তিনি লিখেছেন—‘আমার চুম্বন রাশি ক্রমাগত তোমার গতরে/ ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল/ এর ব্যতিক্রমে বানু এ-মস্তকে নামুক লানৎ/ ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।’ `লোক লোকান্তর`-এর `সিম্ফনি` কবিতায় শুধু নারীর শরীরকে আরাধ্য করেননি কবি, কবিতার চরণসজ্জায় আবরণহীন শব্দের আভরণ স্থান করে নিয়েছে। কবি লিখেছেন- `শঙ্খমাজা স্তন দুটি মনে হবে শ্বেতপদ্ম কলি/লজ্জায় বিবর্ণ মন ঢেকে যাবে ক্রিসেনথিমামে`। `নূহের প্রার্থনা` কবিতায়ও নারী-পুরুষ সম্পর্কই মুখ্য স্থান গ্রহণ করেছে। লিখেছেন ‌`আবার করবো পান বুকের এ উৎস ধারা হতে/জারিত অমৃত রস/এতোদিন যৌবনের নামে/যা ছিল সঞ্চিত এই সঞ্চারিত শরীরের কোষে/হে নূহ সন্তান দেবো, আপনাকে পুত্র দেবো`। `শোকের লোবান` কবিতা নিবেদিত নারীর দাবি পূরণের গল্প-ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন `তামসিক কামকলা শিখে এলে/যেন এক অক্ষয় যুবতী/তখন কবিতা লেখা হতে পারে একটি কেবল/যেন রমণে কম্পিতা কোনো কুমারীর/নিম্ননাভিমূল`। `কালের কলস` গ্রন্থের `শূন্য হাওয়া` কবিতায় কামবিন্দুকে ঘিরে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের সম্পর্কের চরণবৃত্ত গড়ে উঠেছে- `ঘুমের ছল কামের জল/এখনো নাভিমূলে/মোছেনি তবু আবার এলো/আগের শয্যায়।` আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম মীর আবদুস শাকুর আল মাহমুদ। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার তেমন সুযোগ হয়নি তার জীবনেও। স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে সাহিত্য রচনায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে তার পেশা জীবন শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় লেখালেখি চালাতে থাকেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ `লোক লোকান্তর` (১৯৬৩) তাকে প্রথমসারির আধুনিক বাংলা কবিদের কাতারে নিয়ে আসে। কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬) কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা কবিতায় তার আসনকে অনিবার্য ও পাকাপোক্ত করে দেয়। তারপর লিখেছেন আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া ইত্যাদি কাব্য। তার গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধ বনিক, ময়ূরীর মুখ ইত্যাদি। আর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে কবি ও কোলাহল, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, ত্রিশিরা প্রভৃতি। আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ গল্প ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাসও আলাদা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।    

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি