ঢাকা, ২০১৯-০৬-২০ ১৯:৩৭:০০, বৃহস্পতিবার

ক্যান্সার জয়ী সাহসী উদ্যোক্তা সুমনার গল্প

ক্যান্সার জয়ী সাহসী উদ্যোক্তা সুমনার গল্প

পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। এক ধরনের মানুষ নিজের নিয়তিকে মেনে নিয়ে যা আছে তাতেই হা হুতাশ করে। আরেক ধরনের মানুষ সংকল্প করে নিজের নিয়তিকে জয় করার। অদম্য স্পৃহা নিয়ে ছুটে সংকল্পের পেছনে। অতীত তখন হার মানে। ভবিষ্যত তাকে বানায় উদাহরণ। সুমনা তেমনি একজন। যিনি নিজের শরীরে ক্যান্সারের মত ঘাতক ব্যাধি নিয়েও শুন্য থেকে উঠে এসেছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে সফল করেছেন। অনেকের জন্য তৈরি করেছেন কর্মসংস্থান। রোকেয়া পারভীন সুমনা। দেশে নিজ উদ্যোগে যারা পাটজাত পণ্য প্রস্তুত করছেন তাদের একজন। রাজধানীর শেখেরটেক এলাকায় রয়েছে সুমনা`র বৈচিত্র্য নামের পাট ও চামড়াজাত পন্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। যেখানে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন বিয়াল্লিশ জন কর্মী। তবে এ প্রতিষ্ঠানে ভাসমান কর্মীর সংখ্যা অনেক বেশী। মূলত কাজের ধরন অনুযায়ী এখানে কর্মীর সংখ্যা বাড়ে কমে। বৈচিত্র্যের স্বত্ত্বাধিকারী সুমনা`র জীবনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করে করে করে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। শুধু প্ররিশ্রমই তার সঙ্গী ছিল না, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নানা অপমান, লাঞ্ছনা তাকে সইতে হয়েছে নিয়মিত। তবে সুমনাকে সবচেয়ে বেশী লড়াইটা করতে হয়েছে ক্যান্সারের সাথে। এখনো সুমনা লড়াই করছেন। একদিকে ক্যান্সার অন্যদিকে তার উদ্যোগ। সুমনা`র জন্ম সাংস্কৃতিক পরিবারে। বাবা লুৎফুল বারী ( প্রয়াত) ছবি আঁকতেন। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চারুকলায় পড়াবেন। কিন্তু সুমনা`র সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মাত্র ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায় ( ২০০২ সালে) তার বাবা মারা যান। সংসার সম্পর্কে খানিকটা উদাসীন বাবা মারা যাওয়ার সময় ছেলে মেয়েদের চোখে কিছু স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই রেখে যেতে পারেন নি। সুমনা`র ভাষায়, "বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা চার ভাই বোন অথৈ সাগরে পড়লাম। আমার মাও সেই সাগরে ভাসেন। আমরা সেই সাগরে ভাসি"। সুমনা আরো বলেন, " অভাব কাকে বলে জীবন তখন আমাদেরকে তা হাড়ে হাড়ে শিখিয়েছে"। নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে এসএসসি পাস করার আগেই ( ২০০৫ সাল) বিয়ে হয়ে যায় সুমনা`র। বর মাকসুদুর রহমান মহিম তখন একটি সাধারন চাকরি করেন। খুব অল্প বয়সে নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে লড়াই করতে করতে সংসার শুরু করেন তারা। এ সময় সুমনা একটি সিদ্ধান্ত নেন। পড়াশুনা করতে হবে। তার বরও তাকে উৎসাহ দেয়। সুমনা`র ভাষায়, "আমি বুঝতে পারি সমাজে মানুষের মতো বাঁচতে হলে পড়াশুনা লাগবে। এর কোন বিকল্প নেই। সুমনা ভর্তি হলেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসি, সরকারি বাংলা কলেজ থেকে এইচএসসি,আবুজর গিফারী কলেজ থেকে সম্মান অনার্স সম্পন্ন করেন। এই সময় সুমনা প্রচুর টিউশনি করতেন। সুমনা`র ভাষায়, "আমার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য আমার বরের ছিল। কিন্তু সবসময় তার কাছে চাইতে আমার আত্মসম্মানে লাগত। কেন মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হবে? তাহলে স্বকীয়তা থাকল কোথায়?" এরপরপরই কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের উপর চার বছরের একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন সুমনা। তখন ২০১১ সাল। ২০১২ সালের দিকে যোগদিলেন রাজধানীর একটি ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্মে। এরমধ্যে কোলে এল সন্তান। সব ভালই চলছিল। কিন্তু জীবনের গল্প সবসময় মসৃন হয় না। কখনো কখনো ঝড় আসে। সেই ঝড়ে কেউ কেউ লাগাম ধরতে পারে। আবার কেউ কেউ লাগাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সুমনা`র জীবনেও ঝড় এলো। তার থাইরয়েড ক্যান্সার ধরা পড়ল। আসুন, সুমনা`র নিজের মুখেই আমরা সে ঘটনা শুনি। আমাদের কোল জুড়ে সন্তান আসার কিছুদিন পরেই শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। আমার ওজন হঠাৎ বেড়ে যেতে থাকে। আগে আমার ওজন ছিল পঞ্চান্ন। তা বেড়ে হয়ে যায় বাহাত্তর। আমার হার্ট খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। অল্পতেই ধড়পড় করত। মনে হতো ভেতরে ভেতরে আমার শরীরটা ভেঙ্গেচুড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার ওজন কমে পঞ্চাশ হয়ে যায়। রাতে জ্বর থাকত। সারা রাত ঘুম হতো না। প্রায় রাত জেগে থাকতাম। একদিন আমি জ্ঞান হারালাম। এরপর যোগাযোগ করি ডাক্তারের সাথে। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিলেন। সেই টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে দেখালাম আমার চাচীকে। না বললেই নয়,আমার চাচা চাচী দু`জনেই ডাক্তার।আমার চাচী বললেন, তুমি একটা ক্যান্সার টেস্ট কর থাইরয়েডের উপর। এটা পিজি হাসপাতালে ( বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) কর। তার কথা মতো আমি ক্যান্সার রেডিয়েন্ট টেস্ট করি। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর আমার চাচীর পরামর্শ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার ডিপার্টমেন্টের থাইরয়েড বিভাগের হেড অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন- এর শরণাপন্ন হই।" ঘাতকব্যাধি ক্যান্সার এর নাম শুনলে ভয় পায় না এমন কেউ নেই। কিন্তু সুমনা যখন জানল তার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে তখন তার কেমন লেগেছিল? আমরা সে অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনব স্বয়ং সুমনা`র মুখে। "আমি যখন রিপোর্ট আনতে যাই আমাকে জিজ্ঞেশ করা হলো আমার ফ্যামিলিতে কীআর কেউ নেই? আমি নিজে কেন রিপোর্ট আনতে গেলাম।আমি বললাম, নিজের সবকাজ তোআমি নিজেই করি। তাই রিপোর্ট নিতেও আমি এসেছি। আমার রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, তুমি আরো কয়েকটা টেস্ট কর। এরপর তোমার ফ্যামিলির অন্য কোন সদস্য নিয়ে আস। তোমার রিপোর্টে সমস্যা আছে। কিন্তু পরে রিপোর্ট নিয়েআমি নিজেই যাই।আমার বর এমনিতেই মেডিকেল বা ডাক্তার সংক্রান্ত বিষয়গুলো ভয় পায়।আমি তার কাছে বাচ্চাকে রেখে গেলাম। ডাক্তার সব শুনে বললেন, তোমাকে ট্রিটমেন্টে ফেলতে হবে। তোমার শরীরের এখন যে অবস্থা তোমাকে এখন ট্রিটমেন্ট দেওয়া শুরু না করলে পরে সমস্যা হবে। এরপর আমাকে ডাক্তারদের সাথে বসানো হয়। বসিয়েআমার এ টু জেড ডাটা নেওয়া হয়। যে টেস্টটা করেছিলাম সে সংক্রান্ত কোন একটা রেডিয়েন্ট আমার শরীরে পুশ করা হয়। তখনআমি এতোটা অসুস্থ ছিলাম নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলাম না। তখন বাসায় ফোন করি। একজন গিয়ে আমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসে। সেদিন থেকে আমি পুরোপুরি বিছানায় পড়ে গেলাম।" একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সাথে আলাপ কালে স্মৃতিকাতর সুমনা বলতে থাকেন, " তারপর থেকে আমার প্রচুর জ্বর হতো। কখনো ১০৪ ডিগ্রী, কখনো ১০৫ ডিগ্রী। কোন অবস্থায় বিছানা থেকে উঠতে পারতাম না। প্রচুর ব্যাথা হতো। ব্যাথার ধরণও ছিল আলাদা। শরীরের কোন না কোন অংশে ( শুধু নির্দিষ্ট একটি জায়গায়) প্রচুর ব্যাথা হতো। সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি এমনিতে খুব শক্ত মানুষ। কিন্তু সেই ব্যাথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। " কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেন সুমনা। বিরতি দিয়ে শুরু করেন, " তারপর এক নিরন্তর লড়াই। ডাক্তার, হাসপাতাল, বাসা। বাসা, হাসপাতাল, ডাক্তার। ওষুধ, টেস্ট, রিপোর্ট। রিপোর্ট, টেস্ট, ওষুধ। এই চক্রে বন্দী হয়ে যায় জীবন। এভাবে টানা দেড় বছর থেকে দু`বছর।আমাকে প্রচুর ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হয়েছে।আমি এমনিতে ছোটবেলা থেকে পোড় খাওয়া মেয়ে। কিন্তু এ সময় সংগ্রাম আমার কাছে নতুন রূপে ধরা দেয়। সুমনা বলেন, "আমার বাবা ছিলনা বিধায় মাআমাদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছিলেন।আমি বুঝতে পারছিলামআমি মরে গেলেআমার সন্তানের জন্য পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যাবে। সন্তানের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিই,আমাকে বাঁচতে হবে। লড়াইয়ে জিততে হবে। সব খারাপ দিকের বিপরীত দিকে একটা ভাল দিকআছে। সুমনা`র ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ক্যান্সারের সাথে সুমনা যখন লড়াই করছিলেন তখন রাত জাগতেন। রাতের পর রাত ঘুম হতোনা। সময় দিতেন কম্পিউটারে। তখনই ভারতীয় একটি অনলাইন মার্কেট প্লেসেরআদলে নিজে একটি পেজ খোলেন। নাম দেন প্রজাপতি বুটিকস। অনেকটা শখের বশে খোলা। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটগুলো তখনো এদেশে ব্যবসা করছে। তবেআজকের মতো এতোটা জনপ্রিয় না। ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে করতে নিজের পেজে মেয়েদের পোশাক সহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রী শুরু করেন। আমেরিকায় বসবাস করেন এমন কয়েকজন বাঙ্গালীর কাছ থেকে নানা ধরনের অর্ডার পান। লাভ হতে থাকে। ব্যবসায়ে উৎসাহ বাড়ে। সুমনা নিজে নিজে উপলব্ধি করেন তাকে সুস্থ হতে হলে কাজের মাঝে থাকতে হবে। সেই চিন্তা থেকে ২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে ড্রেস মেকিং, ব্লক, বাটিক, ডায়িং- এর উপর একটি প্রশিক্ষণ নেন।এর পরপরই এসএমই ফাউন্ডেশনে সাত দিনের একটি চামড়াজাত দ্রব্য উৎপাদনের কোর্স করেন। একই সময়ে তিনি জেডিপিসিতে পনের দিনের কোর্স করেন। সর্বোপরি এসএমই ফাউন্ডেশনে ফ্যাশন ডিজাইনের উপর এক বছরের একটি কোর্স করেন। একদিকে ক্যান্সারের সাথে লড়াই। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ। নিজেকে পরিপূর্ণ করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। নিজের বাসায় মাত্র দুটি সেলাই মেশিন নিয়ে শুরু। একটি সেলাই মেশিন তার নিজের। অন্যটি তার স্বামীর বড় বোনের। পুরনো, অব্যবহৃত চামড়া ও পাট কিনে পন্য উৎপাদন শুরু করলেন। প্রথমে একটি, তারপর দুটি। বর্তমানে সুমনা`র প্রতিষ্ঠিত `বৈচিত্র্য` নামের প্রতিষ্ঠানটিতে নানা ধরনের সত্তরটিরও বেশী পন্য উৎপাদিত হয়। না, সুমনা`র উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি এত সহজ নয়। সুমনা`র ভাষায়, "পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন মেয়েকে নানা রকম লড়াই করতে হয়। আমি বংশালে কাঁচামাল কিনতে গিয়েছিলাম প্রথমবার। অনেক দোকানদার আমার দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছিল,যেন ওরা কখনো মেয়ে দেখেনি। সব জায়গায় কোন না কোন ভাবে বিব্রত করার জন্য অনেকে উঁৎপেতে বসে থাকে। একটা মেয়েকে সেসব মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হয়। সুমনা মনে করেন, যুগ যুগ ধরে এদেশে অধিকাংশ নারী কখনো বাবার পরিচয়ে, কখনো স্বামীর পরিচয়ে বেঁচেছে। নারীকে নিজের পরিচয়ে বাঁচা উচিত। সেজন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিকল্প নেই।   টিআর/আআ
সংশোধিত এডিপির খসড়া চূড়ান্ত: মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বরাদ্দ

সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপ) মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে শনিবার সরকারি ছুটির দিন হলেও সংশোধিত এ বরাদ্দের খসড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে খসড়া সংশোধিত এডিপি। এ চূড়ান্ত খসড়ায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগের অনুকূলে দেওয়া হচ্ছে ২৪ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ হিসেবে বাড়তি বরাদ্দ পেয়েছে ১ হাজার ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২২ হাজার ৮৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বেড়েছে ৫২৭ কোটি টাকা। মূল বরাদ্দ থেকে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা কমলেও তৃতীয় অবস্থানে থাকা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পাচ্ছে ১৯ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। মূল বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা সচিব মো. নুরুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা হচ্ছে গ্রামকে শহর বানাতে হবে। অর্থাৎ শহরের সব সুবিধা গ্রামে পৌঁছাতে হবে। আমরা সেই নির্দেশনা মেনেই কাজ করে যাচ্ছি। স্থানীয় সরকার বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ফলে গ্রামের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত শহরে এনে বিক্রি করতে পারছে। মানুষের কানেকটিভিটি বেড়ে যাচ্ছে। এই সুবিধা আরও বাড়াতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সূত্র জানায়, সংশোধিত এডিপির খসড়া মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ হচ্ছে, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ৭৩ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ১ হাজার ৪১০ কোটি টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৭৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, সরকারি কর্মকমিশন ৪৪ কোটি টাকা, অর্থ বিভাগ ৪৩৪ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ৩৫৭ কোটি টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ৫৫ কোটি টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ৪০ কোটি টাকা, পরিকল্পনা বিভাগ ১৫৬ কোটি টাকা, আইএমইডি ১০৪ কোটি টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ৫৫১ কোটি টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৮৪ কোটি টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬৬ কোটি টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা, আইন ও বিচার বিভাগ ৪৭২ কোটি, জননিরাপত্তা বিভাগ ১ হাজার ৫৫৬ কোটি, সুরক্ষা সেবা বিভাগ ২ হাজার ১৪ কোটি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৬ হাজার ৮৩৯ কোটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১ হাজার ১২২ কোটি, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২৫৭ কোটি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪২৯ কোটি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ১৬৩ কোটি। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি, তথ্য মন্ত্রণালয় ২৩১ কোটি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৯৮ কোটি, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২০৫ কোটি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ৩২১ কোটি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ১ হাজার ৭৪৫ কোটি, শিল্প মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৮৭ কোটি, বস্ত্র ওপাট মন্ত্রণালয় ৭১২ কোটি, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ২ হাজার ১২৯ কোটি, কৃষি মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৮০৬ কোটি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৭৭৫ কোটি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ৫২৪ কোটি, ভূমি মন্ত্রণায় ৬৩৪ কোটি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ৮৫৯ কোটি, খাদ্য মন্ত্রণালয় ৬৪৫ কোটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৯১৫ কোটি, রেলপথ মন্ত্রণালয় ৭ হাজার ৯২৫ কোটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২ হাজার ৮৯৪ কোটি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২১ কোটি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৮৪৫ কোটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পাচ্ছে ৫৪১ কোটি টাকা।

ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত সমন্বয়ে সময় বাড়ল ৬ মাস

ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের সময়সীমা আবার বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। আগের সময়সীমা অনুযায়ী ৩০ মার্চের মধ্যে এডিআর সমন্বয়ের কথা ছিল। গত বছরের ৩০ জানুয়ারি এডিআর কমানোর নির্দেশনা দেওয়ার পর থেকে তা সমন্বয়ের জন্য এ নিয়ে চার দফা সময় বাড়ানো হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০টি ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে বেসরকারি খাতের ১১টি ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু বেসিক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। আর ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত ৭টি ব্যাংকের এডিআর বেশি রয়েছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাপক বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এডিআর কমিয়ে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৯ শতাংশ করা হয়। আগে যা ৮৫ ও ৯০ শতাংশ ছিল। ব্যাংকগুলোর এডিআর নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে প্রথমে গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। এরপর আরেকটি সার্কুলারের মাধ্যমে সময় বাড়িয়ে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। তবে তারল্য সংকটের কথা বলে বিভিন্ন দাবিতে সরব হয় বিএবি। পরবর্তীতে সময় আরও বাড়িয়ে ৩০ মার্চ নির্ধারণ করা হয়। এখন আরেক দফা সময় বাড়ল। বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সমকালকে বলেন, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে এডিআর সমন্বয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব দেখা দেবে। এসব ব্যাংক মনে করবে, আগামী সেপ্টেম্বরে ঋণ সমন্বয় করতে না পারলেও কোনো সমস্যা নেই। যে কোনো উপায়ে তখন আবার সময় বাড়ানো যাবে। তিনি মনে করেন, বারবার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়মের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলো চাপে পড়বে। এ ছাড়া তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, শুরুতে যেসব ব্যাংকের এডিআর বেশি ছিল এখনও তারাই সীমার সার্কুলারে বলা হয়েছে, ঋণ-আমানত অনুপাত নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনার কার্যক্রম আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে। এখনও যেসব ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে, তারা নির্দেশিত মাত্রায় নামিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অফ-সাইট সুপারভিশন বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে। জানতে চাইলে বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, এডিআর সমন্বয় নিয়ে ব্যাংকগুলো চাপের মুখে ছিল। সময় বাড়ানোর ফলে এখন কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। শেয়ারবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। ব্যাংকগুলোর এডিআর কমানোর জন্য শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগ কমাচ্ছে বলে গুঞ্জন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে দরপতনের অন্যতন কারণ এই ঋণ সমন্বয় বলে বাজার-সংশ্নিষ্টদের অনেকে মনে করেন। বাজারের এই নিম্নমুখী ধারার কারণে অন্য প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছিলেন না বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছিল। এমন অবস্থায় এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা আরও ৬ মাস বাড়িয়ে সার্কুলার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এডিআর বাড়ানোর পর আমানত সংগ্রহে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এতে সুদহার বাড়তে শুরু করে।

যেভাবে হলো ওয়েল গ্রুপের উত্থান

১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি। পারিবারিকভাবে সিন্ধান্ত হলো, আমাকে ব্যবসায়িক কাজে এখন থেকে ঢাকার থাকতে হবে। ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। জন্ম, বেড়ে ওঠা শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি ও ব্যবসা সবকিছুই সূচনা আমার চট্টগ্রামে। অথচ এসব ছেড়ে ঢাকায় থাকতে হবে। মনটা ভীষণ দমে গেল। এদিকে জীনাত মনে-মনে খুব খুশি। কারণ তার বেড়ে উঠা ঢাকায়। ওর মা-বাবা ভাই-বোনও থাকে ঢাকায়। সেখানে থাকতে হবে শুনে তার তো খুশি হবারই কথা। কিন্তু আমার মনের অবস্থা বুঝে আনন্দটা লকিুয়ে রাখল মনে হলো। বড় ভাইয়ের একবন্ধুর সাথে পার্টনারশিপে সেলাই সুতো তৈরির কারখানা দিয়ে টাকায় ব্যবসা শুরু করি। একেবারে ছোটো পরিসরে। সাভারে স্থাপন করা হলো ওয়ের থ্রেড লিমিটেড। এস্কাদার ইঞ্জিনিয়ারের বানানো ৫টি উইন্ডিং মেশিন দিয়ে শুরু। তবে পার্টনারশিপটা বেশিদিন টিকলো না। সিন্ধান্ত হলো যন্ত্রপাতি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে আর নতুন নামে ব্যবসা শুরু করবো। নতুন কোম্পানি গঠন করা হলো সানজি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামে। আজকের ওয়েল গ্রুপ অব ইন্ডান্ট্রিজের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ইউনিট। দেশের বৃহত্তম সেলাই সুতো প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, যাকে তৈরি পোশাকশিল্প সেক্টর ওয়েল থ্রেড নামে সকলে চেনেন। যেখানে এস্কান্দার ইঞ্জিনিয়ারের বানানো মেশিনগুলো এখনও স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতোমধ্যে পাশে বসে গেছে বিশ্বের বিখ্যাত সুইস অরিজিন এসএসএম ইউন্ডিং মেশিন। এদিকে কারখানা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম স্থানান্তারিত হলো, আর আমি রয়ে গেলাম ঢাকায়। আর্থিক সীমাবন্ধতার কারণে প্রথম দিকে বউ বাচ্চাকে ঢাকায় আনতে সাহসে হয়নি। প্রায় এক বছর শ্বশুরবাড়িতে থেকে গেলাম। অনেকটা ঘরজামাই হয়ে। আজকের এই ব্যস্ততা তখন ছিল না। সকাল থেকে বিকেল অব্দি বায়িং অফিস আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টারিতে। ঘুরে-ঘুরে সুতো বিক্রি। বিকেলে অফুরন্ত সময়। কখানও বেইল রোডের মহিলা সমিতি মিলনায়তনে নাটক দেখি। কখনও রমনায় বসে বাদান চিবাই। তখনকার বিকেলটা যেন ফুরোতে চাইতো না কিছুতেই। বৃহস্পতিবারটি এলে বিকেলে ট্রেন ধরে চট্টগ্রামে লাগাতাম দৌড়। স্টেশনে আমার অপেক্ষায় বড়ভাই। ট্রেন থেকে নেমে বড়ভাইয়ের দেখা মিলতেই ভ্যা-ভ্যা করে কান্না, তুমি আমাকে ঢাকায় পাঠালে কেনো। আমার ভাল লাগে না। আমি চলে আসবো… ভাই আমার নিশ্চুপ। আবার বাড়ি ঢুকেই মাকে জড়িয়ে ধরে আরেক দফা কান্না। এই করতে করতে বছর কেটে গেল। ব্যবসাও নড়েচড়ে উঠছে। সিন্ধান্ত হলো, ছোট একটা বাসা ভাড়া নেয়া হবে  ‍পুরানো পল্টন। মসজিদ গলিতে ২ রুমের বাসা ভাড়া নেও হলো শ্বশুরবাড়ি পাশে। ভাড়া ৬ হাজার টাকা। আমার এক বছর বয়েসী মেয়ে যারাহকে নিয়ে ওঠে গেলাম। শুরু হলো জীবনের আরেক পর্ব। সকালে ঘুম থেকে ওঠেই চলে যাই কাকরাইলে এস এ পরিবহনে অফিসে। চট্টগ্রাম থেকে বস্তাভর্তি সুতোর কার্টন এসে নামে। প্রতিটি বস্তা খুলে কার্টন বের করে, কার্টনের গায়ে কাস্টমারের নামে দেখে অর্ডারের সাথে মিলিয়ে চালান লিখতো। কখনো রিকশাভ্যান কখনো অটো রিকশা, কখনো বা ভাড়া করা মাইক্রোবাস। এসবে মাল উঠিয়ে ছুটে চলা। মালিবাগ চৌধুরীপড়া, তেজগাঁও, মিরপুর কমলাপুর। বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টারিতে ডেলিভারি, ডেলিভারি শেষে চালান হাতে পল্টন অফিসে ফিরে নিজ হাতে হিসাবের খাতাপূরণ। পাশের টেবিলে খট-খট শব্দে টাইপ মেশিনে মতিনের ইনভায়েস প্যাকিং লিস্ট তৈরি করা। সব শেষে আগামী দিনের ডেলিভারি শিডিউল ঠিক করে সন্ধ্যায় বাসায়। বিছানায় নিস্তেজ শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম। আর মাথাজুড়ে খেলে যেত কেবল পরে দিনের ভাবনা। শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দেয়া পাওনাদারের দেনাশোধ, ব্যাংকঋণের সুরহা করা ইত্যাদি। সবশেষে নিজের শিল্পপতি হওয়ার অবারিত স্বপ্ন তো আছেই… লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল গ্রুপ অব) চলবে...

যে চিঠিতে বদলে গেলে তরুণ উদ্যেক্তার জীবন

চিঠি লিখছি। আসে পোস্টবাক্সভর্তি উত্তর। সঙ্গে কয়েক পদে পণ্যের ক্যাটালগ। কোনোটা জার্মানি, কোনোটা ফ্রান্স, কোনোটা ইতালি। কোনোটা-বা সিঙ্গাপুর থেকে। কিছু কিছু বুঝি কিছু বুঝি না। তারপরও চেষ্টা করি উত্তর দেওয়ার জন্য। সব চিঠির উত্তর দিতে। একদিন ফ্যাক্স অফিস থেকে ফোন এলো জানালো একটা ফ্যাক্স এসেছে। কাজী আইয়ুবকে পাঠিয়ে সংগ্রহ করে দেখি, এক মার্কিন কোম্পানির সিঙ্গাপুর লেখা চিঠির থেকে পাঠানো ফ্যাক্স। বিয়াট্রিস ফুড (স) প্রাইভেট লিমিটেড। আমার লেখা চিঠির উত্তর। বাংলাদেশে তাদের প্রোডাক্টস তথা মিডোগোল্ড ব্রান্ড কন ডেন্সডন্সেড মিল্ক, মিল্ক পাউডার, বাটার অয়েল বাজারজাতকরণে আমাদের এজেন্ট নিয়োগ করতে চায়। ফ্যাক্স চিঠির গুরুত্ব ‍বুঝতে ছুটে গেলাম বড় ভাইয়ের কাছে। চিঠিটা পড়া পুরো শেষ না করেই ফোন করলেন দেওয়ানজী স্টোরের ঝুলন দাদাকে। দেওয়ানজী স্টোর, রিয়াজউদ্দীন বাজারের সেই সময়ের নাম করে মিল্ক ফুডস ডিলার। আমাদের একই গ্রামের বিখ্যাত দেওয়ানজী পরিবারের প্রতিষ্ঠান। ফ্যাক্সের কপিটা নিয়ে গেলাম তার কাছে। দিখিয়ে বিস্তারিত বলেতেই উনি রাজি হয়ে গেলেন। তবে শর্ত একটা দেওয়ানজী স্টোর ছাড়া অন্য কাউকে মিডো ব্রান্ড দেয়া যাবে না। আমিও কথা দিলাম, তাই। অফিস ফিরে উত্তরটা ফ্যাক্স মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলাম। স্পষ্ট করে লিখলাম: ডিয়ার মিস্টার নিও, ইউ আর রেডি টু ওয়ার্কস অ্যজ ইওর এক্সক্লুসিভ এজেন্ট ফর প্রমোটিং দ্য সেলস অফ ইওর। মিডোগোল্ড সুইডেন্ড কনডেন্সপ মিল্ক হোল মিল্ক পাউডার অ্যান্ড পিওর বাটার অয়েল…। ফ্যাক্স পাঠিয়ে অফিস ফিরতেই পেলাম ওভারসিস কল। নিও স্পিকিং ফ্রম বিয়াট্রিস ফুডস,সিঙ্গাপুর। জোরে গলা খাঁকি দিয়ে বললাম, ইয়েস স্যায়েত নুরুল স্পিকিং…। অপর প্রান্ত থেকে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন আমি সিঙ্গাপুর যেতে পারবো কিনা। একটু চমকে উঠলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম ইয়েস আই ক্যান.. পাসপোর্টটা কেনো জানি আহেই বানিয়ে রেখেছিলাম। ভিসা প্রসিসিং টিকেট কাটা, বিসিসিআই ব্যাস্কে গিয়ে ট্রাভেলার্স চেক তৈরি করে একদিন সত্যি সত্যি সিঙ্গাপুরের উদেশে রওনা দিলাম। অজানা পথ অজানা ভাষা, কোথায় যাবো কি করবো, বুঝে উছতে পারছিলাম না বলে ভাবীর ছোটভাই সেলিম ভাই। আর ঝুলন দাদাকে সাথে নিলাম। খোরে সিঙ্গাপুরে অবতরণ করলাম। এয়ার পোর্ট থেকে নেমেই দেখি, একজন বয়স্ক চীনালোক আমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। পরিচয় দিতেই হাতে বাড়িয়ে বললেন, আই অ্যাম নিও! আমিও বললাম স্যায়েস নুরুল…। গাড়িতে উছে সোজা হোটেল। ১১ টায় দিকে নিও সাহেব এসে নিয়ে গেলেন জুরং এলকায় ফ্যাস্টরি লাগোয়া অফিসে। টুকতেই দেখি। আমার নাম লেখা বোর্ড। সুবহানাল্লাহ…। টুকে সোজা মিটিং রুমে। আমাদের অপেক্ষা ছিলেন। বয়স্ক এক ভদ্রলোক। চেহারা রাশভাবি। হাত বাড়িয়ে বললেন,। আমি রবার্ট জেনাবেল ম্যানেজার,বিয়াচ্রিস ফুডস! পরিয়চ পর্ব শেষে ভদ্রলোক চার পৃষ্ঠা ইংরেজীতে লেখা অ্যাগ্রিমেন্ট কপি আমার হাতে দিয়ে বললেন, স্যয়েদ ইউ জাস্ট গো থ্রো দিজ কনট্রক্ট। আই অ্যাম কামিং হেয়ার ইন হাফ আওয়ার। ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমি সেলিম ভাইকে নিয়ে অ্যাগ্রিমেন্টটা পড়ার এবয় বুঝার চেষ্টা করছি। সঙ্গে গ্লাস ভার্তি চায়নিজ চায়ে দিচ্ছি চুমুক। ঠিক আধ ঘণ্টা পর রবার্ট সাবেব ফিরে এসেই বললেন, জেন্টম্যান, আর ইউ ওকে ? ক্যান ইউ সাইন দ্য অ্যাগ্রিমেন্ট ? আমি সেলিম ভাইয়ের মুখে দিকে তাকিয়ে বললাম, ইয়েস ইউ ক্যান…..। অ্যাগ্রিমেন্ট সাইনড গয়ে গেলে। দুপুরের খাবার পালা। আমাদের নিয়ে আসা হলো সিঙ্গাপুর বিখ্যাত ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট কমলাভিলা বানান লিফে। পুরো খাবারটাই কলাপাতায় সাজানো। খাবার শেষে এবার বিদায়ের পালা। আমার নিজের ইংরেজি নিয়ে আমি সবসময় নার্ভাস ছিলাম। কেনো জানি রবার্ট সাহেবকে বলেই ফেলাম সরি মি.রবার্ট মাই ইংলিশ ইজ নক গুড এনাফ। ভদ্রলোক আমার পিঠ  থাপড়িয়ে ইংরেজিতে যা বললেন, তার অর্থ হচ্ছে আমি আমার ভাষা বাংলাটা ভালো শিখতে-পড়াতে এবং বলতে পারি না। ইংরেজিতে আমার দখল না থাকলেও কিছু আসে যায় না। এত বড় অ্যগ্রিমেন্ট সাইন করে যতটা খুশি হয়েছি। তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হয়েছিলাম আমি রবার্ট সাহেবের ওই কথা শুনে ! জীবনে অনেক বিজনেস মিটিং অনেক অ্যগ্রিমেন্ট অনেক নেগোশিয়েশন, অনেক সেমিনার-সিস্পোজিয়ামে ইংরেজিতে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো দিনই রবার্ট সাহেবের কথা ভুলিনি। কখনও ভাবিনি আমার ইংরেজি জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়ে। ভেবেছি, কী বলতে চেয়েছি। সেটি ঠিক মতো বুছতে সক্ষম হয়েছি কিনা সেটাই বড় কথা। লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল গ্রুপ অব)। চলবে- টিআর/ এসএইচ/  

নতুন বউ নিয়ে মাটির ঘরে

অবশেষে নববধুর পদার্পন বাপ-দাদর স্মৃতিবিজড়িত পুরনো মাটির ঘরে। ভেবেছিলাম নাক সিটকিয়ে ভুরু কুঁচবে বলবে, তুমি তো বলেছিলে আমার জন্য পাকাঘর  বানানো হয়েছে। এখন তো দেখি সেই পুরনো মাটির ঘরই। নাহ, কিছু বলব না। চোখে-মুখে নতুন স্বপ্ন ছাড়া তেমন কোনো প্রতিচ্ছবি দেখলাম না। একটু পরে আতঙ্কিতভাবে নিয়ে আমার দিকে তাকালো নববুধূ, যখন কেউ একজন ভেজা কাঁথা মুগিয়ে নতুন বউ বরণ করতে এলো। পরক্ষণে দেখলাম, ভয় কেটে গেল ওর। যখন নানি চিৎকার করে কাঁথাসহ ওই মহিলাকে সরিয়ে দিলেন। নতুন বউ উপস্থিত আবালবৃদ্ধাবনিতার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে নির্ধারিত স্থানে বসতেই কানে-কানে বললাম কী ব্যপার,একবারে বুয়াদেও পদধ্বনি নিলা? বউ কিছুটা আবাক হয়ে বলল, মা তো বলেছেন শ্বশুরবাড়ির মুরুব্বি দেখতে সবাইকে সালাম করতে হবে। আমার সশব্দ হাসি। সেই হাসির দমকায় অন্যরাও হাসলো বেশ। জানতে চাইল ভেজা কাঁথা দিয়ে একজন চেপে ধরতে চাইলো কেন? আমিও ব্যাপারটা বুঝিনি। এমন সময় নানি উচ্চস্বরে বলে উঠলো নববূকে ভেজা কাঁথায় মুড়িয়ে ঘরে টুকরে সেই বউয়ের ধৈর্যসহ্যগুণ বেড়ে যায়। এমন বিশ্বাস আর কি। তুমি বিদেশি মেয়ে বলে আমি ওটা করতে দিই নি। বললাম, বেঁচে গেলে তো বেশ ! দুইদিন পর বৌভাত। এসি বাসে ঢাকা থেকে শ্বশুরপক্ষের বসাই  আসলো। গ্রামের চারদিকে হইচই বিদেশি বউয়ের বাপেরগুষ্ঠি আসেছে উৎসুক দৃষ্টিতে দেখছে সবাই আগত অতিথিদের। বাড়ির মা খালা চাচিরা বিদেশি বেয়াইন দেখতে এসেছেন লাইন ধরে। একথা সে কথা। তার মধ্যে একটি কথাই সবার মুখে বাববার বেয়াইন গম আচন্নি? বেইয়ান তো ভারি চিন্তিত, কিছুটা বিচলিতও বটে। ছোটা ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন বাবা খাট-পালংক আলমিরা ড্রেসিং টেবিল, শাড়ি-শহনা সব দিলাম, কিন্তু সামন্য জিনিস গমটা দিলাম না। এখানে তো সবাই বালাবলি করছে  গম দেইনি কেনো ? গম কোথায় পাওয়া যাবে এখানে ?। আশপাশে কোন বাজার আছে কি না । আমি তো আবাক। জানতে চাইলাম বৌভাতে অনুষ্ঠান, এখানে ওনার গমের দরকার হচ্ছে কেনো ?। কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন এখানে সাবাই নাকি বিয়েতে উপহার হিসেবে গম দেওয়া হয়নি কেনো মার কাছে জানতে চাচ্ছে ! আমি আরও আবাক ! বলেন কি ? কে এসব বলছে! একে –কে জিগ্যেস করতে আসল ঘটনা বেড়িয়ে এলো।  হাসতে হাসতে ছোটভাইকে বললাম এই গম সেই গম না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দ গম- এর অর্থ হচ্ছে ভালেঅ আচন্নি মানে আছেন তো। ও বেয়াইন গম আচন্নির অর্থ হলো মার কাছে সবাই জানতে চাচ্ছেন উনি ভাল আছেন কি না। ইংরেজীতে সেটাকে বলি হাউ আর ইউ। লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল গ্রুপ অব) চলবে টিআর/ এআর      

অঙ্কে কাঁচা ছেলেটি আজ শীর্ষ কোম্পানির মালিক

ছাত্রজীবনে সবচেয়ে সঠিন সময়ের মুখোমুখি দশম শ্রেণিতে ওঠে। ছোটকাল থেকেই আমি অঙ্কে কাঁচা। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ফাইনালের আগে টেস্ট পরীক্ষা বা  অ্যালাও পরীক্ষা পাস করতে হবে। নইলে এসএসসি দেওয়া যাবে না। মানে ছাত্র জীবনের যবনিকাপাত। অনেক চেষ্টা করেও অঙ্কে মেলাতে পারি না। সহজ-সরল অঙ্কেও শূন্য পাই ক্লাস টেস্টে। তারপরও প্রচুর খাটাখাটনি করে। কিছুটা নকলের ওপর ভর করে টেস্ট দিলাম। রেজাল্টের দিন অঙ্কের শিক্ষক জহরলাল ধর স্যার ডেকে বললেন, তোকে অঙ্কে ৩৩ মার্কস দিয়ে পাস দিলাম। এখন চেষ্টা করে দ্যাখ ফাইনালে পাস করিস কি না। ওখোনে আমি থাকবো না। জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো অঙ্কে পাস। এসএসসিতে যথারীতি ওই অংকেই ফেল। ২৩ মার্ক পেলাম। ১০ গ্রেস পেয়ে ৩৩। ৫৭৩ মার্ক পেয়েও গ্রেসের কারণে তৃতীয় শ্রেণি। উচ্চ মাধ্যমিক, অর্নাস মাস্টার্স, ছাত্রভীতির প্রতিটি অধ্যায়েই অঙ্ক, আর অঙ্কের প্রথম শ্রেণির কাছাকাছি পৌঁছেও দ্বিতীয় শ্রেণি তকোমা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। হায়রে অঙ্ক এখানো যোগ ৯ এর ফল মেলাতে ভাবতে হয় তিন মিনিটি! ১৯৭৭ সাল। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরটি শেষ হয়ে গেলো। মধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি পাওয়া এক কিশোরের জীবনের নতুন বাঁক। একদিকে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাত অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণি পাওয়ার গ্লানি সব মিলিয়ে পড়ালেখা পালিয়ে যাওয়াতে কেমন যে অনিশ্চিয়তা উঁকি দিয়ে গেলো। তারপরও মায়ের স্বপ্ন আর বড় ভাইয়ের উৎসাহকে সম্বল করে ভর্তি পরীক্ষায় হাজির হলাম। চট্টগ্রাম সরকারি বাণিহ্য কলেজ। দেশের নামকরা কলেজগুলো একটি। লিখিত পরীক্ষায় টিকে গেলাম। মৌখিক পরীক্ষায় মুখোমুখি হলাম লম্বা, রাশভারি সাহেবি চেহারার অফসার খান স্যারের প্রথম আমি সাঁতরাতে পারি ইংরেজি কি বলো। বেশিক্ষণ না ভেবে বললাম, আই নো হাউ টু সুইম! আর প্রশ্ন করলেন না । স্যার বলেন গুড। কয়েকদিন পর জানলাম ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। মুখে হাত বুলিয়ে অনুভাব করলাম সদ্য গজানো দাড়ি-গোঁফের অস্তিত্ব। মনের ভেতর যুবক-যুবক অনুভূতি। প্রতিদিন আগ্রবাদ থেকে বাসে চকবাজার নেমেই সেই সবুজ হোটেল। দুটো সিঙাড়া আর এক কাপ চা ….  অর্ডার দিয়েই বসে যাওয়া। কমার্স কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। একদিকে আন্দনে মাথায় উত্তেজনা অন্যদিকে শংকা। অভাবের সংসারে বাবা সবেমাত্র দীর্ঘ কালাজ্বর সেরে বিছনায় উঠে বসেছেন। বড়ভাই একা স্কুলপড়ুয়া আরও চার ভাই এক কোনের পড়ালেখা  বোনটা ভালো জায়গায় পাত্রস্থ করা। এসব ভেবে ভেবে পড়াশোনা চালিয়ে পাওয়ার হিসেবটা আর মেলে না।  এই ভাবনা মাথায় রেখে চকবাজার থেকে কালুর ঘাট বাসা ধরে মোহরা মৌলভিবাজার যায়। সেখান থেকে এক মাইল পথ হেঁটে বাড়ি। মা ও বাবাকে মালাম করে নিয়ে বড় ভাইয়ের অপেক্ষা। আমার ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট শুনে মা আমার যেন আকাশে চাঁদ হাতে পেলেন। এমন আনন্দ তাঁর চোখেঁমুখে। কর্মাস কলেজের প্রথম ক্লাস করতে গিয়ে বন্ধু শওকত, হাফিজ, নওশাদ, মুস্তাফিস, প্রদীপ, শহীদ, হারুন, সেলিম, সুফিয়ান, মকসুদ, আইয়ুব হাবিবুল্লাহ বাজার কেই নেই কাছে। সুফিয়ান অসুস্থ যে কারণে সে এসএসসি দিতে পারেনি। হারুন, মকসুদও কেন যানি ড্রপলি অন্যেরা সবাই ভালো ছাত্র। বিজ্ঞান-মানবিক নিয়ে পড়ালেখা করবে। তাদের চোখেমুখে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কবি, সাহিত্যিক সাংবাদিক হবার স্বপ্ন। সবাই চট্টগ্রাম কলেজে আর মহসিন কলেজে (তখন ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট আই আই কলেজে) ভর্তি হলো। আমি একা কমার্স কলেজে। কলেজ জীবনের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে। স্যার রহিম চৌধুরী ক্লাসরুমে ঢুকেই আমাদের ক’জন দাঁড়াতে বললেন। হাত-পায়ে মৃদু-কাঁপন রয়ে গেলো। অনেকটা চাটগাঁইয়া ভাষা বললেন, এখনি পাশের নাপিতের দোকানে যাও তোমরা, চুল কেটে আসো। এটা কমার্স কলেজ এখানে রোমিও তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মনটা একেবারেই দমে গেল। মনের ভেতরের যুবক-যুবক ভাবটা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেলো।  চলবে… লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ)   এসএইচ/

মনীষা দিয়ে শুরু এখন সফল ব্যবসায়ী

সেশনজটে পড়ে ১৯৮৩-এর ব্যাচ ১৯৮৬ পর্যন্ত পড়ালো। ওই বছর মাস্টার্স করে বাড়ি ফিরলাম। বড় ভাইয়ের ব্যবসার কারণে পরিবারে সচ্ছালতা ফিরেছে। ছোটো বোনটারও বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাইগুলোও বড়  হয়ে গেছে। কেউ স্কুলে কেউ বা কলেজে পড়ছে। আমাকে নিয়ে মা-বাবার অনেক উচ্চাশা। বড় চাকরি করব। বড় ভাইয়ের পাশে থেকে পরিবারের দায়িত্ব নেবো। এদিকে আমার মাথায় তখন কেবল ব্যবসা আর বিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিন খাবার টেবিলে বড় ভাই জানতে চাইলেন আমার ভবিষ্যৎ প্লান কী? চাকরির চেষ্টা-তদ্বির করছি কি না। নাকি রাজনীতি আর সবুজ হোটেলের আড্ডায় দিন কাটাচ্ছি। ভাবলাম বলেই দিবো আমাকে দিয়ে চাকরি-বাকরি হবে না। আমি ব্যবসা নিয়ে ভাবছি। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে করতে চাই। সাহস করে বিয়ের কথাটা বলতে পারলাম না। ব্যবসার চিন্তা করছি শুনে একটু চিন্তিত মনে হলো বড় ভাইকে। খাবার প্লেট চোখে রেখে বললেন, ব্যবসা করবি ক্যাপিটাল কোথায় পাবি? আমার তো বাড়তি টাকা নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। খাবার শেষ না করেই উঠে গেলাম। পরদিন সকালে বড় ভাইয়ের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে এলাম তার অফিসে। বড় ভাই ফোন করে তার বন্ধু মামুন সাহেবকে বললেন, নুরু ব্যবসা করতে চায়। আপনার ক্লিয়ারিং ব্যবসা শেখান ওকে সঙ্গে রেখে। সময় সুযোগ হলে লাইসেন্স একটা করে দেব। এই প্রান্ত থেকে মামুন সাহেব কি বললেন বুঝলাম না। ফোন রেখে বড় ভাই বললেন, মানুন সাহেবের অফিসে যাও ঠিকানা লিখে দিলেন : রহমান করপোরেশন, ৫৯৯ রামজয় মহাজন লেন, খাতুনগঞ্জ। আমার ব্যবসায়িক জীবনের প্রথম ঠিকনা। রিকশা নিয়ে চলে গেলাম রমজয় মহাজন লেন। অন্ধকার চিপা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখি বড় বড় অক্ষরে লেখা সইনবোর্ড: রহমান করপোরেশন। টুকেই পেলাম মামুন সাহেবকে। বললেন, ওয়েলকাম আসো বসো। একজনকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলে বললেন কাশেম সাহেব, আমাদের ম্যানেজার পরদিন ৯টার মধ্যে চলে এলাম অফিস। কাশেম সাহেবের সঙ্গে বেটিট্যাক্সি চেপে গেলাম কাস্টামস হাউজ। তারপর পোর্ট। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ব্যবসায়িক জীবনে শুরু হলো যেভাবে। সপ্তাহ-দশ দিন কাস্টমস-পোর্টে ঘুরে সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লিয়ারিং ব্যবসা আমাকে দিয়ে হবে না। রাতের খাবার টেবিলে কথাটা পাড়তেই বড় ভাই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। জানতে চাইলেন তাহলে কি করবি? বললাম ইন্ডেন্টিং ব্যবসা করবো। সাহাব উদ্দিন ভাইয়ের সূত্রে পরিচিত হারুন ভাই ঢাকায় ইন্ডেন্টিং ব্যবসা খুব ভাল করছেন। আমাকে হেপ্ল করবেন। টাকা-পয়সা তেমন লাগবে না। ছেটো একটা অফিস রুম। একটা ভালো টাইপারইটার, কিছু স্টেশনারিজ আর পোস্টল খরচের জন্য কিছু টাকা দিলেই হবে। আপনি তো আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালে মাসে ৮০০ টাকা দিতেন। ওই ৮০০ টাকা আরও ৬ মাস দেন। আমি ভালো করব। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে খুশিতে উনার চোখ দুটো ছলছল করছে… পরদিন সকালে মোটলসাইকেলের পেছনে বসে বড় ভাইয়ের অফিস ঘুরে খাতুনগঞ্জে। মামুন সাহেবকে বললাম, আমি কাস্টমসে যাব না আর। ক্লিয়ারিং ব্যবসা আমাকে দিয়ে হবে না। আমি ইন্ডেন্টিং নিয়ে ভাবছি। বড় ভাইও রাজি। তিনি বললেন খুব ভালো আইডিয়া। আমার পুরনো একটা  ইন্ডন্টিং লাইসেন্স আছে। ওটার কাগজপত্র ঠিক করে  নিয়ে শুরু করে দাও। জিগ্যেস করলাম নাম কি? মনীষা ইন্টারন্যাশনাল। নামটা আমার বেশ পছন্দ হলো। বললাম, আমি আজ থেকেই শুরু করতে চাই। সেই মনীষা। আমার প্রথম কোম্পানি। যার উপরে দাড়িয়ে আমি  দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প  গ্রুপ ওয়েল গ্রুপ একদূর এসেছে। আজ  আমি সফল একজন ব্যবসায়ী। চলবে… লেখক: সৈয়দ নুরুল  ইসলাম, চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল  গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ) টিআর/এসএইচ/

একসময়ের কবুতর ব্যবসায়ী এখন সফল উদ্যোক্তা

‘স্কুলজীবনে বাড়ির আঙিনায় নিয়মিত সবজি চাষ করতাম। শীতে আলু, বেগুন, টমোটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচামরিচ আর কত কি। বর্ষায় কচু লাউ কাকরল। সাথে কবুতর পালন করতাম। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বাড়তি সবজি বিক্রি করতাম। কয়েকটি হাটে বিক্রির টাকা জমিয়ে গ্রামের বন্ধুদের নিয়ে গোপনে চলে যেতাম চট্টগ্রাম শহরে। আলমাস, লায়ন, সিনেমা প্যালেস, খুরশীদ মহল, রঙ্গম জলসা ইত্যাদি নামকো সব সিনেমা হলে ছবি দেখতাম। গ্রামের বখে যাওয়া ছেলেরা পয়াসা খেলা নামের এক প্রকার জুয়া বসতো যততত্র হরহামেশা। মাঝে মাঝে সিকি আধুলি হাতে তাদের সাথেও ওই পয়সা খেলায় নেমে পড়তাম আমিও। একদিন সবজি আর নিজের পোষা কিছু কবুতর ছানা নিয়ে গেলাম কাজির বাজারে বেচাবো বলে, সাথে আর কবুতর ছানা কোনেকাচাই আর বিক্রি হয়নি। মনে খারাপ। সবকিছু গুছিয়ে বাড়ি ফিরবে এমন সময় এক ভদ্রলোক বললেন ২০০ টাকা দেবো। তাতেই রাজি হয়ে গেলাম। ভদ্রলোক আবার শর্ত দিলে তার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে আমাদের। ওতেও রাজি হয়ে গেলাম। গ্রামের কাঁচা পথ। চার পাশে ঘুটঢ়ুটে অন্ধকার। মাথায় সবজির খাঁচা, হাতে কবুতর ছানা। ভদ্রলোক সামনে আমরা তার পিছু পিছু হাটঁছি।... প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর ভদ্রলোক বললেন, এখানে দাঁড়াও। আমি টাকা নিয়ে আসছি।  সবজির খাঁচা আর কুবতর কার হাতে তুলে দিয়ে আমরা দুজন অপেক্ষায় থাকলাম। ভদ্রলোক আর আসেন না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ভ্রগ্ন মনোরথে বাড়ি ফিলে দেখি মা লণ্ঠন হাতে উঠানে দাড়িয়ে আছেন আমার পথ চেয়ে। নিজের ৩০ বছর ব্যবসায়ী জীবনে কত হাজার কোটি টাকার পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করেছি তার সঠিক হিসাব রাখা হয়নি। কখনো ডিসকাউন্ট কখনো অর্ডার বাতিল কখনো এয়াফ্রেইট কখনও নন-পেমেন্ট, সব মিলিয়ে কত কোটি টাকা যে কতদিকে চলে গেছে, মনে রাখিনি। কিন্তু এখনো ঠিক মনে রেখেছি সেদিনের সেই ২০০ টাকা খোয়ানোর কথা। কখনো ভুলবো না সবজি আর কয়েকটি কবুতর ছানা নিয়ে প্রতারিত হওয়ার কথা। জীবনের প্রতিটি পাতায় যেন নতুন বাঁক। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হল, ফলাফল নিয়ে নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। কারণ এই মধ্যে ফ্রিজ-টেলিভিশনের মিস্ত্রি হিসেবে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে সার্টিফিকেট পেয়ে গেছি। মা’য়ের অজানাতে মামাকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলাম ভিসা পাঠানোর জন্য। মামা আমার সে চিঠি পেয়েছিলো কি না জানিনা। ইতোমধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক রেজান্ট রেরুলো। দ্বিতীয় শ্রেনিতে পাস করলাম। একদিন সন্ধ্যায় আমার প্রিয় বন্ধু আইয়ুব আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে বলল, দোস্ত তুই কোন সাবচেক্টে পড়বি। আমার দুবাই যাওয়ার স্বপ্নের কথা বন্ধু মহলে তখনো অজানা। প্রথমে আইয়ুব জানালো আমি দুবাই নিয়ে ভাবছি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে না। চোখ কপালে তুলে আইয়ুব আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ তারপর যা বলল তার অর্থ হচ্ছে তাকে ছেড়ে আমি দুবাই যেতে পারব না। কিন্তু কি আশ্চর্য! আমি আইয়ুবকে ছাড়িনি। আইয়ু্ব আমাকে ছেড়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছে  কোন অজানায়। প্রিয় বন্ধু আমার.... আইয়ুবের পীড়াপীড়িতে অবশেষে রাজি হলাম। ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে অর্নাস করবে । আমি  অ্যাকাউন্টিং এবং ম্যানেজমেন্টে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। অবশেষে দুবাই যেতে প্রস্তুত গরিবের ঘরে জন্ম নেওয়া যুবকের উড়োহাজটি থাকলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। আমার পিতৃতুল্য বড়ভাই এই একবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের মধ্যপর্বে চট্টগ্রাম উন্নয়নের রূপকার চট্টগ্রামে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তখন শহিদ সোহরাওয়ার্দী সড়কের দানু মিয়া মার্কেটে দুই রুমের অফিস ভাড়া নিয়ে কামফ্যাক্টারি নামে চালাত সেলাই সুতো প্যাঁচানোর কারখানা। সব সময় এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন ভাই আমার। ভাইয়ের নতুন ও কুটির ব্যবসার কথা শুনে গেলাম ভাইয়ের কাছে। মিনিট দশেক ‍বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমার সবকিছু উজাড় করে তোর পড়াশুনা চালাব। তারপর থেকে আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি……………..চলবে লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল  গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ)  

মেট্রিকে থার্ড ক্লাস পাওয়া ছেলেটাই আজ সফল উদ্যোক্তা

বন্ধু প্রফেসর তাহের ক`দিন আগে ফোন করে বলল, দোস্ত তোকে ২৪ তারিখ দূপুর ৪ টায় আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হবে। কারণ জানতে চাইলে বলল, এমবিএ কোর্সে নবাগত ছাত্র ছাত্রীদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে একজন উদ্যোক্তা হিসাবে কিছু বলতে হবে। বন্ধুর অনুরোধে না করতে পারিনি।মনে মনে ভাবলাম হয়ত ছোট খাট কোন অনুষ্ঠান। উপস্থিত থেকে বন্ধু তাহেরকে খুশী করব। বৃহস্পতিবার ঠিক চারটায় সাউথইস্ট এশিয়া ইউনিভার্সটির অডিটোরিয়ামে হাজির হয়ে দেখি আমার নামের সাথে লেখা প্রধান অতিথি। উপস্থিত  আছেন ভিসি সাহেব,রেজিস্ট্রার সাহেব,আইবিএর একজন সিনিয়র প্রফেসর,বন্ধু প্রফেসর তাহের। আরো উপস্থিত শ`দুয়েক এমবিএর ছাত্র ছাত্রী।সবার সামনে  আমাকে কথা বলতে হবে সবার শেষে।কথা বলতে  আমি কখনো ভয় পাইনা।কিন্তু এত্ত এত্ত ইন্টেলেকচুয়ালদের সামনে কথা বলতে হবে দেখে কিছুটা ভাবনায় ছিলাম।কিন্তু কথা বলতে দাঁডাতে দেখি উপস্থিত ছাত্র ছাত্রীরা নড়ে চড়ে বসছে। তৃতীয় শ্রেনীতে মেট্রিক পাশ, দ্বিতীয় শ্রেনীতে উচ্চ মাধ্যমিক,সম্মান ডিগ্রীসহ মাস্টার্স করা একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে এ`ধরণের একটি একাডেমীক সেশনে কথা বলার সুযোগ দানের জন্য বন্ধু তাহেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আশির দশকে শূন্য হাতে শুরু করা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা একজন তরুণ কিভাবে ৩০ বছরে ২৫ হাজারের উপর মানুষের কর্ম সংস্থানের ঠিকানা হতে পারে। যখন তার গল্প বলতে শুরু করলাম তখন দেখি চারিপাশে পিনপতন নিরবতা। ....আমি স্বপ্ন দেখি নির্ঘুম রাতে আর সেই স্বপ্নের পেছনা ছুটে চলি,একটি স্বপ্ন পুরণ হতেই নতুন স্বপ্ন  আবার স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা...কখন যে রাত জেগে দেখা সেই সব স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গিয়ে ৩০ টি বছর চলে গেল বুঝতেই পারিনি...এভাবেই তোমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে রাত জেগে  আর সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হবে  আর একটি স্বপ্ন সৃষ্টির লক্ষে। ....জীবনে এমন একটি গল্প বানাও যে গল্প শুনে তোমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নতুন গল্প বানানোর স্বপ্ন দেখবে...। এমবিএ শেষ করে চাকুরীর খোজে ছুটাছুটি নাকরে নিজে চাকুরী সৃষ্টির চেষ্টা করো.... ১৭ মিনিট কথা বলে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্টেজ থেকে নামতে গেলে ঘিরে ধরল বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী।একজন জানতে চাইল, ‘স্যার  আপনি কি সত্যি সত্যি মেট্রিকে তৃতীয় শ্রেনীতে পাশ, না   আপনার গল্প বলতে গিয়ে মজা করেছেন।’ হাসতে হাসতে বললাম, না মোটেই মজা করিনি। সর্বমোট ৫৮৬ নাম্বার পেয়েও অংকে পেয়েছিলাম ২৩। এর সাথে ১০ গ্রেস মার্কস যোগ পাশ মার্ক ৩৩ করে  আমাকে তৃতীয় শ্রেনীতে পাশ দিয়েছে কুমিল্লা বোর্ড ।  আমাদের সময় কোন সাবজেক্টে গ্রেস মানেই থার্ড ডিভিশন। আমি সত্যি সত্যি তৃতীয় শ্রেনীতে মেট্রিক পাশ। লেখক: সৈয়দ নুরুল ইসলাম চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (ওয়েল  গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ)  

এশিয়ার সেরা উদ্যোক্তাদের তালিকায় বাংলাদেশের দুই তরুণ

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস চলতি বছরে এশিয়ার সেরা ৩০ উদ্যোক্তার তালিকা প্রকাশ করেছে।  ওই তালিকায় এসেছে বাংলাদেশের দুই তরুণ উদ্যোক্তার নাম।‘৩০ আন্ডার ৩০ এশিয়া ২০১৮ : দ্য সোস্যাল এনট্রপ্রেনারস ব্রিঙ্গিং পজিটিভ চেইঞ্জ টু এশিয়া’শিরোনামে এশিয়ার সেরা ৩০ উদ্যোক্তার তালিকা গত সোমবার (২৬ মার্চ) প্রকাশ করেছে ফোর্বস। ফোর্বসের এই তালিকায় উঠে আসা বাংলাদেশি দুই তরুণ উদ্যোক্তা হলেন, অনলাইন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান টেন মিনিটস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক (২৬) ও পরিবেশ রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘চেঞ্জ’ নামের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের প্রধান সাজিদ ইকবাল (২৭)। পরিবেশ রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যে সাজিদ ইকবাল ২০১২ সালে চেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন। প্ল্যাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে পরিবেশসম্মত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে ওই সময় একটি প্রকল্প চালু করেন তিনি।  ‘বোতলবাতি’ নামে তার এই প্রকল্প দ্রুত ব্যাপক সাড়া পায়। দিনের বেলায় বস্তির অন্ধকার ঘরে সূর্যের আলো ব্যবহার করে তৈরি হয় এই বোতলবাতি।  শুধু ঘরেই নয়, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশসাশ্রয়ী বাতি পৌঁছে দিতে সোলার পাইপ লাইট নামের একটি প্রকল্প নিয়েও কাজ করে তার প্রতিষ্ঠান। ফোর্বস বলছে, জার্মানির একটি সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া অন্তত ৪ হাজার মানুষের ঘরে বোতলবাতির আলো পৌঁছে দিয়েছেন সাজিদ।  তার এই প্রতিষ্ঠান সৌর লণ্ঠন, সড়ক বাতি, ক্ষুদে সেচ পাম্প প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করছে। এর আগে বাংলাদেশের এই তরুণ উদ্যোক্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস পদক, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, ব্রিটিশ রানির কাছে থেকে কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ডস-২০১৭ লাভ করেন। অন্যদিকে, শিক্ষামূলক সংগঠন হিসেবে ২০১৫ সালে ‘টেন মিনিট স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষা উদ্যোক্তা আয়মান সাদিক। ওই সময় মোবাইল অপারেটর রবির সহায়তায় তিনি এই অনলাইন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যার লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা; যেখান থেকে মানুষ শিক্ষা অর্জন করতে পারবে। টেন মিনিটস স্কুল ইউটিউব এবং ফেসবুকে সংক্ষিপ্ত লেকচারসমৃদ্ধ ভিডিও প্রকাশ করে। বাংলায় ভিডিওচিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অনলাইনে লাইভ ক্লাসও নিয়ে থাকে সাদিকের এই অনলাইন স্কুল। ফোর্বস বলছে, আয়মান সাদিকের অনলাইন এ স্কুল শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শত শত লাইভ ক্লাস, স্মার্ট বই, হাজার হাজার ভিডিও টিউটরিয়াল তৈরি করে।  বর্তমানে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছে সাদিকের এই স্কুল।  সম্প্রতি টেন মিনিটস স্কুলকে সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ রানির কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ডস-২০১৮ লাভ করেছেন আয়মান সাদিক।  এছাড়া এই স্কুলের জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আইসিটি জোটের বেস্ট ই-লার্নিং অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। আরকে// এআর

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি