শহীদ মিনার থেকে হাসপাতালের হিমঘরে সন্জীদা খাতুন
প্রকাশিত : ২১:৩৬, ২৬ মার্চ ২০২৫

সন্জীদা খাতুনকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ।
বুধবার (২৪ মার্চে) বেলা আড়াইটায় সন্জীদা খাতুনের কফিন শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। অশ্রু, গান, কবিতা ও ফুলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এ সময় ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’সহ বেশ কয়েকটি গান পরিবেশন করেছেন শিল্পীরা। তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে হাজির হয়েছিলেন অনেকে।
বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার পর গান, কথামালা আর আবৃত্তিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিদায় জানানো হয় বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব সন্জীদা খাতুনকে।
এর আগে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ নজরুল শিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। ব্যক্তিগতভাবেও কেউ কেউ এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় জীবনের এই বিপুল যাত্রা সাঙ্গ করেন সন্জীদা খাতুন। রাতে মরদেহ হিমঘরে রাখা হয়, পরে বুধবার দুপুর ১২টায় মরদেহ আনা হয় ছায়ানট ভবনে।
তিনি ছিলেন ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বশেষ সভাপতি। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বুধবার সকাল থেকেই ছায়ানট ভবনে ভিড় করেন শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের দীর্ঘ লাইন ছায়ানট ভবন ছাড়িয়ে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে গিয়ে ঠেকে।
ছায়ানট থেকে থেকে সন্জীদা খাতুনের মরদেহ নেওয়া হয় তার সাবেক কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখান থেকে আড়াইটার পর মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
শহীদ মিনারে সন্জীদা খাতুনের পুত্রবধূ ও রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী লাইসা আহমদ লিসা বলেন, ‘তিনি আজকে বিদায় নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর দেখানো পথ ও তাঁর শক্তি যেন ধারণ করতে পারি। এগিয়ে যেতে পারি। যাঁরা সমবেত হয়েছেন এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
বক্তব্য শেষে ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’ গেয়ে শোনান লিসা। গানটি গাইতে গিয়ে গলা ধরে আসে তাঁর।
শ্রদ্ধা জানাতে এসে নৃত্যশিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, সেই কিশোরীবেলায় সন্জীদা খাতুনের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি।
সন্জীদা খাতুনের সঙ্গে পরিচয় প্রসঙ্গে শর্মিলা বলেন, “আমার যখন ৮/৯ বছর, তখন থেকেই আপার সান্নিধ্য পেয়েছি। আমি তো চট্টগ্রামের মেয়ে। আপা চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে আপার সঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলাম।”
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা। এই শিল্পী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানান শর্মিলা।
তিনি বলেন, “মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার খবর পেলাম শিল্পী স্বপন চৌধুরীর কাছে। পরে আপার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তিনি বললেন, চলে আয়। আমি তখন নিয়মিত গান শিখতাম। তাই আমাকেও দলে নিয়ে নেন সন্জীদা আপা।”
বর্তমানে ছায়ানটের শিক্ষক শর্মিলা বলেন, “১৯৮৭ সালে আমার বিয়ে হয়, ওই বছর থেকেই ছায়ানটের সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেছি। সেটা আপার কারণেই। কোনো একটা গানের মর্মার্থ বুঝতে না পারলে আপার কাছে জানতে চাইতাম। তিনি ব্যাখ্যা করে বলে দিতেন। এমন মানুষ কী আর পাব! আপার মৃত্যুতে গভীর শূন্যতা কাজ করছে।”
সন্জীদা খাতুনকে ‘বাতিঘর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তিনি আলো জ্বেলেছিলেন এবং সেই আলোটা আমাদের সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে আজন্ম চেষ্টা করেছেন। তার মৃত্যুতে আলোটা যেন নিভে না যায়, তার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। তিনি যে আলোটা জ্বেলেছিলেন, সেই আলোটা আমাদের সবাইকে এগিয়ে নিতে হবে। এটাই আমি মনে করি আপার প্রতি আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধা নিবেদন হবে।”
শহীদ মিনারে সন্জীদা খাতুনকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।
আবুল খায়ের বলেন, “বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ছায়ানটের ভূমিকা তো শুধু গান দিয়ে বিচার করার ব্যাপার না। ষাটের দশকে পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কারা রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরনের সূচনা করেছে, সেই ছায়ানটের প্রধানতম মানুষ তো ছিলেন সন্জীদা খাতুন।”
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কর্মযজ্ঞেও সন্জীদা খাতুন নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন সংস্কৃতিচর্চায় যেটুকু কাজ করছে, তার পেছনে নানাভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন সন্জীদা খাতুন। আমরা ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় গত সপ্তাহে সন্জীদা খাতুনকে নিয়ে একটা ফিচার ছেপেছি। সেটা পড়লে সন্জীদা খাতুনের বর্ণাঢ্যজীবনের একটা ধারণা পাওয়া যায়। সন্জীদা খাতুনের মৃত্যু দেশের জন্য, জাতির জন্য বিরাট ক্ষতি।”
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, “এই যে হাজারো মানুষ জমায়েত হয়েছে, একসঙ্গে গান গাইছে। এই এক হওয়ার কাজটিই তো করেছেন সন্জীদা খাতুন। তিনি আমাদের একত্রে থাকার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আমরা তো এটাই চাই। একসঙ্গে থাকতে চাই।”
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিচর্চায় সন্জীদা খাতুনের পরিবারের একটা বড় ভূমিকা আছে উল্লেখ করে লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, “সারাদেশের হাজার হাজার শিল্পী তৈরি করেছে ছায়ানট। এটা তো সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রে একটা বড় শক্তি। বাংলাদেশকে ভালোবাসার কথা শুনিয়েছেন তিনি। বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে চলবার কথা শিখিয়েছেন তিনি।”
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন নৃত্যশিল্পী তামান্ন রহমান, অভিনয় শিল্পী তারিক আনাম খান, সংগীতশিল্পী ফারহিন খান জয়িতা, নাট্যগবেষক কামালউদ্দিন কবিরসহ অনেকে।
বেলা সাড়ে ৩টার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সন্জীদা খাতুনের মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে।
ছায়ানটের সহসভাপতি মফিদুল হক বলেছেন, হাসপাতালের হিমাঘরে থাকবে মরদেহ। পরে পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এসএস//
আরও পড়ুন