পর্দা নামলো অমর একুশে বইমেলার
প্রকাশিত : ২১:৪৩, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

এ বছরের মতো পর্দা নামলো অমর ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৫’ এর। শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ছিল মেলার শেষদিন। এদিন সকাল থেকেই পাঠক ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত বইপ্রেমীরা।
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল এবারের বইমেলা। দর্শনার্থী এবং বইপ্রেমীদের জোয়ারের পাশাপাশি উপচে পড়েছিল আনন্দ, বেদনা, আবেগ, অনুভুতি সবকিছুই। শেষ দিনেও মেলার সর্বত্র ছিল লোকে লোকারন্য।
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’-শীর্ষক প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত এবারের বইমেলায় ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৯৯টি প্রতিষ্ঠান এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৬০৯টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবারের মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মোট ১ হাজার ৮৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে (গত বছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৬৪২টি এবং ইউনিট ছিল ৯৪৬টি)। অন্যদিকে, গতবারের মতো এবারও মেলার দুই প্রাঙ্গণে ৩৭টি প্যাভিলিয়ন ছিল। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬টি।
এদিকে, বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায় ছিল লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। এবার এখানে প্রায় ১৩০টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর, শিশুচত্বরে মোট ৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১২০টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় (গত বছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৬৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিট ১০৯টি)।
এবারের মেলায় বাংলা একাডেমির তথ্যমতে নতুন বই এসেছে ৩২৯৯টি। আর মেলার শেষ দিনে বই এসেছে ৩৩৫টি। বাংলা একাডেমি ২৭শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭ দিনে ৬১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৩ টাকার বই বিক্রি করেছে।
এদিকে, শুক্রবার বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় মেলার সমাপনী আয়োজন। এতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন- ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৫’-এর সদস্য সচিব ড. সরকার আমিন। প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন- সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সচিবের রুটিন দায়িত্ব) মো. মফিদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন- বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ৫২’র ভাষা আন্দোলন। এই ঘটনাটিকে স্মরণ করেই আমরা প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করি। আগামী দিনগুলোতে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে বইমেলাকে কী করে আরও সুন্দর করা যায় সে বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে।’
ড. সরকার আমিন বলেন, ‘বইমেলায় বাংলা একাডেমিসহ সকল প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে। বাংলা একাডেমি ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭ দিনে ৬১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৩ টাকার বই বিক্রি করেছে।’
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কিছু অস্থিরতা সত্ত্বেও এ বছর আমরা ‘অমর একুশে বইমেলা’ আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতে বইমেলাকে নতুন আঙ্গিকে নতুন মাত্রায় আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং বাংলা একাডেমিকে নতুন চিন্তাচেতনার ধারক একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।’
মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘এবারের একুশে বইমেলা নতুন তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আগামীতে তথ্য প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটিয়ে বইমেলাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।’
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের চেতনাবহ ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাস। মাসব্যাপী আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ভাষার জন্য জীবনদানকারী শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার একটি মাধ্যম।’
অন্যদিকে, বইমেলার ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেনÑ কবি শিমুল পারভীন ইতি, গবেষক আবদুল আলীম, গবেষক এম এ মোনায়েম এবং কবি মঈন মুনতাসীর।
সাহিত্য পুরস্কার প্রদান: এদিকে, এবারের বইমেলার এ সমাপনী আয়োজনে ‘কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ এবং ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪’ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে বাংলা একাডেমির ‘কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছেন- কবি আল মুজাহিদী এবং ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪’ পেয়েছেনÑ অধ্যাপক হান্স হার্ডার ও কথাশিল্পী বর্ণালী সাহা। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের পুরস্কারের অর্থ, সম্মাননাপত্র ও সম্মাননা-স্মারক প্রদান করা হয়।
স্মৃতি পুরস্কার প্রদান: বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশ
২০২৪ সালে প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা বইয়ের জন্য যৌথভাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছেÑ পাঠক সমাবেশ (প্লেটো: জীবন ও দর্শনÑআমিনুল ইসলাম ভুইয়া), ঐতিহ্য (ভাষাশহিদ আবুল বরকত: নেপথ্য-কথাÑ বদরুদ্দোজা হারুন) এবং কথাপ্রকাশ (গোরস্তানের পদ্য: স্মৃতি ও জীবনস্বপ্নÑ সিরাজ সালেকীন)। এছাড়া ২০২৪ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক শিশুতোষ বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কাকাতুয়া’ পেয়েছে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’।
এমবি//
আরও পড়ুন