অন্তর্বর্তী সরকার, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
প্রকাশিত : ১২:২৪, ৪ এপ্রিল ২০২৫ | আপডেট: ১৩:১২, ৪ এপ্রিল ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং গণতান্ত্রিক শূন্যতা দেশকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মতিতে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
প্রফেসর ইউনূস একজন নোবেল বিজয়ী, বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবক, যার নৈতিকতা ও দক্ষতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এই প্রত্যাশা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্রের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু অন্ধ সমর্থক এবং ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান। ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার স্বাদ একবার পাওয়ার পর অনেকেই তা সহজে ছাড়তে চান না। যদি এই অন্তর্বর্তী সরকার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে চায়, তবে তা জনগণের সঙ্গে এক ভয়ানক প্রতারণায় পরিণত হবে।
বাংলাদেশের জনগণ এই অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করেছিল এই বিশ্বাসে যে এটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করবে এবং জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত করবে। কিন্তু যদি এই সরকার নিজেদের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
প্রফেসর ইউনূস নিঃসন্দেহে একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন খাতে তাঁর দক্ষতা ও সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ নেই। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার যদি নির্বাচন বিলম্বিত করে বা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকতে চায়, তবে তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সংকটের জন্ম দেবে।
অভ্যন্তরীণ সংকট:
#সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পাবে, যা নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
#রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা ও সংঘাত বাড়বে, যার ফলে সহিংসতা বাড়তে পারে।
#বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করবে।
#প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে, কারণ অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘমেয়াদী নীতি গ্রহণের নৈতিক বৈধতা রাখে না।
আন্তর্জাতিক সংকট:
#গণতান্ত্রিক দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নেবে না, যার ফলে কূটনৈতিক চাপ বাড়বে।
#উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা কমে যেতে পারে, যা বিদেশি সাহায্য ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
#মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক শূন্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সমালোচনা শুরু করলে বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সঠিক কার্যক্রমের ওপর। জনগণ এই সরকারকে সমর্থন করেছিল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য—একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাই যারা এই সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করছে, তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের স্বার্থের পক্ষে কাজ করছে না।
ক্ষমতার মোহকে পরিহার করে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সরকারকে অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। গণতন্ত্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতে থাকা উচিত, ক্ষমতাসীনদের হাতে নয়। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। যদি এই সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বদলে দেশকে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত করবে।
লেখক: প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
এসএস//
** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।